Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ১৪ জন
আজকের পাঠক ৮৯ জন
সর্বমোট পাঠক ৭২৫৭৭৮ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৯৯০৭০ বার
+ - R Print

সূরা হুদ


সূরা হুদ - ১১

১২৩ আয়াত, ১০ রুকু, মক্কী,
(দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে)


ভূমিকা : ১০ থেকে ১৫ নম্বর সূরা সমূহ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এদের সম্পর্কে ১০ নম্বর সূরার ভূমিকাতে জ্ঞাতব্য বিষয় সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। সেই দিক থেকে ১১ নম্বর সূরাটি ১০ নম্বর সূরার অতিরিক্ত অংশ বিশেষ হিসেবে গণ্য করা যায়। ১০ নম্বর সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে মানুষের প্রতি, আল্লাহর দয়া ও করুণার উপরে ; ঠিক সেইভাবে ১১ নম্বর সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহর ন্যায় বিচারের উপরে। যখন মানুষ আল্লাহর প্রসারিত দয়া ও করুণার হাতকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় তখন আল্লাহর করুণা থেকে সে হয় বঞ্চিত। ফলে অবধারিতভাবে আল্লাহর শাস্তি তার উপরে নেমে আসে।

সার সংক্ষেপ : আল্লাহর প্রত্যাদেশ, আল্লাহর দয়া ও করুণারই স্বাক্ষর। এই আয়াত গুলিতে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে আল্লাহ্‌ মানুষের অকৃতজ্ঞতা, মিথ্যার প্রতি ভালবাসা, দম্ভ, অহংকার, কুচক্রপনা প্রভৃতি করুণা ও ধৈর্য্যের সাথে মোকাবেলা করেন। [১১; ১-২৪]

বিধর্মীরা হযরত নূহ এর প্রচারিত আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে ঠাট্টা-বিদ্রুপের বস্তুতে পরিণত করে। হযরত নূহ্‌ আল্লাহ্‌র নির্দেশে নৌকা তৈরী করেন এবং আল্লাহ্‌র করুণায় হযরত নূহ্‌ মহা প্লাবন থেকে রক্ষা পায়। অপরপক্ষে যারা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করেছিল, তাঁরা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। [১১ ; ২৫-৪৯]

হুদ নবী আদ সম্প্রদায়কে মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করতে নিষেধ করেছেন, সালেহ্‌ নবী তার সম্প্রদায়কে আল্লাহ্‌র প্রতীক উটের অসম্মান করতে নিষেধ করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা প্রত্যাখাত হয়েছেন, ফলে প্রত্যাখানকারীরা পৃথিবী থেকে নিঃশেষ হয়ে গেছে [১১;৫০-৬৮]

হযরত লূত তাঁর সম্প্রদায়কে তাঁদের পাপের বিরুদ্ধে সাবধান করে দেয়, কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করে না। ফলে তারা তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করে। প্রতারণা ও জাল জুয়াচুরীর বিরুদ্ধে সুয়েব নবী মিদিয়ানবাসীদের সাবধান করেন, কিন্তু তারা তাকে ভৎর্সনা করে, পরিণামে তারা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। [১১; ৬৯-৯৫]

ফেরাউনের মত উদ্ধত অহংকারী নৃপতি যে তার সম্প্রদায়কে বিপথে চালিত করেছিলো, পরিণাম স্বরূপ নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। আল্লাহ্‌ ন্যায় বিচারক। পাপের শাস্তি হবেই। সুতারাং সব ধরণের মন্দ ও পাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহ্‌র সেবা করতে হবে। [১১; ৯৬-১২৩]

সূরা হুদ - ১১

১২৩ আয়াত, ১০ রুকু, মক্কী,
(দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে)


০১। আলিফ-লাম-রা [এই সেই] কিতাব যার আয়াতসমূহ [প্রমাণিত অর্থসহ] মৌলিক । ১৪৯৩। উপরন্তু, [এখানে] বিশদভাবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্ত্বার নিকট থেকে।

১৪৯৩: দেখুন সূরা [৩:৭] আয়াতে এবং টিকা ৩৪৭। জীবনের প্রতিটি মূল নীতিমালা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশে সন্নিবেশিত এবং তা উদাহরণ, উপমা ও রূপকের সাহায্যে বিষদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

০২। [যা শিক্ষা দেয়] আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুকে এবাদত করবে না। [বলঃ] "অবশ্যই আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ।" ১৪৯৪।

১৪৯৪: যুগে যুগে অন্যান্য নবী রসুলেরা আল্লাহ্‌র যে প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলো, হযরত মুহম্মদ মুস্তফার (সা) জন্যও সেই একই প্রত্যাদেশ ছিল। আল্লাহ্‌র এই প্রত্যাদেশ হচ্ছেঃ (১) মন্দ বা পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ্‌র সর্তকবাণী এবং (২) বান্দার জন্য আল্লাহ্‌র রহমতের সুসংবাদ । আল্লাহ্‌র রহমতের যোগ্য তারাই যারা আল্লাহ্‌তে বিশ্বাসী ও নির্ভরশীল ও শুধুমাত্র এক আল্লাহ্‌র এবাদত করে, - এই দ্বিবিধ প্রত্যাদেশকে এই সূরায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

০৩। [এবং এভাবে ধর্ম প্রচার কর] " তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, এবং অনুতাপের মাধ্যমে তাঁর দিকে ফিরে এসো, যেনো তিনি তোমাদের এক নির্দ্দিষ্ট কালের জন্য উত্তম জীবন উপভোগ করাকে মঞ্জুর করতে পারেন; এবং তিনি তাঁর সীমাহীন অনুগ্রহ সকল গুণীজনকে দান করতে পারেন। ১৪৯৫। কিন্তু যদি তোমরা ফিরে যাও তাহলে আমি তোমাদের জন্য মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করি।"

১৪৯৫: "উত্তম জীবন উপভোগ করাকে মঞ্জুর করতে পারেন"। এই বাক্যটিতে পার্থিব সকল সুখ-সুবিধা, আরাম-আয়েশের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। "সীমাহীন অনুগ্রহ" শব্দটি আধ্যাত্মিক জগতের সমৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই সমৃদ্ধি এই পৃথিবীতেই শুরু হয়ে যায়, কিন্তু পরিসমাপ্তি ঘটে পরকালের জীবনে।

০৪। "আল্লাহ্‌রই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং সকল বিষয়ের উপরে তিনি ক্ষমতাবান।"

০৫। দেখো ! তারা তাদের হৃদয়কে ভাঁজ করে ফেলে যেনো তারা আল্লাহ্‌র নিকট মিথ্যা বলতে এবং গোপন করতে পারে। ১৪৯৬। আঃ! যখন তারা নিজেদের পোষাক দ্বারা আবৃত করে রাখে তখনও তিনি জানেন তারা কি গোপন করে এবং কি তারা প্রকাশ করে। কারণ তিনি ভালোভাবেই অন্তরের [গোপন কথা] অবগত। ১৪৯৭।

১৪৯৬। সাধারণত হৃদয় কথাটি হৃৎপিন্ড কথাটির পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। হৃৎপিন্ড বুকের অস্থির কাঠামের মধ্যে অতি সাবধানে সুরক্ষিত দেহযন্ত্রের অংশ বিশেষ, কিন্তু হৃদয় ঠিক তা নয়। আমরা সাধারণত : কোনও গোপন সুরক্ষিত কথাকে বলে থাকি যে হৃদয়ের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত। কারও নিকট থেকে মানসিক আঘাত পেলে প্রকাশ করি যে, হৃদয় আঘাতে বিপর্যস্ত, দুঃখ কষ্টকে প্রকাশ করি, হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত ইত্যাদি। অর্থাৎ হৃদয়কে মানুষের আবেগ ও অনুভূতির প্রতীক স্বরূপ কল্পনা করা হয়। সেদিক থেকে মানুষের গোপনতম অনুভূতি হৃদয়ের মাঝেই লুকিয়ে রাখে। এখানে হৃদয় কথাটি 'মন' এর প্রতীক স্বরূপ। যারা নির্বোধ শুধু তারাই ভাবতে পারে যে তারা তাদের হৃদয়ের অনুভূতি আল্লাহ্‌র কাছে লুকিয়ে রাখতে পারবে। "গোপন রাখবার জন্য হৃদয়কে ভাজ করে" এটি একটি বাগধারা অর্থ তারা তাদের অন্তরের বিদ্বেষ গোপন রাখে। এই বাক্যটি প্রতীক ধর্মী। অর্থাৎ শরীরের বিভিন্ন অংগ আচ্ছাদিত করার জন্য আমরা কাপড় ব্যবহার করি ; শরীরের যে কোনও দোষত্রুটি ঢেকে রাখার জন্য বস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারি, ঠিক সেই রূপ আমরা আমাদের অসৎ চিন্তা, পরিকল্পনা যত্ন সহকারে লোক চক্ষুর অগোচরে রাখতে পারি। কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে তা দিবালোকের মত সুষ্পটা বস্তু জগতের সামান্যতম জ্ঞান, মনোজগতের সামান্যতম আবেগ, অনুভূতি, দৃশ্য, অদৃশ্য সবই মহানপরাক্রমশালী আল্লাহ্‌র নিকট দিবালোকের মত ভাস্বর, সুষ্পষ্ট।
১৪৯৭। দেখুন সূরা [৩; ১১৯] আয়াতে।

০৬। পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নাই যে, তার জীবিকার জন্য আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীল নয়। ১৪৯৮। তিনি তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী সময় ও অবস্থান সম্বন্ধে অবগত। ১৪৯৯। সুষ্পষ্ট নথিতে সব কিছু [লিপিবদ্ধ] আছে। ১৫০০

১৪৯৮। দেখুন সূরা [৬:৫৯] আয়াত।আল্লাহ্‌র হুকুম বা পরিকল্পনা ব্যতীত পৃথিবীতে কোনও কিছুই ঘটতে পারে না। দৃশ্য, অদৃশ্য, কোনও কিছুই তাঁর অজ্ঞাত নয়। গাছের সামান্য পাতা পর্যন্ত তাঁর হুকুম ব্যতীত পড়ে না। জগৎ সমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা সব কিছু তাঁরই পরিকল্পনার উপরে নির্ভরশীল।

১৪৯৯। "Mustaqarr" অর্থ নির্দিষ্ট বাসস্থান, যেখানে কেউ আসে, অথবা কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম লাভ করে। কোনও স্থানে স্থাপিত হয়। "Mustauda" কোনও বস্তুকে স্থাপন করা, কিছুক্ষণের জন্য অবস্থিত রাখা। প্রথম শব্দটি ব্যবহার হয়েছে পৃথিবীর সকল জীবিত প্রাণীর জন্য, তাদের পার্থিব জীবন ও জীবন চক্রের সব কিছুই এই শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে স্থায়ী অবস্থিতি। দ্বিতীয় শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অস্থায়ী অবস্থানের অর্থ পৃথিবীতে পূর্বের ক্ষণস্থায়ী অবস্থান যেমন মাতৃজঠর ডিমের মধ্যে। আবার ভিন্ন অর্থেও ক্ষণস্থায়ী অবস্থানের শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন : শেষ বিচারের দিনে পুনরুত্থানের পূর্বে মানুষের কবরের মাঝে যে অবস্থান সেই ক্ষণস্থায়ী অবস্থানকেও বুঝানোর জন্য শব্দটির এখানে প্রয়োগ হতে পারে।

১৫০০। দেখুন সূরা [৬:৫৯] আয়াত ও টিকা ৮৮০ এবং সূরা [১০:৬১] ও টিকা ১৪৫০।

০৭। তিনিই ছয় দিনে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। ১৫০১ [তখন] তাঁর সিংহাসন ছিলো পানির উপর ১৫০২। তোমাদের মধ্যে  চারিত্রিক [গুণাবলীতে] কে শ্রেষ্ঠ তা যেনো পরীক্ষা করতে পারেন। ১৫০৩। কিন্তু তুমি যদি তাদের বল" মৃত্যুর পরে তোমাদের অবশ্যই উত্থিত করা হবে," অবিশ্বাসীরা নিশ্চয়ই বলবে, ১৫০৪ "এটা তো সুষ্পষ্ট যাদু।

১৫০১। দেখুন সূরা [৭:৫৪} আয়াত এবং টিকা ১০৩১।

১৫০২। বৈজ্ঞানিক ভাবে এ কথা স্বীকৃত যে প্রাণের সর্বপ্রথম অবির্ভাব ঘটে পানিতে। বৈজ্ঞানিক মতবাদের সুষ্পষ্ট প্রমাণ মেলে কুর-আনের এই আয়াতে। "তার আরশ ছিল পানির উপর।" অর্থাৎ প্রাণের সৃষ্টি তিনি পানি থেকেই করেন। "ছিল" কথাটি অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের পূর্বে অতীত কালকে বুঝানো হয়েছে। পানির থেকেই প্রথম প্রাণের উদ্ভব ঘটে; কুর-আনের অন্য একটি আয়াত সূরা [২১:৩০] আয়াতে এই কথারই সত্যতা প্রমাণিত করে।

১৫০৩। এই বিশাল বিশ্ব-ভূবন সৃষ্টি আল্লাহ্‌র কোনও খেয়াল খুশী নয়। হিন্দুরা যেমন বিশ্বাস করে পৃথিবী সৃষ্টি ভগবানের "লীলা-খেলা'' মাত্র। ইসলামের জীবন দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ্‌ পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার আত্মিক বিকাশ ও উন্নতির লক্ষ্যে। এই নশ্বর দেহের মাঝে যে আত্মা মানুষকে স্বইচ্ছায় সেই আত্মার উৎকর্ষতা লাভ করতে হবে, যেনো নশ্বর দেহ ত্যাগের পরে তার আত্মা পরম আত্মার সানিধ্য লাভের যোগ্যতা অর্জন করে। পৃথিবীর জীবন যাপনের মাধ্যমেই এই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাই পৃথিবীর জীবন যাপন মানব সন্তানের জন্য পরীক্ষার ক্ষেত্র স্বরূপ। আচার আচরণে শ্রেষ্ট অর্থাৎ চারিত্রিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ।

১৫০৪। যারা আল্লাহ্‌ বিশ্বাসী নয়, তারা পরকালেও বিশ্বাসী নয়। পরলোকের জীবনের উল্লেখে তাদের যে ধারণা জন্মে তা হচ্ছে : যাদুকরদের বক্তব্যের সামিল। যাদুকররা যেমন মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়। তাদের প্রকাশিত ও দর্শনীয় বস্তুর যেমন কোনও সত্যের ভিত্তি নাই, তা শুধুই দৃষ্টি বিভ্রমকারী ও প্রতারণাপূর্ণ, কাফেররা পরলোক সম্বন্ধেও সেই ভাবেই ধারণা করে। এ সব কথা তাদের অজ্ঞতারই পরিচায়ক।

০৮। যদি আমি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের শাস্তিকে স্থগিত রাখি, তবে তারা নিশ্চয়ই বলবে, "কি সে তা ফিরিয়ে দিল ?" ১৫০৫। আঃ! যেদিন [যথার্থই] তা তাদের নিকট আসবে। [সেদিন] কিছুই তা তাদের নিকট থেকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। যা নিয়ে তারা ঠাট্টা বিদ্রূপ করতো তারা তার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়বে।

১৫০৫। কাফেররা যে ভাবে ধর্মকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে-তাকেই এখানে উপরের বাক্যটির দ্বারা তুলে ধরা হয়েছে। উপরের বাক্যটির যথার্থ দাঁড়ায় এই যে, ধর্মের সকল কথা, পরকালের কথা, পরকালের শাস্তির কথা, সকলই মিথ্যা সকলই কল্প কাহিনী।

রুকু -২

০৯। যদি আমার পক্ষ থেকে মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ অস্বাদন করাই এবং তার পরে তা তার নিকট থেকে প্রত্যাহার করি, দেখো ! সে হতাশ হয় এবং আল্লাহ্‌র নিন্দায় [ব্যপৃত হয়] ১৫০৬।

১৫০৬। পৃথিবীর জীবন সর্বদা মসৃন নয়। এ জীবনে বহু চড়াই উৎরাই পথ অতিক্রম করতে হয়। আল্লাহ্‌ মাঝে মাঝে মানুষের জীবনে বিপদ আপদ দুঃখ-দুর্দ্দশা দিয়ে থাকেন। কারণ সোনা যেরূপ আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, সেরূপ বিপদ দুঃখ-দুর্দ্দশার পথ অতিক্রম কালে মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তি চরিত্রের দৃঢ়তা ধৈর্য্য একাগ্রতা প্রভৃতি চারিত্রিক গুণাবলীর বিকাশ লাভ করে ও চারিত্রিক মাধুর্য্য উজ্জ্বলতা লাভ করে খাঁটি সোনাতে রূপান্তরিত হয়। আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীলতা থেকে আমাদের আধ্যাত্মিক জগত উন্নত ও অনুশীলনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা লাভ করে।

১০। কিন্তু যদি দুঃখ দুর্দ্দশা স্পর্শ করার পরে আমি তাকে [আমার] অনুগ্রহের স্বাদ অস্বাদন করাই, তখন সে অবশ্যই বলবে, "আমার বিপদ আপদ কেটে গেছে।" ১৫০৭। দেখো! সে উল্লাস ও অহংকারে পতিত হয়,-

১৫০৭। পৃথিবীর জীবনে যখন বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে মানুষ সাফল্য লাভ করে মানুষের স্বভাব ধর্মই হচ্ছে সাফল্যের পুরো কৃতিত্বই সে নিজে ভোগ করতে চায়। বিপদে যে আন্তরিকতা নিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহ্‌র স্মরণাপন্ন হয়েছিলো, বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পরে সাফল্যের স্বর্ণ দুয়ারে পৌঁছে সে সেই স্রষ্টাকে ভুলে যায়, যার দয়ায় তার এই সাফল্য। তার মনের ভাব হচ্ছে সর্ব কৃতিত্ব সব সাফল্য তার একক। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোরও প্রয়োজন বোধ করে না। ফলে দুঃখ বিপদ বিপর্যয়ের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাকে যে পাঠ শিক্ষা দিতে চান সে পাঠ গ্রহণ করতে সে হয় অসমর্থ। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও নির্ভরশীলতা থেকেই মানুষ জীবনের চড়াই উৎরাই এর পথে, জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারে ; যে শিক্ষা স্রষ্টা তাকে দিতে চান। আর কৃতজ্ঞতা বোধ যদি না থাকে, যদি দম্ভ ও অহংকার তার আত্মার মাঝে জন্ম লাভ করে। তবে সেই দম্ভ ও অহংকার তার আত্মাকে অন্ধকাচ্ছন্ন করে ফেলবে; ফলে আল্লাহ্‌র শিক্ষার আলো তার অন্তরে পৌঁছাবে না।

১১। [কিন্তু] যারা ধৈর্যশীল, এবং দৃঢ় এবং সৎ কাজ করে ১৫০৮। তারা সেরূপ করে না। তাদের জন্য আছে [পাপের] ক্ষমা এবং মহা পুরস্কার।

১৫০৮। এই আয়াতে তাদের কথাই বলা হয়েছে যাদের জন্য আছে আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও প্রতিদান। তাদের কাজ ও মানসিকতার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। তারা বিপদে দুর্যোগে, দুঃখ কষ্টে ধৈর্য্য হারান না। অথবা সৌভাগ্যের ও সাফল্যের দিনেও দম্ভ ও অহংকারে স্ফীত না হয়ে তখনও বিনয়ে বিনম্র থাকেন। জীবনের সকল অবস্থাতেই তারা তাদের সৎ কাজের ধারা অব্যাহত রাখেন। এরাই আল্লাহ্‌র পুরস্কারের যোগ্যতা লাভ করে থাকেন।

১২। সম্ভবত : তোমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে তার কিছু বর্জন করার [ইচ্ছা হতে পারে] ১৫০৯। এবং তোমার অন্তর সংকুচিত হবে এ কথায় যে, তারা বলে "তার নিকট রত্নভান্ডার প্রেরণ করা হয় না কেন অথবা তার সাথে ফেরেশতা আসে না কেন ?" তুমি তো কেবল সতর্ককারী। আল্লাহ্‌-ই সকল বিষয়ের কর্মবিধায়ক।

১৫০৯। ১২ তম আয়াত এক বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়। মক্কার মোশরেকরা মহানবীর (সা) সমীপে সমবেত হয়ে কতিপয় আবদার পেশ করেছিলো। প্রথমতঃ তারা বলেছিলো আল্লাহর প্রত্যাদেশে আমাদের দেব-দেবীদের নিন্দা করা হয়েছে। তাই আমরা এর প্রতি ঈমান আনতে পারছি না। আপনি এর সংশোধন করুন। দ্বিতীয়ত : আমরা আপনার নবুয়তের উপরে বিশ্বাস করবো যখন দেখবো যে দুনিয়ার সমস্ত ধন-ভান্ডার আপনার আয়ত্বে আনা। এই আয়াতে রসুলুল্লাহ্‌কে (সা) উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, আপনি কি হতোদ্দম হয়ে তাদের কথায় কুর-আনের কোন কোন আয়াত প্রচার করা ছেড়ে দেবেন? মোশরেকদের মনোরঞ্জনের জন্য মহানবী (সা) কুর-আনের কোন কোন আয়াত গোপন করতে পারেন না। মহানবীর (সা) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সাধারণ মানুষের উর্দ্ধে, তবুও এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে আমাদের মত  সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষের সকল দুর্বলতাই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তা তিনি প্রচন্ড মানসিক শক্তির কারণে সে সব দুর্বলতা জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে তার মনে হয়তো ক্ষণিকের জন্যও মনে হতে পারে "যদি সামান্যতম অংশ গোপন করা হয়; তবে খুব সহজেই আল্লাহ্‌র সত্যকে প্রচার ও প্রসার ঘটানো সম্ভব।" অথবা "যদি প্রচুর অর্থ সম্পদ থাকতো তবে আল্লাহ্‌র বাণীর প্রচার কাজ খুব সহজ হতো" অথবা "অলৌকিক ক্ষমতার। [যেমন দেবদূতরা সাহায্য করতো] অধিকারী হতাম তবে খুব সহজেই আল্লাহ্‌র বাণীর প্রচার ও প্রসার ঘটাতে সক্ষম হতাম।" অর্থাৎ দুঃসাধ্য কাজকে স্বল্প সময়ে ও স্বল্প কষ্টে সমাধান করার উপায় খোঁজা সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের বৈশিষ্ট্য। মহানবীও ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ। তার মাঝেও ক্ষণকালের জন্য হলেও দুর্বলতা জাগা ছিল স্বাভাবিক। মহানবীর (সা) সময়ে সমসমায়িক আরবের সামাজিক অবস্থা এতটাই কলুষতাপূর্ণ ছিল যে তাকে অপসারণ করে কলুষমুক্ত করা হিমালয়কে স্থানচ্যুত করার মতই দুরূহ কাজ ছিলো। যে বিরাট দায়িত্ব তার উপরে আল্লাহ্‌ অর্পণ করেছিলেন, তা অনুধাবনের ক্ষমতা আমাদের ক্ষুদ্র মানুষের নাই। এই দায়িত্ব সমাপ্ত করার ব্যগ্রতা থাকাই স্বাভাবিক আর এখানেই সাময়িক ভাবে মানুষ হিসেবে মহানবীর দুর্বলতা। এই আয়াতে মহানবীকে বলা হয়েছে যে সত্যকে আল্লাহ্‌ যে ভাবে প্রকাশিত করেছেন ঠিক সেভাবেই প্রকাশ ও প্রচার করতে হবে। সে সত্যের প্রচার ও প্রকাশ অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য না হতে পারে। অরুচিকর মনে হতে পারে কিন্তু তা থেকে একচুল পরিমাণও সরে দাঁড়াবার উপায় নাই, গোপন করার উপায় নাই। এবং ধন সম্পদ ও অলৌকিক ক্ষমতাকে সত্য প্রচারের মাধ্যম মনে করার কারণ নাই। আল্লাহ্‌ যাকে যে সম্পদ দান করেছেন, সে সেই সম্পদের সদ্ব্যবহার করে সত্যে অবিচল থেকে সত্য প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করবে। বাকীটা থাকবে আল্লাহ্‌র হাতে।

উপদেশ : এই আয়াতের মমার্থ হচ্ছে কোনও অবস্থাতেই সত্যকে গোপন করা যাবে না। এখানে 'সত্য' কথাটি প্রতীক ধর্মী। যে কোনও ন্যায় ও সত্যকে এখানে 'সত্য' কথাটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। সত্য প্রকাশের জন্য বান্দার প্রয়োজন আল্লাহ্‌র উপরে একান্ত নির্ভরশীলতা, অকুতোভয় ও আপোষহীন মনোভাব। আল্লাহ্‌ যাকে যে সুযোগ সুবিধা দান করেছেন, সত্য প্রচারের ও প্রসারের জন্য সে ততটুকুই ব্যবহার করবে, আরও বেশী সুযোগ সুবিধার আকাঙ্খা করবে না। এই হচ্ছে আল্লাহ্‌র নির্দেশ। এই হচ্ছে এই আয়াতে সর্বসাধারণের জন্য উপদেশ।

১৩। অথবা তারা বলতে পারে, "সে এটা মিথ্যা রচনা করেছে।" বল, "তাহলে এরূপ দশটি মিথ্যা রচিত সূরা আনায়ন কর, এবং [তোমাদের সাহায্যের জন্য] আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য যাকে খুশী ডেকে আন যদি তোমরা সত্য বলে থাক। ১৫১০।

১৫১০। দেখুন সূরা [২:২৩] আয়াত এবং সূরা [১০:৩৮] আয়াত ।

১৪। "যদি তারা [মিথ্যা উপাস্যরা] তোমাদের [ডাকে] সাড়া না দেয়, মনে রেখো এই প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে আল্লাহ্‌র জ্ঞান দ্বারা [পূর্ণ করে]। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। এর পরেও তোমরা আত্মসর্ম্পণকারী হবে কি ?"

১৫। যারা বর্তমান জীবন ও এর চাকচিক্য কামনা করে,-দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের [পূর্ণ] ফল দান করি ; তার কিছুই সংকুচিত করা হবে না। ১৫১১ ।

১৬। তাদের জন্য পরকালে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নাই। তারা যে অভিসন্দি করে তা বৃথা হবে, এবং যে কাজ করে থাকে তার কোন কার্যকারিতা থাকবে না।

১৫১১। যারা পার্থিব জীবন ও ভোগবিলাসে অনুরক্ত তারা পৃথিবীর চাকচিক্য, অর্থ-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিতে মুগ্ধ থাকে। তাদের জীবনে এ সব পাওয়াই হচ্ছে সর্বোচ্চ পাওয়া, জীবনের মোক্ষ লাভ। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, পৃথিবীর জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যই এই পৃথিবীতে আমাদের আগমন। যারা পার্থিব জীবনকে অত্যাধিক গুরুত্ব দান করে, তাদের আধ্যাত্মিক জীবন অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে যাবে। আল্লাহ্‌র প্রদর্শিত পথ দেখতে তারা অক্ষম হবে। তাদের অন্তর আল্লাহ্‌র নূরে আলোকিত হবে না। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথে চলতে অক্ষম হওয়ার ফলে তাদের চরিত্রে দুর্লভ গুণরাজির জন্ম নেবে না, যা অন্তরকে আলোকিত করে, বিবেকের জন্ম দেয়, অর্ন্তদৃষ্টির (Spiritual insight) সৃষ্টি করে। তাদেরকে আল্লাহ্‌ ইহলৌকিক, তাদের জন্য কাম্য বস্তু দান করবেন অকৃর্পণ ভাবে যা অন্তঃসারশূন্য।

১৭। তারা কি তাদের মত যারা তাদের প্রভুর নিকট থেকে প্রেরিত সুস্পষ্ট [নিদর্শনকে] গ্রহণ করে ১৫১২, যারা তাঁর প্রেরিত সাক্ষীকে অনুসরণ করে ; যেমন এর পূর্বে মুসার কিতাব ছিলো, পথ প্রদর্শক এবং অনুগ্রহ স্বরূপ ১৫১৩ তারা তাতে [আল-কুরআনে] বিশ্বাস স্থাপন করেছিলো। কিন্তু যে দল তা প্রত্যাখান করে, আগুন হবে তাদের প্রতিশ্রুত মিলন-স্থান। সুতারাং এতে সন্দেহ পোষণ করো না। কারণ এটা তো তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত সত্য। তথাপি মানুষের মধ্যে অনেকে বিশ্বাস করে না।

১৫১২। "প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শন" অর্থাৎ পবিত্র কুর-আন যা আল্লাহ্‌র তরফ থেকে আল-মোস্তফাকে (সা) দেয়া হয়েছে। এখানে হযরত মুসাকে দেয়া মূল কিতাবের সাথে কুর-আনের তুলনা করা হয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে ; বিভিন্ন রসুলের নিকট প্রেরিত ঐশীবাণীর মধ্যে ইসলাম কোনও ভেদাভেদ করে না। আল্লাহ্‌র প্রেরিত বিভিন্ন নবী রসুলের মধ্যেও পার্থক্য করে না। ইসলাম বিশ্বাস করে সকলেই সেই এক আল্লাহ্‌র বাণীর বাহক মাত্র। কুর-আনের সত্যতার সাক্ষী কুর-আনের মধ্যেই বর্তমান, অর্থাৎ এর বিস্ময়করতা। দ্বিতীয় সাক্ষী ইতিপূর্বে তাওরাত এসেছে, যা হযরত মুসা (আ) আল্লাহ্‌ তায়ালার রহমত স্বরূপ দুনিয়া বাসীর জন্য নিয়ে এসেছিলেন। কুর-আন যে আল্লাহ্‌ তায়ালার সত্য কিতাব এই সাক্ষ্য তাওরাতে সুষ্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত ছিল।

১৫১৩। "Imam" কথাটি ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে "guide and mercy " এবং বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে " পথ প্রদর্শক ও অনুগ্রহ স্বরূপ " । অর্থাৎ যিনি পথের সন্ধান জানেন এবং পথ দেখিয়ে নিয়ে যান বা যিনি নেতা। আধ্যাত্মিক জগতের এই পথ হচ্ছে আল্লাহ্‌র করুণা, রহমত ও দয়া। কুর-আন ও নবী হযরত মুহম্মদ (সা) কে বলা হয়ে থাকে আল্লাহ্‌র পথের পথ নির্দেশক ও মানুষের জন্য কল্যাণ ও রহমত স্বরূপ। এই আয়াতে পরিস্কার ভাবে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী নবীরা যারা আল্লাহ্‌র প্রেরিত পুরুষ ছিলেন, তারা এবং তাদের প্রতি প্রেরিত কিতাবও হচ্ছে আল্লাহর "আদর্শ ও অনুগ্রহ স্বরূপ। "

১৮। আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে যে মিথ্যা রচনা করে তার থেকে বড় পাপী আর কে? তাদের উপস্থিত করা হবে তাদের প্রভুর সম্মুখে এবং সাক্ষীগণ বলবে, "এরাই তারা যারা তাদের প্রভুর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করেছিলো। দেখো ! যারা পাপ করে আল্লাহ্‌র অভিশাপ তাদের উপরে-

১৯। যারা [মানুষকে] আল্লাহ্‌র পথে বাঁধা দান করে, এবং তার মাঝে বক্রতা অনুসন্ধান করে ; এরাই তারা যারা পরকালকে অস্বীকার করে ১৫১৪ ।

১৫১৪। দেখুন সূরা [৭:৪৫] আয়াত।

২০। তারা পৃথিবীতে [আল্লাহর পরিকল্পনা] ব্যর্থ করতে পারবে না, আল্লাহ্‌ ব্যতীত তাদের কোন অভিভাবক নাই। তাদের শাস্ত্তি দ্বিগুণ করা হবে। তারা শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ছিলো এবং তারা দেখতেও পেতো না ১৫১৫-

২১। এরাই তারা, যারা তাদের নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলেছিলো। এবং তাদের উদ্ভাবিত [অলীক কল্পনাগুলি] তাদের হতাশার মাঝে ত্যাগ করে গিয়েছিলো।

২২। নিঃসন্দেহে এরাই ঠিক সেই ব্যক্তি যারা পরকালে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্থ।

১৫১৫। দেখুন সূরা [৭:৩৮] আয়াত। যারা আল্লাহ্‌র পথে মানুষকে বাঁধা দান করে তাদের সম্বন্ধে এই আয়াতে বলা হয়েছে। তাদের পাপ দুধরণের। (১) তারা আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করে বা আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা প্রচার করে। তাদের এই পাপের দরুণ তাদের আধ্যাত্মিক জগত অন্ধকারচ্ছান্ন হয়ে যায়। ফলে, শারীরিক নয়, আত্মিক দিক থেকে তাদের মৃত্যু ঘটে। (২) তাদের দ্বিতীয় পাপ হচ্ছে, তারা আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা প্রচারের দ্বারা ও আল্লাহ্‌কে অস্বীকার দ্বারা সাধারণ মানুষকে বিপথে চালিত করতে প্ররোচিত করে। সাধারণ মানুষকে বিপথে পরিচালিত করা অন্যায় ও পাপ। প্রতিটি ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকবে। উপরোক্ত দ্বিবিধ পাপের দরুণ তাদের আধ্যাত্মিক জগত অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং তাদের আত্মার মৃত্যু ঘটে। আত্মার মৃত্যু এখানে রূপক অর্থে ব্যবহৃত। এই কথাটির অর্থ হচ্ছে, তাদের শোনার ক্ষমতা, অর্থাৎ আল্লাহ্‌র বাণী শোনার ক্ষমতা যার অর্থ যা তাদের জন্য মঙ্গলজনক তা তারা অনুধাবনে ব্যর্থ হবে। চোখ থাকতেও দেখার ক্ষমতা থাকবে না। একথাটির অর্থ, তাদের বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টি থাকবে না। ফলে তাদের প্রতিটি কাজে দূরদর্শিতার অভাব ঘটবে। যারা উপরোক্ত দ্বিদিধ পাপে অভ্যস্ত আল্লাহ্‌ তাদের শ্রবণশক্তি ও দর্শন শক্তি কেড়ে নেবেন। ফলে এসব লোকের মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অভাব ঘটবে। তাদের মাঝে বোঝার ক্ষমতা, অনুধাবন ক্ষমতা, অন্তর্দৃষ্টি তিরোহিত হবে। ফলে কোনও কাজে দূরদর্শিতার সাথে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তাদের থাকবে না।

২৩। কিন্তু যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, এবং তাদের প্রভুর নিকট বিনয়াবনত হয় ।১৫১৬। তারাই হবে [বেহেশতের] বাগানের অধিবাসী, সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী।

১৫১৬। "And humble themselves before their Lord" । এ কথাটির বঙ্গাঁনুবাদ করা হয়েছে "তাহাদিগের প্রভু প্রতি বিনয়াবনত হয়।" বিনয় মুসলমানদের অন্যতম গুণ যা আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য এই বিনয়ের অর্থ "চাটুকারিতা" নয় যা অনেক সময়ে দেখা যায় প্রভাবশালী বা ধর্মীয় ব্যক্তির সংম্পর্শে এলে হীনমন্য ব্যক্তিরা করে থাকে। কুর-আন শরীফে যে বিনয়ের কথা বলা হয়েছে তাঁর উৎপত্তি স্থল সেই সর্বশক্তিমানের অনুভবের মাধ্যমে। ব্যক্তির মেধা, জ্ঞান, অর্থ-সম্পদ প্রভাব-প্রতিপত্তি, প্রতিভা, প্রভৃতি সকল নেয়ামত সেই মহাপ্রভু আল্লাহ্‌র দান। এখানে ব্যক্তির কোনও নিজস্ব কৃতিত্ব নাই। এই বোধ তাঁকে শুধু যে আল্লাহ্‌র কাছে বিনয়ী করে তাই-ই নয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সকলের কাছেই তার এই বিনয়ের প্রকাশ ঘটে। কারণ সে জানে তার সর্ব কৃতিত্ব সর্বশক্তিমানের দান, ফলে তার চরিত্রে জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাসের, আত্মসম্মানের। জীবনের কোনও অবস্থাতেই যেমন সে চাটুকারিতার আশ্রয় গ্রহণ করে না, তেমনই যারা তার তুলনায় নগন্য তাদের নিকট ঔদ্ধত্য বা অহমিকা প্রদর্শনে বিরত থাকে। আল্লাহ্‌তে বিশ্বাস ও শুধু তার উপরে নির্ভরশীলতা তার চরিত্রে 'চাটুকারিতার' স্থলে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার জন্ম দেয়। আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা তাঁর চরিত্রকে করে মহিমান্বিত ও বিনয়ী।

২৪। এই দুদল [লোককে] তুলনা করা যায় অন্ধ ও বধিরের সাথে চক্ষুষ্মান ও শ্রবণ শক্তি সম্পন্নের। তুলনায় এই দুদল কি সমান ? তবুও কি তোমরা মনোযোগ দেবেনা ?

রুকু - ৩

২৫। আমি নূহ্‌ কে তার সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম [সে বলেছিলো] "আমি সুষ্পষ্ট সতর্কবাণী সহ তোমাদের নিকট এসেছি;-

২৬। যেনো তোমরা আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কারও আনুগত্য না কর : সত্য-সত্যই আমি তোমাদের জন্য এক নিদারুণ দিনের শাস্তি আশংকা করি ১৫১৭।

১৫১৭। নূহ্‌ নবীর আগমন ঘটেছিলো এক পাপে নিমগ্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে। অন্যান্য নবী রসুলদের মতই তার দায়িত্ব ছিল দ্বিবিধ। (১) পাপীদের পাপ কাজ সম্পর্কে সাবধান করে দেয়া এবং অনুতাপের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং (২) অনুতাপকারীদের জন্য আল্লার্হ‌ রহমত ও করুণার শুভ সংবাদ পৌঁছে দেয়া। নূহ্‌ নবীর প্রচারিত বাণী ছিল সত্য পথের নির্দ্দেশ ও আল্লাহ্‌র করুণা ও রহমতের সন্ধান।

২৭। কিন্তু তাঁর সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসীদের প্রধাণগণ বলেছিলো, "আমরা তো তোমাকে আমাদের মত মানুষ ব্যতীত আর কিছু দেখছি না। আমাদের মধ্যে যারা নিম্নস্তরের, অপরিপক্ক বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন, তারা ব্যতীত আর কাউকে তোমাকে অনুসরণ করতে দেখছি না। আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না, বরং আমরা তোমাদের মিথ্যাবাদী মনে করি। ১৫১৮।

১৫১৮। এই আয়াতে কাফের ও পাপীদের তিনটি শক্তিশালী সহজাত প্রেরণা বা "Instinct " এর কথা বলা হয়েছে। সাধারণতঃ পাপী ও কাফেরদের যে তিনটি সহজাত প্রেরণার কথা এখানে বলা হয়েছে, যা তাদেরকে আল্লাহর অমিয় বাণী শ্রবণে বাঁধা দেয়, যা নবীর দেখানো পথে চলতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, তা হচ্ছে : (১) ঈর্ষা-বিদ্বেষ তাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন ও অন্ধকার করে দেয়, তারা বলে "তুমি সাধারণ মানুষ, আমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ নও।" যদি ঈর্ষা-বিদ্বেষ তাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন না করতো তবে অবশ্যই তারা নবীদের চরিত্রের মহত্ব অনুধাবন করতে পারতো, তারা বুঝতে পারতো সাধারণ মানুষ হয়েও তারা সাধারণ মানুষ থেকে মহত্বে শ্রেষ্ঠ। (২) দুস্থ, গরীব ও দুর্বলদের প্রতি ঘৃণা। তাদের থেকে যাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান নিম্নে তাদের তারা অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। যদিও আর্থিক দুরবস্থা ও সামাজিক প্রতিপত্তিহীন এই সব লোক জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতায় তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ হয়, তবুও তারা তাদের চোখে ঘৃণ্য। তারা বলে, "আমরা তোমাকে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি না, বা তোমার কথা অনুসরণ করতে পারি না কারণ তোমার অর্থ-সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা আমাদের থেকে নীচে।" (৩) তাদের অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা তাদের মধ্যে এইসব রীপুর জন্মলাভ করে অন্যকে হীন করে দেখার প্রবণতা থেকে যা (২) নম্বরে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নেয়ামত আল্লাহ্‌র দান। সব কিছুর মালিক আল্লাহ্‌। এই বোধ মানুষকে করে বিনয়ী ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। কিন্তু যখন ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে এবং তার ধারণা হয়েছে, আর্থিক ও সামাজিক সকল কৃতিত্ব তার নিজস্ব, আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে সে তখন অস্বীকার করে। এই পাপে তার চরিত্রে অন্ধ অহংকারের জন্ম নেয়। তারা বলে "আমরা তোমাদের থেকে অবশ্যই শ্রেষ্ঠ।" নূহ নবীর প্রচারিত আল্লাহ্‌র বাণীকে বাঁধাদানের মাধ্যমে এই সত্যকেই এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। এই সত্য সর্ব যুগের সর্বকালের চিরন্তন সত্য।

উপদেশ : আর্থিক ও সামাজিক স্বীকৃতি সত্যের মাপকাঠি নয়।

২৮। সে বলেছিলো "হে আমার সম্প্রদায় ! তোমরা কি [এ কথাটি] ভেবে দেখেছ যে, যদি আমি আমার প্রভুর প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং যদি তিনি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহে ধন্য করে থাকেন, কিন্তু যে অনুগ্রহকে তোমাদের নিকট থেকে গোপন রাখা হয়েছে ? তাহলে সে ব্যাপারে আমি কি তোমাদের বাধ্য করতে পারি, যখন তোমরা তা অপছন্দ কর ? ১৫১৯।


১৫১৯। এই আয়াতে নূহ নবীর আবেদন ছিল, মক্কা মদীনাতে রসুলুল্লার আবেদনের ন্যায়, যদিও তা ছিল বহু যুগ আগের। রসুলুল্লাহর (সা) সত্য প্রচারের ভাষা ছিলো দ্ব্যর্থহীন, কোমল, মৃদু, কিন্তু দৃঢ় যা সত্যের প্রতি প্রত্যয় উৎপাদনে সক্ষম সর্বপরি মানুষের জন্য ভালোবাসার প্রকাশ, মানুষের মঙ্গলের জন্য আকুলতা। এই আয়াতে নূহ নবীর আবেদন ছিল : (১) প্রথমত : তিনি বিনয়, কোমল ও দৃঢ়ভাবে তাদের জানান যে, তিনি আল্লাহ্‌র মনোনীত নবী আল্লাহ্‌র সত্য প্রচারের দায়িত্ব তার উপরে ন্যস্ত। (২) দ্বিতীয়ত : আল্লাহ্‌র বাণী অনুসরণ করা মানুষের অবশ্য করণীয় কর্তব্য কারণ তা মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। আর তা অস্বীকার করলে মানুষকে আল্লাহ্‌র শাস্তিতে নিপতিত হতে হবে। যারা আল্লাহ্‌র সত্যকে অস্বীকার করে তারা তা করে নিজস্ব ঈর্ষা-বিদ্বেষ, দম্ভ-অহংকারের কারণে। এইসব রীপু তাদের দেখা বা শোনা বা অনুধাবন ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে দেয়, ফলে তারা আল্লাহ্‌র বাণীর মধ্যে আল্লাহ্‌র রহমতের সন্ধান লাভ করতে অক্ষম হবে। "তোমাদের থেকে গোপন রাখা হয়েছে"-বাক্যটি দ্বারা উপরের ভাবকে প্রকাশ করা হয়েছে।" (৩) তৃতীয়ত : তিনি বলেছিলেন যে ধর্মের ব্যাপারে কোনও জোর জবরদস্থি নাই। তাঁর বক্তব্য ছিল-"আমি কি এই বিষয়ে তোমাদিগকে বাধ্য করিতে পারি।" কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস হচ্ছে আত্মার বিশ্বাস বা আত্মার বিশেষ অবস্থা। বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে বা জবরদস্তিমূলকভাবে অন্তরের এই অবস্থাকে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। যদি কেউ সত্যকে গ্রহণ করে স্ব-ইচ্ছায়, তবে তা করবে তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্য। নূহ নবী এই আবেদন করেছিলেন তার স্বগোত্রের লোকেদের জন্য, তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ ও তাদের কল্যাণের জন্য।

২৯। "হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট কোন ধন-সম্পদ চাই নাই। আমার পুরস্কার রয়েছে আল্লাহ্‌র নিকট ১৫২০। আমি [ঘৃণার সাথে] বিশ্বাসীদের তাড়িয়ে দেবো না। অবশ্যই তারা তাদের প্রভুর সাক্ষাত লাভ করবে, এবং, [বরং] আমি দেখছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।


১৫২০। হযরত নূহের চতুর্থ আবেদনটি ছিল : তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে মিথ্যাবাদীরূপে অভিহিত করে। তাদের ধারণা ছিলো তিনি ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য প্রচারে নেমেছেন। এরই উত্তরে হযরত নূহ্‌ বলেন যে, তিনি কোন পার্থিব পুরস্কারের আশায় সত্যকে প্রচার করছেন না। তিনি পুরস্কারের প্রত্যাশী শুধুমাত্র এক আল্লাহ্‌র কাছে যার বাণী তিনি প্রচার করছেন। আল্লাহ্‌র পুরস্কারের আশায় তিনি যে কোনও অপমান সহ্য করতে প্রস্তুত।
(৫) তাঁর পাঁচ নম্বর আবেদন ছিল, তিনি গরীব ও সমাজের নীচুস্তরের লোকদের যদি ধর্মীয় বিশ্বাস ও সত্যের প্রতি অনুরাগ দেখেন, তবে তিনি তাদের দুরে সরিয়ে দিতে পারেন না। যদি বিত্তশালীরা মনে করে, গরীব ও হতভাগ্যদের উপস্থিতির ফলে তাদের মত বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের আল্লাহ্‌র বাণী গ্রহণ করা সম্ভব নয়, তবে তারা ভুল করছে।
(৬) তাঁর ছয় নম্বর ঘোষণা হচ্ছে : নির্মম সত্য হচ্ছে এসব সম্পদশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অজ্ঞ ও মূর্খ। গরীব ও সমাজের নীচু স্তরের লোক, যারা অন্তরে আল্লাহ্‌র সত্যকে ধারণ করতে ব্যগ্র, তারা এই অজ্ঞ ও মূর্খদের সামিল নয়। তারা বলে এই কারণে যে সমাজের দরিদ্র ও নিকৃষ্ট লোকেরা আপনার আনুগত্য স্বীকার করেছে। আমরাও যদি তা করি, তবে আমরা যারা নিজেদেরকে সম্পদে, অভিজাত্যে শ্রেষ্ঠ মনে করি, তারাও তাদের সমকক্ষ হয়ে যাব। ফলে আমাদের আভিজাত্য ও কুলীনতার হানি হবে।

৩০। "হে আমার সম্প্রদায় ! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই, তবে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে কে আমাকে সাহায্য করবে ? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না ?" ১৫২১

১৫২১। সাত নম্বর আবেদন ছিল যে, তোমাদের মত আমিও যদি দরিদ্র ঈমানদারদের লাঞ্ছিত করি, তাহলে আমিও আমার কর্তব্য চ্যুত হব। এবং আল্লাহ্‌র চোখে জালিম বলে সাব্যস্ত হব। তবুও কি তারা সত্যের প্রতি অনুরাগী হবে না ?

৩১। "আমি তোমাদের বলি না যে, ১৫২২। 'আমার নিকট আল্লাহ্‌র ধন-ভান্ডার আছে।' ১৫২৩। আর আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবগত নই ; আমি এ দাবীও করি না যে আমি একজন ফেরেশতা। তোমাদের দৃষ্টিতে যারা ঘৃণ্য, ১৫২৪ তাদের সম্বন্ধে আমি বলি না যে, আল্লাহ্‌ তাদের জন্য কল্যাণ দান করবেন না; তাদের আত্মায় যা বিরাজমান আল্লাহ্‌ তা ভালোভাবে জানেন। [যদি এমন কিছু বলি] তাহলে আমি অবশ্যই পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হবো।"


১৫২২। আট নম্বর ঘোষণা ছিল যে, "আমার কাছে আল্লাহ্‌র ধন ভান্ডার বা অদৃশ্য সংবাদ নাই।" যেমন অনেকের বিশ্বাস যারা নবী ও রসুল তারা ভবিষ্যতের গর্ভে কি আছে তা বলতে সক্ষম। গায়েবের এলম বা ভবিষ্যতের সংবাদ জানেন একমাত্র আল্লাহ্‌ সে জন্যই আল্লাহ্‌র একটি গুণবাচক নাম, "আলেমুল গায়েব" অন্য কাউকে ভবিষ্যতের সংবাদ দাতা বা আলেমুল গায়েব বা তা ভাবা শেরেকী ও হারাম। এই আয়াতে নূহ নবীর আবেদন ছিল তিনি অদৃশ্য জগতের বা ভবিষ্যতের সংবাদ জানেন না বা তিনি ফেরেশতাদের মত অলৌকিক কর্মকান্ডের অধিকারী নন বা তাদের সাথে তার কোনও যোগযোগও নাই। তিনি আল্লাহ্‌র সত্য প্রকাশ করেন এই জন্য যে, তিনি তার গোত্রের কল্যাণের জন্য নিবেদিত প্রাণ।

১৫২৩। দেখুন সূরা [৬:৫০] আয়াত ও টিকা ৮৬৭।

১৫২৪। হযরত নূহ্‌ তাঁর আবেদন শেষ করার পূর্বে পুনরায় দরিদ্র, দুর্বল ঈমানদার লোকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা, যাদের ধন-সম্পদ ও বিষয়-বৈভব ছিলো না, ছিলো না প্রভাব ও প্রতিপত্তি, তাদের জাহেল লোকেরা ইতর ও ছোট লোক ধারণা করতো। সম্পদ ও সম্মানের মোহ একটি নেশার মত, যা অনেক সময়ে ন্যায় ও সত্যকে গ্রহণ করতে বাঁধার সৃষ্টি করে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ সেই কথাই বলেছেন যে, দম্ভ অহংকার তাদের আধ্যাত্মিক জগতকে অন্ধকারচ্ছন্ন করে দিয়েছে। তাই তারা সত্য পথের পথিক এই সব গরীবদের ঈমানকে সনাক্ত করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাদের কল্যাণ দান করবেন। কারণ প্রকৃত কল্যাণ ধন-সম্পদ বা ক্ষমতার জোরে অর্জন করা যায় না। প্রকৃত কল্যাণ মানুষের অন্তরের অবস্থা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দান করা হয়। একমাত্র আল্লহ্‌ই তা সম্যক অবহিত আছেন যে, কার অন্তর আল্লাহ্‌র রহমতের যোগ্য। পরিশেষে হযরত নূহ্‌ (আ) বলেন যে, তোমাদের মত আমিও যদি দরিদ্র ঈমানদেরদের লাঞ্ছিত ও অবাঞ্ছিত মনে করি, তবে আমিও জালেমরূপে পরিগণিত হব।

৩২। তারা বলেছিলো, "ওহে নূহ্‌, তুমি আমাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছো, এবং আমাদের সাথে বির্তক তুমি [অতি মাত্রায়] দীর্ঘায়িত করেছ। এখন যদি তুমি সত্য বলে থাক, তবে যার ভয় তুমি আমাদের দেখাচ্ছ, তা আমাদের উপর আনায়ন কর।" ১৫২৫।

১৫২৫। হযরত নূহ্‌ এর আবেদনের প্রেক্ষিতে জালিমদের সর্দ্দার তার উপযুক্ত জবাবই প্রদান করে। নূহ্‌ (আ) র্ধৈয্যের সাথে ও ধীর স্থির ভাবে পুনঃ পুনঃ তাদের আল্লাহ্‌র পথে আহ্বান করেন, কিন্তু নূহ্‌ (আ) এর ধৈর্য্য, প্রশান্তি এবং আবেদন জালেমদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটায়। তারা ক্রুদ্ধভাবে নূহকে তাদের সাথে বাকবিতন্ডার জন্য অভিযুক্ত করে। হযরত নূহ্‌-এর পুনঃ পুনঃ আবেদন তাদের কাছে এতটাই অরুচিকর মনে হয়েছিলো যে তারা সেই আবেদনকে ক্রমাগত বাকবিতন্ডারূপে আখ্যায়িত করতে থাকে। তাদের নিকট নূহ্‌ এর আবেদন এতটাই অরুচিকর ছিল যে, তারা প্রচন্ড ক্রোধের সাথে, সন্দেহে বাতিকগস্থ হয়ে যুক্তিহীন ভাবে নূহকে বিদ্রূপ শুরু করলো এই বলে যে, তুমি বলছো, যদি আমরা আমাদের চরিত্রের সংশোধন না করি, তবে ভবিষ্যতে আল্লাহ্‌র শাস্তি আমাদের উপরে পতিত হবে। যদি তোমার ক্ষমতা থাকে তবে সে শাস্তি এক্ষুনি প্রত্যক্ষ করাও। যদি তা না পার তবে বুঝবো তুমি একটি মিথ্যুক ব্যক্তি। তাদের এই বক্তব্যকে এই আয়াতে উত্থাপন করা হয়েছে, কারণ যাদের চরিত্রে সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা জন্মে তাদের ঔদ্বত্য অহংকার ও দম্ভ যে সীমানা ছাড়িয়ে কতদূর যেতে পারে এটা তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

উপদেশ : সর্বযুগে যারা আল্লাহ্‌কে উপেক্ষা করে সত্য ও ন্যায়কে অবদমিত করে চলে তাদের চরিত্রে এই দম্ভ ও অহংকারের প্রকাশ ঘটবে

৩৩। সে বলেছিলো "যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করেন, তবে সত্যিই আল্লাহ্‌ তা তোমাদের উপরে আনায়ন করবেন। এবং তখন তোমরা তা ব্যর্থ করতে পারবে না। ১৫২৬ ।

১৫২৬। আল্লাহ্‌র প্রতি এরূপ আক্রমণাত্বক মনোভাবের উত্তরে নূহ্‌ বললেন, আমি কখনও দাবী করি নাই যে, আমি তোমাদের শাস্তি দানে সক্ষম। আল্লাহ্‌ই একমাত্র শাস্তি দানের মালিক। আর তিনি-ই একমাত্র জানেন কখন তিনি শাস্তি দান করবেন। তবে অন্যায়কারীর শাস্তি অনিবার্য শুধু এই কথাটুকুই আমি বলতে পারি। আমার ক্ষমতার সীমানা শুধু এইটুকুই। তবে একথা দিবালোকের মত সত্য যে, যদি অন্যায়কারী ও পাপী তার পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্‌র দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা না করে তবে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। যখন তা আসবে তোমাদের ক্ষমতা থাকবে না তা প্রতিহত করার।

৩৪। "যদি বিপথে ছেড়ে দেয়া আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হয়, তবে আমি তোমাদের যতই সদুপদেশ দিতে ইচ্ছা করি না কেন, আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসবে না। তিনিই তোমাদের প্রভু এবং তাঁহারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন"। ১৫২৭।


১৫২৭। এই আয়াতে হযরত নূহ তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য মনোঃকষ্ট প্রকাশ করেছেন শত আবেদনেও যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয় নাই, যাদের অত্যাচার ও বিদ্রূপে তাঁর জীবন ছিল ওষ্ঠাগত, তবুও তাদের শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে তার হৃদয় ব্যাথায় ভারাক্রান্ত হতো। কারণ এসব অর্বাচীনরা তাদের কুকর্ম দ্বারা নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনছে। তাদের অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের ফলে তারা আল্লাহ্‌র রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। যে আল্লাহ্‌র রহমত বঞ্চিত হয়, পৃথিবীতে কার সাধ্য আছে তাকে সাহায্য করে ? সুতারাং নূহ্‌ নবীর অবেদন যে সেখানে ফলপ্রসু হবে না সেটাতো স্বাভাবিক সত্য। কিন্তু তবুও তিনি বারে বারে তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহ্‌র রাস্তায় পরিচালিত করতে চেষ্টা করেছেন। কারণ তার সম্প্রদায়ের লোকেরা বিশ্বাস করুক বা না করুক তিনি জানতেন যে সবাইকে শেষ পর্যন্ত শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌র সম্মুখীন হতে হবে। সেখানে তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এর থেকে কারও রেহাই নাই।

৩৫। অথবা তারা কি বলে যে, "সে ইহা নকল করেছে।" বল ; "যদি আমি তা নকল করে থাকি, তবে আমার পাপ আমার উপরে বর্তাবে। এবং তোমরা যে পাপের অপরাধে অপরাধী আমি তা থেকে মুক্ত।" ১৫২৮।

১৫২৮। আশ্চর্য্য চমকপ্রদ সৌন্দর্য্য মন্ডিত নূহ নবীর নাটকীয় কাহিনীর শেষ বিবরণের পূর্বেই এই আয়াতে হঠাৎ করেই আল মুস্তফার (সা) কথা উত্থাপন করা হয়েছে। আপাতঃ দৃষ্টিতে যদিও তা ছন্দপতনের মত মনে হয়, কিন্তু এই আয়াতটির এখানে সন্নিবেশ উদ্দেশ্যমূলক। হযরত নূহ এর কাহিনী যে, শুধুমাত্র কাহিনী নয় এটা একটা নীতিগর্ভমূলক রূপক কাহিনী, সেই কথাকেই প্রকাশের জন্য ছন্দপতনের মত নূহ এর কাহিনীর মাঝামাঝি স্থানে আল মুস্তাফার (সা) কথা কুর-আনে উল্লেখ আছে। নূহ্‌ এর কাহিনীর অপূর্ব আকর্ষণীয় শক্তি স্বাভাবিক ভাবে মোশরেকরা অস্বীকার করতে পারতো না। ফলে তারা কুর-আনের আয়াতকে আল্লাহ্‌র তরফ থেকে আগত তা স্বীকার না করে অভিযোগ করলো যে, কোরান আল মুস্তফার (সা) নিজের রচনা ও প্রতারণা। ঠিক যে ভাবে নূহ নবীর লোকেরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করেছিলো। আল মুস্তাফার (সা) উত্তর ছিল "এসব মিথ্যা রচনা নয়, এসবই আল্লাহ্‌র বাণী এবং প্রকৃত সত্য। তোমরা মিথ্যাতে অভ্যস্ত, তাই সব কিছুকেই মিথ্যা ভাবার প্রবণতা তোমাদের মধ্যে, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে তোমাদের মিথ্যা অভিযোগের প্রতিবাদ করি। আমি প্রতারণা বা মিথ্যার পাপ থেকে মুক্ত। নূহ নবীর কাহিনীর ধারাবাহিকতার সাথে সামঞ্জস্য রাখতে হলে ৪৯ নম্বর আয়াতটি এখানে প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু, এখানে হঠাৎ করেই আল মুস্তফার (সা) উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ মনে হয়, নূহ নবীর জীবনের যে অভিজ্ঞতা সমস্ত নবী রসুল, এমন কি সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ্‌র প্রিয় হাবীবেরও সেই একই অভিজ্ঞতা, এই ভাবকেই প্রকাশের জন্য কাহিনীর মাঝামাঝি স্থানে এই আয়াতটিকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

[এই আয়াতের উপদেশ হচ্ছে, যারা মিথ্যাতে অভ্যস্ত, তারা কোনও দিনও সত্যের প্রকৃতরূপকে অনুধাবন করতে পারবে না। শুধু তাই-ই নয়, তারা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে সত্যকে মিথ্যা প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করবে। এ কথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য। ]

রুকু - ৪

৩৬। নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছিলো "যারা ইতিমধ্যে ঈমান এনেছে তারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেহ ঈমান আনবে না। সুতারাং তাদের [পাপ] কাজের জন্য আর দুঃখ করো না।" ১৫২৯।

১৫২৯। এই আয়াত থেকে নূহ নবীর কাহিনীর পুনরায় শুরু। এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে তাদের কথা যাদের সৎপথে ফিরে আসার আর কোনও সম্ভাবনা নাই। যারা তাদের নিজেদের ধ্বংসের পথকে প্রতিনিয়ত প্রশস্ত করে চলেছে। সেই ধ্বংস ছিল মহা প্লাবন। আল্লাহ্‌ নূহকে সেই মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা করবেন, সুতারাং তিনি তাঁকে বিরাট নৌকা বা জাহাজ বানাতে আদেশ দিলেন যা বন্যার অথৈ পানিতে নিরাপদে ভেসে থাকতে সক্ষম হবে, এভাবেই আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের রক্ষা করেছিলেন।

উপদেশঃ আল্লাহ্‌র রাস্তায় যারা থাকে তাদের জন্য সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন স্বয়ং আল্লাহ্‌ ।

৩৭। "তুমি আমার তত্ত্বাবধানে এবং প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা তৈরী কর ।১৫৩০। এবং যারা পাপে নিমজ্জিত তাদের পক্ষে তুমি আমাকে [আর অধিক] বলো না। কারণ তারা তো [বন্যাতে] নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে।"

১৫৩০। নূহ্‌ নবীর নৌকা বা জাহাজটি তৈরী হয়েছিলো, আল্লাহ্‌র বিশেষ নির্দ্দেশে। বিশেষ এই কারণে যে তা ছিলো বিশেষ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য।

৩৮। তৎক্ষনাত সে নৌকা [তৈরী] আরম্ভ করলো। যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা তাকে অতিক্রম করতো, তারা তাকে উপহাস ছুড়ে মারতো ১৫৩১। সে বলেছিলো, "তোমরা যদি আমাদের উপহাস কর, [আমাদের পালা এলে ] আমরাও তোমাদের একইভাবে উপহাসের সাথে ঘৃণা করবো।" ১৫৩২।

১৫৩১। হযরত নূহ্‌ যখন আল্লাহ্‌র আদেশে নৌকা বানাতে শুরু করলেন, তখন পাপীরা তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে শুরু করলো। তাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের কারণ ছিলো যে, যিনি এতদিন নিজেকে আল্লাহ্‌র নবী বলে প্রচার করেছেন, তিনি এখন কাঠ মিস্ত্রিতে রূপান্তরিত হয়েছেন। পৃথিবীতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অভিজ্ঞতার দাস, এবং তারই আলোকে সে পৃথিবীকে বিচার ও বুঝতে চেষ্টা করে। নূহ নবী যখন তাদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, তাদের পাপের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ্‌ মহা প্লাবনের সৃষ্টি করবেন। এবং সেই মহা প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই এই নৌকা তিনি তৈরী করছেন। একথা নূহ এর সম্প্রদায়ের মনে হাসির উদ্রেক করলো। কারণ নূহ এর সম্প্রদায়ের আবাসস্থল ছিলো, মেসোপোটিমিয়ার মালভূমিতে । এই সুউচ্চ মালভূমি ছিল টাইগ্রীস নদী বিধৌত এবং পারস্য উপসাগরের থেকে সোজাসুজি প্রায় ৮০০-৯০০ মাইল দূরে অবস্থিত। সুতারাং পুরো দেশ কোন মহাপ্লাবনে সমুদ্রের সাথে মিশে যাবে একথা অবিশ্বাসীদের মনে হাসির উদ্রেক করবে বৈকি। পৃথিবীতে যে সমস্ত সভ্যতা শুধুমাত্র বস্তু কেন্দ্রিক, দেখা যায়, তারা নিজেদের কীর্তিকর্মে, সভ্যতার উৎকর্ষতায়, অহংকার, দম্ভে স্ফীত হয়ে যায়। সুতারাং নূহ এর সম্প্রদায়, যারা স্থাপত্য বিদ্যায় উৎকর্ষতা লাভ করেছিলো এবং যাদের পয়ঃ নিষ্কাশন প্রণালী ছিলো গর্বের বিষয়বস্তু, যারা নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতার উপরে প্রচন্ড ভাবে বিশ্বাসী ছিল তাদের পক্ষে হযরত নূহ্‌ এর মত ব্যক্তি, যিনি শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ক্ষমতার উপরে বিশ্বাসী তাকে বিদ্রূপ করাই স্বাভাবিক এবং মহাপ্লাবনের কথা অবিশ্বাস করাই স্বাভাবিক ছিল। মানুষ যখন দম্ভ ও অহংকারে অন্ধ হয়ে যায়, শুধু তখনই তারা প্রকৃত সত্যকে বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারে না। মানুষ যখন পাপে নিমগ্ন হয়, তখনই সে হয়ে ওঠে অবাধ্য ও একগুয়ে এবং তার সীমিত শক্তিতে সে হয় অন্ধ বিশ্বাসী, ফলে নিজের ধ্বংস সে নিজেই ডেকে আনে। নূহ এর সম্প্রদায় সে যুগে যা করেছিলো যুগে যুগে মানুষ তার চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা পুনরাবৃত্তি করেছে। এবং এখনো করছে সত্যই মানুষ এক অকৃতজ্ঞ ও ঘৃণ্য জাতি।

১৫৩২। যারা জীবনকে শুধুমাত্র পার্থিব জৌলুস,আরাম-আয়েশ,ধন-সম্পদের ও প্রভাব-প্রতিপত্তির পটভূমিতে বিচার করে। তাদের চোখে বিশ্বাসীদের মনে হবে বোকা ও দীন-হীন। সে জন্যই তারা বিশ্বাসীদের ঠাট্টা বিদ্রূপ করতে সাহসী হয়। অপর পক্ষে বিশ্বাসীরা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীল। অবিশ্বাসীদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য ও অহংকারকে বিশ্বাসীরা করুণার চোখে দেখে। কারণ আল্লাহ্‌র শক্তির কাছে তাদের অবাধ্যতা সত্যিই হাস্যষ্কর।

৩৯। "কিন্তু শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে যে কার উপরে লাঞ্ছনা-দায়ক শাস্তি আপতিত হবে আর কার উপরে আসবে স্থায়ী শাস্তি। "

৪০। অবশেষে দেখো ! আমার আদেশ এসেছিলো, পৃথিবীর প্রস্রবণসমূহ প্রবল বেগে উথলিয়ে উঠেছিলো ১৫৩৩। আমি বলেছিলাম, "প্রত্যেক শ্রেণীর স্ত্রী-পুরুষ দুটি, ১৫৩৪। এবং যাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ব্যতীত তোমার পরিবার ১৫৩৫, এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের এতে [নৌকায়] তুলে নাও। কিন্তু শুধুমাত্র অল্প সংখ্যক তার সাথে ঈমান এনেছিল।

১৫৩৩। "Far-at-tannuru"-এই আরবী শব্দটির দুরকমের অনুবাদ করা হয়েছে। (১) ঝরণা যা ভূপৃষ্ঠে দেখা যায় নদীর গতিপথে বা উৎসমুখে অথবা ফোয়ারা যা প্রচন্ড বেগে পানিকে উৎসারিত করে। অথবা (২) চুল্লী প্লাবিত হয়। মওলানা ইউসুফ আলী এক্ষেত্রে পূর্বোক্ত অর্থটি প্রয়োগের পক্ষপাতি। একই ভাষার প্রকাশভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছে সূরা [২৩:২৭] আয়াতে। এই দুইটি আয়াতকে তুলনা করা যায় সূরা [ ৫৪:১১-১২] আয়াতের সাথে যেখানে বলা হয়েছে "ফলে আমি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম আমার প্রবল বারি বর্ষণে এবং মৃত্তিকা হইতে উৎসারিত করলাম প্রস্রবণ, অতঃপর সকল পানি মিলিত হইল এক পরিকল্পনা অনুসারে"। যে কোনও বড় বন্যার সময়ে এই বিবিধ ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়। অর্থাৎ যখন কোনও বড় জলোচ্ছ্বাস ঘটে তখন সাথে সাথে আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে থাকে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। নূহ্‌ নবীর সময়ে একটানা বৃষ্টিতে উপত্যকা মালভূমি ভেসে যায়। ফলে সমস্ত ঝরণার পানি প্রচন্ড বেগে উৎসারিত হতে থাকে এবং টাইগ্রীস নদী ফুলে ফেঁপে ওঠে।

১৫৩৪। "Zaujaini"- জোড় বা যুগল শব্দটির দ্বারা এখানে বুঝানো হয়েছে একটি পুরুষ একটি মেয়ের সমম্বয়ে গঠিত এক জোড়া প্রাণী। বেশীর ভাগ স্বনামধন্য ব্যাখ্যাদানকারীর [যেমনঃ ইমাম রাজী] মতে "যুগল" শব্দটির অর্থ পুরুষ ও মেয়ে দ্বারা গঠিত এক জোড়া। অবশ্য কারও কারও এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ কেউ মনে করেন জোড় অর্থ প্রতিটি প্রজাতির দুজোড়া করে নেয়া হয়েছিলো।

১৫৩৫। এই আয়াতে নূহ্‌ নবীর পরিবারের এক অবাধ্য সন্তানের কথা বলা হয়েছে। আরও উল্লেখ আছে নীচের আয়াতে [১১:৪২-৪৩; ৪৫-৪৬]। পরিবারের এই সদস্য পরিবারের সকল ঐতিহ্যকে পদদলিত করেছিলো। যার ফলে আল্লাহ্‌ তাঁর জন্য পারিবারিক যে সুবিধা তা কেড়ে নেন।

উপদেশঃ প্রত্যেকে প্রত্যেকের কর্মফল ভোগ করবে-এটাই আল্লাহ্‌র বিধান।

৪১। সুতরাং সে বলেছিলো; " নৌকাতে আরোহণ কর; আল্লাহ্‌র নামে এর গতি ও স্থিতি। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক বারে বারে ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।"

৪২। সুতরাং পর্বতের ন্যায় [সুউচ্চ] ঢেউ এর মধ্যে নৌকা তাদের নিয়ে ভেসে চললো ১৫৩৬। নূহ্‌ এর যে পুত্র নিজেকে [সকলের থেকে] আলাদা করেছিলো, নূহ্‌ তাকে আহবান করেছিলো, "হে আমার পুত্র! আমাদের সাথে [নৌকাতে] আরোহণ কর এবং অবিশ্বাসীদের অর্ন্তভুক্ত হয়ো না।"

১৫৩৬। ঢেউ গুলোকে এখানে পর্বতের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

৪৩। পুত্র উত্তর করলো, "আমি [অবশ্যই] এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেবো যা আমাকে প্লাবন থেকে রক্ষা করবে ১৫৩৭। নূহ্‌ বলেছিলো, " আজ আল্লাহ্‌র হুকুম থেকে রক্ষা করার কেহ নাই, তবে যাকে আল্লাহ্‌ দয়া করবেন সে ব্যতীত।" এবং তাদের মাঝে তরঙ্গ উত্তাল হলো এবং [নূহ্‌ এর] পুত্র নিমজ্জিতদের অর্ন্তভূক্ত হলো।

১৫৩৭। নূহ্‌ নবীর এই ছেলে ছিলো কাফের। সাধারণ ভাবে কাফেররা আল্লাহ্‌র শক্তি অপেক্ষা পার্থিব শক্তির উপরে প্রচন্ডভাবে আস্থাশীল হয়। নূহ্‌ (আঃ) এর ছেলেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সে নিজেকে পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করে রক্ষা করতে চাইল। কিন্তু আল্লাহ্‌র ক্ষমতা সম্বন্ধে তার কোনও ধারণা ছিল না। তার ধারণারও অতীত ছিল যে সেই সুউচ্চ পর্বতও বন্যায় পানিতে ডুবে যাবে ও সে ধ্বংস প্রাপ্ত হবে।

৪৪। এর পরে বলা হলো ১৫৩৮ "হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি শোষণ কর এবং হে আকাশ [ তোমার বৃষ্টি] ক্ষান্ত কর এবং [তারপর] পানি প্রশমিত হলো; এবং বিষয়টির সমাপ্তি ঘটলো। নৌকা যুডি পর্বতের উপরে স্থির হলো এবং বলা হলো; "যারা পাপ করে তারা ধ্বংস হোক।" ১৫৩৯।

১৫৩৮। আয়াত গুলির সৌন্দর্য অপূর্ব। অল্প কয়েকটি লাইনে মহাপ্লাবনের সম্পূর্ণ ছবিটি আঁকা হয়েছে। মহাপ্লাবনের ঘটনাও পরস্পর সন্নিবেশিত করা হয়েছে এবং এর সাধারণ কার্যকরণ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে অপূর্ব ব্যঞ্জনাময় ভাষায়। শুধু তাই-ই নয়, মহাপ্লাবনের সাথে মানুষের আধ্যাত্বিক জীবনের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। পাপ ও অসৎ কাজকে সম্পৃত্ত করা হয়েছে। মহাপ্লাবন এখানে পাপ ও অসৎ কাজের শাস্তি স্বরূপ। মহাপ্লাবনের পরে নতুন পৃথিবীর সৃষ্টি।

১৫৩৯। মহাপ্লাবনের পরে নূহ্‌ নবীর নৌকা যেখানে থেমেছিলো সে স্থানের ভৌগলিক বিবরণের কিছু ধারণা দেয়া যায়। প্রথমেই ধরা যাক পর্বতের নাম সম্বন্ধে; নাম বলা হয়েছে যুডি (Judi) । ভাষাবিজ্ঞানে J, B, এবং K পরস্পর বিনিময়যোগ্য অর্থাৎ Judi এর স্থলে Gudi, বা Kudi শব্দটি ব্যবহার করা যায়। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে Kurd শব্দটি Kudi থেকে শব্দটির অপভ্রংশ যেখানে R অক্ষরটি পরবর্তীতে সন্ধিবিষ্ট হয়েছে বলে ধরা যেতে পারে। সুমেরাইনদের প্রাচীন রেকর্ড থেকে জানা যায় যে টাইগ্রীস নদীর তীরে মাঝ বরাবর খৃষ্টপূর্ব ২০০০ শতাব্দীতে Kuti বা Gutu নামে এক সম্প্রাদায় বাস করতো [See E-B kurdistan] স্থানটি বর্তমান তুরষ্কের Bohtan প্রদেশে [বর্তমান তুরষ্ক ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্তে) Jasirat-ibh-umar শহর [বর্তমান Turco-Syrian সীমান্ত], এবং ইরাক ও পারস্য পর্যন্ত Ararat পর্বতমালা পর্যন্ত সম্প্রসারিত এই সব শহরগুলি Ararat পর্বতমালার উপত্যকায় অবিস্থত, Judi পর্বতও এই পর্বতমালার অংশ। এই পর্বতমালার এক অনুপম বৈশিষ্ট্য যা আর পৃথিবীর কোথাও নাই, তা হচ্ছে বিরাট লবনাক্ত পানির হ্রদ। এসব হ্রদের সাথে কোনও নদীর সংযোগ নাই। মনে হয় বিরাট লবণাক্ত পানির অংশ পর্বতের নীচু অংশে আটকে পড়েছে। এগুলি মধ্যে Lake Van এবং Lake Urumiya প্রধান [E.B. Asia], যা প্রাচীন কালের কোনও মহা-প্লাবন বা প্রচন্ড বৃষ্টিপাত বা প্রাচীন তুষার যুগের হিমবাহ দ্বারা সংগঠিত হওয়া সম্ভব। বর্তমানে এসব স্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব কম, এবং হিমবাহ অনুপস্থিত, সুতারাং ধরে নেয়া যায় ঘটনার সূত্রপাত প্রাচীনকালেই সম্ভব । এই সব স্থানের স্থানীয় পুরুষানুক্রমিক ভাবে হস্তান্তরিত লোক কাহিনী নূহ্‌ এর মহাপ্লাবনকেই স্বীকার করে। বাইবেলের কাহিনী অনুসারে Ararat পর্বত ছিলো নূহ্‌ এর নৌকার অবতরণের স্থান। এই বিবরণ বিশ্বাসযোগ্য নয়, এই কারণে যে, Ararat পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া ১৬,০০০ ফুটেরও উর্দ্ধে। যদি ধরে নেয়া হয় যে আরারাত পর্বতের সর্বনিম্ন চূড়া ছিল নূহ্‌ এর অবতরণ স্থান ও তাহলে কোরানের ভাষ্য অনুযায়ী তা হওয়া উচিত Judi বা Gudi পর্বত এবং স্থানীয় পৌরানিক কাহিনীর সাথে তা হতো সামঞ্জস্য পূর্ণ। Josephus, Nestorian, Christians, পূর্বদেশীয় সমস্ত খৃষ্টান এবং ইহুদীদের দ্বারা এই প্রাচীন কাহিনীর ধারণাকেই সমর্থন করে। কারণ তারা স্থানীয়দের এবং তাদের ঐতিহ্যের সাথে সপুরিচিত। [See Viscount] J, Bryee, Trans Caucasia and Ararat 4th ed, 1896 P. 216.

৪৫। এবং নূহ্‌ তাঁর প্রভূকে সম্বোধন করে বললো," হে আমার প্রভূ! আমার পুত্র অবশ্যই আমার পরিবারভূক্ত। এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।"

৪৬। তিনি বলেছিলেন, "হে নূহ্‌ ! সে তো তোমার পরিবারভূক্ত নয় ১৫৪০। তার চরিত্র পূন্যবাণ নয়। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেনো অজ্ঞদের মত আচরণ না করো ।

১৫৪০। দেখুন টিকা নং ১৫৩৫। আল্লাহ্‌র নবীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের হৃদয় ছিল কোমল, মানুষের জন্য দয়া ও স্নেহ মমতায় পরিপূর্ণ; হযরত নূহ্‌ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। উপরন্ত ছেলেটি ছিলো তার নিজের পরিবারের। কিন্তু আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ হলো, পাপের সাথে কোন প্রকার সন্ধি নয়। হতে পারে সে নূহ্‌ এর সন্তান কিন্তু যেহেতু সে পাপী ও অন্যায়কারী অবশ্যই সে নূহ্‌ এর পরিবার ভূক্ত নয়। পাপীরা কখনও পূণ্যবানদের পরিবারভুক্ত হতে পারে না। সমস্ত সৎকর্মশীল ও পূণ্যবানেরা একই পরিবারভুক্ত। কারণ তাদের চিন্তা ভাবনা, ক্রিয়া কর্ম একই। পৃথিবীর মানদন্ডে রক্তের সম্পর্ক দ্বারাই পরিবারের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ্‌র দরবারে সীমানা নির্ধারণ হবে ঈমান ও সৎকর্ম দ্বারা। নূহ্‌ এর এক স্ত্রী যে কাফের ছিলো [দেখুন সূরা ৬৬:১০ আয়াতে]-তারও পরিণতি হয়েছিলো ভয়াবহ।

উপদেশ : পূণ্যবান লোকের সংস্পর্শে থেকেই নিজেকে আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহি থেকে মুক্ত করতে কেউ সমর্থ হবে না। সকলকেই নিজ নিজ কাজের জবাবদিহির জন্য পরলোকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ইসলামে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব সর্বাপেক্ষা প্রধাণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৪৭। নূহ্‌ বলেছিলো, "হে আমার প্রভূ! যে বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নাই, সে বিষয়ে আপনাকে অনুরোধ না করার জন্য আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপানি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থদের অর্ন্তভূক্ত হব।" ১৫৪১।

১৫৪১। নূহ্‌ (আঃ) নবী হলেও ছিলেন সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষ। তাই সাধারণ মানুষের মত দুর্বলতাও তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সে কারণেই তিনি অবুঝের মত তার কাফের সন্তানের জন্য আল্লাহ্‌র প্রদত্ত শাস্তির ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি নবী, সুতারাং তার প্রার্থনার শক্তি আল্লাহ্‌র দরবারে অসীম। যদি তার প্রার্থনাকে মঞ্জুর করতে হয়, তবে Law of personal responsibility যা ইসলামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহ্‌র বিধান আল্লাহ্‌কে তা ভঙ্গ করতে হয়। পৃথিবীতে প্রকৃতিতে দেখি আল্লাহ্‌র আইন বা বিধান স্থির, আধ্যাত্মিক জগতেও আল্লাহ্‌র আইন বা বিধান অপরিবর্তনীয়। স্নেহ মায়ায় অন্ধ হয়ে এই সহজ সত্যটি ক্ষণেকের জন্য হযরত নূহ্‌ বিস্মৃত হয়েছিলেন। তিনি যেন অজ্ঞতার আঁধারে ডুবে গিয়েছিলেন। এটা তাঁর পাপ ছিল না, এটা ছিল অজ্ঞতা। আল্লাহ্‌ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে তাঁর এই অজ্ঞতা দূর করেন, ফলে তৎক্ষনাৎ তার চৈতন্যদয় ঘটে এবং অন্তরের মাঝে সত্য প্রত্যক্ষ করেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে তা সংশোধন করেন, এবং আল্লাহ্‌র কাছে তার অজ্ঞতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন ও দয়া ভিক্ষা করেন।

উপদেশ : আমরা সাধারণ মানুষ, জীবনের প্রতিপদে আমরা নানা ধরণের প্রলোভনের সম্মুখীন হয়ে ভুল করি। কিন্তু আমাদের বিবেককে যদি আমরা জাগ্রত রাখি, অবশ্যই সেই ভুল আমরা বুঝতে পারবো। ভুলকে সনাক্ত করে আমাদের অনুতাপের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, ও তা থেকে দূরে থাকতে হবে।

৪৮। বলা হলো, "হে নূহ্‌ ! তোমার ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সাথে আছে তাদের প্রতি আমার পক্ষ থেকে শান্তি ও কল্যাণ সহ [নৌকা থেকে] অবতরণ কর। অপর সম্প্রদায়কেও আমি [সাময়িক ভাবে] জীবন উপভোগ করতে দেবো ১৫৪২। কিন্তু পরিশেষে আমার পক্ষ থেকে তাদের নিকট ভয়াবহ শাস্তি পৌঁছাবে। ১৫৪৩ ।

১৫৪২। দেখুন সূরা [২:১২৬] আয়াতে।

১৫৪৩। যারা সত্যিকারভাবে আল্লাহ্‌কে পেতে চায়, আল্লাহ্‌র রাস্তায় চলতে চায়, আল্লাহ্‌র হেদায়েতের অনুসন্ধান করে, আল্লাহ্‌র নূরে অন্তরকে আলোকিত করতে চায়, আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়, আল্লাহ্‌র করুণা ও রহমতের প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য এখানে দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ চরিত্রগতভাবে দুর্বল। প্রতি পদে পদে তার পদস্খলনের সম্ভাবনা। তা সত্বেও তাদের আন্তরিকতা, সত্যের জন্য সংগ্রামের চেষ্টা, বিশ্বাসের একাগ্রতার জন্য, তাদের ঈমানকে সাফল্যের শিখরে পরিচালনা করবেন। তারা আল্লাহ্‌র শান্তির সন্ধান লাভ করবে, আত্মা প্রশান্তিতে ভরে যাবে, চরিত্রের অস্থিরতা কমে দৃঢ়তার জন্ম নেবে। আধ্যাত্মিক জীবনের উন্নতি থেকেই আত্মায় শান্তি লাভ করা যায়। তাই আল্লাহ্‌ বলছেন যে, " এই আত্মিক উন্নতি ও শান্তি যে শুধুমাত্র নুহ্‌কেই দান করা হয়েছিলো, তাই-ই না। তাঁর যারা সঙ্গীসাথী ছিলেন, যাদের আল্লাহ্‌ মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা করেছিলেন তাদেরও দান করা হয়েছিলো এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও তা অনুমোদন করা হবে, তবে তা শর্ত সাপেক্ষে। শুধুমাত্র তারাই আল্লাহ্‌র শান্তির ও রহমতের প্রত্যাশী হতে পারে, যারা পূণ্যবান হবে। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে যারা পাপে নিমগ্ন হবে, তারা তা থেকে বঞ্চিত হবে। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন, যে, তাঁর করুণা ও দয়া কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়া বিশ্বব্যাপী। সকলের জন্য, তা প্রসারিত। যে আন্তরিকভাবে তা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকেই তা দান করেন। এখানে কেউই তা পূর্বে থেকে তার বংশধরদের জন্য সংরক্ষিত করে রাখতে পারে না।

[[মন্তব্যঃ বংশগত পীরের দাবী এখানে নাকচ করা হয়েছে]]

৪৯। এগুলি হচ্ছে অদৃশ্যলোকের কতক কাহিনী যা আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি। এর পূর্বে তুমি অথবা তোমার সম্প্রদায় তা জানতো না। সুতারাং ধৈর্য্যের সাথে অধ্যাবসায়ী হও। কারণ [শুভ] পরিণাম পূণ্যাত্মাদের জন্য [নির্দিষ্ট] ১৫৪৪ ।

১৫৪৪। দেখুন সূরা [১১:৩৫] এবং এর টিকা নং ১৫২৮। হযরত নূহ্‌ এর ঘটনার মাধ্যমে যে শিক্ষা]দেয়া হয়েছে তার সারাংশ নিম্নরূপ। যারা আল্লাহ্‌ ও তার সৃষ্টির জন্য কাজ করেন তারা পূণ্যবান। তারা পৃথিবীতে অত্যাচারিত, অপমানিত বা কুৎসার সম্মুখীন হতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়া তাদের সর্বদা রক্ষা করবে-যেমন নূহ্‌ নবী রক্ষা পেয়েছিলেন। সুতারাং যারা মুত্তাকী ও আল্লাহ্‌র জন্য নিবেদিত প্রাণ, তাদের জন্য উপদেশ হচ্ছে, ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায়ের সাথে স্ব-স্ব কর্তব্য কর্ম করে যেতে হবে, শেষ পরিণতি আল্লাহর হাতে। আল্লাহ্‌ কারও কোনও সৎকর্ম হারিয়ে যেতে দেন না।

রুকু- ৫

৫০। আদ জাতির নিকট তাদের [স্বজাতি] ভ্রাতা হুদকে [আমি প্রেরণ] করেছিলাম। সে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায় আল্লাহ্‌র এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নাই ১৫৪৫। [তোমাদের অন্য উপাস্য] তোমাদের মিথ্যা রচনা ব্যতীত অন্য কিছু নয়।"

১৫৪৫। আদ সম্প্রদায়ের নবী হুদের বর্ণনা আছে সূরা [৭:৬৫-৭২] আয়াতে। সূরা আল আরাফের বক্তব্য হচ্ছে নবী আল মুস্তফা মক্কাতে তার সম্প্রদায়ের নিকট থেকে যেরূপ দুর্ব্যবহার পেয়েছিলেন, সেটা নূতন কিছু ছিল না। আদ সম্প্রদায়ের নবী হুদও ঠিক একই ব্যবহার পেয়েছিলেন তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট থেকে। এই সূরাতে [সূরা হুদে] অন্য আর একটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আদ সম্প্রদায় সম্পর্কে । আল্লাহ্‌র বাণী শোনার পর আল্লাহ্‌র রহমত পাওয়ার পরও তাদের অবাধ্য উদ্ধতভাবে আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করার প্রবণতা এবং মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করা আদ সম্প্রদায়ের এই ঔদ্ধত্যকেই, এই বৈশিষ্ট্যকেই এই সূরাতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্‌র ন্যায় বিচারে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো এবং মোমেন বান্দারা আল্লাহ্‌র রহমতে রক্ষা পেয়েছিলো। আদ সম্প্রদায়ের বাসভূমি সম্পর্কে সূরা [৭:৬৫] আয়াতে এবং টিকা ১০৪০ তে বর্ণনা করা হয়েছে।

৫১। "হে আমার সম্প্রদায়! এই [সংবাদের জন্য] আমি তোমাদের নিকট কোন পুরস্কার চাই না। আমার পুরস্কার আছে তারই নিকট, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না ?"

৫২। "এবং হে আমার সম্প্রদায় ! তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং [অনুতাপের মাধ্যমে] তাঁর দিকে ফিরে এসো। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাইবেন ১৫৪৬ এবং তোমাদের শক্তি দিয়ে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন ১৫৪৭। সুতারাং পাপের দিকে ফিরে যেও না। "


১৫৪৬। বৃষ্টিমুখর আকাশ আল্লাহ্‌র নেয়ামতের প্রতীক এই রূপকের সাহায্যে আল্লাহ্‌র রহমতের বর্ণনা করা হয়েছে এই আয়াতে। আল্লাহ্‌র রহমত সম্পূর্ণ প্রকাশের ভাষা মানুষের কখনও হবে না। ভাষা যখন প্রকাশের ক্ষমতাকে হারিয়ে ফেলে, তখনই রূপকের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ করতে চেষ্টা করা হয়। আদদের বাসভূমি ছিল উষর। অত্যন্ত অনুর্বর একটি দেশ। সে দেশে বৃষ্টিপাত দেশের জন্য অশেষ কল্যাণ বয়ে আনে। সম্ভবতঃ নবী হুদের এই আবেদনটি ছিল এমন একটি সময়ে যখন বৃষ্টির অভাবে শষ্যের আবাদ প্রচন্ড ক্ষতির সম্মুখীন, চারিদিকে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। আদ সম্প্রদায় এই বিপর্যয়ের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য এক আল্লাহ্‌র নিকট আবেদন করার পরিবর্তে নানা রকম মিথ্যা উপাস্য কুসংস্কার ও কুফরী আচার অনুষ্ঠানের আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা অনুধাবনেই ব্যর্থ ছিল যে, তারা আল্লাহ্‌র রহমত বঞ্চিত হয়েছে। একমাত্র প্রকৃত অনুতাপের মাধ্যমেই তারা আল্লাহ্‌র রহমত পাওয়ার যোগ্য হতে পারতো। প্রাচীন এই সভ্যতার দিকেও দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাওয়া যায় কিভাবে তারা আল্লাহ্‌র করুণাতে বিধৌত ছিল। শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজে পানির ব্যবহারের জন্য তারা বিরাট বিরাট বাঁধ নির্মাণ করেছিলো যেখানে বৃষ্টির পানি সঞ্চিত করা হতো। এটাতো আল্লাহরই করুণা ও দয়া তাদের বৃষ্টির পানি সদ্ব্যবহার করার ক্ষমতা।

১৫৪৭। " তোমাদের শক্তি দিয়ে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন।" এই কথাটির অর্থ কোন কোন অনুবাদকের মতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি হওয়া। আরবের যে অংশে আদ জাতি বাস করতো না তা ছিল প্রায় জনশূন্য। অল্প জনবসতিপূর্ণ। অপরপক্ষে আঁদদের বাসভূমি ছিল ঘন বসতিপূর্ণ। সেচ কাজের দ্বারা উর্বর জমিতে প্রচুর শস্য উৎপন্ন করা হতো। ফলে তাদের সম্পদ তাদের যুদ্ধ ও শান্তি উভয় অবস্থাতেই শক্তির যোগান দিত। তারা তাদের সময়ে এক শক্তিশালী জাতিরূপে পরিগণিত ছিল। আদ জাতির উদাহরণের সাহায্যে আল্লাহ্‌ পৃথিবীর সকল জাতিকে সর্বকালে সর্বযুগে এই উপদেশ দিয়েছেন যে কোনও জাতি যদি আল্লাহ্‌র আইন মেনে চলে এবং ন্যায়নীতি মেনে চলে, সে জাতির শক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। কারণ সমাজে ন্যায় এবং সত্যের প্রতিষ্ঠাই একটি জাতিকে উন্নত করে। আর জাতীয় উন্নতি-ই হচ্ছে শক্তিশালী জাতি গঠনের ভিত্তি। শক্তি কথাটি এখানে ব্যপক অর্থে ব্যবহৃত। দৈহিক, ধনবল সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

৫৩। তারা বলেছিলো, ওহে হুদ! তুমি আমাদের নিকট স্পষ্ট [প্রমাণ] আনায়ন কর নাই। তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করছি না। তোমার কথায় আমরা বিশ্বাসও করছি না। ১৫৪৮।

১৫৪৮। যথারীতিভাবে অবিশ্বাসীদের যুক্তি ছিল, আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করি না। এবং বিশ্বাস করতে চাই-ও না। আমরা মনে করি তুমি হয় একটি মিথ্যুক নতুবা নির্বোধ। [দেখুন পরবর্তী আয়াত]

৫৪। "আমরা তো একথাই বলি যে, [সম্ভবতঃ] আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেহ কেহ তোমাকে মানসিক দুর্বলতা দ্বারা আক্রান্ত করেছে।" ১৫৪৯। সে বলেছিলো, "আমি তো আল্লাহ্‌কে সাক্ষী ডেকেছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমি সে পাপ থেকে মুক্ত, তোমরা তার প্রতি যা আরোপ কর,-

১৫৪৯। দেখুন উপরের টিকা নং ১৫৪৮। অবিশ্বাসীদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের প্রসারিত অংশ এই আয়াত। এই আয়াতে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারা হুদ নবীকে সম্পূর্ণ মিথ্যুক না বলে, কিছুটা অনুগ্রহ করেছে এই বলে যে হুদ নবী মিথ্যুক নয়, তবে তাদের মিথ্যা উপাস্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ। তাই সে ভূতগ্রস্থ লোকের মত, মূর্খ-লোকের মত, আবোল তাবোল বকছে। হুদ নবীর প্রতি তাদের বক্তব্যের ধারা ছিলো তুমি আমাদের উপাস্যকে মিথ্যা বল, এখন দেখ সেই উপাস্যদেরই একজন তোমাকে বাতিকগ্রস্থ ও মূর্খতে পরিণত করেছে। হাঃ হাঃ তাদের এই ব্যঙ্গ বিদ্রূপ হুদ নবীর জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল। মিথ্যুক বলার থেকে এ ছিলো আরও বেদনাদায়ক। কারণ এই ব্যঙ্গ বিদ্রূপের মাধ্যমে তারা একথাই প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তাদের মিথ্যা উপাস্য, এক আল্লাহ্‌ থেকে অধিক শক্তিশালী। সুতারাং হুদ নবী ঘৃণা মিশ্রিত ক্রোধের সাথে উত্তর দেন তোমরা তোমাদের উপাস্যগুলিকে কখনও এক আল্লাহ্‌র সমগোত্রীয় করবে না। তোমরা ভালো করেই জান যে আমি এক আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কারও উপাসনা করি না। তোমাদের কথা থেকে ধারণা হয় যে তোমাদের মিথ্যা উপাস্যরা আল্লাহ্‌র নবীকে আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। আমি তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ্রহণ করলাম। আমার বিরুদ্ধে তোমরা সকলে, তোমাদের মিথ্যা উপাস্যরা একযোগে পরিকল্পনা কর। দেখ তোমরা সফলকাম হতে পার কি না, তোমাদের সে ক্ষমতা আছে কিনা। আমি তোমাদের বা তোমাদের মিথ্যা উপাস্যের কোনও সাহায্য চাই না। আমার সকল বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা একমাত্র এক আল্লাহ্‌র উপরে।

৫৫। "অন্য উপাস্যকে শরীক করে। সুতারাং আমার বিরুদ্ধে তোমরা সকলে ষড়যন্ত্র কর, এবং আমাকে কোন অবকাশ দিও না। ১৫৫০ ।

১৫৫০। দেখুন সূরা [৭:১৯৫] আয়াত ও টিকা নং ১১৬৮ ।

৫৬। "আমার এবং তোমাদের প্রভু আল্লাহ্‌র উপরে আমার নির্ভরতা স্থাপন করলাম। এমন কোন বিচরণশীল জীব-জন্তু নাই যার নিয়ন্ত্রণ তার হাতের মুঠোয় নয় ১৫৫১। নিশ্চয়ই আমার প্রভুই আছেন সরল পথে। ১৫৫২।

১৫৫১। "Grasp of the forelock" এটা একটা আরবী প্রবাদ বাক্য। এই বাক্যের অর্থ "ঘোড়ার কেশর।" যে ব্যক্তি ঘোড়ার পিঠে বসে ঘোড়ার কেশর চেপে ধরে থাকে ঘোড়ার উপরে তার পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। অপরপক্ষে 'কেশর' হচ্ছে ঘোড়ার জন্য সৌন্দর্য্য ও শক্তির প্রকাশ। সেই কেশরকে যে চেপে ধরে সে ঘোড়ার সর্ব কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। ঠিক সেইরূপ হচ্ছে, আল্লাহ্‌র ক্ষমতা-তার সকল সৃষ্টির উপরে। কারও ক্ষমতা নাই সেই অসীম ক্ষমতাকে তুচ্ছ করার। তার শাস্তিকে প্রতিহত করারও ক্ষমতা কারও নাই। দেখুন সূরাতে [৯৬:১৫-১৬] রূপকের সাহায্যে আল্লাহ্‌র ক্ষমতাকে তুলে ধরা হয়েছে, বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে "সাবধান যদি সে বিরত না হয় তবে আমি তাকে অবশ্যই হেচড়িয়ে নিয়ে যাব, মস্তকের সম্মুখভাগের কেশগুচ্ছ ধরে। মিথ্যাচারী পাপিষ্ঠের কেশগুচ্ছ।" রূপকের সাহায্যে আল্লাহ্‌র ক্ষমতাকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

১৫৫২। আল্লাহ্‌র "ইচ্ছার'' মাঝেই নিহিত আছে, পূণ্যাত্মা হওয়ার গুণাবলী । পৃথিবীর সর্ব বস্তু সর্ব বিষয়কেই মঙ্গল কামনা ঘিরে আছে। তাঁর ইচ্ছা ন্যায় ও সত্যের প্রতীক। আল্লাহ্‌র "ইচ্ছাকেই" নবী রসুলদের মাধ্যমে যুগে যুগে প্রেরণ করা হয়েছে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে। এই "ইচ্ছাই" হচ্ছে সহজ সরল পথের ঠিকানা যারা সেই পথকে অবলম্বন না করে তারা বিপথে পরিচালিত হয়।

৫৭। "[অতঃপর] যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও [অন্ততঃ পক্ষে] আমি যে বাণীসহ প্রেরিত হয়েছি তা আমি তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছি। আমার প্রভু অন্য সম্প্রদায়কে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, এবং তোমরা তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারবে না ১৫৫৩। আমার প্রভু সকল কিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।"

১৫৫৩। আদ সম্প্রদায় ছিল অত্যন্ত অহংকারী ও অবাধ্য। হুদ নবীর পুনঃ পুনঃ আবেদন সত্বেও তারা তাঁর প্রদর্শিত পথ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। এরই প্রেক্ষিতে হুদ নবী বলছেন যে তাদের ভুল পথের খেসারত তাদেরই দিতে হবে। আল্লাহ্‌র পথ অবলম্বন না করার ফলে আল্লাহ্‌র কোনও ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না, বা আল্লাহ্‌ বৃহত্তর পরিকল্পনার-ও কোনও পরিবর্তন ঘটবে না। যা ক্ষতি তা ঐ আদ সম্প্রদায়ের। কারণ আল্লাহ্‌র রহমত বঞ্চিত হলে অবশ্যই সে জাতির পতন অনিবার্য। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনাকে সফল করতে, সে জাতির পতন অনিবার্য। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনাকে সফল করতে পৃথিবীর সভ্যতাকে অগ্রসর করতে আল্লাহ্‌ তখন নূতন কোন সম্প্রদায় বা জাতিকে পৃথিবীর সভায় সম্মানের আসনে স্থাপন করবেন। "আমার প্রভু সমস্ত কিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।" আল্লাহ্‌র এই পরিকল্পনার সাফল্যকেই বলা হয়েছে প্রতিটি জিনিষের হেফজতকারী বা রক্ষণাবেক্ষণকারী।

৫৮। সুতারাং যখন আমার নির্দ্দেশ এলো, তখন আমি হুদ ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদের আমার [বিশেষ] অনুগ্রহে রক্ষা করলাম। রক্ষা করলাম তাদের কঠিন শাস্তি থেকে ১৫৫৪।

১৫৫৪। একটি সমাজ যখন অন্যায়ে নিমগ্ন হয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র যখন অন্যায় অসত্যে ভরে যায়, তখন যারা ন্যায় ও সত্যের পথিক তারা এসব জালেমদের দ্বারা উৎপীড়িত হতে থাকে। যেমন হয়েছিলেন নবী হুদ। আল্লাহ্‌র বৃহত্তর পরিকল্পনায় যারা পূণ্যবান তারা ধ্বংস থেকে রক্ষা পায় যেমন পেয়েছিলেন হুদ নবী। সার্বজনীন শিক্ষা হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি পরিপূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ্‌র বিশেষ নেয়ামত প্রাপ্ত হন, ধ্বংস থেকে রক্ষা পান যদিও তারা অন্যায়কারীদের দ্বারা অত্যাচারিত হন।

৫৯। এরূপ ছিলো আদ জাতি। তারা তাদের প্রভু এবং প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করেছিলো। তাঁরা রাসুলগণকে অমান্য করেছিলো, এবং প্রত্যেক ক্ষমতাবান স্বৈরাচারীর নির্দ্দেশ অনুসরণ করেছিলো ১৫৫৫।

১৫৫৫। সর্বমঙ্গলময়, সর্ব কল্যাণময় আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে, আদ সম্প্রদায় আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারণ করে। ক্ষমতার অন্ধ অহংকার, দম্ভ, বা তাদের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়।

উপদেশ : যারা অবিশ্বাসী, ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য তাদের অন্ধ অহংকার ও দম্ভে বিভ্রান্ত করে।

৬০। পার্থিব জীবনে [আল্লাহর ] অভিশাপ তাদের পশ্চাদধাবণ করেছিলো এবং শেষ বিচারের দিনেও [তা করবে]। আঃ শোন! আদ জাতি প্রত্যাখান করেছিলো তাদের প্রভূ এবং প্রতিপালককে। আঃ! শোন হুদের সম্প্রদায় আদ [জাতির] ধ্বংসই ছিলো [ শেষ পরিণাম]

রুকু -৬

৬১। আমি সামুদ জাতির কাছে তাদেরই [এক ] ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম ১৫৫৬। সে বলেছিলো " হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্‌র এবাদত কর, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তিনিই তোমাদের মাটি থেকে তৈরি করেছেন ১৫৫৭ এবং সেখানে তোমাদের স্থায়ী করেছেন। সুতারাং তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং [অনুতাপের মাধ্যমে] তাঁর দিকে ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার প্রভু [সর্বদা] নিকটে আছেন এবং [আহবানে] সাড়া দিতে প্রস্তুত।

১৫৫৬। হুদ নবীর কাহিনীতে যেরূপ দুইটি পৃথক পৃথক সূরাতে আলাদা আলাদা পটভূমিকে তুলে ধরা হয়েছিলো সালেহ্‌ নবীর বেলাতেও ঠিক সেরূপ পৃথক পৃথক সূরাতে আলাদা আলাদা পটভুমিকে তুলে ধরা হয়েছে। সামুদ সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য আল্লাহ্‌ সালেহ্‌ নবীকে প্রেরণ করেন। তার সম্পর্কে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে সূরা [৭:৭৩-৭৯] আয়াতে। সালেহ্‌ ছিলেন সামুদ সম্প্রদায়ের নবী। সূরা [৭:৭৩-৭৯] আয়াতে সালেহ্‌ নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই সূরাতে সালেহ্‌ নবী সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু তা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঠিক যেমনটি বর্ণনা করা হয়েছিলো হুদ নবী সম্পর্কে [দেখুন টিকা নং ১৫৪৫ ও আয়াত ১১:৫০]। এই আয়াতগুলির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যদিও কাহিনী প্রায় একই রয়ে যায়, কিন্তু উদাহরণের সাহায্যে নূতন দৃষ্টিভঙ্গী ও নূতন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। আদ সম্প্রদায়ের পাপ ছিলো তাদের অবাধ্যতা অহংকার ও দম্ভ। সামুদ সম্প্রদায়ের পাপ ছিলো গরীবের প্রতি শোষণ ও অত্যাচার। আল্লাহ্‌ প্রদত্ত উষ্ট্রীটি ছিলো গরীব সম্প্রদায়ের প্রতীক। এই উষ্ট্রীটির উদাহরণের সাহায্যে সামুদ জাতির গরীব সম্প্রদায়ের উপরে অত্যাচার, অবিচারের রূপকে প্রকাশ করা হয়েছে দেখুন সূরা [৭:৭৩] আয়াত এবং টিকা নং ১০৪৪। যদিও সমস্ত পাপেরই উৎপত্তিস্থল হচ্ছে অহংকার এবং অবাধ্যতা তবুও পারিপর্শ্বিক ও পরিবেশের কারণে পাপের ধরণও পাল্টে যায়। যেমন আদ ও সামুদ জাতি এদের দুদলেরই পাপের উৎপত্তি স্থল ছিলো অহংকার ও অবাধ্যতা। কিন্তু আদ সম্প্রদায় ক্ষমতা, দম্ভ ও অহংকারে স্রষ্টাকেই অস্বীকার করতো; অপরপক্ষে, সামুদ জাতির মধ্যে যারা সম্পদশালী ও প্রভাবশালী ছিল, তারা সম্পদ ও ক্ষমতার দম্ভে ও অহংকারে সমাজের গরীবদের মানুষ বলেই গণ্য করতো না । এ ব্যাপারে তারা স্রষ্টার নির্দ্দেশকে জানার প্রয়োজন অনুভব করতো না। আধ্যাত্মিক জগতের মনঃস্ততঃ, এবং পদস্খলন অতি সুন্দর ভাবে সংক্ষিপ্ত আকারে স্বল্পভাষায় অপূর্ব সুন্দরভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই আয়াতে। সামুদ জাতির আবাসস্থল এবং এর ইতিহাসের জন্য দেখুন সূরা [৭:৭৩] এবং টিকা ১০৪৩।

১৫৫৭। "Anshaa"বা সৃষ্টি প্রক্রিয়া। দেখুন সূরা [৬:৯৮] আয়াত এবং টিকা নং ৯২৩। এই আয়াতে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র সৃষ্টির এক অপূর্ব নৈপুণ্য মানব সন্তান। মানুষের নশ্বর দেহ মৃত্তিকায় সষ্টি এবং পৃথিবীতে জীবন যাপনের জন্য তাকে এই পৃথিবীর মাটিতেই অবস্থান করতে হয়। কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথে এই নশ্বর দেহের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এই নশ্বর দেহের অভ্যন্তরেই পরমাত্মার অংশ বা আত্মার বাস [১৫:২৯] [৩৮:৭২] বা অবস্থান, যা অবিনশ্বর যার কোনও ধ্বংস নাই যদিও এই দেহ নশ্বর, তবুও আর্থিক উন্নতির জন্য এই দেহের অবদান অনস্বীকার্য। কারণ দেহের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই আত্মার বিকাশ লাভ ঘটে-আত্মিক উন্নতির সুযোগ ঘটে। এই পৃথিবীর জীবন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৎ জীবন যাপন আমাদের আত্মিক উন্নতির পথ প্রদর্শণ করে। "সুতারাং তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন কর।"

৬২। তারা বলেছিলো "ওহে সালেহ! অদ্যাবধি তুমি ছিলে আমাদের আশা-আকাঙ্খার কেন্দ্রবিন্দু। ১৫৫৮। [এখন] তুমি কি আমাদের এবাদত করতে নিষেধ করছো, যা আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা এবাদত করত ? আমরা অবশ্যই দ্বিধা-দ্বন্দ ও সন্দেহে রয়েছি যার প্রতি তুমি আমাদের অহবান কর।"

১৫৫৮। আমাদের নবী হযরত মুহম্মদ (সা) এর মত [তৎকালীন আরবের লোকেরা যাকে আল-আমীন আখ্যা দিয়েছিলো] নবী সালেহ্‌ এর জীবন ছিল পূত ও পবিত্র। যদি তিনি সামুদ সম্প্রদায়ের কুসংস্কার ও শেরেকীকে প্রশয় দিতেন তবে তারা তাঁকে তাদের নেতা বা রাজা হিসেবে নির্বাচিত করতো সেই আশা-ই তারা করেছিলো। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাকে বৃহত্তর কর্মের জন্য মনোনীত করেছেন। একত্ববাদ, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই ছিল আল্লাহ্‌ কর্তৃক তাঁর জন্য নির্দিষ্ট কাজ। স্বার্থপরতা ও মানবতার অবমাননার বিরুদ্ধে ছিল তাঁর সংগ্রাম। উষ্ট্রীকে পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করানো ছিলো অত্যাচারিত মানবতার প্রতীস্থাপনের প্রতীক স্বরূপ। দেখুন সূরা [৭:৭৩] এবং টিকা ১০৪৪।

৬৩। সে বলেছিলা "হে আমার সম্প্রদায়! আমার যদি আমার প্রভুর প্রেরিত ষ্পষ্ট [নিদর্শন] থাকে এবং তিনি যদি তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে অনুগ্রহ দান করে থাকেন [সেক্ষেত্রে] আমি যদি তাঁর অবাধ্যতা করি তবে কে আমাকে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে সাহায্য করবে? সেক্ষেত্রে তোমরা কি আমার ক্ষতিই বাড়িয়ে দিতেছ?" ১৫৫৯

১৫৫৯। এই আয়াতটি সালেহ্‌ নবীর বক্তব্য। তিনি বলেছেন : "আল্লাহ্‌ আমাকে তাঁর বাণীর বাহক ও প্রচারক নিয়োগ করে সম্মানিত করেছেন। যদি আমি আমার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তবে অবশ্যই আমাকে সে জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সে সময়ে সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র ক্রোধ থেকে কে আমাকে রক্ষা করবে ? আজ তোমাদের ইচ্ছার ফাঁদে আত্মসমর্পণের অর্থ হচেছ-পরলোকে অনন্ত নরকবাস। দেখুন সূরা [১১:২৮] আয়াত।

৬৪। "হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্‌র এই উষ্ট্রীটি তোমাদের জন্য প্রতীকস্বরূপ ১৫৬০। একে আল্লাহ্‌র [মুক্ত] জমিতে চরে খেতে দাও এবং একে কোন ক্লেশ দিও না। [তাহলে] দ্রুত শাস্তি তোমাদের ঘিরে ধরবে।"

১৫৬০। সালেহ্‌ নবী তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রদর্শণ করেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি আল্লাহ্‌র তরফ থেকে এক উষ্ট্রীকে আনায়ন করলেন; দেখুন সূরা [৭:৭৩] আয়াত এবং টিকা ১০৪৪। তিনি বললেন : তোমাদের একচ্ছত্র স্বার্থপরতা ত্যাগ কর। আল্লাহ্‌র দেয়া তৃণভূমিতে সকলের সমান অধিকার। গরীবের পশু ও সম্পদশালী, প্রভাবশালী লোকের পশু সমভাবে এখানে বিচরণ করতে পারবে। আল্লাহ্‌র দান-চারণভূমিতে সকলের সম অধিকার। এই উষ্ট্রী গরীব লোকের প্রতিনিধি এবং একে চারণভূমিতে প্রবেশাধিকার দান আল্লাহ্‌র ন্যায় বিচারের প্রতীক। সুতারাং তোমরা স্বার্থপরতা ত্যাগ করে উষ্ট্রীর চারণের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ কর। কারণ উষ্ট্রীটি হচ্ছে আল্লাহ্‌র তরফ থেকে প্রাপ্ত ন্যায় বিচারের পবিত্র প্রতীক। সুতারাং তোমাদের কাছেও তা পবিত্র। কিন্তু তারা উত্তরে সব আবেদনকে অস্বীকার করে উষ্ট্রীকে বধ-করলো। আল্লাহ্‌র হুকুম বা আদেশকে অস্বীকার করার ফলে তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

[[মন্তব্য : কোরানের মাধ্যমে মুসলমানদের যে সব নৈতিক উপদেশ বা আল্লাহ্‌র আদেশ দান করা হয়েছে মুসলিম সমাজ প্রতিনিয়ত তা প্রতিহত করে চলেছে। যার ফলে তাদের জাতীয় জীবনে বিপর্যয়ের ঘনঘটা দুর্যোগের কালো মেঘ।]

৬৫। কিন্তু তারা তাকে বধ করলো। সুতারাং সে বলেছিলো, "তোমরা তোমাদের গৃহে তিন দিন জীবনকে উপভোগ কর ১৫৬১। [তার পরে আরম্ভ হবে তোমাদের ধ্বংস] [শোন] এটা একটা প্রতিশ্রুতি যা মিথ্যা হওয়ার নয়।

১৫৬১। উষ্ট্রীকে বধ করার পরও তিনদিন সময় দেয়া হয়েছিলো, অনুতাপ করার জন্য। কিন্তু হায়! তারা সে সাবধান বাণীতেও কর্ণপাত করলো না। ফলে তাদের উপরে প্রাকৃতিক দুর্যোগরূপে আল্লাহ্‌র গজব পতিত হয়। প্রচন্ড শব্দের সাথে পৃথিবী আলোড়ন করে ভূকম্পন ঘটে [সম্ভবত : তা ছিলো আগ্নেয়গিরির আগ্নেয়পাত]। আর এই ভূমিকম্পন ঘটেছিলো রাত্রিভাগে যার ফলে তারা তাদের সুরক্ষিত বাড়ী ঘর সহ মৃত্তিকাগর্ভে সমাহিত হয়ে যায়। তাদের সুরক্ষিত বাড়ীঘরকে তারা মনে করতো অত্যন্ত নিরাপদ। তা তাদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থ হয়েছিলো। সকালের সূর্যের মুখ তারা আর দেখতে পায় নাই। রাতের অন্ধকারেই তারা বিলিন হয়ে যায়। এভাবেই আল্লাহ্‌ অবাধ্য উদ্ধত অহংকারীদের অবনত করেন।

৬৬। যখন আমার নির্দ্দেশ এলো, আমি সালেহ্‌ এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদের আমার [বিশেষ] অনুগ্রহ দ্বারা রক্ষা করেছিলাম ১৫৬২ এবং রক্ষা করলাম সেই দিনের লাঞ্ছনা থেকে। তোমার প্রভু তো শক্তিমান এবং তাঁর ইচ্ছাকে কার্যকর করতে সক্ষম।

১৫৬২। দেখুন সূরা [১১:৫৮] আয়াত এবং টিকা ১৫৫৪।

৬৭। [প্রচন্ড] বিস্ফোরণ ১৫৬৩ পাপীদের আঘাত করলো, এবং সকালের পূর্বেই তারা নিজ নিজ গৃহে [এমনভাবে] ধরাশায়ী হয়েছিলো,-

১৫৬৩। দেখুন সূরা [১১:৭৮] আয়াত এবং টিকা ১০৪৭ ও টিকা নং ১৫৬১।

৬৮। যেনো তারা সেখানে কখনও বসবাস করে নাই এবং সমৃদ্ধি লাভ করে নাই। জেনে রাখ, সামুদ সম্প্রদায় তো তাদের প্রভু এবং প্রতিপালককে প্রত্যাখান করেছিলো। জেনে রাখ, [দৃষ্টি থেকে] সামুদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিলো ১৫৬৪।

১৫৬৪। দেখুন সূরা [১১:৬০] আয়াত ।

রুকু - ৭

৬৯। ইব্রাহীমের নিকট আমার ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলো। তারা বলেছিলো, "শান্তি"। সে উত্তর দিয়েছিলো, "শান্তি" এবং সে বাছুর গরুর কাবাব দ্বারা দ্রুত তাদের আপ্যায়ন করেছিলো ১৫৬৫।

১৫৬৫। ৭ নম্বর সূরা বা সূরা আল-আরাফে নবীদের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে নূহ্‌, হুদ, সালেহ্‌, লূত এবং সুয়েব। সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সালেহ্‌ নবীর পরে লূতের কথা বর্ণনা করা প্রয়োজন। এই সূরাতে (১১ নম্বর) লুতের কাহিনীর শুরু হয়েছে ৭৭ নম্বর আয়াত থেকে। আপতঃদৃষ্টিতে ধারাবাহিকতার বিঘ্ন ঘটেছে মনে হলেও ধারাবাহিকতাকে এখানে কোনও ব্যতিক্রম ঘটে নাই। লূতের কাহিনীর ভূমিকা স্বরূপ এখানে হযরত ইব্রাহীমের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম ছিলেন হযরত লূতের চাচা। হযরত ইব্রাহীমের বংশেই পৃথিবীর ধর্মীয় ইতিহাসের মূল নবী রসুলদের প্রেরণ করা হয়। হযরত মূসা হযরত ঈসা, হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা) যাদের নিকট কিতাব বা মূল প্রত্যাদেশ প্রেরণ হয়, তারা হযরত ইব্রাহীমের বংশেই জন্ম গ্রহণ করেন। এই আয়াতে লূতের যে কাহিনীর সূত্রপাত করা হবে, সে সময়ে হযরত ইব্রাহীম জীবনের বহু বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করেছেন। মেসোপোটিমিয়ার মালভূমিতে সে সময়ে তাঁর অবস্থান ছিলো। নমরুদ বাদশা তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিলো। কিন্তু আল্লাহ্‌র কৃপায় তিনি তা থেকে রক্ষা পান। এরপর তিনি নিজ মাতৃভূমির থেকে বিতারিত হন। লূতের কাহিনীর যখন সূত্রপাত ঘটে, তখন হযরত ইব্রাহীম নিজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে ক্যানন প্রদেশে বসবাস করছেন। এখান থেকেই তিনি তার ভ্রাতুস্পুত্র লূতকে আল্লাহ্‌র আদেশ প্রচারের নির্দ্দেশ দান করেন। লূত যে স্থানের অধিবাসীদের নিকট আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়েছিলেন, তা ছিল ডেডসী-র (Dead Sea) বা মরু সাগরের পাশে অবস্থিত সমতল ভূমি যা (বাহার লুত) এখনও Bahr Lut নামে অভিহিত হয়। এভাবেই আল্লাহ্‌ হযরত ইব্রাহীমকে পরিশুদ্ধ করে নেন, তার বাণী ধারণ করার উপযুক্ত করে নেন। আল্লাহ্‌ তাকে ভতিষ্যতে প্রধাণ রসুলদের পূর্ব পুরুষরূপে সম্মানিত করেন। নমরুদ বাদশার অবস্থান কোথায় ছিল ? বর্তমান লোক গাঁথা ও পৌরনিক কাহিনী অনুযায়ী বর্তমান নীমরুদ নামক স্থানে তার রাজধানী ছিল। নীমরুদ স্থানটি ইরাকের মসুল শহর থেকে বিশ মাইল দক্ষিণে টাইগ্রীস নদীর তীরে অবস্থিত। বর্তমানে এই স্থানটিতে আসেরিয়ান রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। অবশ্য হযরত ইব্রাহীমের সময়কাল ছিল আসেরিয়ানদের অভ্যুত্থানের বহু পূর্বে। আসেরিয়ানদের শহরের নাম ছিল Kalakh [calah] । বর্তমানে প্রত্নতাত্বিক অভিযানে আসেরিয়ানদের সভ্যতা সম্পর্কে বহু মুল্যবান তথ্য আবিষ্কার হয়েছে কিন্তু তা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। মূল কথা লূতের কাহিনীর প্রসঙ্গে-ই এখানে হযরত ইব্রাহীমের উল্লেখ করা হয়েছে।

৭০। কিন্তু যখন সে দেখলো তাদের হাত [খাবারের] দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, [তখন] তাদের প্রতি তাঁর অবিশ্বাস অনুভূত হলো এবং তাঁর মনে ভীতির সঞ্চার হলো ১৫৬৫(ক)। তাঁরা বলেছিলো, "ভয় পেয়ো না; আমাদের লূতের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়েছে ১৫৬৬। "

১৫৬৫(ক)। হযরত ইব্রাহীম শান্তির সম্ভাষনের মাধ্যমে বিদেশী আগন্তুকদের গ্রহণ করেন এবং তাদের সম্মুখে সুস্বাদু রোষ্টেড মাংস রাখেন আহার্যের জন্য। কিন্তু বিদেশী অতিথিরা তা স্পর্শ করলো না। কারণ তারা ছিলেন মানুষরূপী ফেরেশতা। খাদ্যকে স্পর্শ না করার অর্থ গৃহকর্তার আপ্যায়নকে গ্রহণ না করা। সুতারাং হযরত ইব্রাহীমের মনে আগন্তুকদের সম্পর্কে ভয় ও সন্দেহের সৃষ্টি হলো। তাঁর এই ভয় ও সন্দেহকে অনুভব করে, ফেরেশতারা তাদের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলো। তারা বললো লূতের শহরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। এবং তাদের আগমন লূতের নিরাপত্তার কারণে। এসময়ে তারা হযরত ইব্রাহীমকে আরও একটি সুসংবাদ দান করেন আর তা হচ্ছে, যিনি মহান ব্যক্তিত্বের পিতা হতে চলেছেন।

১৫৬৬। লূতের সম্প্রদায়ের অর্থ, সেই সম্প্রদায় যাদের নিকট লূতকে প্রেরণ করা হয়েছিলো সতর্ককারী হিসেব। যে শহরে এসব দুষ্ট লোকেরা থাকতো সে শহরের নাম ছিলো সদম ও গোমরাহ্‌ ।

৭১। আর তাঁর স্ত্রী [সেখানে] দন্ডায়মান ছিলো, এবং সে হেসে ফেললো ১৫৬৭। কিন্তু আমি তাঁকে ইস্‌হাক ও তার পরে ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম।

১৫৬৭। এখানের বর্ণনাকে অতি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। কারণ পূববর্তী নবীদের ধর্মগ্রন্থে এই কাহিনীকে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সে কারণেই এ কাহিনী সবার জানা বলে ধরে নেয়া হয়। Genxxi:5 অনুযায়ী ফেরেশতারা সংবাদ প্রথমে হযরত ইব্রাহীমকে দেন, সে সময়ে হযরত ইব্রাহীমের বয়স ছিল একশত বৎসর। এবং তার স্ত্রী সারার বয়স ছিল নব্বই বৎসর Gen xvii সম্ভবতঃ তিনি পর্দ্দার আড়াল থেকে ইব্রাহীম ও ফেরেশেতাদের কথোপকথন শুনছিলেন। তাঁর পক্ষে এই শুভ সংবাদ বিশ্বাসের অতীত ব্যাপার ছিল। ফলে সন্দেহের বশে তিনি অবিশ্বাসের হাসি হাসেন। [অনেকের মতে আনন্দের হাসি] কিন্তু এই শুভ সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাছে প্রকাশ করা হয় যে, তিনি হযরত ঈসাহাকের মা হতে চলেছেন। এবং হযরত ঈসাহাকের মাধ্যমে হযরত ইয়াকুব দৌহিত্ররূপে পেতে চলেছেন। সারার এর পূর্বে কোনও সন্তান হয় নাই। সারাহ এর সন্তান ধারণের বয়স ছিল না। সুতারাং এটা ভাবা তাঁর পক্ষে খুবই স্বাভাবিক ও যুক্তি সঙ্গত ছিল যে তাঁর পক্ষে কি সন্তান ধারণ করা সম্ভব ?

৭২। সে বলেছিলো, "হায় হায়! আমি বৃদ্ধা রমনী হয়ে কিভাবে সন্তান ধারণ করবো, যখন আমার স্বামী এখানে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ? এটা অবশ্যই এক অদ্ভুদ ব্যাপার ১৫৬৮।

১৫৬৮। এই আয়াতটি ছিল সারাহ-এর দীর্ঘশ্বাস বিগত দিনের।

৭৩। তারা বলেছিলোম, "আল্লাহ্‌র আদেশে তুমি বিষ্ময় বোধ কর ? হে গৃহের অধিবাসীগণ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও কল্যাণ ১৫৬৯। তিনি সকল প্রশংসার যোগ্য এবং মহিমান্বিত। ১৫৭০।

১৫৬৯। Ahl-ul-bait অর্থ গৃহের অধিবাসী। বিনয়ের সাথে কোন পরিবারের সদস্য বা সদস্যবৃন্দকে সম্ভাষণ করা এই কথাটির অর্থ সমগ্র পরিবারের জন্য আল্লাহ্‌র রহমত।

১৫৭০। হযরত ইব্রাহীমের জীবনের এই ঘটনা আল্লাহ্‌র রহমতের এক অলৌকিক দিগন্তের উন্মোচন করে। মানুষের প্রতি আল্লাহ্‌র রহমত ও করুণার যে প্রকাশ তাই এখানে পরিষ্ফুট হয়েছে। সত্যের প্রতি, আল্লাহ্‌র বাণীর প্রতি, হযরত ইব্রাহীমের পিতা-বিশ্বাস স্থাপন করেন নাই। সেজন্য ইব্রাহীমের সাথে তাঁর পিতার মতান্তর ঘটে ও বিরোধ হয় [৬:৭৪] তাঁকে আগুনের কুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু তিনি অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসেন [২১:৬৮-৬৯]। তাকে স্বদেশ থেকে বিতারিত করা হয়। তিনি বহুদুর দেশে হিজরত করেন। নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত, বিপদ-বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি আল্লাহ্‌র বাণী ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করেন। বৃদ্ধ বয়েসে আল্লাহ্‌ তাকে সকল নবীদের প্রধান পূর্বপুরুষ হওয়ার শুভ সংবাদ দান করেন। প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী এই বৃদ্ধ বয়েসে সন্তান লাভ করা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু আল্লাহ্‌র রহমত ও কুদরতে সেই অসম্ভব ঘটনাই সংঘঠিত হলো এবং মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের সূচনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো।

৭৪। যখন ইব্রাহীমের [মন থেকে] ভয় দূরীভূত হলো, এবং তাঁর নিকট সুসংবাদ পৌঁছিলো; সে লুতের সম্প্রদায়ের জন্য আমার নিকট আবেদন করতে আরম্ভ করলো। ১৫৭১

১৫৭১। Glad Tiding বা সুসংবাদ, শুধু সুপুত্রের পিতা হবেন, এটাই শুধু সংবাদ ছিল তাই-ই নয়, আরও শুভ সংবাদ ছিল যে তিনি সমস্ত নবীকুলের আদি পিতা হবেন। অর্থ্যাৎ তাঁর বংশধরদের মধ্যে থেকে জগতের সমস্ত নবী রসুলদের জন্ম লাভ ঘটবে। এই সংবাদের পর তার মনের ভীত সস্ত্রস্ত ভাব তিরোহিত হয় এবং তিনি তৎক্ষনাত লুতের সম্প্রদায়ের পাপী লোকদের জন্য প্রার্থনা শুরু করেন।

৭৫। নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম ধৈর্য্যশীল, কোমল হৃদয় এবং সতত আল্লাহ্‌ অভিমুখী। ১৫৭২

১৫৭২। আল্‌-মুস্তফার (সা) মত হযরত ইব্রাহীমের তিনটি প্রধান মহৎ বৈশিষ্ট্যকে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। (১) মানুষের দোষ ত্রুটির ব্যাপারে তিনি ছিলেন ধৈর্য্যশীল, (২) কোমল অন্তর, সকলের জন্য দয়া ও সহানুভুতি ছিল তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এবং (৩) যে কোনও বিপদ ও বিপর্যয়ে সর্বদা আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।

৭৬। হে ইব্রাহীম ! বিরত হও! তোমার প্রভুর হুকুম এসে পড়েছে। তাদের উপরে শাস্তি এসে পড়বে যা অনিবার্য। ১৫৭৩

১৫৭৩। এই আয়াতটিতে আল্লাহ্‌ তার রসুলকে সম্বোধন করেছেন, "হে ইব্রাহীম! তোমার সতর্কবাণী ও লুতের কথা কেউ শুনবে না। হায়! তারা পাপে এত বেশী মগ্ন যে, কোন কিছুই তাদের চরিত্রকে সংশোধন করতে পারবে না।" তাদের পাপের প্রতি প্রগাঢ় আসক্তির চিত্র ৭৯ নম্বর আয়াতে নিম্নে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতের পর থেকে লুতের কাহিনীর বর্ণনা আছে।

[উপদেশ : যে ব্যক্তি পাপে সম্পূর্ণ নিমগ্ন তার পক্ষে সে পথ পরিহার করা সহজ নয়। সত্য পথের সন্ধান দান করলেও সে পথকে সে চিনতে পারে না।]

৭৭। যখন আমার ফেরেশতারা লূতের নিকট পৌঁছালো, তখন সে তাদের আগমনে বিষন্ন হলো এবং তাদের [রক্ষায়] নিজেকে অসমর্থ মনে করলো। সে বলেছিলো, "এটা একটা নিদারুণ দিন।" ১৫৭৪

১৫৭৪। পূর্বের সূরা [৭:৮০-৮৪] আয়াতে লূতের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে লূতের কার্য পদ্ধতির উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। লূতের সম্প্রদায় সমকামিতার মত জঘণ্য বিষয় বস্তুর অনুশীলন করতো। এদের এই পাপ থেকে মুক্ত করার জন্য লূতের সংগ্রামের বর্ণনা আছে পূর্বের সূরাতে দেখুন সূরা [৭:৮০] এবং টিকা নং ১০৪৯। এই সূরাতে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্‌র দয়া ও করুণার উপরে। যারা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সংগ্রাম করে আল্লাহ্‌র রহমত তাদের সকল বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে । অপর পক্ষে যারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত প্রাকৃতিক আইনকে অস্বীকার করে তাদের উপরে আল্লাহ্‌র শাস্তি ও গজব পতিত হয়। বর্তমান সূরাতে আল্লাহ্‌র পূণ্যবান বান্দা ও পাপীর সাথে এই লেন-দেনের সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছে।পূণ্যবান ও পাপীর মধ্যে তুলনা করা হয়েছে।

[উপদেশঃ যারা পাপী তাদের মধ্যে সর্বদা আইনকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যাবে। তারা সমাজ-জীবনে মানুষের তৈরী আইন ও প্রকৃতিকে দেয়া আল্লাহ্‌র তৈরী আইন লঙ্ঘন করবে। এটা হবে তাদের স্বভাব ধর্ম।

৭৮। এবং তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা দ্রুতবেগে তার দিকে ধাবিত হলো এবং পূর্ব থেকেই তারা ঘৃণ্য অভ্যাসে লিপ্ত ছিলো। সে বলেছিলো, " হে আমার সম্প্রদায়! এখানে আমার কন্যারা আছেঃ তোমাদের জন্য তারা পবিত্র [যদি তোমরা বিবাহ কর] ১৫৭৫ । এখন আল্লাহ্‌কে ভয় কর, এবং আমার অতিথিদের ব্যাপারে আমাকে লজ্জায় আচ্ছাদিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি একজনও সঠিক মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি নাই? "

১৫৭৫। কোন কোন তফসীরকারের মতে " নিজের কন্যা দ্বারা সমগ্র জাতির বধূ-কন্যাদের বুঝিয়েছেন। কেন না, প্রত্যেক নবী নিজ উম্মতের জন্য পিতৃতুল্য। কারণ আরবীতে "Waladi" আক্ষরিত অর্থ "My Son" বা আমার পুত্র। কিন্তু এই শব্দটি আরবী ভাষাভাষী দেশে বর্ষিয়সী লোকেরা অল্প বয়েসীদের সম্ভাষনের জন্য ব্যবহার করে থাকে।

৭৯। তারা বলেছিলো, " তুমি তো জান, তোমার কন্যাদের আমাদের কোন প্রয়োজন নাই। প্রকৃতপক্ষে, তুমি ভালোভাবেই জান আমরা কি চাই ।"

৮০। সে বলেছিলো, " আমার যদি তোমাদের দমন করার ক্ষমতা থাকতো অথবা আমি কোন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতাম ।" ১৫৭৬

১৫৭৬। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লূত নিজেকে অসহায় বোধ করতে থাকেন। জনস্রোত পাপের আবেগে যে ভাবে তাঁর দিকে ছুটে গিয়েছিলো, তাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না । নিজের অক্ষমতা ও অসহায়তা হৃদয়ঙ্গম করে লূত এখানে আক্ষেপ করেছেন, ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, শক্তিশালী সাহায্যের জন্য। লূত বুঝতে পারেন নাই শক্তিশালী সাহায্য তার খুবই সন্নিকটে। মহাপরাক্রমশালী, মহাশক্তিশালী আল্লাহ্‌র সাহায্য খুবই নিকটে। অতিথিদ্বয় সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। শেষ পর্যন্ত লূতের সম্প্রদায় পাপ থেকে বিরত হয় কি না তাই পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে মানুষের বেশে তাদের আগমন। মহাশাস্তির আগমনের পূর্বে তাদের আর একবার সুযোগ দেয়াই আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্য । লূতের সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা ও পাপের প্রতি আসক্তির ফলে আল্লাহ্‌র শাস্তির হুকুম তাদের উপরে জারি হয়। এবং ফেরেশতারা লূতকে সকাল হওয়ার পূর্বেই স্থান ত্যাগের নির্দ্দেশ দান করেন। কারণ তাদের শহরটির জন্য সেটাই ছিল শেষ রাত্রি।

৮১। [ফেরেশতারা] বলেছিলো "হে লূত! আমরা তোমার প্রভুর প্রেরিত ফেরেশতা। কোন অবস্থায়ই তারা তোমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। এখন, রাত্রির কিয়দংশ বাকী থাকতেই তোমার পরিবারসহ বের হয়ে পড়। তোমাদের মধ্যে কেউ পিছন ফিরে তাকাবে না। কিন্তু তোমার স্ত্রী ১৫৭৭ [পিছনে পড়ে থাকবে]। [সম্প্রদায়ের] লোকদের যা ঘটবে তারও তা ঘটবে। প্রভাত হচেছ তাদের জন্য নির্ধারিত সময়। প্রভাত কি নিকটবর্তী নয় ?

১৫৭৭। লূতের এক পত্নী ছিলো, যে লূতের মত পূণ্যাত্মার সংস্পর্শে থেকেও পাপের পথ পরিত্যাগ করতে পারে নাই। সে সর্বদা স্বামীর মতবাদকে উপেক্ষা ও অস্বীকার করতো যা প্রকারান্তে আল্লাহ্‌র আদেশ অস্বীকার করার সামিল। কারণ লূত আল্লাহ্‌র আদেশকেই প্রচার করতেন । লূতের পত্নী পিছনে ফিরে তাকায়, ফলে তার পরিণতি হয় ধবংস । দেখুন সূরা [৬৬:১০] আয়াত। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী লূতের পত্নী একটি লবণের মূর্তিতে পরিণত হয় । [Gen xix 26]

উপদেশঃ ইসলাম ব্যক্তিগত দায় দায়িত্বে বিশ্বাসী । লূত ও নূহ্‌ নবীর পত্নী ও পুত্র স্ব-স্ব পাপের দরুণ নিজের ধবংস নিজে ডেকে আনে। নবীদের পত্নী হওয়ার দরুণ বা সন্তান হওয়ার দরুণ তাদের গোনাহ্‌ থেকে মাপ পান নাই।

৮২। অতঃপর যখন আমার আদেশ প্রকাশ হলো, তখন আমি [নগরীকে] উল্টিয়ে দিলাম এবং তাদের উপরে ক্রমাগত গন্ধক বর্ষণ করলাম [যা ছিলো] ইটের ন্যায় শক্ত এবং পরলের উপরে পরল, (১৫৭৮, ১৫৭৯)।

১৫৭৮। দেখুন সূরা [ ৭:৮৪] আয়াত এবং টিকা ১০৫২।

১৫৭৯। "Sijjil" শব্দটির অর্থ মাটির ঢেলা, অথবা ঝামা ইটের মত শক্ত প্রস্তর কঙ্কর । লূতের শহরের নাম ছিল 'সদম' ও 'গোমেরাহ্‌' । এই স্থান দুটির অবস্থান বর্তমানে গন্ধকযুক্ত শক্ত পাথর ও মাটিতে আবৃত যা কোরানের বর্ণনা অনুযায়ী কঙ্কর পাথর "বাক্যটির" সাথে সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ। সূরা [ ৫১:৩৩] আয়াতের বর্ণনাতে "মাটির শক্ত ঢেলা" বাক্যটি [Hijarat min tin] ব্যবহার করা হয়েছে একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। অপর পক্ষে "Sijjil" শব্দটি সূরা [১০৫: ৪] আয়াতে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট ছোট পোড়া মাটির তৈরী শক্ত নুড়ি পাথরের জন্য, যখন আবরাহ্‌ বাদশাহের হস্তী বাহিনী ধবংস হয় তারই বর্ণনার প্রেক্ষিতে।

৮৩। [যা] তোমার প্রভুর নিকট থেকে চিহ্নিত ছিলো ১৫৮০। যারা পাপ করে তাদের নিকট থেকে ইহা দূরে নয় ১৫৮১।

১৫৮০। আক্ষরিক অর্থে এই আয়াতের অর্থ দাড়ায় পাথরের বর্ষণ ছিল পাপীদের শাস্তির শেষ পরিণতির ঐশ্বরিক বিধান।

১৫৮১। "Hiya" আরবী শব্দটির অর্থ ইহা। এখানে "ইহা" শব্দটি দুভাবে প্রয়োগ হতে পারে। কোন কোন তফসীরকারের মতে ইহা শব্দটি ব্যবহার হয়েছে ধবংস প্রাপ্ত শহরগুলির পরিবর্তে যেগুলি পাপে পূর্ণ হয়েছিলো । সেক্ষেত্রে সাধারণ ভাবে অর্থ হবে ঐ ধ্বংস প্রাপ্ত পাপে পূর্ণ শহরগুলির মত অন্যান্য পাপে পূর্ণ শহরের [তাদের] শেষ পরিণতি।

দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, ইহা শব্দটি আল্লাহ্‌ গজবের প্রতীক স্বরূপে পাথরের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে তাহারা 'ইহা' শব্দটি আল্লাহ্‌র গজবের পরিভাষা স্বরূপ। অর্থাৎ যারা পাপ করে আল্লাহ্‌র গজব থেকে তারা খুব বেশী দূরে নয়।

রুকু - ৮

৮৪। মিদিয়ান বাসীদের নিকট [আমি] তাদের ভ্রাতা সুয়েবকে প্রেরণ করেছিলাম ১৫৮২। সে বলেছিলো ; "হে আমার সম্প্রদায় আল্লাহ্‌র এবাদত কর। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। এবং মাপ ও ওজনে কম দিও না। আমি তোমাদের সমৃদ্ধশালী দেখছি ১৫৮৩। কিন্তু আমি আশঙ্কা করছি এক সর্বগ্রাসী দিবসের শাস্তি।"

১৫৮২। দেখুন সূরা [৭:৮৫-৯৩] আয়াতগুলি। মাদিয়ান শহরের অবস্থান সূরা [৭:৮৫] আয়াত এবং টিকা ১০৫৩ তে বর্ণনা করা হয়েছে। সুয়েব নবীর অবস্থানের কালক্রম বর্ণনা করা হয়েছে সূরা [৭:৯৩] আয়াতে এবং ১০৬৪ নম্বর টিকাতে। সূরা [৭] এ সুয়েব নবীর বর্ণনার পটভূমি এবং এই সূরার [১১] পটভূমি সম্পূর্ণ আলাদা। দুটো সূরাতে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সুয়েব নবীর আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরাতে গুরুত্ব দান করা হয়েছে মানুষের প্রতি আল্লাহ্‌র আচরণ এবং মানুষের অবাধ্যতা ও শঠতার উপরে। ৭ নম্বর সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্‌র নবীর প্রতি মিদিয়ানবাসীদের আচরণের উপরে। এভাবেই হযরত মুহম্মদের (সা) প্রতি মক্কাবাসীদের আচরণের দিকে আলোকপাত করা হয়েছে।

১৫৮৩। মিদিয়ান বাসীরা ছিল সম্পদশালী। তাদের সম্পদের মূল কারণ ছিলো ব্যবসা বাণিজ্য। যে পাপ মিদিয়ানবাসীদের প্রলুব্ধ করেছিলো তা ছিলো ব্যবসা বাণিজ্যে তাদের শঠতা । তারা লেনদেনের ব্যাপারে ছিল শঠ ও প্রতারক তারা ওজনে কম দিত অর্থাৎ ব্যবসা বাণিজ্যে বিক্রেতার যে সততা প্রয়োজন তা তাদের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। সুয়েব নবী তাদের সর্তক করে দিয়েছিলেন যে, এভাবে ব্যবসা কখনও তাদের সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী করতে পারবে না। তিনি বলেছিলেন যে, জাতি হিসেবে দরিদ্র হওয়ার এটাই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত পথ। এই পথে তারা শুধু যে পার্থিব সম্পদই হারাবে তাই-ই নয় -তাদের আধ্যাত্মিক জগতও ধীরে ধীরে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। অর্থাৎ পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উভয় জগতের সম্পদ তারা হারাবে । শেষ বিচারের দিনে তাদের প্রতিটি কর্মফলকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার বিশ্লেষণ করা হবে। সেটা হবে "সর্বগ্রাসী দিবসের শাস্তি" । পৃথিবীতে তারা তাদের জাল-জুয়াচুরী যতই গোপন রাখতে সক্ষম হোক না কেন শেষ বিচারের দিনে তা গোপন রাখা সম্ভব হবে না; প্রকাশ হবেই।

[[মন্তব্য : প্রতিটি ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া বর্তমান। উপরের আয়াত আমাদের এই সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে, কোনও কিছুই শঠতা ও জোচ্চুরি দ্বারা অর্জন করা যায় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যে ব্যবসা শঠতার উপরে প্রতিষ্ঠিত তার ধবংস অনিবার্য। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা তাদের শঠতা অনুধাবন করতে পারে এবং শঠতাপূর্ণ ব্যবসায়ীদের পরিত্যাগ করে। ফলে ব্যবসায়ীর ব্যবসাতে মন্দা দেখা দেয়। ঠিক সেই একই ভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততার প্রয়োজন। যে কোনও কাজ যদি সততার উপরে প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে শেষ পর্যন্ত তার ধবংস অনিবার্য। পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জগত সবই ধবংস হয়ে যাবে। এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্‌র বিধান। এই হচ্ছে এই আয়াতের উপদেশ ।]

৮৫। "হে আমার সম্প্রদায় ! সঠিক মাপ ও ওজন দেবে। লোকদের তার প্রাপ্য জিনিষে কম দিও না ১৫৮৪। বিপর্যয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে খারাপ কাজ করো না।"

১৫৮৪। প্লেটো এবং এরিসটোটল 'ন্যায়ের ' সংগা দান কালে বলেছেন যে, যার যা প্রাপ্য তা নিশ্চিত করাই হচ্ছে 'ন্যায়' ধর্ম। বিচার বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, মানুষের যত চারিত্রিক গুণাবলী আছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে স্থান লাভ করে 'ন্যায়' ধর্ম। কারণ ন্যায়ের সাথে আরও বহুবিধ গুণাবলী জড়িত থাকে, যেমনঃ সততা, সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ আন্তরিকতা ইত্যাদি। ব্যবসায়ী মিদিয়ানবাসীদের প্রধান দোষ ছিল তারা গ্রাহকের প্রাপ্য অংশ দিত না। অর্থাৎ তারা ন্যায়ের পথকে পরিহার করতো, তারা অন্যায় করতো, যার ফলে তাদের ধবংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। অন্যকে ঠকাবার প্রবণতার জন্মলাভ করে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা থেকে। নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা যে কোন খারাপ কাজ করতে দ্বিধা বোধ করে না। "ওজনে কম দেয়া" কথাটি প্রতীক ধর্মী। বৃহত্তর অর্থে কথাটির অর্থ দাঁড়ায় সমাজে আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যেকের কাছে প্রাপ্য থাকে। কারণ লেন-দেনের মাধ্যমেই সামাজিক জীবন গড়ে ওঠে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়; যিনি পয়সার পরিবর্তে শিক্ষাদান করেন, তিনি আন্তরিক ও সততার সাথে শিক্ষা দেবেন এটাই শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য। যিনি ডাক্তারী করেন তিনি আন্তরিকভাবে রুগীকে পরামর্শ দেবেন,এটাই রুগীর প্রাপ্য । ঠিক সেই একই ভাবে ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, উকিল, প্রশাসক প্রত্যেকের জন্য এই কথা প্রযোজ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততার অভাব পরিলক্ষিত হয় । কেউ তার ন্যায্য অধিকার পায় না। অন্যায় করা সামাজিক ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। সুতারাং আশঙ্কা হয় মিদিয়ানবাসীদের মত এই সমাজও আল্লাহ্‌র রোষানলে পতিত হবে, যদি আমরা এখনও সাবধান না হই।

৮৬। "যদি তোমরা মুমিন হও, তবে [মনে রেখো] আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যা রেখেছেন, তা তোমাদের জন্য উত্তম ১৫৮৫। আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক নই।"

১৫৮৫। আল্লাহ্‌র আইন সকল কিছুর মধ্যেই সমতা বিধান করে। আল্লাহ্‌র আইন কখনই বলে না যে, নিজেকে সব কিছু থেকে বঞ্চিত করতে হবে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সুখ ও স্বাচ্ছন্দের জন্য যা প্রয়োজন আল্লাহ্‌র আইন তা অনুমোদন করে। কারণ ইহলৌকিক ও পরলৌকিক উন্নতির জন্য সকলেরই ব্যক্তিগত চাহিদা আছে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ বলছেন- অপরের ন্যায্য প্রাপ্য অংশ বন্টনের পরে, যা থাকে তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য থাকবে,তা তার জন্য শুধু যে 'যথেষ্ট' হবে তাই -ই নয়, তাদের পার্থিব ও আত্মিক উন্নতির সহায়ক হবে। যেমন - দয়া, মায়া, বিবেচনা প্রভৃতি গুণাবলী যার কথা আল্লাহ্‌ বারে বারে আমাদের বলেছেন, এতে শুধু যে গ্রহীতা উপকৃত হয় তাই নয় , যিনি দয়া, মায়া বা বিবেচনা প্রদর্শন করেন তারও আত্মার উন্নতি ঘটে। আল্লাহ্‌র আইনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে, চরিত্রের গুণাবলী যথাঃ দয়া, মায়া ও বিবেচনা ন্যায়পরায়ণতা, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ প্রভৃতি গুণাবলী হতে হবে স্বতঃস্ফুর্ত। এই গুণাবলী স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে আত্মার মাঝে জন্ম লাভ করবে এবং ফল্গুধারার মত তা স্বতঃপ্রবাহিত হবে তবেই তা আত্মার কালিমাকে বিধৌত করতে সক্ষম হবে। কোন নবী বা রসুল তা শক্তির মাধ্যমে কাউকে করতে বাধ্য করতে পারেন না। শক্তির মাধ্যমে যা করানো হয় তার সাথে আত্মার যোগাযোগ থাকে না, সুতারাং তা আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে আত্মিক উন্নতি ঘটে না।

৮৭। তারা বলেছিলো, "ওহে সুয়েব? তোমার সালাত কি তোমাকে আমাদের পূর্ব-পুরষেরা যার এবাদত করতো তা পরিত্যাগ করতে আদেশ দেয়? অথবা আমাদের বিষয়-সম্পত্তি সম্পর্কে যা করি তা পরিত্যাগ করতে বলে ? ১৫৮৬। তুমি তো অবশ্য ধৈর্য্যশীল ও ভালোমানুষ।" ১৫৮৭।

১৫৮৬। মিদিয়ানবাসীরা ছিল স্বার্থপর ও বৈষয়িক ধন-সম্পদে তাদের ছিল অতিরিক্ত আসক্তি। তাই তারা; (১) নবী সুয়েবকে এখানে তার প্রার্থনা ও আল্লাহ্‌র প্রতি একান্ত নিবেদনকে উপহাস করেছিলো। (২) তারা তাদের পার্থিব ধন-সম্পদকে জীবনের চরম ও পরম পাওয়া রূপে গণ্য করতো । ফলে তাদের নিকট সমাজের দুস্থ বা অভাবগ্রস্থের কোনও অধিকার ছিল না।

১৫৮৭। এই লাইনটি ছিলো নবী সুয়েবের প্রতি ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ । তারা এভাবে উপহাস করে যে, " তুমি একজন ভালো মানুষ। এবং তুমি আমাদের শিক্ষা দাও যে অন্য লোকের প্রতি দয়ালু হতে এবং তাদের দোষত্রুটি ক্ষমার চক্ষে দেখতে। আমাদের কাজকে তোমার দৃষ্টিতে পাপ মনে হয়। তুমি নিজেকে কি মনে কর? তুমি কি মনে কর তুমিই একমাত্র পূণ্যবান ব্যক্তি ?

৮৮। সে বললো, " হে আমার সম্প্রদায় ! তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে, প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর নিকট থেকে আমাকে উৎকৃষ্ট জীবনোপকরন দান করে থাকেন তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকব? ১৫৮৮ আমি তোমাদের যা নিষেধ করি আমি নিজে তা করতে ইচ্ছা করি না। আমি তো আমার সাধ্য মত সংস্কারই করতে চাই, আমার কার্য সাধন তো আল্লাহ্‌রই সাহায্যে; আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী।

১৫৮৮। নবী সুয়েবের বক্তব্য ছিল মৃদু কিন্তু দৃঢ়। প্রথমতঃ তিনি তাঁর লোকদের আবেগ দ্বারা পরিচালিত না হয়ে সুস্থভাবে চিন্তা করে দেখতে বলেছেন । ধীর স্থির ভাবে চিন্তা করলেই তারা বুঝতে পারবে যে, সুয়েব নবী আল্লাহ্‌র তরফ থেকে প্রেরিত এবং আল্লাহ্‌ প্রদত্ত দায়িত্বই শুধুমাত্র তিনি পালন করছেন। তাঁর লোকদের দোষত্রুটি ধরা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। দ্বিতীয়তঃ যদিও তিনি গরীব । কিন্তু তিনি অত্যন্ত সুখী এবং আত্মতৃপ্ত। আল্লাহ্‌ তাঁকে প্রচুর জীবনোপকরণ দিয়েছেন- পার্থিব ও পরলৌকিক বা আধ্যাত্মিক । কোনও রকম শঠতা বা জুয়াচুরি ব্যতীতই তিনি তার জীবনোপকরণ আল্লাহ্‌র কাছ থেকে লাভ করেন। তৃতীয়তঃ যদি তিনি কিছু নিষেধ করেন তবে নিজের জন্যও ঠিক সমভাবে তা প্রযোজ্য হবে। চতুর্থতঃ তিনি যে সব উপদেশ দিয়েছেন তা তাদেরই কল্যাণের জন্য । পঞ্চমতঃ তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিবেদন করতে চান যে তাঁর শিক্ষক বা ধর্মগুরু হওয়ার আকাঙ্খা নাই, তাদের আনুগত্য তিনি চান না । তাঁর প্রচেষ্টার সাফল্য শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র হাতে, "আমার কার্য সাধন তো আল্লাহ্‌রই সাহায্যে"। তবুও কি তারা আল্লাহ্‌র দিকে প্রত্যার্পন করবে না; যেন আল্লাহ্‌র রহমত পেতে পারে?

৮৯। "এবং হে আমার সম্প্রদায়। আমার সাথে বিরোধ ১৫৮৯ যেনো তোমাদের এমন পাপের কারণ না হয়, যেনো নূহের সম্প্রদায়, অথবা হুদের সম্প্রদায়, অথবা সালেহ্‌ এর সম্প্রদায়ের অদৃষ্টের ন্যায় কষ্ট ভোগ করতে হয়। আর লুতের সম্প্রদায় তো তোমাদের থেকে বেশী দূর নয়।"১৫৯০

১৫৮৯। সুয়েব নবীর সর্বশেষ আবেদন ছিল মানবিক- মানুষ হিসেবে মানুষের কাছে আবেদন। যেহেতু তোমাদের সাথে মতৈক্য হয় নাই, তাই বলে যেনো মনে করো না যে আমি তোমাদের ভালোবাসি না বা তোমাদের জন্য আমার হৃদয়ে কোনও অনুভূতি নাই। আমার ভিন্ন মতামত যেনো তোমাদের একগুয়েমী , অবাধ্যতা ও পাপের পথে পরিচালিত না করে । আমি যা বুঝতে পারি তোমরা তা পার না । আমি দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাই পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের পাপের দরুণ ধবংস হয়েছিলো। সুতারাং অনুতাপ কর ও আল্লাহ্‌র রাস্তায় ফিরে আস।

১৫৯০। যদি সুয়েব নবী হযরত ইব্রাহীমের চতুর্থ বংশধর হন [দেখুন সূরা [৭:৯৩] এবং টিকা নং ১০৬৪] তবে সময়ের ধারাবাহিকতায় লূতের সম্প্রদায় থেকে সুয়েব নবীর সম্প্রদায়ের অবস্থান খুব বেশী সময়ের ব্যবধান ছিল না । কারণ হযরত ইব্রাহীম ও লূত নবী ছিলেন সমসাময়িক। এমন কি এই দুই সম্প্রদায়ের ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যেও খুব একটা দূরত্ব ছিল না । কারণ সুয়েব নবীর সম্প্রদায় বা মিদিয়ানবাসীরা সিনাই পেনিনসুলা থেকে জর্দ্দান উপত্যকার মধ্যে বিচরণ করতো [দেখুন সূরা [৭:৮৫] আয়াতে টিকা নং ১০৫৩] ।

৯০। "[পক্ষান্তরে) তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর ও (অনুতাপের মাধ্যমে) তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর। আমার প্রভু তো পরম দয়ালু এবং প্রেমময়।"

৯১। তারা বলেছিল," ওহে সুয়েব! তুমি যা বল তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না ১৫৯১। বরং আমাদের মাঝে আমরা তোমাকে শক্তিহীন দেখ্‌ছি। তোমার স্বজন বর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে প্রস্তরাঘাতে মেরে ফেলতাম। কারণ আমাদের মাঝে তোমার কোন উচ্চ পদ নাই" ১৫৯২।

১৫৯১। আধ্যাত্মিক জগতের উপদেশাবলী বোঝার জন্য আগ্রহ ও আন্তরিকতার প্রয়োজন । যাদের তা আছে, তারা খুব সহজেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। কিন্তু যারা ঘৃণাভরে, অবজ্ঞাভরে, আল্লাহ্‌র নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে অন্ধ অহংকারের সাথে, তাদের পক্ষে আধ্যাত্মিক জগত এবং এর নিদর্শন সমূহ অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

১৫৯২। সুয়েব নবীর সম্প্রদায়েরা পৃথিবীতে একটাই ভাষা বুঝতো আর তা হচ্ছে শারীরিক শক্তির প্রয়োগ। তাদের বক্তব্যের মাঝে তাদের এই মনোভাব প্রকট হয়ে ওঠে। তারা বলে, " সুয়েব তুমি কি দেখতে পাও না যে আমরা প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা শক্তিতে তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ, তুমি তো একজন সাধারণ শিক্ষক মাত্র। আমরা ইচ্ছা করলেই তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করতে পারি বা কারাগারে রুদ্ধ করতে পারি, অথবা তোমার প্রতি আমরা যে কোনও শাস্তি প্রয়োগ করতে পারি। আমরা তোমার পরিবারের কথা চিন্তা করে তা করছি না, আমাদের এই অনুগ্রহের জন্য তোমার আমাদেরকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। তোমার যা প্রাপ্য তা থেকে তোমাকে অনেক বেশী অনুগ্রহ করা হয়েছে। "

৯২। সে বলেছিলো," হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের নিকট কি আমার স্বজনবর্গ, আল্লাহ্‌ অপেক্ষা অধিক বিবেচ্য? তোমরা তাঁকে [ঘৃণার সাথে] পিছনে ফেলে রেখেছ। তোমরা যা কর আমার প্রভূ তা সর্বদিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছেন।" ১৫৯৩

১৫৯৩। দেখুন সূরা [৮:৪৭] আয়াত ।

৯৩। "এবং হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যা পার কর। আমি আমার [কাজ] করবো ১৫৯৪। তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে কার উপরে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি পতিত হয়, এবং কে মিথ্যাবাদী। সুতরাং অপেক্ষা কর ! আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।"১৫৯৫

১৫৯৪। দেখুন সূরা [৬:১৩৫] আয়াত এবং টিকা নং ৯৫৭।

১৫৯৫। যারা পাপী ও অসৎ তারা যদি ক্রমাগত ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও খোদাদ্রোহী কাজ করে তবে আল্লাহ্‌র অনুগত বান্দা কি-ই বা করতে পারে? শুধু এটুকুই বলতে পারে, "প্রতীক্ষা কর এবং লক্ষ কর ! আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা নির্ভূলভাবে কাজ করবেই। এ বিশ্বাস আমার আছে। সুতরাং আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করবো আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্ত।"

৯৪। যখন আমার নির্দ্দেশ আসলো, আমি সুয়েব এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদের আমার [বিশেষ] অনুগ্রহ দ্বারা রক্ষা করলাম ১৫৯৬। অতঃপর যারা পাপী, [শক্তিশালী] বিস্ফোরণ তাদের আঘাত করলো, এবং প্রত্যুষে তারা তাদের স্ব স্ব গৃহে [এমন ভাবে] ধরাশায়ী হয়েছিলো,-

১৫৯৬। দেখুন সূরা [১১:৬৬] এবং সূরা [১১:৫৮] এবং টিকা নং ১৫৫৪।

৯৫। যেনো তারা সেখানে কখনও বসবাস করে নাই এবং সমৃদ্ধি লাভ করে নাই ১৫৯৭। জেনে রাখ! কি ভাবে মিদিয়ান সম্প্রদায়কে [দৃশ্যতঃ] মুছে ফেলা হয়েছিলো, যেভাবে মুছে ফেলা হয়েছিলো সামুদ সম্প্রদায়কে।

১৫৯৭। দেখুন সূরা [১১:৬৭-৬৮]। বিষ্ফোরণটি ছিল সম্ভবতঃ প্রচন্ড শব্দের সাথে আগ্নেয় গিরির আগ্নেয়ৎপাত।

রুকু - ৯

৯৬। আমি তো মুসাকে স্পষ্ট [নিদর্শন] এবং বিধিসংগত ক্ষমতা প্রদান করে পাঠিয়েছিলাম ১৫৯৮-

১৫৯৮। হযরত মুসা ও ফেরাউনের কাহিনী কুর-আন শরীফের বহু স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে প্রতিটি বর্ণনার প্রেক্ষাপট আলাদা। প্রত্যেক ক্ষেত্রে উদাহরণের সাহায্যে বিশেষ উদ্দেশ্যকে তুলে ধরা হয়েছে। এই আয়াতের মাধ্যমে যে বিশেষ উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে, তা হচ্ছে আল্লাহ্‌ মানুষকে প্রতিটি ব্যাপারে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেন। কিন্ত মানুষ আল্লাহ্‌র নেতৃত্বের পরিবর্তে স্ব-ইচ্ছায় মিথ্যা ও ভূয়া নেতার অনুসরণ করে এবং পরিণতিতে সে এবং তার নেতা সকলেই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ্‌ মানুষকে "সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন। সে এই ইচ্ছাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে নিজ দায়িত্ব পালন করবে। অর্থ্যাৎ সঠিক পথ যা আল্লাহ্‌ কর্তৃক মনোনীত তা অনুসরণ করবে, যেনো সে আল্লাহ্‌র রহমত ও করুণার যোগ্য হতে পারে।

৯৭। ফেরাউন ও তার প্রধাণদের নিকট । কিন্তু তারা ফেরাউনের আদেশ অনুসরণ করেছিলো; এবং ফেরাউনের আদেশ সঠিক [পথ-নির্দ্দেশ] ছিলো না ১৫৯৯।

১৫৯৯। ফেরাউনের বৈশিষ্ট্য ছিলোঃ অবাধ্যতা, একগুয়েমি, স্বার্থপরতা এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমতার সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করা। সে নিজেকে আল্লাহ্‌র সমকক্ষ বলে দাবী করতো। ফেরাউনের এই মনোভাব ও আচরণ অনেক বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে আকর্ষণ করতো; যারা স্ব-ইচ্ছায় ফেরাউনকে অনুসরণ করতো। যদিও আল্লাহ্‌র নবী ও রসুলেরা আল্লাহ্‌র পথে ডাকেন, তাদের শিক্ষা, ও সাবধান বাণী সত্বেও এই সব লোকেরা তাতে কর্ণপাত করে না। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ দয়া কিছুই তাদের প্রভাবিত করতে পারে না।

[উপদেশ : একথা হযরত মুসার সময়ে যেরূপ প্রযোজ্য ছিলো আজও এরূপ বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি পৃথিবীময় ছড়িয়ে আছে, যারা আল্লাহ্‌ অপেক্ষা মানুষের ক্ষমতার উপরে বেশী আস্থাবান।]

৯৮। শেষ বিচারের দিনে সে তার সম্প্রদায়ের পুরোধায় থাকবে এবং সে তাদের অগ্নির দিকে পরিচালিত করবে [ঠিক সেভাবে যে ভাবে পশুপালকে জলাশয়ের দিকে পরিচালিত করা হয়] ১৬০০। যেখানে তাদের প্রবেশ করানো হবে তা হবে প্রকৃতই নিকৃষ্ট।

৯৯। এই [পার্থিব জীবনে] এবং শেষ বিচারের দিনে অভিশাপ তাদের অনুসরণ করবে। কত নিকৃষ্ট সে পুরষ্কার যা [তাদের] দেয়া হবে।

১৬০০। "Awrada" - এই আরবী শব্দটির অনুবাদ দাঁড়ায়, পশুপালকে জলাশয়ের দিকে পরিচালিত করা। এই শব্দটি এখানে রূপক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এই রূপকের ব্যবহার যথাযথ হয়েছে। পশুপালকে দেখা যায় তারা তাদের রাখালকে বিশ্বাস করে এবং তারা দ্বিরুক্তি না করে রাখালের পরিচালিত পথে অগ্রসর হয়। রাখাল তাদের মধ্যাহ্নের উত্তপ্ত সূর্যালোক থেকে শীতল সুস্বাদু পানীয় জলের দিকে পরিচালিত করে। ফলে পশুপাল তাদের তৃষ্ণার পানি খুঁজে পায় ও তৃষ্ণা নিবারণ করে তৃপ্ত হয়। এই রূপকটি ব্যবহার করা হয়েছে এই জন্য যে, যে সব ব্যক্তি পৃথিবীর জীবনে সত্যিকারের নেতার অনুসরণ করে তাদের আধ্যাত্মিক জীবন আল্লাহ্‌র রহমতে সঞ্জিবীত হয়ে আত্মতৃপ্ত হয়। কিন্তু যারা ভুল নেতার অনুসরণ করে তাদের অবস্থা হয় ঠিক বিপরীত। এসব ভুল নেতা তাদের আত্মাকে অনন্ত শাস্তির পথে পরিচালিত করে। তবুও মানুষ তাদের সাধারণ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার না করে, ঐ সব ভুল নেতাদের পশুপালের ন্যায় অন্ধভাবে অনুসরণ করে এবং নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।

১০০। এগুলি হলো কতক সম্প্রদায়ের কাহিনী যা আমি তোমার নিকট বর্ণনা করেছি। তাদের মধ্যে কতক এখনও বিদ্যমান ১৬০১ এবং কতককে [সময়ের কাস্তে দ্বারা কেটে] নির্মূল করা হয়েছে ১৬০২।

১৬০১। পৃথিবীতে কোনও জাতি উন্নতিতে স্থায়ী হয় না। নির্দিষ্ট সময়অন্তে ফসলের মাঠ যেরূপ শূন্য হয়ে যায়, ফসলের কোনও অস্তিত্ব থাকে না, সেরূপ কোনও সভ্যতা বা জাতি এই পৃথিবীতে অনন্তকাল স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারে না। ততক্ষণই তারা স্থায়ীত্ব লাভ করবে, যতক্ষণ তারা আল্লাহ্‌র প্রেরিত নৈতিক আইনকে মেনে চলবে। এই-ই হচ্ছে পৃথিবীর নিয়ম। আর কেউ যদি আল্লাহ্‌র প্রেরিত নৈতিক আইনকে লঙ্ঘন করে তবে তার অবস্থা ঐ শূন্য ফসলের মাঠের অনুরূপ হবে। "তাদের মধ্য কতক এখনও বিদ্যমান" এই লাইনটার অর্থ, কোনও জাতি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর পরও পৃথিবীতে তাদের বংশধরেরা বিদ্যমান থাকে। যেমন : মিশরের ফেরাউনেরা ধ্বংসের পরও মিশরবাসীরা জাতি হিসেবে পৃথিবীতে বিদ্যমান।

১৬০২। পৃথিবীতে প্রতিটি জাতি উন্নতি লাভ করে, পরিপক্কতা লাভ করে জ্ঞানে, বিজ্ঞান, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে শেষে এক সময়ে পৃথিবীর সময়ের অগ্রযাত্রায় তারা তাদের অবস্থান হারিয়ে ফেলে। তারা অনগ্রসর, ক্ষয়িষ্ণু, ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিরূপে পৃথিবীতে অবস্থান করে। সেই জাতিরই শেষ পরিণতি এরূপ হয় যারা আল্লাহ্‌র আইনকে অমান্য করে। যাদের যাত্রা আল্লাহ্‌ প্রেরিত সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকে তাদের ঘরেই তাদের শ্রমের উপযুক্ত ফসল উঠে। অন্যথায় তারা 'নির্মূল হয়েছে।'

১০১। আমি তাদের কোন ক্ষতি করি নাই, বরং তারাই তাদের নিজের আত্মার ক্ষতি করেছিলো। যখন তোমার প্রভুর আদেশ এলো, তখন আল্লাহ্‌ ব্যতীত যে উপাস্যদের তারা উপাসনা করতো তারা তাদের একবিন্দু উপকারে এলো না, ১৬০৩। [তাদের ভাগ্যে] ধ্বংস ব্যতীত অন্য কিছু বৃদ্ধি করে নাই।

১৬০৩। আল্লাহ্‌র বিধানের সম্মুখে, কঠিন বাস্তবতার মুখে সর্ব অপচ্ছায়া, অবাস্তবতা, দূর হয়ে যাবে। আমরা যদি এক আল্লাহ্‌র পরিবর্তে, অন্য কিছুর আরাধনা করি, তবে তা আমাদের আত্মার একাগ্রতাকে, স্বচ্ছতাকে নষ্ট করবে, ফলে আত্মার মাঝে যন্ত্রণার উদ্ভব হবে এবং আত্মিক দিক থেকে অনিবার্য ধ্বংস নেমে আসবে এবং দোযখই তার শেষ পরিণতি।

১০২। এরূপই হলো তোমার প্রভুর শাস্তি যখন তিনি কোন সম্প্রদায়কে তাদের পাপের জন্য শাস্তি দান করেন। প্রকৃতই তাঁর শাস্তি নিদারুণ এবং কঠোর।

১০৩। যারা পরলোকের শাস্তির ভয় করে এতে রয়েছে তাদের জন্য নিদর্শন। এটা হবে সেই দিন যেদিন সকল মানুষকে একত্র করা হবে। এটা হবে সাক্ষ্য প্রমাণের দিন ১৬০৪ ।

১৬০৪। "সেই দিন" এই বাক্যটি যে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে তা হচ্ছে (১) এই সেই দিন যে দিন সকল সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করা হবে। (২) এই সেই দিন যেদিন আল্লাহ্‌ বিচারের জন্য সকল সাক্ষ্য প্রমাণ এবং প্রাসঙ্গিক সকল সাক্ষীকে একত্র করবেন। অর্থাৎ নবী রসুলেরা যারা প্রচার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, নারী-পুরুষ যারা অত্যাচারিত হয়েছিলেন, ফেরেশতারা যারা আমাদের চিন্তা ভাবনা বা কর্মের উদ্দেশ্য বা নিয়তকে লিপিবদ্ধ করতেন এবং আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তা, ভাবনা ও কাজ যা আমাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবে। (৩) এই সেই দিন যে দিনকে সকলে প্রত্যক্ষ করবে; অর্থাৎ যে যেখানেই যে ভাবেই থাক না কেন, তাতে কিছু যাবে না বা আসবে না, সকলেই এই দিনকে সমভাবে প্রত্যক্ষ করবে।

১০৪। কিন্তু আমি নির্দিষ্ট সময়ের বেশী তা স্থগিত রাখবো না।

১০৫। যখন সেদিন আসবে, তখন কোন আত্মা আল্লাহ্‌র অনুমতি ব্যতীত কথা বলতে পারবে না ১৬০৫। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান ১৬০৬।

১৬০৫। " কথা বলতে পারবে না" এই কথা আত্মপক্ষ সমর্থন হতে পারে, বা অন্যের প্রতি অভিযোগ হতে পারে বা অপরের জন্য ওকালতি, বা অংশ গ্রহণ করা, প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা, পরস্পর কথা বলা। এই সেই গুরুগম্ভীর দিন, যে দিন সবাইকে মহাবিচারকের সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে, যিনি সকল কিছুই অবহিত যার অপ্রতিহত ক্ষমতা ধারণারও বাইরে। সেই দিনে কোন ছল-চাতুরী বা কথার মার প্যাঁচ বা সন্দেহজনক অর্থপূর্ণ কথা বা দায় দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল বা অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা, বা অপরের দায়িত্ব নেবার প্রবণতা কিছুই কাজে আসবে না। এই সেই মহা বিচারের দিন যেদিন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বই হবে প্রধান বিচারের বিষয়।

১৬০৬। "Shaqi" যার অনুবাদ করা হয়েছে "হতভাগ্য" এবং said যার বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে ভাগ্যবান। এই শব্দদ্বয় অধ্যাত্মিক ভাবে পূর্ণ যার ব্যাখ্যা পরবর্তী চারটি আয়াতে করা হয়েছে।

১০৬। যারা হবে হতভাগ্য, তারা থাকবে আগুনে। সেখানে তাদের জন্য দীর্ঘশ্বাস ও ফোঁপানি [ব্যতীত] আর কিছু থাকবে না ১৬০৭।

১৬০৭। "Zafir" শব্দটি অনুবাদ করা হয়েছে দীর্ঘশ্বাস, কিন্তু শব্দটির প্রকৃত অর্থ গাধার ডাকের অংশ বিশেষ, গাধা ডাকের সময়ে যে গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করে সেরূপ শব্দ। "Shahiq" শব্দটি অনুবাদ করা হয়েছে "ফোঁপানি" প্রকৃত পক্ষে এই শব্দটি গাধার ডাকের অংশ বিশেষের জন্য ব্যবহৃত হয় যখন গাধা চিৎকার করার জন্য লম্বা শ্বাস নেয়। প্রকৃতপক্ষে গাধার মত একটি প্রাণী এবং তার ডাকের অনুরূপ পরিভাষা ব্যবহারের অর্থ হচ্ছে, এই সব পাপীরা যারা পৃথিবীতে দম্ভে ও অহংকারে ধরাকে সড়া-জ্ঞান করতো তারা হঠাৎ অনুধাবন করতে পারবে যে তারা কত অকিঞ্চিতকর ও ক্ষুদ্র ও বোকা। বোকার মত নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার সুযোগ তারা হেলায় হারিয়েছে। সূরা [৬৭:৭] আয়াতে "Shahiq" শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, দোযখের আগুনের প্রচন্ড গর্জন ধ্বনির পরিবর্তে।

১০৭। আল্লাহ্‌ অন্যরূপ ইচ্ছা না করলে, যতদিন আকাশ ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে ১৬০৮। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু যা পরিকল্পনা করেন তা সম্পাদন করতে [অবশ্যই] সক্ষম।

১৬০৮। "Khalidin" - এই শব্দটিকে আরবী বাগধারা মতে স্থায়ী ভাবে তথায় থাকা বোঝায়। এই আয়াতে শব্দার্থটিকে দুটি শর্তের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। (১) "যতদিন আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে।" এবং (২) "যদি না তোমার প্রতিপালক অন্যরূপ ইচ্ছা করেন।" মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে এই আয়াতের অর্থ সম্পর্কে দ্বিমত দেখা যায়। একদল মনে করেন যে দোযখের শাস্তি অনন্তকাল হবে না। কারণ বিশ্ব ব্রহ্মান্ড অনন্ত কাল থাকবে না। পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের পাপের শাস্তি কখনও অনন্তকাল হতে পারে না-তা হবে কিছুদিনের জন্য কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম দার্শনিকেরা এই মতবাদকে নাকচ করেন। তাদের ধারণা মতে বিশ্বব্রহ্মান্ডের যে উল্লেখ এখানে আছে সে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড বর্তমান বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড নয়। তা হবে নূতন সৃষ্টি যা অনন্তকাল। অবশ্য তাঁরা স্বীকার করেন যে আল্লাহ্‌র "ইচ্ছা" অসীম ক্ষমতার অধীন। পুরস্কার ও শাস্তি সেই মহাপরাক্রমশালী প্রভুর ইচ্ছার প্রতীক যা হবে অনন্তকাল ব্যপী।

১০৮। পক্ষান্তরে যারা [আল্লাহ্‌র] আশীর্বাদ প্রাপ্ত তারা থাকবে [বেহেশতের] বাগানে ১৬০৯। আল্লাহ্‌ অন্যরূপ ইচ্ছা না করলে, যতদিন আকাশ ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে; [যা হবে এক] নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার ১৬১০।

১৬০৯। উপরের যুক্তির অনুরূপ।

১৬১০। বেহেস্তের প্রশান্তি, সুখ ও শান্তি সবই হবে অবাধ, অব্যাহত। পৃথিবীর সুখ ও শান্তি অব্যাহত গতিতে চলতে পারে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যে সুখের ঠিকানা তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভরশীল হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত হঠাৎ আসে আবার হঠাৎ চলে যায়। বেহেস্তের সুখের ঠিকানা তা নয়-তা হবে বাধাহীন, একটানা, অপ্রতিহত ও অব্যহত।

১০৯। সুতারাং এসব লোকেরা যাদের উপাসনা করে তাদের সম্বন্ধে সংশয়ে থেকো না ১৬১১। তারা তো [তাদের] পূর্বে তাদের পূর্বপুরুষেরা যাদের উপসনা করতো, তা ব্যতীত অন্য কিছুর উপাসনা করে না। অবশ্যই আমি তাদের প্রাপ্য [পুরোপুরি] দিব, কিছুমাত্র কম না করে ১৬১২।

১৬১১। তাদের মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা কোনও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ছিল না, তা ছিল শুধুমাত্র পূর্বপুরুষদের রীতি বা প্রথা।

১৬১২। তাদের ধর্ম বিষয়ে তাদের এসব হাস্যকর অনুষ্ঠানের পূর্ণ হিসাব আল্লাহ্‌ গ্রহণ করবেন এবং ভবিষ্যতে তারা তাদের পূর্ণ পরিণতি লাভ করবে।

রুকু - ১০

১১০। অবশ্যই আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে মতভেদ ঘটলো। তোমার প্রভুর পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে, ১৬১৩ ওদের মধ্যে মীমাংসা হয়ে যেতো। তারা কিন্তু এ সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে ১৬১৪ ।

১৬১৩। দেখুন সূরা [১০:১৯] আয়াতে। পূর্ববর্তী ঐর্শী গ্রন্থ এবং এর প্রত্যাদেশকে অবহেলা ভরে দেখার অবকাশ নাই, কারণ ঐ প্রত্যাদেশসমূহ আল্লাহ্‌রই প্রত্যাদেশ, তবে প্রত্যাদেশের যারা ধারক তারা তা বিকৃত করে ফেলেছে, ফলে তা আধ্যাত্মিক মূল্যায়নের দিক থেকে তার উৎকর্ষতা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের বিকৃত করার কারণ হচ্ছে তাদের মতবিরোধ এবং কলহ। আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে পূববর্তী ঐশী গ্রন্থসমূহকে একই পতাকাতলে সমবেত করতে পারতেন, তাদের বিবাদ বিসংবাদ মীমাংসা করে দিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা হচ্ছে তার বাণী ও আদেশ সমূহ নূতন ভাবে পূণঃনবীকরণ ইসলামের মাধ্যমে যেনো পরবর্তী নূতন প্রজন্ম বহু বছরের কুসংস্কার ও বাঁধা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নূতনভাবে শুরু করতে পারে।

১৬১৪। দেখুন সূরা [১১:৬২] আয়াতে। পৃথিবীতে সর্বদা নূতন ও পুরাতনে বিরোধ লেগেই থাকে। যারা নূতন তারা সর্বদা পুরাতন অন্ধ সংস্কারের জীর্ণ খাঁচা ভেঙ্গে নূতন সূর্যালোকে অবগাহন করতে আগ্রহী। এই-ই পৃথিবীর নিয়ম, ধর্মের ব্যপারেও ঠিক সেই একই ধারা প্রবাহিত। ইসলামের আলো ছিলো সেই প্রভাতের নূতন সূর্যালোকের মত, যার রহমতের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করে নূতনেরা পুরাতনের জীর্ণ-শীর্ন বিকৃত কঙ্কালটাকে ত্যাগ করে। কারণ ইসলাম ছিল যুগের উপযোগী, সময় ও পারিপর্শ্বিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । এর ফলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের লোকেরা নূতন ধর্মবিশ্বাসের প্রতি শুধুমাত্র যে সন্দেহ প্রবণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তাই-ই নয় তারা এর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার সম্বন্ধেও সন্দিহান হয়ে পড়লো। পূর্ববর্তী কিতাব ধারী জাতিরা ইসলামের জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গীকে নৈতিকতা বিরুদ্ধ মনোভাবের সাথে প্রত্যক্ষ করলো এবং সন্দিগ্ধ ও দ্বিধাগ্রস্থ হলো।

১১১। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু সকলকে তাদের কাজের [পূর্ণ প্রতিদান] পরিশোধ করবেন। কারণ তিনি ভালোভাবেই জানেন তারা যা করে ১৬১৫।

১৬১৫। দেখুন পূর্ববর্তী আয়াত সূরা [১১:১০৯] আয়াতে। এই আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াতের [১১:১০৯] সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই দুইটি আয়াতেই কর্মফল বা প্রাপ্য পুরোপুরি দেবো-বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই বাক্যটি দ্বারা পরবর্তী আয়াতের দিকে অনুপ্রেরণা দান করা হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে নূতন প্রত্যাদেশের প্রতি দৃঢ়ভাবে নিবেদিত থাকতে।

১১২। সুতারাং তোমাকে যে ভাবে আদেশ করা হয়েছে তাতে [সরল পথে] দৃঢ়ভাবে অবস্থান কর, তুমি এবং তোমার সাথে যারা [আল্লাহ্‌র প্রতি] ঈমান এনেছে [সকলেই]। [সঠিক পথ থেকে] সীমালংঘন করো না। তোমরা যা কর তিনি তা ভালোভাবেই দেখেন।

১১৩। যারা পাপ করে তাদের দিকে ঝুকে পড়ো না তাহলে অগ্নি তোমাকে পাকড়াও করবে। এবং [এ অবস্থায়] তুমি আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোন রক্ষাকারী পাবে না। তোমাকে কোন সাহায্যও করা হবে না।

১১৪। এবং দিবসের দুই প্রান্তভাগে ১৬১৬ এবং রজনীর প্রথমভাগে সালাত কায়েম কর ১৬১৭। কারণ যা ভালো তা অবশ্যই মন্দকে দূরীভূত করে ১৬১৮। যারা [তাদের প্রভুকে] স্মরণ করে এটা তাদের জন্য এক উপদেশ।

১৬১৬। "দিবসের দুই প্রান্তভাগ"- অর্থাৎ দিবসের প্রথম প্রান্তভাগ ফজরের সালাত। ফজর শুরু হয় উষা লগ্নে-ভোরের প্রথম আলোর সাথে, সুবে সাদেকের সময়ে-সূর্যদয়ের পূর্ব পর্যন্ত। এই প্রার্থনার প্রধান উদ্দেশ্য সুবে সাদেকে শয্যা ত্যাগ করে, দিনের সকল কাজের প্রারম্ভে সর্বপ্রথম কাজ হবে মহান স্রষ্টার কাছে আত্মনিবেদনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচী শুরু করা। দ্বিতীয় প্রান্ত শুরু হয় মধ্যাহ্নের পরপরই সে সময়ে জোহরের নামাজের সময় হয়। অর্থাৎ বিকালের প্রথম ভাগের প্রার্থনাকে বলে জোহরের নামাজ। এ সময়ে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক র্কমে ব্যস্ত থাকি-কিন্তু তার মাঝেই আল্লাহ্‌কে স্মরণ করার হুকুম। ফজর ও জোহরের সময় সম্বদ্ধে পন্ডিত ব্যক্তিদের কোনও মতদ্বৈত নাই। তাঁরা সকলেই একমত যে ফজরের নামাজ উষলগ্নে সূর্যদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়। আর জোহরের নামাজ বিকালের প্রথম অংশে আদায় করতে হবে। কিন্তু মতদ্বৈত আছে দিবসের শেষ অংশ নিয়ে। আছর ও মাগরিবের সালাতের মধ্যে।

১৬১৭। রজনীর প্রথমাংশে "Zulafun" বহু বচনে "Zulfatun" অর্থাৎ অগ্রসরমান, কোনও কিছু হাতের কাছে আসা। পরবর্তীতে বহুবচনে দুই এর অধিক সংখ্যাকে বোঝানো হয়। এই আয়াতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। সুতারাং স্বাভাবিকভাবেই রজনীর প্রথমাংশে কথাটি দুই এর অধিক কমপক্ষে তিনটি সময় বোঝাবে। এই তিনটির মধ্যে মধ্যাহ্নের শেষ ভাগে আছরের নামাজ, সূর্যাস্তের পর পরই গোধূলীতে মাগরিবের নামাজ, এবং রাত্রির প্রথমভাগে যখন সূর্যের বিকিরীত আভাস আকাশের বুক থেকে বিলিন হয়ে যায়, তখন এশার সময় হয়। যখন ঘুমের পূর্বে আল্লাহ্‌র বান্দা-দিনশেষের আত্মনিবেদনের মগ্ন হবে নামাজে। আছর, মাগরিব ও এশা এই তিনটি নামাজের সময়কে "রজনীর প্রথমাংশের" বাক্যটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। এই পাঁচটি সময় ইসলামে নামাজের বা প্রার্থনার সময় বলে ধার্য।

১৬১৮। "যা ভালো" এই কথাটি সাধারণভাবে নামাজের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এই বাক্যটির দ্বারা আল্লাহ্‌ সংসারের যাবতীয় ভালো কাজের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেমন : ভালো চিন্তা, ভালো কথা, ভালো কাজ ইত্যাদি যা কিছু কল্যাণকর সবই এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। জগৎ সংসারে মন্দের প্রভাব অত্যন্ত তীব্র। এই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার একমাত্র উপায় ভালোর সাধনা করা-কর্মে, চিন্তায়, বাক্যে, ভালো থাকার জন্য একান্তভাবে প্রার্থনার বা নামাজের মাধ্যমে সেই বিশ্ব বিধাতার কাছে আবেদন জানাতে হবে তবেই "ভালো" দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে। শুধু তখনই অতীতের কালিমা, বর্তমানের প্রলোভন মুক্ত হয়ে ভবিষ্যতের সুখী, নিরাপদ শান্তিময় ও পূণ্যময় জীবনের ঠিকানায় পৌছানো যায়।

১১৫। ধৈর্য ধারণে স্থির সংকল্প হও। কারণ আল্লাহ্‌ পূণ্যাত্মাদের পুরস্কার নষ্ট করেন না।

১১৬। তোমাদের পূর্বের প্রজন্মের যাদের আমি [অনিষ্ট থেকে] রক্ষা করেছিলাম, তাদের মধ্যে অল্প কতক ব্যতীত ১৬১৯ কোন বিচক্ষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ লোক ছিলো না যারা [মানুষকে] পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাতে নিষেধ করতো । ১৬২০ কিন্তু পাপীরা জীবনের সুখ ও স্বাচ্ছন্দের পশ্চাদধাবন করতো এবং পাপে নিমগ্ন থাকতো।

১৬১৯। "Baqiyat"- অর্থ চরিত্রের স্থায়ী গুনাবলী যা জীবনের চলার পথে দুর্যোগ বা দুর্বিপাকে হারিয়ে যায় না। সাধারণ মানুষ অনুকূল পরিবেশে ভালো মানুষ, যারা সমাজের সাধারণ নিয়ম কানুন মেনে চলে। তাদের চরিত্রবান ও সৎ গুণ সম্পন্ন মানুষ বলেই বিভ্রম ঘটে। কিন্তু যখনই তারা প্রতিকূল পরিবেশ বা প্রলোভনের সম্মুখীন হয়। তখনই তাদের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন দেখা দেয়। সময়ের স্রোতে তারা গা ভাসিয়ে দেয়। যে ব্যক্তি চাকচিক্যময় পৃথিবীর প্রলোভন, আনন্দ-ফুর্তির মাঝে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে ; সময়ের দাবীতে অসৎ ও দুর্নীতি পরায়ণ কাজ যদি কোনও সমাজে প্রচলিত রীতি হয় (যেমন বাংলাদেশের সমাজ) তার বিরুদ্ধে যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখে। শত অনাচার, অত্যাচার যার চরিত্রের গুণাবলীর বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়-সেই হচ্ছে "সজ্জন ব্যক্তি" যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাতে নিষেধ করতো।" অর্থাৎ জাতিকে নেতৃত্বদানে আহবান করে। যদি কোনও জাতি সৌভাগ্যবান হয়, শুধুমাত্র তখনই সে এরূপ গুণান্বিত নেতার নেতৃত্বলাভে সক্ষম হয়। ক্ষয়িষ্ণু ও ধ্বংসের মুখোমুখি কোনও জাতিকে শুধু এ রকম নেতাই পারে রক্ষা করতে। এরূপ নেতার অভাব বা দূর্নীতিপরায়ণ জাতি যখন এরূপ গুণসম্পন্ন নেতাকে অস্বীকার করে তখনই একটা জাতির ধ্বংস নেমে আসে যেমন প্রাচীন যুগে বহু জাতির ভাগ্যে ঘটেছে।

১৬২০। যখন কোনও সমাজ দুর্নীতি, অনাচার, অবিচার ও পাপে নির্মজ্জিত হয়ে যায়, তখনও যারা উজ্জ্বল ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী থাকে, তাদের হয় অত্যন্ত দুর্দ্দিন। সে সময় আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা তাঁদের সমাজের পঙ্কিল স্রোত থেকে রক্ষা না করলে তাঁরা সমাজের পাপীদের দ্বারা ধবংস হয়ে যেতো, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ব্যতীত তারাও হয়তো পাপের পঙ্কে ডুবে যেতো বা দুর্যোগ দুর্বিপাক তাদের দিশাহারা করে ফেলতো।

১১৭। যদি কোন সম্প্রদায় সংশোধিত হতে চায়, তবে তোমার প্রভু এমন নন যে, তাদের একটি মাত্র পাপের জন্য তাদের ধ্বংস করবেন ১৬২১ ।

১৬২১। এই আয়াতটির ব্যাখ্যা সম্বন্ধে মতদ্বৈত আছে। "Baidhawi" এর মত অনুসারে "Zulmin" আরবী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে "একটি মাত্র পাপ কাজের" পরিবর্তে । তাঁর মতে এই একটি মাত্র পাপ কাজ হচ্ছে "শেরেক"।

১১৮। তোমার প্রভু যদি ইচ্ছা করতেন তবে তিনি মনুষ্য সম্প্রদায়কে এক জাতিতে পরিণত করতে পারতেন ১৬২২। কিন্তু তারা মতভেদ থেকে বিরত থাকবে না, -

১৬২২। দেখুন সূরা [১০:১৯] আয়াত। যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করতেন সারা বিশ্বের মানুষ মিলে এক জাতিতে পরিণত হতে পারতো। যেমন আমরা প্রাণীকূল ও উদ্ভিদ জগতে দেখি, সমস্ত পৃথিবীতে তারা একই। যেমন : গরু একটি প্রাণী, যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন উচ্চতা ও রং এর গরু দেখা যায়, কিন্তু তাদের সকলের প্রকৃতি ধর্ম-এক এবং কোনও পার্থক্য নাই। মানুষও এরকম হতে পারতো। কিন্তু আল্লাহ্‌ মানুষকে সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করার ফলে মানুষের চাওয়া, পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এই পার্থক্যের জন্যই প্রতিটি মানুষ একক, স্বতন্ত্র। তবে এই স্বাতন্ত্রতা তাদের জন্য কোনও পাপের কারণ হতো না, যদি তারা একান্তভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবেদিত থাকতো। কিন্তু স্বার্থপরতা, নৈতিক অধঃপতন, মতদ্বৈত, কলহ, বিবাদ-বিসংবাদ, হিংসা, দ্বেষ, লোভ, অন্যায় প্রভৃতি পাপ তাদের ঘিরে ধরে। তাদের ইচ্ছাশক্তিকে বিপথে চালিত করে। শুধু মাত্র তারাই এ থেকে রেহাই পেতে পারে যারা আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র মানুষকে প্রেরণের একটাই উদ্দেশ্যে, আর তা হচ্ছে, পৃথিবীর জীবন যাপন প্রণালীর মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি সাধন করা ও আল্লাহ্‌র করুণার যোগ্যতা লাভ করা। কিন্তু মানুষ যদি পাপের পথকে পরিহার না করে পাপে নিমজ্জিত হয় তবে আল্লাহ্‌র শাস্তি অবধারিত, তার ন্যায় বিচারে বিপথগামী মানুষ ও জ্বিনের দ্বারা দোযখ পূর্ণ হয়ে যাবে।

১১৯। তারা ব্যতীত, যাদের উপরে তোমার প্রভুর অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে। এবং তিনি তাদের এজন্যই সৃষ্টি করেছেন। "আমি জ্বিন ও মানুষ দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই,"-তোমার প্রভুর এ কথা পূর্ণ হবেই ১৬২৩ ।

১৬২৩। দেখুন সূরা [৭:১৮,১৭৯] আয়াত। এই পৃথিবীতে যদি কেউ শয়তানের দ্বারা প্রলোভিত হয়ে পাপের পথে পা বাড়ায়, ন্যায় ও সততার পথ পরিহার করে, তবে তার দায় দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হবে। যে অসৎ বা পাপের পথে ধাবিত হয় তার দায়িত্ব গ্রহণ করে শয়তান, যে তাকে প্রলুদ্ধ করে । সুতারাং তারা দুজনেই শাস্তির সম অংশীদার।

১২০। রাসুলদের কাহিনী আমি তোমার নিকট বর্ণনা করেছি, যার দ্বারা আমি তোমার চিত্তকে দৃঢ় করি। এর মাধ্যমে তোমার নিকট সত্য প্রকাশ হয়েছে এবং যারা মুমিন তাদের জন্য আছে উপদেশ ও স্মারক বাণী ১৬২৪ ।

১৬২৪। আল্লাহ্‌র প্রেরিত নবী রসুলদের কাহিনী শুধুমাত্র ঘটনা বা ইতিহাসের সংরক্ষণ নয়। এই আয়াতে বলা হয়েছ এই সব আল্লাহ্‌র প্রেরিত দূতদের মাধ্যমে যুগে যুগে আল্লাহ্‌ তিনটি বিষয়ে শিক্ষাদান করেছেন : (১) তাদের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ সর্ব্বোচ্চ আধ্যাত্মিক "সত্যকে" শিক্ষা দিয়েছেন; (২) তাঁরা "উপদেশ" "নির্দ্দেশ" এবং "সাবধান বাণীর" মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীতে চলার পথের নির্দ্দেশনা দান করেছেন; এবং (৩) তাঁরা আমাদের বিবেককে জাগরিত করে দৈনন্দিন মানব জীবনে আল্লাহ্‌র আইনের প্রয়োগের দিকে আহবান করেছেন। আল্লাহ্‌র নৈতিক আইন মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবেককে জাগরিত করতে সাহায্য করে।

১২১। যারা অবিশ্বাসী তাদের বল, "তোমাদের যা ইচ্ছা কর; আমরা আমাদের কাজ করবো।" ১৬২৪-ক

১৬২৪-ক। দেখুন সূরা [১১:৯৩] আয়াতে এবং সূরা [৬:১৩৫] আয়াতে এবং টিকা নং ৯৫৭। অবিশ্বাসীদের সর্বোচ্চ চেষ্টাও আল্লাহ্‌র পরিকল্পনাকে বানচাল করতে অক্ষম। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবেই। সুতারাং যারা বিশ্বাসী তাদের কর্তব্য হবে আল্লাহ্‌ তাঁর প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আমাদের প্রতি যে কর্তব্য আরোপ করেছেন তা পূর্ণ করা।

১২২। "তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও অপেক্ষা করছি।" ১৬২৫

১৬২৫। দেখুন সূরা [১১:৯৩] আয়াত এবং এর টিকা নং ১৫৯৫ ও সূরা [১০:১০২] আয়াত এবং এর টিকা নং ১৪৮৪। যারা অবিশ্বাসী ও অসৎ "প্রতীক্ষা" তাদের মনস্কামনা পূর্ণ করবে না, তাদের "প্রতীক্ষা" তাদের সামনে আল্লাহ্‌র পরিকল্পনার বাস্তবায়িত রূপকে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করবে। অপরপক্ষে বিশ্বাসীদের "প্রতীক্ষা" তাঁদের বিশ্বাসের ভিত্তিকে আরও দৃঢ় ও সম্পূর্ণ করবে, কারণ তাঁরা জানে আল্লাহ্‌ দয়ালু এবং ভালো; সত্য এবং ন্যায়।

১২৩। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য [ও গুপ্ত] বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ্‌র অধিকারে। এবং তাঁর নিকটেই [সিদ্ধান্তের জন্য] সকল বিষয় প্রত্যানীত হবে। সুতারাং তাঁর এবাদত কর এবং তোমার আস্থা তাঁর উপরে স্থাপন কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে তোমার প্রভু অমনযোগী নন। ১৬২৬

১৬২৬। দেখুন সূরা [২:২১০] আয়াত। পৃথিবী ও বিশ্ব ভূবনে, দৃশ্য-অদৃশ্য; প্রকাশ্য-গোপন সব কিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহ্‌র। সব কিছুই আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ও পরিকল্পনার অধীন। সুতারাং আমরা ক্ষুদ্র মানব সন্তানের শুধুমাত্র তাঁরই "ইবাদত" করা উচিত তাঁর উপরেই একমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করা প্রয়োজন। "ইবাদত" কথাটি ব্যপক অর্থবোধক। "ইবাদত" শব্দটি শুধু মাত্র 'নামাজ' 'রোজা' 'হজ্ব' 'যাকাতের' মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। "ইবাদত" শব্দটি ব্যক্তির সর্বসত্তা ব্যপী সর্ব জীবন ব্যপী, সর্ব অবয়ব ব্যাপী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সাধনা। যথা : (১) "ইবাদতের" অর্থ আল্লাহ্‌কে বুঝতে চেষ্টা করা, তাঁর উপস্থিতি সর্বদা নিজের মধ্যে অনুভব করা;
(২) সেই বিশ্ব বিধাতার মহত্ব, দয়া, অনুগ্রহ অনুভব করা নিজের আত্মার মাঝে। তাঁর ইচ্ছাই যে আমাদের শেষ পরিণতি এই অনুভূতি অর্জন করা।
(৩) শয়নে, জাগরণে-স্বপনে জীবনের সকল অবস্থায় তাঁকে স্মরণ করা। তাঁরই প্রশংসা করা, আমাদের সকল কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। (৪) আল্লাহ্‌র ইচ্ছাকে অনুধাবন করা ও আমাদের সকল ইচ্ছাকে সেই বিশ্ব বিধাতার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ অর্থাৎ তার শুধুমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য তাঁর আইনকে মেনে চলা, আল্লাহ্‌র রাস্তায় কাজ করা, তাঁর সৃষ্টির সেবা করা। বিশ্বাস, আনুগত্য ও আন্তরিকতা হবে এই কাজের মানদম্ভ। (৫) নিজেকে রীপুর দংশন থেকে রক্ষা করে, চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করা যেনো বিশ্ব-বিধাতার হেদায়েতের আলো পরিশুদ্ধ আত্মার মাঝে প্রবেশের সুযোগ লাভ করে । রীপুকে স্ববশে আনার সাধনা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সাধনা যা সারা জীবন ব্যপী এক এবাদত।