Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৬ জন
আজকের পাঠক ১৮ জন
সর্বমোট পাঠক ৭২৬৪১৮ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৯৯৫৬৪ বার
+ - R Print

সুরা নাহল


সুরা নাহল বা মৌমাছি-১৬

১২৮ আয়াত, ১৬ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]


ভূমিকা :

ক্রমপঞ্জি অনুসারে এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ সূরাগুলির মধ্যে শেষ দিকে অবতীর্ণ হয় তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম হচেছ আয়াত ১১০ এবং তার পরবর্তী আয়াত সমূহ। এ ব্যাপারে সময়ের ক্রমপঞ্জি গুরূত্বপূর্ণ নয়। এই সূরার বিষয়বস্তুর সার সংক্ষেপ হচেছ মানুষের সাথে আল্লাহ্‌র আচরণ, যা নূতন আঙ্গিকে এই সূরাতে প্রকাশ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ মানুষের মাঝে আত্মপ্রকাশ করেন তার সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপে এবং মানুষের জীবনের মাধ্যমে তার মাহত্ব প্রকাশ পায়। নূতন বিষয় হচেছ অনুধাবন করা যে, প্রকৃতিকে অনুধাবনের মাঝে আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা ইত্যাদির স্বাক্ষর মেলে।

সার সংক্ষেপ :


সৃষ্টির সব কিছু আল্লাহ্‌র মহত্ব ঘোষণা করে। মানুষকে আল্লাহ্‌ প্রকৃতির উপরে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছেন। যেনো সে প্রাকৃতিক জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র একত্বকে অনুধাবন করতে পারে। (১৬:১-২৫)

আল্লাহ্‌র প্রেরিত রাসূলদের শিক্ষা থেকে মানুষ বিচ্যুত হবে না, কারণ আল্লাহ্‌ তাদের প্রেরণ করে থাকেন মানুষকে সত্য এবং একত্ববাদ শিক্ষা দেবার জন্য। সকলকে সৃষ্টি করা হয়েছে এক আল্লাহ্‌র এবাদত করার জন্য। (১৬:২৬-৫০)

আল্লাহ্‌র রহমত এবং মানুষের অকৃতজ্ঞতাকে তুলনা করা হয়েছে। তার করুণার নিদর্শন হচেছ জলভারে ভরা মেঘ যা বর্ষণ করে, গাভী যা মানুষকে দুগ্ধ দান করে, মৌমাছি যা মানুষকে মধুর যোগান দেয়, পারিবারিক জীবনে স্নেহের বন্ধন এবং সামাজিক জীবনের সুখ ও শান্তি সর্বোপরি সভ্যতার উৎকর্ষতা ও তার ফলে বিলাসী ও আরামদায়ক জীবনের প্রতিশ্রুতি। (১৬:৫১-৮৩)

যারা সত্যকে অস্বীকার করে, সত্যের প্রচারক বা আল্লাহ্‌র রাসুলরা শেষ বিচারের দিনে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবেন। আল্লাহ্‌ আমাদের বিশ্বাস ও কর্মের বিচার করবেন। (১৬:৮৪-১০০)

কোর-আণ অভ্রান্ত সত্য যা সত্যপথে চলার পথ নির্দেশ দান করে। বিশ্বাস কর এবং জীবনকে সৎ ও সুন্দর পথে পরিচালিত কর। ইব্রাহীমের উদাহরণ অনুসরণ কর। বিশ্বাস ও ন্যায়ানুনাগে অটল হও এবং সৎ কাজ কর। (১৬:১০১-১২৮)


সুরা নাহল বা মৌমাছি-১৬

১২৮ আয়াত, ১৬ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]


০১। আল্লাহ্‌র আদেশ (অবশ্যই)আসবেই ২০১৯ সুতরাং তুমি তা ত্বরান্বিত করতে যেও না। তিনি মহিমান্বিত এবং ওরা যে সব অংশীদারিত্ব (আল্লাহ্‌র প্রতি) আরোপ করে তিনি তা থেকে বহু উর্দ্ধে!

২০১৯: অর্থাৎ এই আয়াতটি মোশরেকদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের উত্তর হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। মোশরেকরা প্রায়ই এভাবে বিদ্রূপ করতো যে, "যদি তোমাদের দাবী অনুযায়ী সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব থাকে, যিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে তিনি বিপথগামীদের শাস্তি দান করেন না কেন?'' এই আয়াতটি এসব বিপথগামী মোশরেকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে, " আল্লাহ্‌র আদেশ আসবেই।''যখন সে আদেশ আসবে তখন পাপীরা ইচছা পোষণ করবে সে আদেশ বিলম্ব করার জন্য, কিন্তু হায়, তখন তা সম্ভব হবে না। নিশ্চয় পাপীরা নিতান্ত অবোধ, কারণ তারা আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও করূণা পাওয়ার যে সময় পায় তা শেষ করার জন্য আবেদন করে।

০২। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচছা স্বীয় আদেশসহ ওহী প্রেরণ করেন (এ বলে যে): "মানব সম্প্রদায়কে সাবধান কর এই বলে যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। সুতরাং আমার প্রতি তোমাদের কর্তব্য কর।'' ২০২০

২০২০: মোশরেক বা প্যাগানরা বহু দেব দেবীতে বিশ্বাসী। তারা বিভিন্ন উপাস্যের উপাসনা করে- এসব দেব - দেবী কেউ ভালোর কেউ মন্দের প্রতীক, কেউ সৃষ্টি, কেউ ধ্বংসের প্রতীক। এ সব দেব - দেবীরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি শক্রুভাবাপন্ন রূপে কল্পনা করা হয়। বহু ঈশ্বরের পূজার ফলে মোশরেকদের মনের শান্ত ও অচঞ্চল অবস্থা নষ্ট হতে বাধ্য। কারণ ধর্মকে তারা আচার অনুষ্ঠান সম্বলিত হাস্যষ্কর বস্তুতে পরিণত করে; যার সাথে মন বা আত্মার কোনও যোগসূত্র থাকেনা। ফলে এসব লোক আল্লাহ্‌র একত্ববাদকে অনুধাবনে সক্ষম নয়। বিশ্ব চরাচর আল্লাহ্‌র একত্বের স্বাক্ষর বহন করে। বিরাট বিশ্ব জগত আল্লাহ্‌র ক্ষমতার স্বাক্ষর। সৃষ্টির সকলেই সেই এক আল্লাহ্‌র আইনের অধীনে তারই গুণগানে ব্যস্ত, এই সহজ সত্যকে অনুধাবনে মোশরেকরা হয় ব্যর্থ। তিনিই একমাত্র পূজ্য এবং সকল কর্ম তার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।

০৩। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীকে তিনি যথাযথ ভাবে সৃষ্টি করেছেন ২০২১। ওরা আল্লাহ্‌র প্রতি যে অংশীদারিত্ব আরোপ করে, তিনি তার বহু উর্দ্ধে।

২০২১: "যথাযথ ভাবে'' এই শব্দটি দ্বারা যে ভাব প্রকাশ করা হয়েছে তা হচেছঃ এই বিশাল বিশ্বভুবন সৃষ্টি আল্লাহ্‌র কোন খেয়াল খুশী, বা লীলা খেলা বা আকস্মিক কিছু নয়। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে এই বিশাল বিশ্বভুবনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথারই সমর্থন মেলে আয়াত (১৫:৮৫) এবং আয়াত (২১:১৬) তে। সারা বিশ্ব ভুবনে, গ্রহনক্ষত্রে, বিশ্ব চরাচরে এক আল্লাহ্‌র আইন বিদ্যমান। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখি পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র, রসায়ন বিজ্ঞানের সূত্র, উদ্ভিদ জগতে, প্রাণী জগতে সর্বত্র একই নিয়ম চালু বা সকলে প্রকৃতির একই আইনের অধীনে পরিচালিত। এ সকলেই নির্দ্দেশ করে যে, সকল বিশ্ব চরাচরের সব কিছু একই স্রষ্টার সৃষ্টি। বিভিন্ন স্রষ্টার সৃষ্টি হলে তাদের পরিচালনার আইনও বিভিন্ন হতে বাধ্য হতো। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু বিশ্ব প্রকৃতিতে কোথাও অনিয়ম নাই। সর্বত্র শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়
বর্তমান।

০৪। তিনি মানুষকে শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছেন; অথচ দেখ! সেই একই (মানুষ) প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী ২০২২।

২০২২: মানুষের জন্ম বৃত্তান্ত অত্যন্ত হীন ও ক্ষুদ্র। সেই মানব যখন সম্পদ শালী হয়ে ওঠে, সে প্রকাশ্যে তার স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। এই অস্বীকারের ফলে সে জীবনের উচচতর ও মহত্বর দিকের সন্ধান লাভে হয় ব্যর্থ।

০৫। গৃহপালিত পশু যা তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন ২০২৩। তোমরা তা থেকে লাভ কর উষ্ণতা এবং আরও বহুবিধ উপকার এবং তাদের (গোশ্‌ত) ভক্ষন কর। ২০২৪

২০২৩: 'আন্‌-আম' অর্থাৎ প্রাণী জগৎ বা পশু। মানুষের প্রয়োজনে, তার আরাম-আয়াসের জন্য এই পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তুকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পরবর্তী আয়াত সমূহে সে সম্বন্ধেই বলা হয়েছে।

২০২৪: এই আয়াতে বর্ণনা আছে প্র্রাণী জগত মানুষের যে উপকারে লাগে তার। শীত নিবারক উপকরণ যথা: পশম, চামড়া, চুল ইত্যাদি। উটের চামড়াতে সুন্দর আরামদায়ক শীত নিবারক বস্তু, কম্বল তৈরি হয়। এক ধরনের ছাগলের চামড়া থেকে অনুরূপ জিনিস তৈরি হয়। ভেড়ার পশমের উল ও গরম কাপড় তৈরির জন্য ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এ ছাড়া বহু লোমশ প্রাণী আছে যাদের চামড়া ব্যবহার করা হয় পোষাক, কম্বল ও বিছানা তৈরির জন্য। আমাদের পাদুকার ও ব্যাগের জন্য চামড়ার ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এসব পশুর অনেকেরই স্ত্রী প্রাণী থেকে আমরা দুগ্ধ পেয়ে থাকি যা সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে পরিগণিত হয়- এবং অতীব সুখাদ্য। অনেক প্রাণীর মাংস আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রাণী জগতের আরও বহুবিধ অবদান নীচের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

০৬। এবং যখন তোমরা সন্ধ্যাবেলা তাদের (চারণ ভূমি থেকে) গৃহে ফিরিয়ে আন; এবং সকালে যখন উহাদের চারণভূমিতে নিয়ে যাও তখন তোমাদের হৃদয়ে অহংকার বোধ হয় ২০২৫।

২০২৫: একজন ভালো কৃষক তার পশু সম্পদের জন্য গর্ব অনুভব করে। যখন পশুপাল তৃণভুমিতে সকালে যায় ও সন্ধ্যায় গোচারণ ভূমি থেকে ফিরে আসে - তা দর্শনে কৃষকের মনে তার প্রাচুর্য ও ক্ষমতা সম্বন্ধে গর্ব হয়। পশুপালের সৌন্দর্য ও বশ্যতা তাকে করে বিমোহিত। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তাকে যে সম্পদ দান করেছেন সে সম্বন্ধে তার প্রচছন্ন গর্ব সে উপভোগ করে। মানুষ কি তার সর্ব অনুভব সেই ক্ষুদ্র সম্পদের মধ্যেই আবদ্ধ রাখবে? সে কি জীবনের বৃহত্তর মহত্তর দিক অনুভব করতে চেষ্টা করবে না? যে স্রষ্টা তার পার্থিব সম্পদকে সৃষ্টি করে দিয়েছেন - তাকে কি সে অনুভব করতে চেষ্টা করবে না?
০৭। এবং উহারা তোমাদের ভারী মাল বহন করে নিয়ে যায় দেশে দেশে, (অন্যথায়) প্রাণান্তকর ক্লেশ ব্যতীত তোমারা সেখানে পৌঁছুতে পারতে না ২০২৬। অবশ্যই তোমার প্রভু পরম দয়াময়, পরম করুণাময়।


২০২৬: পশু সম্পদের আরও বিবিধ প্রয়োজনীতা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা ভার বহন করে। পূর্বে একস্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত চলাচলের জন্য পশুর ব্যবহার ছিলো একমাত্র বাহন। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। যদি পণ্য বা ভারী বস্তু মানুষকে নিজে বহন করতে হতো। তা হলে মানুষকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে হতো। শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি নূতন দেশে, সামাজিক মেলামেশা ও জীবন সম্বন্ধে উচচতর ধারণা অনুধাবনে অক্ষম হয়ে পড়তো। শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম,বিজ্ঞান, বাণিজ্য প্রভৃতি মনের বিভিন্ন দিগন্ত তার সম্মুখে উম্মোচিত হতো না। মানুষের মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে আল্লাহ্‌র রহমত ও করূণার ফলে। কারণ তিনিই তো মানুষের জীবনধারাকে নিত্যনূতন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের মাধ্যমে সহজতর করেছেন।

০৮। এবং (তিনি সৃষ্টি করেছেন) অশ্ব ও খচচর এবং গাধা তোমাদের আরোহণের জন্য এবং প্রদর্শনের জন্য ২০২৭। এবং তিনি সৃষ্টি করেন (আরও) বস্তু সামগ্রী যাদের সম্বন্ধে তোমাদের কোনও জ্ঞান নাই ২০২৮।

২০২৭: ভারবাহী পশু যথা: ঘোড়া, খচচর, গাধা ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন দূর থেকে দূরান্ততে যাত্রা সহজ করার জন্য, আরোহণের জন্য। শুধু তাই নয় এদের মধ্যে কিছু সৃষ্টি করেছেন যারা অত্যন্ত উত্তম, যা মনিবের জন্য সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য এসব পশুকে সুসজ্জিত করা হয়। যেমন: ঘোড়া, হাতী ইত্যাদি।

২০২৮: পরিবহনের ইতিহাস সম্বন্ধে যারা জ্ঞাত, তারা জানেন যুগে যুগে সময়ের আবর্তনে মানুষের পরিবহনের ঘটেছে রূপান্তর। এই রূপান্তর যেমন চমকপ্রদ তেমনই আশ্চর্যজনক। অশিক্ষিত ভারবাহী প্রাণী থেকে শুরু হয় পরিবহনের চমকপ্রদ ইতিহাস। বর্তমান যুগে আমরা পরিবহন বলতে বুঝি বাস, কোচ, ট্রাক, রেল, পাতাল রেল, মোটর লরি, প্লেন, জাহাজ, ষ্টীমার ইত্যাদি। সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন সময়ে এই সব বিভিন্ন পরিবহনের উদ্ভব ঘটেছে। কেউ জানে না এর শেষ কোথায়? ভবিষৎতের মানুষ পরিবহনের হয়তো নূতন কিছু আবিস্কার করবে যা বর্তমানের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনা। মানুষকে আল্লাহ্‌ এই আবিস্কার করার ক্ষমতা দান করেছেন। অর্থাৎ মানুষের এই বিশেষ ক্ষমতা আল্লাহ্‌র নেয়ামত স্বরূপ। ভবিষৎতে আল্লাহ্‌ মানুষের মাধ্যমে পরিবহনের আর কি উদ্ভাবন করবেন তা বর্তমানের মানুষ জানেনা। একথাকেই বলা হয়েছে," তিনি সৃষ্টি করেন (আরও) বস্তু সামগ্রী যাদের সন্বন্ধে তোমাদের কোনও জ্ঞান নাই।''

০৯। সরল পথ আল্লাহ্‌র দিকে পরিচালিত করে, কিস্তু পথগুলির মধ্য বক্রপথও আছে। আল্লাহ্‌ যদি ইচছা করতেন তবে তিনি সকলকেই সৎ পথে পরিচালিত করতে পারতেন। ২০২৯

২০২৯: এই পার্থিব জীবন, হাসি, কান্না, ভালোবাসা, হিংসা-দ্বেষ,লোভ-লালসা, এ সব মিলেই আমাদের পৃথিবীর জীবন। সংসার ত্যাগ করে বনে গিয়ে আল্লাহ্‌কে পাওয়ার এবাদত ইসলাম স্বীকার করে না। এই পার্থিব জীবনের মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়ার সাধনাই হচেছ ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু যারা ঘোর সংসারী তারা পৃথিবীর জীবনের উর্দ্ধে আধ্যাত্মিক জীবনকে কল্পনাও করতে পারে না। তারা পার্থিব বিষয়বস্তুতে এতই মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে যে তাদের চিন্তা বা ধ্যানে পরলোকের চিন্তা স্থান পায়না। আল্লাহ্‌ ইচছা করলে মানুষকে "সীমিত স্বাধীন ইচছা শক্তি'' দান না করলেও পারতেন। তাহলে ফেরেশতা বা অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীজগতের মত তাকে পরকালে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হতোনা। কিন্তু স্রষ্টার পরিকল্পনা হচেছ মানুষের ইচছা শক্তিকে প্রশিক্ষিত করা, যেনো সে স্ব-ইচছায় স্রষ্টার ইচছার কাছে আত্মসর্ম্পন করে। আল্লাহ্‌ তার সৃষ্টির মাঝে, প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এই বার্তাই প্রেরণ করেন।

রুকু-২
১০। তিনিই বৃষ্টিকে আকাশ থেকে প্রেরণ করেন। তোমরা তা থেকে পান করো এবং ইহার দ্বারা যে উদ্ভিদ (জন্মায়) তা তোমরা পশুকে খাওয়াও।

১১। এর দ্বারা তিনি তোমাদের জন্য শষ্য, জলপাই, খেজুর, আঙ্গুর এবং বিভিন্ন প্রকার ফল উৎপাদন করেন। অবশ্যই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। ২০৩০
২০৩০: সামান্য গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে পৃথিবীতে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে, আল্লাহ্‌র বিশাল রাজত্বে কি গভীর জ্ঞান ও পরিকল্পনা বিদ্যমান, কি গভীর স্নেহে স্রষ্টা মানুষের সেবার জন্য, মানুষের আরাম আয়েশের জন্য সমস্ত প্রকৃতিকে সৃষ্টি করেছেন। এ সব বোঝার জন্য খুব বেশী কিছু জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নাই, শুধু আল্লাহ্‌কে বুঝতে পারার ঐকান্তিক ইচছাই যথেষ্ট। সে কারণে বলা হয়েছে, "চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন''। আয়াত ১২ তে বলা হয়েছে সূর্য চন্দ্র ও নক্ষত্র রাজিকেও মানুষের সেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে-অবশ্য সে কথা অনুধাবন করার জন্য জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান লোকের প্রয়োজন যারা উপরের বর্ননা হতেও অধিক জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান এদের থেকেও আরও বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী হচেছন তাঁরাই যারা আল্লাহ্‌র প্রশংসা কীর্তন করে"(আয়াত-১৩) অর্থাৎ যারা সর্বদা আল্লাহ্‌র নিদর্শন অনুভব করতে সক্ষম প্রকৃতির বিভিন্ন ক্রমবিন্যাস, বর্ণ, অতি সুক্ষ্ণ তারতম্য। এরা আল্লাহ্‌র অপার রহমত অনুভবের ফলে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে (আয়াত-১৪) থাকেন।

১২। তিনি রাত্রি ও দিনকে তোমাদের অধীন করেছেন। তাঁর আদেশে সূর্য, চন্দ্র, এবং নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে। যারা জ্ঞানী, অবশ্যই এ সবের মধ্যে তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।২০৩১

২০৩১: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে দিন ও রাত্রির সৃষ্টি হয়। দিন ও রাত্রির সৃষ্টির কারণে মানুষ রাত্রিতে বিশ্রাম ও দিনে কাজ করতে সক্ষম হয়। যে কোনও বোধ শক্তি সম্পন্ন মানুষই স্রষ্টার এই নিদর্শন বুঝতে সক্ষম। মানুষকে আল্লাহ্‌ অন্যান্য প্রাণীর উপরে বুদ্ধি দান করেছেন। তাই মানুষ তার আদিম অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। সূর্যের আলো ব্যতীত-ও সে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করতে পারে। তেলের প্রদীপ দিয়ে তার যাত্রা শুরু, তার পরে জ্বালানীতে স্থান পায়, কয়লা, গ্যাস অথবা ইলেকট্রিসিটি। মানুষ এখানেই থেমে থাকে নাই, প্রকৃতির অফুরন্ত শক্তির উৎস সূর্যের আলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সূর্যের আলোর শক্তিকে রক্ষা করে পরে তা ব্যাবহারের উপায় মানুষ আবিষ্কার করেছে। এভাবেই বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাচীনকালে মানুষের জলপথে পরিবহন, জোয়ার ভাটা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, আর জোয়ার ভাটা নিয়ন্ত্রিত হতো চন্দ্র ও সূর্যের অবস্থান দ্বারা। আজকের মানুষ প্রকৃতির এই বাঁধাকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হয়েছে। দেশ দেশান্তরে যাত্রার জন্য মানুষ প্রাচীন কালে নক্ষত্ররাজির ব্যবহার করতো। ধ্রুবতারা নাবিকদের সঠিক পথের সন্ধান দিত। বর্তমানে কম্পাস সে অভাব পূরণ করেছে। এভাবেই সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজিকে আল্লাহ্‌ মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি যে নির্দ্দিষ্ট আইন মেনে চলে সে আইন বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ্‌ মানুষকে দান করেছেন। এ ভাবেই বিশ্ব প্রকৃতিকে আল্লাহ্‌ মানুষের অধীন করেছেন।

১৩। এবং পৃথিবীর (আরও) অনেক বস্তু যা তিনি বহু রং-এ (এবং গুণে) সমৃদ্ধ করেছেন (মানুষের জন্য) ২০৩২। যারা (কৃতজ্ঞ চিত্তে) আল্লাহ্‌র প্রশংসা কীর্তন করে অবশ্যই তাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।২০৩৩

২০৩২: বিশ্ব প্রকৃতির সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার জ্ঞানের স্বাক্ষর বিদ্যমান। প্রকৃতির আইন স্রষ্টার প্রজ্ঞা ও জ্ঞানকে ধারন করে। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা আল্লাহ্‌র সৌন্দর্যকে, শিল্পী মনকে ধারণ করে। সূর্যাস্তের পশ্চিম আকাশে রং এর ছটা, ফুলের পাপড়ির বিভিন্ন রং এর বাহার, পত্র-পল্লবের বিচিত্র সমাবেশ, প্রাণীকূলের গঠনের মধ্যে সৌন্দর্যের যে বিকাশ ঘটেছে তা সম্পূর্ণ অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাহিরে। শুধুমাত্র শিল্পীর তুলি তার কিছুটা ধারণ করতে সক্ষম। সৃষ্টির এই বিভিন্ন ভান্ডারে যেমন বিভিন্ন ধাপ বর্তমান, আধ্যাত্মিক জগতেও সে রূপ বিভিন্ন ধাপ বর্তমান। সৃষ্টির মাঝে প্রকৃতির মাঝে আল্লাহ্‌র প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা অর্থাৎ তার হাতের স্বাক্ষর বিদ্যমান। এসব নির্দশন অনুধাবন করার ক্ষমতা তাদেরই থাকবে যারা আল্লাহ্‌র বাণীর প্রতি নিবেদিত।

২০৩৩: পুনরায় পড়ূন টিকা নং-২০৩০। এখানেই লক্ষ্যনীয় বিষয় হচেছ কি অপূর্ব সুন্দর এবং সুক্ষ্ণ ভাবে আল্লাহ্‌ তার বিভিন্ন সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে অনুধাবন করতে বলেছেন আধ্যাত্মিক জগতকে। আল্লাহ্‌কে অনুভবের মাধ্যমেই আত্মার উন্নতি ঘটে, আর এই অনুভবকে ত্বরান্বিত করা যায় আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা, করুণা, দয়া অনুভবের মাধ্যমে,-যা তার সমস্ত সৃষ্টিতে বিদ্যমান। আধ্যাত্মিক জগতের শিক্ষা লাভ করার এ এক অপূর্ব, সুক্ষ্ণ, সৌন্দর্যময় মাধ্যম।

১৪। তিনিই সমুদ্রকে তোমাদের অধীন করেছেন, ২০৩৪ যেনো তোমরা সেখান থেকে তাজা ও নরম মাংস আহার করতে পার ২০৩৫ এবং সেখান থেকে পরার জন্য অলংকার আহরণ করতে পার ২০৩৬। এবং তোমরা দেখতে পাও (সমুদ্রের) ঢেউ এর বুক চিরে জাহাজ চলাচল করে, যেনো (এরূপে) তোমরা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার ২০৩৭; এবং তোমরা যেনো কৃতজ্ঞ হতে পার।

২০৩৪: এতক্ষণ আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মাঝে মানুষেরে জন্য যে কল্যাণকর কর্মযজ্ঞের বন্দোবস্ত রয়েছে তার সামান্য নমুনা তুলে ধরা হয়েছে। এই আয়াতে অসীম সমুদ্রে মানুষের জন্য যে রহমত তার সামান্য কিছু বর্ণনা করা হয়েছে। বিশাল গহীন সমুদ্র নানা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীতে পরিপূর্ণ তার মধ্যে মাছ অন্যতম, যা স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। সমুদ্রের গভীরে মুক্তা, কোরাল, আম্বার পাওয়া যায়, যা অলংকারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সমুদ্রের বুক চিরে নৌযান চলাচল করে, যার ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং বিশ্ব মানব সম্প্রদায় বিভিন্ন সংস্কৃতি সত্বেও পরস্পর পরস্পরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ লাভ করে। এ ভাবেই বিশ্বমানবতার সুত্রপাত হয়। সমুদ্রের উপমাকে তুলে ধরা হয়েছে এই জন্য যে, আল্লাহ্‌র দয়া, করুণা ও রহমতের ভান্ডার সমুদ্রের থেকেও গভীর, আরও বিশাল।"তোমরা যেনো তার অনুগ্রহ সন্ধান করিতে পার।'' তাঁর রহমত যেমন পার্থিব জগতে সীমাহীন - আধ্যাত্মিক জগতের জন্যও তা বিশাল, যদি কেউ তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। পার্থিব জগতে আল্লাহ্‌কে অনুধাবনের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধান লাভ করা যায়

২০৩৫: "Tari" কথাটি বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে তাজা, ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে "Fersh tender" যারা মাছ পছন্দ করেন তারা জানেন তাজা মাছের তৃপ্তিদায়ক স্বাদ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ভারত মহাসাগরের "পমফেট'' মাছ উত্তর আটলান্টিকের হেরিং মাছ, বঙ্গোপসাগরের ইলিশ মাছ ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশের মাছের প্রধান প্রাপ্তি স্থান হচেছ সমুদ্রের বিশাল জলরাশি। মাছের প্রকৃতি এবং স্বাদ বুঝানোর জন্য তাজা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা মাছের নরম এবং সুস্বাদু অবস্থার প্রতীক। মানুষ কি একবারও চিন্তা করে দেখবে না যে সমুদ্রের লবনাক্ত পানিতে যে মাছের জন্ম, তার স্বাদ গন্ধ কিভাবে সমুদ্রের তিক্ততা না পেয়ে উৎকৃষ্ট স্বাদ পেয়ে থাকে? একি আল্লাহ্‌র করুণা নয়?

২০৩৬: "আহরণ করতে পার'' এই কথাটির অর্থ মানুষ প্রাচীন কাল থেকে আজ অবধি সমুদ্রের অতল থেকে মুক্তা আহরণ করে থাকে। মানুষের সমুদ্রের গভীরতাকে জয় করার এও কি এক অপূর্ব নিদর্শন নয়? এভাবেই আল্লাহ্‌ মানুষকে প্রকৃতির উপরে প্রাধাণ্য দিয়েছেন।

২০৩৭: সমুদ্রকে মানুষের যে পার্থিব উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনার পরে মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে তা থেকে কি তারা জীবনের বৃহত্তর, মহত্তর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না? সমুদ্রের বুক চিরে সুন্দর জলযান দেশ থেকে দেশান্তরে যাত্রা করে। জলযান হচেছ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতীক। ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের আর্থিক ও পার্থিব সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্য আর একটি দার্শনিক দিকও আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোক পরস্পরকে চেনা-জানার সুযোগ পায়। পরস্পর আদান প্রদানের মাধ্যমে বিশ্ব-মানব প্রেমের জন্ম নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের এ হচেছ এক মহত্বর বৃহত্তর দিক-কারণ তা সমগ্র মানব জাতিকে এক সূত্রে বাঁধার প্রয়াস পায়। ফলে সারা পৃথিবীব্যাপী সভ্যতার সমতা বিধান পায়-যার ফলশ্রতিতে বিশ্বমানবতার বিকাশলাভ ঘটে। সমুদ্র সৃষ্টিতে আল্লাহ্‌র যে করুণা প্রকাশ পায় এ শুধু তার সামন্য একটা দিক্‌মাত্র। দেশ দেশান্তরে যাত্রার ফলে মানুষের জ্ঞানের ভান্ডার যে ভাবে সমৃদ্ধ হয়, তাতে তার দৃষ্টিভঙ্গী ও মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়। উম্মুক্ত মনই তো আল্লাহ্‌র করুণা ধারণের যোগ্যতা অর্জন করে। সমুদ্রের পানি লবনাক্ত কারণ - পানির লবনাক্ততার কারণে তা নদী বাহিত পৃথিবীর সকল আবর্জনা ও অন্যান্য দূষিত পদার্থকে পরিশুদ্ধ করে। এতো আল্লাহ্‌র করুণারই এক অপূর্ব স্বাক্ষর। অন্যথায় সমুদ্রের পানি লবনাক্ত না হলে, যুগ-যুগান্তরের সঞ্চিত আবর্জনার ভারে সমস্ত পৃথিবীর পানি দূষিত হওয়ার ফলে পৃথিবী দূষিত হয়ে পড়তো। এসব বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ্‌ অনুভব করতে বলেছেন স্রষ্টার মহত্ব, শ্রেষ্টত্ব, গুরূত্ব ও করুণা।

১৫। এবং পৃথিবীর বুকে পর্বত স্থাপন করেছেন যা দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেনো পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় ২০৩৮। এবং স্থাপন করেছেন নদীসমূহ এবং রাস্তা; যেনো তোমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পার। ২০৩৯:

২০৩৮: অনুরূপ আয়াতের জন্য দেখুন (১৩:৩) এবং (১৫:১৯) আয়াত যে আয়াত সমূহে বলা হয়েছে যে, মানুষের পদতলে পৃথিবীকে বিস্তৃত করা হয়েছে যেনো এক সুবিস্তৃত কার্পেট। আর পর্বত সমূহকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেনো পৃথিবীরূপ কার্পেট স্থানচ্যুত না হয় বা পৃথিবী কেঁপে না ওঠে। আমরা আজকে জানি যে ভূ-গর্ভে যে শিলাস্তরের অবস্থান তা হচেছ চলমান। এই চলমান শিলাস্তরের স্থানচ্যুতির জন্যই ভূমি কম্পের সৃষ্টি হয়। আর এই চলমান শিলাস্তরকে পর্বত স্বস্থানে রাখতে সাহায্য করে। আয়াত (৭৮:৭) বলা হয়েছে যে পর্বত সমূহ যেনো পেরেক। পেরেক যেরূপ কার্পেটকে স্বস্থানে রাখতে সাহায্য করে। পর্বত সমূহ সেরূপ পৃথিবীকে স্বস্থানে রাখতে সাহায্য করে। পর্বত সমূহের জন্য ভূত্বকের বিভিন্ন অংশের ওজনের সমতা রক্ষিত হয় এবং ভূ-ত্বক সুস্থিতি লাভ করে।

২০৩৯: আয়াত (১৬:১৫-১৬) রূপক অলংকারে সমৃদ্ধ। রূপক বর্ণনায় এখানে পর্বতকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানুষকে আধ্যাত্মিক জগতের দিকে হেদায়েত করতে চেয়েছেন। এখানে "Tahtadun" বা পথ নির্দেশ শব্দটি সমস্ত রূপকের প্রতীক স্বরূপ বা রূপকের সাহায্যে মানুষকে জ্ঞান চক্ষু উন্মোলন করার চেষ্ট স্বরূপ। প্রথমতঃ আমাদের চেনা জানা পৃথিবী থেকে পর্বতকে আল্লাহ্‌ অসীম ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পর্বত যা আল্লাহ্‌র সৃষ্টির এক ক্ষুদ্র অংশ কিন্তু তা হচেছ পৃথিবীর ভূ-ভাগের স্থিরতার কারণ। পর্বতের কারণেই ভূ-পৃষ্ট প্রতিদিন কম্পন ও পরিবর্তন থেকে রক্ষা পায়। অন্যথায় চেনা জানা ভূ-পৃষ্ঠ, প্রকৃতি, সভ্যতা, সব কিছু ধ্বংস হয়ে যেতো। আবার প্রকৃতিতে এমন জিনিসও আছে যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, যেমন : বালিয়াড়ি, সমুদ্রের তটরেখা, নদীর গতিপথ ইত্যাদি। নদীর গতিপথ ও পথ রেখা, যদিও সর্বদা পরিবর্তনশীল তবুও তার মধ্যে নিহিত আছে মানুষের জন্য কল্যান। নির্দ্দিষ্ট সঠিক যাত্রার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য পথের নির্দ্দেশ বা "Alamat" রেখেছেন। এসব পথ-নির্দ্দেশ মানুষের তৈরি-ও হতে পারে যেমন পথের নির্দ্দেশনা সম্বলিত স্তম্ভ বা লাইট হাউজ বা আলোক সংকেত আবার প্রকৃতি দত্ত ও হতে পারে যথা: গাছ ইত্যাদি। শেষে উল্লেখ করা হয়েছে ধ্রূব তারার কথা, যার
সাহায্যে প্রাচীন যুগের লোকেরা সমুদ্রের বুকে পথের নিশানা খুঁজে বের করতো। বর্তমানে ধ্রূবতারার পরিবর্তে কম্পাস ব্যবহার করা হয়- যে জ্ঞান আল্লাহ্‌ প্রদত্ত। প্রকৃতির এসব উপমা ও প্রতীকের সাহায্যে আল্লাহ্‌ মানুষকে আল্লাহ্‌র নিরাকার রূপকে অনুধাবন করতে বলেছেন, বৃহত্তর, মহত্তর অনুভবের মাধ্যমে। এ ভাবেই আল্লাহ্‌ প্রতীক ও রূপকের সাহায্যে মানুষকে আধ্যাত্মিক জগতের পথ নির্দ্দেশ করেছেন।

১৬। এবং চিহ্ন ও সংকেত (পথের নিশানা স্বরূপ); এবং (মানুষ) নক্ষত্রের সাহায্যেও পথের নির্দ্দেশ পায়।২০৪০

২০৪০: দেখুন পূর্ববর্তী টিকা। এই আয়াতগুলিতে রূপকের সাহায্যে যে সত্যকে প্রকাশ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ: আয়াতগুলিতে বলা হয়েছে যে বিভিন্ন রূপ পথ নির্দ্দেশক যথা, আলোর সংকেত, প্রাকৃতিক চিহ্ন, ইত্যাদি যেমন সঠিক পথের সন্ধান দেয়, ঠিক সেরূপ আল্লাহ্‌র অনুধাবনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের সঠিক পথের সন্ধান মেলে এবং আল্লাহ্‌র সর্বোচচ করুণা লাভ করা যায়। রূপকগুলি বিশ্লেষন করলে আমরা এর সঠিক রূপ ও সৌন্দর্যকে অনুধাবন করতে পারবো। সুউচচ পর্বত যেরূপ পৃথিবীর স্থিতিশীলতার প্রতীক; সেইরূপ আধ্যাত্মিক জগতের স্থিতিশীলতার প্রতীক হচেছন আমাদের পয়গম্বর কূল।তারা আমাদের সঠিক পথের সন্ধান দেন, শিক্ষা দেন সেই পথে কিভাবে চলতে হবে, পরিচালনা করেন সুনির্দ্দিষ্ট পথে- যেনো আধ্যাত্মিক জগতে বিশ্বাসহীনতার কারণে আমরা পথভ্রান্ত না হই, বা কান্ডারী বিহীন তরণী যেরূপ উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়ায়, বিশ্বাসহীনতার দরুণ যেন সেরূপ উদভ্রান্ত না হই। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র প্রেরিত পয়গম্বরকূল আধ্যাত্মিক জগতে পর্বতের ন্যায় কাজ করেন। তারা বিশ্বাসের অচলতার প্রতীক, মানুষের বিশ্বাসে, চিন্তায়, অনুভবকে তারা সুনির্দ্দিষ্ট পথে চালনা করেন। দ্বিতীয় রূপক হচেছ নদ-নদী ও পথের গুরুত্ব অত্যাধিক। নদী-উপনদী ও শাখা নদীর প্রবাহের ফলে পৃথিবীর উপরিভাগ সমতল ভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে, পৃথিবীকে কৃষিযোগ্য ও আবাসযোগ্য করে তোলে এবং ফলে পৃথিবীতে সভ্যতা ও সৃংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। ঠিক সেরূপ পৃথিবীতে মহান ব্যক্তিত্ব আমাদের নৈতিক জীবনের পথের দিশারী স্বরূপ। তাদের অনুকরণে আমরা আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারি। আবার যাত্রার সময়ে প্রাচীনকালে ধ্রুব তারার বা অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রের আকাশ মন্ডলে অবস্থানের সাহায্য গ্রহণ করতো। বর্তমানে কম্পাসের সাহায্যে মানুষ যাত্রা পথের নির্দ্দেশ গ্রহণ করে। পৃথিবীর জীবনের বাইরেও যে জীবনের অবস্থানে আমরা বিশ্বাসী,-পরকালের সেই জীবন বা আধ্যাত্মিক জীবনকে এখানে দেশ-দেশান্তরে ভ্রমনের সাথে রূপক আকারে তুলে ধরা হয়েছে। দেশ-দেশান্তরে ভ্রমনের বেলায় যেমন সূদূর নক্ষত্রমন্ডলীর সাহায্য প্রয়োজন ঠিক সেইরূপ পরকালের অনন্ত জীবনের সুখ-শান্তির জন্য আমাদের ঐশ্বরিক নির্দ্দেশনার প্রয়োজন।

১৭। সুতরাং যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তার মত, যে সৃষ্টি করতে পারে না? তবু ও কি তোমরা সাবধান হবে না? ২১৪১

২০৪১: আল্লাহ্‌ বিশ্ব ব্রক্ষ্রান্ডে মানুষের কল্যানের জন্য যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণকর ও সুন্দর। সুতারাং তিনি ব্যতীত অন্য কিছুর এবাদত করা কি মূর্খতার শামিল নয়? আল্লাহ্‌র সৃষ্ট অনুগ্রহের এত নিদর্শন থাকা স্বত্বেও কি আমরা তার মহান সত্ত্বার উপস্থিতি আমাদের সত্ত্বার মাঝে অনুভবে অক্ষম হব?

১৮। যদি তোমরা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সমূহ গুণে দেখো, তোমারা কখনও তার সংখ্যা গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ বারে বারে ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।২০৪২

২০৪২: মানুষের জন্য আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অসংখ্য:- তাঁর দয়া অসীম। পাপীর জন্য তাঁর করুণা ও ক্ষমা সীমাহীন, সর্বোচচ।

১৯। এবং আল্লাহ্‌ জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর

২০। আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর যাকেই তারা আহ্বান করুক, তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং নিজেরাই সৃষ্টি হয়েছে। ২০৪৩

২০৪৩: বিশ্ব ভূবনের সকল কিছুর স্রষ্টা এক আল্লাহ্‌। তিনি-ই একমাত্র সত্য। সব কিছুকেই আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন,-সব কিছুই আল্লাহ্‌র মহিমা ঘোষণা করে। সুতরাং আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কিছুর উপসনা করা মূর্খতার কাজ নয় কি?

২১। (তারা হচেছ) মৃত, নির্জীব এবং তারা জানে না কখন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে। ২০৪৪

২০৪৪: পৌত্তলিকদের পূঁজার বিষয়বস্তু হচেছ নিষ্প্রাণ কাঠের যা মাটির বা পাথরের মূর্তি। যাদের নিজস্ব কোন চিন্তা বা চেতনা নাই। মূর্তি ব্যতীতও মানুষ অনেক সময়ে গ্রহ-নক্ষত্র, বা আদর্শ পুরুষ বা নবী-রসুল বা আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তিদের বা পীর-ফকিরদের এতটাই ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যে, তা অনেক সময়েই উপসনার পর্যায়ে চলে যায়। যার জীবন থাকে তারই মৃত্যু ঘটে। যেহেতু এ সব পূজনীয় ব্যক্তিদের মৃত্যু ঘটে, সুতরাং কোন এক সময়ে তারা ''নির্জিব"। এদের সকলকেই শেষ বিচারের দিনে উত্থাপিত করা হবে এবং তাদের পূজারীদের তাদের মুখোমুখি করা হবে। দুঃখের বিষয় শেষ বিচারের দিনের আগমন সর্ম্পকে, এসব উপাস্য দেব দেবী বা পরম শ্রদ্ধার পাত্র যারা, তাদের কোনও ধারণাই নাই।

রুকু-৩

২২। তোমাদের আল্লাহ্‌ এক ও অদ্বিতীয়। যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের হৃদয় (সত্যকে) জানতে অস্বীকার করে এবং তারা অহংকারী হয়।২০৪৫

২০৪৫: আল্লাহ্‌ই একমাত্র সত্য। তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। তিনি আদি এবং তিনিই অন্ত। আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। যারা আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাসী, তারা অবশ্যই পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী। যদি কেউ পরকালে বিশ্বাস না করে, তবে তা হবে তার ব্যক্তিগত দায় দায়িত্বের ব্যাপার। মানুষকে আল্লাহ্‌ ''সীমিত স্বাধীন ইচছাশক্তি" দান করেছেন। সে সেই ইচছাশক্তির অপব্যবহার করে আল্লাহ্‌কে অবিশ্বাসের মাধ্যমে। তার অবিশ্বাসের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তার মূলে রয়েছে ব্যক্তির অন্ধ অহংকার, গর্ব, ও উদ্ধতপনা। গর্ব ও অহংকারের মধ্যে থাকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার প্রবণতা ও অন্যকে নিকৃষ্ট জ্ঞান করা। আর এই পাপের দরুন ইবলীসের বেহেশ্‌ত থেকে পতন হয়।দেখুন (২:৩৪)। গর্ব ও অহংকার মানুষের চেতনাকে সত্য বিমূখ করে তোলে।

২৩। নিঃসন্দেহে, তারা যা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে আল্লাহ্‌ (সব) জানেন। সত্য-সত্যই তিনি অহংকারীদের পছন্দ করেন না। ২০৪৬

২০৪৬: দেখুন অনুরূপ আয়াত (১৬:১৯)। এসব আয়াতগুলি সকল মনুষ্য সম্প্রদায়ের প্রতি অবতীর্ন করা হয়েছে। মানুষের সকল চিন্তা-ভাবনা প্রকাশিত বা গুপ্ত, সবই সর্বশক্তিমানের নিকট প্রকাশ্য দিবালোকের মত ভাস্বর। অনুতপ্ত মানুষের প্রকাশ্য বা গুপ্ত সকল পাপ ক্ষমা করার জন্য তিনি তাঁর ক্ষমা দয়া করুণার হাত সম্প্রসারিত করে আছেন। কিন্তু যারা অহংকারী, উদ্ধত, তারা সর্বশক্তিমানের অপার করুণা, দয়া, ক্ষমা গ্রহণে অপারগ হয়, কারণ তারা উদ্ধত অহংকারে আল্লাহ্‌র হেদায়েতকে অস্বীকার করে।ফলে আল্লাহ্‌র রহমতের ভান্ডার তাদের অগোচরে থেকে যায়। এই আয়াতে তাদেরকেই সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ "অহংকারীকে পছন্দ করেন না।'' তার ফলে তারা আল্লাহ্‌র করুণা, দয়া, ক্ষমা লাভে অপারগ হয়।

২৪। যখন তাদের বলা হয়, "তোমাদের প্রভু কি অবতীর্ণ করেছেন ২০৪৭? তখন তারা বলে "প্রাচীনকালের গল্প-কাহিনী''। ২০৪৭

২০৪৭: এই আয়াতে অবিশ্বাসী ও উদ্ধতদের মানসিক অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের নিকট যখন আল্লাহ্‌র আয়াত সমূহ উপস্থাপন করা হয়, তারা তা ঘৃণার সাথে প্রত্যাখান করে, এবং বলে, "ইহা তো পূর্ববর্তীদের উপকথা।'' এ ভাবেই তারা সত্যকে প্রত্যাখান করে ফলে তারা তাদের আত্মার মাঝে বিবেকের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। শুধু তাই-ই নয়, তাদের অবিশ্বাসকে অজ্ঞ লোকদের বিভ্রান্ত করে এবং তাদের সত্য পথ থেকে বিভ্রান্তিতে নিয়ে যায়।

২৫। শেষ বিচারের দিনে, তারা নিজেদের (পাপের) পূর্ণ বোঝা, এবং যাদের তারা অজ্ঞতা বশে পথভ্রষ্ট করে ছিলো তাদের (পাপের) বোঝার (কিয়দংশ) বহন করবে ২০৪৮। হায়! তারা যে বোঝা বহন করবে তা কষ্টকর হবে।

২০৪৮: উপরের টিকাতে বর্ণিত লোকদের পাপ দ্বিবিধ (১) আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে প্রত্যাখানের পাপ ও (২) অজ্ঞ লোকদের সত্য পথে চলতে বাঁধা সৃষ্টি করা। সুতারাং তাদের শাস্তিও হবে দ্বিবিধ। সুরা (৬:১৬৪) আয়াতে বলা হয়েছে "প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেহ অন্য কারও ভার বহন করবে না।'' প্রত্যেককে স্ব স্ব কর্মফলের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে। খৃষ্টানদের মতে যীশু তাঁর রক্তের বিনিময়ে পাপীদের পাপের ঋণ শোধ করেছেন। দেখা যায় পৃথিবীতে বহু ধর্মীয় মতবাদ আছে যার মূল কথা হচেছ আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মধ্যবর্তী ব্যাক্তির প্রয়োজন। কিন্তু ইসলাম এই মধ্যবর্তী ব্যাক্তির অবস্থানকে স্বীকার করে না। প্রতিটি লোক তার কর্মের জন্য আল্লাহ্‌র নিকট জবাবদিহিতায় আবদ্ধ, তার পাপের বোঝা অন্য কেউ বহন করবে না। উপরন্তু কেউ যদি অন্যকে পাপের পথে বিভ্রান্ত করে সে পাপের শাস্তিও তাকে বহন করতে হবে। এই আল্লাহ্‌র হুকুম। সেক্ষেত্রে তার শাস্তি দ্বিবিধ। নিজের পাপ ও অন্যকে পাপের পথে প্ররোচিত করার পাপ।
রুকু-৪

২৬। তাদের পূর্ববর্তীরাও (আল্লাহ্‌র বিরূদ্ধে) চক্রান্ত করেছিলো। কিন্তু আল্লাহ্‌ ইমারতের ভিত্তিমূলকে অপসারণ করলেন ফলে (ইমারতের) ছাদ উপর থেকে ধ্বসে পড়ল। এবং শাস্তি তাদের এমন দিক থেকে আসলো যা তারা কল্পনাও করে নাই। ২০৪৯

২০৪৯: যুগে যুগে পাপীরা আল্লাহ্‌র নবীদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। এ থেকে আমাদের নবী আল্‌ মোস্তফাও (সাঃ)  রেহাই পান নাই। এই আয়াতে "ইমারতের ভিত্তিমূল'' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে রূপক বর্ণনা হিসেবে। এর অর্থ হবে "চক্রান্তের ভিত্তিমূলে" আঘাত করা। অবিশ্বাসীরা আল্লাহ্‌র পরিকল্পনার বিরূদ্ধে যে ষড়যন্ত্রই করুক না কেন তাদের সেই ষড়যন্ত্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানা হবে এবং তাদের ষড়যন্ত্র ধ্বসে পড়বে ঠিক সে রকম ভাবে যে ভাবে উচচ প্রাসাদের ভিত্তি নড়ে গেলে সমগ্র প্রাসাদই ধ্বসে পড়ে। তাদের প্রতি আল্লাহ্‌র শাস্তি পতিত হবে এমন দিক থেকে যা তারা কল্পনাও করতে পারে নাই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বদরের যুদ্ধের কথা। বদরের যুদ্ধে কোরেশরা তাদের সৈন্য সংখ্যা, সংগঠন, অস্ত্র-শস্ত্র প্রভৃতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলো। তারা সুনিশ্চিত ছিলো যে জয় তাদের অবধারিত। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্বেও তারা বদরের যুদ্ধে পরাজিত হয়।


২৭। অতঃপর শেষ বিচারের দিনে তিনি তাদের লাঞ্জিত করবেন, এবং বলবেন, "কোথায় আমার সেই সমস্ত শরীক যাদের সমন্ধে তোমরা (পূণ্যাত্মাদের সাথে) বিতন্ডা করতে?'' যারা জ্ঞানে ভূষিত ছিলো, তারা বলবে, "অবিশ্বাসীদের জন্য এই দিন অবশ্যই লাঞ্জনা ও দুঃখ কষ্টের হবে ২০৫০;-

২০৫০: অবিশ্বাসী ও পাপীরা কেয়ামতের দিনে যখন বিচারের সম্মুখীন হবে, তারা যে সত্যকে ত্যাগ করে মিথ্যা ও মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করেছে, তার সম্বন্ধে তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে। কিন্তু সে সময়ে তারা উত্তর দানে অপারগ হবে। তবে যাদের পৃথিবীতে জ্ঞান দান করা হয়েছিলো, অর্থাৎ নবী ও রসুলেরা, তারা মন্তব্য করবেন এই বলে যে, "আজ লাঞ্ছনা ও অমংগল কাফিরদের-''

২৮। "নিজের আত্মর প্রতি জুলুম করা অবস্থায় ফেরেশ্‌তারা যাদের জীবন হরণ করে থাকে।'' ২০৫১। তখন তারা আত্ম সমর্পণের (ভান) করে বলবে : "আমরা (জেনে-বুঝে) কোন মন্দ কাজ করি নাই" (ফেরেশ্‌তারা উত্তর দেবে)" না, তোমরা যা করতে আল্লাহ্‌ সে সম্বন্ধে সব কিছু অবশ্যই জানেন।" ২০৫২

২০৫১: " নিজের আত্মর প্রতি জুলুম করা অবস্থায়''। অর্থাৎ মানুষ যখন অন্যায়, অসত্য, কুফরী প্রভৃতি পাপের দ্বারা আচছন্ন থাকে তখন তারা তাদের আত্মার উপরে জুলুম করে। সৃষ্টির আদিতে আত্মা থাকে নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক। মানুষের কৃত পাপে আত্মার এই স্বচছতা নষ্ট হয়ে যায়। একেই বলা হয়েছে "নিজেদের প্রতি জুলুম'' এ এক বিশেষ মানষিক অবস্থা (State of mind)। আল্লাহ্‌র আইনের প্রতি বিদ্রোহী আত্মা, অর্থাৎ যারা পাপিষ্ট ও কাফের আত্মা অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা নিজেদের প্রতি জুলুমের ফলে আত্মার স্বচছতা হারায়।

২০৫২: এখানে কাফের ও পাপীদের শেষ বিচারের দিনের শাস্তি হতে রেহাই পাওয়ার জন্য কৃত ওজর আপত্তিকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ওজর আপত্তি ছিলো ভান মাত্র। প্রথমে তারা অত্যন্ত হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে এবং আত্মসমর্পণ করবে। যখন তারা উত্তর দান করবে তাদের উত্তর হবে শাস্তি থেকে অব্যহতি পাওয়ার জন্য মিথ্যা ওজর মাত্র।তারা বলবে যে তারা যা করেছে তা ছিলো তাদের অজ্ঞতা প্রসুতার ফল, তাদের উদ্দেশ্য কখনও খারাপ ছিলোনা। পৃথিবীতে পাপীরা এভাবে বিচারককে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়, কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ মানুষের মনের ক্ষুদ্রতম চিন্তা বা উদ্দেশ্যকে দিবালোকের মত সুস্পষ্টরূপে অনুধাবনে সক্ষম। সেই স্বর্গীয় শক্তির কাছে লুকানোর উপায় কোথায়? পাপী ও কাফেরদের সেখানে কোনও নিষ্কৃতি নাই।

২৯। "সুতারাং জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর সেখানে বাস করার জন্য। এভাবেই অহংকারীদের বাসস্থান যথার্থই অতি মন্দ''।

৩০। পূণ্যাত্মাদের বলা হবে "তোমাদের প্রভু কি অবতীর্ণ করেছিলেন?'' ২০৫৩। তারা বলবে, "যা কল্যাণকর তার সব।" যারা ভালো কাজ করে, তাদের জন্য পৃথিবীতে আছে কল্যাণ এবং পরকালের জন্য আরও উৎকৃষ্ট আবাস। ২০৫৪। পূণ্যাত্মাদের আবাসস্থল কতই না উত্তম!

২০৫৩: আয়াত (১৬:২৪) ও আয়াত (১৬:৩০), এই দুটি আয়াতে একই প্রশ্ন করা হয়েছে। প্রশ্নটি ছিলো, "তোমাদিগের প্রতিপালক কি অব্তীর্ণ করেছিলেন?" প্রথমটি ছিলো অবিশ্বাসী ও অহংকারীদের জন্য, দ্বিতীয়টি ছিলো বিশ্বাসী ও মোমেন বান্দাদের জন্য। একই প্রশ্নের উত্তর দাতার মানসিক অবস্থার তারতম্যের গুণে উত্তরের তারতম্য লক্ষ্যনীয়। যারা পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র আইনে বিশ্বাসী নয় অর্থাৎ পাপী, তারা ও কাফের বা অবিশ্বাসীরা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের মধ্যে কোনও সত্য ও সুন্দরকে আবিষ্কারে অক্ষম ছিলো। অর্থাৎ কাফের ও পাপীদের নিকট আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ হবে আবেদনহীন যেনো শুধুমাত্র পূর্ববতীদিগের উপকথা।''

২০৫৪: এখানে পূণ্যাত্মাদের মানসিক অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। যারা পূণ্যাত্মা, যারা ভালো তারা সব কিছুর মধ্যেই সুন্দরকে খুঁজে পায়। জীবনে ও মরণে, এই পৃথিবীতে ও পরলোকে, সর্বত্রই তাদের এই মানসিক অবস্থা (State of mind) বিরাজ করে। কারণ তারা সত্য ও সুন্দরকে অনুধাবন করে এবং সত্য ও সুন্দরের মাঝে নিজেকে বিলিন করে দেয়।

৩১। অনন্ত (সুখের) বাগানে তারা প্রবেশ করবে : যার পাদদেশে (মনোহর) নদী সমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা যা কামনা করবে, তারা তাই-ই পাবে ; এ ভাবেই আল্লাহ্‌ পূণ্যাত্মাদের পুরষ্কৃত করবেন,-

৩২। (অর্থাৎ) ফেরেশ্‌তারা যাদের জীবন (আধ্যাত্মিক ভাবে) পবিত্র থাকা অবস্থায় হরণ করবে, (তারা তাদের) বলবে, "তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক ; তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর ; কারণ (পৃথিবীতে) তোমরা যা (ভালো কাজ) করেছ (তার জন্য)। ২০৫৫

২০৫৫: "পবিত্র থাকা অবস্থায়'' - এই বাক্যটি দ্বারা যে ভাবকে প্রকাশ করা হয়েছে তা হচেছ পার্থিব সমস্ত পাপের উর্দ্ধে বিশ্বাসে ও আল্লাহ্‌র করুণা, দয়া, ও ক্ষমার সমুদ্রে অবগাহিত আত্মা। কুফর বা অবিশ্বাস এবং পাপ থেকে মুক্ত থাকাই হচেছ প্রকৃত ইসলামিক মূল্যবোধের মাপকাঠি। যারা উক্ত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন তারাই ফেরেশ্‌তাদের দ্বারা শান্তির সম্ভাষণে সম্ভাষিত হন এবং অনন্ত শান্তির রাজ্যে প্রবেশ লাভ করেন।

৩৩। (অধার্মিকেরা) কি অপেক্ষা করে যতক্ষন না ফেরেশ্‌তাদের আগমন ঘটে অথবা তোমার প্রভুর আদেশ আসে (তাদের ধ্বংসের জন্য)? ২০৫৬। ওদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তারাও এরূপই করত। আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি অন্যায় করেন নাই বরং তারা নিজেরাই নিজের আত্মার প্রতি অত্যাচার করেছিলো।

২০৫৬: "ফেরেশ্‌তা আগমনের'' অর্থাৎ মৃত্যুদূতের আগমনের। এই আয়াতে পাপিষ্টদের মানসিক অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে যারা পাপী তারা মৃত্যুর আগমন বা আল্লাহ্‌র শাস্তি আগমনের পূর্বে অনুতপ্ত হয় না। তাদের পাপ আল্লাহ্‌র প্রতি অনুতপ্ত হতে বাধা প্রদান করে কারণ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।

৩৪। কিন্তু তাদের কাজের মন্দ পরিণতি তাদের উপরে আপতিত হয়েছিলো, এবং ওদের পরিবেষ্টন করেছিলো সেই (শাস্তি), যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো।


রুকু-৫

৩৫। মিথ্যা উপাস্যের উপাসকরা বলে, "আল্লাহ্‌ যদি ইচছা করতেন- তবে আমরা এবং আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা তাঁকে ব্যতীত অন্য কিছুর পূজা করতাম না ২০৫৭ এবং তার সম্মতি ব্যতীত আমরা কোন কিছুকে নিষিদ্ধ করতাম না। '' ২০৫৮ তাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তারাও এরূপ করতো। রাসুলদের কর্তব্য তো শুধু সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছিয়ে দেয়া। ২০৫৯

২০৫৭: মুশরিকদের সেই অতি পুরাতন যুক্তিকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের যুক্তি হচেছ, আল্লাহ্‌ যদি এতই শক্তিশালি হবেন, তবে তিনি সকলকে তার আনুগত্যের আওতায় আনতে সক্ষম হন নাই কেন? যদি আল্লাহ্‌ তায়ালা সবাইকে আনুগত্যে বাধ্য করতে চাইতেন, তবে আনুগত্যের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারও ছিলো না। বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড ও নিখিল প্রকৃতি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, তাঁর আইনের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারও নাই। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র নির্ভুল ভাবে তার আইন মানতে বাধ্য। কারণ তাদের কারও স্বাধীন ইচছা শক্তি নাই। বিশ্ব ব্রহ্মান্ড নিখিল - প্রকৃতিতে সর্বত্র বিরাজ করে তাঁর আইনের প্রতিফলন। নিখিল -প্রকৃতি কেহই তাঁর আইনের বিরূদ্ধে চলে না। কারণ তাদের সে ক্ষমতা আল্লাহ্‌ দান করেন নাই। একমাত্র মানুষকেই আল্লাহ্‌ সীমিত আকারে "স্বাধীন ইচছা শক্তি '' দান করেছেন। এই "সীমিত ইচছা শক্তির'' জন্যই সে সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব বা "আশারাফুল মাখলুকাত'' মানুষ সৃষ্টির এই হচেছ নৈতিক সত্যতা। নিখিল -বিশ্বকে আল্লাহ্‌ মানুষের অনুগত করেছেন এই জন্য যে, সে যেনো এই সত্যকে অনুধাবন করতে পারে, বুঝতে পারে। আর এই বুঝতে পারা হবে স্ব-ইচছায় --"স্বাধীন ইচছা শক্তি'' ব্যবহারের মাধ্যমে। আল্লাহ্‌ তাকে আল্লাহ্‌র রাস্তায় আসতে বাধ্য করবেন না। যদি তা করতে হয় তবে তা বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির আদি পরিকল্পনার বিরূদ্ধাচারণ হয়ে যাবে। মানুষ সৃষ্টির মূল পরিকল্পনাই হচেছ তার আল্লাহ্‌ প্রদত্ত "সীমিত স্বাধীন ইচছা শক্তির'' সঠিক প্রয়োগের ক্ষমতার। এখানেই জবাবদিহিতার প্রশ্নটি নিহিত। জবাবদিহিতার জন্যই মানুষের সৃষ্টি। আর এই কারনেই সে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠজীব। সৃষ্টির অন্য কিছুকেই এর আওতায় আনা হয় নাই।

২০৫৮: সূরা (৬:১৪৩-১৪৫) আয়াতে দেখুন, মুশরিক আরবেরা খাদ্য বস্তু, মাংসের বৈধতা সম্বন্ধে নানারূপ বাঁধা নিষেধ আরোপ করে। ইসলাম কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। খাদ্য দ্রব্য সম্বন্ধে ইহুদীদের আরোপিত কতিপয় নিষেধাজ্ঞাকে ইসলাম রহিত করে (৬:১৪৬)। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানুষকে জীবনের বৃহত্তর ও মহত্তর দিক শিক্ষা দিয়েছেন বৃহত্তর পরিসরে। বৃহত্তর পরিসরে এ সব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন যে মানুষ জীবনের বিভিন্ন দিকে কুসংস্কারচছন্ন হয়ে পড়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে। বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিষেধাজ্ঞার প্রাচীর রচনা করে কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে কিস্তু তাকে বৈধ করে তোলে ধর্মের দোহাই দিয়ে। ধর্মের নামে কুসংস্কারকে প্রচলন ইসলাম পূর্ব আরব মোশরেকদের মধ্যে প্রচলন ছিল। ইসলাম কুসংস্কারকে অবৈধ ঘোষণা করে।

মন্তব্য : মুসলমান সমাজে বর্তমানে ধর্মের নামে যে গোড়ামী ও ধর্মান্ধতার জন্ম নিয়েছে তা ঐ ইসলাম পূর্ব অবস্থারই শামিল।
২০৫৯: "Mubin" অর্থাৎ সুস্পষ্ট বাণী। শব্দটির তিনভাবে ব্যক্ত করা যায়। ১। যে বার্তা সুস্পষ্ট ও পরিস্কার। ২। আল্লা- মানুষকে বা মানুষের আত্মাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন তা সুস্পষ্ট রূপে অনুধাবনের জন্য যিনি চেষ্টা করেন। ৩। যিনি মুক্ত ভাবে সবার জন্য প্রচার করেন।

৩৬। নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন করে রাসুল প্রেরণ করেছি ২০৬০ (এই আদেশ দিয়ে): "আল্লাহ্‌র এবাদত কর, এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাক,।'' তাদের মধ্যে কতককে আল্লাহ্‌ সৎপথে পরিচালিত করেন, এবং কতকের উপর অনিবার্যভাবে ভ্রান্তি (প্রতিষ্ঠিত) হয়েছে। ২০৬১। সুতারাং পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর, এবং দেখ, যারা (সত্যকে) অস্বীকার করেছিলো, তাদের শেষ পরিণতি কি হয়েছিলো।

২০৬০: আল্লাহ্‌র নিদর্শন তার সর্ব সৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান। গ্রহ-নক্ষত্র থেকে আকাশ, পৃথিবী, তরুলতা সর্বত্র তার হাতের পরশ বিদ্যমান। অযত্নে লালিত প্রকৃতির কোলে যে ছোট্ট ঘাসফুল - তার মাঝেও খুঁজে পাওয়া যায় স্রষ্টার হাতের পরশ। মানুষের বিবেকের মাঝে স্রষ্টা তার মাহাত্মকে প্রকাশ করেন। তারপরেও যুগে যুগে পৃথিবীতে নবী ও রসুলদের প্রেরণ করা হয়েছে মানুষকে সৎ পথ প্রদর্শনের জন্য- মানুষ যেন সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ ও পাপ ও মন্দকে বর্জন করতে পারে। এ কথা ভাবার অবকাশ নাই যে, আল্লাহ্‌ মানুষকে পথভ্রান্ত অবস্থায় পরিত্যাগ করেন। আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়া সর্বদা আমাদের সহায়তা ও হেদায়েতের জন্য ব্যগ্র। শুধু বান্দাকে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ, দয়া গ্রহণের জন্য ইচছা প্রকাশ করতে হবে। স্ব-ইচছায় আল্লাহ্‌র হেদায়েত পাওয়ার ইচছা প্রকাশ করলে কেহ তার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয় না।

২০৬১: সংসারে সকলে আল্লাহ্‌ নির্দ্দেশিত পথে চলতে চায় না। একদল আছে যারা হেদায়েত গ্রহণ করে, অন্যদল আছে যারা বিপথে চালিত হয়। যারা বিপথ গ্রহণ করে তারা শেষ পর্যন্ত পাপের পথে, বিভ্রান্তের মাঝে তলিয়ে যায়। এদেরকেই সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, যুগে যুগে কালে কালে যারা সত্যকে পরিহার করে পাপের পথে পা বাড়ায় মন্দ ও পাপের নিকট আত্মসমর্পন করে তাদের শেষ পরিণতি প্রত্যক্ষ করার জন্য দেশ ভ্রমণ করতে।

৩৭। যদিও তুমি তাদের সৎপথ প্রাপ্তি সম্বন্ধে আগ্রহী। কিন্তু আল্লাহ্‌ যাকে বিপথে পরিত্যাগ করেন, তিনি তাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন না ২০৬২; ফলে তারা কোন সাহায্যকারীও পাবে না।

২০৬২: যারা সৎ ভাবে জীবন যাপন করে, আল্লাহ্‌র করুণা ও রহমত তাদের উপরে বর্ষিত হয়। যারা অসৎ পথে, পাপের পথে জীবনকে অতিবাহিত করতে আগ্রহী, তারা ইচছাকৃত ভাবে আল্লাহ্‌র করুণাকে প্রত্যাখান করে, তখন তার জন্য আল্লাহ্‌র হেদায়েতের সকল দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। এই হচ্ছে ঐশ্বরিক আইন।

৩৮। তারা আল্লাহ্‌র নামে দৃঢ়তম শপথ করে বলে (২০৬৩) যে, যারা মৃত আল্লাহ্‌ তাদের পুনর্জীবিত করবেন না ২০৬৪। এটা আল্লাহ্‌র কৃত সত্য প্রতিশ্রুতি; কিন্তু মানুষের মধ্যে অধিকাংশ তা অনুধাবন করে না।
২০৬৩: আরব মোশরেকেরা সবচেয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করতো সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র নামে। অথচ কম দৃঢ় বা সাধারণ প্রতিজ্ঞা করতো তাদের প্রতিমা উপাস্যদের নামে, অথবা পূর্বপুরুষদের নামে বা যে সব জিনিসকে তারা পবিত্র জ্ঞান করতো তাদের নামে।

২০৬৪: সাধারণ আরব মোশরেকদের ধর্ম মত ছিল যে " আল্লাহ্‌ তাদের পুনর্জীবিত করবেন না।'' এই মত ও বিশ্বাস যে শুধুমাত্র সে যুগেই বর্তমান ছিল, তাই নয়। যুগে যুগে কালে কালে যারা আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথ ত্যাগ করে, তারা পৃথিবীতে পাপের পথ অবলম্বন করে এই বিশ্বাসে যে আল্লাহ্‌ তাদের পুনর্জীবিত করবেন না। এ কথা সে যুগের জন্যও প্রযোজ্য ছিল। বর্তমান কালের জন্যও প্রযোজ্য। এর উত্তর দ্বিবিধঃ (১) আল্লাহ্‌ পুনরুত্থানের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সুতারাং তিনি তা করবেন। আল্লাহ্‌র প্রতিজ্ঞা সত্য। (২) পুনরুত্থান ঘটাবেন এ জন্য যে, তারা যেনো প্রকৃত সত্যকে জানতে পারে। পৃথিবীর জীবনের মোহে পরকালের যে জীবনকে তারা অস্বীকার করতো তা তারা অনুধাবন করতে পারবে। তাদের মিথ্যা ও ভ্রান্ত ধারনার জন্য তাদের শাস্তি দান করা হবে তাদের ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব তাদের অবহিত করানো হবে।

৩৯। (তাদের পুনর্জীবিত করা হবে), যেনো তিনি তাদের স্পষ্ট ভাবে দেখাতে পারেন, যে বিষয়ে তারা মত পার্থ্যকে লিপ্ত ছিল এবং কাফেররা যেনো অনুধাবন করতে পারে প্রকৃতই তারা মিথ্যার (নিকট আÍসমর্পনকারী) ২০৬৫।

২০৬৫: দেখুন উপরের টিকা।

৪০। আমি কোন কিছু ইচছা করলে, আমি শুধুমাত্র এ কথা বলি, "হও'' এবং তা হয়ে যায়। ২০৬৬

২০৬৬: এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ্‌র উচচারিত একটি শব্দই হচেছ আল্লাহ্‌র কৃত কাজ। আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার হচেছ প্রকৃত সত্য, যা ঘটবেই। তার ইচছার প্রতিফলনের বিরূদ্ধে সময়, কাল, পরিবেশ কোন কিছুই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। তার ইচছাই একমাত্র সত্য আর সবই মরিচিকা বা ভ্রান্ত। কোনও ঘটনা বা পার্থিব বস্তু থেকে তিনি মুক্ত, কারণ তিনিই সেসবের স্রষ্টা। পার্থিব সকল কিছুর পরিচালনার যে আইন তার স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ্‌। সব কিছুই আল্লাহ্‌র ইচছা অনুসারে পরিচালিত হয়।

রুকু-৬

৪১। যারা আল্লাহ্‌র কারণে অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করার পর তাদের মাতৃভুমি ত্যাগ (হিজরত) করে (২০৬৭) আমি অবশ্যই তাদের দুনিয়াতে উত্তম আবাস দিব। কিন্তু পরকালের পুরষ্কার হবে আরও শ্রেষ্ঠ। হায় যদি কেবল মাত্র তারা (তা) বুঝতে পারতো।

২০৬৭: দেশ ত্যাগ করে সূদূর বিদেশে অবস্থান করাকেই হিজরত করা বলা যাবে না। এই আয়াতে প্রকৃত হিজরতের ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে। হিজরত তখনই আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে যখন তা শুধু মাত্র: (১) আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করার জন্য, তার রাস্তায় জেহাদ করার জন্য নিবেদিত হবে। (২) স্বদেশে অবস্থান করতে হলে, অত্যাচারিদের জন্য যদি কারও অসত্য, অন্যায় ও অসৎ পথকে অবলম্বন ব্যতীত অন্য কোনও উপায় না থাকে, কোনও ভাবেই তার পক্ষে যদি আল্লাহ্‌ নির্দ্দেশিত সত্য ও ন্যায়ের পথ অবলম্বন করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে অত্যাচারী ও আল্লাহ্‌ এ দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র পথে থাকার জন্য সে হিজরত করবে। যখন উপরের শর্তগুলি পূরণ হয় তখন হিজরত আল্লাহ্‌র কাছে অত্যন্ত সম্মানীয়। কারণ এসব ব্যক্তি আল্লাহ্‌র জন্য আল্লাহ্‌র পতাকাকে সম্মুন্নত রাখার জন্য, বিরাট ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। রসুলের (সাঃ) যুগে এদের উদাহরণ হচেছন প্রথম মুসলমান দল যারা নিজস্ব ঈমানকে সমুন্নত রাখার জন্য বাড়ী, ঘর, বিষয় সম্পত্তি ত্যাগ করে অচেনা অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়ান। পরবর্তীরা হচ্ছেন যারা মক্কা ছেড়ে মদিনাতে গমন করেন, রসুলের (সাঃ) মদীনাতে গমনের পূর্বে ও যারা রসুলের মদিনাতে অবস্থান কালে মক্কা থেকে মদিনাতে হিজরত করেন। সকল হিজরত কারীরা রসুলের (সাঃ) সমর্থন ও উপদেশ লাভ করতেন। এদের সম্বন্ধেই পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন তারা ধৈর্য ধারণ করে ও তাদের প্রতিপালকের উপরে নির্ভর করে।

৪২। (এরাই তারা) যারা ধৈর্যের সাথে অধ্যাবসায়ী হয়, এবং তাদের আস্থা স্থাপন করে তাদের প্রভুর উপরে।

৪৩। তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ মানুষকেই প্রেরণ করেছি রাসুল হিসেবে ২০৬৮। তোমরা যদি না বুঝতে পার তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞাসা কর যারা (আল্লাহ্‌র) কিতাব প্রাপ্ত হয়েছে।২০৬৯

২০৬৮: আল্লাহ্‌র প্রেরিত সকল নবী ও রসুল সকলেই ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ। তারা ফেরেশ্‌তা বা অন্য কিছু ছিলেন না, তবে সাধারণ মানুষ থেকে তাদের যে পার্থক্য ছিলো, তা হলো তারা আল্লাহ্‌র নিকট থেকে ওহী বা প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

২০৬৯: "জ্ঞানীগণকে'' অর্থাৎ আল্লাহ্‌র প্রেরিত কিতাবের জ্ঞান যাদের আছে। আরব প্যাগান বা মোশরেকদের ধর্মীয় ইতিহাসের জ্ঞান ছিলো না। তাদের এই অজ্ঞতার কারণেই তারা আশ্চর্য হয়ে যেতো যে কিভাবে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ একজন মানুষের পক্ষে পাওয়া সম্ভব? সে কারণেই তারা মুহাম্মদ (সাঃ) কে রাসুল বা আল্লাহ্‌র নবী বলে স্বীকার করতে অস্বীকার করে। হযরত মুসা (আঃ) কি মানুষ ছিলেন না? তাদের জানা উচিত যে হযরত মুসা ছিলেন একজন নবী যিনি ছিলেন মানুষ, কিন্তু আল্লাহ্‌ তাকে প্রত্যাদেশ বা ওহী প্রেরণ করেন। যারা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন, তারাই "জ্ঞানী'' ব্যক্তি। পার্থিব জ্ঞান মানুষকে অর্থকরী বিদ্যায় জ্ঞানী করে। কিন্তু ঐশ্বরিক জ্ঞান মানুষকে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন বিবেকবান ব্যক্তিতে পরিণত করে যার অর্থ প্রকৃত জ্ঞানী। এক্ষেত্রে এদেরই জিজ্ঞাসা করতে বলা হয়েছে।

৪৪। (এ সব নবীকে) আমি সুস্পষ্ট প্রমাণ ও কিতাব (২০৭০) সহকারে (পাঠিয়েছি) এবং তোমার কাছেও কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি যেনো তুমি মানুষদের সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখা করতে পার তাদের জন্য যা প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা করতে পারে।

২০৭০: কিতাব ধারী জাতিরা পূর্বেও "স্পষ্ট নিদর্শন'' ও কিতাব প্রাপ্ত হয়েছে। ঠিক সেরূপ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে কুরআন দান করা হয়েছে। সময়ের আবর্তনে কিতাবধারী জাতিরা তাদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ সমূহকে বিকৃত করে ফেলেছে। সেই কারণে কোরআনকে প্রেরণ করা হয়েছে পূর্বের কিতাব সমূহকে বাতিল গণ্য করে।
অবতীর্ণ করার কারণ সমূহের মধ্যে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছিলো, যে সম্বন্ধে মানুষের মনে যে দ্বিধা ও দন্দ আছে তা "সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য'' এবং মানুষ যাতে কোরআনকে পড়ে তার চিন্তার দিগন্তকে সম্প্রসারিত করে। অর্থাৎ কোরআনকে পড়ে বুঝতে হবে, চিন্তা করতে হবে তবেই কোরআন পড়ার স্বার্থকতা হবে।

৪৫।তাহলে যারা মন্দ (চক্রান্ত) উদ্ভাবন করে, (তারা কি) নিরাপদ বোধ করে যে, আল্লাহ্‌ তাদের ভূ-গর্ভে বিলীন করবেন না অথবা শাস্তি এমন দিক থেকে আসবে যা তাদের ধারণাতীত? ২০৭১

২০৭১: অনুরূপ আয়াত দেখুন (১৬:২৬)। মন্দ ব্যক্তিরা আল্লাহ্‌র নবীর বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলো। তারা জানে না যে মানুষের প্রতিটি সুপ্ত ও গুপ্ত চিন্তা আল্লাহ্‌র নিকট দিবালোকের মত প্রকাশ্য। প্রতিটি চিন্তা, কর্ম, কর্মের নিয়ত সব কিছুর জন্যই মানুষকে আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এই সত্য আজকের দিনেও বহু মানুষের নিকট অজ্ঞাত। তাই তারা নির্ভয়ে পাপের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহ্‌র শাস্তি যে কোনও মূহুর্তে, যে কোনও রূপে পৃথিবীতে পাপীদের ধ্বংস করে দিতে পারে। পর পর চারটি শাস্তির উল্লেখ এখানে করা হলো।

(১) কারূনের মত তারা পৃথিবী কর্তৃক সম্পূর্ণ গ্রাস হয়ে যেতে পারে। কারূনের কাহিনী সূরা (২৮:৭৬-৮১) আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। কারূন যখন তার সম্পদের প্রাচুর্যে উল্লাসিত হয়ে, অন্ধ অহংকারে স্ফীত হয়ে উঠেছিলো সেই সময়েই পৃথিবী তাকে গ্রাস করে নেয়।

(২) ফেরাউন ও তার প্রধান মন্ত্রী "হামান''হযরত মুসার বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলো, তার ফল স্বরূপ তারা ভয়াবহ দুর্যোগে পতিত হয়, দেখুন (৪০:৩৬-৩৮) ও (২৯:৩৯-৪০) আয়াত। ফেরাউন যখন আল্লাহ্‌র পরিকল্পনাকে ধুলিস্যাৎ করার জন্য গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ইসরাঈলীদের পিছনে ধাওয়া করে তখন আল্লাহ্‌র শাস্তি খড়্গের মত নেমে আসে। তারা সকলেই সমুদ্রের মাঝে নিমজ্জিত হয়{১০:৯০-৯২} তিন ও চার নম্বরের জন্য দেখুন পরবর্তী টিকা সমূহ।

৪৬। অথবা তাদের যাতায়তের মধ্যেখানে তাদের হিসেবের জন্য ধরবেন না ? ২০৭২। (তখন) আল্লাহ্‌কে ব্যর্থ করার তাদের কোনও সুযোগই থাকবে না।

২০৭২: তিন নম্বর, ষড়যন্ত্রকারীদের উপরে শাস্তি যে কোনও মূহুর্তে পতিত হতে পারে। তাদের বাড়ীতে বা চলাফেরা করার সময়ে -যখন তারা তাদের কৃত কর্মের জন্য অন্ধ অহংকারে আপ্লুত হয়। আবু জাহেল ছিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উদ্ধত অহংকারে আচছন্ন হয়ে আবু জাহেল মদিনা আক্রমণ করে ২য় হিজরীতে। সে ছিলো খুবই দাম্ভিক কারণ মক্কা বাসীর সৈন্য সংখা ছিলো মুসলমানদের তিন গুণ এবং তারা ছিলো উন্নত অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত। কিন্তু মক্কাবাসীরা এতদ্‌সত্বেও অপমানের পরাজয় বরণ করে এবং এই যুদ্ধে আবু জাহেল নিহত হয়।

৪৭। অথবা তাদের হিসেবের জন্য ধরবেন না তাদের ধীরে ধীরে (অর্থ, স্বাস্থ্য ক্ষমতা ইত্যাদি) ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সময়ে? ২০৭৩। অবশ্যই তোমার প্রভু দয়া ও করুণায় পরিপূর্ণ।

২০৭৩: চার নম্বর ক্ষয় হয়ে যাওয়া অবস্থা, অপরাধীরা এই অবস্থা তখনই প্রাপ্ত হয় যখন সে দেখতে পায় তার চতুদ্দির্ক ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। শাস্তি তার জন্য অবধারিত তা যখন সে উপলব্ধি করে। মাওলানা ইউসুফ আলী সাহেব অনুবাদ করেছেন এভাবে, "Or that He may not /call them to accout/By a process of Slow wastage-?" অনেক সময়েই অপরাধীর অপরাধের শাস্তি ধীরে ধীরে, দেখা যায় না এ ভাবে আসতে থাকে। আল্লাহ্‌র শক্রদের ক্ষমতা ও শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তা ধ্বংস হয়ে যায়। ইসলামের বিজয়ে ঠিক এরূপ ঘটনাই ঘটেছিলো। হযরতের (সাঃ) মক্কা থেকে মদিনাতে নির্বাসনের আট(৮) বছর পরে মক্কা বিজয় ঘটে। মক্কা বিজয় ছিল রক্তপাতহীন বিজয়-- কারণ শত্রুদের ক্ষমতা ও শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচিছল। মক্কা বিজয়ের পরে রসুল (সাঃ) যে উদারতা ও ক্ষমা প্রদর্শন করেন তা সবই ছিল আল্লাহ্‌র প্রদত্ত। আল্লাহ্‌র তরফ থেকেই তিনি তা প্রদর্শন করেন। এই আয়াতে আল্লাহ্‌র দুইটা বিশেষ গুনের কথা বলা হয়েছে: "Ra-uf" অর্থাৎ দয়াময় বাংলায় অনুবাদ হয়েছে দয়াদম অন্যটি হচেছ "Rahim" করুণাময়।

৪৮। তারা কি আল্লাহ্‌র সৃষ্টির প্রতি লক্ষ্য করে না? (এমন কি জড়) পদার্থও তার ছায়াকে ডানদিক থেকে বাম দিকে ঢলে পড়ে আল্লাহ্‌র প্রতি সেজদাবনত হয়। এবং সেটাই সর্বোচ্চ বিনায়াবনত।২০৭৪

২০৭৪: এই আয়াতে যে বস্তুর উল্লেখ আছে তা হচেছ প্রাণহীন বস্তু প্রকৃতিতে আমরা যা জড় পদার্থ রূপে পরিগণিত করি। বিজ্ঞানের এক বিরাট শাখা হচেছ পদার্থ বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের এই শাখা আমাদের বলে যে প্রকৃতির সমস্ত বস্তুই নির্দ্দিষ্ট প্রাকৃতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য। সে আইন ভাঙ্গার ক্ষমতা কারও নাই। এই আয়াতে উপমার সাহায্যে এই সত্যকেই তুলে ধরা হয়েছে। আলোর ধর্মের জন্য বস্তুর ছায়া নির্ধারিত হয়। কখনও তা দক্ষিনে কখনও তা বামে পড়ে। আলোর এই ধর্মের পরিবর্তনের ক্ষমতা আলোরও নাই, বস্তুরও নাই। এসব প্রাণহীন বস্তু একান্ত অনুগতভাবে তাদের জন্য যে আইন বা নিয়ম আল্লাহ্‌ করে দিয়েছেন তা মেনে চলে। এই মেনে চলাকেই বলা হয়েছে আল্লাহ্‌র প্রতি "সিজদাবনত'' হয়। কারণ সিজদার মাধ্যমে আমরা একান্ত অনুগতভাবে আল্লাহ্‌র ইচছার কাছে আÍসমর্পন করি।

৪৯। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহ্‌কে অভিবাধন জানায়,-হতে পারে তারা চলমান (জীবন্ত) প্রাণীকূল অথবা ফেরেশ্‌তারা ২০৭৫। তারা কেউ (তাদের প্রভুর সম্মুখে) উদ্ধত হয় না।

২০৭৫: "পৃথিবীতে যা কিছু আছে'' এ কথার অর্থ হচেছ পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র সৃষ্ট সকল জীবন্ত প্রাণী ও প্রাণহীন পদার্থ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র সৃষ্ট সকল পদার্থই, প্রাণহীন বা জীবন্ত সব এর অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল সৃষ্ট পদার্থকে তিন শ্রেনীতে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রাণহীন পদার্থ, দ্বিতীয়তঃ যাদের প্রাণ আছে। তৃতীয়তঃ ফেরেশতা বা দেবদুতগণ। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে সৃষ্টির সকলেই আল্লাহর হুকুম বা আইন মেনে চলে, এমনকি ফেরেশতারাও এর বাইরে নয়। ফেরেশতাদের বিশেষত্ব বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে তারা বিনয়ের সাথে আল্লাহ্‌র ইচছার কাছে আত্মসমপর্ন করে। অর্থাৎ অত্মসমর্পণকারীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে বিনয়।

উপদেশ : (প্রকৃত ধর্মভীরু বা আল্লাহ্‌র ইচছার কাছে আত্মসমর্পণকারী হবে নিরহংকার ও বিনয়ী এই আল্লাহ্‌র আদেশ।)

৫০। তারা সকলেই তাদের প্রভুকে শ্রদ্ধা করে (২০৭৬) যিনি তাদের উপরে পরাক্রমশালী এবং তাদের যা আদেশ করা হয় তারা তা পালন করে।


২০৭৬: আল্লাহ্‌ সকল কিছুর উপরে পরাক্রমশালী। তার অধিষ্ঠান এত উচেচ যে তার সৃষ্ট বিশ্ব প্রকৃতির সকল বস্তু তাঁকে ভয় এবং ভক্তি সহকারে আত্মনিবেদন করে, তারা আনন্দের সাথে তাদের উপরে অর্পিত কতর্ব্য পালন করে থাকে। এভাবেই তারা আল্লাহ্‌কে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। শ্রদ্ধা করে বাক্যটি দ্বারা এই ভাবকেই প্রকাশ করা হয়েছে।

রুকু-৭

৫১। আল্লাহ্‌ বলেছিলেন : (এবাদতের জন্য) দুই উপাস্য গ্রহণ করো না ২০৭৭। তিনিই তো একমাত্র উপাস্য (আল্লাহ্‌), সুতারাং আমাকে ভয় কর (এবং শুধুমাত্র আমাকেই)।

২০৭৭: প্রাচীন পারসিয়ানরা বিশ্বাস করতো যে পৃথিবী দুইটি শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। একটি ভালো, অন্যটি মন্দ। আরব প্যাগানদেরও জোড়ায় জোড়ায় ঈশ্বর ছিল যেমন: জিব্‌ত (জাদু) এবং তাগুত (মন্দ) (দেখুন আয়াত:৪:৫১ এবং টিকা ৫৭৩) ইসাফ ও মারওয়া নামক মূর্তি যাদের স্থাপন করা হয়েছিলো সাফা ও মারওয়ার উপরে ইত্যাদি।

৫২। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তারই অধিকারে এবং নিরবিচিছন্ন আনুগত্য তাঁহারই প্রাপ্য। তাহলে তোমরা কি আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্যকে ভয় করবে ? ২০৭৮

২০৭৮: মোশরেক আরবরা মাঝে মাঝে প্রকৃত সত্যের আলো অনুভব করতো, কিন্তু তারা অমঙ্গলকারী দুষ্ট শক্তির ভয়ে সর্বদা ভীত হয়ে থাকতো। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, তাদের এই ভয় অমূলক। কারণ যারা শুধু মাত্র এক'ইলাহ' বা এক স্রষ্টার ক্ষমতায় বিশ্বাসী তাদের কোন অমঙ্গল বা ক্ষতি করার ক্ষমতা কোনও শক্তির নাই, (১৫:৪২) আয়াত দেখুন। খোদাভীরু লোকেরা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ক্রোধকে ভয় পায়। তারা পৃথিবীর অন্য কোনও শক্তিকে ভয় পায় না। পূণ্যাত্মা যারা তারা তাদের সকল মঙ্গঁল ও কল্যাণ আল্লাহ্‌র উপরে ন্যস্ত করে নিশ্চিত থাকে। তাদের অন্তর থাকে ভয়শূন্য কারণ তারা জানে পৃথিবীর অন্য কোন কিছু তাদের ক্ষতি করতে অক্ষম।

মন্তব্য: মুসলমান যখন এক 'ইলাহ' থেকে বিচ্যুত হয়, তখনই তাদের মধ্যে বিপদে বা দুর্যোগে বিভিন্ন পীর, ফকির ও মাজার পূঁজাতে অংশ গ্রহণের প্রবণতা জন্মে।

৫৩। ভালো জিনিস যা কিছু তোমাদের কাছে আছে তা তো আল্লাহ্‌র কাছ থেকেই এসেছে। তা ছাড়া যখন দুঃখ দুর্দ্দশা তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তোমরা তাঁকেই ব্যকুলভাবে ডাক। ২০৭৯

২০৭৯: "তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে ডাক''। এই আয়াতে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণ মানুষ সুখের দিনে আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে ভোগ করে। সে ভুলে যায় এসব সর্বশক্তিমান প্রতিপালকের দান। কিন্তু যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখনই সে ব্যাকুলভাবে সর্বান্তকরণে সেই সর্বশক্তিমানের সাহায্য কামনা করে, বিপদ থেকে পরিত্রাণ চায়। এই-ই হচেছ মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা।

৫৪। তবুও, যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ -দুর্দ্দশা দূর করে দেন; দেখো তখন তোমাদের একদল তাদের প্রভুর সাথে শরীক করে থাকে--

৫৫। (যেনো এভাবেই) তারা তাদের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে, আল্লাহ্‌ তাদের যে অনুগ্রহ দান করেছেন তার জন্য। সুতারাং (তোমাদের সংক্ষিপ্ত দিনকে) ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমাদের (বোকামী) জানতে পারবে।

৫৬। আমি তাদের যে জীবনোপকরণ দান করেছি (এমনকি) তার এক অংশ নির্ধারিত করে তাদের জন্য যাদের সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না (২০৮০,২০৮১)। আল্লাহ্‌র কসম; তোমাদের ঐ বস্তুর বিষয়ে কৈফিয়ত দিতে হবে যা তোমরা মিথ্যা বানিয়ে বলতে।


২০৮০: দেখুন (৬:১৩৬-১৪০, ১৪২-১৪৪ এবং ৫:১০৩)। এই আয়াতগুলিতে বলা হয়েছে কিভাবে মোশরেকরা যুগে যুগে কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে থাকে। এখানে প্যাগান আরবদের কয়েকটি কুসংস্কারের কথা বর্ণনা করা হয়েছে তারা তাদের সন্তানদের, গৃহপালিত পশুদের ও উৎপন্ন শস্যের একটি অংশ নির্ধারিত করতো এবং উৎসর্গ করতো মিথ্যা উপাস্যের নামে এবং একই সাথে তারা সর্বশক্তিমান এক আল্লাহ্‌র নামেও নির্ধারিত অংশ উৎসর্গ করতো। ব্যাপারটি গভীরভাবে চিন্তা করলে নিতান্তই হাস্যকর বলে মনে হবে। কারণ যিনি সর্বশক্তিমান, যিনি এই বিরাট বিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সমস্ত বিশ্বভুবন যার করতলগত, মানুষের জীবন, সম্পদ, মান-সম্মান, সবই যার দান- সেই আল্লাহ্‌কে তাঁর অংশ দান বা উৎর্সগ করা নিতান্তই হাস্যকর প্রথা নয় কি? এ কথা মানুষ ভুলে যায় কি করে যে, তার জীবনের সর্ব সুখ, সর্ব সম্পদ, সব কিছু মহান আল্লাহ্‌র দান? দ্বিতীয়তঃ তারা আল্লাহ্‌র সাথে অলীক ঈশ্বরের কল্পনা করে, যার কোনও অস্তিত্বই নাই। মহান আল্লাহ্‌ মানুষকে গৃহপালিত পশু ও শস্য দান করেছেন। এখানে সম্পদের প্রতীক হিসেবে পশু সম্পদ ও শস্যকে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ মানুষকে সম্পদ দান করেছেন তার শারীরিক বা প্রাত্যহিক জীবন ধারনের জন্য এবং সন্তান দান করেছেন সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের পূর্ণতার জন্য। অজ্ঞ মানব! কিভাবে তারা আল্লাহ্‌র দান থেকে আল্লাহ্‌কে দান করতে পারে?

২০৮১: "যাদের সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না।'' এই উক্তি যারা মূর্তিপূজক ও যারা কাল্পনিক শক্তির পূজক, তাদের সম্বন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। মূর্তিপূজক ও কাল্পনিক শক্তির পূজকদের তাদের উপাস্য সম্বন্ধে কোন ধারণাই নাই। মূর্তি হচেছ নিষ্প্রাণ, সুতারাং তার ক্ষমতা বা শক্তি সম্বন্ধে ধারণা করা মূর্খতার শামিল। আবার কাল্পনিক শক্তি হচেছ ব্যক্তির নিজস্ব ধ্যান ধারণার সৃষ্টি। সুতারাং তারও কোনও বাস্তব সত্যের ভিত্তি নাই।

৫৭। এবং তারা আল্লাহ্‌র জন্য কন্যা সন্তান নির্ধারন করে। তিনি পবিত্র মহিমান্বিত! -এবং তাদের নিজেদের জন্য (পুত্র সন্তান), যা তারা আকাঙ্খা করে। ২০৮২

২০৮২: পৌত্তলিক আরবেরা ফেরেশ্‌তা বা আল্লাহ্‌র দূতদের আল্লাহ্‌র কন্যা সন্তান বলে অভিহিত করতো। আল্লাহ্‌কে তারা কন্যা দ্বারা সম্মানিত করতো। কিন্তু নিজেদের জীবনে কন্যা সন্তানের জনক হওয়াকে অত্যন্ত ঘৃণা করতো। এ কথা আমরা সকলেই জানি যে রসুলের (সাঃ) আগমনের পূর্বে কন্যা সন্তান জন্ম পরিবারের জন্য ছিলো অপমানকর বিষয় এবং এ জন্য জন্মের পরে কন্যা সন্তানকে হত্যা করা হতো। পুত্র সন্তানকে শক্তি ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করতো। কারণ যুদ্ধের সময়ে পুত্র, পিতার ও গোষ্টির জন্য শক্তি বয়ে আনতো। অপর পক্ষে কন্যা সন্তান ছিলো অসম্মানের প্রতীক।

৫৮। তাদের কাউকে যখন কন্যা (সন্তানের জন্মের) সংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায়। এবং সে দুঃখ-মণঃস্তাপে পূর্ণ হয়ে পড়ে।

৫৯। লজ্জায় সে তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট থেকে আত্মগোপন করে, কারণ হচেছ, গ্লানিকর সংবাদ যা সে পেয়েছে তার হেতু। (সে চিন্তা করে) হীনতা সত্ত্বেও কি সে তাকে (কন্যাকে) রেখে দেবে না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? (২০৮৩,২০৮৪)। হায়! তারা যে সিদ্ধান্ত করে তা কত মন্দ (পছন্দ) ২০৮৫।

২০৮৩: "সে চিন্তা করে'' এই বাক্যটি মূল আরবীতে উহ্য আছে। এখানে "তাকে'' শব্দটি কন্যা সন্তানের জন্য প্রযোজ্য হয়েছে।
২০৮৪: অনুরুপ আয়াত দেখুন (৮১:৮-৯)। পৌত্তালিক আরবেরা নবজাত কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। এই আয়াতগুলিতে তাদের সেই জঘন্য রীতিকে কঠোর ভাষাতে তিরস্কার করা হয়েছে।

২০৮৫: রসুলুল্লার (সাঃ) পূর্বে কন্যা সন্তানের জন্ম পরিবারের জন্য ছিলো গ্লানি ও হীনতার প্রতীক স্বরূপ। সুতারাং পরিবারের জন্য দ্বিবিধ পথ উম্মুক্ত ছিলো। হয় হতভাগ্য কন্যা সন্তানকে জীবিত রেখে সমস্ত পরিবারকে অপমান ও হীনতার মাঝে নিমজ্জিত করা অথবা পরিবারের সম্মান ও গৌরবকে সমুন্নত রাখার জন্য কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া। কি ভয়ানক পাপের পথ তাদের জন্য উম্মুক্ত ছিলো!

৬০। যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য মন্দ (প্রকৃতির) উপমা প্রযোজ্য। আল্লাহ্‌র জন্য প্রযোজ্য মহত্তম (প্রকৃতির) উপমা। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমতায় পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাতে পরিপূর্ণ। ২০৮৬

২০৮৬: "Mathal" এই আরবী শব্দটি সাধারণত উপমা বা উদাহরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্তমান আয়াতে শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে আল্লাহ্‌র বিশেষ গুণবাচক ধর্মের প্রকাশের অভিব্যক্তিরূপে। দেখুন আয়াত (৩০:২৭)

রুকু-৮

৬১। আল্লাহ্‌ যদি মানুষকে তাদের পাপের জন্য শাস্তি দিতেন, তবে (পৃথিবীতে) কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না। কিন্তু তিনি এক নির্দ্দিষ্ট সময় কাল পর্যন্ত তাদের সময় দিয়ে থাকেন। যখন তাদের (নির্ধারিত) সময় শেষ হয়ে যায়, তখন তারা (শাস্তিকে) মূহুর্তকালও বিলম্ব বা ত্বরা করতে পারবে না। ২০৮৭

২০৮৭: আল্লাহ্‌র হুকুম নির্ভুলভাবে এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে পালিত হয়। দয়াময় আল্লাহ্‌ যদি প্রতিটি ভুলের জন্য আমাদের শাস্তি দান করতেন তবে পৃথিবীর কোনও জীবন্ত প্রাণীই তার শাস্তি থেকে রেহাই পেতো না। কিন্তু তিনি তো অসীম করুণাময়। তিনি সকলকে নির্দ্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অনুতাপ করার জন্য অব্যহতি দিয়ে থাকেন। যদি কেউ অনুতাপ করে তবে আল্লাহ্‌র করুণা অবশ্যই অবধারিত ভাবে আসন্ন। আর যদি পাপী তার পাপের জন্য অনুতাপ না করে, তবে নির্দ্দিষ্ট সময় অন্তে তার পাপের শাস্তি অবশ্যই নিপতিত হবে। এই-ই আল্লাহ্‌র বিধান। পাপীরা ইচছা করলেই শাস্তিকে ত্বরান্বিত বা দেরী করাতে পারে না। তাদের উদ্ধত অহংকারে, শাস্তিকে ত্বরান্বিত করার আহ্‌বানে, শাস্তি ত্বরান্বিত হবে না বা নির্দ্দিষ্ট মেয়াদান্তে যখন তাদের উপরে শাস্তি বা আযাব নিপতিত হবে, ইচছা করলেও পাপীরা তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। এ কথা যেনো কোনও পাপীরা মনে না করে যে তাকে অনুতাপের মাধ্যমে সংশোধনের যে সুযোগ ও সময় দান করা হয়েছে সে সেই সুযোগে যা খুশী তাই করতে পারবে বা আল্লাহ্‌র শাস্তি থেকে সে বেকসুর খালাস পেতে পারবে।

৬২। (নিজেদের জন্য) তারা যা ঘৃণা করে, তারা তা আল্লাহ্‌র প্রতি আরোপ করে ২০৮৮। এবং তাদের জিহ্বা নিশ্চয়ই করে বলে যে, সকল কল্যাণ তাদের জন্য (নির্ধারিত) ২০৮৯। নিঃসন্দেহে তাদের জন্য (নির্ধারিত) আছে আগুন, এবং তাদেরকেই সর্বাগ্রে (উহাতে) নিক্ষেপ করা হবে।

২০৮৮: দেখুন পূর্বের আয়াত (১৬:৫৭-৫৮) এবং এর টিকা সমূহ।

২০৮৯: যারা মনে করে পৃথিবীর জীবনই একমাত্র জীবন এর পরে আর কিছু নাই, তাদের জীবন দর্শন হচেছ: ভোগ-বিলাস শ্রেষ্ঠ বিধান। তারা ভালো মন্দ, ন্যায় অন্যায়, সত্য-মিথ্যার ভেদ করে না। জীবনের চরম এবং পরম পাওয়া হচেছ ভোগ বিলাস। প্রতিটি কর্মেরই কর্মফল আছে। মন্দ কর্মের কখনও ভালো ফল হতে পারে না। মিথ্যা ও পাপ আত্মার মাঝে যন্ত্রণার সৃষ্টি করে যা দোযখের আগুনের পূর্ব প্রস্তুতি স্বরূপ। যারা মিথ্যার কাছে আÍমর্পণ করে তাদের সর্বাগ্রে দোযখের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।

উপদেশ: মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করা আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে পাপ; যাদের আবাসস্থল দোযখ। সুতারাং মুসলমান হিসেবে আমাদের সত্য বলা, সত্যকে অনুসরণ করা এবং মিথ্যাকে পরিহার করার অভ্যাস করতে হবে। অন্যথায় আমাদের ধ্বংস অনিবার্য।

৬৩। শপথ আল্লাহ্‌র! আমি তোমার পূর্বেও বহু জাতির নিকট (আমার রাসুল) প্রেরণ করেছি। কিন্তু শয়তান (দুষ্টদের) চক্ষে তাদের নিজেদের কাজকে মনোমুগ্ধকর করে দেখায়। আজকে সেই-ই তাদের অভিভাবক ২০৯০। কিন্তু তাদের জন্য থাকবে ভয়াবহ শাস্তি।

২০৯০: যুগে যুগে আল্লাহ্‌ নবী ও রসুলদের প্রেরণ করেছেন পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায়ের পথ প্রদর্শন করার জন্য। কিন্তু যারা পাপী তাদের চোখে পাপের পথকে অত্যন্ত মনোহর বলে ভ্রম হয়। তার ফলে তারা সত্য পথকে ত্যাগ করে শয়তানের পথ বা পাপের পথ, মিথ্যার পথ গ্রহণ করে। যে পাপের পথ তাদের পূর্বপু্রুষেরা গ্রহণ করেছিলো তারাও সেই পথে যাত্রা করে। ফলে তাদের পক্ষে সঠিক পথকে অনুসরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ তাদের নিকট পাপের পথকে অত্যন্ত শোভন বলে ভ্রম হয়। এ কথা আল-মুস্তফার (সাঃ) সময়ে সম সাময়িক পথভ্রষ্ট আরব পৌত্তলিকদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। এখনও প্রযোজ্য আছে। মানুষ যখনই পাপ ও মিথ্যার কাছে আত্মসমর্পন করে, তখন তার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটে। পাপকে পাপ, মন্দকে মন্দ ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলে উপলব্ধি ঘটে না। তাদের দৃষ্টিতে এ সবই শোভনরূপে বিরাজ করে। কারণ শয়তান তখন তাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে। এদের জন্য আছে মর্মন্তদ শাস্তি।

৬৪। আমি তোমার নিকট কিতাব প্রেরণ করেছি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে, তারা যে বিষয়ে মতভেদ করে তা সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য ২০৯১। এবং (ইহা হবে) বিশ্ববাসীদের জন্য পথনির্দেশ ও অনুগ্রহ স্বরূপ।

২০৯১: এই আয়াতে আল্লাহ্‌র রসুলের (সাঃ) কর্তব্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। রসুলুল্লার প্রতি কুর-আন বা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয় তিনটি উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে-

(১) কালের আবর্তনে কিতাবধারী জাতিদের মধ্যে নানা মতবাদের উদ্ভব হয় এবং তারা একত্ববাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধে লিপ্ত হয়। রসুলকে (সাঃ) প্রেরণ করা হয় এ সব বিবাদমান গোষ্ঠীকে তাদের মতভেদ সম্বন্ধে সম্যক অবহিত করা এবং একত্ববাদের পতাকা তলে সকলকে সমবেত করার জন্য। এক আল্লাহ্‌ বা একত্ববাদ মানুষকে বিশ্বমানবতার ক্ষেত্রে আহ্বান করে। মানুষ বর্ণ, গোষ্ঠী, সব কিছুর উর্দ্ধে উঠতে সক্ষম হয়।

(২) আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়। পৃথিবীতে চলার পথ অত্যন্ত ক্লেদাক্ত ও পিচিছল। চরিত্রের মাধুর্যে নিজেকে সমুন্নত রেখে জীবনের পথকে অতিক্রম করার পথ নির্দ্দেশ হচেছ কুর-আন। যে সব গুণাবলী মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে তার উল্লেখ আছে কুর-আনে। সুতারাং সঠিক পথে চলার জন্য কুর-আন বা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে জানতে হবে।

(৩) এই সেই মহাগ্রন্থ যেখানে পাপীদের মুক্তির পথ নির্দ্দেশ দান করা হয়েছে। অনুতাপের মাধ্যমে মুক্তির পথ বিদ্যমান। বিপথগামী অনুতাপকারীর জন্য আছে আল্লাহ্‌র করুণা, দয়া ও আধ্যাত্মিক মুক্তি।

৬৫। আল্লাহ্‌ আকাশ থেকে বৃষ্টি প্রেরণ করেন এবং উহা দ্বারা তিনি মৃত ভূমিকে জীবন দান করেন। অবশ্যই যারা (আল্লাহ্‌র বাণী) শোনে এর মাঝে তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। ২০৯২

২০৯২: এই আয়াতে সুন্দর উপমার সাহায্যে মানুষের জীবনের শেষ পরিণতিকে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের জীবনকে এখানে পৃথিবীর উদ্ভিদ জগতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। শস্য শ্যামল পৃথিবী তার সমস্ত উদ্ভিদ জগত সহ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে বৃষ্টিপাতের অভাবে। শুষ্ক মাটিতে সবুজ বৃক্ষ সমূহ বিবর্ণ হয়ে যায়; শেষে একদিন সে ধরনীর বুক থেতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়-পড়ে থাকে শুধু ঊষর ধরিত্রি। কিন্তু সেই মাটিতে যখন আবার মেঘের আনাগোনা শুরূ হয়। জলভারে নত মেঘ অঝোর ধারা বর্ষণ করে, ঊষর মাটি বর্ষণধারায় সিক্ত হয়ে ওঠে,ফলে ধরিত্রি আবার সতেজ সবুজের সমারোহে ভরে ওঠে। মৃত মাটি আবার বৃষ্টিধারাতে প্রাণের স্পন্দনে ভরে ওঠে। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক ক্রিয়া আল্লাহ্‌র রহমতের এবং ক্ষমতার এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত। যিনি মৃত পৃথিবীকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন, তিনি অবশ্যই ক্ষমতা রাখেন মৃত্যুর পরে জবাবদিহিতার জন্য পুনরুজ্জীবিত করার।

রুকু-৯

৬৬। এবং গবাদি পশুর (মধ্যে) তোমরা উপদেশপূর্ণ নিদর্শন দেখতে পাবে ২০৯৩। তাদের শরীরের মধ্যস্থিত গোবর ও রক্ত থেকে আমি উৎপন্ন করি তোমাদের জন্য পানীয় দুগ্ধ যা পানকারীদের জন্য বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু।(২০৯৪, ২০৯৫)।
২০৯৩: 'আন্‌ আম' অর্থ গৃহপালিত পশু যা থেকে আমরা দুধ পাই আমাদের ও আমাদের শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে। এই উপমার সাহায্যে আল্লাহ্‌ আমাদের দৃষ্টিকে পার্থিব ও শারীরিক পুষ্টি বা উন্নতি থেকে আধ্যাতিক উন্নতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এখানেই স্রষ্টার বিচক্ষণতা ও ভালোবাসার স্বাক্ষর। দুই-একটি উদাহরণের সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য তাঁর জ্ঞান, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও করুণার স্বাক্ষর। পূর্বের আয়াতে মৃত মাটি বা পৃথিবীর উপমাকে তুলে ধরা হয়েছে, কিভাবে মৃত পৃথিবী আল্লাহ্‌র করুণায় সঞ্জীবিত হয়ে আবার প্রাণ লাভ করে। এই আয়াতে এবং পরবর্তী দুটো আয়াতে গরুর দুধ, খেজুর, আঙ্গুঁর ও মধুকে উপমার বিষয় বস্তু করা হয়েছে। মানুষের মঙ্গলের জন্য, কল্যানের জন্য স্রষ্টার দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা দয়া, করুণার স্বাক্ষর তার সর্বসৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান। আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও বিচক্ষণতাকে ভাষায় বর্ণনা অসাধ্য। এ সব উপমার সাহায্যে তার দয়া ও করুণাকে প্রকাশ করতে চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

২০৯৪: "তাদের''-অর্থাৎ গৃহপালিত পশুর।

২০৯৫: দুধ হচেছ গাভীর দেহ নিঃসৃত এক প্রকার তরল পদার্থ। প্রতিদিনের জীবনে আমরা দেখি, প্রসবের পরে বাছুর গরুর জন্য স্তন দুধে ভরে ওঠে। দুধ একটি সম্পূর্ণ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আজকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ দুধের জন্য ডাইরী ফার্মে উন্নত জাতের গাভী পালন করে থাকে যারা বাছুরের খাবার পরেও প্রচুর দুগ্ধ উৎপন্ন করে যা সাধারণ মানুষ, রুগী ও শিশুদের পুষ্টিকর ও উত্তম খাদ্য হিসেবে বহুল প্রচলিত। গরুর দুধের সাথে আমাদের জীবন ধারণ এতই সম্পৃক্ত যে, আমরা কোন দিন এর উৎস সম্বন্ধে তলিয়ে চিন্তা করি না। ষাড় ও গাভী একই খাদ্য খেয়ে থাকে, কিন্তু শুধু গাভী-ই দুগ্ধ উৎপাদনে সম্ভব, ষাড় গরু নয়। খাদ্যের সার পদার্থ রক্তে মিশে যায় এবং অন্যান্য বর্জ পদার্থ দেহ ত্যাগ করে গোবর রূপে। প্রাকৃতিক এই নিয়মের মাঝেই, রক্ত থেকে মাতৃদুগ্ধ উৎপন্ন হয়। এও আল্লাহ্‌র সৃষ্টির এক বিস্ময়কর দিক নয় কি ?

৬৭। খেজুর গাছের ফল এবং অঙ্গুর থেকে তোমরা স্বাস্থ্যকর পানীয় এবং খাদ্য লাভ করে থাকো ২০৯৬। দেখো! এখানেও জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।

২০৯৬: আঙ্গুর ও খেজুর থেকে আমরা খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুত করে থাকি। আঙ্গুর ও খেজুর থেকে মাদক ব্যতীত বিভিন্ন পানীয় উৎপাদন সম্ভব যেমন:- ভিনিগার, খেজুরের চিনি, আঙ্গুরের রস ও চিনি, ইত্যাদি। উপরন্ত আঙ্গুর ও খেজুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। "Sakas" শব্দটি অধিকাংশ তফসীরকারদের মতে 'মাদক দ্রব্য'। আলোচ্য আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ। মদের নিষেধাজ্ঞা এর পরে মদিনায় অবতীর্ণ হয়। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময়ে মদ নিষিদ্ধ ছিল না। মুসলমানেরা সাধারণভাবে তা পান করতো। কিন্তু তখনও এ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মদ্যপান ভাল নয়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে শরাবকে কঠোরভাবে হারাম করার জন্য কোরানে বিধি বিধান আরোপ করা হয়।

৬৮। তোমার প্রভু মৌমাছিকে পাহাড়ে, গাছে এবং (মানুষের) বসতির মাঝে মৌচাক নির্মাণ করতে শিক্ষা দিয়েছেন ২০৯৭।

২০৯৭:Auha : Wahyun যার সাধারণভাবে অনুবাদ করা যায় প্রত্যাদেশ। প্রত্যাদেশ শব্দটি নবী ও রসুলদিগের সম্বন্ধে ব্যবহৃত হয়, সে অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয় নাই। এখানে কাউকে কোনও কথা গোপনে এমনভাবে বুঝিয়ে দেয়া যে অন্য ব্যক্তি তা বুঝতে না পারে, অর্থাৎ আল্লাহ্‌র ইচছা বা হুকুম ব্যক্তি তা প্রাণীর হৃদয়ে অঙ্কিত হওয়াকে এখানে উপরের শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে মৌমাছির সহজাত প্রবৃত্তিকে আল্লাহ্‌র শিক্ষারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন সহজাত প্রবণতা বা প্রবৃত্তি আছে। সে সমস্তই তাদের বৈশিষ্ট্য। কীট পতঙ্গ থেকে বিশাল প্রাণী জগত সকলেই আপন আপন বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। এ সকলই আল্লাহ্‌ তাদের শিক্ষা দান করে থাকেন তাদের অন্তরে তাদের ডি, এন, এর মাধ্যমে। সূরা (৯৯:৫) আয়াতে এই শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে পৃথিবীর জন্য। আমরা এ সম্বন্ধে আলোচনা করব নির্দ্দিষ্ট সময়ে। মৌচাক মৌমাছিদের বাসস্থান। কাঠামোগত দিক থেকে মৌচাক এক আশ্চর্য সৃষ্টি। নির্দ্দিষ্ট জ্যামিতিক মাপে অসংখ্য ষড়ভূজ খোপের সমন্বয়ে মৌচাকের সৃষ্টি। এসব ষড়ভূজের মাপ ও স্থাপন অত্যন্ত সুকৌশলে করা হয় সকল সময়ে ষড়ভূজের মধ্যে সমতা বিধান করে। মৌচাকের প্রতিটি খোপ ষড়ভূজ এবং প্রতিটি ষড়ভূজ জ্যামিতিক নির্দ্দিষ্ট মাপের এবং ষড়ভূজ গুলি পরস্পর সমতার বিধানে সন্নিবেশিত - যা করতে মানুষের অনেক যান্ত্রিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মৌমাছির মত ক্ষুদ্র প্রাণী কোনও যান্ত্রিক সাহায্য ব্যতীতই কিভাবে নির্ভূল ভাবে মৌচাকের মত বাসস্থান বানাতে সক্ষম? এ কি আল্লাহ্‌র কুদরত নয়? সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা মৌমাছিরা এমন স্থানে তাদের মৌচাক প্রস্তুত করে যেখানে সাধারণ মানুষ বা প্রাণী খুব সহজে প্রবেশ লাভ করতে পারে না যেমন: পাহাড়, গাছের উঁচু ডাল, বা মানুষের বাসস্থানের কোনও দুর্গম জায়গায়। মৌমাছির উদাহরণ স্রষ্টার সৃষ্টির বিস্ময়কর রূপকে অনুধাবনের জন্য।

৬৯। "তারপর (পৃথিবীর) সকল উৎপন্ন দ্রব্য থেকে (রস আহরণ করে) খেতে থাক ২০৯৮; এবং দক্ষতার সাথে তোমাদের প্রভুর পথকে অনুসরণ কর।'' (এভাবে) তার পেট থেকে রং বেরং এর পানীয় (মধু) বের হয়,যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। যারা চিন্তাশীল, নিশ্চয়ই এর মধ্যে তাদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। ২০৯৯

২০৯৮: মৌমাছি বিভিন্ন ফুল থেকে ফুলের নির্যাস সংগ্রহ করে এবং নিজ লালার সাথে মিশ্রিত করে মধুতে রূপান্তরিত করে এবং তা মৌচাকে সংরক্ষিত করে। মৌচাক তৈরি হয় মৌমাছির দেহ নিঃসৃত মোম থেকে। একই ফুলের নির্যাস থেকে আহরিত বস্তু থেকে মৌমাছি কখনও মৌচাক তৈরি করার উপাদান সৃষ্টি করে কখনও বাচচা মৌমাছিদের খাদ্য মধু তৈরি করতে পারে। এও কি স্রষ্টার এক অপার কলা কৌশলের উদাহরণ নয় কি? এই আয়াতে বলা হয়েছে খাদ্য ও ঋতুর তারতম্যের কারণে মধুর রং বিভিন্ন হয়। কখনও তা গাড় খয়েরি, কখনও হালকা খয়েরি, সোনালী, সাদা ইত্যাদি। স্বাদ ও গন্ধ নির্ভর করে ঋতু উপযোগী ফুলের উপর। কোন মধু হয় সুন্দর সুগন্ধ যুক্ত, কোনও মধুতে গন্ধ থাকেনা। যেমন আমাদের দেশে নিম গাছের নিকট যে সব মৌচাক থাকে তাদের মধু হয় তিক্ত স্বাদ যুক্ত-আবার সর্ষে ফুলের মাঠের কাছের মৌচাকে মধু হয় সোনালী রং এর এবং সুন্দর গন্ধ যুক্ত। খাদ্য হিসাবে মধু পুষ্টিকর ও উপাদেয়। ঔষদ হিসাবে মধুর ব্যাপক ব্যবহার আছে-এই আয়াতে আল্লাহ্‌ আমাদের সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। আয়াতটি শেষ করা হয়েছে "অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য'' লাইনটি দ্বারা। এ কথার তাৎপর্য হচেছ: আল্লাহ্‌র সৃষ্টির বিভিন্ন দিককে চিন্তার মাধ্যমে, অনুশীলনের মাধ্যমে, শিক্ষার মাধ্যমে, জ্ঞানের মাধ্যমে অনুধাবনের চেষ্টা করা। যদি তা করা যায় শুধু তখনই স্রষ্টার বিশালত্ব, মহিমা, জ্ঞান, করুণাকে অনুধাবন করা সম্ভব। যারা শুধু মাত্র ধর্মীয় বিধি বিধান মেনে চলে তারা ধর্মকে না মেনে মুসলমান সমাজকে মেনে চলে মাত্র। তারা আচার বিচারকেই ধর্ম বলে সাব্যস্ত করে- আল্লাহ্‌কে অনুধাবনের মাধ্যমে নয়, সর্বশক্তিমানকে হৃদয়ে ধারণ করার মাধ্যমে নয়, আল্লাহ্‌র মহিমাকে উপলব্ধির মাধ্যমে নয়। কিন্তু এই সব আয়াত থেকে এ সত্য স্পষ্ট প্রতিভাত যে আল্লাহ্‌র জ্ঞান, মহিমা, দয়া, করুণা ইত্যাদি অনুধাবন করা তখনই সম্ভব যখন তার সৃষ্টি কৌশল সম্বন্ধে আমরা অবগত হব। আর তার জন্য চাই শিক্ষার আলো। এজন্যই রসুল (সাঃ) বলেছেন যে, বিদ্যা শিক্ষা প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ ও নারীর জন্য ফরজ। একমাত্র জ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব নিজস্ব আত্মার মাঝে অনুধাবন করা যায়।
২০৯৯: এই আয়াতটি পূর্বের আয়াতের প্রসারিত অংশ বিশেষ। পূর্বের আয়াতে আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ বা হুকুম মৌমাছিদের উপরে তাদের বাসগৃহ নির্মান সম্পর্কে। এই আয়াতটি পূর্বের আয়াতেরই অংশ। এখানে মৌমাছিদের হুকুম দেয়া হয়েছে খাদ্য ও মধু তৈরি সম্পর্কে। "Zululan" শব্দটির দ্বিবিধ অর্থ করা সম্ভব:

(১) প্রশস্ত ও সহজ রাস্তা, অর্থাৎ এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে মৌমাছিদের গন্তব্যের প্রতি। মৌমাছিরা মৌচাক থেকে বহু দূরে যায় মধু সংগ্রহ করতে। কিন্তু তারা নির্ভূল ভাবে মৌচাকে ফিরে আসতে সক্ষম। একেই বলা হয়েছে "প্রভুর পথ''।

(২) দ্বিতীয় অর্থটি হচেছ : আল্লাহ্‌র মৌমাছির মধ্যে যে সহজাত প্রবৃত্তিকে অঙ্কিত করে দিয়েছেন, তাই হচেছ আল্লাহ্‌র হুকুম। মৌমাছিরা আল্লাহ্‌র হুকুম মেনে চলে অত্যন্ত বিনয় ও একান্ত অনুগত নির্ভুল ভাবে। অর্থাৎ তাদের এই হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা নাই। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল সৃষ্টির মাঝেই জীবিত বা জড় সকলের জন্য আল্লাহ্‌ তার হুকুম বা নিয়মাবলীকে নির্দ্দিষ্ট করে দিয়েছেন। প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য অর্পিত দায়িত্ব নির্ভুল ভাবে পালন করে থাকে। কাউকে সেই অমোঘ হুকুম লঙ্ঘনের ক্ষমতা দান করা হয় নাই, একমাত্র মানুষ ব্যতীত।

৭০। আল্লাহ্‌ই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তোমাদের আত্মাকে হরণ করবেন। তোমাদের কাউকে কাউকে উপনীত করা হবে বৃদ্ধ বয়সে। ফলে (অনেক) কিছু জানার পরে তারা তা মনে করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সব কিছু জানেন এবং সর্বশক্তিমান। (২১০০, ২১০১)

২১০০: উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ্‌র সৃষ্টির নৈপূণ্য, সৌন্দর্য ও জ্ঞানকে তুলে ধরা হয়েছে। এই আয়াতে পৃথিবীতে মানুষের জীবন চক্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। মানুষকে আল্লাহ্‌ প্রথম অবোধ ছোট শিশুরূপে সৃষ্টি করেন; ধীরে ধীরে সে বড় হয় এবং জ্ঞান ও বুদ্ধিতে পরিপূর্ণতা লাভ করে; নির্দ্দিষ্ট সময় অন্তেই নশ্বর দেহ থেকে তার আত্মাকে বের করে নেয়া হয় এবং নশ্বর দেহ ধ্বংস হয়ে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে কেউ কেউ এত দীর্ঘদিন বাঁচে যে তাদের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটে এবং এসব বৃদ্ধ ব্যক্তি শিশুর ন্যায় অবোধ হয়ে যায়। তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান বুদ্ধি সকল কিছু ভুলে যায়। যে মানুষ একদিন বুদ্ধি ও জ্ঞানে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতো, পৃথিবীতেই বেঁচে থাকা অবস্থায় আল্লাহ্‌ তা তার থেকে কেড়ে নিতে পারেন। এ সবই কি আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করে না?

২১০১: উপরের আয়াতগুলির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন কিভাবে সৃষ্টির মাঝে, জীবনের পরিবর্তনের মধ্যে, আল্লাহ্‌র সৃজনশীলতা কাজ করে, তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ ঘটে। তাঁর সৃষ্টির জন্য তাঁর করুণাধারা কিভাবে প্রবাহিত হয়। এই আয়াতের মাধ্যমে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে মানুষ একটি দুর্বল প্রাণী বৈ আর কিছু নয়। পরবর্তী রুকুতে বলা হয়েছে যে আল্লাহ্‌ তার বিভিন্ন বান্দাকে বিভিন্ন নেয়ামতে ধন্য করেছেন এবং এভাবেই তিনি বিভিন্ন শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য তৈরি করেন। এভাবেই কেউ হয় বিজ্ঞানী কেউ শিল্পী কেউ সাহিত্যিক ইত্যাদি। সুতারাং মানুষ উপলব্ধি করুক স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান।

রুকু-১০

৭১। আল্লাহ্‌ (মানুষকে) জীবনোপকরণের জীবিকা কাউকে কাউকে অন্যের অপেক্ষা বেশী দান করেছেন। যাদের বেশী অনুগ্রহ করা হয়েছে তারা তাদের অধীনস্ত দাস-দাসীদের তাদেরকে দেয়া অনুগ্রহ থেকে এমন কিছু দেয় না যাতে উহারা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায়। এর পরেও কি তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সমূহ অস্বীকার করবে? ২১০২

২১০২: এই আয়াতে বলা হয়েছে দারিদ্র ও ধনাঢ্যতা এবং জীবিকার বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। আল্লাহ্‌ কিছু লোককে তাঁর নেয়ামতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আল্লাহ্‌ সমস্ত মানব জাতিকে বুদ্ধি, মেধা, বল, শক্তি ও কর্মদক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এরই অপরিহার্য পরিণতি হিসেবে ধন-সম্পদেও বিভিন্ন শ্রেণী থাকা বাঞ্ছনীয় যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ প্রতিভা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে প্রতিদান পেতে পারে। যারা আল্লাহ্‌র বিশেষ নেয়ামতে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে দেখা যায় তারা নিজেদের এই শ্রেষ্ঠত্ব ত্যাগ করতে চায় না। উপরন্তু তারা অন্যান্য ব্যক্তি যারা ধনে মানে তাদের থেকে নিম্নতর তাদের দমন করতেই সর্বদা সচেষ্ট থাকে। "তাদের জীবনোপকরণ থেকে এমন কিছু দেয় না যাতে উহারা তাদের সমান হয়ে যায়।" তারা কখনও তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ত্যাগ করবে না। তারা কি ভুলে যায় এ সবই আল্লাহ্‌র দান?

৭২। আল্লাহ্‌ একই প্রকৃতি বিশিষ্ট তোমাদের জোড়া (এবং সঙ্গী) সৃষ্টি করেছেন। ২১০৩। এবং যুগল থেকে তোমাদের জন্য পুত্র-কন্যা এবং নাতী-নাতনী সৃষ্টি করেছেন ২১০৪; এবং তোমাদের জন্য উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন। এর পরেও কি তারা অসার জিনিষে বিশ্বাস করবে, এবং আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে?

২১০৩: "জোড়া সৃষ্টি করেছেন''। অনুরূপ আয়াতের জন্য দেখুন সূরা (৪:১) এবং টিকা ৫০৪। নারী ও পুরুষের সমন্বিত প্রয়াসই হচেছ পৃথিবীর জয়যাত্রা। এখানে নারীকে বলা হয়েছে পুরুষের জোড়া, তার বৈশিষ্ট্য হচেছঃ
(১) পুরুষের সঙ্গী হিসেবে - একথাকেই প্রকাশ করা হয়েছে "একই প্রকৃতি বিশিষ্ট'' লাইনটি দ্বারা অর্থাৎ পুরুষের মানষিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে।

(২) যৌন প্রয়োজন ব্যতীতও নারী, পুরুষের সকল কর্তব্যঃ ধর্মীয় বা নৈতিক বা পার্থিব সকল কর্তব্যের দায়িত্ব পুরুষের সাথে নারীরাও বহন করবে।

(৩) ইসলাম নারীকে পাপের উৎস বলে বিচার করেনা, খৃষ্টানেরা যেরূপ করে। বরং নারীকে এখানে আল্লাহ্‌র নেয়ামত রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ নারী ও পুরুষের যৌন জীবনের ফলেই সন্তানের আশীর্বাদ লাভ করা যায়।

২১০৪: "Hafadat" - অর্থ; নাতী-নাতনী এবং পরবর্তী বংশধর। পুত্র যেরূপ পিতা মাতার জন্য শক্তি ও অবলম্বনের প্রতীক, সেইরূপ কন্যা ও নাতী-নাতনী বৃদ্ধ বয়েসে সুখ ও আনন্দ বয়ে আনে। পুত্র, কন্যা ও পরবর্তী বংশধরেরা হচেছ সুখ, আনন্দের আল্লাহ্‌র নেয়ামতের প্রতীক।

৭৩। এবং আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর এবাদত করবে যাদের আকাশমন্ডলী অথবা পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করার কোন শক্তি নাই! ২১০৫। এবং উহারা (কিছুই) করতে সক্ষম নয়।

২১০৫: "Rizq" বা জীবনোপকরন। এই আয়াত (১৬:৬৫-৭৪) এবং অন্যান্য সূরার আয়াতে 'রিজিক' ব্যপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের পৃথিবীতে জীবন ধারণের জন্য শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সুখ- স্বাচছন্দের জন্য যা কিছু প্রয়োজন জীবনের সব উপকরণেই রিজিক শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। দুধ, মধু, ফল, মূল, খাদ্যশস্য এগুলি হচেছ দেহ গঠনের উপাদান। মানুষ ব্যতীত পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যের বেশী অন্যান্য জীবনোপকরণের প্রয়োজন নাই। কিন্তু মানুষ উন্নত প্রাণী। এই নশ্বর দেহের অভ্যন্তরে আত্মার বাস যা পরমাত্মার অংশ। সুতারাং মানুষের জীবনোপকরণ আত্মার উন্নতির জন্যও প্রয়োজন বৈকি। উপমার সাহায্যে এ কথাকেই প্রকাশ করা হয়েছে। নৈতিকতা হচেছ আধ্যাত্মিক নেয়ামত। সুস্থ, সুন্দর পারিবারিক জীবন মানুষের সুখ সাচছন্দের চাবিকাঠি ও আধ্যাত্মিক জীবনের নেয়ামত। আকাশ মন্ডলী অথবা পৃথিবী হতে জীবনোপকরণ সরবরাহ করার অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে আয়াতে (১৬:৬৫)। বৃষ্টি আকাশ থেকে যেরূপ সেরূপ আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।

৭৪। সুতারাং আল্লাহ্‌র কোন সদৃশ্য উদ্ভাবন করো না ২১০৬। আল্লাহ্‌ জানেন এবং তোমরা জান না।

২১০৬: দেখুন আয়াত (১৬:৬০) এবং টিকা ২০৮৬। 'সদৃশ্য' অর্থাৎ আল্লাহ্‌র গুণের সদৃশ্য। আল্লাহ্‌র সদৃশ্য কিছু কল্পনা করা বাতুলতা ও অবিমৃস্যকারীতা। মোশরেক আরবেরা তাদের উপাস্য দেব দেবীদের সম্বন্ধে এরূপ মিথ্যা সদৃশ্য কল্পনা করতো। তারা বলতো তাদের দেব-দেবীরা আল্লাহ্‌রই প্রতীক স্বরূপ এবং তারা পুরোহিত শ্রেণীর মধ্যবর্তী লোকদের মাধ্যমে তাদের আরাধনা করতো।

৭৫। আল্লাহ্‌ উপমা দিচেছন (দুজন লোকের তাদের) একজন কৃতদাস, যে অপরের অধিকার ভুক্ত (২১০৭) এবং যার কোন ক্ষমতা নাই। এবং (অপর) একজন লোক যাকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম অনুগ্রহ দান করা হয়েছে এবং সে সেখানে থেকে গোপনে এবং প্রকাশ্যে (মুক্ত হস্তে) দান করে। এই দুজন কি সমান? (কখনও নয়)। সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র। কিন্তু তাদের অধিকাংশ তা জানে না।

২১০৭: এই আয়াত ও পরবর্তী আয়াতে দুইটি উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম উপমাটি হচেছ, একজন ক্রীতদাসকে একজন স্বাধীন ও পূণ্যবান লোকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যে ক্রীতদাস তার নিজস্ব কোনও ক্ষমতা নাই, ভালো বা মন্দ কিছু করারই স্বাধীনতা নাই - কারণ সে তার প্রভু বা মালিকের অধীন। অপর জন স্বাধীন ও মুক্ত মানুষ যে, তাঁর সম্পদ অভাবী ব্যক্তিকে দান করে, প্রকাশ্যে বা গোপনে। তাঁকে বাধা দেয়ার কেউ নাই কারণ সে নিজেই তাঁর নিজের প্রভু কারও কাছে তার জবাবদিহিতা নাই। ক্রীতদাসকে এখানে মিথ্যা উপাস্যের উপাসকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সমাজ জীবনে এরূপ মিথ্যা, মূর্তি ব্যতীত আরও অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন: প্রাকৃতিক শক্তি, যার নিজস্ব কোনও শক্তি নাই, যা আল্লাহ্‌র হুকুমে পরিচালিত হয় মাত্র। আবার অনেকে বীর পূজা করে এবং এই পূজাতে তাকে দেবতূল্য করে তোলে। কিন্তু মানুষ বুঝতে অক্ষম যে, বীরত্ব বা মহত্ব সব আল্লাহ্‌র দান - তার নিজস্ব কিছুই নাই। এরূপ পূজার শেষ নাই, প্রগতির নামে ,কেউ বিজ্ঞান, কেউ সাহিত্য, কেউ শিল্পের পূজারী। কিন্তু তারা বুঝতে অক্ষম যে এ সবই বান্দার জন্য আল্লাহ্‌র দান। বান্দার নিজস্ব কোন ক্ষমতা এখানে নাই।জগত সংসারের অধিকাংশ মানুষ নিজ প্রবৃত্তির দাস।

৭৬। আল্লাহ্‌ দুইটি মানুষের (আরেকটি) উপমা দিতেছেন। তাদের একজন মূক, কোন রকম ক্ষমতা রাখে না। তার প্রভুর জন্য সে বিরক্তকর বোঝা স্বরূপ। তাকে যেখানেই পাঠানো হোকনা কেন সে ভালো কিছুই করতে পারে না। ২১০৮। এই লোক কি সেই লোকের সমান হয়; যে ন্যায়ের নির্দ্দেশ দান করে এবং সরল পথে থাকে ২১০৯?

২১০৮: দ্বিতীয় উপমাটি দেয়া হয়েছে দুই ব্যক্তির। উহাদের একজন মূক এবং কোনও কিছুই ব্যাখ্যা করতে বা বুঝতে পারে না। তার প্রভু তাকে যাই করতে বলুক না কেন সে তা করতে অক্ষম - সে তার প্রভুর বোঝা স্বরূপ। যে ভালোর পরিবর্তে মিথ্যা উপাস্যকে গ্রহণ করে। তাদের মিথ্যা উপাস্যকে তুলনা করা হয়েছে- মূক ও শক্তিহীন অপদার্থ ব্যক্তিরূপে। অপর ব্যক্তির তুলনা হচেছ, যে ন্যায়বান, ন্যায়ের পথে চলে, এবং অন্যকে ন্যায়ের ও সত্য পথে চলতে নির্দ্দেশ দান করে। সে কারও অধীন নয় বরং সে অন্যকে পরিচালনা করে। দ্বিতীয় উপমাটিতে সূক্ষ্ণভাবে আল্লাহ্‌র অবস্থানকে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ কারও উপরে নির্ভরশীল নন। তিনি সমস্ত পৃথিবীর প্রভু এবং তিনি তার নেয়ামতে তার সৃষ্ট জীবকে ধন্য করেন।

২১০৯: উপরের আয়াতগুলিতে যারা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে তাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে। তাদের অপরাধ দ্বিবিধ যার সার সংক্ষেপ হচেছ :

(১) যারা মিথ্যা উপাস্যের অধিকারী তারা অনুধাবন করতে পারে না স্রষ্টা ও তার সৃষ্ট জীব বা বস্তুর মধ্যে কি দুস্তর ব্যবধান। তারা পার্থিব বিষয় বস্তুকে তাদের উপাসনার বিষয় বস্তুতে পরিণত করে। তারা সৃষ্ট জীব ও বস্তুতে দেবত্ব আরোপ করে। এভাবেই তারা আল্লাহ্‌র মহিমা ও শক্তিকে খর্ব করে দেখে। কিন্তু এসব লোকই তাদের শ্রেষ্ঠত্বের অংশ যা আল্লাহ্‌রই দান কোনও অবস্থাতেই তাদের থেকে যাদের নিম্নে অবস্থান তাদের সাথে ভাগ করে নিতে চায়না। কারণ তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ-বুদ্ধি, অহমিকা, আত্মম্ভরিতা তাদের বাঁধার সৃষ্টি করে। কিন্তু আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে তারা নির্বিচারে আল্লাহ্‌র ক্ষমতাকে, মহিমাকে তাদেন সৃষ্ট উপাস্যে অর্পন করতে দ্বিধা করে না।

(২) এ সব লোকেরা আল্লাহ্‌র চোখে অকৃতজ্ঞ। কারণ তারা ভুলে যায় সকল মঙ্গল, সকল কল্যান সকল শ্রেষ্ঠত্ব আল্লাহ্‌ প্রেরিত। তাদের সমৃদ্ধ জীবনের জন্য তাদের শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত ছিলো।

রুকু-১১

৭৭। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রহস্য আল্লাহ্‌র অধীনে ২১১০। এবং (বিচার দিবসের) সময়ের সিদ্ধান্ত তো চক্ষুর পলকের ন্যায় (২১১১) বরং তা অপেক্ষাও দ্রুত। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সর্ব বিষয়ের উপরে ক্ষমতাশালী।

২১১০: আল্লাহ্‌ যে সর্ব বিষয়ে শক্তিমান তারই কয়েকটি রূপ এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। সর্ব বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ্‌র নিকটে। মানুষের ক্ষমতা ও জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। মানুষের দৃশ্যমান অদৃশ্য জগতের জ্ঞানের চাবিকাঠি শুধু মাত্র আল্লাহ্‌র হাতে বিদ্যমান। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

২১১১: পার্থিব জীবনের সুখ ও আনন্দ মানুষকে পরলোকের কথা বিস্মৃত করে দেয়। সে ভুলে যায় পরকাল হচেছ অতি সত্য। আবার অনেকে আছে যারা পরকালে বিশ্বাস করলেও এমন ভাবে জীবন চালনা করে যেনো পরলোক সূদুর ভবিষ্যতের কথা। কোরান বার বার মানুষকে সাবধান করেছে যে পরকাল কোন সূদুর ভবিষ্যত নয়। হিসাব নিকাশে সময় প্রত্যেক মানুষের জন্য অতি নিকটে। যে কোন সময় বিনা নোটিশে তা উপস্থিত হতে পারে। সুতারাং ক্ষণস্থায়ী এই পার্থিব জীবনে প্রত্যেক লোককে পরকাল বা কিয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুত থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সর্বদা বিরত থাকবে পাপ থেকে এবং অধর্ম থেকে। কারণ কিয়ামত সংঘটিত হবে চোখের পলকে।

৭৮। তিনিই তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন, যখন তোমরা কিছু জানতে না। (এরপর) তিনি তোমাদের শোনার ও দেখার ক্ষমতা এবং বুদ্ধিমত্তা ও হৃদয় (ভালবাসার ক্ষমতা) দান করেছেন ২১১২। যারা বিশ্বাসী তারা যেন [আল্লাহকে] কৃতজ্ঞতা জানাতে পারে।

২১১২: "হৃদয়'' শব্দটি জীববিজ্ঞানে মানুষের হৃৎপিন্ডকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভাষা সাহিত্যে 'হৃদয়' অর্থ যেখান থেকে প্রেম, ভালোবাসা উৎসরিত হয়। আরবী বাগধারাতে "হৃদয়'' শব্দটি ভালোবাসা ও বুদ্ধি এই দুই ভাবকেই বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ চর্মচক্ষুতে দেখার অভিজ্ঞতা। চর্মচক্ষু ব্যতীত ও জ্ঞানীলোকেরা হৃদয় দ্বারা দেখতে পান বা অনুভব করতে পারেন। শ্রবনশক্তি হচেছ কানে শোনার শক্তি। আক্ষরিক শব্দ শোনা ব্যতীতও ধার্মিক ও পুন্যবান ব্যক্তিরা হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারেন বা শুনতে পারেন - সত্য ও মিথ্যার প্রভেদকে, ন্যায়ের ডাক ও অন্যায়ের প্রলোভনকে, সাধারণ ভাবেও বলতে গেলে আমরা যে দৃশ্যমান জগতকে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে এর রূপ, রস, গন্ধকে অনুভব করতে পারছি এও তো আমাদের কাছে এক অপূর্ব অনুভব। পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধকে উপভোগ করতে পারি; সুতারাং শুধু এ কারণেই আমাদের আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত। কাল্পনিক উপাস্য ও শক্তির উপাসনা না করে এক আল্লাহ্‌র উপাসনা করা উচিত।
৭৯। তারা কি শূন্যে (বাতাসে) ভাসমান পাখীর দিকে লক্ষ্য করে না। (আল্লাহ্‌র ক্ষমতা ব্যতীত) কিছুই তাদের (শূন্যে) ধরে রাখে না। ২১১৩। যারা বিশ্বাসী এর মধ্যে তাদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।

২১১৩: সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ্‌র সৃষ্টি নৈপুন্য প্রকাশ পায়। এই আয়াতগুলি সে কথাকেই প্রকাশ করেছে। যাদেরই বোঝার ক্ষমতা আছে তারাই সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ্‌র জ্ঞান, শিল্প নৈপুন্য এবং ক্ষমতা দেখে বিমোহিত না হয়ে পারে না। পূর্বের আয়াতে মানুষের উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। এই আয়াতে পাখীকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পাখী যখন শূন্যে ডানা মেলে, তার উড়ন্ত কৌশল বিজ্ঞানের এক বিস্ময় - যার গবেষনালব্ধ ফল হচেছ বর্তমান উড়োজাহাজ। আল্লাহ্‌র প্রাকৃতিক আইনই পাখীকে উড়তে সাহায্য করে - এ কথাকেই বলা হয়েছে " আল্লাহর ক্ষমতা ব্যতীত কিছুই তাদের শূন্যে ধরে রাখে না।'' মানুষ যুগে যুগে নিজ বুদ্ধমত্তা প্রয়োগ করে আল্লাহ্‌র প্রাকৃতিক আইনকে উম্মোচন করেছে, নূতন নূতন বিজ্ঞানের সূত্রকে আবিষ্কার করেছে - যার ফলশ্রূতিতে আজকের সভ্যতার জন্ম। মানুষের এই বুদ্ধিমত্তা আল্লাহ্‌ই দান। যারা মুমিন ব্যক্তি তারাই শুধু আল্লাহ্‌র নিদর্শনকে অনুধাবণ করতে সক্ষম হবে।
৮০। আল্লাহ্‌-ই তোমাদের বাসস্থানকে তোমাদের জন্য করেন বিশ্রাম ও শান্তির আলয় ২১১৪। এবং তোমাদের বসবাসের জন্য পশু চর্মের (তাবুর) ব্যবস্থা করেছেন যা তোমাদের ভ্রমণকালের অথবা (ভ্রমণকালে) বিরতির জন্য হালকা এবং সুবিধাজনক ২১১৫। এবং তাদের পশম এবং নরম লোম এবং কেশ থেকে কিছু কালের (ব্যবহারের) জন্য দামী পশমী বস্ত্র ও আরামদায়ক বস্তুর ব্যবস্থা করেছেন। ২১১৬, ২১১৭।

২১১৪: "গৃহকে করেন তোমাদের বিশ্রাম ও শান্তির আলয়'' - লাইনটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। আল্লাহ্‌ মানুষকে মেধা, বুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক শক্তি দান করেছেন। সে এসব প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ গঠন করে বাস করে এবং তার গৃহকে সুখ- স্বাচছন্দ্য: মানসিক উৎকর্ষতা ও স্নেহ ভালোবাসা মন্ডিত আবাসস্থলে পরিণত করে। এই পবিত্র গৃহকোণই হচেছ মানুষের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার ক্ষেত্র স্বরূপ। এভাবেই আল্লাহ্‌ মানুষকে ক্ষমতা দান করেন গৃহকে শান্তির "আবাসস্থলে'' পরিণত করার।

২১১৫: পৃথিবীতে বাস করার জন্য স্থায়ী আবাসস্থলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যখন সে ভ্রমণ করে তখন তার জন্য অস্থায়ী গৃহের প্রয়োজন। অস্থায়ী গৃহকোণের জন্য এই আয়াতে তাবুর উল্লেখ করা হয়েছে। তাবুর জন্য আল্লাহ্‌ পশু চর্ম, বা তদ্‌সদৃশ বস্তু সরবরাহ করেছেন। এসব তাবু খুব সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা যায়।

২১১৬: ''Suf' ' অর্থ ভেড়ার লোম। 'Sha'r' অর্থ কেশ যা ছাগলের চামড়া থেকে পাওয়া যায়। 'Wabar' উটের নরম চামড়া যা থেকে তন্তু বুনন করা হয়। এ সব উদাহরনের আরও বিস্তৃত করা যায়, লোম বা ফার জাতীয় আরও অন্যান্য বস্তুর বেলায়।

২১১৭: "কিছু কালের'' অর্থাৎ স্বল্প কালের জন্য যদিও এসব বিলাস দ্রব্য এবং প্রয়োজনীয় বস্তুর স্থায়ীত্ব স্বল্প কালের জন্য, কিন্তু এ সমস্তই মানুষের জন্য আল্লাহ্‌র দান বা নেয়ামত। একথাকেই বলা হয়েছে "তোমাদিগের জন্য ব্যবস্থা করনে।"

৮১। আল্লাহ্‌-ই তার সৃষ্ট বস্তুর মধ্য থেকে তোমাদের ছায়া দানের জন্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন ২১১৮। তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। তাপ থেকে রক্ষার জন্য তিনি তোমাদের জন্য পোষাকের ব্যবস্থা করেছেন এবং যুদ্ধের সময়ে রক্ষার জন্য লৌহ বর্মের ব্যবস্থা করেছেন। ২১১৯। এ ভাবেই তিনি তোমাদের উপর তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন, যেনো তোমারা তাঁর ইচছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পার। ২১২০

২১১৮: প্রচন্ড রৌদ্রে আমরা বিভিন্ন বস্তু হতে ছায়া পেয়ে থাকি যেমন: গাছ, বাগান, বাড়ীর ছাদ ইত্যাদি। আবার অন্য দৃষ্টি কোন থেকে বলা যায় যে, সূর্যের রশ্মি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে পৃথিবীর উপরে পতিত হয়; যেমন তীর্যকভাবে পতিত হলে বহু জিনিসেরই ছায়া উৎপন্ন হয়। পাহাড় ও পাহাড়ের গুহা ছায়া উৎপন্ন করে ইত্যাদি।

২১১৯: আমাদের পরিধেয় বস্ত্র আমাদের তাপ ও ঠান্ডা থেকে রক্ষা করে। ঠিক সেই ভাবে লোহার বর্ম আমাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুর তরবারীর আঘাত থেকে রক্ষা করে।

২১২০: উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ্‌র নেয়ামত সমূহের বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষের প্রতি আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয় - তা অশেষ।এই পার্থিব নেয়ামত সমূহ মানুষকে দান করা হয় মহত্তর ও বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনার জন্য আর তা হচেছ আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করা। আমাদের জীবনকে আরামের সাথে অতিবাহিত করার বন্দোবস্ত আল্লাহ্‌ করেছেন, যেনো আমরা আমাদের সমগ্র জীবনকে, সমস্ত সত্ত্বাকে একান্তভাবে আল্লাহ্‌র ইচছার সাথে সমন্বিত করতে পারি। প্রতিদিনের জীবনধারণের গ্লানি যেনো আমাদের সেই মহত্তর উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত না করে। আল্লাহ্‌র ইচছার কাছে শর্তহীন আত্মসমর্পনের নামই হচেছ 'ইসলাম'

মন্তব্য: শুধুমাত্র নামাজ ও রোজার মধ্যেই ইসলাম সীমাবদ্ধ নয় সকল কর্মে, নিয়তে আল্লাহ্‌র প্রতি একান্ত নিবেদনের নামই ইসলাম।

৮২। কিন্তু যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমার কর্তব্য তো কেবল স্পষ্টভাবে (আল্লাহ্‌র) বাণী পৌঁছিয়ে দেয়া।

৮৩। তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ চিনতে পারে, তারপরে তারা তা অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশই অকৃতজ্ঞ (প্রাণী)। ২১২১

২১২১: মানুষ জাতি সবিশেষ অবগত আছে আল্লাহ্‌র অশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত। তারা তা উপভোগ করে কিন্তু কখনও স্মরণ করে না আল্লাহ্‌কে, যিনি তাদের এই নেয়ামত দান করেছেন। বিস্মরণের মাধ্যমে তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহকে অস্বীকার করে। তারা অকৃতজ্ঞ। আর এই অকৃতজ্ঞতার দরূণ তারা আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে অস্বীকার করে যা আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করার শামিল। তাদের অধিকাংশই পাপী ও কাফের।

উপদেশ: কোরানে কৃতজ্ঞতা গুণটির উপরে অত্যন্ত গুরূত্ব প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা দিয়েই এই গুণটির শুরু। কৃতজ্ঞতা এমন একটি গুণ যা আত্মাকে হতাশা ও পাওয়ার আকাঙ্খা ও না পাওয়ার বেদনা থেকে আত্মাকে মুক্তি দেয় ও আত্মার মাঝে শান্তি আনায়ন করে।

রুকু-১২

৮৪। সেদিন সকল সম্প্রদায় থেকে একজন স্বাক্ষী উত্থাপন করা হবে। ২১২২। এরপরে অবিশ্বাসীদের কোন ওজর-আপত্তি গ্রহণ করা হবে না; তারা কোন অনুগ্রহও লাভ করবে না। ২১২২-ক

২১২২: প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ্‌ শিক্ষক বা দূত প্রেরণ করেছেন-যারা মানুষকে সঠিক পথ ও ভ্রান্ত পথের নির্দ্দেশ দান করে থাকেন। কেয়ামতের দিনে এসব রাসুলরা স্বাক্ষ্য দিবেন যে, তারা সঠিক পথের নির্দ্দেশনার জন্য সত্যকে প্রচার করেছেন। যদিও আল্লাহ্‌র নিদর্শন বিশ্ব প্রকৃতিতে তাঁর সৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান, তবুও সত্যকে সাধারণ মানুষের নিকট অনুধাবন যোগ্য করার জন্য, এসব রাসুলদের মাধ্যমে পুন: পুন: সৎপথে আহ্বান করেছেন - কিন্তু তারা তাদের ডাকে কর্ণপাত করে নাই। তাদের পৃথিবীর শিক্ষানবীশ কালে অনুতাপ করার জন্য বারে বারে সময় দেয়া হয়েছে, কিন্তু তারা তা হেলায় নষ্ট করেছেন। কেয়ামতের দিনে তাদের নূতন করে আর কোন সময় দেয়া হবে না। তখন তারা আর আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ পাবে না।
২১২২-ক: "সুযোগ দেয়া হবে না'', অর্থাৎ কেয়ামতের দিনে পাপীদের অনুতাপের মাধ্যম আত্মশুদ্ধির সুযোগ দান করা হবে না। অনুরূপ আয়াত দেখুন (৩০:৫৭); (৪৫:৩৫)

৮৫। যখন পাপীরা (সত্য সত্যই) শাস্তিকে প্রত্যক্ষ করবে ২১২৩ তখন আর তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না এবং তাদের কোন অবকাশও দেয়া হবে না।

২১২৩: কেয়ামতের দিনে যখন প্রকৃত শাস্তি নিপতিত হবে, তখন আর অনুতাপ করার জন্য কোনও সুযোগ দান করা হবে না। অনুতাপ করার জন্য তা অত্যন্ত দেরী হয়ে যাবে। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ পাওয়ার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

৮৬। যারা আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদার করেছিলো, তারা তাদের (উপাস্য) 'অংশীদার'কে দেখতে পাবে। তারা বলবে, "হে আমাদের প্রভু! এরাই ছিলো আমাদের (উপাস্য) অংশীদার, যাদের আমরা তোমার পরিবর্তে আহ্বান করতাম "২১২৪। (তদুত্তরে) তারা তাদের মুখের উপর বলবে, "তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।''

২১২৪: যারা পৃথিবীতে মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করতো, শেষ বিচারের দিনে তারা চেষ্ট করবে তাদের পাপের বোঝা অন্যের উপরে চাপাতে, মিথ্যা উপাস্যের উপরে আরোপ করতে। যদিও সেদিন সম্পূর্ণ মিথ্যা বলতে তাদের সাহস হবে না। কিন্তু তারা পরোক্ষভাবে তাদের বক্তব্যকে উত্থাপন করবে। তারা বলবে যে মিথ্যা উপাস্যরাই তাদের বিপথে চালিত করেছে, এতে তাদের নিজস্ব কোন দায়-দায়িত্ব নাই। কিন্তু পরের আয়াতে বর্ণনা আছে, তাদের মিথ্যাকে প্রতিহত করে তাদের উপরে নিক্ষেপ করা হবে।

৮৭। সেদিন তারা (প্রকাশ্যে) আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য দেখাবে ২১২৫। এবং তাদের উদ্ভাবিত 'মিথ্যা' তাদের হতাশার মাঝে ত্যাগ করে যাবে।

২১২৫: মানুষ নিজস্ব কল্পনা অনুযায়ী মূর্তি, বা দেবতুল্য ব্যক্তিত্ব, বা প্রাকৃতিক শক্তিকে উপাস্য হিসেবে আরাধনা করে। শেষ বিচারের দিনে তাদের উপাস্যরা তাদের ত্যাগ করে যাবে। উপাস্যরা তাদের উপাসকদের সম্বন্ধে কোনও দায়-দায়িত্ব স্বীকার করবে না। তারা প্রকাশ্যে আল্লাহ্‌র কাছে আত্মসমর্পন করবে। যেহেতু এ সব উপাস্য নিজস্ব কল্পনার সৃষ্টি, সুতারাং এদের কোনও অস্তিত্বই তখন বিরাজ করবে না।

৮৮। যারা আল্লাহ্‌কে প্রত্যাখান করে, এবং (মানুষকে) আল্লাহ্‌র রাস্তায় বাঁধা দেয় - তাদের জন্য শাস্তির উপরে শাস্তি বৃদ্ধি করবো। কারণ তারা অশান্তির বিস্তার করে।

৮৯। সেদিন আমি সকল সম্প্রদায়ে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের বিরূদ্ধে একজন স্বাক্ষী উত্থিত করবো (২১২৬)। এবং এ সব (লোকের) বিরূদ্ধে তোমাকে স্বাক্ষী রূপে আনবো। আমি মুসলিমদের (আত্মসমর্পনকারী) জন্য সকল বিষয়ে ব্যাখ্যাদানকারী, পথনির্দ্দেশক, অনুগ্রহ এবং সুসংবাদ স্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি।

২১২৬: আয়াত (১৬:৮৪) এর বর্ধিত অংশ বর্তমান আয়াত। কেয়ামতদিবসে যখন সকলের পুনরূত্থান ঘটবে, পূর্বের (১৬:৮৪) আয়াতে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র প্রেরিত দূতকে স্বাক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করানো হবে। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, এ সব স্বাক্ষী যে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র বিশেষ দূত তারাই হবেন তা নয়, তাদের গোত্রের লোক বা নিকটজন, যারা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ বা কোরানের বাণীকে বুঝতে পারতো, যারা সঠিক পথের নিশানা উপলব্ধি করতে পারতো এবং নিজস্ব গোত্রের ভাষাতে তা প্রচার করতো, তাদেরও স্বাক্ষী হিসেবে উত্থাপন করা হবে। এখানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কথাও বলা হয়েছে "তোমাকে'' শব্দটি দ্বারা অর্থাৎ কেয়ামতের দিনে হযরত মুহাম্মদকে (সাঃ) মোশরেকদের বিরূদ্ধে স্বাক্ষীরূপে উপস্থাপন করা হবে। আল্লাহ্‌ তো রসুলুল্লার (সাঃ) মাধ্যমে কোরানকে অবতীর্ন করেছেন যা "স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ'' যাতে আছে পৃথিবীর জীবন যাত্রার "পথ নির্দ্দেশ'', এবং "আল্লাহ্‌র করূণা" ও দয়ার প্রতিশ্রুতি ও "সদুপদেশ বা সুসংবাদ''। যারা আল্লাহ্‌র নিকট "আত্মসমর্পন কারী'' তারাই এই কিতাব থেকে উপরে বর্ণিত সুসংবাদ পেতে পারে।

৯০। আল্লাহ্‌ ন্যায়পরায়ণতা সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দানের নির্দ্দেশ দেন, এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অন্যায় আচরণ, এবং সীমালংঘন। তিনি তোমাদের নির্দ্দেশ দান করেন যেনো তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। ২১২৭।

২১২৭: এই আয়াতে আল্লাহ্‌ তিনটি বিষয়ের নির্দ্দেশ দান করেছেন, এবং তিনটি বিষয়ে নিষেধ করেছেন। যে তিনটি বিষয়ের আদেশ দান করেছেন তার প্রথমটি হচেছ "ন্যায়পরায়ণতা''। "ন্যায়'' কথাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি শব্দ যার দ্বারা এক বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র ও অনুভবকে বোঝানো হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে অন্যের অধিকার পুরোপুরি দেয়াই হচেছ ন্যায়। যার যতটুকু প্রাপ্য সেটুকু দেয়ার পরেই আমরা আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য থেকে মুক্তি পেতে পারি সত্য কিন্তু সমাজ জীবনে তা হয়ে যাবে শুষ্ক কর্তব্য কর্ম করার মত। সেখানে জীবনের স্নেহ ভালোবাসার কোনও উত্তাপ থাকবে না। সে হবে এক শৈত্যমন্ডিত জীবনাদর্শ। তাই তার পরবর্তী নির্দ্দেশে আল্লাহ্‌ বলেছেন, "সদাচরণের" কথা। সদাচরণ অর্থাৎ কর্ম, চরিত্র ও অভ্যাসকে সুন্দর করা, মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করা। সামাজিক জীবনে এমন অনেক ক্ষেত্র থাকে যেখানে কাজ না করা অন্যায় নয় যেমন: দুর্যোগের সময়ে সাহায্য করা। এসব ক্ষেত্রে একে "অন্যায়'' বলা যাবে না। ন্যায়ের ভিত্তিতে, ধর্মীয় নির্দ্দেশনাতে কোনও কিছু দাবী না থাকা সত্বেও মানুষ অপরের জন্য কাজ করতে পারে। মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে সে সব ক্ষেত্রে কাজ করাকে বলা যায় সদাচরণ। এখানে আত্মীয় বা অনাত্মীয়ের কোনও ভেদাভেদ নাই। মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করাও "সদাচরণ''। সৎ কাজের মাধ্যমে মন্দ কাজের প্রতিদান দেয়া সদাচরণ। যারা আমাদের আত্মীয় নয় বা বন্ধু বান্ধব নয়, যাদের আমাদের উপরে আইনগত বা সামাজিক ভাবে কোনও দাবী নাই, তাদের মঙ্গলার্থে কাজ করাও সদাচরণ অর্থাৎ কর্ম, আচরণ, ব্যবহার, অভ্যাস ও চরিত্র যার সৌন্দর্যমন্ডিত তারই আচরন হচেছ সদাচরণ। তৃতীয় আদেশ হচেছ আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দ্দেশ। আত্মীয় স্বব্জনের হক বা অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। আল্লাহ্‌র এই তিনটি আদেশের মাঝে 'ন্যায়পরায়ণতা' হচেছ কেন্দ্রীয় গুণাবলী। অন্যান্য গুণাবলী ন্যায়পরায়ণতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এই কেন্দ্রীয় গুণাবলী যে ব্যক্তি বা সমাজ বা জাতির মধ্যে অনুপস্থিত, সেই সমাজে অন্যায়, অবিচার নির্যাতন আল্লাহ্‌র আসনকে কাঁপিয়ে তুলবে। পরিণতিতে সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। যেমনটি বর্তমানে ঘটেছে বাঙ্গালী জাতির জাতীয় জীবনে।

অনুরুপ ভাবে তিনটি জিনিসের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অশ্লীলতা, অন্যায় আচরণ ও সীমালঙ্ঘন করা এই তিনটি কাজকে আল্লাহ্‌ নিষেধ করেছেন। অশ্লীলতা অর্থাৎ যা কিছু আল্লাহ্‌র চোখে গর্হিত বা নিন্দনীয় তা থেকে দূরে থাকতে হবে। দ্বিতীয়তঃ অন্যায় আচরণ অর্থাৎ সেই কাজ যা ন্যায় সঙ্গত নয় যেমন: গরীবের অধিকার হরণ করা, কারও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা; হতে পারে তা আইনের অধিকার, বা সম্পত্তির অধিকার, বা প্রশাসনিক অধিকার, বা সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অধিকার। অন্যের প্রাপ্য বস্তু নিজে ভোগ করার প্রবণতা যেমন: ত্রাণসামগ্রী আত্মসাৎ করা, ঘুষ খেয়ে বেআইনী কাজ করা ইত্যাদি অন্যায় কাজের বিবরণ পাতার পর পাতা লিখেও শেষ করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজ জীবন তৃণমূল থেকে সমাজের শীর্ষবিন্দু পর্যন্ত অন্যায় কাজে আকন্ঠ নিমজ্জিত।

তৃতীয়ঃ সীমালঙ্ঘন করতে আল্লাহ্‌র নিষেধ করেছেন। এই সীমা হচেছ আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য যে আইন করেছেন, সেই আইনের বিরূদ্ধে সীমা লঙ্ঘন করাকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ্‌র আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক সময়ে দেখা যায় ধর্মীয় উম্মাদনা বশতঃ সেখানে বাড়াবাড়ি ঘটে থাকে, আবার আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশকে উপেক্ষা করার ক্ষেত্রেও সীমা লঙ্ঘন ঘটে থাকে। আমরা যখন আল্লাহ্‌র আইনকে ধর্মীয় উম্মাদনা বা কুফ্‌রী দ্বারা প্রতিহত করি, তখন আমরা আমাদের জাগ্রত বিবেকের বিরূদ্ধে কাজ করে থাকি। জাগ্রত বিবেক হচেছ মানুষের অন্তরে আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ গ্রহণ করার মাধ্যম বিশেষ। কারণ আল্লাহ্‌ মানুষকে বিচারশক্তি, যুক্তিযুক্ত ভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং উন্নত মানসিক ক্ষমতা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে তার প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেছেন (২:৩০)।

৯১। আল্লাহ্‌র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর অঙ্গীকার করে থাক। অনুমোদন করার পরে তোমাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করোনা। অবশ্যই তোমরা তোমাদের যামিন করেছ আল্লাহ্‌কে। তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ তা সব জানেন। ২১২৮।

২১২৮: এই আয়াতটির একটি সাধারণ এবং একটি বিশেষ অর্থ আছে। সাধারণ অর্থে একটি বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিঁত করা হয়েছে। রসুলের (সাঃ) হিজরতের চৌদ্দ মাস পূর্বে, প্রথম দল মদীনার নিকটবর্তী 'আকাবা' উপত্যকাতে হযরতের (সাঃ) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে অঙ্গীঁকার করে এবং দ্বিতীয় দল প্রথম দলের কিছু পরে আনুগত্য প্রকাশ করে অঙ্গীঁকার করে। দেখুন আয়াত (৫:৭) এবং টিকা ৭০৫। সাধারণ অর্থে এর অর্থ অনেক ব্যাপক। দ্বিবিধভাবে এর অর্থ ব্যাখ্যা করা যায়:

(১) যে কোন প্রতিজ্ঞা-ই হচেছ আল্লাহ্‌কে স্বাক্ষী রেখে করা। সেখানে আল্লাহ্‌র নাম উল্লেখ করা হোক বা না হোক, ব্যক্তির ইচছাই আল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছে যায় তৎক্ষনাৎ। একেই সূরা (৫:১) আয়াতে বাধ্যবাধকতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

(২) মুসলমানের পালনীয় প্রতিটি কাজই তার অঙ্গীকার আল্লাহ্‌র সাথে। যেহেতু সে নিজেকে মুসলমান বলে বিশ্বাস করে। সুতারাং ধর্মে যেগুলি অবশ্য পালনীয় সবই তার " আল্লাহ্‌র সাথে অঙ্গীঁকাররূপে'' গণ্য। সুতারাং ইসলাম ধর্ম তার জন্য যে কর্তব্য ও দায়িত্ব স্থির করেছে তা সে অনুগত ভাবে পালন করবে।

৯২। এবং সেই মহিলার মত হয়োনা, যে তার সূতা মজবুত করে পাকানোর পর উহার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়। ২১২৯। পরস্পরকে প্রবঞ্চনা করার জন্য তোমাদের শপথকে ব্যবহার করো না (২১৩০), যেনো একদল অন্যদল অপেক্ষা অধিক লাভবান হতে পার। ২১৩১। এর দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তোমাদের পরীক্ষা করবেন। এবং শেষ বিচারের দিনে অবশ্যই তিনি তোমাদের নিকট (সত্যকে) প্রকাশ করে দেবেন, যে সম্বন্ধে তোমরা মতভেদে ছিলে। ২১৩২।

২১২৯: মানুষের মাঝে ধর্মীয় মতভেদের ব্যবধান ও হানাহানিকে এই আয়াতে উপমার মাধ্যমে সুন্দররূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাট থেকে সুন্দর রজ্জু তৈরি হয়। তৈরির সময়ে পাটের নরম আঁশকে পেঁচিয়ে শক্ত করে তোলা হয়। কোনও স্ত্রীলোক যদি পাটের নরম আঁশকে পেচিয়ে রজ্জু তৈরি করে এবং পরে আবার রজ্জুর পাঁক খুলে ফেলে, ফলে শক্ত রজ্জু আবার নরম, দুর্বল পাটের আঁশে পরিণত হয়। ধর্মের অঙ্গীকার পালনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতে ঐক্যের বন্ধনের সৃষ্টি হয়। যার ফলে সমাজ জীবনের ভিত্তি শক্ত ও মজবুত হয় এবং পাপের বিরূদ্ধে আমাদের নিরাপত্তা দান করে। সমাজ জীবনের এই মজবুত ভিত্তিকেই ঐ পাটের রজ্জুর সাথে উপমার দ্বারা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক জীবনের সূদৃঢ় বন্ধনের উপরে জাতীয় জীবনের সূদৃঢ় ভিত্তি রচিত হয়। কিন্তু যদি কোন জাতি ধর্মীয় জীবনের অঙ্গীকার পূরণ না করে, আল্লাহ্‌ যে সব নির্দ্দেশ দান করেছেন তা থেকে বিচ্যুত হয় তবেই সেই জাতির জীবনে বিচিছন্নতার জন্ম নেয় এবং পরিণতিতে তারা দুর্বল জাতিতে পরিণত হয়। ঠিক যেন ঐ পাটের রজ্জুর মত যখন তার পাক খুলে দেয়া হয়।

উপদেশ: আল্লাহ্‌র যে তিনটি নির্দ্দেশ উপরের আয়াতে (১৬:৯০)দান করেছেন তার থেকে বিচ্যুতিইর ফলেই আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের অধঃপতন ঘটে, ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্যে বিভক্তি ঘটে। এর ফলে ধর্মীয় মতভেদের উদ্ভব ঘটে যার পরিণতিতে জাতীয় জীবনে বিচিছন্নতার জন্ম নেয় এবং জাতি এক দুর্বল জাতিতে পরিণত হয় যেমনটি বাংলাদেশে ঘটেছে।

২১৩১: ইসলামে অঙ্গীকার একটি পবিত্র বিধান। ধর্মীয় এ বিধানকে ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের জন্য ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। "পরস্পরকে প্রবঞ্চনা করার জন্য তোমাদের শপথকে ব্যবহার করো না।'' পূর্বে বলা হয়েছে শপথ সব সময়ই পবিত্র অঙ্গীকার। শপথের নিয়ত আল্লাহ্‌র নিকটি পৌঁছে যায়। সুতারাং অঙ্গীকার সব সময়ে পালন করতে হবে। অঙ্গীকার ভঙ্গ করা গোনাহ্‌। এই আয়াতে নির্দ্দেশ দান করা হয়েছে কোনও দলের সাথে চুক্তি হয়ে গেলে পার্থিব স্বার্থ ও উপকারের জন্য সে চুক্তি ভঙ্গ করা যাবে না। মুসলমান অঙ্গীকারে অটল থাকবে, লাভ ও ক্ষতি আল্লাহ্‌র কাছে সমর্পন করবে। ইসলামে অঙ্গীকার একটি পবিত্র বিধান। ধর্মের এই বিধানকে খেলাধূলার বস্তু করতে নিষেধ করা হয়েছে। উদাহরণ: যে দল বা পার্টির সাথে চুক্তি হয়েছে, তারা দুর্বল ও সংখ্যায় কম কিংবা আর্থিক দিক দিয়ে নিঃস্ব। তাদের বিপরীতে অপর দল সংখ্যাগরিষ্ট, শক্তিশালী অথবা ধর্ণাঢ্য। এ অবস্থায় শুধু এই লোভে যে, শক্তিশালী ও ধনী দলের অনুগ্রহ লাভ করলে বেশী সুবিধা পাওয়া যাবে এ কথা ভেবে প্রথম দলের বা পার্টির সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। রসুলের (সাঃ) যুগে কোরেশরা এই পাপে নিমজ্জিত ছিল। বর্তমানে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে দেখা যায় অঙ্গীকার ভঙ্গ করা ও সুবিধা ভোগ করাকে রাজনীতির কূটকৌশল রূপে গণ্য করে আত্মপ্রসাদ ও আত্মসম্মান লাভ করে। রাজনীতিতে কোনও শেষ কথা নাই।এই কথা বলে তারা বিশেষ আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। কিন্তু ইসলাম অঙ্গীকার ভঙ্গের এই ধারাকে অনুমোদন করেনা। অঙ্গীকারকে সর্বদা পবিত্র বিধান রূপে পরিগণিত করা হবে, এবং এর চুক্তি সমূহ আন্তরিকভাবে পালন করতে হবে, যদিও এর বিরোধী শক্তি প্রবল হয়। অঙ্গীকার পালন করতে হবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে। সংসার জীবনে ছোট খাট ব্যাপারে আমরা শপথ ভঙ্গ করে থাকি,যেমন: ছোট শিশুকে কোন ওয়াদা করে তা রাখার প্রতি গুরূত্ব না দেয়া। কিন্তু এরূপ ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ।
২১৩২: যে কোনও ব্যাপারে বা কাজে দুদলে বা দুই ব্যাক্তির মাঝে মতানৈক্য থাকতে পারে, কিন্তু তারা যদি কাজের নিয়ত সম্বন্ধে সৎ একনিষ্ট থাকে, যদি তারা একে অপরের উপরে অন্যায় ভাবে সুবিধা লাভ করতে না চায়, তবে এই মতানৈক্যের ফলে তাদের মাঝে ঝগড়া ও মারামারির সৃষ্টি করবে না। সংঘর্ষের সুত্রপাত তখনই হয় যখন মতানৈক্যের কারণ হবে ব্যাক্তি স্বার্থ। আল্লাহ্‌ এভাবেই তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন যে তারা ন্যায়ের পথে অটল থাকে কিনা। কেয়ামতের দিনে তাদের মতভেদের কারণ স্পষ্টভাবে প্রত্যেকের নিকট প্রকাশ করবেন।

৯৩। যদি আল্লাহ্‌ ইচেছ করতেন, তবে তিনি তোমাদের এক জাতি পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচছা করেন বিভ্রান্তিতে ছেড়ে দেন এবং যাকে ইচছা সৎ পথে পরিচালিত করেন। তোমাদের সকল কাজের অবশ্যই হিসাব গ্রহণ করা হবে। ২১৩৩
২১৩৩: অনুরূপ আয়াত দেখুন (১৪:৪) এবং টিকা ১৮৭৫। পৃথিবীতে একমাত্র মানুষকেই আল্লাহ্‌ "সীমিত স্বাধীন ইচছা শক্তি'' দান করেছেন। সে ইচছা করলেই ভালোকে গ্রহণ করতে পারে ও মন্দকে ত্যাগ করতে পারে, বা মন্দকে গ্রহণ করতে পারে ও ভালোকে ত্যাগ করতে পারে। এ ব্যাপারে মানুষকে কোনও জবরদস্তি করা হবেনা। কিন্তু যাকে সৎ পথ প্রদর্শন করা হবে, যার খুশী সে সেই পথে চলবে। যার খুশী সে সেই পথ ত্যাগ করে ভ্রান্ত পথে চলবে। কিন্তু মানুষকেই একমাত্র পরলোকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে তার কার্যকরণের জন্য। আল্লাহ্‌র এই বিধানকেই বলা হয়েছে আল্লাহ্‌র ইচছা।যদি আল্লাহ্‌ ইচছা করতেন তাহলে মানুষের জন্য তরুলতা, পশু প্রাণীর মত বিধান চালু করতে পারতেন। এসব জীব জন্তু বা তরুলতার স্বাধীন-কোনও ইচছা নাই- যে ভাবে সে কর্ম সম্পাদনের জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে তারা অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করে চলে-সুতারাং তাদের কোনও জবাবদিহিতা নাই। মানুষকেও যদি আল্লাহ্‌ ইচছা করতেন তবে "সীমিত স্বাধীন ইচছা শক্তি'' বিহীন সৃষ্টি করতে পারতেন। এই ভাব প্রকাশ করা হয়েছে, "তিনি যাহাকে ইচছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাহাকে ইচছা সৎ পথে পরিচালিত করেন' লাইনটি দ্বারা।

৯৪। পরস্পরকে প্রবঞ্চনা করার উদ্দেশ্যে তোমাদের শপথকে ব্যবহার করোনা, ২১৩৪। যার ফলে, পা স্থির ভাবে প্রোথিত হওয়ার পরে তা পিছলিয়ে যাবে এবং আল্লাহ্‌র পথে (মানুষকে) বাঁধা দেয়ার জন্য তোমাদের মন্দ কাজের (পরিণতি) ভোগ করতে হবে। এবং তোমাদের উপরে মহাশাস্তি আপাতিত হবে।

২১৩৪: দেখুন আয়াতে (১৬:৯২) উল্লেখ করা হয়েছে মিথ্যা ও প্রবঞ্চনামূলক শপথের কথা। যে প্রবঞ্চনার উদ্দেশ্যে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তার পরিণামের কথা এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। যে কাজ সম্পন্ন করা কারো দায়িত্ব কর্তব্য, সেটাই তার জন্য আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার। এরূপ কাজ সম্পন্ন করার জন্য কারোর কাছ থেকে বিনিময় গ্রহণ করা বা বিনিময় না নিয়ে কাজ না করার অর্থই হচেছ আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। উদাহরণ: সরকারী কর্মচারী কাজের বেতন সরকারের নিকট থেকে পায়, সে বেতনের বিনিময়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে জনগণের কাছে প্রত্যক্ষভাবে এবং আল্লাহ্‌র কাছে পরোক্ষ ভাবে অঙ্গীকার বদ্ধ। যদি সে এ কাজ করার জন্য কারও কাছে বিনিময় চায় এবং বিনিময় ব্যতিত কাজ করতে গড়িমসি করে, তবে সে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত কর্তব্য অবহেল করে। সে আল্লাহ্‌র সাথে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে-তার ক্ষুদ্র স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। অর্থাৎ পৃথিবীতে আমাদের সকলেরই স্ব স্ব কর্তব্য রয়েছে, যা আল্লাহ্‌রই দান পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রের জন্য। এখানেই আমরা আল্লাহ্‌র সাথে অঙ্গীকার বদ্ধ। অঙ্গীকার ভঙ্গের পরিণাম দুধরনের

(১) পা স্থির হওয়ার পর "তা পিছলিয়ে যাবে'' অর্থাৎ যারা প্রতারিত হয় যারা এতদিন সঠিক পথে পথ চলছিলো, প্রতারণার ফলে তারা সঠিক পথ থেকে ভ্রষ্ট হবে। এমনকি তারা তাদের ঈমানের দৃঢ়তা হারিয়ে বিপথে চলে যেতে পারে এবং পরিণতিতে তারাও অবিশ্বাসী ও প্রতারকে পরিণত হতে পারে। যে পরিণতি আমরা প্রত্যক্ষ করি বাংলাদেশীদের চরিত্রে। চারিপাশের প্রতারণার ফাঁদে সুস্থ বিবেকবানেরাও আজ আমাদের সমাজে অস্থির বিভ্রান্ত।

(২) যে প্রবঞ্চণার মাধ্যমে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে সে যে শুধু তার নিজের আত্মার প্রতি পাপ করে তাই-ই নয় অন্যকে পাপের পথে প্রতারণার পথে টেনে নামানোর পাপও তার উপরে বর্তাবে। সুতারাং তার শাস্তি দ্বিবিধ। প্রথমতঃ ইহকালে মন্দ কাজের পরিণতি "শাস্তি'' এবং পরকালে মহাশাস্তি বা আল্লাহ্‌র ক্রোধ।

মন্তব্য: বাংলাদেশ আজ প্রতারণামূলক অঙ্গীকারে আবদ্ধ। উচচ-নীচ, ধনী-গরীব জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতারণা আজ মহামারীর ন্যায় বিস্তার লাভ করেছে। আল্লাহ্‌র বিধান অনুযায়ী সে কারণেই আমাদের জাতীয় উন্নতি আজ বাধা গ্রস্থ, সর্বক্ষেত্রে আমরা দুর্বিপাকের সম্মুখীন। ইহকালে এই আমাদের শাস্তি।
৯৫। আল্লাহ্‌র সাথে কৃত অঙ্গীকার ঘৃণ্য মূল্যে বিক্রি করোনা ২১৩৫। কারণ আল্লাহ্‌র নিকট যে (পুরষ্কার) রয়েছে তা তোমাদের জন্য বহু অংশে উত্তম যদি তা তোমরা জানতে।

২১৩৫: আল্লাহ্‌র অঙ্গীকারকে সামান্য মূল্যে বিক্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ মানব সন্তানকে স্ব স্ব কর্তব্য নির্ধারণ পূর্বক প্রেরণ করেছেন। সেই কর্তব্য সমাধানের জন্য তাকে উপযুক্ত পরিবেশ, মেধা, প্রতিভা, ও মানসিক দক্ষতা দান করে থাকেন। ফলে কেউ হয় বিজ্ঞানী, কেউ প্রশাসক কেউ শিল্পী ইত্যাদি। যে যার নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী সমাজে তার অবদানের স্বাক্ষর রাখে। এই তার অঙ্গীকার আল্লাহ্‌র সাথে। "তুচছ মূল্য'' অর্থ্যাৎ পার্থিব লোভ লালসা এবং স্বার্থপরতা। আল্লাহ্‌ মানবকে বলেছেন যে পার্থিব লাভের জন্য তাঁর সাথে মানব সন্তানের যে অঙ্গীকার তা যেন সে ভঙ্গ না করে। অঙ্গীকার ভঙ্গ করা অর্থ আল্লাহ্‌র বিধানকে অস্বীকার করা। আল্লাহ্‌র ইচছাকে অবমাননা করা। তাঁর পরিণতিতে হয়তো বা তাৎক্ষণিক লাভ হতে পারে, কিন্তু সূদূর প্রসারী ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। ইহকাল ও পরকাল সর্বকালেই তারা ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অপরপক্ষে আল্লাহ্‌র বিধান মানা বা আল্লাহ্‌র সাথে মানুষের যে অঙ্গীকার তা মানার মাধ্যমে স্থায়ী উপকার লাভ করা যায়।

৯৬। তোমাদের নিকট যা আছে তা অদৃশ্য হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহ্‌র নিকট যা আছে তা স্থায়ী হবে। যারা ধৈর্যের সাথে অধ্যাবসায়ী হয়, অবশ্যই আমি, তারা যা করে তা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার দান করবো। ২১৩৬

২১৩৬: এই পৃথিবীর ধন-সম্পদ, প্রভাব -প্রতিপত্তি, সবই ক্ষণস্থায়ী। কালের অতল স্রোতে তা ক্ষণস্থায়ী বুদবুদের মত। ব্যাক্তির জীবনে বা জাতির জীবনে তা সমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু আধ্যাত্মিক ও নৈতিক যে গুণাবলী তা ব্যক্তির জন্য ও জাতির জন্য স্থায়ী সমৃদ্ধি আনায়ন করে। ইহলৌকিক ধনসম্পদ ও পারলৌকিক সমৃদ্ধি দুটোর মধ্যে কোন তুলনাই চলে না। পারলৌকিক সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক আধ্যাত্মিক অনুশীলনের ফল। আর এর পুরষ্কার আছে আল্লাহ্‌র কাছে যার কোনও ধ্বংস নাই, যা অনন্তকাল স্থায়ী।

৯৭। পুরূষ ও নারী যে কেউ সৎ কাজ করবে, এবং ঈমান আনবে, অবশ্যই তাকে আমি নতুন জীবন দান করবো, যে জীবন হবে ভাল এবং পবিত্র ২১৩৭। তাদের কাজ অনুযায়ী তাদের আমি শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার দান করবো। ২১৩৮

২১৩৭: ধর্মীয় বিশ্বাস শুধুমাত্র কলেমা পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে হবে মুমিন বান্দার আচরণে, তাঁর কর্মের মাধ্যমে। যখন "বিশ্বাস'' ও আচরণ এবং কর্ম পরস্পর সমন্বিত হয় তখনই বান্দা সত্যিকারের মুমিন হয়। কারণ আল্লাহ্‌র চোখে সেই সর্বাপেক্ষা সম্মানীয় যার আচরণ হবে ন্যায়পরায়ণ বা মুমিন দেখুন আয়াত (৪৯:১৩)। আল্লাহ্‌র বিধান অনুযায়ী আল্লাহ্‌র ইচছার কাছে আত্মসমর্পনের মাধ্যমে বান্দা যখন সৎ কাজে জীবনকে উৎসর্গ করে, তখন বান্দার জীবনের রূপ পরিবর্তন হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ জীবনের পথ পরিক্রমার সময়ে , প্রতিদিনের সংগ্রামে সে হয় বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। সন্দেহ, ভয়, অপমান, গ্লানি তাকে প্রতিমূহুর্তে আলোড়িত করে, অস্থির করে, সে তার চতুর্দ্দিকে শুধু ভয় বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণার ষড়যন্ত্রই প্রত্যক্ষ করে। ফলে তার আত্মার শান্তি বিনষ্ট হয়। কিন্তু যে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য সৎ কর্ম করে, তার জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। সে সকল দুঃশ্চিন্তা দুর্ভাবনা বিপদ আপদ থেকে মুক্ত হয়ে যায়। কারণ সেতো তার জীবনের সকল ভার আল্লাহ্‌কেই ন্যস্ত করেছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের মাধ্যমে। জীবনকে উৎসর্গ করেছে সৎ কাজে। বিনিময়ে আল্লাহ্‌ তার সকল দুঃশ্চিন্তা দুর্ভাবনাকে হরণ করে নেন। দুঃশ্চিন্তা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তার সমস্ত হৃদয় জুড়ে প্রশান্তি বিরাজ করতে থাকে। সৎ ও মুমিন বান্দার এই মানসিক পরিবর্তন সাধারণ লোকও অনুধাবন করতে পারে। পৃথিবীর জীবন হবে তাদের জন্য আনন্দময় জীবন এবং পরলোকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার আল্লাহ্‌ দেবেন যা আমাদের ধারণার বাইরে।

এই আয়াতের আর একটি বৈশিষ্ঠ্য হচেছ আয়াতটিতে নারী ও পুরুষকে সমভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের সাধনার পথ নারী ও পুরুষের এখানে কোন দ্বিতীয় পন্থা নাই। আল্লাহ্‌র চোখে পুরুষ ও নারী সমান। কারন উভয়ের নশ্বর দেহের মাঝে যে আত্মার অবস্থান তা পরমাত্মারই অংশ। নারীর আত্মা কোনও অংশেই পুরুষের আত্মার থেকে হীন নয়।

২১৩৮: পূর্বের আয়াতগুলির বক্তব্যকে এই জোড়ালো বক্তবের মাধ্যমে শেষ করা হয়েছে।

৯৮। যখন কোর-আন পাঠ করবে, অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহ্‌র আশ্রয় প্রার্থনা করবে। ২১৩৯

৯৯। যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রভুর উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের উপরে তার কোন কর্তৃত্ব নাই।

১০০। তার কর্তৃত্ব তো শুধু তাদেরই উপর যারা তাকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্‌র সাথে শরিক করে।

২১৩৯: কুরআন পাঠের পূর্বে "আউজুবিল্লাহ মিনাশশাইতানির রাজিম বিসমিল্লাহি্র রাহমানির রাহিম'' পাঠের হুকুম এই আয়াতে দেয়া হয়েছে। কারণ কুরআন হচেছ সেই মহা গ্রন্থ যার মাঝে আল্লাহ্‌র হুকুম সমূহ লিপিবদ্ধ। যে গ্রন্থ ন্যায় ও অন্যায়, ভালো, মন্দ, সত্য ও অসত্যের মধ্যে প্রভেদ করতে শেখায়। শয়তান সর্বদা মানুষকে কোরানের বাণী থেকে বিপথে চালিত করতে প্রয়াস পায় যাতে সে কোরআনের বাণীর মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে না পারে। চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করার মাধ্যমে শয়তান এই বিভ্রান্তি ঘটায়। যদি আমরা আমাদের বিশ্বাস আল্লাহ্‌র উপরে ন্যস্ত করি, তাবে শয়তান আমাদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম তবে না। শুধু কুর-আন পাঠের সময়েই নয় পৃথিবীর যে কোন কাজে যা কর্তব্য ও দায়িত্ব বলে পরিগণিত তা যদি আমরা আল্লাহ্‌র নামে, আল্লাহ্‌র উপরে বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে শুরু করি তবে আমাদের কর্তব্য বা দায়িত্ব কখনও বিপথে চালিত হবে না। কারণ সকল ভুল ভ্রান্তি পাপ থেকে আমাদের রক্ষা করবেন স্বয়ং আল্লাহ্‌। সে কারণেই আমাদের উচিত যে, কোন কাজ শুরূ করার আগে আনুষ্ঠানিক ভাবে "অভিশপ্ত শয়তান হইতে আল্লাহ্‌র স্মরণ'' নেয়া। কারণ মানুষ চিত্তের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল প্রাণী। সে কারণেই অন্যায়, পাপ ও বিপথে বিভ্রান্ত না হয়ে অন্তরের মাঝে সত্যের শিখাকে সমুজ্জল রাখার দৃঢ়তার জন্য আমাদের মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করা প্রয়োজন। কারণ বিশ্বাসীদের উপরে শয়তানের কোন আধিপত্য নাই।

রুকু-১৪

১০১। যখন আমি এক আয়াতকে অন্য আয়াত দ্বারা প্রতিস্থাপিত করি-আল্লাহ্‌ ভালোভাবেই জানেন তিনি (ধাপে ধাপে) কি অবর্তীন করেছেন ২১৪০। তখন তারা বলে, তুমি তো প্রতারক ব্যতীত অন্য কিছু নও। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বুঝতে অক্ষম।


২১৪০: অনুরূপ আয়াত দেখুন (২:১০৬) এবং টিকা ১০৭। যুগের উপযোগী করে আল্লাহ্‌ যুগে যুগে তাঁর প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছেন। কিন্তু সকল যুগের জন্য মৌলিক নীতিমালা একই রয়ে গেছে। এই পরিবর্তনকে যারা ''মিথ্যা উদ্ভাবন কারী'' বলে আখ্যায়িত করে তারা অজ্ঞ। কারণ রসুলের (সাঃ) নিকট প্রেরিত প্রত্যাদেশের কিছু বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটলেও তার মূল সত্য ও অন্তর্নিহিত বাণী যুগ ও কাল অতিক্রান্ত। সকল যুগে সকল রাসুলদের কাছে ঐ একই সত্যকে প্রেরণ করা হয়েছে।

১০২। ''বল'' তোমার প্রভুর নিকট থেকে পবিত্র আত্মা (জিব্রাইল ২১৪১)। সত্য সহ প্রত্যাদেশ নিয়ে এসেছে, যেনো মুমিনদের (হৃদয়কে) অধিকতর দৃঢ় করতে পারে এবং মুসলিমদের জন্য যা পথ নির্দ্দেশ ও সুসংবাদ স্বরূপ।২১৪২

২১৪১: ''রূহুল কুদ্দুস "শাব্দিক অর্থ পবিত্র আত্মা'' বলতে কুর-আনে জিব্রাইল (আঃ) কে বলা হয়েছে। জিব্রাইলের (আঃ) মাধ্যমে কোরানের বাণীকে রসুলুল্লাহ্‌র (সাঃ) নিকট পাঠানো হয়।

২১৪২:যাদের ঈমান বা বিশ্বাস খাঁটি, কুর-আন পাঠে তাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়; মনের সকল অবিশ্বাস সন্দেহ দূরীভূত হয়। এই আয়াতে মুসলিম বা 'আত্মসমর্পনকারী' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যারা হযরত ইব্রাহীমের ধর্ম অবলম্বনকারী তারাই মুসলমান। কারণ ইব্রাহীমের (আঃ) ধর্ম হচেছ ইসলাম বা আত্মসমর্পনকারী। সে হিসেবে কিতাবধারীরা আত্মসমর্পনকারী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) ধর্মগ্রন্থ মানুষের স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা বিকৃত হয়ে যায়। যে কোনও ধর্মের লোক কোরানের মাঝে প্রত্যক্ষ করতে পারবে সত্যিকারের হেদায়েতের আলো ও সুসংবাদ।

১০৩। আমি জানি যে সত্যিই তারা বলে; "তাঁকে তো শিক্ষা দেয় একজন মানুষ।'' তারা যার উল্লেখ করে সে তো বিদেশী ভাষা অবলম্বী, যেখানে এই (কুর-আন) হচেছ সুষ্পষ্ট আরবী ভাষাতে।২১৪৩

১০৪। যারা আল্লাহ্‌র নিদর্শনে বিশ্বাস করে না:- আল্লাহ্‌ তাদের পথ নির্দ্দেশ দান করেন না। তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি।

২১৪৩: মক্কার এক খৃষ্টান দাস যার ভাষা আরবী নয় তার উল্লেখ এখানে করা হয়েছে। এই খৃষ্টান দাসের সাথে রাসুলুল্লাহ্‌র (সাঃ) মাঝে মাঝে দেখা হতো। এতেই কাফেররা বলতে শুরু করে রাসুল (সাঃ) কে এই দাস কোরানের কাহিনী বর্ণনা করেছে। এসব কাহিনী বাইবেলেও বিদ্যমান-কারণ বাইবেলও হযরত মূসার গ্রন্থ আল্লাহ্‌র তরফ থেকেই প্রেরিত মহাগ্রন্থ। আরব মোশরেকদের উপলব্ধির বাইরে ছিল যে, কিভাবে একজন নিরক্ষর ব্যক্তির মুখ থেকে এমন শব্দ ঝংকার, মধুক্ষরা বাণী নির্গত হতে পারে। সুতারাং তারা রাসুলুল্লাহ্‌র (সাঃ) জন্য উপরোক্ত শিক্ষকের দাবী উত্থাপন করলো। তাদের দাবীর বিপক্ষে এ কথাই বলা যায় যদি কারও কোরানের পূর্বের গ্রন্থসমূহের প্রত্যাদেশ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান থাকে এবং সে সেই জ্ঞানকে আরবীতে কোরান রূপে প্রকাশ করতে চায়, তবুও তার সাধ্য হবে না কোরানের ভাষার মাধুর্য্য, বাচনভঙ্গী, মূর্ত থেকে বিমূর্ত ভাব প্রকাশের ক্ষমতা ও উপমার নির্বাচনের মাধ্যমে উপদেশের প্রকাশ ভঙ্গীকে আয়ত্ব করা। কারণ এ ভাষা তো স্বয়ং আল্লাহ্‌র নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গী। মর্তের মানুষের পক্ষে এমন কি আরবী ভাষাতে দক্ষ আরবের পক্ষেও এমন অলংকারপূর্ণ, ভাবের গভীরতা সম্পন্ন, ভাষা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এখানেই কোরান সুষমামন্ডিত ও বৈশিষ্ট্যময়। অপর পক্ষে যে দাসের কথা তারা বলাবলি করতো তার ভাষা আরবী ছিলোনা।

১০৫। যারা আল্লাহ্‌র নিদর্শনে বিশ্বাস করেনা,- তারাই মিথ্যা উদ্ভাবন করে, এরাই মিথ্যা কথা বলে। ২১৪৪

২১৪৪: যারা আল্লাহ্‌র নিদর্শনে বিশ্বাস করে না তারাই কোরানের সত্যতা সম্বন্ধে মিথ্যার উদ্ভাবন করে। এই মিথ্যার কোনরূপ ভিত্তি নাই তা সম্পুর্ণ মিথ্যা। উদ্ভাবনকরীরা মিথ্যাবাদী।

১০৬। যদি কেউ বাধ্য হয়ে ঈমানহীনতার কথা উচচারণ করে, কিন্তু (প্রকৃতপক্ষে) তার হৃদয় ঈমানে দৃঢ় থাকে, তারা বাদে যারা ঈমান আনার পরে আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করে এবং কুফরীর জন্য হৃদয়কে উন্মক্ত করে দেয়, তাদের জন্য আছে আল্লাহ্‌র ক্রোধ এবং মহাশাস্তি। ২১৪৫

২১৪৫: এই আয়াতটি হযরত আম্‌মারের ঘটনার উপলক্ষে প্রেরিত। হযরত ইয়াসীর, হযরত সুমাইয়া ছিলেন আম্‌মারের পিতা ও মাতা। তারা ইসলাম গ্রহণের পরে অবর্ননীয় অত্যাচারের সম্মুখীন হন এবং অত্যাচারের মুখে তারা প্রাণ ত্যাগ করেন। এর পর অত্যাচারের খরগ নেমে আসে হযরত আম্‌মারের উপরে। পিতা মাতার অত্যাচার স্বচক্ষে দর্শনে এবং নিজে অত্যাচারিত হওয়ার সময়ে তিনি কাফেরদের মতে মত প্রকাশ করেন এবং বাহ্যিক ভাবে ইসলাম ত্যাগ করেন। কিন্তু তার অন্তরে সত্যের শিখা, ঈমানের আলো, অনিবার্যভাবে প্রজ্জলিত থাকে। শক্রুর কবল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি রসুলুল্লাহ্‌র (সাঃ) সমীপে উপস্থিত হয়ে দুঃখের সাথে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) তাকে সান্তনা দেন এবং এই আয়াতটি সেই পেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়।

১০৭। এর কারণ তারা এই পৃথিবীর জীবনকে পরলোকের জীবন অপেক্ষা বেশী ভালবাসে। যারা ঈমানকে প্রত্যাখান করে আল্লাহ্‌ তাদেরকে হেদায়েত করবেন না।

১০৮। এরাই তারা যাদের হৃদয়, কর্ণ এবং চক্ষুতে আল্লাহ্‌ সীল মোহর করে দিয়েছেন ২১৪৬। তার কোন কিছু শোনে না।

২১৪৬: অনুরূপ আয়াত দেখুন (২:৭) যখন আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস থাকে না তখন ব্যক্তি কারও কাছে তার কর্মের জন্য জবাবদিহিতার প্রয়োজন অনুভব করে না। মানসিক এ অবস্থায় ব্যক্তি হয়ে পড়ে স্বেচছাচারী, অন্যায়, অবিচারে মিথ্যাচারে তার সকল সত্তা অন্ধকারচছন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা আত্মার স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত। ফলে আত্মার স্বাভাবিক বিকাশের পথ রূদ্ধ হয়ে যায়। তখন তাদের সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকে না। এদেরকেই বলা হয়েছে আল্লাহ্‌ এদের ''অন্তর, কর্ণ, চক্ষু মোহর করে দিয়েছেন।'' এরা আর ফিরবে না, এদের আবাসস্থল দোযখ।

১০৯। নিঃসন্দেহে পরলোকে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে।

১১০। যারা দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতনের পরে হিজরত করে ২১৪৭ এবং যারা তাদের বিশ্বাসকে সমুন্নত রাখার জন্য সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে এবং ধৈর্য ধারণ করে ও অধ্যাবসায়ী হয়, - এসবের পরে তোমার প্রভু (তাদের প্রতি) অবশ্যই বারে বারে ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু-২১৪৭।

২১৪৭: এই আয়াতটিতে ইসলামের প্রথম যুগের আরব মোশরেকদের উল্লেখ করা হয়েছে। এরা যখন পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তাদের উপর অবর্নণীয় অত্যাচারের খরগ নেমে আসে। অত্যাচার নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁরা মদিনাতে হিজরত করেন। সেখানেও তারা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন নাই। মক্কার কাফেরদের সাথে তাদের যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হতে হয়, ইসলামের নিরাপত্তার জন্য। তারা কখনও ধৈর্য হারান নাই। আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রামে তারা ছিলেন অবিচল ও একনিষ্ট। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাদের অতীতের সকল পাপ আল্লাহ্‌ ক্ষমা করে দেবেন। খালেদ-বিন-ওয়ালেদ ছিলেন রসুলুল্লাহ্‌র (সাঃ) সময়ে ইসলামের একজন শ্রেষ্ঠ বীর। এরকম বহু সাহাবী ছিলেন যাদের আত্মত্যাগ, বীরত্ব, শৈর্য, বির্য ইসলাম প্রচারে সহায়ক ছিল। এখানে উল্লেখযোগ্য যে আয়াতটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে এই আয়াতটি মদীনাতে অবর্তীণ হয়। কিন্তু সূরাটি হচেছ মক্কান সূরা।

উপদেশ: আত্ম সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র কাছে আত্মসমর্পন করলে আল্লাহ্‌ পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেবেন। দেখুন অনুরূপ আয়াত (১৬:১১৯)।

রুকু-১৫

১১১। সেই দিন প্রতিটি আত্মা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সংগ্রাম করবে। এবং প্রতিটি আত্মাকে তার কর্মের (পূর্ণ) প্রতিদান দেয়া হবে, এবং কারও প্রতি অন্যায় করা হবে না। ২১৪৮

২১৪৮: শেষ বিচারের দিনে যখন পৃথিবীর কর্মের হিসাব নিকাশ নেয়া শুরূ হবে, প্রতিটি আত্মা নিজস্ব দায় দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত হবে। সেদিন কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না। সেদিন পূর্ণ ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা হবে, পৃথিবীর যত অন্যায়, অবিচার, ভেদাভেদ দূর হয়ে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হবে। প্রত্যেককে প্রত্যেকের কর্মফল দেয়া হবে।

১১২। আল্লাহ্‌ উপমা দিতেছেন এক নগরীর যা নিরাপত্তা, শান্তি ও জীবনোপকরণের প্রাচুর্য সর্বদিক থেকে ভোগ করে আসছিলো, ২১৪৯। তথাপি তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞ হলো। সুতারাং আল্লাহ্‌ তাদের ক্ষুধা ও ভীতির (প্রচন্ডতা) দ্বারা পোষাকের ন্যায় (আচছাদিত) করলেন। কারণ ছিলো (এর লোকদের মন্দ) কাজ। ২১৫০

২১৪৯: এই আয়াতে যে নগরীর উল্লেখ করা হয়েছে, হতে পারে তা অতি প্রাচীন কালের বা বর্তমান কালের কোন নগরী। সময়টা বড় কথা নয়, বড় কথা হচেছ সর্বকালে সর্ব যুগে আল্লাহ্‌র আইন ভঙ্গকারীদের পরিণাম। সেটা ছিলো এমন এক নগরী, যার অধিবাসীরা প্রাচুর্য এবং নিরাপত্তা ভোগ করতো আল্লাহ্‌র নেয়ামত স্বরূপ। কিন্তু তারা আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে ভুলে গেল, আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে তারা আল্লাহ্‌র বিধান বা আইনকে অস্বীকার করে বিরূদ্ধাচারণ করলো। ফলে তাদের উপরে আল্লাহ্‌র শাস্তি নেমে আসে। সমৃদ্ধি শেষ হয়ে যায়, নিরাপত্তা হয় হুমকির সম্মুখীন। "ক্ষুধা ও ভীতি তাদের আচছাদন করে।'' অনেক তফসীরকারের মতে শহরটি হচেছ মোশরেকদের অধীনে থাকার সময়ে মক্কা শহর। এরূপ দৃষ্টান্ত বর্তমান যুগেও আমাদের চারিদিকে বর্তমান। যে সব জাতি নৈতিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেয়, যাদের সমাজে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য থাকে না, তারা আল্লাহ্‌র আইনকে অস্বীকার করে। আর এই অস্বীকার করার অমোঘ পরিণতি স্বরূপ তাদের উপরে দারিদ্র, ক্ষুধা, শত্রুর হুমকি বা নিরাপত্তার অভাব নেমে আসবে আল্লাহ্‌র শাস্তি হিসেবে। দেখুন পরবর্তী টিকা।

মন্তব্য: বাংলাদেশ আজকে অন্যায় ও পাপে আকন্ঠ নিমজ্জিত। "অঙ্গীকার'' যা ইসলামে পবিত্র বিধান তা ছেলে খেলার বস্তু। সুতারাং আমাদের ক্ষুধা, দারিদ্র, নিরাপত্তার অভাব হবে বৈ কি।)

২১৫০: এই আয়াতে দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে:

(১) নগরী প্রাচুর্য ও নিরাপত্তা ভোগ করার পরে তাদেরকে ক্ষুধা ও ভয় দ্বারা শাস্তি দান করা হয় এবং

(২) যে দুটি ঐশ্বরিক শাস্তির উল্লেখ এই আয়াতে করা হয়েছে তা পুরো নগরীকে আচছাদিত করেছিলো। আচছাদন শব্দটি পোষাকের জন্য ব্যবহার করা হয়। পোষাক যে ভাবে শরীরকে আচছাদিত করে, ঠিক সেই ভাবে ক্ষুধা ও ভয় তাদেরকে আচছাদিত করেছিলো। ক্ষুধা ও ভয়কে শাস্তির প্রতীক এবং 'আচছাদন' শব্দটি সর্বত্র ব্যাপী ধারণাটি বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যদি নগরীটিকে মোশরেক কোরেশদের অধীনে মক্কা নগরী হয়ে থাকে, তবে মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কা নগরীর যে অবস্থা ছিলো তার সাথে তুলনা করা যায়। পর পর সাত বছর মক্কা নগরী দুর্ভিক্ষে কবলিত হয়। দুর্ভিক্ষের সাথে এই ভয় বাসা বাধে যে যে কোনও মুহুর্তে মক্কা বিজয় করে নিতে পারে। তাদের দিন শেষ হয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত মুসলমানেরা মক্কা বিজয়ের পরে মক্কা নগরীর শান্তি ও শৃঙ্খলা আবার ফিরে আসে।


১১৩। তাদেরই মধ্য থেকে তাদের নিকট একজন রাসুল এসেছিলো। কিন্তু তারা তাকে প্রত্যাখান করেছিলো। সুতারাং অন্যায় করা অবস্থায় তাদের শাস্তি গ্রাস করলো।

১১৪। সুতারাং আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যা হালাল ও পবিত্র বস্তু দিয়েছেন তা থেকে তোমরা আহার কর। এবং আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ হও ২১৫১ যদি তোমরা শুধু তাঁরই এবাদত কর। ২১৫১।

২১৫১: "কৃতজ্ঞতা'' একটি বড় গুণ। এই গুণটির কথা কোরান শরীফে বহু বার উল্লেখ করা হয়েছে। যার চরিত্রে এই গুণের সমাবেশ ঘটেছে তাঁর জীবন অনাবিল শান্তিতে ভরে ওঠে। এই গুণটি ব্যক্তির জীবনে প্রকাশ পায় আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে। আল্লাহ্‌ আমাদের যে সব নেয়ামত দান করেছেন, সেগুলিকে সনাক্ত করা এবং তার জন্য মহান আল্লাহ্‌র দরবারে শোকর গোজারী করা। আল্লাহ্‌র নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় তিন ভাবে :

(১) আমাদের সকল সুখ, শান্তি, ধন, ঐশ্বর্য, জীবন, মান, সম্মান, এক কথায় জীবনে যা কিছু প্রাপ্তি, তা যে আল্লাহ্‌র দান বা নেয়ামত এ কথাকে অস্বীকার করা।

(২) আল্লাহ্‌র নেয়ামতের যথেচছ বা অপব্যবহার দ্বারা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা কেউ যদি তার অপব্যবহার করে। আল্লাহ্‌ যাকে যে নেয়ামত দান করেছেন, কেউ যদি তা কুক্ষিগত করে রাখে সমাজের অভাবগ্রস্থদের জন্য তা ব্যয় না করে, তবে তা আল্লাহ্‌র প্রতি অকৃজ্ঞতা জানানো হবে।

(৩) অথবা আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মনগড়া মতবাদ প্রচার করা, যাতে ব্যক্তি বিশেষের সুবিধা হয়।

১১৫। আল্লাহ্‌ তো কেবল মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকরের মাংস এবং যে কোন (খাদ্য) যার উপরে আল্লাহ্‌র নাম ব্যতীত অন্যের নাম উচচারিত হয়েছে তাই তিনি তোমাদের জন্য হারাম করছেন ২১৫২। কিন্তু যদি কেউ ইচছাকৃত ভাবে অবাধ্য না হয়ে, কিংবা সীমালংঘন না করে প্রয়োজনে বাধ্য হলে, আল্লাহ্‌ তো বার বার ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

২১৫২: অনুরূপ আয়াত দেখুন (২:১৭৩) এবং টিকা ১৭৩ আয়াত (৫:৩-৪) এবং আয়াত (৬:১২১, ১৩৮-১৪৬)।

১১৬। তোমাদের জিহ্বা দ্বারা মিথ্যা আরোপ করে এরূপ কোন মিথ্যা বলো না ২১৫৩, - " ইহা হালাল ইহা হারাম,'' - যা আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা আরোপ করা। যারা আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা আরোপ করবে তারা কখনও সফলকাম হবে না।

২১৫৩: মানুষ কুসংস্কার বা সামাজিক রীতিনীতি দ্বারা পরিচালিত হয়ে অনেক সময়েই নিজের সুবিধা মত বিভিন্ন বাধা নিষেধ আরোপ করে থাকে। আর এ সব আরোপ করে ধর্মের নামে। আর আল্লাহ্‌র চোখে এ সব নিন্দনীয় প্রথা। সুতারাং সমাজ ও জাতীয় জীবনে কোনও প্রথা ধর্মের নামে চালু করার আগে কোরানের নির্দেশ খুঁজে দেখা উচিত।

১১৭। (এরূপ মিথ্যা হবে) অকিঞ্চিতকর মুনাফা। কিন্তু (অপর পক্ষে) তাদের শাস্তি হবে ভয়াবহ।

১১৮। ইহুদীদের জন্য আমি তো কেবল তাই হারাম করেছিলাম যা তোমার নিকট পূর্বে উল্লেখ করেছি ২১৫৪। আমি তাদের উপরে কোন অন্যায় করি নাই, প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরাই নিজেদের আত্মার প্রতি অন্যায় করতো।

২১৫৪: দেখুন আয়াত (৬:১৪৬) ও টিকা। আল্লাহ্‌র আইনের বাইরে তারা নিজেদের জন্য অন্যান্য বহু বাধা নিষেধের প্রচলন করে, যা ছিলো তাদের নিজেদের সৃষ্টি। এই পাপের শাস্তিতে তাদের অন্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লাহ্‌র হুকুমের বাইরে মানুষ যখন নিজে ধর্মের আইন প্রনয়ণ করে এবং নানা ধরনের বাধা নিষেধের প্রাচীর গড়ে তোলে তখন সে ধর্মের মর্ম বা মূল থেকে বিচিছন্ন হয়ে যায়। সে তার নিজস্ব মনগড়া নিয়মের অনুশীলন ও চর্চাতে সর্বদা নিজেকে ব্যস্ত রাখে ও একেই ধর্ম বলে ভাবতে শুরু করে। পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ করলেই যেমন নামাজ বা আল্লাহ্‌র এবাদত হয়না। এবাদত থাকে অন্তরের আন্তরিকতায়, নিষ্ঠায় ও আল্লাহ্‌র প্রতি অনুগত ভালোবাসার নিবেদিত প্রাণে। ঠিক সেরূপ যারা সর্বদা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মানার প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীল এবং অধিক কঠোরতা অবলম্বলনের জন্য স্ব প্রণীত বাধা নিষেধের প্রাচীর গড়ে তোলে- তাদের সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মাঝে আল্লাহ্‌র আসন স্থান পায় না। কারণ পাষাণ হৃদয়ে আল্লাহ্‌র ভালোবাসার ফুল ফুটতে পারে না।

১১৯।যারা অজ্ঞতাবশতঃ পাপ করে, কিন্তু তার পরে তারা অনুতপ্ত হয়ে নিজেকে সংশোধন করে, - এসবের পরেও তোমার প্রভু অবশ্যই বারে বারে ক্ষমাশীল , পরম দয়ালু। ২১৫৫


২১৫৫: দেখুন আয়াত এবং টিকা ২১৪৭। এই আয়াতগুলি এই সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে, আল্লাহ্‌ তার বান্দার কাছে সঠিক আচরণ বা চারিত্রিক গুণাবলী আশা করেন। সে কারণে অনুতাপ করে আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথে ফিরে আসার জন্য আল্লাহ্‌ বান্দাকে অবসর দিয়ে থাকেন।

রুকু-১৬

১২০। আল্লাহ্‌র প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের (এবং) ঈমানের সত্যতায় ইব্রাহীম ছিলো প্রকৃতই একজন আদর্শ এবং সে কখনও আল্লাহ্‌র সাথে শরীক করতো না। ২১৫৬, ২১৫৭।

২১৫৬: 'উম্মত' শব্দটির অর্থ সম্প্রদায় এখানে আদর্শ সম্প্রদায়। কিন্তু এই আয়াতের অর্থ অনুযায়ী হযরত ইব্রাহীম একাই ছিলেন আদর্শ যিনি একা সকল পৃথিবীর বিরূদ্ধে দন্ডায়মান হয়েছিলেন আল্লাহ্‌র আদর্শ রক্ষা
করার জন্য। তিনি ছিলেন আল্লাহ্‌র অনুগত একনিষ্ঠ ভক্ত।

২১৫৭: আধ্যাত্মিক জগতের মূল ভিত্তি আল্লাহ্‌র একত্ববাদের উপরে প্রতিষ্ঠিত যা সর্ব যুগে সর্ব কালে এক সত্য। একত্ববাদের এই সত্যের প্রধান আদর্শ হচেছন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন পশ্চিম এশিয়ার একত্ববাদ প্রচারের প্রধান আদর্শ ব্যক্তি, তাঁর পরবর্তী বংশধরেরা সারা পৃথিবীতে আধ্যাত্মিক জগতের আদর্শ রূপে পরিগণিত হন। চাল্‌ডীনস (Chaldeans) সম্প্রদায়ে হযরত ইব্রাহীম জন্মগ্রহণ করেন। চাল্‌ডীনস্‌রা আল্লাহ্‌র একত্ববাদকে পরিত্যাগ করে তারকার পূজা করতো। হযরত ইব্রাহীম যদিও তাদের গোত্রের অন্তর্ভূক্ত ছিলো কিন্তু তিনি তাদের মত ছিলেন না। তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাসের জন্য তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট থেকে অত্যাচার ও নির্যাতনের সম্মুখীন হন, যার ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি তার দেশ ত্যাগ করে ক্যানান প্রদেশে হিজরত করেন।

১২১। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের জন্য সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতো, (কারণ) আল্লাহ্‌ তাঁকে মনোনিত করেছেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেছেন।

১২২। এবং আমি তাঁকে পৃথিবীতে মঙ্গল দান করেছিলাম, এবং পরকালেও সে পূন্যাত্মাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। ২১৫৮।

১২৩। সুতারাং আমি তোমাকে প্রত্যাদেশ দান করলাম, "ইব্রাহীমের পথ অনুসরণ কর, যে ছিলো প্রকৃত বিশ্বাসী এবং যে, আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদার করতো না।''

২১৫৮। দেখুর অনুরূপ আয়াত (২:১৩০)

১২৪। সাবাত (শনিবার) পালন তো কেবল তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিলো যারা এর (পালন সম্পর্কে) মতভেদ করতো ২১৫৯। শেষ বিচারের দিনে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করতো আল্লাহ্‌ অবশ্যই তার মীমাংসা করে দেবেন। ২১৬০


২১৫৯: আল্লাহ্‌ আয়াতে (১৬:১২৩) রসুলকে নির্দ্দেশ দান করেছেন একনিষ্ঠভাবে ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করতে। ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ-ই হচেছ ইসলাম ধর্ম। ইহুদীরা মুসলমানদের এই বলে বিদ্রূপ করতো যে, যদি তোমরা ইব্রাহীমের ধর্মই সঠিক বলে গণ্য কর তবে তোমরা সাবাত দিবস পালন কর না কেন? কারণ তাদের বিশ্বাস তারাই শুধু ইব্রাহীমের অনুসারী, তাদের এই ব্যঙ্গোঁক্তির উত্তর হিসেবে দ্বিবিধ কারণ দর্শানো যায়।

(১) সাবাত দিবসের সাথে হযরত ইব্রাহীমের কোনই সংস্রব নাই। কারণ সাবাত দিবস হচেছ হযরত মুসার নিকট প্রেরিত আল্লাহ্‌র আইন বা মুসার আইন (Law of moses)। মুসার আগমন ঘটে হযরত ইব্রহীমের আবির্ভাবের বহু পরে। অবিশ্বাস ও বিদ্রোহ ইহুদীদের আত্মাকে কঠিন হৃদয়ে পরিণত করেছিলো - আর এ কঠিন হৃদয়ের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ্‌ মুসার নিকট সাবাত আইনের নির্দেশ দান করেন (২:৭৪)। ইহুদীরা সর্বদা হযরত মুসার সাথে আল্লাহ্‌র হুকুমের বিরূদ্ধে তর্কে লিপ্ত হতো (২:১০৮)। পরবর্তীতে তারা অনেকে সাবাত দিবসকে অমান্য করে (২:৬৫ এবং টিকা ৭৯)। এই ছিলো সাবাত দিবসের সংক্ষিপ্ত পটভুমি। সুতারাং তার সাথে হযরত ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শের কোন যোগসুত্র নাই।

(২) সপ্তাহের কোন দিনটি ছিলো সাবাত দিবস? ইহুদীরা শনিবারকে সাবাত দিবস হিসেবে প্রতিপালন করে। খৃষ্টানরা ওল্ডটেষ্টামেন্টকে তাদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের অন্তর্ভূক্ত করে। কিন্তু তারা রবিবারকে সাবাত দিবস ঘোষণা করে। তবে এ ব্যাপারেও খৃষ্টানদের মধ্যে মতদ্বৈধ আছে। তাদের মধ্যে একদল (The Seventh Day Advirtists) শনিবারে সাবাত দিবস উদ্‌যাপন করে। সুতারাং পূর্বোক্ত সকল কিতাবধারী জাতিরা এ ব্যাপারে একমত নয়। তাদের এই মতদ্বৈততা কেয়ামত পর্যন্ত চলবে। মুসলমানেরা এরূপ কোন কঠোর অনুশাসন থেকে মুক্ত। তাদের জন্য শুক্রবারকে সমবেত প্রার্থনার জন্য নির্দ্দিষ্ঠ করা হয়েছে সত্য, কিন্তু ইহুদীদের মত সকল কাজ থেকে বিরত থেকে শুধু মাত্র প্রার্থনার জন্য এই দিনকে ধার্য করা হয় নাই।

২১৬০: দেখুন আয়াত (২:১১৩)

১২৫। (সকল) মানুষকে তোমার প্রভুর দিকে আহ্বান কর জ্ঞান এবং সুন্দর ধর্মাপোদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে যুক্তি উত্থাপন কর উত্তম ও সুন্দর পন্থায়। ২১৬১। তোমার প্রভু সবচেয়ে ভাল জানেন, কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী হয় এবং কে উপদেশ গ্রহণ করে। ২১৬২।

২১৬১: আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারের উপায় ও পথ এই সুন্দর আয়াতটির মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাঞ্জলভাবে বর্নণা করা হয়েছে। যে বাণী যুগে যুগে আত্মার অন্ধকারকে দূর করে আলোর ভূবনে নিয়ে যাবে। যে বাণীর প্রভাবে আত্মা হবে পরিশুদ্ধ, নির্মল, যে বাণী তাঁকে স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে- সে বাণী প্রচারের মাধ্যম বা পথ হবে অবশ্যই অপূর্ব ও সৌন্দর্য মন্ডিত। এই ধর্মীয় বাণী প্রচারের মূল নীতি গুলি এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে, যা সর্ব যুগে সর্ব কালে প্রযোজ্য। আলোচ্য আয়াতে প্রচারের জন্য তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। (১) হিক্‌মত (২) সদুপদেশ এবং (৩) উত্তম পন্থায় তর্ক বিতর্ক। হিক্‌মতের মাধ্যমে দাওয়াত জ্ঞাণী ও সুধী জনের জন্য, উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত জনসাধারণের জন্য এবং বিতর্কের মাধ্যমে দাওয়াত তাদের জন্য যাদের অন্তরে সন্দেহ ও দ্বিধা রয়েছে। আমরা সকলকে আল্লাহ্‌র রাস্তায় আহ্বান করবো। আর এই আহ্বান হবে 'হিকমত' অর্থাৎ জ্ঞান বিচক্ষণতার মাধ্যমে। তাদের সদুপদেশ দিতে হবে সেই ভাবে যেন তা শ্রোতার মেধা, মনন শক্তি ও উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে অতিক্রম করে না যায়। আত্মিক উন্নতির ধাপ অনুসারেই প্রত্যেকে আল্লাহ্‌র বাণী ও কোরানের ভাষাকে হৃদয়ঙ্গম করে। যিনি প্রচারক তিনি গ্রহীতার ক্ষমতা অনুযায়ী জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে সদুপদেশ দেবেন। প্রচারকের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ উদাহরণ তা ক্ষুদ্র বা বৃহৎ যাই হোক না কেন মানুষকে প্রভাবিত করবে। যুগের উপযোগী, মুক্তবুদ্ধি, চিন্তা, চেতনায় সমৃদ্ধ জীবনের আলোকে প্রচারিত ধর্মীয় জ্ঞান মানুষের বিশ্বাসকে করে সুমন্নত ও দৃঢ়। সে অনুভব করতে পারে পৃথিবীর জীবনকে ত্যাগ করে ধর্মীয় জীবন নয়। পরিচছন্ন ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জীবনই হচেছ পার্থিব ও ধর্মীয় জীবনে উন্নতির চাবিকাঠি। "যুক্তি উত্থাপন কর উত্তম ও সুন্দর পন্থায়'' এই লাইনটি ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে, "And argue with them/In way that are best/And most gracious"। ধর্মীয় প্রচারে যে সব যুক্তি তর্কের অবতারণা করা হবে, তা যেনো "বদ্ধমূল'' ধারণা না হয়। বদ্ধ মূল ও সংকীর্ণ ধারণা আল্লাহ্‌র আলো হৃদয়ে প্রবেশের পথ যেনো রূদ্ধ করে না দেয়। প্রচার যেনো শুধু মাত্র নিজ বিদ্যা জাহির বা আত্মপ্রচারণা সমৃদ্ধ না হয়, তা যেনো কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির বিরূদ্ধে কুৎসা প্রচারের মাধ্যম না হয়। প্রচারক ও প্রচারের ভাষা হবে ভদ্র, অমায়িক, সহানুভূতি ও সুবিবেচনাপূর্ণ এবং তা যুক্তি গ্রাহ্য হয় এবং শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। আমাদের আচরণ, যুক্তি, ভাষা, কখনো রূক্ষ বা কর্কষ হবে না তা হতে হবে সৌহার্দপূর্ণ, ক্ষমা সুন্দর, যেন শ্রোতাদের মনে এ কথা জাগে যে, ''এ ব্যক্তি শুধু মাত্র ধর্মীয় বা দার্শনিক মতবিরোধ প্রচারের মাধ্যমে আমকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে না। সে তো আন্তরিকভাবে তার বিশ্বাসকে ব্যক্ত করছে, যে বিশ্বাসে আছে গভীরতা, যে বিশ্বাসের মাঝে আছে মানুষের জন্য ভালোবাসা, মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা সর্বোপরি বিশ্ব বিধাতা আল্লাহ্‌র প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা।'' কিন্তু এরূপ প্রচারকের বড়ই অভাব।

২১৬২: এই আয়াতে প্রচারকের মানসিক অবস্থাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যখন আন্তরিক প্রচেষ্টা বৃথা যায়, তখন অনেক সময়ে প্রচারকের মনে হতে পারে যে, "এসব লোকদের মাঝে ধর্মীয় উপদেশ প্রচারের সার্থকতা কি ? তারাতো তাদের আদর্শে মনস্থির করেছে এবং সে ব্যাপারে তারা অনঢ় ও দৃঢ়। তারাতো শুধু মাত্র বিরোধিতার জন্য প্রস্তুত''। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, যিনি আল্লাহ্‌ বাণী প্রচারে আত্ম নিয়োগ করবেন, তিনি যেন এরূপ চিন্তা মনেও স্থান না দেয়। আল্লাহ্‌র বাণীর মাধুর্য কার মনে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করবে তা আমাদের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র বীজ যেরূপ মাটির স্পর্শে অঙ্কুরিত হয় এবং ধীরে ধীরে আকাশে শাখা প্রশাখা মেলে এক দিন মহিরুহুতে পরিণত হয় সেরূপ আল্লাহ্‌র বাণী রূপ বীজ কার মনে অঙ্কুরিত হবে সে কথা অনুধাবনের ক্ষমতা আমাদের নাই। আমাদের কাজের ফলাফল বিচারের দায়িত্ব আমাদের নয়। আমাদের দায়িত্ব শুধুমাত্র কাজ করার। মহান আল্লাহ্‌ জানেন তিনি কিভাবে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। মানুষের অন্তরের অন্তস্থল এর চিন্তা ভাবনা সম্বন্ধে আল্লাহ্‌ সবিশষ অবগত। এই আয়াতটি (১৬:১২৫) সমসাময়িক কালে রসুলুল্লাহ্‌ (সাঃ) প্রতি আল্লাহ্‌র আদেশ। কিন্তু আল্লাহ্‌র আদেশ সর্বকালের সর্বযুগের। বর্তমানে যারা ধর্মীয় বাণী প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের জন্য এই আয়াতের বক্তব্য অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ।
১২৬। যদি তোমরা তাদের শাস্তি দাও, তবে ঠিক ততখানি শাস্তি দেবে, যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর তবে তাই হচেছ সর্বশ্রেষ্ঠ (পন্থা) ধৈর্যশীলদের জন্য। ২১৬৩

২১৬৩: এই আয়াতটি মদীনায় অবতীর্ণ। ওহদের যুদ্ধে সত্তর জন সাহাবীর শাহাদাৎ বরণ এবং হযরত হামযা (রাঃ) কে হত্যার পর তাঁর লাশের নাক কান কর্তনের ঘটনা সম্পর্কে এই আয়তটি অবতীর্ণ হয়েছে। নিজ শ্রদ্ধেয় পিতৃব্য হামযার বিকৃত মৃত দেহ দেখে রসুলুল্লাহ্‌ (সাঃ) শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি এর প্রতিশোধে সত্তর জন মুশরিকের মৃতদেহ বিকৃত করবেন। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার ভুমিকা এখানে বর্ণিত হলো। এখানে সাবধান করা হয়েছে ততটুকুই প্রতিশোধ নিতে যতটুকু তার প্রতি করা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ রসুলকে(সাঃ) ন্যায়ানুগ আচরণের উপদেশ দেয়া হয়েছে, সমপরিমাণ প্রতিশোধের অনুমতি যদিও রয়েছে, কিন্তু তাও ছেড়ে দিয়ে ধৈর্য ধারণ করা অধিকতর শ্রেয়। কারণ প্রতিশোধের মাধ্যমে কোন দিনও জিঘাংসা বৃত্তিকে প্রশমিত করা সম্ভব নয়। জিঘাংসা আত্মার শান্তি বিনষ্ট করে। কিন্তু আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করে ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে দুঃখ, কষ্ট ও প্রতিকূলতাকে জয় করা যায়। আত্মার মাঝে দুঃখ কষ্টের অনলের পরিবর্তে আত্মা প্রশান্ত হয়। ধৈর্যশীল ব্যক্তি হয় প্রশান্তমণা, কারণ সে তার নীতি থেকে বিচ্যুত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করার ফলে সহজেই তার আত্মা বিক্ষুব্ধ হয় না। ক্রোধকে সে বশীভূত করতে সক্ষম। ক্রোধ এমন একটি খারাপ রিপু যা অন্যান্য সদ্‌গুণকে ধ্বংস করে ফেলে। এ জন্যই ক্রোধকে আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আয়াতটি যদিও দৈহিক কষ্ট ও দৈহিক ক্ষতি সম্পর্কে অবতীর্ণ করা হয়েছে, কিন্তু ভাব আরও ব্যাপক অর্থে প্রযোজ্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর নীতি প্রযোজ্য।

১২৭। এবং তুমি ধৈর্যশীল হও ২১৬৪। কারণ তোমার ধৈর্য তো আল্লাহ্‌রই প্রেরিত (সাহায্য)। তাদের জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তাদের ষড়যন্ত্রে নিজেকে বিপর্যস্ত করো না।

২১৬৪: বিরোধ ও সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় মুসলমানদের কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্বন্ধে মূলনীতি এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। "যদি শত্রু তোমার করতল গত হয়, তবে তুমি তাকে ততটুকুই আঘাত করতে পার যতটুকু সে তোমাকে করেছে, তার বেশী নয়। কিন্তু ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করা অধিকতর শ্রেয়। এই আয়াতে রসুলকে (সাঃ) আল্লাহ্‌ সরাসরি ধৈর্য ধারণের আদেশ দিয়েছেন। কেননা তাঁর মহত্ব ও উচ্চপদ হেতু অন্যের তুলনায় এটাই ছিলো তাঁর জন্য উপযোগী। তাঁকে ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে অতুলনীয় ক্রোধোদ্দীপক প্ররোচনার বিরূদ্ধে। মনে হতে পারে যে, শত্রুরা তার ক্ষমা, সংযম ও ধৈর্যকে দুর্বলতা না ভাবে। কারণ মুসলিম জগতের নেতা হিসেবে শত্রুর অত্যাচার থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার দায়িত্ব তাঁর। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ রসুলকে(সাঃ) বলেছেন যে, তাদের ষড়যন্ত্রে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। এ সব ক্ষেত্রে ধৈর্য এবং দৃঢ়তা অবলম্বনই হচেছ শ্রেষ্ঠ পন্থা এবং এই হচেছ আল্লাহ্‌র মনোনীত পথ। যদি তারা আল্লাহ্‌র হেদায়েত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, রসুল (সাঃ) যেনো সে ব্যাপারে মনঃক্ষুন্ন বা দুঃখিত না হয়। তিনি তাঁর কর্তব্য ও দায়িত্ব অবিচলিত ভাবে করে যাবেন। যদি মুশরিকেরা তাঁর বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, রসুল (সাঃ) যেনো দুঃখ না করেন। কারণ মুসলমানদের রক্ষা কর্তা স্বয়ং আল্লাহ্‌।

উপদেশ:আয়াতটিতে যদিও রসুলকে (সাঃ) সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু এর আবেদন সর্বযুগের মুসলিম উম্মার প্রতি প্রযোজ্য। বিপদে দুঃখে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে, সর্বপরি আল্লাহ্‌র প্রতি নির্ভরশীলতার মাধ্যমে বিপদকে অতিক্রমের উপদেশ এখানে দেয়া হয়েছে।

১২৮। যারা নিজেকে সংযত করে এবং ভালো কাজ করে; আল্লাহ্‌ তাদের সঙ্গে থাকেন ২১৬৫।

২১৬৫: যারা মুমিন বান্দা, যারা এক আল্লাহ্‌র প্রতি শুধুমাত্র নির্ভরশীল তাদের প্রতি সান্তনার বাণী দ্বারা এই সূরাটির উপসংহার টানা হয়েছে। তাদের জন্য এই পংক্তি কয়েকটি হচেছ সর্ব্বোচচ সান্তনার বাণী কারণ এখানে আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন যে তিনি সর্বদা তাঁদের সাথে থাকেন এবং তারা আল্লাহ্‌র নিরাপত্তার যোগ্য বলে বিবেচিত হনঃ

(১) যারা সর্বাবস্থায় ন্যায়ানুগ অর্থাৎ বিপদে, দুঃখ-কষ্টে, ধৈর্য হারায় না, রাগ ও জিঘাংসাকে সংযত করে এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না,

(২) যারা ধীর স্থির ও দৃঢ়তার সাথে সৎকাজের প্রতি নিবেদিত থাকে এই বিশ্বাসে যে তাদের কাজ আল্লাহ্‌কে খুশি করবে। আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্খাই হবে মোমেন বান্দার সর্ব্বোচ্চ আশা ও আকাঙ্খা।