Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ২৭ জন
আজকের পাঠক ৬৫ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৪৫৬৮১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২১৩৬৫২ বার
+ - R Print

সূরা হাজ্জ


সূরা হাজ্জ বা তীর্থযাত্রা - ২২

৭৮ আয়াত, ১০ রুকু, মাদানী
[ দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে।]


ভূমিকা : এখান থেকে শুরু হচ্ছে চারটি নূতন সিরিজের সূরা। পূর্ববর্তী পাঁচটি সূরা যে ভাবে বিভিন্ন নবী রসুলদের সত্যকে প্রচার ও প্রসারের বিভিন্ন চেষ্টা এবং পাপকে জয় করার বর্ণনা আছে ঠিক একই ভাবে এই নূতন সিরিজের সূরাগুলিতে বর্ণনা আছে ধর্মীয় অগ্রগতির উপরে পরিবেশ ও পদ্ধতির প্রভাব। দেখুন সূরা ১৮ এর ভূমিকা।

এই সুরার বিষয়বস্তুতে বিশেষ ভাবে আলোচনা করা হয়েছে পবিত্র কাবাগৃহ, হজ্জ্ব, কোরবাণী, আক্রান্ত হলে সত্যকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করা এবং যুদ্ধ করা এবং অন্যান্য নিঃস্বার্থ কর্ম যা মিথ্যাকে দূরীভূত করে।

এই সূরার সময়কাল সম্বন্ধে মতবিরোধ আছে। সম্ভবতঃ এর কিছু অংশ মক্কাতে এবং কিছু অংশ মদীনাতে অবতীর্ণ হয়, সে যাই হোক তার সাথে সূরাটির বক্তব্যের কোনও সম্পর্ক নাই।

সারসংক্ষেপ : আধ্যাত্মিক জীবনের ভবিষ্যত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যের জন্য সাহায্য এবং পাপের জন্য শাস্তি - ঈমানের দৃঢ়তার জন্য প্রয়োজনীয়। [ ২২: ১ - ২৫ ]

পবিত্রতা , প্রার্থনা , বিনয়, এবং ঈমানের প্রতীকার্থে প্রকাশ হচ্ছে হজ্জ্ব। পবিত্র কোরবাণী আমাদের কৃতজ্ঞতার এবং আল্লাহ্‌র প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা, এবং গরীবের মাঝে মাংস বিতরণের মাধ্যমে তাদের সাথে অংশীদারিত্বের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে। সত্য যখন আক্রান্ত হয়, তখন তা রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যুদ্ধ করা হচ্ছে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ। [ ২২ : ২৬ - ৪৮ ]

মন্দ বা অসৎ আল্লাহ্‌র নবীর কাজে বাঁধার সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তাঁর কাজ সাফল্য লাভ করবেই এবং আল্লাহ্‌র সত্য ও করুণা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবেই। সুতারাং বিনয়ের সাথে আল্লাহ্‌র সেবা কর এবং আল্লাহ্‌ তোমাদের রক্ষা করবেন ও সাহায্য করবেন। [ ২২ : ৪৯ - ৭৮ ]

সূরা হাজ্জ বা তীর্থযাত্রা - ২২

৭৮ আয়াত, ১০ রুকু, মাদানী
[ দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে।]


০১। হে মানবকূল ! তোমার প্রভুকে ভয় কর। [ কেয়ামতের ] প্রচন্ড আন্দোলন হবে এক ভয়ংকর ব্যাপার ২৭৭০।

২৭৭০। কেয়ামতের প্রকম্পনের ভয়াবহতার উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র আদেশ অমান্যকারীদের সাবধান করা হয়েছে। কেয়ামত তাদের জন্যই ভয়াবহ যারা আল্লাহ্‌র আদেশের বিরুদ্ধে বলে এবং বিদ্রোহ করে। অপর পক্ষে যারা পূণ্যাত্মা তাদের জন্য কেয়ামত দিবস ভয়াবহ নয়, বরং তারা ফেরেশতাদের দ্বারা স্বাগত সম্ভাষিত হবেন। দেখুন আয়াত [ ২১ : ১০৩ ]।

০২। সেদিন তোমরা দেখবে প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী মাতা তার দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী মাতা তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানবকূলকে দেখবে নেশাগ্রস্থের ন্যায়, যদিও তারা নেশাগ্রস্থ নয়। বস্তুতঃ আল্লাহ্‌র ক্রোধ হবে ভয়াবহ ২৭৭১।

২৭৭১। কেয়ামতের দিনের ভয়াবহতা উপস্থাপন করার জন্য তিনটি উপমার ব্যবহার করা হয়েছে এই আয়াতে : ১) এই পৃথিবীতে আমরা দেখি কোনও মা -ই শত বিপদেও তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুকে পরিত্যাগ করবে না। কিন্তু কেয়ামত দিনের ভয়াবহতায় " মা " তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে পরিত্যাগ করতে দ্বিধা বোধ করবে না। ২) সন্তান সম্ভবা মাতা গর্ব ও আশার সাথে সন্তান ধারণ করে, এবং অপেক্ষা করে নবজাতকের আগমনের। কিন্তু কেয়ামতের ভয়াবহতায় গর্ভপাত ঘটে যাবে। ৩) স্বভাবতঃ সাধারণ অবস্থায় মানুষ থাকে দৃঢ় আত্ম মর্যদাপূর্ণ। কিন্তু মাতাল হলে তাঁর এই আত্মমর্যদাপূর্ণ অবস্থার অন্তর্ধান ঘটে। কেয়ামত দিবসে কোনও মাদক ব্যতীতই মানুষ মাতালের ন্যায় ব্যবহার করবে। সে তার আত্মমর্যদা হারাবে।

০৩। তথাপি মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ আছে যারা না জেনেই আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে তর্ক করে এবং [ তারা ] অবাধ্য ও বিদ্রোহী শয়তানের অনুসরণ করে।

০৪। তাদের সম্বন্ধে এই আইন করা হয়েছে যে, যারাই [ মন্দদের সাথে ] বন্ধুত্ব কামনা করবে, তাকেই সে পথভ্রষ্ট করবে। এবং তাকে পরিচালিত করবে প্রজ্বলিত আগুনের শাস্তির দিকে ২৭৭২।

২৭৭২। এত সাবধান বাণী সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে এমন নির্বোধ আছে যারা আল্লাহ্‌র বিরোধিতা করে, সেই আল্লাহ্‌ , যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন, এবং দয়া , করুণা ও ভালোবাসার সাথে তাদের প্রতিপালন করেন। এ সব লোক আল্লাহ্‌র আইন অমান্যকারী এবং অপরাধী - কারণ তারা শয়তানের বন্ধুত্বের প্রয়াসী। আর আল্লাহ্‌ এখানে বলছেন যে, তিনি তাঁর অমোঘ নিয়ম চালু করেছেন যে যারা শয়তানের বন্ধুত্ব কামনা করবে শয়তান তাদের দোযখের পথে পরিচালিত করবেই।

০৫। হে মানবকূল ! পুণরুত্থান সম্বন্ধে তোমাদের যদি সন্দেহের অবকাশ থাকে তবে গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখ, ২৭৭৩ আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি ধূলো কণা থেকে , তারপরে শুক্র থেকে , তারপরে ঝুলন্ত রক্তপিন্ড থেকে , তারপর পূর্ণ আকৃতি বিশিষ্ট অথবা অপূর্ণ আকৃতি বিশিষ্ট গোশ্‌তপিন্ড থেকে ২৭৭৪ যেনো আমি আমার [ক্ষমতা ] তোমাদের নিকট প্রকাশ করতে পারি। এবং আমি যাকে ইচ্ছা তাকে মাতৃগর্ভে নির্দ্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত রাখি ২৭৭৫, তারপর আমি তোমাদের শিশুরূপে বের করে আনি , তারপর [ লালন পালন করি ] যেনো তোমরা পরিণত বয়সে উপণীত হও। তোমাদের মধ্য কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, আবার কাউকে কাউকে নিয়ে যাওয়া হয় অতিদুর্বল বৃদ্ধ বয়েসে, যেনো [ অনেক কিছু ] জানার পরে তারা আর সজ্ঞানে থাকে না ২৭৭৬। এবং [ আরও ] দেখ, যে ভূমি নিষ্ফলা ও নির্জিব থাকে, কিন্তু যখন আমি তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তা তখন [ জীবন স্পন্দনে ] জেগে ওঠে, তা ষ্ফীত হয় এবং উৎপন্ন করে [ জোড়ায় জোড়ায় ] সুন্দর সুন্দর উদ্ভিদ সমূহ ২৭৭৭।

২৭৭৩। এই আয়াতে মানুষের সৃষ্টি রহস্যের বর্ণনা আছে যা অনেক তফসীরকার তফসীরের প্রধান বক্তব্য হিসেবে উত্থাপন করেছেন। এই বর্ণনা হচ্ছে বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। আমরা এখানে আল্লাহ্‌র বক্তব্যের মর্মার্থ উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো। সন্দেহ বাতিকেরা যদি পুণরুত্থান সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে, তবে স্রষ্টা এই আয়াতে পৃথিবীর অতি সাধারণ কয়েকটি ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যা আমরা প্রতি নিয়ত আমাদের চারিদিকে দেখতে পাই। মানুষ কি নিজের জন্ম রহস্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে না ? প্রাণহীন মাটি থেকে অর্থাৎ বিভিন্ন মৌলিক উপাদান , যা প্রাণহীন , থেকে শুরু , তারপর বীজ বা শুক্র, তারপর নিষিক্ত ডিম্ব, তারপরে ভ্রুণ এভাবেই পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এর পরে পৃথিবীর জীবনের পরিক্রমায় শৈশব, কৈশর, যৌবন অতিক্রম করে একদিন বার্দ্ধক্যে উপণীত হয় এবং শেষ পরিণতি ঘটে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। যিনি পৃথিবীতে এক জীবনের এতগুলি পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হন , তবে মানুষ কিভাবে অবিশ্বাস করে যে, সেই মহান স্রষ্টা পৃথিবীর এই জীবন শেষে পরলোকে অন্য জীবনের শুরু করতে অক্ষম ? বিবর্তনের ধারাতে পৃথিবী ও মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, যিনি তা পারেন তিনি অবশ্যই মৃত্যুর পরে পুণরুত্থানে সক্ষম। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য আর এক সত্য তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে আমাদের চারিদিকে দৃষ্টিপাত করতে। উষর মরুভূমি, যেখানে তৃণলতার চিহ্নমাত্র নাই যদি সেখানে আল্লাহ্‌র করুণারূপ বৃষ্টি নিয়মিত হয়, তবে অতি অল্পদিনেই মরুভূমি শস্যশ্যামল ভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। মৃত জমি জীবন্তরূপ ধারণ করে। যে স্রষ্টা মৃত জমিকে এক সমারোহপূর্ণ প্রদর্শনীতে পরিণত করতে পারেন , তিনি অবশ্যই মৃত্যুর পরে নূতন অন্য পৃথিবী সৃষ্টিতে সক্ষম।

২৭৭৪। মানুষের সৃষ্টির বর্ণনায় প্রাণহীন পদার্থ [ এমিনো এসিড ] থেকে শুরু করে তার পূর্ণ জীবন চক্রের বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনার নির্ভুলতা, সৌন্দর্য, খুঁটিনাটি যে ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা বিজ্ঞানের বিষয় বস্তু। যারা প্রাণীবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত আশা করা যায় চৌদ্দশত বৎসর পূর্বে নাজেল হওয়া কোর-আনে তারা বর্তমান বিজ্ঞানের যোগসূত্র খুঁজে পাবেন। মানুষের মাতৃগর্ভে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথে আত্মিক পরিবর্তনের কথাটিও চিন্তা করতে হবে। মহান শিল্পী আল্লাহ্‌ এ ভাবেই আত্মার বাহন শরীরের পূর্ণতার মাধ্যমে আত্মাকে করেন সমৃদ্ধ, পরিপূর্ণ ও বিকশিত।

২৭৭৫। "আমি যাকে ইচ্ছা করি " অর্থাৎ ছেলে বা মেয়ে সন্তান, সুন্দর বা কুৎসিত , ফর্সা বা কালো, বুদ্ধিমান বা সাধারণ, ভালো বা মন্দ ইত্যাদি শিশু। মানব শিশু অনন্ত সম্ভাবনাময়। জীবনের বিভিন্ন দিকে তাঁর বিকাশ লাভের সম্ভাবনা আল্লাহ্‌ তার চরিত্রের মাঝে ডি, এন , এ'র মাধ্যমে নির্দ্দিষ্ট করে দেন। তিনি নির্দ্দিষ্ট করে দেন বংশগতিধারা - এ সকলেই মহান আল্লাহ্‌র ইচ্ছা।

২৭৭৬। দেখুন [ ১৬ : ৭০ ]। এই আয়াতে জীবনের রহস্যের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র করুণা ও অনুগ্রহকে তুলে ধরা হয়েছে। এই আয়াতে মানুষের জীবন মৃত্যুর রহস্যকে তুলে ধরার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা পরকালের জীবনের প্রতি , যে জীবন সৃষ্টি আল্লাহ্‌র ক্ষমতারই স্বাক্ষর ও প্রতিজ্ঞা। এখানে উপমা ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের জীবনচক্রের।

জীবন শক্তিতে পরিপূর্ণ শিশু যৌবনে, শৈর্যে বীর্যে, জ্ঞানে গরিমায়, উদ্দীপ্ত হয়, আবার সেই মানুষই বার্দ্ধক্যে সকল ক্ষমতা ও জ্ঞানশুন্য হয়ে শিশুর মত হয়ে যায়। " যেনো অনেক কিছু জানার পরে তারা আর স্বজ্ঞানে থাকে না।" মানুষের জীবন চক্র সেতো স্রষ্টারই ক্ষমতার প্রকাশ মাত্র।

২৭৭৭। এই আয়াতটি ভাষা ও উপমা ও বর্ণনার মাধুর্যে এক অপূর্ব ও অমূল্য নীতিগর্ভমূলক উপদেশ। সামান্য কয়েকটি বাক্যের মাধ্যমে যে সত্যকে প্রকাশ করা হয়েছে তার যাদুকর প্রভাব যে কোন আল্লাহ্‌ প্রেমিকের মনে গভীর ভাবে রেখাপাত করতে সক্ষম।

০৬। ইহা এরূপেই [ হয় ], কারণ আল্লাহ্‌ [ একমাত্র ] সত্য। তিনিই মৃতকে জীবন দান করেন এবং সব কিছুর উপরে তাঁর ক্ষমতা বিদ্যমান ২৭৭৮।

২৭৭৮। বিশ্ব- প্রকৃতির মাঝে জীবনের সমারোহ, জীবনের রহস্য আমাদের এক অমোঘ সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আর তা হচ্ছে বিশ্ব-প্রকৃতির স্রষ্টা একজনই। একদিন সবই ধ্বংস হয়ে যাবে, শুধু রয়ে যাবে আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব। তিনি আদি ও তিনিই অন্ত এবং তিনি অবিনশ্বর।

০৭। এ সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই যে, কিয়ামত অবশ্যই আসবে, অথবা যারা কবরে আছে তাদের সকলকে আল্লাহ্‌ উত্থিত করবেন।

০৮। তথাপি মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে যাদের কোন জ্ঞান নাই , কোন পথ নির্দ্দেশ নাই, কোন দীপ্তিমান কিতাব নাই, কিন্তু [ তা সত্ত্বেও ] তারা আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে বির্তক করে ২৭৭৯;-

২৭৭৯। 'দীপ্তিমান কিতাব '। দেখুন আয়াত [ ৩ : ১৮৪ ] এবং টিকা ৪৯০। মওলানা ইউসুফ আলীর মতে জ্ঞান শব্দটি পার্থিব জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মানুষ বিদ্যা শিক্ষার মাধ্যমে , বুদ্ধির ব্যবহারের মাধ্যমে যে জাগতিক জ্ঞান লাভ করে তাকেই জ্ঞান শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে। 'পথ নির্দ্দেশ ' শব্দটি দ্বারা স্বর্গীয় হেদায়েতকে বোঝানো হয়েছে যা আল্লাহ্‌র তরফ থেকে সরাসরি আগত অথবা তার নবী রসুলদের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়, অথবা স্বর্গীয় প্রত্যাদেশ যা ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়, এবং "Book of Enlightenment" বা "দীপ্তিমান কিতাব অর্থ নৈতিক মূল্যবোধ পরিচালনার ভিত্তিস্বরূপ যে কিতাব। সৎ চরিত্রের ভিত্তি স্বরূপ যে নৈতিক মালা , যার অনুসরণে মানুষ পবিত্র ও সৎ চরিত্রের অধিকারী হয় তা যে গ্রন্থ ধারণ করে। দীপ্তিমান কিতাব হচ্ছে সেই গ্রন্থ যার মধ্যে আছে চরিত্রের মাধুর্য ও গুণের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে সুন্দর জীবন যাপন প্রণালীর পথের নিশানা। আর এই স্বর্গীয় পথের নিশানাকে যিনি দেখিয়ে দেন বা নির্দ্দেশ করেন বা চিনিয়ে দেন সেই সব আল্লাহ্‌র নবী ও রাসুলেরা হচ্ছে "পথ নির্দ্দেশ।" কোর-আনকে দীপ্তিমান কিতাব বলা হয় কারণ এই সেই গ্রন্থ যার মধ্যে আছে চরিত্রের মাধুর্য ও গুণের উৎকর্ষ সাধন করে সুন্দর জীবন যাপন প্রণালীর পথের নিশানা। কোর-আনের মূল নির্দ্দেশ হচ্ছে চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করার উপায় সমূহ , যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব। পাপে নিমজ্জিত আত্মা আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভে বঞ্চিত হয়। যে আত্মা গুণান্বিত ও আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভে ধন্য সেই তো আলোকিত আত্মা। সেদিক থেকে " দীপ্তিমান কিতাব " কথাটি অত্যন্ত প্রযোজ্য।

০৯। [ অবজ্ঞাভরে ] ঘাড় বাঁকিয়ে, যেনো [ লোকদের ] আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিপথে চালিত করতে পারে। ইহজীবনে তাদের জন্য আছে অসম্মান এবং শেষ বিচারের দিনে আমি তাদের জ্বলন্ত [ আগুনের ] স্বাদ আস্বাদ করাব ২৭৮০।

২৭৮০। অনেক তফসীরকারের মতে আয়াতটি আবু জহলের প্রতি প্রযোজ্য। কিন্তু এই আয়াতের বক্তব্য সার্বজনীন। সকল যুগেই আবু জহলের মত লোক সমাজে বিদ্যমান। আয়াত [ ২২ : ৩ ] এর বক্তব্য একই, এক্ষেত্রে আয়াতটির নাজেল হওয়া সম্বন্ধে বলা হয় যে, তা Nadhar ibn Harith এর জন্য প্রযোজ্য ছিলো। তবে এর আবেদন সার্বজনীন যুগ কাল অতিক্রান্ত।

১০। [ বলা হবে ] : তোমাদের হাত [ যে কর্ম ] পূর্বে প্রেরণ করেছে এটা তারই জন্য। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তার বান্দাদের প্রতি অন্যায় করেন না ২৭৮১।

২৭৮১। প্রত্যেককে প্রত্যেকের কর্মফল ভোগ করতে হয়। ভালো কাজের শেষ পরিণত ভালো এবং মন্দ কাজের শেষ পরিণতি মন্দ। এই আল্লাহ্‌র আইন। বিশ্ব বিধাতার সর্ব চরাচরে এই আইন বিদ্যমান। আল্লাহ্‌ ন্যায় বিচারক। তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি সামান্যতমও অবিচার করেন না।

রুকু - ২

১১। মানুষের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা আল্লাহ্‌র আনুগত্য করে সন্দেহের সাথে ২৭৮২। যদি তাদের কল্যাণ হয়, তাহলে তারা পরিতৃপ্ত , কিন্তু যদি তাদের বিপদ আসে, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা ক্ষতিগ্রস্থ হয় দুনিয়াতে ও আখিরাতে। ইহা তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।

২৭৮২। যাদের ঈমানের ভিত্তি মজবুত নয়, তাদের মনঃস্তত্বকে এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। যদি সংসারের সব কিছু তাদের স্বার্থের পক্ষে যায় তবে তারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসী। কিন্তু যদি কোনও বিপদ বা বিপর্যয় তাদের উপরে পতিত হয়, তবে তাদের ঈমানের ভিত্তি নড়ে ওঠে। সুখের দিনে তারা ঈমানদার , কিন্তু দুঃখ বিপর্যয়ের দিনে তারা আল্লাহ্‌র উপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করার পরিবর্তে অন্য উপাস্যের সাহায্য প্রার্থনা করে। যেরূপ বাংলাদেশে বহু লোককে দেখা যায় বিপদ বিপর্যয়ে আল্লাহ্‌কে ডাকার সাথে সাথে তারা রত্নপাথর, পানি পড়া, বা পীরের মাজারে নিয়ত ও শিন্নির স্মরণাপন্ন হয়। এদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে যে, এরাও একধরণের মোনাফেক। তারা অবশ্যই প্রতারক বা দ্বিমুখী নীতিসম্পন্ন লোক নয়। তাদের অপরাধ , তারা মনের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল চরিত্রের অধিকারী। তারা স্বার্থপর, সে কারণে তারা আল্লাহ্‌র জন্য কোন কিছুই হারাতে রাজী নয় তাদের সব চাই। এই "সব চাই " এর দল হয় অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ-মনা; এরা তাৎক্ষণিক সাফল্যের ভিত্তিতে জীবনের জয়পরাজয়ের মূল্যমান বিচার করে। ফলে এরা হয় দূরদৃষ্টি বিহীন জীবনের সব কিছুই এরা জাগতিক চাওয়া পাওয়ার ভিত্তিতে বিচার করে। জাগতিক পাওয়া ও পার্থিব লাভই এদের জীবনের মূল মন্ত্র। যখনই তাদের এই চাওয়া পাওয়ার স্বার্থে আঘাত লাগে তখনই তারা আল্লাহ্‌র একত্বের প্রতি বিশ্বাসের দৃঢ়তা রাখতে পারে না। তারা বুঝতে অক্ষম যে বিপদ বিপর্যয়ের পরীক্ষার মাধ্যমেই আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করে নেন। এরা ইহাকাল এবং পরকাল দুকূলই হারায়। এই পৃথিবীতে তাদের পরাজয়ের সাক্ষী হয় সকলেই।

১২। আল্লাহ্‌ ব্যতীত তারা এমন সব উপাস্যকে ডাকে যারা তাদের ক্ষতি বা লাভ কিছুই করতে পারে না। ইহাই চরম পথ ভ্রষ্টতা ২৭৮৩।

২৭৮৩। যাদের ঈমানের ভিত্তি মজবুত নয়, সেই সব মোনাফেকদের মনঃস্বত্ব এই আয়াত গুলিতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র প্রতি অবিচল বিশ্বাসই হচ্ছে ঈমানের ভিত্তি। এ বিশ্বাস মনে রাখা যে, সর্ব কল্যাণের মালিক এক আল্লাহ্‌। দুঃখ বিপদ বিপর্যয় একমাত্র তাঁরই কল্যাণময় স্পর্শে দূর হওয়া সম্ভব। আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীলতায় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও বিশ্বাসীরা কুণ্ঠিত নয়। বিশ্বাসীদের নিকট ধর্ম হচ্ছে সর্বোচ্চ আকাঙ্খিত বিশ্বাস, মহৎ উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার, আল্লাহ্‌র অসীম করুণা ও অনুগ্রহ আত্মার মাঝে অনুধাবন । অপর পক্ষে যাদের ঈমান দোদুল্যমান,তারা ধর্মকে গ্রহণ করে কতগুলি আনুষ্ঠানিকতা রূপে। আল্লাহ্‌র প্রতি আত্মসমর্পনের মাধ্যমে চরিত্রে যে দুর্লভ গুণরাজির জন্ম নেয়, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের মানসিকতার জন্ম নেয়, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সনাক্ত করার ক্ষমতা লাভ করে, মোনাফেকের চরিত্রে তা থাকে অনুপস্থিত। তাৎক্ষণিক লাভের আশায় সে এমন কিছুকে ডাকে [ রত্ন পাথর ধারণ বা পীরের মাজারে গমন ইত্যাদি ] যারা " ক্ষতি বা লাভ কিছুই করতে পারে না।" অর্থাৎ যত তারা এসব মিথ্যা উপাস্যের সাহায্য প্রার্থনা করে, তত তারা প্রকৃত ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়। আল্লাহ্‌র রাস্তা থেকে দূরে সরে যায়।

১৩। [ সম্ভবতঃ] তারা এমন কিছুকে ডাকে যার ক্ষতি উহার লাভ থেকে অধিক নিকটবর্তী। সাহায্যের জন্য কত মন্দ এই অভিভাবকত্ব, কত মন্দ এই সাথী ২৭৮৪।

২৭৮৪। উপরের আয়াতগুলিতে যাদের কথা বলা হয়েছে, যারা বিপদ বা বিপর্যয়ে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর সাহায্য কামনা করে তাদের এই উপাসনা মিথ্যা। তাদের এই মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা তাদের জন্য ভালো বা মন্দ কোন ফলই বয়ে আনতে পারবে না এ কথা সর্বদা সঠিক নয়, এই আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন, সম্ভবতঃ ক্ষতিই সর্বপ্রথম হবে, এবং তারা আল্লাহ্‌র কোনও অনুগ্রহ লাভ করবে না। কারণ মিথ্যা উপাস্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনার ফলে এ সব আত্মা বিপথে চালিত হয়। আর বিপথগামী আত্মা আল্লাহ্‌র সাহায্য লাভের অনুপযুক্ত।

১৪। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে , তাদের আল্লাহ্‌ [ বেহেশতের ] বাগানে প্রবেশ করাইবেন , যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। আল্লাহ্‌ যা পরিকল্পনা করেন তা বাস্তবায়িত করেন ২৭৮৫।

২৭৮৫। এই আয়াতটিতে আল্লাহ্‌ ইসলামের সারমর্মকে উত্থাপন করেছেন। দৃঢ় ঈমান ও সৎ কর্ম এই দুটো হচ্ছে ধর্মের মূল ভিত্তি। ব্যক্তির জীবনে এ যেনো দুটি পায়ের সদৃশ। দীর্ঘ পথ অতিক্রম বা সুউচ্চ পর্বতে আরোহণ যেমন এক পায়ে সম্ভব নয় দুপায়ের প্রয়োজন হয়, ঠিক সেরূপ ধর্মের দীর্ঘ পথকে অতিক্রম করে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রয়োজন ঈমান বা দৃঢ় বিশ্বাস এবং এই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বিধানের জন্য সৎকর্ম দ্বারা। বিশ্বাস ও সৎ কর্ম হচ্ছে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের পূর্বশর্ত। বেহেশতে প্রবেশের চাবিকাঠি। এ ভাবেই আল্লাহ্‌র ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে, এবং সর্ব শক্তিমান আল্লাহ্‌ পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। এ কথারই প্রতিফলন দেখি আয়াত [ ২: ৬২ ] ' [ ৫ : ৬৯ ] এবং [ ২২ : ১৭ ] আয়াতে। এ সব আয়াতে মুসলমান [ বিশ্বাসী ] দের সাথে ইহুদী , খৃষ্টান, এবং সাবীয়ানদের উল্লেখ করা হয়েছে , এবং বলা হয়েছে একত্ববাদে বিশ্বাস এবং সৎকর্ম-ই হচ্ছে ধর্মের মূল ভিত্তি।

১৫। যদি কেউ মনে করে থাকে যে, আল্লাহ্‌ তাঁকে [ রাসুলকে ] এই পৃথিবীতে এবং পরকালে সাহায্য করবেন না, তবে তাঁর উচিত যে, সে যেনো আকাশের দিকে একটি দড়ি টানায় এবং [ নিজেকে ] বিচ্ছিন্ন করে ২৭৮৬। অতঃপর দেখুক তার এই প্রচেষ্টা, তার আক্রোশের হেতু দূর করে কি না।

২৭৮৬। এই আয়াতটি সম্বন্ধে তফসীরকারদের মতদ্বৈত আছে। অধিকাংশ তফসীরকারের মতে " আল্লাহ্‌ তাকে " বাক্যটির মধ্যে " তাকে" সর্বনামটি রাসুলের (সা) পরিবর্তে ব্যবহার হয়েছে। এবং "যদি কেহ " বাক্যটির মধ্যে "কেহ" শব্দটি রাসুলের (সা) শত্রুদের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। এই লাইনটির অর্থ দাঁড়ায় রাসুলের (সা) শত্রুদের সর্বান্তকরণের ইচ্ছা ছিলো, যে কোন ভাবে আল্লাহ্‌ নবীর ধ্বংস কামনা। মওলানা ইউসুফ আলী এখানে ইবনে আব্বাসকে অনুসরণ করেছেন যাকে অধিকাংশ তফসীরকারগণ অনুসরণ করে থাকেন। সম্পূর্ণ আয়াতটির অর্থ দাঁড়ায় যে, রাসুলের (সা) শত্রুরা তাঁর সাফল্যে যদি রাগে অন্ধ হয়ে যায় ,তবে তারা ছাদে রজ্জু ঝুলিয়ে তাতে ঝুলে পড়ুক। "Samaa" শব্দটি ঘরের ছাদের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। যদি "Samaa" শব্দটির অর্থ "আকাশ " হয় , যা এখানে করা হয়েছে, তাহলে সম্পূর্ণ আয়াতটির অর্থ দাঁড়াবে, : আল্লাহ্‌র সাহায্য ও রাসুলের (সা) সাফল্যে যদি রাসুলের (সা) শত্রুরা আক্রোশে অন্ধ হয়ে যায়, তবে তারা আকাশ পর্যন্ত দড়ি ঝুলিয়ে দিক এবং এভাবে তারা দেখুক যে তারা [ শত্রুরা ] আল্লাহ্‌র সাহায্য বন্ধ করতে পারে কি না। অন্য কথায় তারা নির্বোধ , কারণ তারা মনে করে তাদের নিম্নমানের কৌশল দ্বারা তারা আল্লাহ্‌র রাসুলকে (সা) আল্লাহ্‌র সাহায্যচ্যুত করতে পারবে। সারকথা এই যে, ইসলামের পথ রুদ্ধকারী শত্রু চায় যে, আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁর রাসুল (সা) ও ধর্মকে সাহায্য না করুণ। সুতারাং যে ব্যক্তি রাসুল (সা) ও তাঁর ধর্মের উন্নতির পথ রুদ্ধ করতে চায়, তার সাধ্য থাকলে এরূপ কৌশল অবলম্বন করা উচিত যাতে নবুওয়াতের পদ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ওহীর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। এই অসম্ভব বিষয়বস্তুকে সম্ভব ধরে নেয়ার ভঙ্গীতে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, রসুলুল্লাহ্‌ (সা) থেকে ওহী বন্ধ করতে সে কোনরূপে আকাশে পৌঁছে ওহী আসার পথ বন্ধ করে দিক।

১৬। এ ভাবেই আমি সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে উহা প্রেরণ করেছি। আর আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন ২৭৮৭।

২৭৮৭। 'উহা' সর্বনাম দ্বারা এস্থলে কোরাণকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ্‌র রসুলের (সা) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র না করে অবিশ্বাসীদের এই আয়াতে আহ্বান করা হয়েছে রসুলের (সা) নিকট প্রেরিত আল্লাহ্‌র যে "সুস্পষ্ট নিদর্শন " প্রেরণ করা হয়েছে তা অনুধাবন করার জন্য। পবিত্র কোরাণে আল্লাহ্‌র হেদায়েত বর্তমান। আর এই হেদায়েত - ই হচ্ছে সঠিক পথে চলার পথ নির্দ্দেশ এবং সঠিক পথের সুফল এবং বিপথের কুফল বর্ণনা করা হয়েছে। এই কর্মফল আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্দ্দিষ্ট আইন এর কোন ব্যত্যয় নাই। আল্লাহ্‌র 'ইচ্ছাই ' আল্লাহ্‌র আইন। যে আল্লাহ্‌ নির্দ্দেশিত সঠিক পথে চলে; আল্লাহ্‌ তাকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। অর্থাৎ সে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহভাজন হয় এবং তার হৃদয়ের মাঝে সে আল্লাহ্‌র হেদায়েতকে অনুভব করে। এই হচ্ছে বিশ্বভূবনে আল্লাহ্‌র আইন বা "ইচ্ছা"। "ইচ্ছা" শব্দটির দ্বারা আল্লাহ্‌র আইনকেই বোঝানো হয়েছে। হৃদয়ের মাঝে আল্লাহ্‌র হেদায়েতের অনুভব করার ক্ষমতা হচ্ছে মোমেন বান্দার সর্বোচ্চ পাওয়া। যারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার বা আইনের সাথে নিজের ইচ্ছাকে সমন্বিত করে তারাই এই পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে এই পৃথিবীতে।

১৭। যারা [ কোর-আনে ] ঈমান এনেছে, যারা ইহুদী [ ধর্মগ্রন্থ ] অনুসরণ করে, এবং সাবিঈন ২৭৮৮, খৃষ্টান, অগ্নিপূজক এবং মুশরিক, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌ তাদের মধ্যে বিবাদের বিচার করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সব কিছুর সাক্ষী।

২৭৮৮। 'সাবীয়ান " দের জন্য আরও দেখুন আয়াত [ ২ : ৬২ ] ও টিকা ৭৬ এবং আয়াত [ ৫ : ৬৯ ]। এই দুই স্থানেই মুসলমানদের [ বিশ্বাসী ] সাথে ইহুদী, খৃষ্টান ও সাবীয়ানদের উল্লেখ আছে যারা আল্লাহ্‌র দয়া ও করুণা লাভে সক্ষম। এই আয়াতে এই চার প্রধান ধর্ম ব্যতীত আরও দুই ধর্মাবলম্বীদের উল্লেখ করা হয়েছে এরা হলো মেজিয়ান বা অগ্নিপূজক এবং বহু ইশ্বরবাদী বা মোশরেক। এদের প্রতি আল্লাহ্‌র করুণার কথা উল্লেখ করা হয় নাই। শুধুমাত্র উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের মধ্যে বিচার ও ফয়সালা করে দেবেন কেয়ামত দিবসে।

১৮। তারা কি দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহ্‌র এবাদতে সেজ্‌দা করে ২৭৯০, সূর্য , চন্দ্র, তারকারাজি, পাহাড়সমূহ, বৃক্ষরাজি, এবং প্রাণীকূল এবং মানুষের মধ্যে অনেকেই ? আবার বহুজন শাস্তির যোগ্য হয়েছে। এবং আল্লাহ্‌ যাকে অসম্মান করেন, তাকে কেউই সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ্‌ যা ইচ্ছা করেন তা বাস্তবায়িত করেন ২৭৯১।

২৭৯০। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ২১ : ৭৯ ] এবং টিকা ২৭৩৩। বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সকল বস্তু জড় বা জীবন্ত সবই আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের উপরে নির্ভরশীল। আল্লাহ্‌ প্রত্যেক বস্তুকে তার স্ব স্ব ধর্মে সৃষ্টি করেছেন ; যেমন; পানির ধর্ম পানির, লোহার ধর্ম লোহার, ইত্যাদি এগুলি জড় পদার্থের ধর্ম, আবার জীবন্ত উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর মাঝে দেখা যায় , প্রাকৃতিক নিয়মে তারা বড় হয়, বংশবৃদ্ধি করে, আবার প্রাকৃতিক নিয়মে তারা মরে যায়। এই প্রাকৃতিক নিয়ম প্রাণী , উদ্ভিদ জগত ও জড় পদার্থের জন্য আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আর এই নিয়ম সৃষ্টিগত ব্যবস্থাপনার অধীন , উদ্ভিদ জগত, প্রাণীজগত, জড় জগত - অর্থাৎ আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহ্‌ কর্তৃক জারীকৃত এই প্রাকৃতিক নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। একেই সৃষ্ট জগতের সকল পদার্থের আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য বা সেজ্‌দারুপে প্রকাশ করা হয়েছে। জড় ও জীবন্ত সকলেই তাদের অস্তিত্বের জন্য আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীল এবং তাদের এই নির্ভরশীলতাই হচ্ছে আনুগত্য বা সেজ্‌দা রূপে প্রকাশ করা হয়েছে। এদের অস্তিত্বই হচ্ছে এদের আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীলতা বা আনুগত্য। এদের কোনও স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি নাই। আল্লাহ্‌ এদের যে ধর্মগুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তারা তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছার বিরোধিতা করার ক্ষমতা এদের নাই।

২৭৯১। দেখুন আয়াত [ ২২ : ১৬ ]। সৃষ্টি জগতে মানুষ ব্যতীত আর কারও " স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি " নাই। আর স্রষ্টার হুকুম হচ্ছে এই " স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে" স্রষ্টার "ইচ্ছা" বা আইনের সাথে সমন্বিত করতে হবে। যারা তা করতে পারবে তারাই আল্লাহ্‌র নিকট পুরষ্কারের যোগ্যতা অর্জন করবে। এই আয়াতে মানুষের মাঝে তাদের কথাই বলা হয়েছে , যারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে সেজ্‌দা অবনত হয় না। যারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছা বা আইন বা বিধানের বিরোধিতা করে,তারা শাস্তি ভোগ করবে, অসম্মানিত হবে। আল্লাহ্‌ তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্ষম তিনি তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়নে সক্ষম।
১৯। এই দুই বিবাদমান পক্ষ, আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে পরস্পর বির্তক করে থাকে। যারা [ তাদের প্রভুকে ] অস্বীকার করে, তাদের জন্য কাটা হবে আগুনের পোষাক। তাদের মাথার উপর ঢালা হবে ফুটন্ত পানি ২৭৯২।

২৭৯২। একমাত্র মানুষই পারে আল্লাহ্‌র 'ইচ্ছা' বা আইনের বিরুদ্ধাচারণ করতে। এই আয়াতে দুই বিবাদমান পক্ষ অর্থ দুই দলকে বোঝানো হয়েছে যাদের এক দল মোমেন বান্দা যারা স্ব ইচ্ছায় আল্লাহ্‌র হুকুম বা ইচ্ছাকে মেনে চলে এবং আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করে, আল্লাহ্‌র সাহায্য কামনা করে। এদেরই বিপক্ষে অন্যদল যারা সর্বোতভাবে আল্লাহ্‌র ইচ্ছার বিরুদ্ধাচারণ করে তাঁর আইনকে ভঙ্গ করে।

২০। তাদের দেহের ভিতরে যা আছে তা এবং [ তাদের ] চামড়াও এর সাহায্যে ঝলসানো হবে ২৭৯৩।

২৭৯৩। " চামড়াও ঝলসানো হবে " বাক্যটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে শাস্তির তীব্রতা। তাদের শাস্তি এত তীব্র হবে যেনো অস্থি চর্ম ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করবে।

২১। এর উপরে তাদের [ শাস্তির জন্য ] থাকবে লৌহ গদা ২৭৯৪।

২৭৯৪। এই আয়াতটি পরবর্তী আয়াতের সাথে একত্রে পাঠ করে অর্থ অনুধাবন করতে হবে। অনুতাপের সময় সীমার অতিক্রমের পরে পাপীদের আর অব্যহতি দান করা হবে না।

২২। যখনই তারা তীব্র যাতনায় তা থেকে বের হতে চাইবে, তাদের জোরপূর্বক সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং [ বলা হবে ], " আস্বাদন কর দহন যন্ত্রণা।"

রুকু - ৩

২৩। যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ্‌ তাদের অধিষ্ঠিত করবেন বেহেশতের বাগানে, পাদদেশে যার নদী প্রবাহিত। সেখানে তাদের স্বর্ণ- কঙ্কন ও মুক্তা দ্বারা সাজানো হবে। এবং সেখানে তাদের পোষাক হবে রেশমের। ২৭৯৫

২৪। [ এই পৃথিবীর জীবনে ] তারা সর্বোচ্চ পবিত্র বাক্য [ কুর-আন ] দ্বারা পরিচালিত ছিলো এবং যিনি [ সকল ] প্রশংসার যোগ্য তার পথে পরিচালিত হয়েছিলো।

২৭৯৫। উপরের আয়াতে [ ২২ : ১৪ ] মোমেন বান্দাদের পুরষ্কারের ঘোষণা করা হয়েছে বিপরীতে [ ২২ : ১০ - ১৩ ] কাফের দল ; এই দুদল ইসলামের যুগেই হোক বা তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব যুগের জন্য প্রযোজ্য। এখানে তাদের কথাই বলা হয়েছে যারা কাফেরদের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হন, যাদের কাবা শরীফে [আল্লাহ্‌র পথে ] প্রবেশ করতে দেয়া হয় নাই এবং জীবনের সকল সুখ, স্বচ্ছন্দ, আরাম - আয়েশ থেকে যাদের বঞ্চিত করা হয়। তাদের জন্য প্রতীকের মাধ্যমে বেহেশতের সুখ শান্তির বর্ণনা করা হয়েছে। যা থেকে বোঝা যায় প্রতিটি পুরষ্কার হচ্ছে নির্দিষ্ট নির্যাতনের বিপরীতে শান্তির প্রলেপ। অলঙ্কৃত করা হবে স্বর্ণ কঙ্কন ও মুক্তা দ্বারা , অর্থাৎ যারা পৃথিবীতে অত্যাচারের দ্বারা তাদের গৃহ এবং সম্পত্তিচ্যুত হয়েছিলেন, তারা বেহেশতে তদপেক্ষা অধিক মূল্যবান বস্তু দ্বারা পুরষ্কৃত হবেন। এখানে মূল্যবান বিষয় সম্পত্তির প্রতীক হিসেবে "স্বর্ণ কঙ্কণ ও মুক্তা ও রেশমের পোষাক " কে বর্ণনা করা হয়েছে যা সাধারণত নৃপতিরা ব্যবহার করে। " পবিত্র বাক্য " [ ২২ : ২৪ ] যার বিপরীত হচ্ছে অকথ্য ভত্র্সনা। অর্থাৎ ভর্তসনা ও নির্যাতনের বিপরীতে " পবিত্র বাক্যের" বা মধুর ব্যবহারের যে সুখ ,সেই সুখ তারা পাবে। "পরম প্রশংসা ভাজন আল্লাহ্‌র পথে" এর বিপরীতে হচ্ছে, নিষ্ঠুর নির্যাতন ও অত্যাচার যা তারা ভোগ করেছিলেন। অর্থাৎ পৃথিবীতে ভর্তসনা ও অত্যাচারে বিপরীত অবস্থা তারা বেহেশতে লাভ করবে। সেখানে তাদেরকে আল্লাহ্‌র পবিত্র বাক্য ও আল্লাহ্‌র পথে অনুগামী করা হবে।

২৫। যারা [আল্লাহকে ] প্রত্যাখান করেছে এবং [ মানুষকে] আল্লাহ্‌র পথ থেকে এবং পবিত্র মসজিদ হতে নিবৃত্ত করে, যা আমি স্থানীয় ও বহিরাগত [ সকল ] মানুষের জন্য [মুক্ত এবং ] সমান করেছি এবং যাদের উদ্দেশ্য হবে সেখানে অশ্রদ্ধা দেখানো ও পাপ কাজ করা ২৭৯৬, তাদের আমি ভয়াবহ শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাবো।

২৭৯৬। এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে মক্কার মোশরেক আরবদের কথা যারা হিজরতের পূর্বে ও পরে মুসলমানদের অত্যাচার ও নির্যাতন করেছিলো।

রুকু - ৪

২৬। স্মরণ কর ! আমি ইব্রাহীমকে [ পবিত্র ] গৃহের স্থান নির্ধারিত করে দিয়েছিলাম ২৭৯৭, [ বলেছিলাম ] " আমার সাথে [ এবাদতে ] অন্য কাউকে শরীক করো না। এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখো তাদের জন্য যারা তা তাওয়াফ করে অথবা সালাতে দাঁড়ায় , অথবা রুকু অথবা সেজ্‌দা করে [ প্রার্থনায় রত থাকা অবস্থায় ]।

২৭৯৭। কাবা ঘর প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ্‌ হযরত ইব্রাহীমকে [ ও তার পুত্র ইসমাঈলকে ] মক্কাতে স্থান নির্ধারণ করে দেন। কাবা ঘর হবে একমাত্র আল্লাহ্‌র এবাদতের স্থান যা মূর্তি পূজা থেকে পবিত্র রাখার হুকুম করা হয়েছে। এই স্থান হবে বিশ্বমানবতার মিলন কেন্দ্র " যাহা আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সকলের জন্য সমান।" কাবায় প্রবেশের একটাই মানদণ্ড তা হচ্ছে " যারা তাওয়াফ করে এবং যারা দাঁড়ায় রুকু করে ও সিজ্‌দা করে।" অর্থাৎ এই বিশ্ব মানবতার সঙ্গম স্থলে ছোট- বড় , ধনী - গরীর , বংশমর্যদা বা গোষ্ঠি পরিচয় সবই মূল্যহীন। শুধুমাত্র এক আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যই হবে তাদের একমাত্র পরিচয়।

২৭। " মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দাও। তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে , এবং সকল প্রকার উটের [পিঠে ] যেগুলি দূর -দূরান্তর উপত্যকা পথ অতিক্রম করার ফলে শীর্ণকায় ২৭৯৯,-

২৭৯৯। হজ্জ্বের ঘোষণার পরে দূরের এবং কাছের সকলেই হজ্জ্বের জন্য সমবেত হবে। যারা কাছের তারা পদব্রজে, যারা দূরের তারা উটের পিঠে [ অর্থাৎ যানবাহনে ] গমন করে হজ্জ্বের জন্য সমবেত হবে। " দূর- দূরান্তর পথ অতিক্রম করার ফলে শীর্ণকায়।" অর্থাৎ দূরের পথ অতিক্রমের ফলে উটেরা হয়ে পড়বে শীর্ণ। কিন্তু বিনিময়ে উটের আরোহীরা পাবে আত্মিক নেয়মাত যার বর্ণনা আছে পরবর্তী আয়াতে।

২৮। "যেনো তারা তাদের জন্য [ নির্ধারিত ] কল্যাণসমূহ প্রত্যক্ষ করতে পারে২৮০০ , এবং তিনি তাদের [উৎসর্গের জন্য ] যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন সেগুলির উপরে তারা যেনো, নির্ধারিত দিনসমূহে আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা উহা থেকে আহার কর এবং দুস্থ , অভাবগ্রস্থকে আহার করাও ২৮০১, ২৮০২।

২৮০০। হজ্জ্বের মাধ্যমে আমাদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক উভয় দিক সমৃদ্ধ হয়। কাবা ঘরকে আল্লাহ্‌ বিশ্ব মানবের মিলনকেন্দ্র রূপে ঘোষণা করেন। পৃথিবীর সমস্ত দেশ থেকে মুসলিমরা এখানে হজ্জ্বের সময়ে সমবেত হয়। হজ্জ্ব পৃথিবীর এক অন্যন্য দৃশ্যের অবতারণা করে। ভাষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, দেশ , প্রকৃতি, পরিবেশ সব কিছুর বিভিন্নতা সত্বেও সকলেই এখানে একই উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত থাকে। ফলে বিভিন্নতা সত্বেও সকলেই এক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একসূত্রে গ্রথিত থাকে। বৃহত্তর মানব বন্ধন ও ভ্রাতৃত্বের সূচনা হয়। বর্তমানকালে এত বড় মানব সমাবেশ পৃথিবীতে আর কোথাও হয় না। হজ্জ্বের সমাবেশের ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের লোক অন্য প্রান্তের লোকদের সাথে মোলাকাতের সুযোগ লাভ করে। ফলে ভাবের আদান প্রদান , জ্ঞানের আদান প্রদান, শিল্প সংস্কৃতির আদান প্রদান ঘটে। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার লাভ ঘটে। এ সবই হলো জাগতিক লাভ। অপরপক্ষে এই সেই স্থান যেখানে আমরা বহু ওলী ও আওলিয়ার সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করি, এই সেই স্থান যা প্রাচীন যুগ থেকে বহু নবী রাসুলের পদধূলিতে ধন্য। এখানেই আমরা সুযোগ পাই পৃথিবীর প্রতিদিনের জীবনের ক্লেদমুক্ত হয়ে নিজেকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে পরিচালিত করতে। এই সেই স্থান যেখানে তীর্থ যাত্রীরা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় দিক সমৃদ্ধশালী করার সুযোগ লাভ করে।

২৮০১। হজ্জ্বের " নির্দ্দিষ্ঠ দিনগুলি " হচ্ছে ৮ই, ৯ই এবং ১০ই জ্বিলহজ্জ্ব এবং পরবর্তী ২/৩ দিন "Tashriq" বা হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের জন্য। দেখুন হজ্জ্বের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য টিকা ২১৭ এবং আয়াত [ ২ : ১৯৭ ]। তবে সাধারণতঃ জ্বিলহজ্জ্ব মাসের প্রথম দশ দিনকেই হজ্জ্বের সময় বলে গণ্য করা হয়।

২৮০২। ১০ই জ্বিলহজ্জ্ব হচ্ছে কোরবাণীর দিন যা হজ্জ্বের এক প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা আমাদের এক সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহত্তম আত্মত্যাগকে স্মরণ করিয়ে দেয়। হজ্জ্বের ময়দানে যে চতুষ্পদ পশুকে কোরবাণী দেয়া হয় তা নিজে আহার করা এবং অভাবগ্রস্থকে আহার করানোর জন্য বলা হয়েছে।

২৯। অতঃপর তারা যেনো তাদের নির্দ্দেশিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ করে ২৮০৩। তাদের মানত পূর্ণ করে ২৮০৪, এবং [পুনরায় ] প্রাচীন গৃহের তাওয়াফ করে।

২৮০৩। "Tafath" অর্থ অপরিচ্ছন্নতা যা শরীরের অতিরিক্ত জিনিষ যা বর্দ্ধিত হয়। যেমন নখ, চুল ইত্যাদি যা এহ্‌রাম থাকা অবস্থায় দূর করা নিষিদ্ধ। এ সব কর্তন করা চলে জ্বিল হজ্জ্ব মাসের দশম দিনে যখন হজ্জ্বের পুরো আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যাবে।

২৮০৪। " প্রাচীন গৃহ " অর্থাৎ কাবা শরীফ। হজ্জ্বের শেষ আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে তওয়াফ করা। এর মাধ্যমেই পুরো হজ্জ্ব প্রক্রিয়া শেষ হয়। হজ্জ্ব শেষে হজ্জ্বযাত্রীরা পবিত্র দেহ মন নিয়ে ঘরে ফিরে যাবে। তাদের মনে এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে ঘরে ফেরা উচিত যেনো হজ্জ্বের মাধ্যমে তারা যে পবিত্রতা অর্জন করলো, তা যেনো তারা পরবর্তী জীবনে রক্ষা করতে পারে। আল্লাহ্‌র রাস্তায় সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে করা হয় বিদায়ী তওয়াফ।

৩০। এই হচ্ছে [ হজ্জ্বের বিধান ] : যে আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র আনুষ্ঠানিকতার সম্মান করে, সে তার প্রভুর চোখে উত্তম। যার উল্লেখ পূর্বে করা হয়েছে সেগুলি ব্যতীত [ হজ্জ্বের সময়ে খাদ্য হিসেবে ] চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে ২৮০৫। সুতারাং মূর্তি পূঁজার অপবিত্রতা থেকে দূরে থাক এবং পরিহার কর মিথ্যা কথন ,-

২৮০৫। খাদ্যের হালাল ও হারাম সম্বন্ধে আছে আয়াত [ ২ : ১৭৩ ] এবং [ ৬ : ১১, ১৩৮ -১৪৬ ]। হালাল পশুর মাংস , শরীর এবং আত্মা উভয় ক্ষেত্রেই উপকারী। আত্মার পরিচ্ছন্নতা ও আত্মিক অগ্রগতির সমৃদ্ধির জন্য হালাল রুজী অপরিহার্য। কিন্তু কঠিন সর্তক বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে মূর্তিপূঁজার বিরুদ্ধে এবং মিথ্যা কথনের বিরুদ্ধে। মিথ্যা কথন আত্মাকে ক্ষয় করে, আত্মাকে ধ্বংস করে ঠিক যে ভাবে অম্ল ধাতুকে ক্ষয় করে। মুর্তিপূজা আত্মাকে করে অপবিত্র, মিথ্যা কথন আত্মাকে করে ধ্বংস। যা কিছু সত্যের পরিপন্থি তাই বাতিল ও মিথ্যাভুক্ত। রসুলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন, আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে শরীক করা, পিতামাতার অবাধ্যতা করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এবং সাধারণ কথাবার্তায় মিথ্যা বলা সবচেয়ে বড় পাপ। তিনি শেষোক্ত শব্দ বার বার উচ্চারণ করেন। [ বোখারী ]

মন্তব্য : বাংলাদেশীরা জীবনের প্রতি মুহুর্তে মিথ্যাশ্রয়ী - আর সে কারণেই তাদের এত দুর্ভোগ জাতীয় জীবনে।

৩১। আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসে একনিষ্ঠ হয়ে , এবং তাঁর সাথে কোন অংশীদার না করে। কেউ যদি আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদার করে তবে সে যেনো আকাশ থেকে পড়ে গেল, এবং পাখীরা তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বাতাস তাকে [ পাখীর মত ছোঁ মেরে ] উড়িয়ে নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করলো ২৮০৬।

২৮০৬। এই আয়াতটি রূপক বর্ণনায় সমৃদ্ধ। যে একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে বহু উপাস্যের উপসনা করে তার উপমা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির মত যে স্বর্গ থেকে পড়লো এবং পথিমধ্যে এক পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিল বা বায়ু তাকে দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। একত্ববাদ বা এক আল্লাহ্‌র উপাসনা আত্মাকে করে স্থির , অচঞ্চল, দৃঢ় একাগ্র এবং একবিন্দুতে কেন্দ্রীভূত , আত্মা তার নোঙ্গঁর খুজে পায়। অপর পক্ষে যারা বহু উপাস্যের উপাসনা করে, তারা আত্মার ভিতরে একাগ্রতা অনুভবে ব্যর্থ হবে। কারণ বহু উপাস্যের সন্তুষ্টির চিন্তায় তার একাগ্রতা , বহুধাবিভক্ত হবে ঠিক যেনো নোঙ্গঁর বিহীন নৌকা। তার অবস্থানের কোনও মজবুত ভিত্তি থাকবে না , সে ঠিক যেনো আকাশ থেকে পতিত শুন্যে অবস্থানকারী বস্তু , যাকে শূন্য থেকেই কোনও পাখী ছোঁ মেরে তুলে নেয়, পৃথিবীতে পড়ার আগেই। কারণ মিথ্যা উপাস্য আত্মাকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে অক্ষম। ঠিক যেমন পতিত বস্তু মাটির স্থায়ী আশ্রয় লাভের পূর্বেই পাখীর চঞ্চুতে আশ্রয় পায় যা আরও অস্থায়ী। অথবা বৈশাখী ঝড় যেরূপ ঝড়া পাতাকে বৃক্ষের কোল থেকে বিচ্যুত করে দূরদূরান্তে ঠিকানা বিহীনভাবে উড়িয়ে নিয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই বহু উপাস্যের পূজারীদের আত্মা আল্লাহ্‌র ক্রোধের শিকার হয় এবং আল্লাহ্‌র ক্রোধের ঝড়ো হাওয়া তাদের শান্তি থেকে বহু দূরে নিয়ে যায় , শেষ পর্যন্ত নিক্ষেপ করে দোযখের ভয়াবহ অশান্তিতে।

৩২। এই হলো [ মোশরেকের অবস্থা ] : কেউ আল্লাহ্‌র নিদর্শনাবলীর সম্মান করলে সে এই [ সম্মান ] মনের পবিত্র ভাব থেকেই করে থাকে ২৮০৭।

২৮০৭। "Sha'air" অর্থ প্রতীক , চিহ্ন , কারও অধিকারে থাকার চিহ্ন যেমনঃ পতাকা ইত্যাদি। আয়াত [ ২ : ১৫৮ ] এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সাফা ও মারওয়ার প্রতীক হিসেবে ; দেখুন টিকা ১৬০। এই আয়াতে শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে। হজ্জ্বের এসব আনুষ্ঠানিকতা আত্মত্যাগের নিদর্শন স্বরূপ। এগুলি আল্লাহ্‌র জন্য সর্বোচ্চ মানবিক আত্মত্যাগের প্রতীক। এগুলি 'তাকওয়া' বা হৃদয়ের ভক্তি , ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ধর্মভীরুতার পূর্ব সূচনা করে। ব্যক্তিকে আল্লাহ্‌র জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। দেখুন [ ২২ : ৩৭ ] আয়াত।

৩৩। ইহাদের [ পশুদের ] মধ্যে তোমাদের জন্য এক নির্দ্দিষ্ট সময় [ কোরবাণী ] পর্যন্ত বিবিধ সুবিধা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রাচীন ঘরের নিকটে হবে তাদের কোরবাণীর স্থান ২৮০৮, ২৮০৯।

২৮০৮। " এই সমস্ত পশুদের " অর্থাৎ গৃহপালিত পশু এ স্থলে কোরবাণীর জন্য যাদের আনা হয়েছিলো। এ কথা সত্য যে গৃহপালিত পশু মানুষের বহুবিধ কল্যাণ সাধন করে থাকে। যেমন : প্রাচীনকালে মরুবাসীদের জীবনে উটের প্রাধান্য অনুধাবনযোগ্য। প্রাচীনকালে মরুভূমি পারাপারের একমাত্র বাহনই ছিলো উট। মরুদেশে বাণিজ্যের প্রসারের একমাত্র বাহনই সে যুগে ছিলো উট। উটের মাংস , উটের দুধ, হচ্ছে খাদ্য , উটের চামড়া ও লোম বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। ঠিক সেই ভাবে গরু, ভেড়া, ঘোড়া প্রভৃতি পশুর অবদান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যদি তাদের কোরবাণীর জন্য উৎসর্গ করা হয়, তবে তারা আল্লাহ্‌র জন্য মানুষের আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে যায়। কারণ কোরবাণীর মাধ্যমে তারা তাদের প্রয়োজনীয় পশুটির কোরবাণী দেয় যার মাংস সে তার গরীব ভাইদের সেবায় ব্যয় করে।

২৮০৯। "Ila" অর্থ নিকটবর্তী। কোরবাণী কাবা ঘরে দেয়া হয় না, কোরবাণী দেয়া হয় যে স্থানে হজ্জ্ব যাত্রীদের অস্থায়ী তাবু স্থাপন করা হয় তার থেকে ৫/৬ মাইল দূরে মীনাতে, দেখুন টিকা [ ২:১৭] এবং আয়াত ২:৯৭। "Thumma" অর্থাৎ অবশেষে বা শেষে। কাবা ঘরের তওয়াফ, সাফা মারওয়াতে দৌড়ানো, আরাফাতে অবস্থান ইত্যাদি হজ্জ্বের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পরে।

রুকু - ৫

৩৪। আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য [ কুরবাণীর ] নিয়ম নির্দ্দিষ্ট করেছি। তাদের জীবনোপকরণ স্বরূপ [খাদ্যপোযোগী ] যে সকল পশু দিয়েছি তারা যেনো তাদের উপর আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করতে পারে ২৮১০। কেননা তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্‌, অতএব তোমরা তার [ ইচ্ছার ] নিকট আত্ম সমর্পন কর। এবং [ হে মুহম্মদ ] সুসংবাদ দাও বিণীতগণকে ২৮১১-

২৮১০। কোরবাণীর মাধ্যমে আল্লাহ্‌র প্রতি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের সর্বশেষ নিদর্শন প্রদর্শন করা হয়। এই আয়াতের অর্থ এই যে, এই উম্মতকে কোরবাণীর যে আদেশ দেয়া হয়েছে তা কোন নূতন আদেশ নয়। পূর্ববর্তী উম্মতদেরও কোরবাণীর আদেশ দেয়া হয়েছিলো। এই কোরবাণী হতে হবে শুধু মাত্র এক আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য। কোরবাণীর পশুর রক্ত মাংস কিছুই আল্লাহ্‌র কাম্য নয়। বান্দার একাগ্রতা ও নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা হচ্ছে কোরবাণীর প্রতীক যা পশু কোরবাণী ও তার মাংস গরীবদের সাথে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উদ্‌যাপন করা হয়। কোরবাণীর পশুর উপরে আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করা হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতার এক প্রধান অংশ।

২৮১১। "সুসংবাদ দাও " তাদের জন্যই সুসংবাদ যারা বিনয়ী। দম্ভ বা অহংকার যাদের উদ্ধত ও অত্যাচারী করে তোলে নাই। যারা জাগতিক অর্থ সম্পদ ক্ষমতা সব কিছুর জন্য সর্বশক্তিমানের কাছে কৃতজ্ঞ এবং আল্লাহ্‌ সন্তুষ্টি লাভের জন্য গরীব ও নির্যাতিতের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে, যারা সুখে - দুঃখে স্বাচ্ছন্দে ও অভাব অনটনে আল্লাহ্‌র কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সন্তুষ্ট থাকে তারাই বিণীত।

উপদেশ : বিনয় এমন একটা গুণ যা আল্লাহ্‌র নিকট অত্যন্ত প্রিয়। মোমেন বান্দার চরিত্রে এই গুণটির প্রকাশ ঘটবে।

৩৫। তাদেরকে যাদের হৃদয়, আল্লাহ্‌র উল্লেখে ভয়ে ভীত হয়, যারা বিপদ বিপর্যয়কালে ধৈর্যশীল ও অধ্যাবসায়ী হয়, নিয়মিত সালাত কায়েম করে, এবং আমি তাদের যা দান করেছি তা থেকে [ দানে ] ব্যয় করে ২৮১২।

২৮১২। মুত্তাকী বা খোদাভীরুদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যবলী এই আয়াতগুলিতে বর্ণনা করা হয়েছে। ক্রম অনুযায়ী তা নিম্নরূপ : ১) বিনয় হবে তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ্‌র ক্ষমতার কাছে নিজের ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতা অনুধাবনের মাধ্যমেই জন্ম নেয় আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য, বিনয়, ও আত্মসমর্পনের মানসিকতা। ফলে আল্লাহ্‌র হেদায়েত বিনয়ী ব্যক্তির মনে রেখাপাত করে; আল্লাহ্‌র হেদায়েত গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে। এক কথায় বিনয়ী ব্যক্তিকে আল্লাহ্‌ হেদায়েত করেন। ২) আল্লাহ্‌ ভীতি তাদের হৃদয়কে কম্পিত করে। এই আল্লাহ্‌ ভীতি তীব্র ভালোবাসারই আর এক [ দেখুন টিকা ২৬ ] প্রকাশ। প্রিয়জনকে অসন্তুষ্ট করার ভয় ও ব্যথা এই হচ্ছে তার 'তাকওয়া' বা আল্লাহ্‌ ভীতির মূল উৎস। আল্লাহ্‌র প্রতি এই ভালোবাসার তীব্রতার ফল্গুধারা তাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে স্বতঃ প্রবাহিত। ৩) তারা পার্থিব কোনও বিপদ-আপদে ভীত হয় না, বরং ধৈর্য্য এবং অধ্যাবসায়ের ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের প্রত্যাশা করে। তারা বিপদ -বিপর্যয়কে আল্লাহ্‌র পরীক্ষা বলে জানে , এবং ধৈর্যের সাথে দৃঢ় পদক্ষেপে বিপদের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পথ আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করে অতিক্রম করার প্রয়াস পায়। ৪) ফলে এসব বিপদ বিপর্যয়ের মাঝে এ সব পূণ্যাত্মাদের যে প্রার্থনা তা শুধুমাত্র কোনও আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত থাকে না। তাদের প্রার্থনা বা সালাত উৎসরিত হয় অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। তাদের অন্তরের আকুতি থাকে এক আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে নিবেদিত। আল্লাহ্‌র করুণার সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা পায়, ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস এবং বন্ধুর পথ চলার শক্তি উদ্দীপ্ত হয় ঠিক সেই ভাবে যে ভাবে একজন প্রভুভক্ত ভৃত্য তার দয়ালু ও অনুভূতিশীল মনিবের উপস্থিতিতে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। ৫) তাঁরা শোকর করেন আল্লাহ্‌ তাদের যে নেয়ামত দান করেছেন তার জন্য। কৃতজ্ঞতার এই প্রকাশ প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহ্‌র সৃষ্টির সেবায় দানের মাধ্যমে এই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটানো। অভাবগ্রস্থদের মাঝে দান করা আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর শ্রেষ্ঠ ভাষা।

৩৬। কোরবাণীর উটগুলিকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম করেছি। তাদের মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। যখন তারা [ কোরবাণীর জন্য ] সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায় তাদের উপরে আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ কর ২৮১৩, যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় [ যবাই এর পরে ] তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আহার করাও গরীবদের যারা ভিক্ষা করে না এবং যারা ভিক্ষা করে [ উভয়কে ]। এরূপে পশুদের আমি তোমাদের অধীন করেছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও ২৮১৪।

২৮১৩। আয়াত [ ২২ : ৩৩ ] এবং টিকা ২৮০৮, যেখানে সমস্ত পশুদের সম্বন্ধে সাধারণ ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই আয়াতে বিশেষভাবে উটের কথা বলা হয়েছে যা মরুবাসীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। উটকে যবেহ্‌ করার প্রণালী অন্যান্য ছোট পশুদের থেকে ভিন্ন। উটকে দণ্ডায়মান অবস্থায় বুকের অগ্রভাবে ছুড়ি বসিয়ে যবেহ্‌ করা হয়।

২৮১৪। এই আয়াতে অভাব গ্রস্থদের নৈতিকতার বর্ণনা করা হয়েছে। একদলের কথা বলা হয়েছে যারা অভাবগ্রস্থ কিণ্তু ধৈর্য্যশীল। অর্থাৎ অভাব থাকা সত্বেও তারা ধৈর্য্যশীল অর্থাৎ আত্মতৃপ্ত এরা কারও দ্বারে ভিক্ষার পাত্র প্রসারিত করে না। আর একদল অভাবগ্রস্থ আছে যারা যাঞ্চাকারী - অর্থাৎ যারা বিনয়ের সাথে যাঞা করে। এই দুই শ্রেণীর অভাবগ্রস্থের কথা এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। যারা অভাবগ্রস্থ কিন্তু উদ্ধত এবং বিদ্রোহী ,তাদের কথা আল্লাহ্‌ উল্লেখ করেন নাই, যদিও সকল দুর্দ্দশাগ্রস্থরাই বাঞ্ছিত বা অবাঞ্ছিত সকলেই দানের যোগ্য। কিণ্তু যারা বিনয়ের সাথে যাঞ্চাকরে এবং যারা আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির সাথে যাঞা করে এই ঊভয়দলকে বিশেষভাবে দান পাবার যোগ্যরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। দান কখনও অন্যকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা উচিত নয়, দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্‌কে খুশী করার মানসিকতা। সে কারণে দান কখনও প্রদর্শন বা নাছোরবান্দা লোকদের বিতাড়ন করার উদ্দেশ্যে করা ঠিক নয়। প্রকৃত অভাবগ্রস্থকে দান করতে হবে যেনো তা গ্রহীতার জীবনের অভাবকে মোচন করে স্থায়ী সাফল্য আনতে সহায়ক হয়।

৩৭। আল্লাহ্‌র নিকট ইহাদের গোশ্‌ত বা রক্ত কিছুই পৌঁছায় না বরং পৌঁছায় তোমাদের [আল্লাহ্‌র ] প্রতি অনুরাগ। এভাবেই তিনি ইহাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যেনো তোমরা আল্লাহ্‌র মহিমা কীর্তন করতে পার, এজন্য যে তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন ২৮১৫। যারা সৎ কাজ করে তুমি তাদের সুসংবাদ দাও।

৩৮। অবশ্যই আল্লাহ্‌ বিশ্বাসীদের রক্ষা করবেন। তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।

২৮১৫। আল্লাহ্‌র জন্য আত্মত্যাগের মর্মবাণী উদ্ধৃত করা হয়েছে টিকা ২৮১০। আল্লাহ্‌ এই বিশ্ব ভূবনের মালিক। কোরবাণীর পশুর রক্ত, মাংস কিছুই তার কাছে পৌঁছায় না। যা পৌঁছায় তা হচ্ছে বান্দার সৎকাজে আত্মোৎসর্গের নিয়ত। পৌত্তলিক এবং আরব মোশরেকরা সে যুগে দেব-দেবীর পূজা করতো প্রাণী বলি দ্বারা অর্থাৎ রক্ত দ্বারা দেব-দেবীর মনোরঞ্জন করা হতো। এটা ছিলো তাদের নিজস্ব কল্পনা। যিনি পৃথিবীর স্রষ্টা, বিশ্ব বিধাতা তাঁর তো সৃষ্ট পদার্থের রক্তের প্রয়োজন নাই। তিনি তো অভাবমুক্ত। তিনি চান ভক্তের আকুল আকুতি , ভালোবাসা ,ভক্তি ও শ্রদ্ধার ডালি এবং আল্লাহ্‌র জন্য আত্মোৎসর্গ। ভক্তের এই প্রাণের ভালোবাসার প্রকাশের জন্য আনুষ্ঠানিক যে ব্যবস্থা তাই হচ্ছে পশু কোরবাণী। আত্মোৎসর্গের প্রতীক হচ্ছে কোরবাণী যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত ইব্রাহীমের সর্বোচ্চ আত্মাত্যাগের কাহিনী। একমাত্র মনের এই আত্মত্যাগের মহত্তম দিকটি আনুষ্ঠানিক কর্মের মাধ্যমে প্রকাশের জন্যই পশু হত্যার নির্দ্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সেই কারণেই কোরবাণীর পশুর উপরে আল্লাহ্‌র নামে কোরবাণী দেওয়ার নির্দ্দেশ দান করা হয়েছে। অন্যথায় জীবনের পবিত্রতা ও মহার্ঘতা আমরা বিস্মৃত হতাম। আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে পশু জবেহ্‌ করার হুকুম কারণ আল্লাহ্‌র করুণার পরিবর্তে আমরা খাদ্য সংগ্রহ করি পশু হত্যার মাধ্যমে। এই আনুষ্ঠানিকতা আমাদের উজ্জীবিত করে আল্লাহ্‌র করুণার প্রতি - যা মন থেকে পশু হত্যার নিষ্ঠুরতার দিকটি অবমূল্যায়ন করতে সক্ষম হয়। কোরবাণীর পশুর দুই -তৃতীয়াংশ গরীবদের মাঝে ও আত্মীয় স্বজনদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এ ভাবেই কোরবাণীর প্রতীককে মানবতার সেবার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। নিজস্ব কিছু গরীব ও আত্মীয়দের জন্য আত্মত্যাগের মনোভাবই হচ্ছে কোরবাণীর মূল সুর। চরিত্রের মাঝে এই দুলর্ভ গুণরাজির প্রকাশই হচ্ছে কোরবাণীর আত্মত্যাগের নির্যাস। স্রষ্টার নিকট আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় এ জন্য যে আল্লাহ্‌ আমাদের দূর্লভ চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করার সুযোগ দান করেছেন, আমাদের পথের নির্দ্দেশনা দান করেছেন। আমাদের জাতীয় জীবনে আজকে বহু লোককে দেখা যায় যারা কোরবাণীর এই মহৎ শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে। যারা কোরবাণীর মাধ্যমে অর্থ বিত্তের প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা করে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং আত্মত্যাগ, কোরবাণীর এই মহৎ শিক্ষাকে জাতীয় জীবনে জাগরিত করা সকলের কর্তব্য।

রুকু - ৬

৩৯। যারা যুদ্ধ দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাদের [যুদ্ধের ] অনুমতি দেয়া হলো ২৮১৬। কারণ তাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। এবং নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করতে আল্লাহ্‌ প্রচন্ড শক্তিধর;

২৮১৬। যুদ্ধের অনুমতি দেবার কারণ এখানে উল্লেখ ও পরের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রথম যেখানে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ধরার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুতারাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আয়াতটি মদিনায় অবতীর্ণ।

৪০। [ এরাই তারা ] যাদের অন্যায় ভাবে তাদের ঘর বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে - শুধু এই কারণে যে, তারা বলে, " আমাদের প্রভু আল্লাহ্‌।" যদি আল্লাহ্‌ মানুষের একদলকে দিয়ে অন্য দলকে প্রতিহত না করতেন , ২৮১৭, তবে নিশ্চয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো মনেষ্টরি [ খৃষ্টান সংসার বিরাগীদের উপাসনা স্থান ] , গীর্জা , সিনাগগ [ইহুদীদের উপাসনালয় ] এবং মসজিদ সমূহ - যেখানে আল্লাহ্‌র নাম অহরহ স্মরণ করা হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাকেই সাহায্য করেন যে, তাঁর [আল্লাহ্‌র কাজের ] সহযোগীতা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ শক্তিমান পরাক্রমশালী ২৮১৮।

২৮১৭। অন্যায়কারী ও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত কাজ। মক্কার কোরেশদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের এই অস্ত্র ধারণ শুধু যে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিলো তাই-ই নয়। প্রয়োজন ছিলো সত্য ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও অস্তিত্বের জন্য লড়াই। পবিত্র কাবা ঘরে উপসানার জন্য কোরেশদের যেরূপ অধিকার মুসলমানদের ঠিক সমঅধিকার। মুসলমানদের সেই অধিকার থেকে শুধু যে বঞ্চিত করা হয়েছে তাই - ই নয়, তাদের সত্য ধর্মে বিশ্বাসের জন্য মক্কা থেকে বিতাড়িত করে নির্বাসন দেয়া হয়। যদি অত্যাচারীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা না হয় , তবে তার দ্বারা পৃথিবীর সকল ধর্মের সকল জাতির লোকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। শেষ পর্যন্ত এই ক্ষতির তালিকায় ইহুদী , খৃষ্টান কেহই বাদ যাবে না।

২৮১৮। " .. .. .. তাঁকেই সাহয্য করে " অর্থাৎ আল্লাহ্‌ বিধানকে প্রতিষ্ঠার সাহায্য করে। আল্লাহ্‌ সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে। তিনি সর্ব ক্ষমতার অধিকারী। "Aziz" অর্থ সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বা অধিষ্ঠানে, বা সম্মানে যিনি সর্বোচ্চ। যিনি তুলনাহীন। যিনি মহাশক্তিধর। যার ইচ্ছা দ্যুলোকে ভূলোকে সকলে মানতে বাধ্য। আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই শক্তিমান ও পরাক্রমশালী।

৪১। এরাই তারা যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে , তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ন্যায় কাজে আদেশ দেবে এবং পাপ থেকে বিরত রাখবে ২৮১৯। [সকল ] কাজের শেষ [ সিদ্ধান্ত ] আল্লাহ্‌র ক্ষমতার অধীনে।

২৮১৯। যারা আল্লাহ্‌র বিধান প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে, তাদের বিশেষত্ব এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। " তারা ন্যায় কাজের নির্দ্দেশ দেবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে " মুসলিম উম্মার এই হবে অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই বিশেষ কর্তব্য সমাধানের জন্য এই উম্মাকে আল্লাহ্‌ এদের পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। দেখুন [৩ : ১০৪, ১১০ ; ৯: ৭১, ১১১ - ১১২; ২২ : ৪১ ] আয়াত। তারা নিজেদের ক্ষমতা সুযোগ সুবিধা বা ভূমি আগ্রাসনের জন্য কখনও যুদ্ধ করবে না। তাদের সংগ্রাম হবে ন্যায়ের জন্য।

৪২। যদি তারা তোমার [ প্রচারকে ] মিথ্যা জানে, [ তবে নিশ্চয় জেনো ] তাদের পূর্বে নূহের জাতি, এবং আদ ও সামুদ জাতিও [ তাদের নবীদের ] মিথ্যা জেনেছিলো , ২৮২০-

২৮২০। আল্লাহ্‌র নবীকে অস্বীকার করার মধ্যে কোনও নূতনত্ব নাই। কারণ এরূপ ঘটনা পূর্বেও ঘটেছে, যেমন : নূহ্‌ নবী [ ৭ : ৬৬ ] ; আদ্‌ সম্প্রদায়ের নবী হুদ [ ৭:৬৬ ] সামুদ জাতির নবী সালেহ্‌ [ ৭ : ৭৬ ] ; ইব্রাহীম [ ২১ : ৫৫ ]; লূত [ ৭ : ৮২ ] ;; মাদিয়ান বাসীর নবী শুয়েব [ ৭ : ৮৫ ] এবং অরণ্যের অধিবাসী [ ১৫ : ৭৮ ] দের জীবনে। মুসা নবীর কথা আলাদা ভাবে বলা হয়েছে ; হযরত মুসার সম্প্রদায় আমাদের নবী হযরত মুহম্মদের (সা) সময় এবং বর্তমান কাল পর্যন্ত অবস্থান করছে। তারা প্রায়ই হযরত মুসার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতো [ ২ : ৪৯ - ৬১ ]।

৪৩। ইব্রাহীম ও লূতের সম্প্রদায়ও ; -

৪৪। এবং মাদইয়ান সম্প্রদায় ২৮২১; এবং [ একই ভাবে ] অস্বীকার করা হয়েছিলো মুসাকেও। কিন্তু অবিশ্বাসীদের আমি অবকাশ মঞ্জুর করেছিলাম। এবং [ শুধুমাত্র ] তার পরেই আমি তাদের শাস্তি দিয়েছিলাম। [তাদের প্রতি ] আমার প্রত্যাখান ছিলো কত [ ভয়ঙ্কর ]! ২৮২২।

২৮২১। মাদিয়ানবাসী ও অরণ্যের অধিবাসীরা কি একই ছিল ? দেখুন টিকা ২০০০ এবং আয়াত [ ১৫ : ৭৮ ]।

২৮২২। আল্লাহ্‌র শাস্তির ভয়াবহতা যার পরিণাম সমৃদ্ধি থেকে বিপর্যয়।

৪৫। কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যাদের অধিবাসীরা পাপে লিপ্ত ছিলো, তারা তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছিলো ২৮২৩। কত কূপ পরিত্যক্ত হয়েছিলো এবং কত সুদৃশ্য এবং মজবুত প্রাসাদও ! ২৮২৪।

২৮২৩। যে কোন ইমারত যখন ধবংস হয় প্রথমে তার ছাদ ধ্বসে পড়ে, পরে সম্পূর্ণ ইমারত ভেঙ্গে চূরে ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়। ঠিক সেরূপ আল্লাহ্‌র রোষে পতিত জনপদ সম্পূর্ণ ধবংসপ্রাপ্ত হয় এবং তা সম্পূর্ণরূপে ওলট পালট হয়ে যায়।

২৮২৪।

৪৬। তারা কি দেশ ভ্রমণ করে নাই ? করলে তাদের হৃদয় [ ও মন ] প্রজ্ঞা সম্পন্ন হতো ২৮২৫; এবং তাদের কান [ সত্যকে ] শোনার ক্ষমতা অর্জন করতো। প্রকৃত পক্ষে, চক্ষু তো অন্ধ নয় , বরং অন্ধ হয়েছে বক্ষস্থিত হৃদয়।


২৮২৫। আরবীতে হৃদয় শব্দটি গভীর এবং ব্যপক অর্থবোধক। আরবী ভাষাতে ' হৃদয় ' শব্দটি দ্বারা বুদ্ধি বিবেক, অনুধাবন ক্ষমতা, আবেগ- অনুভূতি ও ভালোবাসার ক্ষমতাকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ যে সব গুণের দ্বারা মানুষ পশু থেকে আলাদা , যার জন্য মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব সেই গুণবাচক বিশেষণ গুলিকেই আরবী ভাষাতে হৃদয় শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মানব যখন আল্লাহ্‌র বিধান মেনে সৎ ও পরিশুদ্ধ জীবন যাপন প্রণালীর মাধ্যমে আল্লাহ্‌র কাছে আত্মসমর্পন করে তখনই বান্দার "হৃদয়" প্রসারিত হয়। তার মাঝে প্রকৃত সত্যকে দেখার ক্ষমতা, বোঝার ক্ষমতা ও অনুধাবন ক্ষমতার জন্মলাভ করে। সে পরিণত হয় বিবেকবান, অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন , অনুভূতিশীল এক উন্নত আলোকপ্রাপ্ত মানুষে। আর যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহ্‌র বিধানকে অস্বীকার করে তাদের হৃদয়ের তন্ত্রীতে আল্লাহ্‌র রহমতের প্রতীক উপরিউক্ত বিশেষ গুণাবলী ঝংকৃত হতে পারে না। তাদের "হৃদয়" ঐ সব বিশেষ গুণবাচক বিশেষণ ধারণে অক্ষম হয়। এই হচ্ছে পার্থিব জীবনে তাদের শাস্তি। ফলে তাদের চোখ থাকতেও তারা দৃষ্টিহীন অর্থাৎ তাদের হৃদয় অন্তর্দৃষ্টি বিহীন , কান থাকতেও তারা বধির, কারণ তারা কখনও সত্যের ডাক শুনতে পাবে না,ফলে তারা হবে বিবেক বর্জিত। " বস্তুতঃ চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হয়েছে বক্ষস্থিত হৃদয়"। প্রকৃতপক্ষে দেশ ভ্রমণ এবং প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করার ফলে তাদের মনে আল্লাহর করুণা ও শাস্তি সম্বন্ধে ধারণা জন্মাতো। ফলে তারা প্রজ্ঞাসম্পন্ন হতে পারতো।

 

৪৭। তথাপি তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে। কিন্তু আল্লাহ্‌ কখনও তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না ২৮২৬। প্রকৃতপক্ষে, তোমার প্রভুর দৃষ্টিতে একদিন তোমাদের সহস্র বৎসরের সমান।

২৮২৬। মানুষকে আল্লাহ্‌ পাপ কাজ করার সাথে সাথে শাস্তি দান করেন না। মানুষ যাতে অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন করার সুযোগ পায়, সেই সুযোগ আল্লাহ্‌ পাপীদের দান করে থাকেন। এই হচ্ছে মানুষকে দেয়া আল্লাহ্‌র রহমতের অঙ্গীকার। পাপীদের দ্বারা শাস্তি ত্বরান্বিত করার অনুরোধেও আল্লাহ্‌ তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না। তিনি বারে বারে পাপীদের সময় দেন, সুযোগ দেন অনুতাপের জন্য; কিন্তু সাবধান করে দেন যে প্রতিটি ব্যক্তিকেই পৃথিবীতে তার কৃতকর্মের জন্য পরলোকে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আর এই জবাবদিহিতা হবে ন্যায় নীতির ভিত্তিতে। আল্লাহ্‌র এই অঙ্গীকার সত্য তা বাস্তবায়িত হবেই। যারা নির্বোধ তারাই আল্লাহ্‌র শাস্তিকে ত্বরান্বিত করতে চায়। আল্লাহ্‌ স্থান , কাল ও সময়ের উর্দ্ধে। তিনি অনন্ত , অসীম , আমরা সময়ের হিসাব করি দিন ও রাত্রির দ্বারা। কিন্তু সময়ের এই ধারণা আপেক্ষিক [ বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণা ]। সময় হচ্ছে অনন্ত ও অসীম যা স্থান ও কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। এরই উদাহরণ আল্লাহ্‌ দিয়েছেন আমরা যাকে সহস্র বৎসর কল্পনা করি হয়তো তা আল্লাহ্‌র নিকট একদিন বা এক মিনিটের সমতুল্য।

৪৮। কত জনপদকে আমি অবকাশ দিয়েছি ২৮২৭, যারা পাপে লিপ্ত ছিলো, শেষ পর্যন্ত আমি তাদের শাস্তি দান করেছিলাম। [ সকলেরই ] শেষ গন্তব্যস্থল আমারই নিকট।

২৮২৭। এই আয়াতটির সূচনা করা হয়েছে আয়াতে [ ২২ : ৪৫ ] । এই আয়াতে তা শেষ করা হয়েছে।

রুকু - ৭

৪৯। বল, " হে মানুষ! আমাকে তো প্রেরণ করা হয়েছে একজন স্পষ্ট সতর্ককারী রূপে ২৮২৮।

২৮২৮। আল্লাহ্‌র নবীর একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে তাঁর প্রতি আল্লাহ্‌র দেয়া কর্তব্য সঠিক ভাবে এবং সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। কেউ যদি তাঁর প্রচারিত সর্তকবাণী গ্রহণ না করে , তবে তাকে তা গ্রহণ করতে বাধ্য করা , বা তার বিচার করা বা তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করার দায়িত্ব নবীর জন্য নয়। অবাধ্য ও অবিশ্বাসীদের শেষ পরিণতির ভার একমাত্র আল্লাহ্‌র উপরে। অবাধ্য ও পাপীদের জন্য যে সর্তকবাণী তা কিন্তু শাস্তিদানের ভীতি দ্বারাই শেষ করা হয় নাই , তা আল্লাহ্‌র করুণার সংবাদও বহন করে ,তাদের জন্য , যারা পাপ করার পরেও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্‌র রাস্তায় ফিরে আসে।

৫০। যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা ২৮২৯।

২৮২৯। এই আয়াতে 'জীবিকা' কথাটি সঙ্কীণার্থে ব্যবহৃত হয় নাই। এর প্রয়োগ এখানে ব্যপকার্থে। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় ধরণের জীবনোপকরণকে এখানে বোঝানো হয়েছে। পার্থিব জীবনোপকরণ প্রয়োজন এই নশ্বর দেহ ধারণের জন্য। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যার দেহের বাইরেও আর এক অস্তিত্ব বর্তমান। একমাত্র মানুষই অমর আত্মার অধিকারী। দেহের সুস্থতা ও পরিবর্দ্ধনের জন্য প্রয়োজন জাগতিক জীবনোপকরণ। আত্মার সুস্থতার ও সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ঐশ্বরিক জীবনোপকরণ। "সম্মানজনক জীবিকা " দ্বারা এই দুধরণের জীবনোপকরণ বোঝানো হয়েছে। যারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে , অর্থাৎ যারা মুত্তাকী তাদের জন্য আল্লাহ্‌র সুসংবাদের অঙ্গীকার - যা হবে তাদের সৎ কর্মের বহুগুণ বেশী।

৫১। যারা আমার নিদর্শন সমূহ ব্যর্থ করার জন্য চেষ্টা করবে ২৮৩০, তারা হবে আগুনের অধিবাসী।

২৮৩০। আল্লাহ্‌র আয়াত বা হুকুমকে ব্যর্থ করার ক্ষমতা এই পৃথিবীতে কারও নাই। যারা সেই চেষ্টা করে তারা নিজের ক্ষতি নিজেই করে। কারণ এই চেষ্টার মাধ্যমে তাদের আধ্যাত্মিক অবনতি শুরু হয় এবং সময়ের ব্যবধানে তা ত্বরান্বিত হয় মাত্র। ফলে তাদের আত্মিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তারা দোযখের মাঝে নিক্ষিপ্ত হয়।

৫২। তোমার পূর্বে আমি এমন কোন রাসুল বা নবী প্রেরণ করি নাই , যখন তার আকাঙ্খায় , শয়তান [ কুমন্ত্রণা ] নিক্ষেপ করতো না ২৮৩১। কিন্তু যা কিছু [ কুমন্ত্রণা ] সে নিক্ষেপ করে আল্লাহ্‌ তা বিদূরিত করেন এবং আল্লাহ্‌ তাঁর নিদর্শনসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ ২৮৩২।

২৮৩১। রাসুল ও নবীর মধ্যে পার্থক্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে [ ১৯ : ৫১ ] আয়াতের টিকা ২৫০৩ এ। রসুল ও নবী এরা সকলেই রক্ত - মাংসের মানুষ। কিন্তু তারা তাদের জৈবিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সমকক্ষ ,কিন্তু তারা তাদের চারিত্রিক গুণগত মানে সাধারণ মানুষের অনেক উর্দ্ধে অবস্থান করেন। তাদের কাজ হচ্ছে কল্যাণকর, তাদের উদ্দেশ্য থাকে মহৎ। যেহেতু তারা মানুষ, ফেরেশতা নন, সুতারাং শয়তান তাদেরও প্রলুব্ধ করে বিপথে পরিচালিত করার প্রয়াস পায়। আল্লাহ্‌র রাস্তায় কাজে দুস্তর বাঁধা যা মানুষ দ্বারা শয়তানেরই সৃষ্টি। আল্লাহ্‌র বাণীকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য, এই সব বাধাকে অপসারণের প্রয়োজন হয়। আর এই সব বাধা বিপত্তিকে অপসারণের সহজ পন্থায় শয়তান প্ররোচিত করে। শয়তানের এ সব প্ররোচনা বিবিধ হতে পারে, হতে পারে তা অবাধ্যদের সাথে সমঝোতা বা অর্থ সম্পদের ক্ষমতার দ্বারা মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ইত্যাদি। শয়তানের প্ররোচনা নবী রসুলদের মনেও রেখাপাত করতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ্‌র ক্ষমতা শয়তানের ক্ষমতাকে বিদূরিত করে। আল্লাহ্‌র করুণা , হেদায়েত তাদের মনের যে কোন মিথ্যা প্রহেলিকা দূর করে আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।

২৮৩২। এই আয়াতের বক্তব্য ও পরর্বতী আয়াতের বক্তব্য একই রূপ। কিন্তু এই আয়াতের শেষের বাক্যটির ও পরবর্তী আয়াতের শেষ বাক্যটি সম্পর্কহীন।

৫৩। ইহা এ জন্য যে, শয়তান যে ইঙ্গিত নিক্ষেপ করে তিনি তা তাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ করতে পারেন ২৮৩৩, যাদের অন্তরে [ অবিশ্বাসের ] ব্যাধি রয়েছে , এবং যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে ২৮৩৪। পাপীরা [প্রকৃত সত্য থেকে ] বহুদূরে মতভেদে রয়েছে।

২৮৩৩। মানুষের মনের উপরে, চিন্তা ধারার উপরে শয়তানের প্রভাবকে এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এই প্রভাব হবে দ্বিবিধ এবং বিপরীতমুখী। পাপাত্মার জন্য শয়তানের প্ররোচনা হচ্ছে আল্লাহ্‌র তরফ থেকে পরীক্ষা স্বরূপ আর পূণ্যাত্মাদের জন্য তা হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধির সহায়ক স্বরূপ; আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্ম সমর্পনের ইচ্ছাকে আরও সুসংহত করণ।

২৮৩৪। দেখুন আয়াত [ ২ : ১০ ] যেখানে অন্তরের ব্যাধির কথা বলা হয়েছে। অন্তরের ব্যাধি হচ্ছে অভিশপ্ত আত্মার পূর্বাবস্থা। ব্যাধিগ্রস্থ আত্মা সত্যের আলো বঞ্চিত থাকে। গাছ যেরূপ দীর্ঘদিন সূর্যালোক বঞ্চিত অবস্থায় ধীরে ধীরে দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ব্যাধি গ্রস্থ আত্মাও সেরূপ ধীরে ধীরে পাষাণের ন্যায় কঠিন হৃদয়ে পরিণত হয়।

৫৪। এবং ইহা এ জন্য যে ২৮৩৫ যাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তারা যেনো শিখতে পারে যে ইহা [ কোর-আনই ] তোমার প্রভুর প্রেরিত সত্য, এবং তারা যেনো উহার প্রতি অনুগত হয়। যারা ঈমান আনে আল্লাহ্‌ তাদের সরল পথে পরিচালিত করেন।

২৮৩৫। দুধরনের লোকের কথা এই বাক্যাংশগুলির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এই আয়াতের বাক্যাংশ " যাহাদিগকে জ্ঞান দেওয়া ... ... ... ... প্রেরিত সত্য " এবং ৫৩ নং আয়াতের বাক্যাংশ " ইহা এ জন্য যে, ... .. .. ব্যাধি রহিয়াছে " এই দুদল লোকের কথা সমান্তরাল ভাবে বলা হয়েছে। এই দুদল লোকের বর্ণনাকে আয়াত নং ৫২ বাক্যাংশ দ্বারা " অতঃপর আল্লাহ্‌ ... ... .. সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।" সংযুক্ত করা যায়। দেখুন টিকা ২৮৩৩।

৫৫। যারা ঈমানকে প্রত্যাখান করে তারা [ প্রত্যাদেশ ] সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতে থাকবে, যতক্ষণ না হঠাৎ করে তাদের সম্মুখে শেষ বিচারের দিন উপস্থিত হবে, অথবা তাদের সম্মুখে অমঙ্গল দিনের [ কিয়ামতের ] শাস্তি এসে পড়বে ২৮৩৬।

২৮৩৬। ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করার ফলে কাফেররা তাদের অন্তরে আল্লাহ্‌র হেদায়েত প্রবেশের সকল পথ রুদ্ধ করে দেয়। আল্লাহ্‌র করুণা , দয়া, রহমত সব কিছু সে হৃদয়ে উপলব্ধির করতে হয় অপারগ। এসব হৃদয় সন্দেহ ও কুসংস্কারের দোলায় সর্বদা দোদুল্যমান থাকবে,  অর্থাৎ আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশে তাদের সন্দেহ বাতিকতা তাদের সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করবে আমৃত্যু। মৃত্যুর পরে মিথ্যার আবরণ তাদের চোখের সামনে থেকে সরে যাবে, তারা প্রকৃত সত্যকে অনুধাবনে সক্ষম হবে,কিন্তু তখন আর অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের কোনও সময় থাকবে না। আল্লাহ্‌র হেদায়েত পাওয়ার পক্ষে তা হবে সুদূর পরাহত।

৫৬। সেদিন [ কেবলমাত্র ] আল্লাহ্‌র কাছেই ক্ষমতা থাকবে। তিনিই তাদের মধ্যে বিচার করবেন। সুতারাং যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তারা আনন্দের বাগানে বাস করবে ২৮৩৭।

৫৭। এবং যারা ঈমানকে প্রত্যাখান করে এবং আমার নিদর্শনসমূহ মিথ্যা জেনেছে, তাদের জন্য আছে অপমানজনক শাস্তি।

২৮৩৭। যারা শয়তানের প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পন করে ,তাদের উপরেই শয়তানের প্রভুত্ব বিরাজ করে [ ১৭ : ৬২ - ৬৪]। সেই দিন অর্থাৎ শেষ বিচারের দিনে শয়তানের রাজত্বের হবে অবসান। শয়তানকে যে অবসর দান করা হয়েছিলো তা শেষ হয়ে যাবে, এবং সর্বত্র আল্লাহ্‌র আধিপত্য বিরাজ করবে।

রুকু - ৮

৫৮। যারা আল্লাহ্‌র রাস্তায় তাদের ঘর-বাড়ী ত্যাগ করেছে এবং তারপরে নিহত হয়েছে অথবা মারা গেছে, তাদেরকে আল্লাহ্‌ এক উত্তম জীবিকা দান করবেন। প্রকৃতপক্ষে , তিনিই তো শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার দাতা ২৮৩৮।

২৮৩৮। "Rizq" জীবিকা বা জীবনোপকরণ। রূপক অর্থে শেষোক্ত অর্থটি অধিক প্রযোজ্য। কারণ মৃত্যুর পরে রিয্‌ক শব্দটি অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হবে না। তা রূপক বা আলংকারিক অর্থে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যত জীবনকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন এবং পৃথিবীতে তার উপরে যারা নির্ভরশীল এবং তাঁর প্রিয়জনদের ভবিষ্যত জীবনের নিরাপত্তার জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই এই রিয্‌ক শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে।

৫৯। তিনি তাদের এমন স্থানে স্থাপন করবেন যা তারা পছন্দ করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ সব জানেন ও পরম ধৈর্যশীল ২৮৩৯।

২৮৩৯। যারা আল্লাহ্‌র রাস্তায় নিহত হয় তারা শহীদ। সাধারণ পূণ্যাত্মাদের তুলনায় শহীদদের জন্য আছে আরও অধিক পুরষ্কার। তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং আত্মনিবেদনের জন্য আল্লাহ্‌ তাদের পার্থিব সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ। তিনি তাদের পৃথিবীর পূর্বের সকল কাজের খবর রাখেন। কিন্তু আল্লাহ্‌র রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করার জন্য তাদের সমস্ত ক্রিয়া কর্ম জবাবদিহিতার উর্দ্ধে রাখা হয়। আল্লাহ্‌ তো সম্যক প্রজ্ঞাময়।

৬০। ইহা (এরকমই) যদি কেহ অত্যাচারিত হয়ে তুল্য প্রতিশোধ নিয়ে থাকে ও পুণরায় সে অত্যাচারিত হয়, তাহলে আল্লাহ্‌ তাকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ্‌- ই [ পাপ ] মোচন করেন , এবং বারে বারে ক্ষমা করেন ২৮৪০।

২৮৪০। সাধারণভাবে মুসলমানদের উপরে আল্লাহ্‌র হুকুম হচ্ছে মন্দের পরিবর্তে ভালো করা [ ২৩ : ৯৬ ]। কিন্তু এমন অনেক সময় আসে যখন সাধারণ মানুষের পক্ষে তা করা সম্ভব হয় না। সে সব ক্ষেত্রে মন্দের পরিবর্তে মন্দ বা ক্ষতির পরিবর্তে ক্ষতি করার ততটুকু হুকুম আছে যতটুকু তার প্রতি করা হয়েছে। যদি সমান প্রতিশোধ নেওয়ার পরেও ব্যাপারটি সেখানেই শেষ না হয়, এবং অপর পক্ষ যদি পুণরায় আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, এবং সকল সীমারেখা অতিক্রম করে, সেক্ষেত্রে আমাদের সকল দোষ ত্রুটি সত্ত্বেও আমরা আল্লাহ্‌র সাহায্য পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি। কারণ আল্লাহ্‌ পাপ মোচনকারী এবং পুণঃ পুণঃ ক্ষমাশীল।

৬১। ইহা এ জন্য যে, আল্লাহ্‌ রাত্রিকে প্রবেশ করান দিবসের মাঝে, এবং দিবসকে প্রবেশ করান রাত্রির মাঝে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ [ সব ] শোনেন [ সব ] দেখেন ২৮৪১।

২৮৪১। অনেকের কাছে আল্লাহ্‌র গুণাবলীর বর্ণনাকে অদ্ভুদ ও সামঞ্জস্যহীন মনে হতে পারে। কারণ একই সাথে বলা হয়েছেঃ তিনি দয়ালু আবার সেই সাথে ন্যায় বিচারক, তিনি বান্দাকে রক্ষা করেন আবার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র রাস্তায় শহীদ হওয়ার জন্য আহ্বান করেছেন। একদিকে মন্দের পরিবর্তে ভালো করার আদেশ দান করেন, আবার সমপরিমাণ প্রতিশোধেরও অধিকার দান করেছেন। কিন্তু যারা অদূরদর্শী শুধু তারাই আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে এরূপ চিন্তা করতে পারে। কারণ বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে , আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মাঝে এরূপ বহু সামঞ্জস্যহীনতা বিদ্যমান। " আল্লাহ্‌ রাত্রিকে প্রবেশ করান দিবসের মধ্যে এবং দিবসকে প্রবিষ্ট করান রাত্রির মধ্যে।" অর্থাৎ আমাদের চেনা পৃথিবীর দিন রাত্রির হ্রাস-বৃদ্ধির উদাহরণ এখানে দেয়া হয়েছে। দিনের বা রাত্রির কোনও নির্দ্দিষ্ট সীমা রেখা নাই। বছরের কোনও সময়ে রাত্রি দিবসের মাঝে প্রবেশ করে দিবসকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলে , আবার কখনও দিবস রাত্রির মাঝে প্রবেশ করে রাত্রিকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলে। দিবা রাত্রির পরিবর্তিত অবস্থান সত্বেও রাত্রি হচ্ছে বিশ্রামের জন্য নির্দ্দিষ্ট। বিশ্ব প্রকৃতি সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ে। দিন হচ্ছে কর্মচাঞ্চল্যের জন্য নির্দ্দিষ্ট। সূর্যের প্রদীপ্ত আলোতে ভাস্বর সুন্দর এই পৃথিবী হেসে ওঠে। এই পৃথিবীতে অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ্‌র শিল্পী সত্তা ও জ্ঞানের চিহ্ন ভাস্বর, যা মানুষের সর্বোচ্চ জ্ঞানও অনুধাবনে অক্ষম। ঠিক সেরকম এই পৃথিবীতে মানুষে মানুষে , সামাজিক অবস্থান ও পরস্পরের সম্পর্কের ক্ষেত্র অত্যন্ত জটিলতায় পরিপূর্ণ যা সব সময়ে আমাদের পক্ষে অনুধাবন সম্ভব নয়। একমাত্র আল্লাহ্‌র পক্ষেই সম্ভব এসব সুক্ষ ভেদাভেদ সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং তাঁর সৃষ্ট জীবের আবেদনে সাড়া দেওয়া।

৬২। ইহা এই কারেণ যে, আল্লাহ্‌ - তিনিই সত্য ২৮৪২; এবং তিনি ব্যতীত তারা যা উদ্ভাবন করে সবই মিথ্যা, তিনিই আল্লাহ্‌ যিনি মহান, শ্রেষ্ঠ ২৮৪৩।

২৮৪২। এই আয়াতে অত্যন্ত জোরালো ভাবে এবং সুস্পষ্টভাবে আল্লাহ্‌র প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌-ই একমাত্র সত্য। তিনি ব্যতীত আর সবই ছায়া সদৃশ্য যার কোনও নিজস্ব অস্তিত্ব নাই।

২৮৪৩। মানুষ কল্পনার দ্বারা আল্লাহ্‌র প্রতিপক্ষ দাঁড় করায় যার কোন বাস্তব ভিত্তি নাই। মানুষ এই সব ভিত্তিহীন বস্তুর উপাসনার পরিবর্তে এক আল্লাহ্‌র উপাসনা করবে।

৬৩। তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ্‌ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, এবং [ ফলে ] অবিলম্বে পৃথিবী সবুজ চাঁদরে ঢেকে যায় ? [ একমাত্র ] আল্লাহ্‌ -ই [ সৃষ্টির ] সুক্ষ রহস্য বুঝতে পারেন এবং [ তার সাথে ] সুপরিজ্ঞাত ২৮৪৪।

২৮৪৪। "Latif " আল্লাহ্‌র আর এক নাম। এর সঠিক অর্থ প্রকাশ করা ভাষার পক্ষে দুঃসাধ্য। এর ধারণা অন্তরে ধারণ করা মানুষের অনুধাবন ক্ষমতার সর্বোচ্চ বিকাশের পক্ষেও কষ্টকর। তবুও এই শব্দটি দ্বারা সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র যে সব গুণবাচক বিশেণকে প্রকাশ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ : ১) সুক্ষদর্শী অন্তর্দশী, ২) এত সুক্ষ যে মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরে , ৩) এত পবিত্র যে ধারণা শক্তির অতীত, ৪) এত স্বয়ং সম্পূর্ণ যে পৃথিবীর সকল অতি সুক্ষ পার্থক্য এবং রহস্য বুঝতে সক্ষম ৫) এত দয়ালু এবং মহৎ যার দয়া ও মহত্বের প্রকাশ সর্বোচ্চ। মানুষের প্রতি তাঁর দয়া, করুণা ও অনুগ্রহ ধারণার অতীত। আল্লাহ্‌র নাম স্মরণের সাথে সাথে আল্লাহ্‌র এই গুণবাচক বিশেষণ গুলিকে হৃদয়ে অনুভবের চেষ্টা করা প্রয়োজন।

৬৪। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্‌র অধীনে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সকল অভাবমুক্ত সকল প্রশংসার যোগ্য ২৮৪৫।

২৮৪৫। আয়াত [ ২২ : ৬১ - ৬৩ ] গুলিতে আল্লাহ্‌র প্রতি আরোপিত তাঁর গুণবাচক বিশেষণ গুলির কয়েকটির উল্লেখ আছে। যা ঐ সব আয়াতের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ। এই আয়াতে পূর্ববর্তী সকল আয়াতের বক্তব্যকে সারসংক্ষেপ করা হয়েছে এবং আল্লাহ্‌র প্রতি আর দুটো গুণবাচক বিশেষণ বা নাম আরোপ করা হয়েছে। তিনি "অভাবমুক্ত" ও "প্রশংসার যোগ্য "। আল্লাহ্‌র দয়া ও করুণার ধারণা পৃথিবীতে কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। পৃথিবীর সকল কিছুই একে অন্যের উপরে নির্ভরশীল, এবং সকলেই প্রতিটি কর্মের জন্য প্রতিদান আশা করে , এমনকি নিঃস্বার্থ যে দান , তাও সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ নয় কারণ পরকালে সমুন্নত জীবনের আশায়, আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে সে দান করা হয়। সুতারাং সম্পূর্ণ প্রতিদান বিহীন বা কোন কিছুর আশা না করে কেউ এ পৃথিবীতে কিছু করে না। এখানেই আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়ার সাথে পৃথিবীর মানুষের কৃত সর্বোচ্চ দয়া ও করুণার পার্থক্য। আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্ট পদার্থ থেকে কিছুই আশা করেন না। তিনি অভাবমুক্ত। আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্ট পদার্থের উপরে নির্ভরশীল নন। সুতারাং তাঁর দয়া ও করুণা পার্থিব দয়া ও করুণার সাথে তুলনীয় নয়। তা কোনও কবির লেখনী সম্পূর্ণ রূপে বর্ণনা করতে অক্ষম। একমাত্র আমাদের আন্তরিক ও ভক্তিপ্লুত হৃদয়ের ভালোবাসা থেকে যে সঙ্গীতের সৃষ্টি হয় তাই পারে আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়ার কণামাত্র বর্ণনা করতে। দেখুন [ ২ : ৬৭ ]

রুকু - ৯

৬৫। [ হে মানুষ ] তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ্‌ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন পৃথিবীর সকল কিছুকে এবং তাঁর আদেশে সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযান সমূহকে ২৮৪৬ ? তাঁর অনুমতি ব্যতীত পৃথিবীর উপরে আকাশের [বৃষ্টির] পতনকে তিনিই ধরে রাখেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ মানুষের প্রতি দয়ালু ও পরম করুণাময় ২৮৪৭।

২৮৪৬। স্থলভাগ ও সমুদ্রকে আল্লাহ্‌ মানুষের আয়ত্বাধীন করে দিয়েছেন, যেনো মানুষ এদের উপরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে ও নিজের জীবন গড়তে পারে।

২৮৪৭। "Samaa" অর্থ ১) সুউচ্চ কোন কিছু, ২) ছাদ, ৩) আকাশ বা আকাশের সামিয়ানা ,৪) মেঘ বা বৃষ্টি। যদিও অধিকাংশ তফসীরকারগণ " আকাশ " শব্দটি ব্যবহার করেছেন , তবে মওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের মতে শেষ অর্থটি হবে অধিক প্রযোজ্য। যদি বৃষ্টি কে ধরা হয় তবে সম্পূর্ণ আয়াতটি যে ভাবের প্রকাশ করে তা হচ্ছে তিনটি জিনিষ পৃথিবীতে মানুষের জীবন ধারাকে নিয়ন্ত্রিত করে মাটি, সমুদ্র ও বাতাস। বৃষ্টি হচ্ছে আল্লাহ্‌র করুণাধারার প্রতীক। তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য বৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত করেন।

৬৬। তিনিই তোমাদের জীবন দান করেছেন ও মৃত্যু ঘটাবেন এবং পুণরায় তোমাদের জীবন দান করবেন। সত্যই, মানুষ এক অতি অকৃতজ্ঞ প্রাণী।

৬৭। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি ধর্মীয় আচার - অনুষ্ঠান নির্ধারিত করেছি ২৮৪৮, যা অবশ্যই তারা অনুসরণ করবে। সুতারাং তারা যেনো এই ব্যাপারে তোমার সাথে বির্তক না করে। কিন্তু তুমি [ তাদের ] তোমার প্রভুর দিকে আহ্বান কর। অবশ্যই তুমি সঠিক পথে রয়েছ।

২৮৪৮। এই আয়াতের অর্থ এই যে, মুশরেক ও ইসলাম বিদ্বেষীরা ইসলামী শরীয়তের বিধানকারীর বিরুদ্ধে তর্ক-বির্তক শুরু করে। আল্লাহ্‌ প্রত্যেক উম্মতকে তার সময়ের উপযোগী বিশেষ শরীয়ত বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও কিতাব দিয়েছেন। আল্লাহ্‌র নিকট থেকে পরবর্তী নির্দ্দেশ না আসা পর্যন্ত তা তাদের জন্য বৈধ ছিলো। রসুলের (সা) আগমনে তাদের অনুধাবন করা উচিত ছিলো যে নূতন বিধান সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিণ্তু তারা তা করে না কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মের মূল বিষয় অপেক্ষা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে। এ কথা সত্যি যে, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য, সংঘবদ্ধ জীবন ধারণের জন্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও লৌকিকতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ এসব আনুষ্ঠানিকতার প্রভাব সমাজ জীবনে ও ব্যক্তিজীবনে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। যদিও এসব আনুষ্ঠানিকতা ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতীক স্বরূপ, তবুও অনেক সময়ে দেখা যায় সাধারণ মানুষ ধর্মের গুঢ় অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে অনুধাবনের পরিবর্তে এ সব বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতাকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে এবং তর্ক-বির্তক ও বাক্‌-বিতন্ডা শুরু করে। এ কথা রসুলের সময়ে মোশরেক ও ইসলাম বিদ্বেষীদের জন্য যেমন প্রযোজ্য ছিলো, আজও তা সমভাবে প্রযোজ্য। এ সব বাদানুবাদ ও তর্ক-বিতর্ক অবশ্যই নিন্দার্হ। কিণ্তু তাই বলে এ কথা বলা যাবে না যে, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নাই বা এগুলি অর্থহীন। ইসলামের দৃষ্টিতে সংঘবদ্ধ জীবনের জন্য, সামাজিক একতার জন্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশের জন্য এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও লৌকিকতার প্রয়োজন সমাধিক। এখানেই প্রয়োজন হবে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি এবং বিবেকের। আনুষ্ঠানিকতা ও লৌকিকতা যেনো ধর্মীয় মূল্যবোধকে অতিক্রম না করে যায়। আর তা করেছিলো দেখেই মোশরেক ও ইসলাম বিদ্বেষীরা রসুলের (সা) প্রচারিত দ্বীনের আনুষ্ঠানিকতার সৌন্দর্যকে উপলদ্ধি করতে পারে নাই। ইসলামে এই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সমূহ এমনভাবে আরোপ করা হয়েছে যা মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিকাশের সহায়ক। এই আয়াতে রসুলকে (সা) আল্লাহ্‌ নির্দ্দেশ দিয়েছেন সমগ্র মানব গোষ্ঠিকে দ্বীনের প্রতি আহ্বান করার জন্য। এই আহ্বানের বার্তা এখন পর্যন্ত প্রযোজ্য। যদি আমরা আমাদের বিবেক থেকে জানি যে আমরা আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও লৌকিকতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছি, তবে সকলকে আমরা আমাদের সংঘবদ্ধ জীবনে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে দ্বিধা করবো না। সকলকে জানাতে হবে যে, বাদানুবাদ বা র্তক-বির্তক নয়, আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বৃহত্তর ও মহত্তর জীবনের সন্ধান লাভ করাই হচ্ছে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মূল উদ্দেশ্য।

৬৮। যদি তারা তোমার সাথে বিতন্ডা করে তবে বল, " তোমরা যা করছো সে সম্বন্ধে আল্লাহ্‌-ই সবচেয়ে ভালো জানেন। " ২৮৪৯।

২৮৪৯। মানুষ সঠিক জ্ঞান লাভ না করা সত্বেও বিবাদ -বিতন্ডা করে থাকে, বিশেষতঃ দ্বীনের ব্যাপারে কথাটি অধিক প্রযোজ্য। দেখা যায় ধর্মীয় জ্ঞান বা ধর্মের ব্যাপারে আন্তরিকতা না থাকা সত্বেও মানুষ বৃথা র্তকবির্তকে লিপ্ত হয়। মানুষের প্রতিটি কর্ম ও কর্মের উদ্দেশ্য বা নিয়ত আল্লাহ্‌র নিকট সুস্পষ্ট। এই নিয়তের প্রেক্ষিতেই পরলোকে তাদের ধর্মানুরাগকে বিচার করা হবে, শুধুমাত্র তাদের বাদানুবাদের প্রেক্ষিতে নয়।

৬৯। যে বিষয়ে তোমরা মতভেদে রয়েছ সে ব্যাপারে , শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌ -ই তোমাদের মধ্যে বিচার করে দেবেন।

৭০। তোমরা কি জান না আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে আল্লাহ্‌ সব জানেন ? নিশ্চয়ই এ সকলই নথিতে [ লেখা আছে ] এবং আল্লাহ্‌র জন্য তা অতি সহজ ২৮৫১।

২৮৫১। এই আয়াতের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র এক বিশেষ ক্ষমতা বা গুণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র জ্ঞান স্বয়ং সম্পূর্ণ , ব্যপক , এবং নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত। মানুষের জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধ। আর এই সীমাবদ্ধ জ্ঞানকে নির্ভুল ভাবে লিপিবদ্ধ না করলে মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু আল্লাহ্‌র জ্ঞান অসীম। সীমার বাঁধনে তা আবদ্ধ করা যায় না। আকাশ -পৃথিবীর সকল কিছুর জ্ঞান তাঁর স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান এবং সব কিছু সংরক্ষিত থাকে। মহাকালের গর্ভে কিছুই হারিয়ে যায় না।

৭১। তথাপি তারা আল্লাহ্‌কে বাদ দিয়ে এমন কিছুর এবাদত করে যার বিধি সংগত ক্ষমতা তাদের প্রেরণ করা হয় নাই ২৮৫২। এবং যার সম্বন্ধে তাদের [ প্রকৃতই ] কোন জ্ঞান নাই। নিশ্চয়ই যারা পাপ করে তাদের কোন সাহায্যকারী নাই।

২৮৫২। যারা নির্বোধ ও সাধারণ জ্ঞান বির্বজিত শুধু তারাই পারে মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করতে। কারণ সামান্য দূরদৃষ্টি থাকলেই তারা বুঝতে পারতো এই উপাসনার কোনও প্রকৃত ভিত্তি নাই। এদেরকেই বলা হয়েছে 'জালিম' যারা মিথ্যা উপাস্যের উপাসনার দ্বারা আল্লাহ্‌কে অসম্মান করে তাদের কে সাহায্য করবে ?

৭২। যখন উহাদের নিকট আমার স্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয় , তুমি অবিশ্বাসীদের মুখে প্রতিবাদের [ চিহ্ন ] লক্ষ্য করবে ২৮৫৩। ওরা [ অবিশ্বাসীরা ] তাদের আক্রমণ করতে উদ্যত হয় যারা ওদের কাছে আমার আয়াত সমূহ আবৃত্তি করে। বল, " আমি কি তোমাদের এই সকল নিদর্শন অপেক্ষাও খারাপ কিছুর সংবাদ দিব ? ২৮৫৪ সেটা হচ্ছে জাহান্নামের আগুন। অবিশ্বাসীদের জন্য এটা হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি। উহা অত্যন্ত মন্দ গন্তব্য স্থান। "

২৮৫৩। "Munkar" অর্থ ১) কাউকে কিছু দিলে তা নিতে অস্বীকার করা। ২) কোনও বক্তব্যের প্রতি লক্ষ্য করতে বললে দেখতে অস্বীকার করা। ৩) অসম্মত হওয়া , বিরক্ত হওয়া ইত্যাদি।

২৮৫৪। এই বাক্যটি বিদ্রূপাত্মকরূপে ব্যবহৃত হয়েছে "তোমরা মনে কর আল্লাহ্‌র সুস্পষ্ট আয়াতসমূহের বিষয়বস্তু অরুচিকর। তোমাদের জন্য তদ্‌পেক্ষা অরুচিকর বস্তু আছে যদি তোমরা এখনও অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন না কর। আর তা হচ্ছে পরলোকের শাস্তি যা অবশ্যাম্ভবী।

রুকু - ১০

৭৩। হে মানব সম্প্রদায় [ তোমাদের জন্য ] একটি উপমা উপস্থাপন করা হলো , মনোযোগ সহকারে উহা শ্রবণ কর। আল্লাহ্‌ ব্যতীত তোমরা যাকে আহ্বান কর, তারা তো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারে না। যদি তারা এই উদ্দেশ্যে সকলে একত্রিত হয়, [ তবুও পারবে না ] এবং যদি মাছি কিছু তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়, উহাও মাছির নিকট থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা তাদের নাই। আবেদনকারী ও যাদের নিকট আবেদন করা হয় উভয়েই কত দুর্বল ২৮৫৫।

২৮৫৫। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে মিথ্যা উপাস্য ও উপাস্যের উপসনাকারী উভয়েই দুর্বল , নির্বোধ এবং হতভাগ্য।

৭৪। আল্লাহ্‌র [ মর্যাদা ] সম্বন্ধে তাদের প্রকৃত ধারণা নাই। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ক্ষমতাবান , যিনি তাঁর ইচ্ছা সম্পাদনে সক্ষম ২৮৫৬।

২৮৫৬। যারা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর উপাসনা করে , তারা কোনদিনই আল্লাহ্‌র প্রকৃত স্বরূপকে আত্মার মাঝে উপলব্ধি করতে পারবে না। আল্লাহ্‌ সর্বশক্তিমান। দ্যুলোকে -ভূলোকে সর্বত্র তিনি ক্ষমতাশালী। তিনি তাঁর পরিকল্পনা সর্বোতভাবে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম। তিনি সকল ক্ষমতা ও সম্মানের উর্দ্ধে বিরাজ করেন। দেখুন "Aziz" শব্দটির অর্থের জন্য আয়াত [ ২২ : ৪০ এবং টিকা ২৮১৮ ]

৭৫। আল্লাহ্‌ ফেরেশতাদের মধ্য থেকে তাঁর বাণী বাহক ২৮৫৭ মনোনীত করেন, এবং মানুষের মধ্য থেকেও। আল্লাহ্‌-ই [ সব কিছু ] শোনেন এবং দেখেন ২৮৫৮।

২৮৫৭। আল্লাহ্‌ ফেরেশতাদের মধ্যে থেকে তাঁর বাণীর বাহক মনোণীত করেন এবং মানুষের মধ্যে থেকেও। কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে ফেরেশতাদের মত পুত ও পবিত্রতার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব নয়। সুতারাং ফেরেশতারা আল্লাহ্‌র বাণীকে বহন করে আনে আল্লাহ্‌র নির্বাচিত নবী ও রসুলদের নিকট। ফেরেশতা ও নবী, রাসুল উভয়ই আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্বাচিত, এবং তাদের কার্যপ্রণালী আল্লাহ্‌র ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। তাঁরা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র বাণীর প্রচারক হিসেবে কাজ করেন। সুতারাং কোনও অবস্থাতেই তাদের আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি হিসেবে পূঁজা করা চলবে না। তিনি মানুষকে তা স্বগোত্রের মধ্যে থেকে নির্বাচিত করেন যার নিকট ফেরেশতা আল্লাহ্‌র বাণীকে বহন করে নেয়, যা আধ্যাত্মিক জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য।

২৮৫৮। আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্ট বস্তুর প্রতি করুণাময়। দীন-হীনের প্রতিও আল্লাহ্‌র করুণা সমভাবে প্রবাহিত, তিনি তাদের প্রার্থনাকে অসম্মান করেন না। তিনি সর্বশ্রোতা। সম্যক দ্রষ্টা।

৭৬। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তিনি তা জানেন। সকল বিষয় [ সিদ্ধান্তের জন্য ] আল্লাহ্‌র নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে ২৮৫৯।

২৮৫৯। সাধারণ মানুষ অতীত ও বর্তমান সময় নিয়ে মাথা ঘামায়। তারা নিজেদের মধ্যে তর্কবির্তক করে আল্লাহ্‌র প্রেরিত দূতদের আগমনের সময় সম্বন্ধে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ বলছেন মহাকালের গর্ভে পূর্ববর্তী ও পরর্বতী সময় কোনও ব্যাপারই নয়। আদি ও অন্ত সবই আল্লাহ্‌র কাছে প্রত্যাবর্তন করবে এবং তিনিই সব কিছুর বিচার করবেন।

৭৭। হে বিশ্বাসী সম্প্রদায়! রুকু কর, সিজ্‌দা কর ও তোমাদের প্রভুকে শ্রদ্ধাভরে ভালোবাস এবং ভালো কাজ কর; যেনো তোমরা সফলকাম হতে পার ২৮৬০।

২৯৬০। "সফলকাম" এই শব্দটির ভাবার্থ হচ্ছে ইহকাল ও পরকাল উভয়কালে সাফল্য লাভ করা বা সমৃদ্ধি অর্জন করা। এই সাফল্য লাভের উপায় এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র এবাদত করা ও সৎকাজ করা এই দ্বিবিধ উপায়ের কথা এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। এবাদত অর্থ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য আল্লাহ্‌র হুকুম বা বিধানকে মেনে চলা এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সৎ কাজ করা বা তাঁর সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ করা। ইহকাল ও পরকালের সমৃদ্ধির জন্য এই দ্বিবিধ কর্ম পদ্ধতিই একমাত্র আল্লাহ্‌র মনোনীত।

৭৮। এবং আল্লাহ্‌র রাস্তায় সংগ্রাম কর , যে ভাবে সংগ্রাম করা উচিত [আন্তরিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে ] ২৮৬১। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই ২৮৬২। ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ। পূর্বে এবং এই [ প্রত্যাদেশে ] এই উভয় ক্ষেত্রে তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন "মুসলিম " [ সদা অনুগত ] ২৮৬৩; যেনো রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষী হতে পারে ও তোমরা মানব সম্প্রদায়ের জন্য সাক্ষী হতে পার ২৮৬৪। অতএব, তোমরা নিয়মিত সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, এবং আল্লাহ্‌কে শক্ত করে ধরো; তিনি তোমাদের রক্ষাকর্তা এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষাকর্তা এবং সর্বোত্তম সাহায্যকারী।

২৮৬১। আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম বা জেহাদ সম্পর্কে পড়ুন টিকা ২০৪ ও আয়াত [ ২ : ১৯০ ] এবং টিকা ২০৫ ও আয়াত [ ২ : ১৯১]।
২৮৬২। ইসলাম কোনও নূতন ধর্ম নয়। হযরত ইব্রাহীমের প্রচারিত ধর্মই হচ্ছে ইসলাম এবং আল্লাহ্‌ ইসলাম অনুসারীদের "মুসলমান" নামে সম্বোধন করেছেন। সুতারাং ইসলাম ও মুসলিম কোনও নূতন শব্দ নয় বা নূতন মিল্লাত বা সম্প্রদায় নয়। কিন্তু পরবর্তীতে কঠোর হৃদয় ইহুদীদের জন্য ধর্মীয় রীতিনীতি কঠোর করা হয়। ফলে ইহুদীরা সাম্প্রদায়িকতায় পর্যবসিত হয়। অপর পক্ষে খৃষ্টান ধর্ম সাধারণ মানুষের ধর্ম নয়। যারা শুধুমাত্র সাধু ও সন্ন্যাসী যারা জাগতিক বিষয়বস্তু ত্যাগ করতে পারবে তারাই প্রকৃত খৃষ্টধর্মে দীক্ষা নিতে পারে। তাদের ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি থেকেই এ কথার সত্যতা মেলে,"Sell Whatsoever thou hast" [ Mark X : 21 ]; "Take no thought for the morrow" [ Matt vi 34 ] . এই উদ্ধৃতিগুলিই প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ যারা স্ত্রীপুত্র পরিজন নিয়ে ঘোর সংসারী তাদের পক্ষে এই ধর্মকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। অপর পক্ষে ইসলামের বিধি বিধান সাধারণ মানুষের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের পথকে স্বাভাবিক ও উম্মুক্ত করে দেয়। ইসলামের মূল বিষয়গুলির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে মানুষের যা স্বাভাবিক প্রবণতা তা ইসলামে অস্বীকার করা হয় নাই। তবে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাকে আল্লাহ্‌র বিধান বা নির্দ্দেশ অনুযায়ী পরিচালনার হুকুম করা হয়েছে। মানুষের সকল মানসিক দক্ষতা ও প্রবণতাকে আল্লাহ্‌র বিধানের মাঝে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ প্রদত্ত স্বাভাবিক প্রবণতাকে ত্যাগ করে বা অবদমিত করে মানুষের পক্ষে পৃথিবীর দীর্ঘ পথকে অতিক্রম করা সম্ভব হতো না। ফলে মানুষের সভ্যতার অগ্রযাত্রা হতো ব্যহত। ইসলাম হচ্ছে বিশ্ব জনীন ধর্ম। ইসলামের পৃথিবীতে আগমন হযরত আদমের ধরাধামে আগমনের সাথে সাথে ঘটে। এই আয়াতে পিতা ইব্রাহীমের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জন্য যে পূর্ববর্তী উম্মত সমূহ যাদের মাঝে প্রথম ইসলাম প্রচার করা হয় [ ইহুদী , খৃষ্টান এবং আরব ] তিনি ছিলেন তাদের আদি পিতা।

২৮৬৩। " পূর্বে" অর্থাৎ আগের যুগে। দেখুন হযরত ইব্রাহীমের প্রার্থনা আয়াত [ ২: ১২৮]। " এই প্রত্যাদেশে" অর্থাৎ এই আয়াত এবং কোরাণের বিভিন্ন স্থানে।

২৮৬৪। দেখুন আয়াত [ ২ : ১৪৩ ] ও টিকা ১৩ এবং ১৪৪। রাসুল (সা) যেরূপ মূসলমানদের পথ প্রদর্শক এবং উদাহরণ। ঠিক সেরূপ প্রকৃত মুসলিম সম্প্রদায় সারা বিশ্বের জন্য হবে অনুকরণীয় এবং উদাহরণ। কারণ সত্যকে তাদের চরিত্রে ধারণ করার ফলে তারা হবে আল্লাহ্‌র বিধানসমূহ বা সত্যের জ্বলন্ত উদাহরণ। যারা হবে সারা বিশ্বের জন্য ন্যায় ও সত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

মন্তব্য : বর্তমান বিশ্বে যারা নিজেদের মুসলিম উম্মত রূপ পরিচয় দান করে তারা শুধু মাত্র নাম সর্বস্ব মুসলমান। ন্যায় ও সত্যের পথকে তারা জীবন থেকে বিসর্জন দিয়েছে। ফলে বিশ্ব সভায় মুসলমানদের আজ এত দুর্ভোগ এত অসম্মান। সম্পদ ও সুযোগ থাকা সত্বেও তারা তার সদ্ব্যবহার করতে অপারগ।