Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫১ জন
আজকের পাঠক ১৩৪ জন
সর্বমোট পাঠক ৭২৫৮২৩ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৯৯১১৫ বার
+ - R Print

সূরা কাসাস


সূরা কাসাস বা বর্ণনা - ২৮

৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]



ভূমিকা : প্রত্যাদেশ পুণরায় যাদের কাছে প্রেরণ করা হয় তাই হচ্ছে এই সূরার বিষয়বস্তু। কিন্তু এখানে নূতন বিষয়ের উপরে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রত্যাদেশ গ্রহণকারীরা প্রতিদিনের সাধারণ জীবন যাত্রার মাঝেও কিভাবে মহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। অপরপক্ষে , দাম্ভিক ও লোভী ব্যক্তিরা কিভাবে তা প্রত্যাখান করেছিলো। সত্যকে প্রত্যাখানকারীদের সাথে পূণ্যাত্মাদের তুলনা করা হয়েছে।

সম্ভবতঃ কয়েকটি আয়াত বাদে এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ হয় , হিজরতের অল্প কিছু আগে।

সারসংক্ষেপ : ফেরাউন ছিলো অন্যায়কারী , অত্যাচারী এবং উদ্ধত , অহংকারী। কিন্তু আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা ছিলো দুর্বলকে রক্ষা করা। শৈশবেই মুসাকে আল্লাহর দায়িত্ব প্রাপ্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়। যৌবনে তিনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং আল্লাহ তাঁকে হেদায়েত করেন। নির্বাসিত জীবনেও তিনি লাভ করেন সাহায্য-সহযোগীতা ও ভালোবাসা। যখন তাঁকে কর্মক্ষেত্রে ডাকা হয় , আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন। [২৮ : ১-৪২]

ঠিক অনুরূপ ভাবে আল্লাহ্‌র নবী মুহম্মদের [ সা ] পূত পবিত্র আধ্যাত্মিক জীবন ছিলো আল্লাহ্‌র করুণায় বিধৌত। তাঁর নিকটই প্রেরিত প্রত্যাদেশকে পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ প্রাপ্তরা সনাক্ত করেন। তিনি আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন পুরাতন পবিত্র ভূমিতে, যা ছিলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে যারা নিমজ্জিত তাদের জন্য সাবধান বাণী। [ ২৮ : ৪৩ - ৬০ ]

সুন্দর ভবিষ্যত তাদের জন্যই যারা অনুতাপকারী , বিশ্বাসী এবং সৎকাজে অংশ গ্রহণকারী। কারণ সকল সত্য ও করুণার আঁধার এক আল্লাহ্‌। [ ২৮ : ৬১- ৭৫ ]

কিন্তু মানুষ ধনগর্বে অহংকারে স্ফীত হয় , যেমন কারূন হয়েছিলো। এদের শেষ পরিণতি মন্দ। অপরপক্ষে বিনয়ী ও পূণ্যাত্মারা আল্লাহ্‌র করুণা লাভের সমর্থ হবে। [ ২৮ : ৭৬ - ৮৮ ]


সূরা কাসাস বা বর্ণনা - ২৮

৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। তা - সীন - মীম ;

০২। এগুলি কিতাবের আয়াত , যা [ সকল কিছু ] সুস্পষ্ট করে ৩৩২৭।

৩৩২৭। দেখুন আয়াত [২৬: ২ ] এবং টিকা ৩১৩৮।

০৩। আমি তোমার নিকট মুসা ও ফিরআউনের কাহিনী যথাযথ ভাবে বর্ণনা করেছি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ৩৩২৮।

৩৩২৮। হযরত মুসার কাহিনীর কিছু কিছু অংশ এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলি হচ্ছে : কিভাবে মুসার শৈশবে আল্লাহ্‌ তাঁর মাকে অনুপ্রাণীত করেন। মুসা যখন বড় হতে থাকেন, আল্লাহ্‌ কিভাবে তাঁকে মহত্তর ও বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য প্রস্তুত করেন। যৌবনে মুসা কিভাবে বিপদ বিপর্যয়ের মাঝে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেন, শুধু তাঁরই সাহায্য কামনা করেন। কিভাবে তিনি নির্বাসনে পলায়ন করেও অপরের ভালোবাসা ও সাহায্য সহযোগীতা লাভ করেন তার ভালো কাজের দরুন। দায়িত্ব প্রাপ্তির পরে , আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে কি ভাবে তিনি শত্রুদের পরিকল্পনা ধূলিস্যাৎ করেন। এ সব বর্ণনা দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা ক্রমাগত ধীরে ধীরে কাজ করে যাবে। যারা বিশ্বাসী ,তাঁরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র হাতের স্পর্শ অনুভব করতে পারবে আত্মার মাঝে এবং প্রত্যাদেশের মাধ্যমে , যে আলো তাদের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাবে। এ সব কাহিনীর মাধ্যমে মুমিনদের আল্লাহ্‌র কার্যপ্রণালী অনুধাবনের উপদেশ দেয়া হয়েছে।

০৪। ফেরাউন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিলো এবং সে [ দেশের ] অধিবাসীদের নানা দলে বিভক্ত করেছিলো ৩৩২৯। তাদের মধ্যে একটি দলকে সে অবদমিত করে রেখেছিলো। সে তাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করতো, কিন্তু তাদের কন্যাদের জীবিত রাখতো। অবশ্যই সে ছিলো অশান্তি সৃষ্টিকারী।

৩৩২৯। কোন রাজা বা প্রশাসক যখন এমন কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যা প্রজাদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ও অসন্তুষ্ট করে; বিশেষভাবে যদি প্রজাদের এক অংশকে নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত করা হয়, তবে আল্লাহ্‌র চোখে সেই রাজা বা প্রশাসক তার কর্তব্য ত্যাগের জন্য দায়ী। একে আল্লাহ্‌ " অশান্তি সৃষ্টিকারী " রূপে বর্ণনা করেছেন ও তাঁর কুচক্রীদল তাদের জাতিগত মর্যদা ও পার্থিব সভ্যতার গর্বে, দম্ভ ও অহংকারে স্ফীত হয়ে ইসরাঈলীদের তুচ্ছ জ্ঞান করতো। ফলে ইহুদীদের তারা অত্যাচার ও নির্যাতন করতো। ফেরাউন ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসরাঈলীদের সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করা হবে, এবং মেয়ে সন্তানকে জীবিত রাখা হবে মিশরবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য। পরর্বতী আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে আল্লাহ্‌র ক্ষমতায় , মুসা কিরূপ অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেয়ে যান।
০৫। এবং আমি ইচ্ছা করলাম যে, যাদের দেশের মধ্যে অবদমিত করা হয়েছিলো , তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে - তাদের [ ধর্মীয় ] নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধীকারী করতে ৩৩৩০।

৩৩৩০। ফেরাউনের ইচ্ছা ছিলো ইসরাঈলীদের হীনবল করে ধ্বংস করা। কিন্তু আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ছিলো ভিন্নরূপ। আল্লাহ্‌ চেয়েছিলেন ইসরাঈলীদের রক্ষা করতে, কারণ তারা ছিলো দুর্বল। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ছিলো তিনি ইহুদীদের আল্লাহ্‌র ধর্মের রক্ষক ও নেতা রূপে নির্বাচন করবেন এবং তাদের " দুধ ও মধু প্রবাহিত দেশের [ Flowing with milk and honey ]" উত্তরাধীকারী করবেন। কার্যক্ষেত্রে ইসরাঈলীরা যতদিন আল্লাহ্‌র বিধান মেনে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করেছে ততদিন তারা সেখানে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ছিলো।

০৬। দেশে তাদের ক্ষমতায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফেরাউন, হামান, ৩৩৩১ ও তাদের বাহিনীকে সেই জিনিষ দেখাতে যার বিরুদ্ধে তারা সাবধানতা অবলম্বন করেছিলো ৩৩৩২।

৩৩৩১। হামান ছিলেন ফেরাউনের মন্ত্রী। ওল্ড টেস্টামেন্টে [ Esther iii ] যে হামানের উল্লেখ আছে তার সাথে এই হামান এক নয়। ওল্ড টেস্টামেন্টের উল্লেখিত হামান ছিলেন পারস্যের রাজার Ahasuerus [ Xeres ] এর মন্ত্রী। এই রাজা গ্রীস আক্রমণ করেন এবং খৃষ্ট পূর্ব ৪৮৫ - ৪৬৪ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

৩৩৩২। বনী ইসরাঈলীদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধির কারণে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিলো। ফলে ফেরাউন তাদের ধ্বংস করে দেবার পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা তো সফল হয়ই নাই উপরন্তু মুসার আহ্বানে তাদের উপরে প্লেগ রোগের প্রার্দুভাব হয় এবং হাজার হাজার লোক মারা যায় [ ৭ : ১৬৩ এবং টিকা ১০৯১ - ৯২ ]। আল্লাহ্‌ ফেরাউনের লোকদের ধ্বংস করেন কারণ তারা ছিলো উদ্ধত, অহংকারী এবং পাপে নিমজ্জিত। পলায়ণপর ইসরাঈলীদের অনুসরণ করতে যেয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীগণ ডুবে মারা যায়।তাদের সাবধানতা কোন কাজে আসলো না। সুতারাং ফেরাউন যে আশঙ্কা করেছিলো তা সত্যে পরিণত হলো। কারণ অত্যাচারী , অহংকারীদের শেষ পরিণতি হবে ধ্বংস। এই আল্লাহ্‌র বিধান। এই কাহিনীর এটাই নৈতিক উপদেশ।

০৭। সুতারাং আমি মুসার মায়ের প্রতি ওহী পাঠিয়েছিলাম যে, " [ তোমার শিশুকে ] স্তন্য দান কর। কিন্তু যখন তুমি তার সম্পর্কে আশংকা করবে তখন তাঁকে তুমি নদীতে নিক্ষেপ করবে ৩৩৩৩। কিন্তু ভয় পেয়ো না বা দুঃখিত হয়ো না। নিশ্চয়ই আমি তাঁকে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেবো এবং আমি তাঁকে রাসুলদের মধ্যে একজন করবো।"

৩৩৩৩। মিশরে ধাত্রীদের উপরে হুকুম ছিলো ইসরাঈলীদের ছেলে সন্তানকে জন্মের পরই মেরে ফেলার জন্য। হযরত মুসার জীবন এ থেকে গোপনে রক্ষা পায় এবং তাঁর মা তাঁকে বুকের দুধ খাইয়ে বড় করতে থাকেন। যখন আর মুসার উপস্থিতি গোপন রাখা সম্ভব ছিলো না , তখন মুসার মা তাঁকে একটি ঝুরিতে রেখে নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন। ঝুড়িটি ভাসতে ভাসতে রাজার প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে থেমে থাকে। পরর্বতী আয়াতে বলা হয়েছে যে, সেখান থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়। আল্লাহ্‌ মুসার মাতাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর সন্তানকে তাঁর কোলে ফিরিয়ে দেবেন। বাস্তবে মুসা তাঁর মায়ের স্নেহের তত্বাবধানেই বড় হতে থাকেন এবং পরবর্তীতে আল্লাহ্‌র নবী হন।

০৮। অতঃপর ফেরাউনের লোকজনে তাঁকে [ নদী থেকে ] উঠিয়ে নিল [ এই অভিপ্রায়ে যে মুসা ] যেনো তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে ৩৩৩৪। ফেরাউন ও হামান এবং তাদের [ সকল ] লোক লষ্কর ছিলো পাপী।

৩৩৩৪। "মুসা যেনো তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে।" এই আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, কিভাবে তাঁর দুরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, পরিকল্পনা কাজ করে। দুষ্ট ও পাপীরা তাদের দুরভিষন্ধির জাল নিক্ষেপ করে বিপক্ষের প্রতি, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সে জাল তাদেরকেই বেষ্টন করে ফেলে , যে ভাবে তারা মুসাকে লালন-পালনের মাধ্যমে নিজেদের শাস্তির অস্ত্রকে নিজেরাই তৈরী করছিলো এবং শাণিত করেছিলো। অথবা অন্যদৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, মুসাকে আল্লাহ্‌ মিশরবাসীদের সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন যেনো তিনি সে সবের অন্তঃসারশূন্যতা ও প্রতারণার খেলা বুঝতে পারেন। এভাবেই আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা আমাদের জীবনকে এক নির্দ্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি নিয়ে যায় যা হয়তো অনেক সময়েই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না

০৯। ফেরাউনের স্ত্রী বলেছিলো, " [ এই শিশু ] আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী ৩৩৩৫। ওকে হত্যা করো না। এমনও হতে পারে যে, সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করতে পারবো।" বস্তুতঃ তারা অনুধাবন করতে পারে নাই [কি তাদের কাজের পরিণাম ] ৩৩৩৬।

৩৩৩৫। হযরত মুসা দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর। ফেরাউনের কোনও পুত্র সন্তান ছিলো না, শুধু একটি কন্যা ছিলো পরবর্তীতে যে কন্যা ফেরাউনের সিংহাসনের অংশ গ্রহণ করে। অনেকে মনে করেন এই ফেরাউন হচ্ছেন তুত্‌মাস।

৩৩৩৬। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা কি ভাবে কাজ করে তার অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ঐশ্বরিক বিচক্ষণতার পরিণামে দেখা যায় পাপী তার নিজস্ব কর্মের দ্বারাই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। শুধু তাই-ই নয়, পাপীর ইচ্ছা না থাকলেও অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও তারই কর্মের পরিণামে মন্দ অবদমিত হয়ে ভালো প্রতিষ্ঠা লাভ করে থাকে। হযরত মুসার কাহিনীর মাধ্যমে এই চিরন্তন সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যে বালক সম্পর্কে স্বপ্ন ও স্বপ্নের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিলো এবং যার কারণে বনী ইসরাঈলীদের অসংখ্য নবজাতক পুত্র সন্তানকে হত্যা করার আইন জারি করা হয়েছিলো , তাকে আল্লাহ্‌ এই ফেরাউনেরই গৃহে, তারই হাতে লালিত পালিত করলেন। এ ভাবেই বিস্ময়কর ভাবে আল্লাহ্‌র সূদূর প্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় যা সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা অসাধ্য। সে কারণে কোন দুর্যোগ বা বিপদে ধৈর্য্যহারা না হয়ে আল্লাহ্‌র প্রতি ভরসা রেখে অগ্রসর হতে বলা হয়েছে। আজ যা বিপদের কালো মেঘ , আগামীতে তাই-ই হয়তো সফলতার স্বর্ণ উজ্জ্বল দিন হয়ে দেখা যাবে যার সংবাদ শুধু আল্লাহ্‌-ই জ্ঞাত।

১০। কিন্তু মুসা- জননীর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিলো। আমি তার হৃদয়কে [ বিশ্বাসে] দৃঢ় করে না দিলে, সে তো তাঁর [ মুসার ] পরিচয় প্রকাশে প্রায় উদ্যত হয়েছিলো ৩৩৩৭।

৩৩৩৭। সন্তানের থেকে বিচ্ছেদের ফলে, মুসার মায়ের হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু তাঁর ছিলো আল্লাহ্‌র কল্যাণকর পরিকল্পনার উপরে অগাধ বিশ্বাস, ফলে আল্লাহ্‌ জননীর মনঃস্তুষ্টির জন্য তারই কোলে সন্তানকে বিষ্ময়করভাবে পৌঁছে দেন। ঘটনাটি এরূপ : শিশু মুসা কোনও ধাত্রীরই স্তন্য পান করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। শেষে মুসার জননী ধাত্রীর পরিচয়ে মুসাকে স্তন্য পান করানোর প্রস্তাব দেন। এবারে শিশু মুসা নিজ মাতার স্তন্য পান করতে থাকেন। এ ভাবেই নিজ মাতা, ধাত্রীর পরিচয়ে মুসাকে নিজ তত্বাবধানে রাখতে সক্ষম হন। ঐশ্বরিক পরিকল্পনা কত বিস্ময়করভাবেই না কাজ করে। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন। সেই সময় পর্যন্ত ধৈর্য্য ধারণের প্রয়োজন হয়। মুসার জননীর হৃদয়ে আল্লাহ্‌ ধৈর্য্য ধারণের ক্ষমতা দ্বারা শক্তিশালী করেছিলেন। আল্লাহ্‌ পরম করুণাময়।

১১। এবং সে [ মুসার] বোনকে বলেছিলো, " ওকে অনুসরণ কর।" সুতারাং সে [বোনটি ] অপরিচিত হিসেবে [ দূর থেকে ] তার প্রতি নজর রাখতে থাকলো। ফেরাউনের লোকেরা তা বুঝতে পারলো না।

১২। আমি পূর্বেই তাঁকে [ অন্য ধাত্রীর ] স্তন্য পান করাতে নিষেধ করেছিলাম , যতক্ষণ না [ তাঁর বোন এসে ] বলেছিলো : " আমি কি তোমাদের এমন এক পরিবার দেখিয়ে দেবো যারা তাঁর হিতাকাঙ্খী হয়ে তোমাদের হয়ে তাঁকে লালন পালন করবে ? " ৩৩৩৮

৩৩৩৮। "তোমাদিগের হয়ে " - অর্থাৎ ফেরাউনের পরিবারের পরিবর্তে শিশু মুসার মা সে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এভাবেই শিশু মুসা মাতৃদুগ্ধ পানের ও মাতৃস্নেহ লাভের সুযোগ পান এবং একই সাথে রাজকীয় পরিবারে লালিত-পালিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। সেখানে তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের দ্বারা মিশরের জ্ঞান বিজ্ঞান শেখার সুযোগ লাভ করেন। এসব দেখে মায়ের অন্তর শান্তিতে ভরে যায়। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে মুসা যে নিজ জননী ব্যতীত অন্য ধাত্রীদের স্তন্য পান করে নাই তা ছিলো আল্লাহ্‌রই পরিকল্পনা - জননীকে নিজ সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার কৌশল মাত্র।

১৩। এভাবেই আমি তাকে তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম, যেনো তার চক্ষু জুড়ায় , যেনো সে দুঃখ না করে এবং সে যেনো বুঝতে পারে যে, আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি সত্য। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বুঝতে পারে না ৩৩৩৯।

৩৩৩৯। এ ভাবেই আল্লাহ্‌ জননীর কোলে তাঁর সন্তানকে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবেই। কিন্তু যাদের বিচক্ষণতা, অন্তর্দৃষ্টি, ও অনুধাবন ক্ষমতা কম তারা তা উপলব্ধি করতে অক্ষম। এ সব লোকেরা যে সব পরিকল্পনা করে যদি তা সামান্য ব্যাহত হয়, তবে সাথে সাথে তারা অস্থির হয়ে পড়ে। তারা আল্লাহ্‌র বিচক্ষণতা , জ্ঞান , ক্ষমতা এবং মঙ্গলাকাঙ্খা অনুধাবনে অক্ষম হয়। আল্লাহ্‌র ক্ষমতা, বিচক্ষণতা , জ্ঞান, পরিকল্পনা কাজ করে সময়ের বৃহত্তর পরিসরে যা ব্যাপক এবং কল্যাণকর। কিন্তু মানুষ অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানের অভাবে তা অনুধাবনে অক্ষম।

রুকু - ২

১৪। যখন সে পূর্ণ যৌবনে উপণীত ও পরিণত বয়স প্রাপ্ত হলো , এবং [ জীবনে ] দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো ৩৩৪০ ; আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম। যারা ভালো কাজ করে তাদের আমি এ ভাবেই পুরষ্কৃত করে থাকি।

৩৩৪০। "পূর্ণ যৌবনে উপণীত ও পরিণত বয়স্ক হলো " - এই বয়েসকে ধরা যায় ১৮ থেকে ৩০ বৎসরের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে যে কোনও ব্যক্তির শারীরিক বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হয়ে যায় এবং মানসিক দক্ষতা সমূহও পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। তার নৈতিক চরিত্র এবং অভ্যাসসমূহ এক বাঁধাধরা নিয়মে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সে কর্ম জীবনে প্রবেশ লাভ করে। এই বয়সে মুসার চরিত্রে প্রকাশ পায় তার আত্মার পবিত্রতা , মানুষের জন্য মঙ্গলাকাঙ্খা , নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য, বিশ্বস্ততা, এবং সর্বোপরি সকলের জন্য ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রতি অনুরাগ। তিনি চরিত্রের এ সব গুণাবলী নিজ চেষ্টায় অর্জন করেন, যার ফলে আল্লাহ্‌ তাঁকে পুরষ্কৃত করেন হিকমত বা বিবেক এবং জ্ঞান দ্বারা; যেনো এ দ্বারা তিনি ভবিষ্যত জীবনের দুর্যোগকে মোকাবিলা করতে পারেন। মুসার চরিত্রের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ সকল মানুষের জন্য এই বারতা পৌঁছে দিয়েছেন যে, " আমি সৎকর্ম পরায়ণদিগকে পুরষ্কার প্রদান করে থাকি" হিক্‌মত ও জ্ঞান দ্বারা।

১৫। [ মুসা একদিন ] নগরে প্রবেশ করলো যখন উহার অধিবাসীরা সর্তক ছিলো না ৩৩৪১। এবং সে সেখানে দুইটি লোককে সংঘর্ষে লিপ্ত অবস্থায় দেখলো। একজন তার নিজ ধর্মের এবং অপরজন তার শত্রুদলের। এখন মুসার নিজ ধর্মের লোকটি তার শত্রুর বিরুদ্ধে মুসার নিকট সাহায্যের আবেদন করলো, এবং মুসা তাকে ঘুষি মারলো ৩৩৪২। ফলে তার জীবন অবসান হলো। সে [মুসা ] বলেছিলো, " এটা শয়তানের কাজ। সে তো প্রকাশ্য বিভ্রান্তকারী শত্রু।"

৩৩৪১। মুসা যখন নগরীতে প্রবেশ করলো, সম্ভবতঃ তা ছিলো মধ্যাহ্ন কাল, যখন মিশরের ব্যবসা বাণিজ্য কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ থাকে। প্রচন্ড সূর্যতাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লোকজন গৃহের ছায়াতে আশ্রয় নেয়। অথবা সময় কালটি ছিলো রাত্রিকাল - যখন শহরের অধিবাসীরা সুপ্তির কোলে আশ্রয় গ্রহণ করে। আয়াত ১৮ এর বর্ণনা অনুযায়ী শেষের বর্ণনাটিই অধিক প্রযোজ্য মনে হয়, এর আর একটি কারণ হতে পারে মুসা রাজপরিবারে রাজপুত্রের ন্যায় প্রতিপালিত। সুতারাং একজন রাজপুরুষের যে কোনও সময়ে নাগরিক সুবিধা বঞ্চিতদের সমাজে, হীনভাবে বিবেচিতদের আবাসস্থলে যে কোনও সময়ে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। অবশ্যই সময়টা এমন হতে হবে, যখন তাঁকে কেউ লক্ষ্য করবে না। মুসা সেই সব কারণে প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে গোপনে রাতে ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো নিজ চোখে ইহুদীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। ইহুদীদের প্রতি যে নিদারুণ অত্যাচার অবিচারের কাহিনী তিনি শুনেছিলেন সম্ভবতঃ তা তিনি নিজে বিচার করতে চেয়েছিলেন। আমরা ধরে নিতে পারি তিনি তাঁর মায়ের সংস্পর্শে সব সময়েই ছিলেন - যার ফলে তাঁর মধ্যে ইহুদীদের প্রতি বিশেষ এক আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করা যায়।

৩৩৪২। সংঘর্ষ হচ্ছিল ইহুদী ও মিশরবাসীর মধ্যে। মুসার উদ্দেশ্য ছিলো মিশরবাসীকে আঘাত করে ইহুদীকে মুক্ত করা। তিনি মিশরবাসীটিকে হত্যা করতে চান নাই। কিন্তু ঘটনাচক্রে মিশরবাসীটি মুসার এক ঘুষিতেই মৃত্যুবরণ করে। সম্পূর্ণ ঘটনাটি মুসার জন্য ছিলো বহুকারণে দুর্ভাগ্যজনক। কারণ প্রথমতঃ মুসা নিয়ম বর্হিভূত ভাবে গোপনে নগরী ভ্রমণ করছিলো, দ্বিতীয়তঃ দুর্বলের পক্ষ অবলম্বন করতে যেয়ে তিনি একজন স্বাধীন মিশরবাসীর মৃত্যুর কারণ হয়েছেন। এসব কারণে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়েন এবং আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করেন।
১৬। সে প্রার্থনা করেছিলো, " হে আমার প্রভু ! আমি সত্যিই নিজের আত্মার প্রতি অত্যাচার করেছি। এখন তুমি আমাকে ক্ষমা কর।" সুতারাং আল্লাহ্‌ তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি বারে বারে ক্ষমাশীল , পরম করুণাময়।

১৭। সে বলেছিলো, " হে আমার প্রভু! যেহেতু তুমি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, সুতারাং আমি আর কখনও পাপীদের সাহায্যকারী হব না।" ৩৩৪৩

৩৩৪৩। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করার জন্য হযরত মুসা প্রতিজ্ঞা করেন একান্ত আন্তরিক ও অনুগত ভাবে। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে,তিনি ভবিষ্যতে কখনও অপরাধীদের সাহায্য করবেন না। সম্ভবতঃ ইহুদীটি ছিলো কলহপ্রিয়, সেই কারণে মুসা অনুতপ্ত অবস্থায় উপরের প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু তখনও দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে নাই , যে ঘটনার পরিণামে তাঁকে মিশর ত্যাগ করতে হয়।

১৮। অতঃপর ভীত-সতর্ক অবস্থায় সেই নগরীতে তাঁর প্রভাত হলো। হঠাৎ সে শুনতে পেলো, পূর্বদিন যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিলো সে চীৎকার করে [ পুণরায় ] তার সাহায্য প্রার্থনা করছে। মুসা তাকে বললো, " এটা পরিষ্কার যে, তুমি একজন ঝগড়াটে ব্যক্তি ৩৩৪৪।"

৩৩৪৪। লোকটি ছিলো পূর্বদিনের ইসরাঈলী। এদিন মুসা তাকে সাহায্যের জন্য আগ্রহ বোধ করলেন না কারণ বলা হয়েছে টিকা ৩৩৪২ এ। মুসা অত্যন্ত ক্রুব্ধ বোধ করেন।

১৯। অতঃপর, মুসা যখন তাদের উভয়ের শত্রুকে ধরতে উদ্যত হলো ৩৩৪৫; তখন সে ব্যক্তি বলে ঊঠলো, " হে মুসা ! গতকাল তুমি যেভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, তোমার উদ্দেশ্য কি সেভাবে আমাকে হত্যা করা ? [আসলে] তোমার উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী উৎপীড়ক হওয়া ; শান্তিস্থাপনকারী হওয়া নয়। " ৩৩৪৬

৩৩৪৫। এর পরের ঘটনা হচ্ছে ,মুসা যখন আবার ধারণা করলেন যে মিশরবাসীটিই অন্যায়ভাবে ইহুদীটিকে মারধর করছে, তিনি ব্যাপারটিতে হস্তক্ষেপ করতে পুণরায় মনস্ত করলেন। " উভয়ের শত্রু " অর্থাৎ মুসা এবং ইহুদীটির শত্রু মিশরবাসীটি। ঠিক সে সময়েই তিনি দ্বিবিধ সর্তকবাণী লাভ করেন। একটি হচ্ছে যুদ্ধরত মিশরবাসীটির কাছ থেকে , অন্যটি অপর এক বন্ধুসুলভ ব্যক্তির নিকট থেকে যে ইসরাঈলীও হতে পারে বা মিশরবাসীও হতে পারে। ধারণা করা যেতে পারে যে প্রথম দিনের ঘটনার পরে হাট-বাজারে ঘটনাটি সম্বন্ধে প্রচুর আলোচনা হয়েছে যেখানে মিশরবাসী ও ইসরাঈলী উভয়পক্ষ অংশ গ্রহণ করেছে। ফলে যুদ্ধরত ইসরাঈলীটি নিজেকে বিজয়ী বলে ধারণা করে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে এবং দ্বিতীয় দিনও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং মুসাকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে; যে কারণে হযরত মুসা বিরক্ত হয়ে তাকে তিরষ্কার করেন। সম্ভবতঃ হত্যার ঘটনাটি মিশরবাসীদের মধ্যে ব্যপক সাড়া জাগায় ও আলোচনা হয় এবং তারা যখন প্রকৃত হত্যাকারীকে সনাক্ত করতে পারে , তখন তারা তা রাজপ্রাসাদে ঘটনাটি জ্ঞাত করে। যে কারণে মুসা রাজপ্রাসাদে ফিরে যেতে সাহস করেন নাই।

৩৩৪৬। মিশরবাসীটি পূর্বের সম্পূর্ণ ঘটনাটি অবগত ছিলো। সে মুসাকে বললো, তুমি কি গতকালের ঘটনার পুণরাবৃত্তি করতে চাও ? তুমি তো একজন স্বেচ্ছাচারী বই আর কিছু নও। আর তুমি সর্বদা ন্যায়ের ও শান্তির কথা বল। যদি তুমি সত্যবাদী হও তবে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করবে।

২০। শহরের দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এসে বললো, ৩৩৪৭: " হে মুসা ! পরিষদবর্গ তোমার সম্বন্ধে পরামর্শ করছে; তোমাকে হত্যা করার জন্য। অতএব তুমি বাইরে চলে যাও। অবশ্যই আমি তোমার হিতাকাঙ্খী।"

৩৩৪৭। মিশরবাসীকে হত্যার গুজব চর্তুদ্দিকে রটনা হয়েছিলো যা শেষ পর্যন্ত রাজপ্রাসাদেও পৌঁছে যায়। সেখানে ফেরাউনের সভাষদবর্গের সভাতে মুসার জন্য মৃত্যু দণ্ডাদেশ ধার্য করা হয়।

২১। সে সেখান থেকে ভীত সতর্ক অবস্থায় বের হলো ৩৩৪৮। সে প্রার্থনা করেছিলো ; " হে আমার প্রভু ! তুমি আমাকে এই পাপী সম্প্রদায়ের হাত থেকে উদ্ধার কর।"

৩৩৪৮। মুসা উপলব্ধি করতে পারলেন যে, রাজপ্রাসাদ বা নগরী এমনকি ফেরাউনের রাজত্বের সীমানার মধ্যে তাঁর জীবন নিরাপদ নয়। সুতারাং তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনের মনস্ত করলেন। কিন্তু তিনি কোথায় যাবেন জানেন না। প্রচন্ড মানসিক উদ্বেগ ও উত্তেজনা তাঁকে অস্থির করে তোলে। তিনি কায়মনোবাক্যে একান্তভাবে সেই পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করেন, যার ফলে তিনি আত্মার মাঝে শান্তি লাভ করেন, এবং উদ্বেগ থেকে মুক্ত হন। তিনি সান্তনা লাভ করেন এই ভেবে যে, অন্যায় , অবিচার ও নিষ্পেষণের মাঝে বাস করার থেকে নির্বাসনে যাওয়া অনেক কম কষ্টের।

রুকু - ৩

২২। অতঃপর যখন সে মাদইয়ান অভিমুখে যাত্রা করলো, ৩৩৪৯ সে বলেছিলো, "আমি আশা করি, আমার প্রভু আমাকে সরল পথ দেখাবেন। "

৩৩৪৯। মিশরের নিম্নভূমির ৩০০ মাইল পূর্বদিকে থেকে সিনাই উপদ্বীপের অবস্থান। সিনাই উপদ্বীপ দক্ষিণে সুয়েজ উপসাগর [ Gulf of Suez ] দ্বারা বেষ্টিত, উত্তরে মিশরের সাথে ভূমি দ্বারা সংযোজিত - বর্তমানে এই সংযোগস্থলকে কেটে সুয়েজ খাল নির্মাণ করা হয়েছে। প্রাচীন কালে এই সংযোজিত ভূখন্ডের উপর দিয়ে বাণিজ্য পথ মিশর থেকে প্যালেস্টাইন ও সিরিয়া পর্যন্ত প্রসারিত ছিলো। হযরত মুসা এই বাণিজ্যপথকে পরিহার করেন, কারণ তিনি ছিলেন পলাতক আসামী এবং ফেরাউনের লোকজন তাঁর সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলো। যদি তিনি বাণিজ্য পথকে ব্যবহার করতে পারতেন , তবে তিনি মিশর ও সিনাইএর সংযোজিত এই ভূখন্ড অতিক্রমের পর পরই সিনাইর মরুভূমিতে পৌঁছুতে পারতেন। সেখান থেকে পূর্বে বা দক্ষিণ পূর্বে মাদিয়ানদের রাজ্যের শুরু। মাদিয়ানরা মিশরীয় ছিলো না - তারা ছিলো আরব। তিনি মাদিয়ানদের আবাসস্থলের দিকে যাত্রা করেন এবং যাত্রার পূর্বে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। এখানে অনুধাবনযোগ্য যে, মুসার ভৌগলিক জ্ঞান ও জাগতিক জ্ঞান ছিলো অগাধ - কারণ তিনি রাজপ্রাসাদেই সে সম্বন্ধে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষিত হন। তা সত্বেও তিনি তাঁর প্রতিটি কাজে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছেন। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে মুসার আল্লাহ্‌র নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের চিত্রই ফুঠে উঠেছে।

২৩। এবং যখন সে মাদইয়ানের পানির [কূপের ] নিকট পৌঁছুলো, ৩৩৫০, সে সেখানে একদল লোককে দেখলো যারা তাদের [ মেষপালকে ] পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পশ্চাতে সে দুজন নারীকে দেখতে পেলো, যারা তাদের [ মেষপালকে ] থামিয়ে রাখছিলো। সে বলেছিলো, " তোমাদের ব্যাপার কি ? " তারা বলেছিলো, " আমরা আমাদের [ মেষপালকে ] পানি পান করাতে পারি না , যতক্ষণ না রাখালেরা তাদের [ মেষপালকে ] সরিয়ে নিয়ে যায়। এবং আমাদের পিতা অত্যন্ত বৃদ্ধ ব্যক্তি।" ৩৩৫১

৩৩৫০। প্রাচীন কালে , যারা মরুভূমি অতিক্রম করতো, তাদের যাত্রাপথে একমাত্র উদ্দেশ্য থাকতো নির্দ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য পথের মরূদ্যান বা কূপের নিকট পৌঁছানো। কারণ তা হলে গাছের ছায়াতে সূর্যের প্রচন্ড তাপ থেকে শরীরকে সুশীতল করা যায়, কূপের পানি পানে প্রচন্ড তৃষ্ণাকে নিবারণ করা যায় , সর্বোপরি মরুভূমির জনশূন্যতা থেকে রক্ষা পেয়ে মানুষ সঙ্গ লাভ করা যায়। মাদিয়ানদের জলাশয়টি ছিলো সম্ভবতঃ একটি গভীর কূপ। সিনাই উপদ্বীপ হচ্ছে বালুকাময় মরুভূমি। বালুকাময় মরুভূমিতে পানির স্তর অত্যন্ত নীচে থাকে। সেই কারণে বিশেষতঃ ঝরণা দেখা যায় না। অবশ্য নিকটর্বতী স্থানে যদি পাহাড় থাকে তাহলেই ঝরণার অস্তিত্ব সম্ভব।

৩৩৫১। এই আয়াতটি প্রেমের পূর্বরাগের কবিতার মত মধুর যা কয়েকটি মাত্র বাক্যের দ্বারা চিত্রিত করা হয়েছে। মুসা শেষ পর্যন্ত মাদিয়ানের একটি মরূদ্যানে পৌঁছাতে সক্ষম হলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন পথশ্রমে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। তিনি তাঁর আজন্ম পরিচিত শৈশব , কৈশর ও যৌবনের মিশরকে ত্যাগ করেন দুর্যোগ ও দুর্ভাবনার মধ্যে। মানসিক দুশ্চিন্তা ও ভয়ে তিনি অনিশ্চিতের পথে পা বাড়ান , শুধু একমাত্র নির্ভরশীলতা ছিলো আল্লাহ্‌র উপরে। তিনি পথশ্রমে ছিলেন তৃষ্ণার্ত, সুতারাং স্বাভাবিকভাবে তিনি পানি পান করার জন্য আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কূপে তখন দুজন রাখাল তাদের পশুপালকে পানি পান করাচ্ছিল। নূতন আগুন্তক হিসাবে তাদের সরিয়ে দেয়া ঠিক নয়। সুতারাং মুসা গাছের ছায়াতে তাদের কাজ শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে মনস্ত করেন। এ সময়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে দুজন তরুণী কুমারী তাদের পশুপাল নিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের পশুদের পানি পান করানোর জন্য। রাখালদের সরিয়ে তাদের পশুদের স্থান করে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এই কথা শুনে মুসার পৌরুষ জাগরিত হয়ে উঠলো। তিনি তরুণীদের পশুপালকে নিয়ে কূপের ধারে জায়গা করে নিলেন এবং তাদের পানি পান করালেন এবং পুণরায় গাছের ছায়াতে বিশ্রাম করতে লাগলেন। এখানে মুসার চরিত্রের যে মহৎ দিক উম্মোচিত হলো তা হচ্ছে দুর্বলের প্রতি সব সময়েই তাঁর হাত ছিলো প্রসারিত। মিশর থেকে বিতাড়িত হওয়ার মূলেও ছিলো সেই এক কাহিনী। এই আয়াত ও পূর্ববর্তী আয়াতে আমরা দেখি মুসা সর্বদা সকল অবস্থায় আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ কামনা করেছেন।

এই আয়াতে তরুণীদ্বয় একটি মাত্র বাক্য , "Abu na Shaikhun Kabirun" অর্থাৎ "আমাদের পিতা অতিবৃদ্ধ" বাক্যটি দ্বারা মনের বিরাট ভাব প্রকাশ করেছে। তারা বলতে চেয়েছে যে তাদের পিতা অতি -বৃদ্ধ হওয়ার দরুণ পশুপালকে নিয়ে আসতে পারে নাই। সে কারণে তার কাজ আমাদের করতে হচ্ছে। আমাদের পক্ষে এসব পুরুষদের সরিয়ে জায়গা করা সম্ভব নয়।

২৪। সুতারাং মুসা তাদের [ মেষপালকে ] পানি পান করালো ; অতঃপর সে ছায়াতে ফিরে গিয়ে বললো , " হে আমার প্রভু ! তোমার যে কোন অনুগ্রহের জন্য আমি প্রকৃতই [ ভীষণভাবে ] কাঙ্গাল। " ৩৩৫২

৩৩৫২। কুমারীদ্বয় কৃতজ্ঞদৃষ্টি মুসার প্রতি নিক্ষেপ করে ওষ্ঠে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে প্রস্থান করলো। তাদের সেই দৃষ্টি , হাসি মুসার হৃদয়ে কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো ? মুসা তাঁর তৃষ্ণা নিবারণ করে গাছের ছায়াতে বসে আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ দিলেন। কারণ সুন্দরী কুমারী তরুণীর হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা তাঁকে প্রশান্তি এনে দিয়েছিলো। যদিও মুসা সে সময়ে ছিলেন একজন গৃহহীন, ভবঘুরে, কিন্তু তাঁর অশান্ত হৃদয় কারও কোমল স্পর্শের জন্য, সহানুভূতির জন্য হয়ে উঠেছিলো উম্মুখ। হৃদয়ের দিক থেকে এবং বিত্তের দিক থেকে তিনি সে সময়ে ছিলেন প্রায় ভিক্ষুকের সমকক্ষ। সুতারাং কুমারীদ্বয়ের হাসি ও কৃতজ্ঞতা তার কাছে মনে হয়েছিলো অনেক পাওয়া, এবং তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। মুসার মনে হয়তো বা স্বপ্ন জেগে থাকবে, স্বচ্ছল বৃদ্ধ ব্যক্তি, বিশাল পশুপাল, সর্বপরি যার সুন্দরী নম্র কন্যাদ্বয় আছে, যেখানে সুখের এবং শান্তির কোনও অভাব নাই। যদিও তিনি ধারণা করেছিলেন যে তার মত ভিক্ষুকের পক্ষে এ স্বপ্ন বাতুলতা , সম্ভবতঃ তিনি আর কখনও তাদের দেখবেন না , কিন্তু এসব বাস্তব সত্য তাঁর তরুণ হৃদয়ের আবেগকে,স্বপ্নকে প্রতিহত করতে পারে নাই। হয়তো বা তিনি কল্পনায় স্বচ্ছল বৃদ্ধের সংসারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে পেয়েছিলেন, যে কারণে তিনি বলেছিলেন, " তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবে আমি তার কাঙ্গাল।" অবশ্য আল্লাহ্‌ তাঁর জন্য চরম বিস্ময় প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।
২৫। তৎপর [তরুণীদ্বয়ের ] একজন লজ্জ্বা-জড়িত চরণে তাঁর নিকট ফিরে এলো। সে বলেছিলো, " আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করেছেন; আমাদের [ মেষপালকে ] আমাদের পক্ষ থেকে পানি পান করানোর পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য ৩৩৫৩।" সুতারাং যখন সে [ মুসা ] তার নিকট এসে সকল বৃত্তান্ত বর্ণনা করলো, সে বললো, " ভয় পেয়ো না; তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছ।" ৩৩৫৪

৩৩৫৩। মুসা যখন সবেমাত্র বিশ্রাম নিচ্ছিলেন , সে সময়ে কুমারীদ্বয়ের একজন লজ্জাবনত চরণে মুসার নিকট আগমন করলেন এবং বিণীতভাবে বললেন : " আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমার পিতা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য এবং পারিশ্রমিক দেবার জন্য ডেকেছেন।"

৩৩৫৪। হযরত মুসা এই আমন্ত্রণকে সুস্বাগত জানালেন - বিশেষভাবে আমন্ত্রণের র্বাতা যিনি বহন করে এনেছিলেন। হযরত মুসার সে সময়কার অবস্থার তুলনায় এর থেকে সুখবর আর কি বা হতে পারে ? মুসা বৃদ্ধ লোকটির আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলেন। নিমন্ত্রণ কর্তা ছিলেন সমৃদ্ধ এবং এক সুশৃঙ্খল সুখী পরিবারের মালিক। পরিবারের সকল সদস্য ও সদস্যারা পরস্পর পরস্পরের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের পরস্পরের প্রতি ছিলো বিশ্বাস ও আনুগত্য। সুতারাং তারা যখন নব আগুন্তকের সম্বন্ধে বর্ণনা করেছিলো, তাদের বর্ণনা শুনে তাদের পিতা মুসা সম্বন্ধে পূর্বেই ভালো ধারণা পোষণ করেন এবং তাঁকে তাদের গৃহে সাদর অভ্যর্থনা করেন। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের অগম্য। হয়তো নিমন্ত্রণ পাওয়ার পরে মুসার জগৎ রঙ্গীন স্বপ্নে ভরে যায়। কন্যাদ্বয়ের পিতাকে তিনি মহৎভাবে নিজ হৃদয়ে অঙ্কিত করতে থাকেন এবং কন্যাদ্বয়কে দেবীর ন্যায় হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। এ সমস্তই আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা। ফলে বৃদ্ধ পিতা ও মুসা দেখা হওয়া মাত্র তৎক্ষণাত বন্ধুতে পরিণত হয়ে যায়। মুসা তাঁকে তাঁর জীবন কাহিনী বিবৃত করেন - তিনি কে ছিলেন, কিভাবে তিনি এখানে এলেন, কি পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জন্মভূমি মিশর ত্যাগে বাধ্য হন - তার সকল দুর্ভাগ্যের পূর্ণ বিবরণ তিনি বৃদ্ধ লোককে বর্ণনা করেন। সম্ভবতঃ বৃদ্ধের সমগ্র পরিবার এই কাহিনী শ্রবণে অংশগ্রহণ করে। অবশ্যই সেখানে বৃদ্ধের কন্যাদ্বয়ও উপস্থিত ছিলো। আমরা কল্পনা করতে পারি এই সুঠাম সুদর্শন যুবকের দুঃসাহসিক অভিযাত্রার কাহিনী শুনতে শুনতে তরুণীদ্বয়ের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো। চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে যাচ্ছিল এবং তাদের হৃদয় এই যুবকের জন্য সশ্রদ্ধ ভক্তি ও অনুকম্পাতে ভরে যাচ্ছিল। সম্ভবতঃ যে তরুণীটি তাঁকে সঙ্গে করে গৃহে নিয়ে এসেছিলো তাঁর হৃদয়ে এই যুবকের জন্য পূর্বরাগের মৃদু ছোঁয়াতে ভরে যাচ্ছিল।

মোট কথা সমগ্র পরিবার সাদর অভ্যর্থনা দ্বারা মুসাকে তাদের পরিবারে গ্রহণ করে। মুসা সমগ্র পরিবারের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হন। ফলে পরিবারের প্রধান বৃদ্ধ ব্যক্তিটি মুসাকে তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন যে, মুসা এখানে সম্পূর্ণ নিরাপদ। বৃদ্ধ পরিবার প্রধান মুসাকে আরও বলেন যে, " অত্যাচারী জালিমদের মাঝে কে বাস করতে চায় ? এটা খুব ভালো যে তুমি জালিমদের কবল থেকে বেঁচে গেছ।" বৃদ্ধের জীবনের বহু অভিজ্ঞতাই তাকে এই সিদ্ধান্তে আসতে সাহায্য করে।

২৬। যুবতীদের একজন বলেছিলো, " হে আমার [ প্রিয় ] পিতা ! তুমি তাকে মজুর হিসেবে নিয়োগ কর ৩৩৫৫। কারণ নিয়োগ করার জন্য তোমার জন্য উত্তম হবে সেই [ ব্যক্তি ] সে শক্তিশালী , বিশ্বস্ত "৩৩৫৬।

৩৩৫৫। এভাবেই গল্প গুজবে সময় অতিক্রান্ত হয়। কিন্তু অতিথি তো আর দীর্ঘদিন থাকতে পারে না। কিন্তু তারা অনুভব করছিলো এরূপ নীতিবান, শক্তিশালী , বিশ্বস্ত ও মহৎ হৃদয়ের যুবক তাদের পরিবারের জন্য কত প্রয়োজন। তাদের সকলের মনেই অনুরিত হচ্ছিল যে, যদি তাকে চিরদিনের জন্য পরিবারের সদস্য করা যেতো। অবশেষে যে তরুণীটি তাঁর হৃদয়কে ইতিমধ্যেই মুসার প্রতি সমর্পন করে ফেলেছিলো , সে তার না বলা কথাটি অন্যভাবে প্রকাশ করে। সে বলে মুসাকে তো পশু চারণের জন্য মজুর হিসেবে নিযুক্ত করা যায়। কারণ তাদের পিতা বৃদ্ধ, তাদের পরিবারে শক্তিশালী পুরুষ অনুপস্থিত। সুতারাং এই শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত যুবক তাদের সে অভাব পূরণ করবে।

৩৩৫৬। "শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত " - হযরত মুসা পরিবারটির কাছে নিজেকে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত বলে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। আর এই বিশেষ গুণাবলী যা যে কোন তরুণীদের অত্যন্ত পছন্দনীয়।

২৭। সে মুসাকে বলেছিলো, " আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই, এই শর্তে যে, তুমি [ মোহার হিসেবে ] আট বৎসর আমার চাকুরী করবে ৩৩৫৭। আর যদি দশ বৎসর পূর্ণ করতে চাও তবে তা হবে তোমার পক্ষ থেকে [ অনুগ্রহ ]। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে সৎলোক হিসেবে পাবে। "

৩৩৫৭। বেশ কিছুদিন গত হয়েছে; মুসা পরিবারের মধ্যে, নিজস্ব স্থান করে নিয়েছেন তাঁর নিজস্ব গুণাবলী দ্বারা। এ সময়েই বৃদ্ধ পিতা বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। মুসা ছিলেন পলাতক, সুতারাং তাঁর পক্ষে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা সম্ভব নয়, বিশেষতঃ যখন ধন-সম্পদ ও স্থায়ী নিবাসী হিসেবে কন্যাপক্ষের অবস্থান মুসার বহু উর্দ্ধে। বৃদ্ধ পিতার প্রস্তাব ছিলো মুসা তার যে কোনও একটি কন্যাকে বিবাহ করতে পারে , বিনিময়ে, তাঁকে কমপক্ষে আট বছর তাঁর পশুচারণের কাজ করতে হবে। অবশ্য মুসা ইচ্ছা করলে দশ বছরও থাকতে পারে। কারণ মুসার কন্যার পিতাকে কোনও যৌতুক দেবার ক্ষমতা ছিলো না। সুতারাং যৌতুকের পরিবর্তে এই সময় পর্যন্ত কাজ করে যাওয়া তাঁর জন্য যথেষ্ট হবে। অবশ্য কোন কন্যাটিকে মুসা পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ করবেন, তা তরুণ হৃদয় দুটি আল্লাহ্‌কে সাক্ষী হিসেবে আবেদন করলেন। বৃদ্ধ পিতা জামাতা হিসেবে মুসার যোগ্যতা জানতেন। আর এও জানতেন যে মুসা অত্যন্ত বিশ্বস্ত , কখনও কথার বরখেলাপ হবে না। সুতারাং তিনি মুসাকে আস্বস্ত করলেন যে, তিনি মনিব হিসেবে মুসার প্রতি কঠোর হবেন না এবং মুসার অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করবেন না। মুসার অনুপোযোগী কোনও কাজের অনুরোধ করবেন না। এ ভাবেই মুসার নূতন জীবন শুরু হয়। এ হচ্ছে মুসার স্বল্পকালীন " শিক্ষানবীশ কাল।" রাজকীয় জীবন থেকে সাধারণ গৃহী জীবনে উত্তোরণের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন।

২৮। মুসা বলেছিলো, " আমার ও আপনার মধ্যে এই [ চুক্তি ] রইল। এই দুটি মেয়াদের যে কোনটি আমি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকবে না। আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি আল্লাহ্‌ তার সাক্ষী ৩৩৫৮।"

৩৩৫৮। পিতৃতন্ত্র সমাজে কন্যার পিতাকে যৌতুক প্রদান করা খুব একটা নূতন বা অভিনব কিছু নয়। তবে মুসাকে গৃহী করার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানুষকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা হচ্ছে :

১) যিনি আল্লাহ্‌র ভবিষ্যতে নবী হবেন, তাকেও সাধারণ মানুষের মত দৈনন্দিক জীবনের উত্থান পতনের মাধ্যমে, আবেগ অনুভূতি অনুভবের মাঝে জীবনের পথকে অতিক্রম করতে হয়। তবে সাধারণ লোকদের থেকে তাঁর পার্থক্য হবে তিনি জীবনের এই বন্ধুর পথ অতিক্রম করেন সৌন্দর্যমন্ডিত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাবে , যা সাধারণ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়।

২) বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপিত হয় , দৈহিক ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত দেহাতীত ভালোবাসাতে রূপান্তরিত হয়। এ ভাবেই আধ্যাত্মিক ভালোবাসার সন্ধান পাওয়া যায় যা মুসার জন্য অপেক্ষা করছিলো। মুসার জন্য ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছিলো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক জগতের মুক্তি ও সম্মান। এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে নারীর ভালোবাসা কোনও প্রলোভনের ফাঁদ নয়, নারীকে সাধারণত যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়। নারী হতে পারে পুরুষের সহকর্মী, যে তাঁর সহমর্মিতায় ভালোবাসাতে স্বামীকে নির্দ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে, ঠিক যেমনটি আমাদের রসুলের [ সা ] জীবনে ছিলো বিবি খাদিজার ভূমিকা। নারীর এই ভূমিকা মুসার জীবনে নবুয়ত পাওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে প্রয়োজন ছিলো। পৃথিবীতে যে কোন মহৎ ও কল্যাণকর কার্য নারী পুরুষের সম্মিলীত প্রয়াসেই করা সম্ভব।

এই বার্তাকেই কবি নজরুল এ ভাবে ব্যক্ত করেছেন,

" বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্দ্ধেক তার সৃজিয়াছে নারী, অর্দ্ধেক তার নর। "

আল্লাহ্‌র নবীদের জীবনীর মাধ্যমে নারীর এই ভূমিকাকেই তুলে ধরা হয়েছে। যারা ধর্মের নামে নারীকে পৃথিবীর কর্মশালা থেকে বিতাড়িত করে বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করতে চায় তারা স্রষ্টার এই অমোঘ নিয়মকেই অস্বীকার করে থাকে

রুকু - ৪

২৯। এখন মুসা যখন তার মেয়াদকাল পূর্ণ করলো সে সপরিবারে যাত্রা শুরু করলো ৩৩৫৯। সে তূর পর্বতের দিক থেকে এক আগুন দেখতে পেলো। সে তাঁর পরিবারকে বলেছিলো , " তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখছি, আমি আশা করি সেখান থেকে তোমাদের জন্য [ পথের ] খবর আনতে পারবো কিংবা একখন্ড জ্বলন্ত কাষ্ঠখন্ড আনতে পারবো যাতে তোমরা নিজেদের উষ্ণ করতে পার ৩৩৬০।"

৩৩৫৯। এতক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে মরুভূমির মাঝে মুসার বিভিন্ন ব্যক্তির সংস্পর্শে সামাজিক জীবন যাত্রা। এখন তাঁর মহত্তর ও বৃহত্তর মর্যদার জন্য প্রস্তুতি কাজ সম্পন্ন হয়েছে , এখন তিনি ঐশ্বরিক দায়িত্বের দারপ্রান্তে এরই প্রেক্ষাপটে এই আয়াতটি অবতীর্ণ। এই আয়াতকে তুলনা করা চলে [ ২৭ : ৭-১৪ ] আয়াতসমূহের সাথে।

কিন্তু সেখানের প্রেক্ষাপট ছিলো আলাদা যা পূর্ববর্তী আয়াত সমূহের টিকাতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে - এখানে তা আর পুণরাবৃত্তি করা হলো না।

৩৩৬০। এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে সুখী পরিবারের প্রধান হিসেবে মুসার, পরিবারের সুখের জন্য চিন্তা ভাবনা, কি ভাবে নবুয়তের দায়িত্বের জন্য রূপান্তরিত হয়ে যায়।

৩০। কিন্তু যখন সে [ আগুনের ] কাছে এলো, তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বের পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের মধ্য থেকে আওয়াজ শোনা গেলো : " হে মুসা ! আমিই আল্লাহ্‌ , জগতসমূহের প্রভু।" ৩৩৬১

৩৩৬১। এই বৃক্ষের বর্ণনা আছে [ ২৭ : ৮ ] আয়াতে এবং টিকা ৩২৪৫। বাইবেলে এ বৃক্ষের বর্ণনা আছে ,Bush burning but not consumed" [ Exod iii2 ] হিসেবে।

৩১। " এখন তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর।" কিন্তু যখন সে দেখলো তা [ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে] সর্পের ন্যায় নড়াচড়া করছে, সে [ভয়ে] পিছিয়ে এলো এবং আর ফিরে তাকালো না। আহবান এলোঃ '' হে মুসা; এগিয়ে এসো, ভয় করো না। কারণ যারা নিরাপত্তা লাভ করে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। ৩৩৬২

৩৩৬২। এই আয়াতটির সাধারণ অর্থ এই দাড়ায় যে, আল্লাহ্‌ মুসাকে বলেছেনঃ " হে মুসা তুমি ভয় পেয়ো না, এটা তোমার জন্য সাপ নয়, ফেরাউনের জন্য সাপ , তুমি নিরাপদ। " কিন্তু এই বাক্যটি গভীর অর্থবোধক। আল্লাহ্‌ মুসাকে উচ্চতর মর্যদাসম্পন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত করবেন, আল্লাহ্‌র নবী হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেয়া হবে। তাঁকে মিশরবাসীদের ঘৃণা ও প্রতারণার কৌশলকে মোকাবিলা করতে হবে। সুতারাং মুসাকে সে জন্য ঈমানের নিরাপত্তা দান করা হয়েছে। জীবনের সকল বিপদ -বিপর্যয়ের মাঝে আল্লাহ্‌ হবেন তাঁর পথ প্রদর্শক তাঁর রক্ষক। কারণ তিনি এখন আল্লাহ্‌র কাজে, আল্লাহ্‌র সেবার জন্য নিবেদিত।

৩২। " তোমার হাত বগলে রাখ, এবং ইহা শুভ্র সমুজ্জল রূপে বের হয়ে আসবে [ক্ষতি ছাড়াই ] ; এবং ভয় দূর করার জন্য তোমার হাত দুটি নিজের দুপাশে চেপে ধর ৩৩৬৩। এই দুটি তোমার প্রভুর প্রদত্ত প্রমাণ; ফেরাঊন ও তার পরিষদ বর্গের জন্য। প্রকৃতই তারা এক বিদ্রোহী ও দুষ্ট সম্প্রদায়।"

৩৩৬৩। " হস্তদ্বয় নিজের দুপাশে চেপে ধর " - অর্থাৎ নিজের বক্ষের উপরে স্থাপন করা। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ মুসাকে বলেছেন যে, ভয় পেলে হস্তদ্বয় নিজের দিকে অর্থাৎ বুকের দিকে টেনে আনতে। এ যেনো ঠিক পাখী যে ভাবে উড়ন্ত অবস্থা থেকে তার ডানা নিজের দিকে টেনে আনে। যখন পাখী ওড়ে বা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়, তখন তার ডানা বিস্তৃত থাকে। কিন্তু যখন পাখী নির্ভয়ে শান্তিতে থাকে, তখন তার ডানা গুটানো থাকে দুপাশে - এটা হচ্ছে পাখীর মনের শান্তির প্রতীক, নিরাপত্তার প্রতীক। দেখুন আয়াত [ ২০-২২ ]
৩৩। সে বলেছিলো " হে আমার প্রভু ; আমি উহাদের একজন মানুষকে হত্যা করেছি। ফলে আমি আশংকা করছি ওরা আমাকে হত্যা করবে ৩৩৬৪।

৩৩৬৪। আল্লাহ্‌ মুসাকে শুধুমাত্র লাঠিকে সাপে রূপান্তর হওয়ার ফলে যে ভয়, তাই থেকে আস্বস্ত করেন নাই, তিনি তাঁকে নূতন অপরিচিত ও পবিত্র পরিবেশের প্রভাব, তাঁর ভয় থেকেও আশ্বস্ত করেন। মুসার হৃদয়কে আল্লাহ্‌ তাঁর নিরাপত্তা দানে শক্তিশালী ও আশ্বস্ত করেন। কিন্তু নূতন দায়িত্ব লাভে মুসা ছিলো ভীত , তাঁর নিকট ভবিষ্যত ছিলো অস্পষ্ট। কারণ তাঁর দায়িত্ব ছিলো ফেরাউনের মুখোমুখি হওয়া। ফেরাউনের লোকদের হত্যার অপরাধে ফেরাউন তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এরূপ পরিস্থিতিতে আল্লাহ্‌ মুসাকে ফেরাউনের নিকট যেতে আদেশ দিলেন এবং তাঁকে ও তাঁর পরিষদবর্গকে তিরষ্কার করতে হুকুম দিলেন। মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষের দুর্বলতা থাকে। মুসারও তাঁর ভয় ও দুর্বলতা আল্লাহ্‌র নিকট নিবেদন করলেন, এবং লোকবলের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ্‌র সাহায্য অদৃশ্যলোক থেকে আগত হয় - যা অত্যন্ত শক্তিশালী ও তুলনা হীন। তবুও মানবিক দুর্বলতার কারণে মুসা এরূপ সাহায্য বা লোকবলের জন্য প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ্‌ তা তৎক্ষণাত মঞ্জুর করেন। আল্লাহ্‌ মুসার ভাই হারুনকে মুসার সাহায্যের জন্য নিয়োজিত করেন।

৩৪। " আমার ভাই হারুন আমার অপেক্ষা বাকপটু। সুতরাং সাহায্যকারী হিসেবে তাকে আমার সাথে পাঠাও ,আমাকে সমর্থন [ও শক্তিশালী ] করার জন্য। কেননা আশংকা করি যে, ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।"

৩৫। আল্লাহ বলেছিলেন," আমি তোমার ভ্রাতার দ্বারা তোমার হাতকে শক্তিশালী করবো এবং তোমাদের উভয়কে কর্তৃত্ব দান করবো যেনো, ফেরাউনের লোকেরা তোমাদের স্পর্শ করতে সক্ষম না হয় ৩৩৬৫। তোমরা দুজনে এবং তোমাদের অনুসারীরা - তোমরা সকলে আমার নিদর্শনের সাহায্যে জয়লাভ করবে ৩৩৬৬।"

৩৩৬৫। "তোমাদের স্পর্শ করতে সক্ষম হবে না" আল্লাহ্‌ মুসাকে যে অত্যাশ্চার্য নিদর্শন সমূহ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন , তাতে নিকটবর্তী হয়ে কেউ তাঁর ক্ষতি করতে পারবে না।

৩৩৬৬। এই লাইনটি সার্বজনীন, সকলের উদ্দেশ্যে, যারা সাধারণভাবে আল্লাহ্‌র অনুসারী তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে শুধু মুসা ও হারুণই নয়, যারাই আল্লাহ্‌র অনুসারী তারাই আল্লাহ্‌র 'নিদর্শনের' শক্তিতে শক্তিশালী হবে। নবী রসুলেরা অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে পারেন। এখানে বলা হয়েছে যারা আন্তরিকভাবে নবী রসুলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সামান্য পরিমাণে হলেও তারাও সেরূপ ক্ষমতা প্রাপ্ত হবে জালেমদের উপরে। অলৌকিক ঘটনা মানুষের মনে প্রচন্ড প্রভাব ফেলতে পারে সত্য। কিন্তু আল্লাহ্‌র ক্ষমতার সেটাই সর্বোচ্চ স্বাক্ষর নয়। আল্লাহ্‌র ক্ষমতার সাক্ষর আমাদের চারিপাশেই ছড়ানো আছে।

৩৬। মুসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের নিকট ঊপস্থিত হলো তারা বলেছিলো " এটা মিথ্যা যাদু ব্যতীত অন্য কিছু নয় ৩৩৬৭। আমাদের পূর্ব পুরুষদের কালে কখনও এরূপ কথা শুনি নাই। " ৩৩৬৮।

৩৩৬৭। হযরত মুসার অলৌকিক ক্রিয়াকর্ম প্রদর্শন করে ফেরাউন ও তার সভাষদবর্গ বললো, " ইহা তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র।" আর ঠিক এই ভয়-ই মুসা করেছিলেন যে, তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা হবে, এবং প্রকৃত সত্যকে প্রত্যাখান করা হবে। সে যুগে এবং বর্তমান কালেও পৃথিবীতে সাধারণ মানুষের মনস্ততঃকে এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। নবী রসুলদের যুগ থেকে, গ্যালেলিওর প্রচারিত বিজ্ঞানের সত্যও মানুষ মিথ্যা বলে প্রচার করেছিলো। সর্বোচ্চ ও প্রকৃত সত্যকে তারাই মিথ্যা বলে প্রচার করে থাকে যারা তাদের জীবনে মিথ্যা , প্রতারণা ও যাদুবিদ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে সাধারণ লোকদের প্রতারণা করার জন্য। ফেরাউনের লোকজনও ছিলো এদের দলেরই।

৩৩৬৮। হযরত মুসা যখন এক আল্লাহ্‌র উপাসনার জন্য ফেরাউন ও তাঁর সভাষদদের বললেন, তখন ফেরাউনের লোকজন এই উক্তি করেছিলো।

৩৭। মুসা বলেছিলো, " আমার প্রভু সবচেয়ে ভালো জানেন কে তাঁর নিকট থেকে পথ নির্দেশ নিয়ে এসেছে এবং পরলোকে কার পরিণাম শুভ হবে নিশ্চয়ই পাপীরা কখনও সফলকাম হবে না।" ৩৩৬৯।


৩৩৬৯। "পাপীরা সফলকাম হবে না " এই উক্তিটি আছে আয়াত [ ৬ : ১৫ ]। যারা নির্বোধের ন্যায় প্রকৃত সত্যকে প্রত্যাখান করে, পূর্বপুরুষদের দোহাই দেয় তাদের জন্য যুক্তি তর্ক বৃথা। তাই মুসা এ ক্ষেত্রে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র নিকট আবেদন করেছিলেন এবং জালিমদের পরিণতি সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। পরলোকের শেষ পরিণতি সম্বন্ধে বিশ্বাস করতে হলে আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমানের প্রয়োজন। কিন্তু যাদের আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস নাই তারা অবশ্যই পূর্বপুরুষদের মিথ্যা এবং পাপকেই গ্রহণ করবে - যা তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।ফলে তাদের জাতীয় উন্নতি বাঁধাপ্রাপ্ত হবে এবং পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে তারা হয় অবহেলিত ও অপমানিত ( যেমন বাংলাদেশ)।



 

৩৮। ফেরাউন বলেছিলো ," হে পরিষদ বর্গ ! আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য তোমাদের জন্য আছে বলে জানি না। ৩৩৭০। সুতরাং ওহে হামান! তুমি আমার জন্য (ভাটিতে) ইট পোড়াও এবং সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর, হয়তো আমি ইহাতে আরোহন করে মুসার উপাস্যের নিকট যেতে পারবো। কিন্তু আমার ধারণায় আমি মনে করি (মুসা) একজন মিথ্যাবাদী।" ৩৩৭১

৩৩৭০। ফেরাউন নিজেকে ঈশ্বর বলে ঘোষণা করেছিলো বহু ঈশ্বরের একজন নয় , একমাত্র ঈশ্বর বলে। দেখুন সূরা [ ৭৯ : ২৪ ] আয়াতে; ফেরাউন ঘোষণা করেছিলো ,"I am the Lord most High." দম্ভ ও অহংকার তাকে এতটাই মোহাবিষ্ট এবং বিপথে চালিত করেছিলো যে, সে কিছুতেই বুঝতে পারছিলো না কেন লোকে তাকে ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করবে।

৩৩৭১। মওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের মতে ফেরাউনের এই বাক্যটি ছিলো বিদ্রূপাত্মক। হযরত মুসার আল্লাহকে ব্যঙ্গ করার জন্য সে এরূপ কথা উচ্চারণ করে। তবে অনেক তফসীরকার ফেরাউনের বাক্যটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং কল্পনা করেন যে ফেরাউন সত্য সত্যই সুউচ্চ টাওয়ার তৈরী করতে চেয়েছিলো আকাশে পৌঁছানোর জন্য।

৩৯। এবং পৃথিবীতে ফেরাউন ও তাঁর দল-বল ছিলো কোন কারণ ছাড়াই উদ্ধত এবং অন্যায়কারী। তারা মনে করতো যে তারা আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করবে না। ৩৩৭২

৩৩৭২। " তারা আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করবে না।" - ফেরাউন ও তার বাহিনী পরলোকের জগত সম্বন্ধে কোনও বিশ্বাসই করতো না। তাদের অহংকার ও দম্ভ এই সহজ সত্যকে অনুধাবনে অক্ষম করে যে, প্রতিটি কাজেরই প্রতিফল আছে। ভালো কাজের পরিণাম ভালো এবং মন্দ কাজের পরিণাম মন্দ। এই ভালো ও মন্দ কাজের ফলাফল পরলোকে আমাদের আল্লাহ্‌র নিকট থেকে গ্রহণ করতে হবে। একমাত্র পরম করুণাময়ের করুণাতেই মন্দ পরিণাম থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

৪০। সুতারাং আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম এবং আমি তাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম ৩৩৭৩। এখন দেখো ; যারা পাপ করে তাদের শেষ পরিণতি কি ঘটে।

৩৩৭৩। দেখুন সূরা [ ৭ : ১৩০ - ১৩৬ ] আয়াত যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে ফেরাউনের বিভিন্ন ঘটনা এবং বলা হয়েছে শেষ পর্যন্ত তাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়া হয়। এখানেও সমুদ্রে নিক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। ফেরাউন ও তার বাহিনী হচ্ছে সেই রকম লোক যারা শুধু ধবংস ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। ফলে নিজেরাও ধ্বংস হয়ে যায়। সুখ বা শান্তির জন্য তারা কোনও কিছু করতে অক্ষম কারণ তাদের আত্মার মাঝে বিরাজ করে প্রচন্ড দম্ভ ও অহংকার। এই দম্ভ ও অহংকারের ফলে তাদের আত্মায় জন্ম নেয় হিংসা, ঘৃণা , বিদ্বেষ ও আক্রোশ। আমাদের চারিপাশে যাদের চরিত্রে দম্ভ, অহংকার , হিংসা , দ্বেষ , আক্রোশে পরিপূর্ণ তারা নিজেরাও শান্তি পায় না , তাদের চারিপাশে যারা অবস্থান করে তাদেরও শান্তি হরণ করে নেয়।

৪১। এবং আমি তো তাদের জাহান্নামের দিকে আহ্বান করার জন্য নেতা করেছিলাম। এবং শেষ বিচারের দিনে তারা কোন সাহায্য লাভ করবে না।

৪২। এই পৃথিবীর জীবনে তাদের পশ্চাদ্‌ধাবন করেছিলো আমার অভিসম্পাত্‌ ৩৩৭৪। এবং শেষ বিচারের দিনে তারা হবে অতিশয় ঘৃণিতদের অন্যতম।

৩৩৭৪। ফেরাউনের ও তার পরিষদবর্গকে আল্লাহ্‌ দেশ ও জাতির নেতা করে দিয়েছিলেন , কিন্তু এই ভ্রান্ত নেতারা জাতিকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করতো। জাহান্নাম কথাটি এখানে রূপক অর্থে বব্যহৃত। এর অর্থ হচ্ছে পাপের দিকে আহ্বান করতো , যার পরিণাম ছিলো জাহান্নাম। এসব নেতারা যখন ক্ষমতায় আসীন থাকে, মোসাহেব এবং সুযোগ সন্ধানীরা তাদের গুণকীর্তনে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে , যার ফলে তারা দম্ভ ও অহংকারে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। এসবের ফলে যখন তাদের পতন শুরু হয়, তারা অসম্মান ও অপমানের সম্মুখীন হয় এই পৃথিবীর জীবনেই। জীবিতকালে যদি কারও কুকীর্তি প্রকাশ নাও হয়, যদি অসম্মানিত নাও হয়, অনেক সময়েই দেখা যায় মৃত্যুর পরে সত্য প্রকাশ পায়। ফলে ভবিষ্যত প্রজন্মের লোকেরা তার নামে অভিসম্পাত করে, কারণ তাদের কুকীর্তি; অন্যায় -অবিচার , লোভ-লালসা ও পাপের ফলশ্রুতি হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের দুঃখ দুর্দ্দশার কারণ। এসব পাপীরা আল্লাহ্‌র দুনিয়াকে নিকৃষ্ট স্থানে পরিণত করার প্রয়াস পায়। তবে এখানেই তাদের পাপের শেষ পরিণতি নয়। তাদের শেষ পরিণতি হচ্ছে পরলোকের ভয়াবহ শাস্তি। সেখানেই তাদের কাজের প্রকৃত রূপকে প্রকাশ করা হবে এবং মূল্যায়ন করা হবে। ফলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ অত্যাচারী শক্তিশালী ব্যক্তি সেখানে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরে অবস্থান করবে।

রুকু - ৫

৪৩। পূর্ববর্তী বহু প্রজন্মকে ধবংস করার পরে আমি মুসাকে কিতাব দান করেছিলাম মানুষের জন্য অন্তর্দৃষ্টি [ বা জ্ঞান বর্তিকা ] এবং পথনির্দ্দেশ ও দয়া স্বরূপ ; যেনো তারা উপদেশ গ্রহণ করে ৩৩৭৫।

৩৩৭৫। অত্যাচারী ফেরাউন এবং ফেরাউনের ন্যায় বহু অত্যাচারীকে ধ্বংসের পরে আল্লাহ্‌ পৃথিবীর মানুষের জন্য হযরত মুসার মাধ্যমে নূতন ভাবে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেন - মুসার যুগে তার নিকট প্রেরিত কিতাবে। মানবতার ইতিহাস আবার নূতন ভাবে শুরু হয় - এ যেনো নূতন স্লেটে প্রথম আঁচরের মত। মুসার কিতাব হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাদেশ যা তিনটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখার জন্য আমাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা হয়েছে। এই কিতাব হচ্ছে :

১) জ্ঞান বর্তিকা বা জ্ঞানের প্রদীপ বা অন্তর্দৃষ্টি বা দিব্যজ্ঞান ,যা মানুষের বিবেককে জাগরিত করে বা আলোকিত করে।

২) পথ-নির্দ্দেশ , যা সংসার জীবনে এই পৃথিবীতে সঠিক পথে চলার নির্দ্দেশ দান করে থাকে। মানুষকে পরিষ্কার ভাষায় পাপ ও পূণ্যের পথের নির্দ্দেশ দান করা হয়েছে, যেনো সে ভুল করে পাপের পথে না যায়।

৩) আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও করুণা স্বরূপ। কারণ আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথে চলার ফলেই মানব আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও করুণা লাভে সক্ষম হবে। সূরা [ ৬ : ৯১] আয়াতে জ্ঞান বর্তিকা ও পথ নির্দ্দেশের কথা বলা হয়েছে , হযরত মুসার প্রত্যাদেশের প্রসঙ্গে এবং [ ৬ : ১৫৪ ] আয়াতে পথ-নির্দ্দেশ ও করুণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ঐ একই প্রসঙ্গে। এই আয়াতে জ্ঞানের প্রদীপ বা দিব্যজ্ঞান , পথ নির্দ্দেশ, আল্লাহ্‌র করুণা ও ক্ষমা , তিনটিকে এক সুত্রে গ্রথিত করা হয়েছে। এখানে 'Nur' শব্দটির স্থলে 'Basair' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

৪৪। এবং [ হে মুহম্মদ (সা) ] ; তুমি তো তখন [ তূর পাহাড়ের ] পশ্চিম দিকে উপস্থিত ছিলে না , যখন আমি মুসাকে নবুয়তের জন্য নিয়োজিত করেছিলাম ৩৩৭৬। এবং তুমি তো [ ঘটনার ] প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না।

৩৩৭৬। সিনাই উপদ্বীপ আরবের উত্তরপশ্চিম কোনে অবস্থিত। এখানে তুওয়া উপত্যকার পশ্চিম প্রান্তের উল্লেখ করা হয়েছে। তূর পাহাড় - যেখানে হযরত মুসা তার নবুয়তের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন, তুওয়া উপত্যকার পশ্চিমে অবস্থিত।
৪৫। কিন্তু আমি [ নূতন ] বহু মানব গোষ্ঠির আবির্ভাব ঘটিয়েছিলাম; তাদের উপর দিয়ে বহু সময় পার হয়ে গেছে ৩৩৭৭। আমার আয়াত সমূহ আবৃত্তি করার জন্য তুমি তো মাদিয়ানবাসীদের মধ্যেও ছিলে না। কিন্তু আমি অবশ্যই [ ওহীসহ ] রাসুল পাঠিয়ে এসেছি ৩৩৭৮।

৩৩৭৭। হযরত মুসা ও হযরত মুহম্মদ [সা] মাঝে বহু যুগ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে বহু মানবগোষ্ঠির উত্থান পতন ঘটেছে , কিন্তু তা সত্বেও অক্ষরজ্ঞানহীন নবী [ সা ] আল্লাহ্‌র প্রেরিত প্রত্যাদেশের মাধ্যমে সেই সব ঘটনার জ্ঞান লাভ করেন। যদি রসুল [ সা ] সেই সময়ে আরবে বাস করতেন তবুও তাঁর পক্ষে মাদয়ানবাসীদের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব ছিলো না। একমাত্র আল্লাহ্‌র পক্ষেই সম্ভব সময়ের ও দূরত্বের ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষের অজ্ঞানতা দূর করে তাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করা। কারণ আল্লাহ্‌ স্থান, কাল ও সময়ের উর্দ্ধে।

৩৩৭৮। যদিও রাসুল [ সা] মাদ্‌য়াইনবাসীদের মাঝে কখনও ছিলেন না এবং তাদের সম্বন্ধে জানার কোনও সুযোগই তাঁর ছিলো না , তবুও আল্লাহ্‌ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে রাসুলকে [ সা ] মাদ্‌য়ানবাসীদের মাঝে মুসার অবস্থানের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও বিবরণ অবগত করান। উম্মী নবীর পক্ষে এরূপ জ্ঞান লাভ করাই কি নিদর্শন নয় যে তিনি আল্লাহ্‌র প্রেরিত দূত ? তবুও কি লোকেরা বুঝবে না ?

৪৬। মুসাকে যখন আমি আহ্বান করেছিলাম, তখন তুমি তূর পর্বত পার্শ্বে ছিলে না। তথাপি ইহা তোমার প্রভুর নিকট থেকে দয়াস্বরূপ [ প্রেরণ করা হয়েছে ], যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সর্তক করতে পার; যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসে নাই ৩৩৭৯। [এ জন্য ] যেনো তারা উপদেশ গ্রহণ করে।

৩৩৭৯। এই সম্প্রদায় হচ্ছে কোরেশ সম্প্রদায়। এখানে বক্তব্য : আল্লাহ্‌ রাসুলকে [ সা ] সম্বোধন করে বলছেন, "যদিও তুমি প্রত্যক্ষ কর নাই যে, কিভাবে মুসাকে তূর পর্বতে নবুয়ত দান করা হয়েছিলো , কিন্তু তোমাকেও আমরা সেই অনুরূপ অভিজ্ঞতায় ধন্য করেছি। তোমাকে প্রেরণ করা হয়েছে কোরেশ সম্প্রদায়ের মাঝে, তাদের সর্তক করতে , তারা যেনো পাপ পরিহার করে এবং অনুতাপের মাধ্যমে এক আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আনে।

৪৭। [ যদি আমি তোমাকে কুরাইশদের নিকট প্রেরণ না করতাম ], তাহলে তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের কোন বিপদ ঘটলে তারা বলতো, " হে আমাদের প্রভু ! কেন তুমি আমাদের নিকট কোন রাসুল প্রেরণ করলে না ? করলে আমরা তোমার নিদর্শন সমূহ মেনে চলতাম এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের অন্তর্ভূক্ত হতাম। " ৩৩৮০

৩৩৮০। 'কৃতকার্য' অর্থাৎ মানুষ যা করে। "কৃতকার্যের জন্য তাদের কোন বিপদ হলে " - অর্থাৎ যে কোনও বিপদ ও বিপর্যয় মানুষেরই কৃত কর্মের ফল। কারণ মানুষের কর্ম দ্বারাই আল্লাহ্‌র হুকুম নিয়ন্ত্রিত হয়। যখন আমাদের নবীর আগমন ঘটলো ,যিনি পূর্ববর্তী সকল রসুলদের জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, যা তিনি লাভ করেছিলো স্বর্গীয় প্রত্যাদেশের মাধ্যমে, তাঁকে অস্বীকার করার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ ছিলো না। রসুলের [ সা] আগমনের পরে কারও এ কথা বলার কোনও সুযোগ থাকবে না , যে, " তুমি আমাদের নিকট কোন রাসুল প্রেরণ করলে না কেন? " তাদের পাপের দরুণ, তাদের কৃতকর্মের দরুণ যদি কোন বিপর্যয় তাদের উপরে নিপতিত হয়, তবে তারা আল্লাহ্‌কে দোষারোপ করতে পারবে না যে, তাদের পূর্বেই সর্তক করে দেয়া হয় নাই কেন।

৪৮। কিন্তু [ এখন ] যখন আমার নিকট থেকে তাদের নিকট সত্য এসেছে , তারা বলতে লাগলো , " মুসাকে যেরূপ দেয়া হয়েছিলো , তাঁকে সেরূপ [ নিদর্শন সমূহ ] দেয়া হলো না কেন ? ৩৩৮১।" পূর্বে মুসাকে যে [নিদর্শনসমূহ ] দেয়া হয়েছিলো তারা কি তা প্রত্যাখ্যান করে নাই ? তারা বলতে লাগলো, " দুই প্রকার যাদু [ যা ] একে অপরকে সমর্থন করে থাকে।" ৩৩৮২। এবং তারা বলে, " [ এরূপ ] সকলকেই আমরা প্রত্যাখান করি।"

৩৩৮১। কোরাণ অবতীর্ণ হয়েছিলো , যুগোপযোগী করে। মুসার যুগের থেকে হযরত মুহম্মদের [ সা ] যুগের মধ্যে সময়ের বহু ব্যবধান। কোরাণ যখন যুগের দাবী অনুযায়ী পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশকে পরিমার্জিত ভাবে অবতীর্ণ করা হলো , তখন কোরেশরা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো , কারণ তারা মুসার মত অলৌকিক ক্রিয়াকর্ম দর্শনে আগ্রহী ছিলো। আমাদের রসুলের [ সা ] মধ্যে বহু সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় যা হযরত মুসার মাঝে বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু হযরতের [ সা ] সময়কাল মুসার সয়মকাল থেকে আলাদা ছিলো, মুসার সময়কাল ছিলো যাদুবিদ্যার কাল - মানুষ যাদুর চমকপ্রদ প্রতারণাকে অলৌকিক ভেবে বিশ্বাস করতো। কিন্তু হযরতের [ সা ] সময়ে যাদুর কাল অতিক্রান্ত হয়েছে - মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী ও বিশ্বাস হয়েছে অনেক যুক্তিসঙ্গত ও বৈজ্ঞানিক ধারণায় বিশ্বাসী। সুতারাং মানুষের মানসিক অগ্রসরতার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে যুগের দাবী অনুযায়ী পরিমার্জিতরূপে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে প্রেরণ করা হয় - আর এই হচ্ছে আল্‌-কোরাণ ; যার বাণী , শিক্ষা ,পথের নির্দ্দেশ, আবেদন বিশ্বজনীন , যুগ, কাল অতিক্রান্ত। মুসাকে যেরূপ উজ্জ্বল হাত ও লাঠির মোজেজা দ্বারা শক্তিশালী করা হয়। আল্‌-কোরাণ হচ্ছে এ যুগের আল্লাহ্‌র প্রেরিত মোজেজা বা অলৌকিক ক্রিয়া কর্ম যা রসুলকে [সা] দান করা হয়। কোরাণ হচ্ছে, অন্ধকার যুগের প্রতিশোধক, ভবিষ্যত পথের নির্দ্দেশ। সে হিসেবে কোরাণ মুসার লাঠি ও সাদা হাত অপেক্ষা অধিক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ও ভিন্ন প্রকৃতির। কোরেশরা কখনও আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশে বিশ্বাস স্থাপন করতো না। যদিও তারা বলছে যে মুসার মত রসুল [ সা ] যদি অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন হতেন তবে তারা বিশ্বাস স্থাপন করতো, কিন্তু তা সত্য নয়। তখন তারা অন্য অজুহাত সৃষ্টি করতো। তারা তো শুধু ইহুদীদের সাথে পূর্বাহ্নে আপোষে চুক্তি করে অভিযোগগুলির উত্থাপন করে - প্রকৃত সত্য হচ্ছে মুসার অলৌকিক মোজেজা সম্বন্ধেও তাদের কোন বিশ্বাস ছিলো না।

৩৩৮২। মিশরবাসীরা হযরত মুসাকে যাদুকর আখ্যা দিয়েছিলো, কোরেশরা কোরাণের আবির্ভাবকেও যাদু আখ্যা দিয়েছিলো। যেহেতু কোরাণ হযরত মুসার নিকট আল্লাহ্‌র প্রেরিত প্রত্যাদেশকে সত্যায়ন করে, সেহেতু কোরায়েশরা আপত্তি উত্থাপন করে যে, হযরত মুসার কিতাব ও কোরাণ উভয়ে একে অপরকে সমর্থন করছে এবং ষড়যন্ত্রে সহযোগীতা করছে।

৪৯। বল, " তবে তোমরা আল্লাহ্‌র নিকট থেকে এমন এক কিতাব আন যা হবে এই উভয় [ তাওরাত ও কুর-আন ] কিতাব অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক, যেন আমি তা অনুসরণ করতে পারি। যদি তোমরা সত্যবাদী হও [তবে তা কর ]।"

৫০। কিন্তু যদি তারা তোমার কথা না শোনে ৩৩৮৩, তবে জেনে রাখ , তারা শুধু তাদের নিজ প্রবৃ্ত্তির অনুসরণ করে থাকে। আল্লাহ্‌র পথ-নির্দ্দেশ ত্যাগ করে যে তার নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তার থেকে বেশী পথভ্রষ্ট আর কে আছে ? যারা পাপে আসক্ত আল্লাহ্‌ তাদের পথ দেখান না।

৩৩৮৩। কোরেশদের প্রতি আল্লাহ্‌ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আহ্বান করেছেন যদি ক্ষমতা থাকে, তবে তারা কোরাণ বা তাওরাতের থেকে অধিক ভালো কিছু সৃষ্টি করুক। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশে পাপ ও পূণ্যের পার্থক্য, পার্থিব জীবন পরিচালনার সঠিক নির্দ্দেশ যে ভাবে দান করা হয়েছে, যে নৈতিক মূল্যবোধ সর্বযুগের সর্বকালের জন্য জীবন পথের পথ নির্দ্দেশনা হিসেবে বিবেচিত , তা সৃষ্টি করা কোনও মানব বা সম্প্রদায়ের জন্য সম্ভব নয়। সুতারাং কোরেশরা যে তা পারবে না সেটাই তো স্বাভাবিক। তাদের প্রত্যাখান ও অভিযোগ ছিলো বিদ্বেষ প্রসূত। তারা তো প্রকৃত পক্ষে সত্যকে জানতে চায় নাই - তারা অনুসরণ করে তাদের বিকৃত কামনা,বাসনা ও স্বার্থপরতার মানসিকতা । অনুসরণ করে, তাদের ক্ষমতা , স্বেচ্ছাচারিতা, একচ্ছত্র আধিপত্য। গরীবকে শোষণ ও তাদের অন্যায়-অত্যাচার ইত্যাদি যাতে কোনওরূপ বাধাগ্রস্থ না হয় সেটাই হচ্ছে কোরাণের শিক্ষাকে প্রত্যাখান করার মূল কারণ। যাদের মন এরূপ স্বার্থপরতা, স্বেচ্ছাচারিতায় পরিপূর্ণ তারা কিভাবে আল্লাহ্‌র হেদায়েতের আলো পেতে পারে ?

রুকু - ৬

৫১। আর আমি নিশ্চয়ই তাদের নিকট বারে বারে আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি, যেনো তারা উপদেশ গ্রহণ করে ৩৩৮৪।

৩৩৮৪। কোরাণ অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে কোরেশরা অভিযোগ করতো যে আল্লাহ্‌র বাণী তো হিব্‌রু ভাষাতে অবতীর্ণ হয়েছে, সুতারাং তাদের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু কোরাণের আগমনে তাদের সে অভিযোগের কোনও ভিত্তি রইল না। এখন কোরাণ বা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ তাদের নিজ মাতৃভাষাতে , তাদের গৃহদ্বারে, তাদের নিজ জাতির লোক এবং নিজ পরিবারের লোকের কাছে অবতীর্ণ। সুতারাং কোরাণের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে গ্রহণ করার কোন বাধা বা অভিযোগ থাকা উচিত নয়।

৫২। এর পূর্বে যাদের আমি কিতাব প্রেরণ করেছিলাম , তারা এই [ প্রত্যাদেশ ] বিশ্বাস করে।

৫৩। এবং ইহা তাদের নিকট আবৃত্তি করা হয়, তারা বলে, " আমরা ইহাতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম , নিশ্চয়ই ইহা আমাদের প্রভুর প্রেরিত সত্য। আমরা তো ইহার পূর্বেও মুসলমান [আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পনকারী ] ছিলাম।" ৩৩৮৫।

৩৩৮৫। কোরাণ যখন অবতীর্ণ হয়, কিছু সংখ্যক খৃষ্টান ও ইহুদী ছিলো যারা হযরত মুহম্মদের [সা ] প্রচারিত ইসলাম ধর্মকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলো। তারাঁ বুঝতে পেরেছিলো যে, ইসলাম ধর্ম এবং কোরাণের প্রত্যাদেশ হচ্ছে পূর্ববর্তী ঐশী প্রত্যাদেশ সমূহের যুক্তিসঙ্গত ধারাবাহিকতা। এটা কোনও নূতন ধর্ম নয়। সুতারাং তারা শুধু ইসলামকে অভিনন্দনই জানান নাই, তারা সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেন। এদের কথাই উপরের আয়াতে বলা হয়েছে , যারা বলেছিলেন , " আমরা ইহাতে ঈমান আনি, ইহা আমাদিগের প্রতিপালক হইতে আগত সত্য। আমরা তো পূর্বেও আত্মসমর্পনকারী ছিলাম।" আত্মসমর্পনকারী অর্থাৎ ইসলামে বিশ্বাসী। ইহুদীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সালাত [ রাঃ ] ও অন্যান্য এবং আবিসিনিয়ার কিছু খৃষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেন। এদের সম্বন্ধেই এই আয়াতে বলা হয়েছে।

তাঁরা সঠিকভাবেই দাবী করেছিলেন যে, তারা পূর্বেও মুসলিম ছিলেন। সে হিসেবে হযরত আদম , নূহ্‌, ইব্রাহীম, মুসা এবং যীশুখৃষ্ট সকলেই মুসলমান ছিলেন। যদিও এই আয়াতে এদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে ,কিন্তু এর আবেদন সার্বজনীন। এই আয়াতের বক্তব্য তখনও প্রযোজ্য ছিলো এখনও প্রযোজ্য আছে। কারণ তাওরাত ও ইঞ্জিলের যে শিক্ষা সে শিক্ষাও হচ্ছে ইসলাম। তবে সময়ের ব্যবধানে মানুষ তাওরাত ও ইঞ্জিলের শিক্ষাকে বিকৃত করে ফেলেছে। ফলে বর্তমানে যে গ্রন্থ আছে তা হযরত মুসা ও ঈসার গ্রন্থের প্রকৃত রূপ নয়। যদি কেউ প্রকৃত পক্ষেই তাওরাত ও ইঞ্জিলের শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে তবে সে অবশ্যই রসুলুল্লাহ্‌ [ সা ] ও তার নিকট প্রেরিত প্রত্যাদেশকে সনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

৫৪। তাদের দুবার পুরষ্কার দেয়া হবে ৩৩৮৬; এজন্য যে , তারা ধৈর্য্যশীল , তারা মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করে এবং আমি তাদের যা দিয়েছি তা থেকে [ দানে ] ব্যয় করে থাকে।

৩৩৮৬। উপরের আয়াতে যাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, এদের জন্য দ্বিবিধ পারিশ্রমিক আছে। প্রথমটির কারণ তারা পূর্বেও ইসলামে বিশ্বাসী ছিলো অর্থাৎ আত্মসমর্পনকারী ছিলো; কারণ তারা পূর্ববর্তী যে ধর্মীয় আইন আল্লাহ্‌ রাসুলুল্লাহ্‌র পূর্বে প্রেরণ করেছেন তা তারা আন্তরিকতার সাথে কায়মনোবাক্যে অনুসরণ করতো। দ্বিতীয়ত পরবর্তীতে রাসুল [সা ] যখন ইসলামের দাওয়াত দিলেন তারা তৎক্ষণাত তা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ রূপে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবং মুসলমান হয়েছিলেন। নব্য মুসলিম হিসেবে তাদেরও নির্যাতনের মুখে ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায়ের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সুতারাং ধর্মের জন্য আল্লাহ্‌র জন্য তারা যে কষ্ট সহ্য করেছেন সেই পূণ্যের ফলেও তারা পারিশ্রমিক পাবেন। এদের গুণাবলী সম্বন্ধে বলা হয়েছে এরা ১) ধৈর্য্যশীল, ২) ভালোর দ্বারা মন্দের মোকাবিলা করেন, ৩) আল্লাহ্‌র দেয়া রিয্‌ক থেকে দান করে থাকেন।

৫৫। এবং যখন তারা অন্তঃস্বার শূন্য কথা শোনে, তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, এবং বলে, " আমাদের কর্মফল আমাদের , তোমাদের কর্মফল তোমাদের ৩৩৮৭। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞ লোকদের [সংস্রব ] চাই না। "

৩৩৮৭। যারা মোমেন বান্দা তাঁরা কখনও ধর্ম সম্বন্ধে র্তক বির্তকে লিপ্ত হবেন না। যদি তারা কখনও এরূপ পরিবেশে ও পরিস্থিতিতে পড়েন তবে তাঁরা সে সব সঙ্গ ত্যাগ করবেন বিনয়ের সাথে। অবিশ্বাসীদের প্রতি তাঁদের বক্তব্য হবে, " আমরা আমাদের কাজের জন্য দায়বদ্ধ আর তোমরা তোমাদের কাজের জন্য দায়বদ্ধ। আমাদের তোমাদের প্রতি কোনও বিদ্বেষ নাই। আমরা তোমাদের মঙ্গল কামনা করি, সেই কারণে , আমরা যে ঐশ্বরিক জ্ঞান লাভ করেছি তা তোমাদের মঙ্গলার্থে তোমাদের জানাতে চাই। ঐশ্বরিক জ্ঞান লাভের পরে কেউ কি পারে পুণরায় অজ্ঞতার অন্ধকারে ফিরে যেতে ? "
৫৬। এ কথা সত্য যে, তুমি যাদের ভালোবাস তাদের প্রত্যেককে তুমি সুপথে চালিত করতে সক্ষম হবে না ৩৩৮৮। কিন্তু আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা করেন সুপথ প্রদর্শন করতে পারেন। কে সুপথ লাভ করবে তিনি তা উত্তম রূপে জানেন।

৩৩৮৮। হযরত মুহম্মদের [সা ] চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর পরে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত [সা ] এই চাচাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তিনিও হযরতকে [ সা ] বিপদে সাহায্যে এগিয়ে আসতেন এবং প্রতিটি আচরণে হযরতের [সা ] সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। স্বাভাবিকভাবেই হযরত [সা ] অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন যে তাঁর চাচা যেনো সত্য ধর্মে অর্থাৎ ইসলামে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেহত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর চাচা পিতৃপুরুষদের ধর্মে অনড়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। সুতারাং তাঁর মৃত্যুর পরে ,তার পরিণতির কথা চিন্তা করে স্বাভাবিকভাবে হযরত [সা] দুঃখে অভিভূত হয়ে পড়েন। এই ছিলো আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট। এরূপ ঘটনা সকলের জীবনেই ঘটতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে আমাদের দুঃখ করতে নিষেধ করা হয়েছে। যাদের আমরা ভালোবাসি, তারা সব সময়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী বা মতামত বা বিশ্বাস গ্রহণ নাও করতে পারে। আমরা তাদের বিচার করতে পারি না। আল্লাহ্‌ যাকে যে ভাবে খুশী পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখেন। একমাত্র আল্লাহ্‌-ই সকল অদৃশ্য খবরের মালিক। মানুষের অন্তরের খবরও আল্লাহ্‌ জ্ঞাত।

৫৭। তারা বলে, " আমরা যদি তোমার সাথে সৎপথ অনুসরণ করি, তাহলে, আমাদের দেশ থেকে উৎখাত করা হবে ৩৩৮৯। " আমি কি তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল প্রতিষ্ঠা করি নাই ; যেখানে আহারের জন্য আমার দেয়া সব রকম ফল উপহার স্বরূপ নিয়ে আসা হয় ? কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বুঝতে অক্ষম।

৩৩৮৯। কোন কোন কোরেশ বলতো যে, " আমরা ইসলামের মাঝে সত্যকে প্রত্যক্ষ করি , কিন্তু তা গ্রহণ করলে আমাদের দেশ থেকে উৎখাত করা হবে, ফলে আমরা আমাদের ভূমির উপরে আমাদের অধিকার হারাবো ,এবং অন্য লোকেরা তা অধিকার করে নেবে।" এখানে যে উত্তর দেয়া হয়েছে তার অর্থ দ্বিবিধ। একটি আক্ষরিক অন্যটি গভীর অর্থবোধক। আল্লাহ্‌ বলেছেন,

১) " তোমরা তোমাদের ভূমির কথা চিন্তা করছো ? ; কেন আমি কি তোমাদের জন্য মক্কাকে নিরাপদ হারাম শরীফ করি নাই। [ নির্দ্দিষ্ট সীমানা দ্বারা চিহ্নিত মক্কার পবিত্র স্থানকে 'হারাম ' বলা হয়, এই স্থানে কিছু কিছু কাজ নিষিদ্ধ আছে ] যদি তোমরা আল্লাহ্‌র হুকুম মেনে চল, তবে তোমাদের শক্তিশালী করা হবে, দুর্বল নয়।

২) মক্কা হচ্ছে আধ্যাত্মিক কল্যাণের ও নিরাপত্তার প্রতীক স্বরূপ। মানুষের কর্ম-ই তার আত্মাকে আলোকিত করে, অথবা অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। সৎ কর্ম আত্মার আলো স্বরূপ, অসৎ কর্ম অন্ধকার স্বরূপ। তোমাদের ভয় কিসের ? তোমরা তো আল্লাহ্‌র নির্বাচিত দুর্গের মাঝে বাস করছো। যতই তোমরা আল্লাহ্‌র আশ্রয় প্রার্থনা করবে ততই তোমাদের নিরাপত্তা নিচ্ছিদ্র হবে।

৫৮। কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার বাসীন্দারা জীবন ধারণের [ আরাম - আয়েশ ও প্রাচুর্যের ] দম্ভ করতো। এখন তাদের পরে সেসব জনপদসমূহ, অল্প কিছু [দুঃস্থ ] লোকজনের বসবাস ব্যতীত , পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে ৩৩৯০। এবং আমিই তাদের উত্তরাধীকারী হয়েছি।

৫৯। তোমার প্রভু কোন জনপদকে ধ্বংস করেন না , যতক্ষণ না তিনি উহার কেন্দ্রস্থলে রাসুল প্রেরণ করে থাকেন, যে তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করবে। এবং জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করবো যখন এর বাসিন্দারা অন্যায় করার অভ্যাস করে।

৩৩৯০। এই আয়াতটিতে মহাকালের এক অমূল্য উপদেশকে তুলে ধরা হয়েছে। আরাম আয়েস এবং প্রাচুর্য হচ্ছে শুধুমাত্র গর্বের বিষয়বস্তু। তবুও আমরা দেখি মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে বা শহর কেন্দ্রিকভাবে বা জাতিগতভাবে সভ্যতা ,সম্পদ বা প্রাচুর্যের জন্য দম্ভ ও অহংকার করে থাকে। মানুষ কখনও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। এ রূপ কত সভ্যতা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে যারা একদিন নিজেদের প্রাচুর্য ,সম্পদ ও ক্ষমতা ও সভ্যতার জন্য গর্বিত ও অহংকারী হয়ে পড়েছিলো। ভারতের মোহন-জো-দারো , ফাতেপুর-সীক্রী ইত্যাদি স্থান , মিশরের ফেরাউনের স্থান ইত্যাদি বহু সভ্যতার ইতিহাস পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। এ সব সভ্যতার উন্নতি ও ধ্বংসের ইতিহাস সর্বদাই এক। যতদিন তারা ন্যায় ও সত্যের পথে চলেছে ততদিন তারা ক্রমান্বয়ে উন্নতি করেছে। কিন্তু যখনই তারা ন্যায় ও সত্যকে পরিহার করে অহংকার ও দম্ভে অন্যায় ও অত্যাচারের পথকে বেছে নেয় তখনই তাদের পতনের কারণ ঘটে। ন্যায় ও সত্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র আইন।

৬০। [ পার্থিব ] জিনিষ তোমাদের যা দেয়া হয়েছে তা তো পার্থিব জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও জাঁকজমক ৩৩৯১। কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে যা আছে তা উত্তম ও চিরস্থায়ী। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না ?

৩৩৯১। পার্থিব ভোগের জিনিষ জাগতিক আরাম আয়েশের জন্য। এই পার্থিব ধন-সম্পদ , আরাম আয়েস খুবই ক্ষণস্থায়ী। ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষে মৃত্যুর সাথে সাথে তা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আত্মার সাথে যা থাকবে তা মৃত্যুঞ্জয়ী। মৃত্যুকে অতিক্রম করে তা পরলোকেও স্থায়ী হবে। যে আত্মার মাঝে ইহলোকে ন্যায় ও সত্যের অনুধাবন ক্ষমতা আছে, সেই তো আল্লাহ্‌র কল্যাণময় স্পর্শের অনুভবে সমৃদ্ধ। আর এই অনুভব স্থায়ী। যে দিব্যজ্ঞানের অধিকারী সে কি কখনও স্থায়ী সত্যকে ত্যাগ করে অস্থায়ী বস্তুর জন্য ঘুরে বেড়াতে পারে? তবুও মানুষ জাগতিক বিষয় বস্তুর পিছনে সারাটা জীবন ঘুরে বেড়ায় সুখ-শান্তির অণ্বেষনে। কিন্তু তার সে ছুটে বেড়ানো হচেছ মরীচিকার পিছনে ঘুরে বেড়ানোর মত। কারণ জাগতিক বস্তু কখনও স্থায়ী সুখের ঠিকানা দিতে পারে না। স্থায়ী সুখের ঠিকানা একমাত্র আল্লাহ্‌ নির্দ্দেশিত পথে নিহিত।

রুকু - ৭

৬১। যাকে আমি উত্তম প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এবং যে সেই [ প্রতিশ্রুতি পূর্ণতার ] স্তরে পৌঁছাচ্ছে , সে কি সেই ব্যক্তির সমান যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগ-সম্ভার দিয়েছি কিন্তু যাকে পরে শেষ বিচারের দিনে হাজির করা হবে [ শাস্তি প্রদানের জন্য ] ? ৩৩৯২

৩৩৯২। এই আয়াতে দুই শ্রেণীর লোকের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এরা হচ্ছে :

১) যাদের আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস আছে এবং যারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্‌ মোমেন ব্যক্তিদের পরকালে পুরষ্কৃত করবেন। এরা তাদের জীবনের পূর্ণতার জন্য, আল্লাহ্‌কে খুশী করার জন্য এই পৃথিবীতে ভালো কাজ করে যায়। অর্থাৎ তাঁরা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে খুশী করার জন্য আল্লাহ্‌র হুকুম মান্য করে থাকে। তাদের জীবন বিশ্বাস ও সৎকাজ এই দুয়ের সমন্বয়ে ভরে ওঠে।

২) অপরপক্ষে, আল্লাহ্‌ যাদের প্রাচুর্য ,সম্পদ ও জীবনের প্রয়োজনীয় অন্যান্য উৎকৃষ্ট বস্তু দান করেছেন,তারা আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পরিবর্তে অকৃতজ্ঞ হয়। তারা আল্লাহ্‌র স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়ে শুধুমাত্র অর্থ ও বিত্ত, ক্ষমতার পূঁজা করে। তাদের আত্মা সর্বদা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে এসব জাগতিক বিষয়বস্তুর ধ্যানেই মগ্ন থাকে, অথবা অন্য যে কোনও বস্তুর ধ্যানে তারা মগ্ন থাকে , তাদের এই পূজনীয় বস্তুই হচ্ছে আল্লাহ্‌র সাথে শরীক স্বরূপ।

এরাই তারা যারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসকে প্রত্যাখান করে এবং অসৎ ও পাপে ভরা জীবন যাপন করে। এদেরকে পরকালে জবাবদিহি ও শাস্তির জন্য সমবেত করা হবে। এই দুই শ্রেণীর লোক তাদের চিন্তায় , কাজে , বিশ্বাসে দুই মেরুর অধিবাসী। এই দুই শ্রেণী কখনও এক শ্রেণীভূক্ত হতে পারে না।

৬২। সেদিন [আল্লাহ্‌ ] তাদের ডেকে বলবেন, " আমার অংশীদাররা কোথায় ? - যাদের তোমরা [ আমার শরীক বলে ] মনে করতে ? "

৬৩। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হবে ৩৩৯৩ তারা বলবে, " হে আমাদের প্রভু ! এরাই তারা যাদের আমরা বিপথে চালিত করেছিলাম। আমরা নিজেরা যেমন পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম এদেরও তেমনি পথভ্রষ্ট করেছিলাম। [এখন] তোমার উপস্থিতিতে আমরা [ তাদের ] দায়িত্ব থেকে অব্যহতি চাচ্ছি। এরা শুধু আমাদেরই পূঁজা করতো না [ বরং নিজেদের প্রবৃত্তিরও পূঁজা করতো ] ৩৩৯৪।

৩৩৯৩। এই আয়াতটি ও পরের আয়াতে তাদেরকেই পরীক্ষা করা হয়েছে যারা পৃথিবীতে সত্যকে ত্যাগ করেছিলো এবং পূণ্যকাজকে অবহেলা করেছিলো ও মিথ্যা মনগড়া উপাস্যের উপাসনাতে মগ্ন ছিলো। এ সব উপাস্যকে তারা আল্লাহ্‌র সমকক্ষ শক্তিশালী মনে করতো। এরাই ছিলো পাপীদের পৃথিবীতে নেতা স্বরূপ। কিন্তু শেষ বিচারের দিনে এ সব নেতারা তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করবে। তাদের ভাষ্য হবে , " আমরা ভ্রান্ত ছিলাম। ওরা আমাদের উদাহরণ অনুসরণ করে কারণ ওরা তাতে আনন্দ পায় এবং ওদের জন্য তা ছিলো উপযুক্ত। ওরা আমাদের পূঁজা করে নাই প্রকৃত পক্ষে ওরা নিজেদের কামনা বাসনা চরিতার্থ করার উপায় অন্বেষণ করেছিলো।

৩৩৯৪। দেখুন আয়াত [ ১০: ২৮ ] যারা মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করে , তারা প্রকৃতপক্ষে আত্মপূঁজা ব্যতীত অন্য কিছুই করে না। অর্থ , সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি বিভিন্ন বিষয় মানুষের মিথ্যা উপাস্য হতে পারে। যে নামেই তাকে ডাকুক না কেন, যখন তাদের উপরে শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌র শাস্তির খড়গ নেমে আসবে তখন উভয়েরই বোধদয় ঘটবে। প্রত্যেকটি পাপী তখন তাদের কাজের পরিণাম সম্বন্ধে সচেতন হবে। ঘটনার পরিণতি তাদের বিহ্বল করে তুলবে। তারা তখন ইচ্ছা করবে যে, তারা যদি সময় থাকতে আল্লাহ্‌র নবীর অনুসরণ করতো।

৬৪। [ তাদেরকে ] বলা হবে, " [ সাহায্যের জন্য ] তোমাদের শরীকদের ডাক।" তারা উহাদের ডাকবে , কিন্তু উহারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে না। তারা [ তাদের সম্মুখে ] শাস্তিকে প্রত্যক্ষ করবে। [ তারা কত ব্যাকুলভাবে চাইবে যে ] "যদি তারা সৎপথের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকতো।"

৬৫। সেদিন আল্লাহ্‌ তাদের ডেকে বলবেন, ৩৩৯৫ " রাসুলদের তোমরা কি উত্তর দিয়েছিলে ? "

৩৩৯৫। যারা পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র নবীদের শিক্ষাকে প্রত্যাখান করেছিলো, তাদের হত্যা করেছিলো , তাদের বিচার যে ভাবে শুরু হবে তারই বর্ণনা আছে এই আয়াতে। [ ২৮ : ৬২ - ৬৪ ] আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে এরা তারাই তবে এখানে তাদের বিরুদ্ধে অন্য আর এক অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।

৬৬। সেদিন সকল তথ্য তাদের সম্মুখে অস্পষ্ট হয়ে পড়বে। [ এমনকি ] তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাও করতে সক্ষম হবে না ৩৩৯৬।

৩৩৯৬। ঘটনার প্রচন্ডতায় তাদের মন হতবিহ্বল, বিভ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়বে। অতীত তাদের কাছে মনে হবে অবাস্তব স্বপ্ন , বর্তমানকে মনে হবে তাদের বুদ্ধির অগম্য। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের উত্তর দানের জন্য পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করার ক্ষমতাও তাদের থাকবে না। কারণ প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা হবে একই প্রকার।

৬৭। কিন্তু [এই জীবনে ] যারা অনুতপ্ত হয়েছিলো, ঈমান এনেছিলো, এবং সৎ কাজ করেছিলো - আশা করা যায় তারা পরিত্রাণ প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।

৬৮। তোমার প্রভু যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং মনোনীত করেন ৩৩৯৭। [ এ ব্যাপারে ] তাদের কোন হাত নাই। আল্লাহ্‌ পবিত্র , মহান , এবং ওরা যাকে শরীক করে থাকে তা থেকে তিনি বহু উর্দ্ধে।

৩৩৯৭। "যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন " - তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী। এই বাক্যটি দ্বারা আল্লাহ্‌র ক্ষমতার প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান কারও উপরে নির্ভরশীল নন, কারও উপদেশ বা সাহায্যের তাঁর প্রয়োজন নাই। তাঁর কোনও অংশীদার নাই। সমস্ত সৃষ্টিই তাঁর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কোন জিনিষটি কেমন হবে সে সম্পর্কে কেউ তাঁকে নির্দ্দেশ দান করার ক্ষমতা রাখে না। কারণ তিনি জ্ঞানে এবং বিচক্ষণতায় সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর প্রেরিত নবীদের ধরাতলে আগমন একমাত্র তাঁরই মনোনয়নের প্রকাশ। আর কেহ এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে না।
৬৯। এবং তাদের অন্তর যা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে ,তোমার প্রভু তা সব জানেন ৩৩৯৮।

৩৩৯৮। মানুষ পৃথিবীর স্বল্প কালীন জীবনে বহু পরিকল্পনা করে যার অনেক কিছুই সে গোপন রাখে, অনেক ইচ্ছাই অপূরণীয় থেকে যায়। কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র নিকট সকলের অন্তরের খবর দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। আল্লাহ্‌র ইচ্ছাই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তা বাধা দেয়ার ক্ষমতা কারও নাই।

৭০। এবং তিনি আল্লাহ্‌। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। [সৃষ্টির ] আদিতে এবং অন্তে - সকল প্রশংসা তারই। বিধান তারই। তোমাদের [ সকলকে ] তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে।

৭১। বল : " তোমরা কি চিন্তা করে দেখেছ ? আল্লাহ্‌ যদি রাত্রিকে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত চিরস্থায়ী করতেন, তবে আল্লাহ্‌ ব্যতীত এমন কোন উপাস্য আছে কি যে তোমাদের আলোকসম্পাত করতে পারতো ? তবুও কি তোমরা শুনবে না ? ৩৩৯৯

৩৩৯৯। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সমূহকে তুলে ধরা হয়েছে। কত সুক্ষ ও গভীর ভাবে মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধিকে জাগরিত করার প্রয়াস হয়েছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা দিবারাত্রের পর্যায়ক্রমে অভ্যস্ত। কিন্তু এর মাঝে যে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ রয়েছে তা কখনও অনুভব করি না, হৃদয়ঙ্গম করি না। দিন হচ্ছে আমাদের দিবসের কাজের জন্য নির্ধারিত আর রাত্রি বিশ্রামের জন্য। যদি ধরাপৃষ্ঠে কোনও দিনের আভির্ভাব না ঘটতো, রাত্রি যদি অনাদি অনন্তকাল ব্যপী দীর্ঘ হতো তবে আমাদের কি পরিণতি ঘটতো ? আমাদের সকল বুদ্ধি , অনুভব ক্ষমতা হারিয়ে যেতো। আমরা মাটির নীচের অন্ধকার জীবে পরিণত হতাম। সারা পৃথিবী বৃক্ষলতা শূন্য বিরান ভূমিতে পরিণত হতো। দিনের পৃথিবীর সৌন্দর্য্য , অনুভব জীবন থেকে হারিয়ে যেতো। আমাদের সকল মানসিক দক্ষতা নষ্ট হয়ে যেতো, আবার যদি রাত্রির আগমন না ঘটে পৃথিবীতে শুধুই দিন থাকতো , তবে দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে গভীর সুপ্তির কোলে বিশ্রাম ঘটতো না। ফলে ক্লান্তি ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করে ফেলতো , আমাদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে যেতো। পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ না পেয়ে মাটি প্রচন্ড উত্তপ্ত হয়ে যেতো ফলে পৃথিবী বৃক্ষলতা শূন্য হয়ে জীবনের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতো। দিনরাত্রির পর্যায়ক্রমের ফলে আমাদের প্রতিদিনের জীবন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত সমৃদ্ধ ও সুখী। এ ভাবেই আমরা আমাদের পৃথিবীর শিক্ষানবীশ কালকে সমাপ্ত করে পরলোকের স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারি। আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের সমৃদ্ধিও দিন রাত্রির প্রতিদিনের ন্যায় পর্যায়ক্রমে গঠিত হয়। আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধির জন্য চেষ্টাও ক্রমাগত ধারাবাহিক ভাবে চলতে পারে না। কখনও তা সক্রিয় কখনও তা নিষ্ক্রিয় থাকে। পৃথিবীতে আল্লাহ্‌ র নির্দ্দেশিত পথে পূত পবিত্র জীবন যাপনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি ঘটে, তবে মাঝে মাঝে ক্ষণস্থায়ী ঘটনা প্রবাহ বাঁধার সৃষ্টি করে বিশ্রামের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসেও আমরা দেখি আল্লাহ্‌র নবী রসুলদের আগমনে পৃথিবীতে তীব্র আধ্যাত্মিক আলোড়নের সৃষ্টি হয় পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে স্বর্গীয় আলোয়। আবার এমন সময় আসে যখন পৃথিবী আত্মিক আলো বিহীন হয়ে পাপের অন্ধকারে ডুবে যায় [ অন্ধকার যুগ ]। এ সবই ঘটে থাকে পর্যায়ক্রমে।তবে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, এ সবই হচ্ছে আল্লাহ্‌র পরিকল্পনার অংশ মাত্র। তাঁর জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও দয়া, তুলনাহীন, যা শুধুমাত্র পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত প্রযোজ্য। এরপরে সৃষ্টি হবে নূতন পৃথিবী নূতন আঙ্গিকে , নূতন আইনে

৭২। বল; " তোমরা কি চিন্তা করে দেখেছ ? আল্লাহ্‌ যদি দিনকে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত চিরস্থায়ী করতেন, তবে আল্লাহ্‌ ব্যতীত এমন কোন উপাস্য আছে কি , যে তোমাদের বিশ্রামের জন্য রাত্রি দান করতে পারতো ? তবু কি তোমরা ভেবে দেখবে না ? "৩৪০০

৩৪০০। আয়াত [ ২৮ : ৭১ ] এ চিরস্থায়ী রাত্রির কথা বলা হয়েছে। অনন্ত বিশ্রাম মৃত্যুর সমতুল্য যা মানুষের মানসিক দক্ষতাকে পঙ্গু করে ফেলে। সুতারাং আয়াতটি শেষ করা হয়েছে যে কোনও র্বাতা শোনা বা উপলব্ধি করার মানসিক দক্ষতার কাছে আবেদন করে বলা হয়েছে : " তোমরা কি ভেবে দেখবে না ? " এই আয়াতে [ ২৮ : ৭২ ] চিরস্থায়ী দিনের উল্লেখ আছে। দিনের সাথে দেখার ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সম্পর্ক বিদ্যমান। সুতারাং এই আয়াতটি " ভেবে দেখবে না " বাক্যটি দ্বারা শেষ করা হয়েছে। কারণ মানুষ জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অন্বেষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে , চিন্তা করে, অনুভব করে , উপলব্ধি করে। পৃথিবীর অভিজ্ঞতা বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ব্যক্তির সত্ত্বার মাঝে প্রবেশ করে এবং তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ করে। আত্মার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার এটা কি স্রষ্টার এক বিশেষ অবদান নয়?

৭৩। এটা তাঁর একান্ত দয়া যে, তিনি তোমাদের জন্য রাত্রি ও দিনকে সৃষ্টি করেছেন - যেনো তোমরা তাতে বিশ্রাম করতে পার ও তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার; - এবং যেনো তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।

৭৪। সেদিন তিনি তাদের ডেকে জিজ্ঞাসা করবেন, " আমার শরীকরা কোথায় - যাদের তোমরা [ শরীক বলে ] কল্পনা করতে ? " ৩৪০১

৩৪০১। দেখুন আয়াত [ ২৮ : ৬২ ] আয়াত। এই আয়াতটি দ্বারা এই পরিচ্ছেদের সমাপ্তি করা হয়েছে।

৭৫। এবং প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে আমি একজন সাক্ষী বের করে আনবো এবং বলবো ৩৪০২ ; " তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।" তখন তারা জানবে যে সত্য [ একমাত্র ] আল্লাহ্‌ ,এবং যে [ মিথ্যা ] তারা উদ্ভাবন করেছিলো, তা তাদের হতাশার মাঝে পরিত্যাগ করে ফেলে যাবে ৩৪০৩।

৩৪০২। দেখুন [ ৪: ৪১] শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন নবীকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করা হবে , যারা সাক্ষী দেবে যে, তারা আল্লাহ্‌র একত্বের কথা যথাযথ ভাবে প্রচার করেছেন। যারা এই একত্ববাদকে এই পৃথিবীতে অস্বীকার করে বিভিন্ন উপাস্যের উপাসনা করেছে তাদের প্রমাণ উপস্থিত করতে বলা হবে যে, কোন অধিকারের বলে তারা আল্লাহ্‌র একত্বকে অস্বীকার করেছিলো।

৩৪০৩। রোজ কিয়ামতের পরে শেষ বিচারের দিনে যে পৃথিবীর কথা বলা হয়েছে তা হবে এক নূতন পৃথিবী যার পরিচিতি বর্তমান এই পৃথিবী থেকে লাভ করা বা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বর্তমান পৃথিবীতে আমরা বেঁচে থাকার জন্য , শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য, অর্থ-সম্পদ, প্রভাব প্রতিপত্তি কুক্ষিগত করার জন্য যত রকম মিথ্যা বা অর্ধ সত্য বা প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করি তা সবই শেষ বিচারের দিনে মনে হবে মিথ্যা মায়া -মরীচিকা। জাগতিক সকল মিথ্যা  অন্তর্হিত হয়ে যাবে, প্রকৃত সত্যের স্বরূপ হবে ভাস্বর। ফলে পৃথিবীতে যারা মিথ্যার উপরে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো তারা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হবে।

রুকু - ৮

৭৬। কারুণ ছিলো নিঃসন্দেহে মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত লোক ৩৪০৪। কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার করতো। অথচ আমি তাকে দান করেছিলাম এমন অগাধ ধন-ভান্ডার ৩৪০৫ , যে যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিলো ৩৪০৬। স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিলো , " দম্ভ করো না , নিশ্চয়ই যারা [ সম্পদের ] অহংকার করে আল্লাহ্‌ তাদের পছন্দ করেন না।"

৩৪০৪। ইংরেজী বাইবেলে কারুণকে কোরাহ্‌ নামে অভিহিত করা হয়েছে। সেখানে কোরাহ্‌ এর কাহিনী [ Num xvi i – 13 ] নিম্নরূপ। কোরাহ্‌ এবং তার দুইশত পঞ্চাশ জন অনুসারী মুসা এবং হারূণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তাঁদের বিদ্রোহের কারণ তাদের ধারণা, তাদের সম্মান, প্রতিপত্তি, অর্থবিত্ত তাদের মুসা এবং হারূণের মত আধ্যাত্মিক নেতা হওয়ার যোগ্যতা দান করেছে। জাগতিক বৈভব এবং সম্মানের দরুণ তারা মুসা ও হারূণের মতই পবিত্র ও পূণ্যাত্মা এবং তারা পূরোহিতের ন্যায় পূঁজা করার অধিকারী। এদেরকেই আল্লাহ্‌ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দান করেন, " পৃথিবী মুখ ব্যদান করেছিলো এবং কোরাহ্‌ এর সকল সম্পত্তি এবং অধিকারভূক্ত সকল লোকজনসহ কোরাহ্‌ কে গ্রাস করে ফেলে। পৃথিবীর মুখ বন্ধ হয়ে যায় ,ফলে সে এবং তার অধিকারে যারা ছিলো সকলে মৃত্তিকা গর্ভে জীবন্ত বিলীন হয়ে যায়। ফলে জনসমাবেশের মধ্যে থেকেও তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

৩৪০৫। এখানে কারূণের অশেষ সম্পদের বর্ণনা করা হয়েছে।

৩৪০৬। 'Usbat' অর্থ বলবান লোকের শরীর। এখানে সাধারণ ভাবে দশ থেকে চল্লিশ জন বলবান লোককে বোঝানো হয়েছে। প্রাচীন কালে সিন্ধুকের চাবিগুলি ছিলো বৃহৎ আকার এবং ভারী। যদি কারুণের একশতটি সিন্ধুকেও থেকে থাকে, তবে ধারণা করা যায় যে, সেই চাবিগুলির ওজন ছিলো অত্যাধিক। যখন কারূণ এক স্থান থেকে থেকে অন্য স্থানে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতো , সে ধনরত্ন ভরা সিন্ধুকগুলি মিশরে রেখে শুধু চাবিগুলি নিজের সাথে বহন করে নিত। সেই চাবিগুলি বহন করতেই একদল বলবান লোকের প্রয়োজন হতো।

৭৭। বরং আল্লাহ্‌ যে [সম্পদ ] তোমাকে দান করেছেন , তা দিয়ে পরলোকের আবাস অনুসন্ধান কর ৩৪০৭। এই পৃথিবীতে তোমার অংশ ভুলে যেও না। পরের উপকার কর যেমন আল্লাহ্‌ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করার কারণ [ অনুসন্ধান ] করো না। কারণ যারা অশান্তি সৃষ্টি করে আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন না।

৩৪০৭। আখিরাতের আবাস অনুসন্ধানের পথ এখানে বলে দেয়া হয়েছে। সে পথ হচ্ছে , " পরোপকার করা।" ভালো কাজে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য দান করা। মানুষের অর্থ-সম্পদ , বিষয়-বৈভব,মান সম্মান , সবই সেই সর্ব শক্তিমানের অনুগ্রহ এই সাধারণ সত্য কথাটি মানুষ ভুলে যায়। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ , আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা প্রয়োজন। তার অর্থ এই নয় যে, কেউ তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে অস্বীকার করবে " পৃথিবীতে তোমার অংশ ভুলে যেও না।" একমাত্র কৃপণ যারা তারাই ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও খরচ করে না। যারা সর্বদা শুধুমাত্র অর্থ সম্পদের কথাই দিনরাত্রি চিন্তা করে তারাই বিশেষতঃ কৃপণ হয়। যদি অর্থ সম্পদ সঠিকভাবে খরচ করা না হয়, তবে নিম্নোক্ত তিন ধরণের পাপের দ্বারা সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিরা বেষ্টিত হয় :

১) তারা হয় অত্যন্ত কৃপণ ! তারা নিজের ও পরিবারবর্গের ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও খরচ করতে পারে না।

২) সে গরীবের দুঃখ কষ্ট বুঝতে অক্ষম অথবা কোনও মহৎ কাজেও সে সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে অক্ষম।

৩) এবং সে সম্পদের অপব্যবহার করে এবং সমাজের বহু ক্ষতি সাধন করে।

বাহ্যতঃ প্রতীয়মান হয় যে, কারূণ এই তিন ধরণের পাপেই আসক্ত ছিলো

৭৮। সে বলেছিলো, " এসব আমি পেয়েছি আমার নিজস্ব জ্ঞানের দ্বারা ৩৪০৮।" সে কি জানে না যে, তার পূর্বে আল্লাহ্‌ [ বহু ] মানব গোষ্ঠিকে ধ্বংস করেছেন , যারা ছিলো তার থেকে শক্তিতে প্রবল, এবং তাদের সংগৃহিত [ ধনসম্পদ ] ছিলো আরও অধিক? কিন্তু অপরাধীদের নিকট [ সঙ্গে সঙ্গে ] তাদের পাপের হিসাব চাওয়া হবে না। ৩৪০৯।

৩৪০৮। কারূণ সম্পদের অহংকারে এতটাই অন্ধ ও উদ্ধত হয়ে গিয়েছিলো যে, তার ধারণা হয়েছিলো যা কিছু সম্পদ সবই সে অর্জন করেছে নিজের মেধা, জ্ঞান, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। সেখানে আল্লাহ্‌র কোনও অনুগ্রহ নাই। যেহেতু সব কৃতিত্ব তার একার সুতারাং সে সকলের থেকে শ্রেষ্ঠ এবং সকলে তার পায়ের তলার যোগ্য। - হতভাগ্য ! আল্লাহ্‌ তাকে টেনে নীচে নামিয়ে ফেলেছিলেন। কারূণের যে মানসিকতা , যুগে যুগে এবং বর্তমানেও যারা প্রভূত সম্পদের অধিকারী এই একই মানসিকতা তাদের মাঝেও কাজ করে। তাদের অপরাধ সম্পর্কে তৎক্ষণাত জিজ্ঞাসা করা হবে না। কারণ তাদের সব হিসেব আল্লাহ্‌র নিকট আছে।

৩৪০৯। অপরাধীদের অপরাধ সম্পর্কে তৎক্ষণাত প্রশ্ন করা হবে না। এমন কি কারূণকেও সুদীর্ঘ সময় দেয়া হয়েছিলো তাঁর অগাধ বৈভব-বিত্ত উপভোগ করার জন্য। যখন তার পাপের পাত্র পূর্ণ হয়েছিলো তখনই তাকে ধবংস করে দেয়া হয়।

৭৯। সুতারাং সে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে [ পার্থিব সম্পদের অহংকারে ] জাঁকজমকের সাথে উপস্থিত হলো। যাদের জীবনের লক্ষ্য হলো [ শুধু ] পৃথিবীর জীবন, তারা বলেছিলো , " কারূণ যেরূপ পেয়েছে , আমরাও যদি সেরূপ পেতাম ! নিশ্চয় সে মহা ভাগ্যবান ব্যক্তি।" ৩৪১০

৩৪১০। কারূণের বিজয় গৌরব যখন মধ্য গগণে, কারূণের পার্থিব সম্পদ, জাগতিক বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন লোকদের মনে হিংসার উদ্রেক করতো। তারা মনে করতো যে, কারূণের মত ধন ঐশ্বর্যের অধিকারী হলে তারা কতই না সুখী হতো। কিন্তু যারা প্রকৃত জ্ঞানী তারা ঘটনার তাৎপর্য উপলব্ধিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তী আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
৮০। কিন্তু যাদের [সত্য ] জ্ঞান দান করা হয়েছিলো , তারা বলেছিলো , " তোমাদের জন্য আফসোস্‌ ! যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে [ পরলোকে ] আল্লাহ্‌র দেয় পুরষ্কার তাদের জন্য হবে সর্বোৎকৃষ্ট। যারা [ সত্যের প্রতি ] দৃঢ়তার সাথে অধ্যাবসায়ী হয় তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা অর্জনে সক্ষম হবে না।"

৮১। অতঃপর আমি তাকে এবং তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার পক্ষে এমন কোন [ছোট ] দলও ছিলো না যারা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারতো, সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলো না ৩৪১১।

৩৪১১। দেখুন টিকা ৩৪০৪ আরও দেখুন [ ১৬ : ৪৫ ] আয়াত ও টিকা ২০৭১। এই কাহিনীর নৈতিক উপদেশ হচ্ছে, আর্থিক ধন-সম্পদ খুবই ক্ষণস্থায়ী বস্তু , কিন্তু তবুও তা অনেকের জন্য একান্ত কাম্য বস্তু এবং পরিণামে ধ্বংসের কারণ। তবে মওলানা ইউসুফ আলীর মতে সম্পূর্ণ কাহিনীতে আরও কিছু রূপক শোভিত অর্থ বিদ্যমান সেগুলি নিম্নরূপ :

১) সোনা বা রূপা বা সম্পদ এর নিজস্ব কোনও মূল্যমান নাই। যা কিছু মূল্যমান তা সমাজ সংসার থেকে আরোপিত।

২) কারূণ গোত্র হিসেবে ইহুদীদের গোত্রভূক্ত ছিলো। সে হিসেবে শারীরিক দিক থেকে ইহুদীদের সাথেই মরুভূমিতে ভ্রমণ করছিলো , কিন্তু তার হৃদয়, আত্মা , মন সবই মিশরে পড়ে ছিলো কারণ সেখানের সম্পদের দাসত্বে সে ছিলো বন্দী। কারূণের মত অবস্থা বহু মোনাফেকের হয়। এ সব মোনাফেকের নিজেদের পূণ্যাত্মাদের সমপর্যায়ে দেখতে ভালোবাসে , কিন্তু তাদের চিন্তা কার্য , আকাঙ্খা পূণ্যাত্মাদের সঙ্গের অনুপযোগী।

৩) সকলের মঙ্গলের উৎস আল্লাহ্‌। যদি আমরা তা না বুঝতে পারি , তবেই আমরা আল্লাহ্‌র সাথে শরীক কল্পনা করি। আমাদের জ্ঞান, বুদ্ধি এতটাই সীমিত যে, তা যেনো উদ্ধত অন্ধ অহংকারে আল্লাহ্‌র সাথে প্রতিদ্বন্দিতা না করে।

৪) কারূণ যদি তার ঐশ্বর্যের গর্বে অন্ধ হয়ে না যেতো, তা হলে সে বুঝতে পারতো জাগতিক বুদ্ধি জ্ঞান, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নিকট কত অকিঞ্চিতকর। আধ্যাত্মিক নেতার তুলনায় রাজনৈতিক নেতা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও নগন্য।

৮২। পূর্ব দিনে যারা তার ভাগ্যকে হিংসা করেছিলো , পরের দিন তারা বলতে শুরু করলো, " আঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা করেন রিযিক বাড়িয়ে দেন যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন ৩৪১২। আল্লাহ্‌ যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহশীল না হতেন , তবে আমাদেরও ভূগর্ভে প্রোথিত করতে পারতেন। আ : ! যারা আল্লাহ্‌কে প্রত্যাখান করে নিঃসন্দেহে তারা উন্নতি করতে পারবে না। "

৩৪১২। রিযিক বা আহার। এই শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ও আলংকারিক অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। রিযিক বা আহার আমাদের দৈহিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। এই রিযিক হচ্ছে শরীরের আবার আর এক ধরণের রিযিক আছে যা আত্মার খোরাক ,আত্মার সমৃদ্ধির জন্য যা প্রয়োজন। আত্মার সমৃদ্ধি অর্থাৎ উন্নততর মানসিক গুণ ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতা। নির্বোধ জনসাধারণ কারূণের জাঁকজমক ও পার্থিব সমৃদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করতে থাকে। কারূণের ধ্বংসের পরে তাদের বোধদয় ঘটে। তারা বুঝতে পারে যে, পার্থিব সম্পদ ব্যতীতও আল্লাহ্‌র আরও অনুগ্রহ বা দান আছে যা পার্থিব সম্পদ অপেক্ষা মহার্ঘ এবং যা সকলের জন্য কাম্য হওয়া উচিত। যারা পার্থিব ধন-ঐশ্বর্য এবং সমৃদ্ধি উপভোগ করে সাধারণত তারা আধ্যাত্মিক জীবনের এই উচ্চতর ধারণা লাভে অক্ষম হয়। পার্থিব চাকচিক্যময় জীবন তাদের চক্ষু ধাঁধিয়ে দেয় , ফলে আধ্যাত্মিক জীবন সম্বন্ধে তারা হয় অন্ধ। তাদের পার্থিব সমৃদ্ধি প্রকৃত পক্ষে কোনও সমৃদ্ধি -ই নয়। কারণ যে সমৃদ্ধি আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধির সাথে সর্ম্পকিত নয় তা মিথ্যা এবং অস্তিত্ববিহীন। মৃত্যুর সাথে সাথে তার কোনও অস্তিত্ব থাকে না তা বিলীন হয়ে যায়

রুকু - ৯

৮৩। যারা পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হয় না এবং অশান্তির সৃষ্টি করে না, পরকালের আবাস আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি ৩৪১৩। এবং পূণ্যাত্মাদের শেষ পরিণতি [ সর্বোৎকৃষ্ট ]।

৩৪১৩। " স্বেচ্ছাচারী ও অশান্তি সৃষ্টিকারী "। ইসলাম অর্থ আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পনকারী। যারা আত্মসমর্পনকারী বা মোমেন বান্দা তারা সর্বদা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য ভালো কাজ করেন যার বিপরীত হচ্ছে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। যারা মোমেন তারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন এই আল্লাহ্‌র বিধান। " পূণ্যাত্মাদের শেষ পরিণতি [ সর্বোৎকৃষ্ট ]।

৮৪। যদি কেউ ভালো কাজ করে, তবে তার পুরষ্কার হবে তার কর্ম অপেক্ষাও উত্তম। কিন্তু কেউ যদি পাপ করে তবে তাদের [ততটুকুই ] শাস্তি দেয়া হবে যতটুকু পাপ কাজ তারা করেছে ৩৪১৪।

৩৪১৪। সৎকর্ম বয়ে আনে আল্লাহ্‌র পুরষ্কার। আর আল্লাহ্‌ বলেছেন এই পুরষ্কার হবে তার কর্মের দরুণ যা প্রাপ্য তা অপেক্ষা বহুগুণ বেশী। কারণ আল্লাহ্‌ তো পরম করুণাময়। অনুতাপ ও সংশোধনের মাধ্যমে পাপীদের পাপ ক্ষমা করা হবে। কিন্তু যদি তারা অনুতপ্ত না হয়, তবে তারা ততটুকুই শাস্তি পাবে যা ন্যায়বিচারে তাদের প্রাপ্য, তার বেশী নয়।

৮৫। যিনি তোমার জন্য কোরআনকে বিধান করেছেন ৩৪১৫, নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে পূর্ব স্থানে ফিরিয়ে আনবেন ৩৪১৬। বল, " আমার প্রভুই সবচেয়ে ভাল জানেন কে সত্য পথের নির্দ্দেশ নিয়ে এসেছে এবং কে স্পষ্ট ভুলের মাঝে রয়েছে ৩৪১৭। "

৩৪১৫। "কুরাণকে করেছেন বিধান "- কোরাণ আল্লাহ্‌র আইন বা বিধান মানুষের জন্য এবং এই বিধান পালনের মাধ্যমেই আছে মানবাত্মার মুক্তির পথ যা আল্লাহ্‌র অপার করুণা। পরবর্তীতে আরও হুকুম দেয়া হয়েছে যে, আয়াতসমূহ পড়তে হবে এবং অন্যকে শিক্ষা দিতে হবে এবং এর মূল নীতিগুলি জীবন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত করতে হবে । রাসুল [ সা ] কোরাণের শিক্ষাকে প্রচার করেন, ফলে, তিনি অত্যাচার নির্যাতনের সম্মুখীন হন। কিন্তু যেহেতু কোরাণ আল্লাহ্‌র তরফ থেকে অবতীর্ণ , সুতারাং যারা এর অনুসরণ করবে তারা শেষ পর্যন্ত আর নির্যাতিত বা অত্যাচারিত হবে না। তাদের শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন স্থলে ফিরিয়ে আনা হবে এবং সুখী করা হবে। দেখুন পরবর্তী টিকা।

৩৪১৬। " পূর্বস্থানে ফিরিয়ে আনবেন" - এর মানে দ্বিবিধ হতে পারে। ১) অর্থাৎ মক্কা শরীফে। ২) পুনরুত্থানের পরে আমরা যখন আবার আমাদের প্রভুর সমীপে হাজির হব। বলা হয়ে থাকে যে আয়াতটি মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার পথে জুহ্‌ফা [ Juhfa ] নামক স্থানে অবতীর্ণ হয়। রাস্তাটি মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরতের সংক্ষিপ্ত পথ। এই পথে হিজরতের সময়ে রাসুলের [ সা ] হৃদয় নিজ মাতৃভূমি ত্যাগের দুঃখে কষ্টে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। এই আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাঁকে সান্তনা ও আশ্বাস দিয়েছেন। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার এই ছিলো প্রেক্ষাপট, কিন্তু এর অর্থ সার্বজনীন। মৃত্যুর পরে যখন পুণরুত্থান ঘটবে, তখন সকলকে প্রত্যাবর্তন স্থলে ফিরে যেতে হবে - তখন পৃথিবীর কৃত্রিম মূল্যবোধ ও অশুভ শক্তি মিলিয়ে যাবে মরীচিকার ন্যায়, প্রকৃত ও সত্য মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে।

৩৪১৭। আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ। তিনি জানেন কোনটা সত্য , কোনটা মিথ্যা। যদি আমাদের বিশ্বাস ও ঈমানের জন্য, সঠিক কর্তব্য কাজের জন্য , আমাদের নির্যাতিত করা হয় , অত্যাচার করা হয়, তিরষ্কার করা হয়, এরূপ ক্ষেত্রে আমাদের নিশ্চিত আশ্রয়স্থল হচ্ছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌। আমরা তাঁর কাছেই আশ্রয়ের জন্য আবেদন করবো, কোনও মানুষের কাছে নয়।

৮৬। আর তুমি তো আশা কর নাই যে, তোমার নিকট কিতাব প্রেরণ করা হবে। ইহা তো কেবল তোমার প্রভুর অনুগ্রহ ৩৪১৮। অতএব, কোন ভাবেই তুমি তাদের সমর্থন করো না যারা [আল্লাহ্‌র বাণীকে ] প্রত্যাখান করে ৩৪১৯।

৩৪১৮। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ লাভ করা এবং সত্যকে প্রচার করা হচ্ছে বিরোধ , ও নির্যাতনের আরম্ভ। যিনি সত্যকে প্রচার করেন তাঁর জন্য শুরু হয় দুঃখময় ও যন্ত্রণাময় দিনের। জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করলে একে দুঃখময় রাত্রি বলা চলে - কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র করুণা লাভের পূর্বশর্ত। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বান্দা লাভ করে অপ্রত্যাশিত ভাবে। নবী রসুলদের নিকটও আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ বা অনুগ্রহ এসেছে অপ্রত্যাশিত ভাবে। তাঁরা সজ্ঞানে বা সচেতন ভাবে প্রত্যাদেশের জন্য প্রার্থনা করেন নাই। ধর্মীয় ইতিহাসে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে হযরত মুসার জীবনে, আমাদের রাসুলের [সা ] জীবনে। এই আয়াত তারই উল্লেখ আছে।

৩৪১৯। পৃথিবীতে যুগে যুগে যখনই সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, অন্যায় , অসত্য ও পাপ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। কারণ পাপীদের নিকট আল্লাহ্‌র বাণী সর্বদাই অরুচীকর মনে হবে। অন্যায় ও অসত্যের প্রতিরোধের ক্ষমতায় অনেকের মন দ্বিধাগ্রস্থ হতে পারে - এরা মনে করে যে, কাফেরদের প্রতিরোধে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা কি আল্লাহ্‌র -ই ইচ্ছার প্রকাশ নয় ? তাদের এই দ্বিধা গ্রস্থ মনোভাব পরোক্ষভাবে কাফেরদের প্রতিরোধ এবং আক্রমণাত্মক মনোভাবকে সহযোগীতা দান করে থাকে। সুতারাং আল্লাহ্‌র হুকুম হচ্ছে আল্লাহ্‌র সৈনিকরা দৃঢ় ও নির্ভিকভাবে কাফেরদের বিরুদ্ধে দাড়াবে। তাঁরা হচ্ছে আল্লাহ্‌র 'মুজাহিদ ' বা সত্যের নির্ভিক সৈনিক।তারা হবে দুঃসাহসিক কারণ তারা জানে আল্লাহ্‌ তাঁদের সহায়।

৮৭। তোমার নিকট আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর কোন কিছুই যেনো তোমাকে তা থেকে ফিরিয়ে নিতে না পারে। [ মানব সম্প্রদায়কে ] তোমার প্রভুর দিকে আহ্বান কর, এবং তাদের সঙ্গী হয়ো না যারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্য উপাস্য ধারণ করে ৩৪২০।

৩৪২০। এই আয়াতটিতে রাসুলকে [সা ] সম্বোধন করা হলেও এর আবেদন সার্বজনীন। আল্লাহ্‌র সৈনিকরা হবে নির্ভিক অন্যায় , অসত্য ও পাপের বিরুদ্ধে। একবার স্বর্গীয় আলোতে [আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ সমূহ ] যে অবগাহন করেছে সে কখনও এক ইঞ্চি পরিমাণও অসত্য ও অন্যায়কে মেনে নেবে না। এই হচ্ছে সত্যের সৈনিকদের উপরে আল্লাহ্‌র হুকুম। তিনি সকলকে আল্লাহ্‌র পথে আহ্বান করবেন। কোনও অবস্থাতেই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।

৮৮। আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য উপাস্যকে ডাকবে না। তিনি ব্যতীত অন্য উপাস্য নাই। তাঁর সত্তা ব্যতীত সকল কিছুই ধ্বংস হবে ৩৪২১। সকল বিধান তারই অধীনে এবং তোমাদের [সকলকে ] তারই নিকট ফিরিয়ে নেয়া হবে।

৩৪২১। এই আয়াতটির মাধ্যমে সম্পূর্ণ সূরাটির সার সংক্ষেপ করা হয়েছে। একমাত্র আল্লাহ্‌ই হচ্ছেন অনাদি ও অনন্ত সত্য। এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মান্ডের সকল কিছুই সর্বদা পরিবর্তনশীল। কিছুই স্থায়ী নয়। সবই সময়ের সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে যায় ও ধ্বংস হয়ে যাবে। একমাত্র আল্লাহ্‌র সত্ত্বাই শেষ পর্যন্ত বিরাজ করবে