Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ১৬ জন
সর্বমোট পাঠক ৭১৩৭০৪ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৮৯৭৫৪ বার
+ - R Print

অনুবাদকের কথা

মানুষের জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক জীবনের এক সুস্পষ্ট চিত্র হচ্ছে আল-কুরআন। যে জীবন বিধান মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনকে ইহকাল ও পরকালে সমৃদ্ধির পথে, শান্তির পথে পরিচালিত করবে- কুরআনে তা সমৃদ্ধ ভাষাতে সহজ সরল ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেনো সাধারণ মানুষের তা বোধগম্য হয়। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্‌র এ এক অসীম করুণা সাধারণ মানুষের জন্য। না হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পথের দিশা অন্বেষন করে ফিরতো অন্ধের মত। কুর-আনের বাণীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এর মাধ্যমে মানব জাতিকে জীবন পথের দিক-নির্দেশণা দান করা। পবিত্র কুর-আনে পথনির্দেশ ও আত্মশুদ্ধি লাভের উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। যে তা গ্রহণ করতে পারে, তার চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। কুর-আনের প্রকৃত মূল্য ও তাৎপর্য এবং গুরুত্ব তখনই বুঝা সম্ভব হবে, যখন কুর-আন পড়ে বুঝতে পারা যাবে, উপলব্ধি করা সম্ভব হবে আত্মার মাঝে। এরূপ পাঠই পারে পাঠকের মনের দিগন্তকে প্রসারিত করতে, আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর করাতে, চরিত্রকে পুণঃগঠন করে চারিত্রিক গুণাবলীতে ভরিয়ে দিতে। মানুষের আধ্যাত্মিক জগতকে সমৃদ্ধশালী করে আল্লাহর নৈকট্যলাভের উপযুক্ত রূপে গড়ে তুলতে। কারণ আল্লাহ বলেছেন :

[৫০:৩৭] অবশ্যই এতে (কুর-আনে) রয়েছে উপদেশ তার জন্য যার (আন্তরিক) হৃদয় এবং বোঝার ক্ষমতা আছে অথবা যে শ্রবণ করে নিবিষ্ট চিত্তে।

আমাদের রীতি অনুযায়ী আমরা আরবীতে কুর-আন পাঠ করি, যার কোন অর্থই আমরা বুঝতে পারি না। আমরা পড়লাম কিন্তু তার বক্তব্য বুঝতে পারলাম না, তবে সে গ্রন্থ পাঠ করে লাভ কি? একটা সহজ সত্যকে আমরা অনুধাবনে অক্ষম যে, যখনই আমরা কোন বই পড়ি, সে পাঠের উদ্দেশ্য হয় বইটির মূল বক্তব্যকে অনুধাবন করা। একথা সাধারণ গল্পের বই থেকে শুরু করে উচ্চতর জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। যিনি ডাক্তার হবেন তিনি তার কিতাবের বক্তব্য সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য চেষ্টা করবেন, এবং এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করবেন শিক্ষকগণ। ডাক্তারী বিদ্যায় শুধু তত্বীয় জ্ঞান আহরণ করলেই চলবে না, তাকে হাতে কলমে কাজ করে প্রয়োগের মাধ্যমে অধীত জ্ঞানকে সম্পূর্ণ করায়ত্ত্ব করতে হয়। এ কথা শুধু যে ডাক্তারী বিদ্যার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়, জীবনের সকল জ্ঞানের ক্ষেত্রে, যেমন প্রকৌশল, আইন, হিসাব-বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান ইত্যাদি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এ সকল ক্ষেত্রে জ্ঞানকে পাঠের মাধ্যমে বুঝে, অনুধাবন করে করায়ত্ব করতে হয় এবং অধীত জ্ঞানকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনুশীলন করে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। যেখানে পার্থিব জ্ঞানকে বুঝে, জেনে, অনুশীলনের মাধ্যমে মানব জীবনে প্রয়োগ করতে হয়, সেখানে মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানকে, যা আল-কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানব জাতির জন্য প্রেরণ করেছেন, তাকে করায়ত্ব করার জন্য ও তা জীবনে প্রয়োগের জন্য, তা বোঝার বা অনুধাবনের প্রয়োজন নাই। না বুঝে শুধুমাত্র আরবীতে কুর-আন পাঠই আত্মিক সমৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট এই আমাদের বিশ্বাস। আরবের ভাষা আরবী। শুধু তাদের পক্ষেই আরবীতে কুর-আন পাঠ করে তা অনুধাবন করা সম্ভব। সুতরাং আরবের লোকেরা ব্যতীত অন্যরা আরবীতে কুর-আন পাঠ করে কিভাবে তার বক্তব্য অনুধাবন করতে পারবে?

ভাষা হচ্ছে চিন্তা বা মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম বিশেষ। সুতরাং সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আরবীতেই কুর-আন পাঠ করে নেকী অর্জন করা যায়, এ ধারণা সঠিক নয়। পূণ্যাত্না ইমাম গাজ্জালী বলেছেন যে, কুর-আন পাঠ করতে হবে নিম্নলিখিতভাবে। কণ্ঠের কাজ হবে তা উচ্চারণ করা, বুদ্ধির কাজ হবে তা বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে বক্তব্যকে বোঝা এবং হৃদয়ের কাজ হবে তা অনুভবের মাধ্যমে, উপলব্ধির মাধ্যমে, চিন্তার মাধ্যমে, ধ্যানের মাধ্যমে আত্তস্থ করা। এই তিনের সমন্বয় যখন ঘটে তখনই তা প্রকৃত কুর-আন পাঠ বা তেলাওয়াতের পর্যায়ে পড়ে। আল্লাহ বলেছেন :

[৩৮:২৯] কুর-আন্‌ এক কল্যাণময় কিতাব। ইহা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষ ইহার আয়াতসমূহ চিন্তা করে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে উপদেশ।

[৪৪:৫৮] অবশ্যই আমি [এই কুরআন] তোমার ভাষায় সহজ করে প্রকাশ করেছি, যেনো তারা [এর উপদেশে] মনোযোগ দিতে পারে।

[৪৭:২৪] তবে কি উহারা কুর-আন সম্বন্ধে অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করে না? না উহাদের অন্তর তালাবদ্ধ?

[২১:১০] [হে মানুষ] আমি তো তোমাদের জন্য এক কিতাব অবতীর্ণ করেছি যার মধ্যে তোমাদের জন্য আছে উপদেশ। তবুও কি তোমরা বুঝতে পার না?

উপরের আয়াতগুলি থেকে একথাই প্রমাণ হয় যে, কুর-আনকে পড়ে বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে, "অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করতে হবে" যেনো এর উপদেশ হৃদয় কন্দরে গভীরভাবে প্রবেশ করে ও স্থায়ীভাবে আসন লাভ করে। ঐশী বাণীকে অনুধাবনের মাধ্যমে প্রতিদিনের জীবন যাত্রায় তার প্রতিফলন দ্বারা সে সতর্ক হতে পারবে, উপকৃত হতে পারবে। কুর-আনকে আল্লাহ্‌ রসুলের (সা) অন্তরে ওহী বা অনুপ্রেরণার মাধ্যমে প্রেরণ করেন যা রসুলের (সা) মাতৃভাষা আরবীতে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আছে সতর্কবাণী যেনো মানুষ অনুতাপের মাধ্যমে নিজেদের সংশোধনের চেষ্টা করে। পূণ্যাত্মাদের জন্য কুর-আন হচ্ছে বিশ্বাসের অঙ্গীকার, যা আল্লাহর স্মরণ দ্বারা শক্তি লাভ করে। কুর-আনকে পড়ে তা বুঝার উপর আল্লাহ বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন :

[৫৪:১৭] বুঝার ও মনে রাখার জন্য কুর-আনকে আমি অবশ্যই সহজ করেছি। এর পরে এমন কেউ আছ কি যে উপদেশ গ্রহণ করবে?

কুর-আনের উপদেশকে সফলভাবে কার্যকর করতে হলে অবশ্যই তার অর্থকে সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য করতে হবে। তাহলে যে জাতির মধ্যে তা প্রথমে প্রচার করা হয়েছে তাদের ভাষাতেই প্রচার করতে হবে। কারণ মাতৃভাষার আবেদন মানুষের হৃদয় তন্ত্রীতে আঘাত হানতে সক্ষম। আর এ কারণেই আল্লাহর প্রত্যাদেশ বিভিন্ন রসুলের নিকট তাদের মাতৃভাষাতে প্রেরণ করা হয়, যেনো তিনি তার স্বগোত্রের নিকট মাতৃভাষাতে প্রচার করতে পারেন। আর এভাবেই তাদের মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার লাভ করতে সক্ষম হয়। এভাবেই তা একদিন বিশ্বমানবের মাঝে বিস্তৃতি লাভ করবে। আল্লাহ বলেছেনঃ

[৩৯:৪১] আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি [সমগ্র] মানব সম্প্রদায়ের জন্য।

[৮১:২৭] ইহা [কুর আন] তো শুধু বিশ্ব জগতের জন্য উপদেশ

এসব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, তাঁর বাণী বিশ্বমানবের কল্যাণের জণ্য প্রেরিত হয়েছে, সুতরাং এর প্রকাশ যে কোন ভাষাতেই হতে পারে। সে কারণেই হযরত মুসা ও হযরত ঈসার ধর্ম প্রচারের ভাষা আরবী ছিলো না। আল্লাহ বলেছেন 'ইসলাম' কোন নতুন ধর্ম নয়, 'ইসলাম' হচ্ছে হযরত ইব্রাহীমের ধর্ম, এবং কুরআন কোন নূতন ধর্মগ্রন্থ নয়। এটা হলো হযরত মুসার ধর্মগ্রন্থের সত্যায়নকারী। আল্লাহ বলেছেন :

[৪৬:১২] এর পূর্বে মুসার কিতাব ছিলো [মানুষের জন্য] পথ প্রদর্শক ও করুনা। এবং [কুর-আন] ইহাকে সত্যায়িত করে আরবী ভাষাতে; অন্যায়কারীকে সাবধান করার জন্য ও ন্যায় কর্মশীলকে সুসংবাদ দান করার জন্য।

সুতরাং ভাষা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। দ্ব্যর্থহীন ভাষাতে বলা হয়েছে যে, কুর-আনকে আরবী ভাষাতে অবতীর্ণ করা হয়েছে তার কারণ রসুলের (সা) চতুঃপার্শ্বের লোকদের মাতৃভাষা ছিলো আরবী। তাদের বোঝার সুবিধার্থে আরবী ভাষাতে কুর-আনকে অবতীর্ণ করা হয়। নীচের আয়াতগুলি তার প্রমাণ।

[১২:২] ইহা [কুর-আন] আমি অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পার।

[১৯:৯৭] আমি তো তোমার ভাষায় [কুর-আনকে] সহজ করেছি, যেনো এর সাহায্যে তুমি পূণ্যাত্মাদের সুসংবাদ দিতে পার এবং যারা বিতর্ক প্রিয় তাদের সতর্ক করতে পার।

[৪৩:৩] আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায়    কুর-আন, যেনো তোমরা [তা] বুঝতে সক্ষম হও।

[৪২:৭] এভাবে আমি তোমার প্রতি কুর-আন অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মক্কা ও উহার চতুর্দিকের জনগণকে এবং সতর্ক করতে পার কিয়ামত দিবস সম্পর্কে যাতে কোন সন্দেহ নাই। .......

[৪১:২-৩] দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ একটি কিতাব, যার আয়াতসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে - ইহা আরবী ভাষার কুর-আন, যারা বুঝতে পারে তাদের জন্য।

[৪৪:৫৮] অবশ্যই, আমি [এই কুর-আনকে] তোমার ভাষায় সহজ করে প্রকাশ করেছি, যেনো তারা [এর উপদেশে] মনোযোগ দিতে পারে।

উপরের আয়াতসমূহ থেকে একথা সুস্পস্ট যে, কুর-আন শরীফকে আরবীতে অবতীর্ণ করার কারণ এই ঐশী বাণী প্রথম যাদের মাঝে প্রচারিত হয়েছে তারা সকলে আরবী ভাষী। আরবী ভাষী লোকদের বুঝতে সুবিধা হবে এ কারণেই কুর-আন শরীফকে আরবীতে অবতীর্ণ করা হয়েছে।

আরবীতে কুর-আন অবতীর্ণ হওয়ার দরুন রসুলের (সা) পক্ষে কুর-আনের বক্তব্যকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করা সহজতর হয়েছে। কারণ মানুষের মাতৃভাষার উপরে দখল, বাকপটুতা, অলংকরণের ক্ষমতা অনেক বেশী ও গভীর হয়। যদিও ইসলামের আবির্ভাব সারা বিশ্বের জন্য, তবুও এর প্রাথমিক উন্মেষ ও বিকাশের জন্য তা আরবী ভাষাতে হওয়া প্রয়োজন ছিলো। আরবের সাধারণ মানুষের বোধগম্যের জন্যই কুর-আনকে আরবীতে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এটা কোন বেহেশতের ভাষা নয়। আল্লাহর বাণীর প্রকাশ যে কোন ভাষাতেই হতে পারে, কারণ সে বাণীর আবেদন সকলের জন্য সমান। সেভাবে মাতৃভাষাতে কুর-আন্‌ পাঠের ফলে এর আবেদন, ব্যাখ্যা, আল্লাহর হুকুম তাদের নিকট সহজেই হৃদয়গ্রাহী হবে। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহর বাণীর মর্মার্থ হৃদয়ে ধারণ করতে সক্ষম হবে। কুর-আনের বাণীর প্রভাব এ ব্যাপারে অপূর্ব। কুর-আনের বাণী সাধারণ ও জ্ঞানী সকলকেই সমভাবে অভিভূত করতে সক্ষম। ভাষা এখানে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আল্লাহ বলেছেনঃ-

[১৪:৪] স্ব-জাতির ভাষাতে শিক্ষাদান করা ব্যতীত আমি কোন রসুল প্রেরণ করি নাই, [তারা] যেনো লোকদের নিকট [বিষয়বস্তু] পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।........

এসব আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে কুর-আন্‌ শরীফ আরবীতে অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে তা অবতীর্ণ করা হয় আরবী ভাষী লোকদের মাঝে। কুর-আন পাঠ করে এর অর্থকে বুঝতে হবে, এবং সে অনুযায়ী জীবনকে পরিচালিত করতে হবে- এই-ই মানুষের নিকট বিশ্বস্রষ্টার দাবী। আল্লাহ বলেছেন-

[১৪:১] এই কিতাব আমি তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছি যেনো তুমি মানব জাতিকে অন্ধকারের অতল থেকে আলোতে পরিচালিত করতে পার তাদের প্রভুর নির্দ্দেশক্রমে, তার পথে যিনি মহা শক্তিধর, সকল প্রশংসার যোগ্য। 

উপরের আয়াত থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, কুর-আন পাঠের ফলে জীবনের সঠিক পথ নির্দ্দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে, যে পথে চললে মানবাত্মা হবে নৈতিক গুণে গুণান্বিত। ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, কৃতজ্ঞতা, সততা, আন্তরিকতা, অধ্যাবসায়, আত্মসংযম ইত্যাদি বহুবিধ গুণের জন্মলাভ করবে ব্যক্তির চরিত্রে, ফলে মানবাত্মাকে করবে আলোকিত। এ আলো তাদের পথ দেখায়, ফলে তাদের মাঝে আনে স্থিরতা, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, কল্যান-অকল্যাণ তাদের মনের আয়নায় খুব সহজেই ধরা পড়ে। আত্মিক অন্ধকার কেটে যাওয়ার ফলে তারা হন অত্যন্ত ন্যায়বান, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞা সম্পন্ন মানুষ। সর্বপরি তাদের মাঝে দেখা যাবে মানুষকে ভালোবাসার অসাধারণ ক্ষমতা। মানুষের জন্য দয়া, মায়া, ভালোবাসাতে এ সব হৃদয় থাকবে পরিপূর্ণ। এ সবই ব্যক্তির জীবনে ঘটে কুর-আনের শিক্ষাকে জীবনে গ্রহণ করার ফলে। কুর-আনের শিক্ষাকে যদি কেউ প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করে, এবং এর আয়াত সমূহ চিন্তার মাধ্যমে অনুধাবনের চেষ্টা করে, তবে সে বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে তাঁর অবস্থান ও মানুষের সাথে প্রকৃতির ও আল্লাহর সম্পর্ক অনুধাবনে সক্ষম হবে। চিন্তাশীল ও বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য কুর-আন হচ্ছে এক মহাগ্রন্থ- যা তাদের মনের সকল সন্দেহের অবসান ঘটায় এবং সকল প্রশ্নের সমাধান করে দেয়। এভাবেই কুর-আনের মাধ্যমে প্রকৃতি জ্ঞানী ব্যক্তিরা আধ্যাত্মিক জগতের শিক্ষালাভ করে থাকেন। আত্মিক উন্নতির বিভিন্ন ধাপ এই কুর-আনে বর্ণিত আছে। কুর-আনের পথ নির্দ্দেশের সাহায্যে মানবাত্মা সঠিক পথের দিশা খুঁজে পায়, বুঝতে সক্ষম হয় বিশ্ব জগতে মানুষ সৃষ্টির রহস্য। এর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে ইসলামের প্রথম যুগের ব্যক্তিগণ। চার খলিফার জীবনী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শুধু তাই-ই নয় ইসলামের ইতিহাসে এরূপ বহু ব্যক্তির সন্ধান মেলে যারা ইসলাম বিরোধী থেকে কুর-আনের বাণীর যাদুস্পর্শে পরিবর্তিত মানুষে রূপান্তরিত হয়ে শৈর্যে, বীর্যে, পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক হন। ইসলামের শিক্ষার স্পর্শে সেই পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত মদিনা রূপান্তরিত হয় সংঘবদ্ধ জাতিরূপে, যারা পৃথিবীর সম্মূখে শৈর্যে, বীর্যে, সাহসিকতায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে ভাস্বর হয়েছিলেন। যারা এক সময়ে ছিলেন অজ্ঞাত, অখ্যাত মরুচারী অজ্ঞ আরব, পৃথিবী যাদের নাম জানতো না, রসুলের (সা) সংস্পর্শে এসে কুর-আনের আলোতে অবগাহনের ফলে তাদের যে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ঘটে তা সত্যিই বিস্ময়কর। তাদের চরিত্র পরিণত হয় হিরক খন্ডের ন্যায়, যার দ্যুতি পৃথিবীকে করেছিলো আলোকিত। এর থেকে সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায় যে, আল্লাহর নবী ও তার সাহাবারা কুর-আনকে না বুঝে তেলাওয়াতের (lip service) মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব কর্তব্য শেষ করতেন না। কুর-আনের আসল মূল্য, তাৎপর্য ও গুরুত্ব তো শুধু তখনই উপলব্ধি করা সম্ভব হবে যখন কুর-আনের বক্তব্যকে জানা ও বুঝা সম্ভব হবে এবং তখনই কুর-আন পাঠ দ্বারা পাঠকের চরিত্রের কার্যকর পরিবর্তন সম্ভব। আল্লাহ কুর-আনকে অবতীর্ণ করেছেন মানুষের চিন্তা চেতনায় জগতকে উজ্জীবিত করে তা পুনঃগঠন করতে। জীবন ও জগত সম্বন্ধে মানুষের ভুল ধারণাগুলিকে দূর করে, মানুষের আধ্যাত্মিক জগতকে সমৃদ্ধশালী করে, আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপযুক্তরূপে গড়ে তুলতে। মানুষ যখন কুর-আনের বক্তব্যকে জানতে ও বুঝতে পারবে তখন তারা আল্লাহর নির্দ্দেশ পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সমর্থ হবে। তা না করে অর্থ না বুঝে শুধুমাত্র আরবীতে কুর-আন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই কল্যাণকর ফল লাভ সম্ভব নয়। কুর-আনকে আল্লাহ্‌ বলেছেন "জ্ঞানগর্ভ কিতাব।"

[১০:১: ৩১:২] এইগুলি জ্ঞানগর্ভ কিতাবের আয়াত।

[৩৬:২] শপথ জ্ঞানগর্ভ কুর-আনের।

কুর-আন হচ্ছে জ্ঞানের ভান্ডার। এই জ্ঞান যখন ব্যক্তি মানসে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোতে ভাস্বর হবে, শুধু তখনই বিশ্বনবীর (সা) শিক্ষাকে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি জীবনে সার্থকভাবে প্রতিফলিত করা সম্ভব। কুর-আন হচ্ছে মূল অগ্নিশিখা যা থেকে অগনিত প্রদীপ আলো গ্রহণ করে থাকে। সেই কুর-আনকে যদি আমরা শুধুমাত্র মৌখিক আরবী পাঠের মাধ্যমে শেষ করে দিই এবং এর অর্থের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করি তবে কিভাবে আমরা আল্লাহর হেদায়েত লাভে সক্ষম হব? একবার হযরত আয়েশা (রা) কিছু লোকের কথা জানতে পারলেন যে তারা একরাতে দু-তিন বার কুর-আন খতম করে। তিনি তাদের ব্যাপারে হুশিয়ার করে বলেন, "তারা কুর-আন পড়ে বলে মনে করে, কিন্তু আসলে তাদের কিছুই পড়া হয় না।" আসলে বুঝে শুনে এবং যথার্থ চিন্তা ভাবনা করে কুর-আনের কিছু অংশ পড়া- না বুঝে চিন্তা ভাবনা না করে অনেকখানি তেলাওয়াত করা অপেক্ষা উত্তম। কণ্ঠ, হৃদয় ও বুদ্ধির মধ্যে সম্পূর্ণ সংগতির মাধ্যমে তা অধ্যয়ন করা উচিত। বাংলাদেশে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ কুর-আন তেলাওয়াত করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের মানুষ কুর-আন পাঠ করেন সত্য কিন্তু তা তেলাওয়াতের পর্যায়ে পড়ে না। তেলাওয়াত শব্দটির অর্থ-অনেক ব্যপক ও গভীর। এর অর্থ পড়তে হবে, পড়ে বুঝতে হবে, চিন্তা করতে হবে এবং হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। মূল কুর-আন আরবীতে হওয়ায় এর কোনটাই হয় না। কিছু সংখ্যক বাংলা অনুবাদ বের হয়েছে। কিন্তু কুর-আন শরীফ অবতীর্ণ হয়েছে প্রাচীন আরবী ভাষাতে যার প্রতিটি শব্দ চয়ন স্বয়ং স্রষ্টা কর্তৃক নির্বাচিত। এ ভাষার সৌন্দর্য, ধ্বনির মাধুর্য, রচনাশৈলী, ভাবের প্রকাশ কোনও অনুবাদকের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের ইংরেজী অনুবাদ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুবাদ হিসেবে স্বীকৃত। তার ভাষ্য অনুযায়ী কুর-আনের সৌন্দর্যকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা কোনও অনুবাদকের পক্ষেই সম্ভব নয়। সুতরাং যে কোন অনুবাদে কুর-আনের সেই স্পষ্ট ভাষা, প্রকাশের গভীরতা, ভাবের মাধুর্য, তা অবশ্যই সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় নাই। মাওলানা ইউসুফ আলী তর্জমার সাথে প্রতিটি আয়াতে তার ব্যাখ্যা বা তাফসীর দান করেছেন। তার তফসীরে তিনি প্রতিটি আয়াতের মূল শিক্ষাকে উপস্থাপন করেছেন, আল্লাহ তার বান্দাকে কি বলতে চান, সেই বক্তব্যকে প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে এবং নৈতিক উপদেশের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কুর-আনের অনুবাদের সাথে তাঁর তাফসীর গুলি পাঠ করলে কুরআনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর জন্য যে নৈতিক শিক্ষাদান করা হয়েছে তার সন্ধান লাভ করা যায়। আরবী ভাষার অর্থ না বুঝে শুধুমাত্র বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের মূল উপদেশকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। আল্লাহর কালামকে অনুধাবনের জন্য তর্জমা ও তাফসীর উভয়েরই প্রয়োজন। এই অনুধাবন থেকেই আমি মাওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের তাফসীর গুলি বাংলায় অনুবাদের সিদ্ধান্ত নেই। বাংলায় অনুবাদ করতে যেয়ে অনুধাবন করলাম আমার সীমাবদ্ধতা। তিনি সামান্য এক লাইনে যে বিশাল ভাবের প্রকাশ করেছেন, আমার মত ক্ষুদ্র ব্যক্তির পক্ষে তা প্রকাশ করতে অন্ততঃ দশ লাইনে ভাবানুবাদ করতে হয়। সুতরাং তার তাফসীর সমূহের মূল ভাবকে সঠিক রেখে ভাবানুবাদ করা হয়েছে। তার তাফসীর সমূহের ভাবানুবাদ করার পরেও মনে হয়েছে যা প্রকাশ করতে চেয়েছি তা প্রকাশ করা হয় নাই। আরও কিছু গভীর ভাব ব্যঞ্জনাময় করে বর্ণনা করা উচিত ছিলো। তাঁর মত পন্ডিত ব্যক্তির ভাষার প্রকাশ আমার মত ক্ষুদ্র ব্যক্তির পক্ষে সম্পুর্ণরূপে করা অসম্ভব। আমার এ অক্ষমতা সর্বশক্তিমান ক্ষমা করুন। সর্বশক্তিমানের কাছে এই আমার প্রার্থনা যে আমার চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলো না। উল্লেখ করা হচ্ছে যে, জনসাধারণের বোঝার সুবিধার্থে তার লেখা টিকার নম্বর ও বাংলা অনুবাদের টিকার নম্বর একই রাখা হয়েছে তাদের জন্য যারা ইংরেজী বাংলাকে সমন্বিত করে পড়তে চান। আমাদের দেশে অনেকেই আছেন যারা ইংরেজী বোধগম্য না হওয়ার দরুন ইউসুফ আলী সাহেবের তাফসীর পড়তে পারেন না। তাদের জন্যই আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। যদি একজনও আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা দ্বারা উপকৃত হন তবে আমি মনে করবো আমার পরিশ্রম সার্থক। আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ধারায় বিধৌত করেছেন।

একথা বলবো না যে, আরবী পাঠের প্রয়োজনীয়তা নাই। অবশ্যই আরবীতে কুর-আন পাঠ শিখতে হবে, কারণ আরবী হলো মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের ভাষা। সারা মুসলিম বিশ্ব এই এক ভাষাতে ঐক্যবদ্ধ। কেবলা যেরূপ মুসলিম বিশ্বের একতার কেন্দ্রবিন্দু, ঠিক সেরূপ হচ্ছে আরবী ভাষা। মুসলিম জাহানের অনুভবের ঐক্য যা বিশ্বের দূরত্বকে অতিক্রম করে সকল মুসলমানকে একসূত্রে গ্রথিত করেছে, তা হচ্ছে আরবী ভাষা। হজ্বের প্রাক্কালে লক্ষ লক্ষ মুসলমান যখন কাবা প্রান্তরে নামাজে দাঁড়ায়, তখন এই ঐক্যের অনুভূতি সকল মুসলমান তীব্রভাবে অনুভব করে। বিশ্বের সকল প্রান্তরের বিভিন্ন ভাষাভাষি দেশের মুসলমানেরা কাবা প্রান্তরে নামাজে অংশগ্রহণ করে এবং একই ভাষাতে আল্লাহর এবাদতে মশগুল হয়, এর থেকে বড় ঐক্য আর কিসে হতে পারে? সুতরাং আরবীতে কুরআন পাঠের সাথে সাথে মাতৃভাষাতে অনুবাদ ও তাফসীর পাঠ করতে হবে। কুর-আনকে পড়ে বুঝতে হবে, এর বক্তব্যকে চিন্তা করতে হবে, এবং তা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে এবং সর্বশেষে তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। কুর-আন হচ্ছে সেই ঐশী বাণী যা মানব জীবনের পথ চলার নির্দ্দেশ। মনে রাখতে হবে নির্দ্দেশ না বুঝলে পথের ঠিকানা মিলবে না। ঠিকানা ভুল হলে সঠিক মঞ্জিলে পৌঁছানো সম্ভব হবে না, তখন আমাদের অবস্থা হবে ঐ ইহুদীদের মত যারা তাদের গ্রন্থ থেকে পথের নির্দ্দেশ নিতে পারে নাই। এদের সম্বন্ধে আল্লাহ বলেছেন :

[৬২:৫] যাদের উপরে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে তারা সে দায়িত্ব বহনে অকৃতকার্য হয়েছিলো, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে বৃহৎ গ্রন্থখন্ড বহনকারী গাধার ন্যায়, [যে গ্রন্থের কিছু বুঝে না]। যে সম্প্রদায় আল্লাহর আয়াতসমূহ মিথ্যা গণ্য করেছে, কত নিকৃষ্ট তাদের উপমা। যারা পাপ করে আল্লাহ তাদের সৎ পথ প্রদর্শন করেন না।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তাঁর বাণী প্রচারের জন্য ইহুদীদের বিশেষভাবে নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তারা প্রকৃত সত্যকে ভুলে যায় এবং দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে। 'তাওরাত' ছিলো তাদের ধর্মগ্রন্থ, যার মাধ্যমে আল্লাহর বাণী বিশ্বমানবের জন্য প্রেরণ করা হয়। কিন্তু তারা সে বাণীর মর্মার্থ ভুলে যায় এবং আনুষ্ঠানিকতাকে তাদের ধর্মরূপে পরিগণিত করে। ইহুদিরা তাদের নিজ গোষ্ঠিভূত বহু পয়গম্বরকে হত্যা করেছে। যখনই তাদের নিজেদের মতের সাথে সত্যের বিরোধ ঘটেছে তখনই তারা তাদের হত্যা করেছে। এভাবে তারা তাওরাতের শিক্ষাকে অস্বীকার করেছে। এদের উপমা হচ্ছে ভারবাহী গাধার ন্যায়। গাধা যেরূপ পিঠে কি বহন করে সে সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং বাহিত মূল্যবান বোঝা দ্বারা সে কোনভাবেই উপকৃত হয় না, সেরূপ হচ্ছে ইহুদীদের দৃষ্টান্ত। তাওরাতের শিক্ষা দ্বারা তারা উপকৃত হয় নাই। মুসলমানদেরও আজকে সাবধান হওয়ার সময় এসেছে, তারা যেনো ঐ ইহুদীদের মত "গর্দ্দভে" পরিণত না হয়- যারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা থেকে জীবনের পথ নির্দ্দেশ গ্রহণে হবে অক্ষম। না বুঝে শুধুমাত্র আরবীতে কুর-আন পাঠের ফলে এর শিক্ষাকে হৃদয়ঙ্গম করে জীবনে প্রতিফলিত করা সম্ভব হয় না। ফলে তাদের অবস্থা হয় ভারবাহী ঐ গাধার মত, পিঠে কি সম্পদ বহন করে সে জানে না। কুর-আনে যেখানে যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে চারিত্রিক গুণের সমষ্টিগত শক্তির উপরে যা ঈমানের মূল শক্তি, যেখানে বলা হয়েছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও গুনরাজি-ই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ও পারলৌকিক জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি, সেখানে আজকের মুসলমানেরা কুর-আনকে না বুঝে পড়ার দরুন, জীবনের সৌন্দর্য থেকে হয়েছে বঞ্চিত। কুর-আনের অমূল্য উপদেশকে তারা নিজ জীবনে ধারণ করতে হয়েছে অক্ষম, ফলে তারা পরিণত হয়েছে নির্গুন ও মৌলিক সৃজন ক্ষমতাবিহীন জাতিতে।

মনে রাখতে হবে ভাষা হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম বিশেষ। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আজকে মুসলমানেরা শিক্ষিত হয়েও এই ভ্রান্ত ধারণায় বিশ্বাসী যে, না বুঝে শুধুমাত্র আরবীতে কুরআন পাঠের মাধ্যমে অশেষ সওয়াব লাভ করা যায়। যে তেলাওয়াত হৃদয়ে ধারণ করা হয় না, যার দ্বারা মানব আত্মা উপকৃত হয় না তা অবশ্যই আল্লাহর কাম্য নয়। যেদিন আমরা বিশ্বাস করবো যে, ঐশী গ্রন্থ যে কোন ভাষাতেই পাঠ করলে, তার ঐশি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হারায় না, এবং যে কোনও ভাষাতেই আল্লাহকে আহ্বান করলে তা আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হয়, সেদিন থেকে ঘটবে মুসলমানদের পুনঃ জাগরণ। একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, কুর-আন কোন বিশেষ গোষ্ঠির ধর্মগ্রন্থ নয়। কুর-আন হচ্ছে বিশ্ব মানবের জন্য জীবন পথের পথ নির্দ্দেশ। সেখানে আরবী-অনারবী, আর্য-অনার্য, কালো-সাদার মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই সবার জন্য সমান নির্দ্দেশ আছে।
সুস্পষ্ট ভাষাতে বলা হয়েছে কুর-আন হচ্ছে বিশ্বমানবের জন্য পথ নির্দ্দেশ, আরও বলা হয়েছে হযরত মুহম্মদ (সা) সারা বিশ্বের জন্য প্রেরিত দূত। আল্লাহ্‌ বলেছেন :

[৩৪:২৮] আমি তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।

[২১:১০৭] আমি তো তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি কেবল রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।

মনে রাখতে হবে রসুলের (সা) গন্ডি শুধু আরবের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ ইসলামের গন্ডি আরবের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে বিস্তৃত। সে কারণে আরবী ভাষা ছাড়াও যে কোন ভাষাতেই কুর-আনের আবেদন মানব আত্মার জন্য সমভাবে বর্তমান। সুতরাং আরবীতে কুর-আন পাঠের সাথে সাথে মাতৃভাষাতে অনুবাদ ও তাফসীর পাঠ করতে হবে। সেই সাথে বুঝতে হবে, চিন্তা করতে হবে এবং আল্লাহর বাণীকে হৃদয়ঙ্গঁম করে, সর্বশেষে প্রাত্যহিক জীবনে তার প্রয়োগ ঘটাতে তবে। মনে রাখতে হবে স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্ক বিবেকের ও আত্মার।

প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমার মত যাদের নূতন পদচারণা তারা জানেন, এ এক অচেনা, অজানা ভুবন, যেখানে বহু নিয়ম নীতি বিদ্যমান- যা একজন নব আগন্তুকের থাকে অজানা। সুতরাং নবাগত হিসেবে আমার মনে হয়েছে এ এক দুরূহ কাজ। লেখা শেষ করার পরেও দীর্ঘ পাঁচ বছর অপেক্ষা ও চেষ্টা করতে হয়েছে প্রকাশনার জন্য। প্রকাশনার সেই মহাসন্ধিক্ষনে যাদের সাহায্যে আমার প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখতে পেলো তারা হচ্ছেন সিলেট শাহজালাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক খান জহুরুল ইসলাম (রীপন), আবু মোহাম্মদ ইউসুফ বিন আহম্মদ, ট্রেইনি এ্যাসিস্টেন্ট, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড এবং এ, এস, এম আসাদুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ রাইফেলস্‌ কলেজ। এদের নাম কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। এদের সহযোগীতা না পেলে আমার ন্যায় বর্ষীয়ান নারীর পক্ষে প্রকাশনার এই দুরূহ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের কল্যান করুন। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট তাদের সর্বমঙ্গল কামনা করি। এই মহতী উদ্যোগের সাথে আর যারা সম্পৃক্ত আছেন তাদের সবাইকে জানাই ধন্যবাদ। আল্লাহ তাদের সকলকে যোগ্য পুরস্কারে ভূষিত করুন।

পরিশেষে আমার সকল প্রচেষ্টা মহান আল্লাহর দরবারে নিবেদন করে শেষ করছি। যিনি আমার মত এক অজ্ঞ এবং অখ্যাত নারীকে তাঁর কালাম চর্চ্চার অধিকার দিয়ে ধন্য করেছেন। হে আল্লাহ! আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, জ্ঞানের স্বল্পতা থাকলেও তোমার বাণীর প্রতি আমার আনুগত্য ছিলো অসীম। এই আনুগত্যটুকুই ছিলো আমার সম্বল। ঐকান্তিকভাবে চেষ্টা করেছি তোমার কিতাবের কথাকে সহজ সরলভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। যদি এতে কোন সফলতা থাকে, তবে প্রভু, সে তোমারই অনুগ্রহ। আর আমার বিফলতা, সকল দোষ-ত্রুটি, সে আমারই অক্ষমতা।

প্রভু! আমার সে অক্ষমতা তুমি ক্ষমা করে আমাকে তুমি তোমার রহমতের ধারাতে ধন্য করো। আমি তো ক্ষুদ্র, নগণ্য, তুচ্ছ, দীন, হীন এক নারী। তোমার রহমতের অসীম ব্যাপ্তির মাঝে আমাকে সামান্য ঠাঁই দিও। প্রভু হে! আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল ভ্রান্তি ক্ষমা করে আমার এবাদত গ্রহণ করে আমাকে তুমি ধন্য করো। 


বিনীতা
হোসনে আরা খান
অনুবাদক