Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫০ জন
আজকের পাঠক ৬৩ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৬০৩৬৩ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২২৪০৬৩ বার
+ - R Print

সূরা সা'দ


সূরা সা'দ বা সংক্ষিপ্ত অক্ষর সমূহ - ৩৮

৮৮ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা : যে ছয়টি সূরা আধ্যাত্মিক জগতের বর্ণনায় সমৃদ্ধ তাদের মধ্যে এই সূরার অবস্থানের জন্য দেখুন সূরা ৩৪ এর ভূমিকা। ৩৪ নং সূরার সময়কাল এবং বিষয়বস্তু সূরা নং ৩৮ এর সমগোত্রীয়। সূরা নং ৩৭ এ যে যুক্তির উত্থাপন করা হয়েছে , এখানেও ঠিক সেই একই যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে - কিন্তু বিশেষ ভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তির উপরে , যখন আধ্যাত্মিক শক্তি পার্থিব ক্ষমতার সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে। সেই সাথে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তির গুরুত্ব ও বাস্তবতার উপরে। সে কারণেই দাউদ নবী ও সুলাইমানের উদাহরণ উত্থাপন করা হয়েছে , যারা ক্ষমতাধর নৃপতি এবং সেই সাথে নবীও ছিলেন। এদের উদাহরণের সমান্তরালভাবে আমাদের রাসুলের [ সা ] জীবনীকে চিত্রিত করা হয়েছে।

সার সংক্ষেপ : পাপীরা এবং বৈষয়িক বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা সত্য এবং ন্যায়ের পুণঃর্ভিভাবে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে যায়। দাউদ নবী , যিনি আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উভয় ক্ষমতা দ্বারা শক্তিশালী ছিলেন, তাঁর কাহিনীর মাধ্যমে এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, পার্থিব ক্ষমতা অপেক্ষা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অনেক বেশী শক্তিশালী। [ ৩৮ : ২৭ - ৬৪ ]

ঠিক একই ভাবে সুলাইমান পার্থিব শক্তি অপেক্ষা আল্লাহ্‌কে বেশী ভালোবাসতেন। পার্থিব ক্ষমতা দুষ্টলোকের অধিকারে অপব্যবহার হতে পারে। ইয়াকুব নবী ছিলেন ক্ষমতাবান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ। তিনি জীবনের শেষ পরিণতি হিসেবে দুঃখ দুর্দ্দশার পরিবর্তে পরলোকের শান্তিকে বেছে নিয়েছিলেন। [ ৩৮ : ১ - ২৬ ]।

শেষ নবীর বেলাতেও তাঁর প্রচারিত আল্লাহ্‌র একত্ববাদ সকল হিংসা ও ঔদ্ধত্যের উপরে স্থান লাভ করবে। [ ৩৮ : ৬৫ - ৮৮ ]।


সূরা সা'দ বা সংক্ষিপ্ত অক্ষর সমূহ - ৩৮

৮৮ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

০১। সাদ, ৪১৪৬ শপথ কুর-আনের যা উপদেশে পরিপূর্ণ [ এটাই প্রকৃত সত্য ] ৪১৪৭।

৪১৪৬। 'Sad' একটি আরবী অক্ষর। এখানে অক্ষরটি ব্যবহৃত হয়েছে ভাবধারাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশের জন্য।

৪১৪৭। "শপথ উপদেশপূর্ণ কুর-আনের।" এখানে 'Zikr' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। জিক্‌র শব্দটি দ্বারা এক বিশাল ভাবধারাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এর দ্বারা প্রকাশ করা হয় ; ১) ভক্তি সহকারে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করা ; ২) আল্লাহ্‌র আয়াত সমূহ আবৃত্তি করা এবং আল্লাহ্‌র প্রশংসা জ্ঞাপন করা ; ৩) আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে শিক্ষাদান করা , সাবধান করা , সর্তক করা ; ৪) আয়াত [ ১৬ :৪৩ ] 'Ah-luz-Zikr' অর্থ করা হয়েছে বাণী , প্রত্যাদেশ।

০২। কিন্তু অবিশ্বাসীরা আত্মগরিমায় [ মত্ত ] এবং বিরোধিতায় ডুবে আছে ৪১৪৮।

৪১৪৮। এই আয়াতটির মাধ্যমে মনুষ্য চরিত্রের এক বিশেষ দিককে তুলে ধরা হয়েছে। সত্যকে অবিশ্বাস করার এবং পাপে নিমগ্ন হওয়ার প্রবণতার মূল নিহিত থাকে মানুষের অহংকার ,গর্ব ও ঔদ্ধত্যের মাঝে। অহংকার , গর্ব ও ঔদ্ধত্যের ফলেই শয়তানের পতন ঘটে বেহেশত থেকে। শয়তানের এই বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে [ ৩৮ : ৭৪ - ৭৬ ] আয়াতে। অহংকার একটি খারাপ রিপু যা থেকে হিংসা ও বিদ্বেষের উৎপত্তি ঘটে, - আর হিংসা-দ্বেষ থেকে সৃষ্টি হয় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রবণতা, প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করে নিজস্ব অধিকারভুক্ত মতামতের সৃষ্টি করার চেষ্টা। যার ফলে তার আত্মার মাঝে প্রকৃত সত্যের আলো অনুপ্রবেশে বাঁধা পায় এবং আল্লাহ্‌র একত্বের ধারণা থেকে সে অনেক দূরে সরে যায়। একত্ববাদ হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। যার উপরে প্রতিষ্ঠিত হয় জীবন বিকাশের সকল শাখা-প্রশাখা। আরব মোশরেকরা রাসুলের [সা ] প্রচারিত এই একত্ববাদকেই প্রতিহত করে। দেখুন আয়াত [ ৩৮ :৫ ] পৃথিবীতে মানুষের অধঃপতনের কারণও হচ্ছে অহংকার, হিংসা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশের ফল।

০৩। কত জনগোষ্ঠিকে এদের পূর্বে আমি ধ্বংস করেছি ? শেষ পর্যন্ত তারা [ করুণা লাভের জন্য] আর্তচীৎকার করেছিলো - কিন্তু তখন উদ্ধার পাওয়ার কোন উপায় ছিলো না ৪১৪৯।

৪১৪৯। পৃথিবীতে সর্বকালে সর্বযুগে আল্লাহ্‌ মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দান করেছেন, সাবধান করেছেন এবং তার নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন, যেনো প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি জাতি সময়মত সাবধান হতে পারে। তা সত্বেও পৃতিবীতে বিভিন্ন জাতির অধঃপতনের ইতিহাস হচ্ছে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত পথ নির্দ্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তা থেকে দূরে সরে যাওয়া। এই ইতিহাস থেকে পরবর্তী জাতির জন্য আছে শিক্ষণীয় বিষয় যে , প্রতিটি জাতিই আত্ম ধ্বংসের জন্য দায়ী। প্রাকৃতিক আইনের ন্যায় পৃথিবীতে আল্লাহ্‌ নৈতিক আইনও স্থাপন করে দিয়েছেন। আর এই আইন হচ্ছে অলঙ্ঘনীয়। যারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত নৈতিক আইন লঙ্ঘন করবে তাদের ধবংস অনিবার্য। এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্‌র ন্যায়নীতি। অন্যায়কারীদের ধ্বংস তাদেরই কর্মফল। তবে পৃথিবীতে তাদের স্বল্পকালীন অবস্থান কালে তারা যদি অনুতাপের মাধ্যমে নিজেদের চরিত্র ও কর্মধারার সংশোধন করে, তবে আল্লাহ্‌ পরম করুণময় ও ক্ষমাশীল। কিন্তু তাদের আত্ম অহংকার এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধারণার ঔদ্ধত্য ; তাদের আল্লাহ্‌র করুণা লাভে ব্যর্থ করে। তাদের কর্মফল তাদের আত্মায় আল্লাহ্‌র নূর প্রবেশে বাঁধা দান করে, ফলে তারা আল্লাহ্‌র হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়। এ যেনো এক দুর্ভেদ্দ্য পর্দ্দা যা আলোর সামান্য রশ্মীকেও প্রবেশে বাঁধা দান করে। কিন্তু যখন তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপণীত হয়, তখন তারা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করতে পারে এবং আর্ত চীৎকার করে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে যাবে। ভুল সংশোধনের আর কোনও সুযোগ পাওয়া যাবে না।

০৪। এরা আশ্চর্য হচ্ছে এই ভেবে যে, তাদের মধ্য থেকেই তাদের জন্য একজন সর্তককারী এসেছে এবং অবিশ্বাসীরা বলে যে, " এ তো একজন যাদুকর , মিথ্যা বলছে ৪১৫০।

৪১৫০। রাসুলের [সা ] আগমনে আরব মোশরেকরা আশ্চর্য্য বোধ করে এ জন্য যে, তাদেরই একজনকে আল্লাহ্‌ কেন বিশেষ ভাবে রাসুল রূপে নির্বাচিত করলেন। হিংসার আগুন তাদের সমস্ত সত্ত্বাকে বিদ্বেষে পরিপূর্ণ করে তোলে। ফলে তারা রাসুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এবং কুরুচিপূর্ণ বাক্য প্রয়োগ করতে থাকে। যাকে আল্লাহ্‌ পৃথিবীর রহমতরূপে প্রেরণ করেছেন তাঁকে তারা "যাদুকর" ও " মিথ্যাবাদী" রূপে অভিহিত করার প্রয়াস পায়। তাদের এই প্রয়াস তাদের বিবেক বুদ্ধির স্বল্পতারই প্রকাশ করে।

০৫। " সে কি বহু দেব-দেবীদের [ সকলকে ] এক আল্লাহ্‌ বানিয়েছে ? সত্যিই এটা একটা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!" ৪১৫১

৪১৫১। আল্লাহ্‌র একত্ব ঘোষণায় রসুলের [সা ] ত্রুটি কোথায় ? তিনি তো কাল্পনিক উপাস্যদের বিদূরিত করে উপসনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনায়ন করেছেন। ফলে বিভিন্ন উপাস্যের উপাসকরা পরস্পর সংঘর্ষ থেকে রেহাই পায় এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে রাসুলের শিক্ষা এক অপূর্ব শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের সমাবেশ, তবুও অবিশ্বাসীদের চোখে তা বিদ্রূপের সামিল। এই আয়াতে অবিশ্বাসীদের ব্যঙ্গক্তিকেই প্রকাশ করা হয়েছে।

০৬। তাদের মধ্যে যারা প্রধান তারা অসহিষ্ণু ভাবে চলে গেলো [ এই বলে ] ৪১৫২। "তোমরা চলে যাও, এবং তোমাদের দেবতাদের প্রতি অবিচলিত থাক। নিশ্চয়ই এটা [ তোমাদের বিরুদ্ধে ] এক অভিসন্ধি।

৪১৫২। ইসলামের প্রথম যুগে যখন ইসলামের প্রচারক হযরত মুহম্মদের [ সা ] উপরে পৌত্তলিক কোরেশদের নির্মম নির্যাতন চলছিলো , সে সময়ে তারা রাসুলের [সা ] নির্যাতনের জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করতো, এর মধ্যে অন্যতম পন্থা ছিলো , তারা হযরতের [সা ] চাচা আবু তালিবের উপরে চাপ সৃষ্টি করা যেনো তিনি প্রকাশ্যে তাঁর প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে পরিত্যাগ করেন। এ ব্যাপারে তারা আবু তালেবের সাথে মন্ত্রণাসভারও আয়োজন করে। এ ব্যাপারে তাদের উদ্দোগ অকৃতকার্যতায় পর্যবসিত হয। ফলে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা প্রচার করে যে, ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ [ সা ] তাঁর নিজের হাতে সমস্ত ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। হযরত ওমর [রা] ইসলাম প্রচারের ষষ্ঠ বছরে ইসলাম গ্রহণ করেন যা ছিলো হিজরতের সাত বছর পূর্বে। হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণ কোরেশ প্রধানদের আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ তারা ছিলো স্বেচ্ছাচারী ,লোভী , সুতারাং ইসলামের সমতার বিধান তাদের ক্ষমতার ভিত্তিকে আঘাত হানে। সুতারাং ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তারা পূণ্যাত্মা রাসুলের [সা ] ভূমিকাকে বিকৃত করে দেখানোর প্রয়াস পায়। রাসুলুল্লাহ্‌র [সা] ধর্ম প্রচার রোধ করার উদ্দেশ্যে কোরেশদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলাম থেকে লোকদের ফিরিয়ে রাখতে এই ধরণের অপপ্রচার করতো।

০৭। "ইদানিং কালের জন সাধারণের মধ্যে [এরূপ ] কথা কখনও শুনি নাই। এটা কিছু নয় , মনগড়া কাহিনী মাত্র।" ৪১৫৩

৪১৫৩। এখানে পৌত্তলিক কোরেশদের উক্তিকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিলো যে,অন্য ধর্মে; ইসলামে প্রচারিত দর্শন নাই সুতারাং তা গ্রহণ করার কোনও যৌক্তিকতা নাই। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এ সব প্রতিমারই পূঁজা করে গেছেন ; সুতারাং তাদের ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না। তারা নিজেদের মনগড়া ধারণাতে এতটাই আত্মতৃপ্ত ছিলো যে, প্রকৃত সত্যের ধারণা তাদের নিকট অরুচিকর বোধ হলো। সুতারাং তারা প্রচারিত সত্যকে "মনগড়া উক্তিমাত্র " - আখ্যা দান করেছিলো। কোনও কোনও তফসীর কারের মতে "Millat akhirat" শব্দটি দ্বারা ইসলামের আগমনের পূর্বে শেষ যে ধর্ম পৃথিবীতে প্রচারিত হয় তাকেই বোঝানো হয়েছে , অর্থাৎ খৃষ্টীন ধর্ম যা আল্লাহ্‌র একত্বের ধারণা বিচ্যুত হয়ে তা পিতা পুত্র পবিত্র আত্মা এই ত্রিতত্বে পর্যবসিত হয়।

০৮। "কি! আমাদের সকলের মধ্যে বুঝি তার নিকটেই ওহী প্রেরণ করা হয়েছে ? " ৪১৫৪। তারা আমার ওহী সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করে [ কারণ ] তারা এখনও আমার শাস্তি আস্বাদন করে নাই ৪১৫৫।

৪১৫৪। এই আয়াতটির মাধ্যমে কোরেশদের হিংসা ও দ্বেষের চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিলো , " যদি আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ পৃথিবীতে প্রেরণ করতেই হয়, তবে তা আসা উচিত প্রভাবশালী কোরেশ নেতাদের নিকট। তা না হয়ে তার আগমন কেন আব্দুল্লাহ্‌র এতিম পুত্রের নিকট হবে?"

৪১৫৫। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ সম্পর্কে কোরেশ নেতাদের কোনওরূপ ধারণা ছিলো না। পার্থিব জিনিষ - ক্ষমতা সম্পদ প্রভাব প্রতিপত্তির চারিপাশে আবর্তিত হয়। কিন্তু যা স্বর্গীয় তা লাভ করার জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি। যদি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে তবে তাদের জন্য আল্লাহ্‌র শাস্তি অবধারিত।

এই আয়াতগুলির মাধ্যমে মানুষের সত্য বিমুখতার প্রবণতাকে তুলে ধরা হয়েছে। তারাই সত্য বিমুখ ও সত্য -বিদ্বেষী যারা সমাজে সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করে থাকে। এ কথা সর্ব যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। ভবিষ্যতেও প্রযোজ্য হবে।

০৯। তোমার প্রভুর অনুগ্রহের ভান্ডার কি ওদের নিকট আছে ৪১৫৬ - [ যিনি ] ক্ষমতায় পরাক্রমশালী এবং অফুরন্ত অনুগ্রহ বণ্টনকারী ?

৪১৫৬। অবিশ্বাসীরা আল্লাহ্‌র জ্ঞান বিবেচনাকে বিচার করে, প্রশ্ন করে। কিন্তু আল্লাহ্‌র ক্ষমতা ও দয়াকে অনুধাবন করার ক্ষমতা কি তাদের আছে? আল্লাহ্‌ সর্বশক্তিমান ,তিনি অসীম ক্ষমতা ও করুণার আঁধার। আল্লাহ্‌ কাকে তাঁর করুণায় ধন্য করবেন আর কাকে করবেন না , সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে ? তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহের জন্য নির্বাচিত করেন।

১০। অথবা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ও উহার মধ্যবর্তী সকল কিছুর রাজত্ব কি তাদের ? যদি তাই হয় , তবে [ শেষ সীমানাতে ] তারা দড়ি ও [অন্য ] উপায়ে আরোহণ করুক ৪১৫৭।

৪১৫৭। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের তুলনায় মানুষ অতি ক্ষুদ্র প্রাণী। তার এই ক্ষুদ্রত্ব সত্বেও কি ভাবে সে সর্বশক্তিমান বিশ্বস্রষ্টার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করে ? তাদের ব্যবহারে মনে হয় সকল সৃষ্টির প্রভু তারাই , আল্লাহ্‌ নন। এখানে আল্লাহ্‌ এসব অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন যে, যদি ক্ষমতা থাকে তবে তারা আকাশে আরোহণ করে তার শেষ দেখে নিক। চেষ্টা করে দেখুক, তবুও তারা এভাবে আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে পারে কি না।

১১। বহুদলের এই বাহিনীও সেক্ষেত্রে অবশ্যই পরাজিত হবে ৪১৫৮।

৪১৫৮। কোনও ভাবেই কাফেররা আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্য নস্যাৎ করতে পারবে না। যদিও তারা সমবেত ভাবে সত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তবুও তাদের সাফল্য লাভ ঘটবে না , তাদের হবে অপমানজনক পরাজয়। আয়াত ১৩ এর শেষাংশ দেখুন বহু বাহিনী বা দলের সম্বন্ধে।

১২। ওদের পূর্বেও [ অনেকেই ] রাসুলদিগকে অস্বীকার করেছিলো ৪১৫৯, - নূহের সম্প্রদায়, আ'দ এবং কীলকের অধিপতি ফেরাউন ৪১৬০,

৪১৫৯। সত্যকে প্রতিরোধ করার এই প্রবণতা রাসুলের [ সা ] সময়ে যেমন ছিলো ঠিক সেরূপই ছিলো নূহ্‌ নবীর সম্প্রদায়ের বা আ'দ ও সামুদ জাতির। এ সঙ্গে আরও উল্লেখ করা হয় মিশরের মহাশক্তিধর নৃপতি ফেরাউনের এবং লূতের সম্প্রদায়ের [ দেখুন ৩৭ : ৭৫-৮২ ; ৭ : ৬৫ -৭৩ ; ৭ : ১০৩ - ১৩৭ ; ৭ : ৮০-৮৪ ]। এদের কথা আল্লাহ্‌ বারে বারে উল্লেখ করেছেন ঔদ্ধত্য এবং বিদ্রোহীদের উদাহরণ হিসেবে। এরা সকলেই উদ্ধত অহংকারে আল্লাহ্‌র শিক্ষাকে গ্রহণে অস্বীকার করে যার পরিণতি হয়েছিলো অত্যন্ত মন্দ। পরবর্তী প্রজন্মও কি তাদের উদাহরণের মাধ্যমে শিক্ষালাভ করবে না ?

৪১৬০। ফেরাউনের উপাধি বলা হয়েছে ," বহু কীলকের অধিপতি" ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে ," Lord of the stakes." । এই বাক্যটি দ্বারা ফেরাউনের ক্ষমতা ও দম্ভকে প্রকাশ করা হয়েছে নিম্নোক্ত ভাবে : ১) stakes বা কীলক যার অর্থ সৈনিকদের শিবির যা বড় বড় কীলক দ্বারা ভূমিতে স্থাপন করা হয়। কীলক তাঁবুকে শক্ত ও মজবুত করে। এখানে কীলককে দৃঢ়তা ও অটলভাবে প্রতিষ্ঠার প্রতীক স্বরূপ ব্যবহার করা হয়েছে। ২) বহু শিবির বা কীলকের অর্থ হচ্ছে বিশাল সৈন্য শিবির বা সেনাদল। ৩) ফেরাউন তার দম্ভ , ক্ষমতা ও অহংকারকে প্রকাশের জন্য বহু লোককে শুলে বা কীলকের চড়িয়ে হত্যা করতো।

১৩। এবং সামুদ , এবং লূতের সম্প্রদায়, এবং অরণ্যের অধিবাসীরা ৪১৬১ - এরা ছিলো [সকলে বিশাল ] বাহিনী ৪১৬২।

৪১৬১। " আয়কাবাসীর " বা "অরণ্যের অধিবাসীর" জন্য দেখুন [১৫ : ৭৮ ] এবং টিকা ২০০০।

৪১৬২। দেখুন উপরের আয়াত [ ৩৮ : ১১ ] এবং টিকা ৪১৫৮।

১৪। এরা প্রত্যেকেই রাসুলগণকে প্রত্যাখান করেছিলো ফলে আমার শাস্তি অবশ্যম্ভাবীভাবে [ তাদের উপরে ] পতিত হয়েছে ৪১৬৩।

৪১৬৩। দেখুন [ ১৫ : ৬৪ ] আয়াত ও টিকা ১৯৯০ এবং আয়াত [ ২২ : ১৮ ]।

রুকু - ২

১৫। [ আজকে ] তারা শুধু অপেক্ষা করছে একটি মাত্র বিস্ফোরণের ৪১৬৪ -। [ তা যখন আসবে ] তখন কোন বিরাম থাকবে না ৪১৬৫।

৪১৬৪। দেখুন আয়াত [ ৩৬ : ২৯ ] ও টিকা ৩৯৭৩।

৪১৬৫। 'Fawaq' - দেরী , গরুর দুধ দুইতে বোঁটা থেকে হাত আলগা হলে পুণরায় হাত ফিরে আসতে যে সময় লাগে ততটুকু বা তদপেক্ষা কম সময়। সময়টি খুবই স্বল্পক্ষণ, বাক্যটির অর্থ যখন আল্লাহ্‌র শাস্তি নিপতিত হবে তখন আর একমূহুর্ত সময় থাকবে না - তা সংগে সংগে সংঘটিত হবে বিরামহীনভাবে।

১৬। তারা বলে, " হে আমাদের প্রভু ! শেষ বিচারের দিন আসার পূর্বেই তুমি আমাদের দণ্ডাদেশ শীঘ্র দিয়ে দাও। " ৪১৬৬

৪১৬৬। দেখুন [ ২৬ : ২০৪ ] এবং টিকা ৩২৩০। যারা মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাসী নয়, তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে থাকে এই বলে যে, " আমাদের শাস্তির জন্য পরকালের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই সাথে সাথে দিয়ে দেয়া হোক। অর্থাৎ যদি আল্লাহ্‌র সে ক্ষমতা থাকে, দেরীর কোনও কারণ নাই। " এসব লোক সম্বন্ধেই পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে যে, তারা শীঘ্রই প্রকৃত সত্যকে অনুধাবন করতে পারবে , কিন্তু তখন আর সময় থাকবে না , অনুতাপ করার বা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও করুণা লাভ করার। এরা আল্লাহ্‌র নবীদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে থাকে এখানে আল্লাহ্‌ তাদের ধৈর্য্য ধারণ করতে উপদেশ দিয়েছেন কারণ আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই। এমন কি দাউদ নবীর মতো মহাপরাক্রমশালী নৃপতিকে তাঁর সমসাময়িক লোকদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের পরিবর্তে প্রচন্ড ধৈর্য ধারণ করতে হয়েছিলো।

১৭। তারা যা বলে তুমি তাতে ধৈর্য ধর , এবং স্মরণ কর আমার বান্দা দাউদের কথা যে ছিলো শক্তিশালী এবং সর্বদা [আল্লাহ্‌র ] অভিমুখী ৪১৬৭।

৪১৬৭। দাউদ নবী ছিলেন স্বাভাবিক মানুষের থেকেও বিরল শক্তির অধিকারী। তিনি যখন ছিলেন অনভিজ্ঞ যুবক মাত্র তখনই তিনি গোলিয়াথ নামক দৈত্যকে হত্যা করেন। দেখুন [ ২ : ২৪৯ - ২৫২ ] এবং টিকা ২৮৬ - ৮৭। গোলিয়াথের সাথে যুদ্ধের পূর্বে তাঁর শক্তি সম্বন্ধে তাঁর শত্রুরা হাসাহাসি করেছিলো ; এমনকি তাঁর বড় ভাই তাকে যুদ্ধের ইচ্ছা প্রকাশের জন্য ভৎর্সনা করেছিলো। কিন্তু কোনও কিছুই দাউদ নবীকে আল্লাহ্‌র উপরে একান্ত নির্ভরশীলতা ও বিশ্বাস থেকে টলাতে পারে নাই। তিনি আল্লাহ্‌র উপরে গভীর বিশ্বাসের সাথে গোলিয়াথের সাথে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দেশের রাজা হন।

১৮। আমি পর্বতমালাকে তার সাথে সন্ধ্যায় ও ঊষালগ্নে আমার মহিমা ঘোষণা করতে বাধ্য করেছিলাম ৪১৬৮।

৪১৬৮। দেখুন আয়াত [২১ : ৭৯ ] ও টিকা ২৭৩৩। মানুষের অনুভুতিকে উপলব্ধির মাধ্যমে তীক্ষ্ণ করলে মানুষ দেখতে পেতো বিশ্বপ্রকৃতি সকল কিছুই আল্লাহ্‌র প্রশংসা কীর্তন করে চলেছে , আল্লাহ্‌র একত্ব ঘোষণা করছে। বিশ্ব প্রকৃতির সকল কিছুই এক প্রাকৃতিক আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত , যেমন আলোর কথাই ধরা যাক, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল স্থানেই আলোর ধর্ম এক। মঙ্গলে এক ধর্ম , নিহারিকাতে আর এক ধর্ম , পৃথিবীতে আলোর জন্য অন্য ধর্ম , এ ব্যবস্থা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের কোথাও নাই। বিভিন্ন স্রষ্টা হলে তাই-ই ঘটতো। এভাবেই জড় ও জীব প্রত্যেকেই একই সুত্রে গাঁথা এবং একই সুত্র মানার মাধ্যমে তারা আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ ঘটায় ও প্রশংসা গীত গায়। দাউদ নবীকে আল্লাহ্‌র সঙ্গীতে বিশেষ প্রতিভা দান করেন। তিনি যখন আল্লাহ্‌র প্রশংসা গীত গাইতেন তখন তাঁর সাথে আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, বিশ্ব প্রকৃতি যোগদান করতো। প্রভাতে পাখীরা যখন তাদের সারাদিনের যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয় , সন্ধ্যায় পাখীরা যখন দিন শেষে তাদের সারা রাতের ঘুমের জন্য নীড়ে ফিরে আসে, তখন পাখীরা সমস্বরে ডাকাডাকি করে। দাউদ নবীর সাথে এই সময়ে পাখীরা একসাথে আল্লাহ্‌র গুণগানে নিমগ্ন হয়ে পড়তো।

১৯। এবং পাখীদের [ সভায় ] সমবেত করতাম , যারা প্রত্যেকে [আল্লাহ্‌র ] অভিমুখী হতো ৪১৬৯।

৪১৬৯। এই আয়াতটি পূর্বের [ ১৭ নং ] আয়াতেরই প্রতিধ্বনি বা ধারাবাহিকতা। আরবী শব্দ 'Awwab' এই উভয় আয়াতেই লক্ষ্য করা যায় যার বাংলা অনুবাদ হয়েছে অভিমুখী। এই শব্দটির দ্বারা সূরাটির সারাংশ বা মূল স্পন্দনকে প্রকাশ করা হয়েছে। সূরাটির মূল বক্তব্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রশংসা ও প্রার্থনায় নিমগ্ন হও। কারণ তা হচ্ছে সকল পার্থিব জ্ঞান ও ক্ষমতার থেকে বহু উর্দ্ধে।

২০। আমি তাঁর রাজত্বকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম প্রজ্ঞা এবং অভ্রান্ত বিচারের জন্য দিয়েছিলাম বাগ্মিতা এবং সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ৪১৭০।

৪১৭০। এই রূপক কাহিনী বাইবেলে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুর-আনে শুধুমাত্র অন্তর্নিহিত বক্তব্যকে উত্থাপন করা হয়েছে। দাউদ নবীর ন্যায় বিচারের জন্য দেখুন [ ২১ : ৭৯ ] আয়াত ও টিকা ২৭৩২। তিনি উপযুক্ত ভাষার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন যার উদাহরণ হচ্ছে তার রচিত ধর্ম-সংগীত সমূহ।

২১। তোমার নিকট কি বিবাদমান লোকদের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে ? ৪১৭১ যখন তারা ব্যক্তিগত এবাদত খানাতে প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে নেমেছিলো ?

৪১৭১। দাউদ নবী ছিলেন এক অতি পূণ্যবান মানুষ। আল্লাহ্‌র এবাদতের জন্য তাঁর ছিলো এক অতি সুরক্ষিত স্থান [Mirhab] বা এবাদত খানা।

২২। যখন তারা দাউদের নিকট উপস্থিত হলো ৪১৭২, এবং সে তাদের দেখে আতঙ্কগ্রস্থ হলো , [ তখন] তারা বলেছিলো , " ভয় পাবেন না; আমরা দুই বিবাদমান পক্ষ, আমাদের একজন অন্যজনের প্রতি অত্যাচার করেছে। অতএব আমাদের মাঝে ন্যায় বিচার করুন , অন্যায় বিচার করবেন না এবং আমাদের সঠিক পথ নির্দ্দেশ করুন।

৪১৭২। রাজা হিসেবে সকল কাজ সমাপান্তে দাউদ নবী নির্দ্দিষ্ট সময়ে তার ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করতেন আল্লাহ্‌র এবাদত ও প্রশংসা করার জন্য। একদিন তিনি যখন তাঁর ইবাদতখানাতে এবাদতে মশগুল , তখন হঠাৎ করে দুজন লোক প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে তার ইবাদতখানাতে প্রবেশ লাভ করে। দাউদ নবী তাদের অপচ্ছায়া দেখে ভয় পেয়ে যান। কিন্তু তারা বলে যে, " আমরা দুই ভাই , দেশের রাজা হিসেবে আপনার নিকট ন্যায়বিচার লাভের জন্য আমাদের আগমন। আমাদের মধ্যে বিবাদের মীমাসংসার জন্য আপনার নিকট আমরা এসেছি। "

২৩। "এই লোকটি আমার ভাই ৪১৭৩। ওর আছে নিরানব্বইটি দুম্বা এবং আমার আছে [ মাত্র ] একটি। তবুও সে বলে এটাকে আমার অধীনে দিয়ে দাও।  অধিকন্তু সে আমার প্রতি কর্কশ ভাষী।"

৪১৭৩। দুই ভাই এর মধ্যে যে বেশী অত্যাচারিত সে বক্তব্য শুরু করলো এভাবে, " আমার এই ভাই এর নিরানব্বইটি ভেড়ার একটি পাল আছে। আমার আছে মাত্র একটা। সে আমার এই একটি মাত্র দুম্বাকেও দখল করে নিতে চায়। উপরন্তু আমার সাথে তাঁর ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। তার কথাবার্তা দুরভিসন্ধিমুলক। সে এই ভেড়াটি অংশীদারী ভিত্তিতে গ্রহণ করার কথা বলে না। এবারে আমি কি করবো?"

২৪। [ দাউদ ] বলেছিলো , " সে তোমার [ একটি মাত্র ] দুম্বাকে তার দুম্বা [ দলের ] সাথে যোগ করতে চেয়ে নিঃসন্দেহে সে তোমার প্রতি অন্যায় করেছে ৪১৭৪। প্রকৃত পক্ষে [ব্যবসাতে ] অনেক অংশীদারই একে অন্যের উপরে অন্যায় করে থাকে ৪১৭৫। তারাই করে না যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে এবং তারা সংখ্যায় কত অল্প ? " - দাউদ বুঝতে পারলো যে আমি তাঁকে পরীক্ষা করলাম। সে তাঁর প্রভুর ক্ষমা ভিক্ষা করলো ৪১৭৬ এবং [ সিজ্‌দায় ] নত হয়ে লুটিয়ে পড়লো এবং [অনুতাপে আল্লাহ্‌র ] অভিমুখী হলো ৪১৭৬ক।

৪১৭৪। সম্পূর্ণ পরিবেশই ছিলো রহস্যজনক কারণ যে ভাই অন্যায়কারী সে ভাইও অত্যাচারিত ভাইএর সাথে দাউদ নবীর নিকট আগমন করেছিলেন। রাজার প্রাসাদের সুউচ্চ দেয়াল, প্রহরীদের চক্ষু ফাঁকি দিয়ে অতিক্রম করা ছিলো এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু জীবন বাজি রেখে অন্যায়কারীর তা করার কোনও প্রয়োজন ছিলো না এবং সে অভিযোগ খন্ডন করার জন্য কোনও যুক্তিও উত্থাপন করে নাই। দাউদ নবী তাদের অভিযোগ শ্রবণ করেন এবং মিথ্যা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রচার করেন। লোভ ত্যাগ করে যার যা প্রাপ্য তাই নিয়ে সকলের সন্তুষ্ট থাকা উচিত।

৪১৭৫। দাউদ নবী তাঁর প্রচারণার সময়ে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন ব্যবসায়ে সক্রিয় অংশীদের মধ্যে ন্যায় বিচারের প্রতি। অংশীদারিত্বের প্রধান শর্ত-ই হচ্ছে কেউ কারও প্রতি প্রতারণা না করা , কেউ কারও সুযোগ গ্রহণ না করা। কিন্তু কত সামান্য সংখ্যক লোক আছে পৃথিবীতে যারা এই শর্ত মেনে চলে। যারা তা মেনে চলে তারাই পৃথিবীতে পূণ্যাত্মা। এই বিচার করার সময়ে দাউদ নবীর অন্তরে নিজের ন্যায় বিচার করার ক্ষমতা ও আল্লাহ্‌র প্রতি আত্মসমর্পনকারী রূপে মনে মনে গর্বের সূচনা ঘটে, কিন্তু হঠাৎ করেই লোকদ্বয় অন্তর্ধান করে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁর বোধদয় ঘটে। তিনি বুঝতে পারেন যে, সম্পূর্ণ ঘটনাটি ছিলো তার জন্য এক পরীক্ষা স্বরূপ। আল্লাহ্‌ তার নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক ভাবে তিনি কতটুকু আল্লাহ্‌র প্রতি নিবেদিত তাই পরীক্ষা করতে চেয়েছেন। যদিও রাজা হিসেবে তিনি ছিলেন দক্ষ প্রশাসক ও মহান , বিচারক হিসেবে ছিলেন ন্যায়বিচারক , কিন্তু এক মূহুর্তের জন্য তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, এসব ক্ষমতা তাঁর নিজস্ব নয়, মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে এসব ক্ষমতা দান করেছেন মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য। এক মূহুর্তের জন্য তাঁর অন্তরে তাঁর নিজস্ব ক্ষমতার জন্য গর্ববোধ হয়েছিলো। "অবিচার করে না কেবল মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ এবং তারা সংখ্যায় অল্প।" এই বাক্যটি তাঁর আত্মগর্বেরই প্রকাশ মাত্র। কিন্তু যে মূহুর্তে লোকদ্বয় অন্তর্ধান করে সাথে সাথে তাঁর চৈতন্যদয় ঘঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে, গর্ব ও অহংকার রূপ শয়তান তার আধ্যাত্মিক জগতকে ক্ষণকালের জন্য হলেও গ্রাস করেছে। সাধারণ লোকের মত তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে তাঁর মধ্যে জ্ঞান , প্রজ্ঞা ও ন্যায়বোধ জন্মলাভ করেছে ; তিনি শুধু এসবের ধারক , বাহক ও রক্ষকমাত্র। এতে তার নিজস্ব কৃতিত্ব খুব বেশী নাই। এ সব লাভ করার জন্য তার উচিত বিনয়ের সাথে আল্লাহ্‌র নিকট ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা ও আত্মসমর্পন করা।

উপদেশ : সাধারণ মানুষ কত সামান্য কারণেই আত্মগর্ব , আত্মগরিমা ও অহংকারে মেতে উঠে তা আশ্চর্য্যজনক , যা ব্যক্তি নিজেও অনুধাবনে অক্ষম। যেরূপ অক্ষম হয়েছিলেন দাউদ নবী ; যদিও তা ক্ষণকালের জন্য । আত্মগর্ব , আত্মগরিমা ও অহংকার মানুষকে শয়তানের রাস্তায় পরিচালিত করে , কারণ মানুষ ভুলে যায় পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সকল কিছুই আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ।

৪১৭৬। দাউদ নবীর এই আত্মগরিমা ও আত্মগর্ব সাধারণের জন্য কোনও গুরুত্বই বয়ে আনে না। কারণ সাধারণ লোকের ধারণা যে, তিনি তো কোনও অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। তিনি একজন ভালো এবং ন্যায়বান নৃপতি। তাঁর কোনও কার্যক্রমে বাহ্যিক অন্যায় ঘটে নাই। কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে তিনি ছিলেন এক উচ্চমার্গের ব্যক্তি। আল্লাহ্‌র নিকটতম সান্নিধ্যে তাঁর অবস্থান [Muqarrabun ৫৬ : ১১ ]। সুতারাং এ সব পবিত্র আত্মাতে আত্মগর্বের স্থান নাই। দাউদ নবী যখনই আত্মোপলব্ধি করতে পারলেন , সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভের চেষ্টা করেন। পরবর্তী আয়াতে দেখুন আল্লাহ্‌ তাঁকে ক্ষমা করে দেন।

উপদেশ : মানুষের অবচেতন মনে সর্বদা শয়তান তাঁর জাল বিস্তার করে যার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে অহংকার , আত্মগর্ব ও আত্মগরিমা। দাউদ নবীর মত, মানুষ অনেক সময়ে নিজে বুঝতেই পারে না যে, সে আত্মগরিমার দ্বারা আক্রান্ত।

৪১৭৬-ক। অনেক তফসীরকারের মতে এখানে দাউদ নবীর অপরাধ ছিলো যে তিনি অন্য পক্ষের কোন যুক্তি না শুনেই তাড়াতাড়ি বিচারের রায় প্রদান করেন। যখন তিনি তাঁর অপরাধ বুঝতে পারলেন তিনি অনুতাপে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

২৫। সুতারাং তাঁর এই [ ত্রুটি ] আমি ক্ষমা করলাম। সে উপভোগ করেছে আমার নৈকট্য এবং তার [শেষ ] প্রত্যাবর্তন স্থান হবে উত্তম।

২৬। হে দাউদ ! আমি অবশ্যই তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি ৪১৭৭। সুতারাং মানুষের মধ্যে সত্য ও [ ন্যায়ের ] ভিত্তিতে বিচার -মীমাংসা কর। তোমার [ হৃদয়ের ] কামনা বাসনার অনুসরণ করো না। কারণ তারা তোমাকে আল্লাহ্‌র পথ থেকে ভ্রষ্ট করবে ৪১৭৮। যারা আল্লাহ্‌র পথ থেকে ভ্রষ্ট হয় তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি। কারণ তারা হিসাবের দিবসকে বিস্মৃত হয়েছিলো।

৪১৭৭। দেখুন আয়াত [২ : ৩০ ] এবং টিকা ৪৭। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ দাউদ নবীকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করেছেন। দাউদ নবীর রাজা হিসেবে প্রশাসনিক ক্ষমতা, জ্ঞান ,প্রজ্ঞা , ন্যায়বিচারের ক্ষমতা, সঙ্গীতের প্রতিভা , নবুয়ত্ব সবই আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ; এবং আল্লাহ্‌ তাঁকে অনুগ্রহ করেছেন সেটাতে তার নিজস্ব কোন কৃতিত্ব নাই। আত্মগরিমার কোনও অবকাশ নাই। দাউদ নবীর এই উদাহরণ থেকে সাধারণ মানুষের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষ তাদের মেধা, মননশীলতা, প্রতিভা,সৃজনশীলতা ; সাফল্য কৃতিত্ব সব কিছুর জন্য আল্লাহ্‌র পরিবর্তে আত্মগরিমায় লিপ্ত হয়। এ কথা সত্যি যে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহকে নিজস্ব চেষ্টার মাধ্যমে আয়ত্ব করতে হয়। কিন্তু যদি মেধা বা সৃজনশীলতা বা প্রতিভা জন্মগত ভাবে লাভ না করে ,তবে চেষ্টা দ্বারা এসব করায়ত্ব করা সম্ভব নয়। সুতারাং জীবনের সকল , সাফল্যের মূল হচ্ছে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ এবং তার জন্য মানুষ অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে।

৪১৭৮। মুসলিম দর্শন অনুযায়ী দাউদ নবী বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন ন্যায় বিচারক। এই আয়াত গুলির মাধ্যমে দাউদ নবীর চরিত্রের নির্মলতা প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে যে সামান্য পরিমাণ আত্ম অহংকার আত্মার মাঝে উদয় হওয়ার সাথে সাথে তিনি তা অনুতাপের বারিধারাতে ধুয়ে মুছে ফেলে সদ্যস্নাতরূপে প্রস্ফুটিত হন। দাউদ নবী সম্বন্ধে বাইবেলের ধারণার সাথে মুসলিমদের ধারণার বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

রুকু - ৩

২৭। আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং এ দুই এর মধ্যবর্তী সকল কিছু উদ্দেশ্য বিহীন ভাবে সৃষ্টি করি নাই। যারা অবিশ্বাসী শুধু তারাই [ ভুল ] ধারণা করে ! কিন্তু আফসোস অবিশ্বাসীদের জন্য , কারণ [তাদের জন্য রয়েছে ] জাহান্নামের আগুন! ৪১৭৯

৪১৭৯। দেখুন আয়াত [ ৩ : ১৯১ ]। আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস হচ্ছে আত্মার এক বিশেষ অবস্থা , চুম্বক যেরূপ যেকোনও অবস্থাতেই পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে মুখ করে থাকবে, বিশ্বাসী আত্মার অবস্থান হবে সেরূপ সকল অবস্থায় থাকবে আল্লাহ্‌র অস্তিত্বে নিমগ্ন। ফলে পরলোকের জীবন তাঁর নিকট হবে বাস্তব সত্য যার পটভূমিতে পার্থিব এই জীবন হবে সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলাতে পরিপূর্ণ। অপরপক্ষে আল্লাহ্‌র অস্তিত্বে অবিশ্বাসী যে আত্মা সে আত্মায় পরলোকের জীবনে বিশ্বাসহীনতার জন্য , ইহলোকের পার্থিব জীবন হবে উদ্দেশ্য বিহীন। নোঙ্গর ছেড়া নৌকার ন্যায় - উদ্‌ভ্রান্ত ,লক্ষ্যহীন , দিগভ্রান্ত। অবিশ্বাসের ধারণা হচ্ছে প্রকৃত বিশ্বাসের বিপরীত ঠিক যেরূপ নিখিল বিশ্বে বিশৃঙ্খলা শৃঙ্খলার বিপরীত, দোযখের আগুনের বিপরীত হচ্ছে বেহেশতের শান্তি।

২৮। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আমি কি তাদের সমপর্যায়ভুক্ত করবো তাদের সাথে যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়? যারা নিজেকে পাপ থেকে রক্ষা করে তাদের কি সমপর্যায়ভুক্ত করবো তাদের সাথে যারা ন্যায় [ ও সত্যকে ] দূরে সরিয়ে রাখে ? ৪১৮০

৪১৮০। এই সূরার ২৬ নং আয়াতের শেষে " হিসাব দিবসের " উল্লেখ আছে। এই "হিসাব দিবস" হচ্ছে শেষ বিচারের দিন, পরকালে যেদিন ইহকালের হিসাব গ্রহণের মাধ্যমে কর্মফল দান করা হবে। অবিশ্বাসীরা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যুর সাথে সাথে জীবনের সব শেষ হয়ে যাবে। আত্মার অস্তিত্বে তারা বিশ্বাসী নয়। আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস মানুষকে আধ্যাত্মিক জগতের শ্রেষ্ঠত্ব ও পতনের ধারণা দান করে। পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র নেয়ামত সকলে সমভাবে ভোগ করে না। যদি ইহকালের কর্মফলের ভিত্তিতে পরকালের বিচার নাই হবে , তবে কি ভাবে পৃথিবীতে পাপী ও পূণ্যাত্মা , ভালো ও মন্দের যে বৈষম্য তা মেনে নেয়া যায় ? ধর্মের গোড়ার কথাই হচ্ছে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করা। আত্মা অমর এবং অবিনশ্বর। প্রতিটি আত্মাকে ইহাকালের কর্মের হিসাব দাখিল করতে হবে পরকালে। সেদিন সকল বৈষম্যের সমতা বিধান করা হবে। আল্লাহ্‌ ভালো-মন্দ ,পাপী-পূণ্যাত্মা সকলকে একভাবে বিচার করবেন না। যদি আত্মার অস্তিত্ব না থাকতো যদি মৃত্যুর মাধ্যমেই জীবনের শেষ হয়ে যেতো, তাহলে মনুষ্য জন্ম বৃথা হয়ে যেতো।

২৯। এই কিতাব [ কুর-আন্‌ ] তোমার নিকট প্রেরণ করেছি যা কল্যাণে পরিপূর্ণ; মানুষ যেনো এর আয়াতসমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে পারে এবং বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষেরা যেনো তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে ৪১৮১।

৪১৮১। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ বা কোরাণের অবতীর্ণ কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। কোরাণের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র আশীর্বাদ ও মঙ্গল মানুষের নিকট পৌঁছায়। আল্লাহ্‌ আমাদের স্রষ্টা। মানুষের প্রকৃত কল্যাণের উপায় তাঁর থেকে বেশী আর কেউই জানে না। আত্মিক উন্নতির বিভিন্ন ধাপ এই কিতাবে [ কোরাণে ] বর্ণিত আছে। মানুষের মাঝে যে আত্মার বাস তা পরমাত্মার অংশ [ রুহু ]। আত্মার প্রশান্তি পৃথিবীতে বেহেশতের শান্তি আনায়ন করে। আত্মার অশান্তি পৃথিবীকে দোযখে পরিণত করে। আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বা শান্তির পথ প্রদর্শন করে এই কিতাব [কোরাণ ]। কোরাণকে যদি কেউ প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করে ,এর আয়াতসমূহ চিন্তার মাধ্যমে অনুধাবনের চেষ্টা করে , তবে সে বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে তাঁর অবস্থান ও মানুষের সাথে প্রকৃতির ও আল্লাহ্‌র সর্ম্পককে অনুধাবনে সক্ষম হবে। চিন্তাশীল ও বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য কোরাণ হচ্ছে এক মহাগ্রন্থ - যা তাদের মনের সকল সন্দেহের অবসান ঘটায়, এবং সকল প্রশ্নের সমাধান করে। এভাবেই কোরাণের মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা আধ্যাত্মিক জগতের শিক্ষালাভ করে থাকেন। উদভ্রান্ত আত্মা সঠিক পথ খুঁজে পায়, বুঝতে সক্ষম হয় বিশ্বজগতে মানুষের সৃষ্টির রহস্য।

৩০। আমি দাউদকে [ পুত্র হিসেবে ] দান করেছিলাম সুলাইমানকে ৪১৮২। কত চমৎকার সে ছিলো আমার সেবায় ! সে সর্বদা [ আমার ] অভিমুখী ছিলো।

৪১৮২। মানুষের মাঝে পরমাত্মার বাস যা অমর এবং অবিনশ্বর। পৃথিবীর সকল কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু আত্মার ধ্বংস নাই। আধ্যাত্মিক উন্নতিই হচ্ছে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থানের প্রধান কারণ। আত্মিক উন্নতি ব্যতীত পার্থিব জীবন এবং জাগতিক বিষয়বস্তু অর্থহীন । এই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য পুণরায় দাউদ নবী ও তার পুত্র সুলাইমানের উল্লেখ করা হয়েছে। সুলাইমান ছিলেন এক শক্তিশালী ও মহান নৃপতি। কিন্তু তাঁর মহত্ব ও শক্তির প্রকৃত উৎস হচ্ছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌। সুলাইমান সম্বন্ধে কোরাণে বলা হয়েছে ," সে ছিলো অতিশয় আল্লাহ্‌ অভিমুখী" যা ওল্ড টেস্টামেন্ট বা তাওরাতের বক্তব্য থেকে পৃথক। ওল্ড টেস্টামেন্টে সুলাইমানকে পৌত্তলিক এবং আল্লাহ্‌র চোখে পাপিষ্ঠ রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে এভাবে "Doing evil in the sight of the lord" যেখানে কোরাণে তাঁকে আল্লাহ্‌র একান্ত অনুগত ও পূণ্যাত্মারূপে বর্ণনা করা হয়েছে।

৩১। স্মরণ কর! যখন এক অপরাহ্নে তাঁর সামনে ,দ্রুতগামী উন্নত জাতের অশ্বসমূহ নিয়ে আসা হলো ৪১৮৩, ৪১৮৪;

৪১৮৩। এই আয়াতটি সম্বন্ধে ব্যাখ্যাকারীরা একমত নন। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা করেছেন। ইউসুফ আলী সাহেব তাদের মতামতের সাথে নিজস্ব সিদ্ধান্ত যোগ করেছেন।

৪১৮৪। Safinal - আক্ষরিক ভাবে সেই ঘোড়াকে বোঝানো হয়েছে, যে ঘোড়া নিদ্রিত অবস্থায় তার তিনটি পা শক্তভাবে মাটিতে প্রোথিত করে থাকে এবং চর্তুথ পাটি বিশ্রামের জন্য আলগা করে থাকে অর্থাৎ অশ্বের ঘুমন্ত অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। আলংকারিক অর্থে শব্দটি দ্বারা অশ্বের বিভিন্ন গুণাবলীকে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন : উন্নত গুণসম্পন্ন জাতি যথা দ্রুত চলার গতি শিষ্টাচার ইত্যাদি।

৩২। তখন সে বলেছিলো ," আমি তো আমার প্রভুর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে , ঐশ্বর্য প্রীতিতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম ৪১৮৫, যতক্ষণ না সূর্য রাত্রির অবগুন্ঠনে আড়াল হয়ে পড়লো ৪১৮৬।

৪১৮৫। সুলাইমানের [আ ] এই উক্তিটির উল্লেখ ওল্ড টেস্টামেন্টে নাই। মওলানা ইউসুফ আলীর ব্যাখ্যা হচ্ছে হযরত সুলাইমানও তাঁর পিতার ন্যায় আধ্যাত্মিক জগতে অত্যন্ত সাবধান ছিলেন। উক্তিটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত সুলাইমান ক্ষণকালের জন্য অশ্বরাজির মোহে পড়ে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করতে বিস্মৃত হন। পিতা হযরত দাউদের ন্যায় তিনিও আত্মসুখের জন্য পার্থিব জিনিষের মোহে ক্ষণকালের বিস্মৃতিকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখেছিলেন। আত্ম সুখের দ্বারা আত্মিক গুণাবলী নষ্ট করতে চান নাই। তিনি অশ্ব ভালোবাসতেন ; তাঁর ছিলো বিরাট সেনাবাহিনী , অশ্বারোহীদল এবং ঐশ্বর্য,সম্পদ। তিনি তাঁর সকল সম্পদ আল্লাহ্‌র সেবায় নিবেদন করতেন। দেখুন আয়াত [২৭ : ১৯ ] ও টিকা ৩২৫৯ এবং [ ২৭ : ৪০ ] আয়াত ও টিকা ৩২৭৬। রাজ্যের প্রসার ও ক্ষমতা লাভের জন্য তিনি কখনও যুদ্ধ করেন নাই। রক্তের তৃষ্ণা তাঁর ছিলো না। তিনি যুদ্ধ করেছেন জেহাদের কারণে - আল্লাহ্‌র সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই তাঁর অশ্বপ্রীতিকে যোদ্ধাদের অশ্বপ্রীতির সাথে বা যারা ঘোড়দৌড় করে , তাদের অশ্বপ্রীতির সাথে তুলনীয় নয়। তাঁর অশ্বপ্রীতিও ছিলো আল্লাহ্‌র বাণী প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বা জেহাদের অংশ বিশেষ। তাঁর অশ্বের প্রতি এই ভালোবাসা এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় : তা হচ্ছে সর্বোচ্চ মঙ্গলের প্রতীক - আধ্যাত্মিক ভালোবাসা। কারণ অশ্বরাজি প্রস্তুত করা হয়েছিলো জেহাদের জন্য। এই অশ্বের প্রতি আকর্ষণ পার্থিব কারণে নয়, পালনকর্তার স্মরণের কারণেই। কারণ জেহাদ একটি উচ্চস্তরের এবাদত।

কোন কোন তফসীরকারের মতে হযরত সুলাইমান অশ্বের পরিদর্শনে এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে তিনি আসর নামাজের ওয়াক্ত বিগত প্রায় তা লক্ষ্যও করেন নাই।

৪১৮৬। এই আয়াতটির শেষাংশ ইংরেজী ও বাংলাতে দুভাবে অনুবাদ করা হয়েছে। ইংরেজী অনুবাদ হচ্ছে ; "Until [The sun] was hidden in the veil [ of night ]." অর্থাৎ মাগরিবের সময় গত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এবাদতে মশগুল হয়ে পড়েন।

বাংলা অনুবাদ হয়েছে , " যতক্ষণ না সূর্য রাত্রির অবগুণ্ঠনে আড়াল হয়ে পড়লো।" অর্থাৎ অশ্ব পরিদর্শনে নিমগ্ন থাকার ফলে সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে এবং সঠিক সময়ে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করতে পারেন নাই।

৩৩। "এগুলিকে আমার সামনে পুণরায় নিয়ে এসো " অতঃপর সেগুলির পদদেশে এবং ঘাড়ে হাত বুলাতে লাগলো ৪১৮৭।

৪১৮৭। এই আয়াতটিও দুভাবে অনুবাদ করা হয়েছে। ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে , "Bring them back to me." Then began he pass his hand over [ Their ] legs, and their neck. অর্থাৎ এবাদত শেষে তিনি পুণঃরায় অশ্বরাজিকে তাঁর নিকট উপস্থিত করার হুকুম দান করেন এবং অশ্ব প্রেমিকদের ন্যায় অশ্বের গলা এবং সামনের পায়ে হাত বুলাতে লাগলেন।তিনি এরূপ উত্তম অশ্বরাজি প্রাপ্তির জন্য তৃপ্ত ছিলেন কারণ তিনি সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ্‌র শ্রেষ্ঠত্বকে উপলব্ধি করতে পারতেন।

বিভিন্ন বাংলা অনুবাদ হয়েছে, " এই গুলিকে পুণরায় আমার সম্মুখে আনয়ন কর। অতঃপর সে উহাদিগের পদ ও গলদেশ ছেদন করিতে লাগিল।" অর্থাৎ নির্ধারিত নফল এবাদত বাদ পড়ার কারণে তিনি অনুতপ্ত হন এবং স্বাভাবিক ভাবেই অশ্বগুলির প্রতি তাঁর মন রুষ্ট হয়। তিনি সেগুলির পুনরায় আনাইয়া উহাদের কিছু সংখ্যককে কুরবানী করেন।

৩৪। এবং আমি সুলাইমানকে পরীক্ষা করেছিলাম ৪১৮৮, আমি তাঁর সিংহাসনের উপরে মস্তকহীন একটি শবদেহ স্থাপন করেছিলাম ৪১৮৯। কিন্তু সে আমার দিকে ফিরে এলো [ প্রকৃত আনুগত্যের সাথে ] ৪১৮৯।

৪১৮৮। " পরীক্ষা করেছিলাম " - হযরত সুলাইমানের পরীক্ষাটি কি ছিলো ? ঐশ্বর্য, খ্যাতি-যশ যা কিছু পার্থিব সম্পদ আল্লাহ্‌ তাঁকে দান করেছিলেন তা ছিলো তাঁর জন্য এক আধ্যাত্মিক পরীক্ষা। জাগতিক এত সম্পদ, ঐশ্বর্য, ক্ষমতা সুখ যে কোনও মানুষের মাথা ঘুড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সুলাইমান ছিলেন আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বস্ত ও সমর্থনে একনিষ্ঠ। যখন তিনি তার এই প্রভুত সম্পদ , ক্ষমতা [ যে ক্ষমতা শুধু মানুষ নয় , জ্বিন ও প্রাকৃতিক শক্তির উপরেও কার্যকর ছিলো ] ভোগ করছেন, তখনও তিনি জাগতিক প্রলোভনে বিভ্রান্ত হন নাই। তিনি তাঁর মন বা আত্মাকে সর্বদা আল্লাহ্‌র কাজে ও আল্লাহ্‌র সেবায় একনিষ্ঠ ভাবে নিয়োজিত রাখতেন। দেখুন আয়াত [ ৮ : ২৮ ] যেখানে বলা হয়েছে ," জেনে রাখ তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষা স্বরূপ।" আল্লাহ্‌ সুলাইমানকে পৃথিবীর সকল সম্পদ দানের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র প্রতি একনিষ্ঠতার পরীক্ষা করেন।

৪১৮৯। " আমি তাঁর সিংহাসনের উপরে মস্তকহীন একটি শবদেহ স্থাপন করেছিলাম।" - এই লাইনটি সম্বন্ধে বহুবিধ তফসীর বিদ্যমান। তবে সর্বাপেক্ষা যে তফসীরটি যুক্তিগ্রাহ্য এবং মনে আবেদন সৃষ্টি করে তা নিম্নরূপ :

সুলাইমান ছিলেন এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত নৃপতি রাজত্ব করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী। মানুষ, জ্বিন ও প্রকৃতি, পশু ও পাখী , সকলেই তাঁর অধীনে ছিলো। একবার তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন যার ফলে তিনি চলৎশক্তিবিহীন হয়ে পড়েন। এ সময়ে তাঁকে মনে হতো শবদেহ বা লাশের মত। তখন মনে হতো, একটি নিষ্প্রাণ দেহকে সিংহাসনে রেখে দেয়া হয়েছে। এতে তাঁর আত্মার মাঝে উপলব্ধি ঘটলো যে, আল্লাহ্‌র চোখে তিনি কত ক্ষুদ্র ,কত অসহায় , এই বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধির মাধ্যমে স্রষ্টার চরণে নিজেকে নিবেদন করেন।

৩৫। সে বলেছিলো , " হে আমার প্রভু ! আমাকে ক্ষমা কর ৪১৯০ ; এবং আমাকে এমন রাজত্ব দান কর যা আমার পরে কাহারও জন্য [যেনো ] উপযুক্ত না হয়। তুমিই তো সীমাহীন অনুগ্রহ দান করার মালিক ৪১৯১।

৪১৯০। পার্থিব ক্ষমতা আল্লাহ্‌র কাছে যাঞা করা পয়গম্বরদের প্রকৃতি বিরুদ্ধ। যদিও তা যাঞা করা হয় আল্লাহ্‌র জন্য, আল্লাহ্‌র কাজের জন্য , তবুও তাঁর মাঝে কোথায় যেনো আত্মতৃপ্তির বা আত্ম সুখের সন্ধান পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের জন্য জাগতিক বিষয়বস্তু প্রার্থনার মাঝে বিশেষ কোনও অপরাধ নাই। কিন্তু পয়গম্বরদের জন্য আত্মসন্তুষ্টির চিন্তাও অপরাধযোগ্য যা আমরা লক্ষ্য করি সুলাইমানের পিতা হযরত দাউদের ক্ষেত্রে যার উল্লেখ আছে [ ৩৮ : ২৪ ]আয়াতে ও টিকা ৪১৭৬। হযরত সুলাইমান এ কারণেই আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

৪১৯১। হযরত সুলাইমান আল্লাহ্‌র কাছে আরও ক্ষমতা যাঞা করেন - যা তিনি কখনও অপব্যবহার করবেন না। যদিও এত প্রভূত ক্ষমতা সাধারণ লোকদের পক্ষে অপব্যবহার ব্যতীত ভোগ করা অসম্ভব ব্যাপার।

৩৬। তখন আমি বায়ুকে তার অধীন করে দিলাম ৪১৯২। যেনো তা তার আদেশে যেখানে সে ইচ্ছা করতো সেখানে মৃদুমন্দভাবে বয়ে যায় ; ৪১৯৩ -

৪১৯২। দেখুন [ ৩৮ : ৯ ] আয়াত।

৪১৯৩। দেখুন [ ২১ : ৮১] আয়াত ও টিকা ২৭৩৬।

৩৭। এবং শয়তানদের [জ্বিনদের ]। যার মধ্য অর্ন্তগত ছিলো সব রকম রাজমিস্ত্রি ও ডুবুরী ; ৪১৯৪

৪১৯৪। দেখুন আয়াত [ ২১ : ৮২ ] ও টিকা ২৭৩৮ এবং আয়াত [ ৩৪ : ১২-১৩ ] ও টিকা সমূহ। শেষের আয়াতে জ্বিনের উল্লেখ আছে। সম্ভবতঃ এদেরই এক শ্রেণীকে সমুদ্রে মুক্তা আহরণের জন্য নিযুক্ত করা হতো।

৩৮। এবং শৃঙ্খলে আবদ্ধ আরও অনেককে ৪১৯৫।

৪১৯৫। দেখুন আয়াত [ ১৪ : ৪৯ ] যেখানে "শৃঙ্খলাবদ্ধ " শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে পাপীদের শেষ বিচারের দিনে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য।

৩৯। " এই সব আমার অনুগ্রহ ,এ থেকে তুমি অন্যকে দিতে অথবা নিজে রাখতে পার। এর জন্য তোমাকে হিসাব দিতে হবে না ৪১৯৬। "

৪১৯৬। আল্লাহ্‌ সুলাইমানকে অশেষ নেয়ামত দানে ধন্য করেছিলেন। সুলাইমানের প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ গুণে শেষ করা যাবে না। উপরন্তু আল্লাহ্‌ তাঁকে এই নেয়ামত তাঁর ইচ্ছামত কাউকে দান করা বা নিজের জন্য রাখার ক্ষমতা দান করেন। যে কোনও লোকের জন্য আল্লাহ্‌র এত অনুগ্রহ মাথা খারাপ করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সুলাইমান পয়গম্বর সুলভ মানসিকতায় পার্থিব সম্পদের কদর্য দিকও অনুধাবনে সক্ষম ছিলেন সুতারাং তিনি আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা প্রার্থী ছিলেন, এত ক্ষমতা পরবর্তী কেউ হয়তো সঠিক ব্যবহার না করে অপব্যবহার করতে পারে যাতে পৃথিবীর সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা - সে কারণেই তিনি তাঁর পরে অন্য আর কেউ যেনো এত - ক্ষমতা লাভ না করে সে জন্য আবেদন করেন এবং আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাঁর নাম ও খ্যাতি চিরদিনের জন্য পৃথিবীতে অমর করে রাখেন। শুধু তাই-ই নয়,তিনি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ধন্য বান্দাদের মাঝে স্থান লাভ করেন। দেখুন পরবর্তী আয়াত।

৪০। অবশ্যই সে আমার নৈকট্য উপভোগ করেছে ৪১৯৭। তার [শেষ ] প্রত্যাবর্তন স্থান হবে উত্তম।

৪১৯৭। এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে দাউদ নবীর সম্বন্ধে [ ৩৮ : ২৫ ] আয়াতে। এ ভাবেই ইসরাঈলীদের দুজন মহান নৃপতির কাহিনী সমভাবে শেষ করা হয়েছে।

রুকু - ৪

৪১। আমার বান্দা আইয়ুবকে স্মরণ কর ৪১৯৮। দেখো, সে তাঁর প্রভুকে আকুল ভাবে ডেকে বললো, "শয়তান তো আমাকে দুঃখ দুর্দ্দশা ভোগ করাচ্ছে।" ৪১৯৯

৪১৯৮। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াতের জন্য দেখুন আয়াত [ ২১ : ৮৩ - ৮৪ ]।

৪১৯৯। আইয়ুব নবীর বিপদ বিপর্যয় ছিলো নানাবিধ। দেখুন [ ২১ : ৮৩ ] আয়াতের টিকা ২৭৩৯। তাঁর সর্বাঙ্গে ছিলো ঘা, তিনি তাঁর ঘরবাড়ী , বিষয় সম্পত্তি হারান। তাঁর পরিবার হারান, এমনকি তিনি তাঁর মানসিক ভারসাম্যও হারানোর পথে ছিলেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি আল্লাহ্‌র প্রতি অটুট বিশ্বাস থেকে একচুলও চ্যুত হন নাই [ দেখুন নীচের ৪৪ নং আয়াত ]। সুতারাং তাঁর আকুল আবেদনের প্রেক্ষিতে পুণরুদ্ধার কাজ শুরু হয়ে যায়।

৪২। [ আদেশ হলো ] : " তোমার পা দ্বারা আঘাত কর ৪২০০ এই হচ্ছে সতেজ হওয়ার জন্য গোসলের সুশীতল পানি এবং পান করার জন্য পানীয়।

৪২০০। আল্লাহ্‌ আইয়ুব নবীর প্রার্থনা অনুমোদন করলেন এবং তাঁর জীবনের দুঃখ কষ্টের অবসান শুরু হলো, তাঁর প্রতি আদেশ হলো পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত করার ফলে সেখানে একটি ঝরণার সৃষ্টি হলো - যার পানিতে অবগাহনের ফলে তিনি সুস্থতা লাভ করেন , দেহে ও মনে পরিচ্ছন্নতা অনুভব করেন, আত্মার মাঝে সতেজ ভাব উপলব্ধি করেন। এর পানি পানে তিনি তৃপ্তি লাভ করেন। এবং নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করতে পারেন। আইয়ুব নবীর ঘটনা পূর্বেও বর্ণনা করা হয়েছে , কিন্তু তাঁর জীবনের পুনরাম্ভের ঘটনা সেখানে বর্ণনা করা হয় নাই , অথবা আইয়ুব নবীর কিতাবেও এর বর্ণনা নাই। এই সূরাতেই নূতনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে - আল্লাহ্‌র রহমত ও অনুগ্রহের বিকাশের ধারা আমাদের আত্মার মাঝে উপলব্ধির জন্য।

৪৩। এবং আমি তাকে তার পরিজনবর্গ [ফেরত ] দিলাম এবং আমার অনুগ্রহ স্বরূপ সেই সংখ্যাকে দ্বিগুণ করলাম ৪২০১। যাদের বোঝার ক্ষমতা আছে এটা তাদের সকলের জন্য স্মরণীয় স্মৃতি।

৪২০১। দেখুন আয়াত [ ২১ : ৮৪ ] ও টিকা ২৭৩৯ - ২৭৪০।

৪৪। " তোমার হাতে একগুচ্ছ ঘাস নাও এবং তা দ্বারা আঘাত কর; এবং [তোমার প্রতিজ্ঞা ] ভঙ্গ করো না ৪২০২।" সত্যিই আমি তাঁকে ধৈর্য্যশীল ও দৃঢ় রূপে পেয়েছিলাম। আমার সেবায় [ সে ] কত উত্তম ৪২০৩। সে ছিলো সর্বদা আমার অভিমুখী।

৪২০২। ভয়াবহ বিপর্যয়ের এবং দুঃখ কষ্টের মধ্যেও আইয়ুব নবী ধৈর্য্য হারান নাই ; তিনি আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসে ছিলেন দৃঢ়। বাহ্যত তাঁর স্ত্রী সেরূপ ছিলো না। আইয়ুব নবীর কিতাব অনুযায়ী [ ২ : ৯ - ১০ ] তার বর্ণনা নিম্নরূপ :
"Then said his wife unto him,dost thou still retain thine integritz ? Curse God, and die. But he said unto her, thou speaks as one of the foolish women speaketh , what ? Shall we receive good at the hand of God , and shall we not receive evil? In all this did not Job sin with his lips." সম্ভবতঃ তিনি রাগের বশে তাঁর স্ত্রীকে মারার কথা বলেছিলেন। এই আয়াতে তাঁকে উপদেশ দেয়া হয়েছে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না করার জন্য এবং একগোছা ঘাস নিয়ে তা দ্বারা আঘাত করতে বলা হয়েছে। এর দ্বারাই প্রকাশিত হয় তার চরিত্রের কমনীয়তা , ধৈর্য্যশীলতা ও দৃঢ়তা।

৪২০৩। একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে সুলাইমান সম্বন্ধে [ ৩৮ :৩০ ] আয়াতে। পৃথিবীতে মানব সন্তানের আগমন পরকালের প্রস্তুতির জন্য। আর এই প্রস্তুতির সর্বোচ্চ ধাপ হচ্ছে আত্মার উন্নতি লাভ। আত্মপোলব্ধি ও আত্মোন্নতির জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য ও দৃঢ়তা গুণ দুটি অর্জন করা আত্মার মাঝে। ধৈর্য্য ও দৃঢ়তা অর্জন করাও আল্লাহ্‌র এবাদত করা। দৃঢ়তা ব্যতীত ধৈর্য্য হবে জীবন বিমুখতা ও নিষ্কৃয়। সুতারাং যে বিশ্বাস দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য্যের সমন্বয় ঘটায় - সেই মানসিকতা আত্মিক বিকাশের সহায়ক। এ কারণেই কোরাণে আল্লাহ্‌ মানুষের এই দুটি গুণ যা সব্‌র নামে অভিহিত ; তা বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন। [দেখুন সবরের জন্য টিকা ৬১ ]। কবি মিলটনের ভাষায় ; "They also serve who only stand and wait."

৪৫। আমার বান্দা ইব্রাহীম , ইসাহাক্‌ এবং ইয়াকুবকে স্মরণ কর, যারা ছিলো ক্ষমতা ও দূরদৃষ্টির অধিকারী ৪২০৪।

৪২০৪। পূর্বের সূরাতে [ ৩৭ : ৮৩-১১৩ ] ইব্রাহীম এবং ইসাহাকের [ এবং নিহিতার্থে ইয়াকুব ] উল্লেখ আছে যেখানে তাঁদের বর্ণনা করা হয়েছে পাপের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে এবং পাপের বিরুদ্ধে বিজয়ী হিসেবে। এই আয়াতে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তিতে শক্তিশালী এবং অর্ন্তদৃষ্টি সম্পন্ন মানব হিসেবে। তাঁরা ছিলেন ইসরাঈলী সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ যারা তাদের পরকালের সংবাদ দান করেন। সুতারাং তারা ছিলেন ইসরাঈলীদের জন্য আর্শীবাদ স্বরূপ। কারণ তারা প্রকৃত সত্যকে শিক্ষা দেন।

৪৬। আমি অবশ্য তাদের মনোনীত করেছিলাম বিশেষ [ উদ্দেশ্যে ] পরলোকের কথা প্রচারের জন্য।

৪৭। তারা ছিলো আমার দৃষ্টিতে সুনিবার্চিত , উত্তম বান্দাদের অর্ন্তভূক্ত।

৪৮। এবং স্মরণ কর , ইসমাঈল , আল্‌-ইয়াসা এবং জুলকিফলের কথা। এরা প্রত্যেকে উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত ছিলো ৪২০৫।

৪২০৫। হযরত ইসমাঈল আরবদের পূর্বপুরুষ যার উল্লেখ আছে সূরা [ ৩৭ : ১০০১- ১০৭ ] আয়াতে আত্মোৎসর্গের সর্বোচ্চ উদাহরণ হিসেবে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে সজ্জন বান্দাদের একজন হিসেবে অর্থাৎ যারা তার সম্প্রদায়ের জন্য রহমত স্বরূপ। হযরত ইসমাঈলের সাথে হযরত আল্‌ ইয়াসা [ যার উল্লেখ আছে আয়াত ৬ : ৮৬ ] ও টিকা ৯০৬, এবং যুল-কিফলের [ যার উল্লেখ আছে আয়াত ২১ : ৮৫ ও টিকা ২৭৪৩ ] উল্লেখ একই সাথে করা হয়েছে। এই তিনজন একই গুণসম্পন্ন মানব। তারা দুঃখ ও কষ্টে ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন।

৪৯। ইহা [ কুর-আন ] এক [ সর্তককারী ] উপদেশ। পূণ্যাত্মাদের [ শেষ ] প্রত্যাবর্তন স্থান হবে অপরূপ সুন্দর - ৪২০৬

৪২০৬। পূর্বে যারা ভালো এবং মহৎ ব্যক্তিত্বরূপে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের উদাহরণ দেওয়ার পরে মুত্তাকীদের সমবেত ভাবে সম্বোধন করা হয়েছে তাদের ভবিষ্যত হবে অত্যন্ত শান্তিদায়ক। পরলোকে তাদের জন্য আছে মন্দের উপরে বিজয় এবং উত্তম আবাসস্থল।

৫০। অনন্তকাল স্থায়ী উদ্যান, যার প্রবেশ পথ [ সর্বদা ] তাদের জন্য খোলা থাকবে ৪২০৭।

৪২০৭। জান্নাত হবে চিরশান্তি স্থান ; এখানে জান্নাতের বর্ণনায় বলা হয়েছে যে জান্নাত কোন গুপ্ত স্থান বা প্রতিচ্ছায়া বা নির্জন স্থান হবে না। এ কোনও রহস্যময় স্থান হবে না, যা বদ্ধ দরজার ওপারে রহস্যের রাজত্ব বিরাজ করবে। মুত্তাকীদের জন্য বেহেশত্‌ হবে উন্মুক্ত দরজা - যার মাঝে তাদের যাতায়াত হবে অবারিত। কারণ তাদের পবিত্র আত্মাসমূহ বিশ্ব প্রকৃতির সমন্বিত শৃঙ্খলার সাথে একসুত্রে গ্রথিত।

৫১। সেখানে তারা [ আরামে ] হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা [ ইচ্ছামত ] প্রচুর ফলমূল এবং [ উপাদেয় ] পানীয় চাইবে ৪২০৮।

৪২০৮। দেখুন সূরা [ ৩৬ : ৫৭ ] আয়াত ও টিকা ৪০০৩।

৫২। এবং তাদের পার্শ্বে থাকবে আনতনয়না পবিত্র সমবয়স্ক যুবতী [সঙ্গীগণ ] ৪২০৯, ৪২১০।

৪২০৯। দেখুন সুরা [ ৩৭ : ৪৮ ] ও টিকা ৪০৬০ এবং সূরা [ ৩৬ : ৫৬] ও টিকা ৪০০২। পৃথিবীতে আমাদের সুখ ও তৃপ্তির সাথে মিশে থাকে সঙ্গ। যত ভোগের বস্তুই থাকুক না কেন সঙ্গী না থাকলে সুখ নাই ; নিঃসঙ্গতা সুখের বা তৃপ্তির পরিপূর্ণতা আনতে পারে না। যে বস্তু আমাদের আনন্দ দেয়, সেই আনন্দকে নিকটজনের সাথে ভোগ করার মাঝেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিহিত। নিঃসঙ্গ একাকীত্বে কোনও সুখ নাই , আনন্দ নাই। পরিপূর্ণ সুখ ও আনন্দ ভোগ করা যায় পার্শ্বে কেউ থাকলে। এই অনুভূতিকেই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

৪২১০। পৃথিবীতে মানুষ বাস করে সামাজিক ভাবে। সামাজিক জীবনে সুখ ও শান্তিকে পরিপূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন সমবয়স্ক সঙ্গী। বৃদ্ধ ও যুবতী কখনও পরস্পর পরস্পরের সঙ্গ উপভোগ করতে পারে না। পরলোকে সময়ের কোনও সীমা থাকবে না পৃথিবীর ন্যায়। সেই সীমাহীন সময়ের পরিমন্ডলে বৃদ্ধ বয়স থাকবে কি না তার কোনও উল্লেখ এখানে নাই। যদি সেখানে বৃদ্ধ বয়েস নাও থাকে,তবুও যদি শরীর বা মনের গঠনগত প্রকৃতির পার্থক্য থাকে তবে সঙ্গী এমনভাবে নির্বাচিত করা হবে যাতে তারা সমমনোভাব সম্পন্ন হয়। অথবা আমরা এভাবে চিন্তা করতে পারি সেই অমর চিরশান্তির রাজ্যে সকলেরই যৌবন থাকবে চিরস্থায়ী সকলেই হবে সুখী।

৫৩। শেষ বিচারের দিনের জন্য তোমাদের এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো।

৫৪। [ তোমাদের জন্য ] এই হবে আমার অনুগ্রহ যা কখনও শেষ হবে না।

৫৫। হ্যাঁ, ইহাই [ মুত্তাকীদের পরিণাম ] ! পাপীদের [ শেষ ] গন্তব্যস্থল হবে অতি মন্দ স্থান ৪২১১।

৪২১১। ইহাই ! অর্থাৎ এরকমই হবে মুত্তাকীদের পরিণাম। মুত্তাকীদের সুখ ও শান্তির চিত্রের সাথে সমান্তরালভাবে পাপীদের চিত্র অংকন করা হয়েছে

৫৬। জাহান্নাম ! সেখানে তারা দগ্ধ হতে থাকবে, কত মন্দ সে বিছানা [ শোবার জন্য ] ৪২১২।

৪২১২। দেখুন সূরা [ ১৪ : ২৯ ] আয়াত। এই আয়াতেও মুত্তাকীদের সুখ শান্তির চিত্রের সমান্তরাল পাপীদের অবস্থার ছবি আঁকা হয়েছে।

৫৭। হ্যাঁ এরূপই হবে ! অতঃপর তারা আস্বাদন করবে ফুটন্ত তরল পদার্থ এবং কৃষ্ণবর্ণ, অন্ধকারময় তীব্র ঠান্ডা [ তরল পদার্থ ] ৪২১৩-

৪২১৩। দেখুন [ ১০ : ৪ ] আয়াত ও টিকা ১৩৯০। ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে "and a fluid dark marky, intensely cold." ফুটন্ত পানির সাথে পূঁজ অথবা উপরের বর্ণিত তরল পদার্থ যাই-ই যোগ করা হোক না কেন , তা শাস্তির তীব্রতাকেই বোঝানো হয়েছে। বেহেশতের মনোরম পরিবেশের সাথে সুখ ও শান্তির যে উপস্থাপনা করা হয়েছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র হচ্ছে দোযখের বর্ণনা।

৫৮। এবং আরও আছে অনুরূপ সমকক্ষ শাস্তিসমূহ।

৫৯। এই আর এক দল আছে যারা তোমাদের সাথে দ্রুতবেগে তাড়াহুড়া করছে [ দোযখে প্রবেশের জন্য ] ৪২১৪। তাদের জন্য কোন স্বাগত সম্বর্ধনা নাই ! অবশ্যই তারা আগুনে দগ্ধ হবে।

৪২১৪। " দল" - অর্থাৎ বিশাল দল। এ এক অতি আশ্চর্য্য ব্যাপার যে সীমালংঘনকারীদের দল হবে বিশাল। তারা পাপকে খুব আগ্রহের সাথে গ্রহণ করে থাকে। পৃথিবীতে তারা পাপাসক্তদের অধিপতি দ্বারা অভিনন্দিত হতে পারে সত্য, কিন্তু পরলোকের অবস্থান হবে ঠিক এর বিপরীত। তারা সেখানে অভিনন্দনের পরিবর্তে লাভ করবে ভৎর্সনা ও অভিশাপ।

 

৬০। [ অনুসারীগণ তাদের নেতাকে বলবে ] : বরং তোমরাও ! তোমাদের জন্যও কোনও স্বাগত -সম্বর্ধনা নাই। কেননা তোমরাই [ এই শাস্তি ] আমাদের জন্য এনেছ ৪২১৫। এখন বাসের জন্য এই স্থান কত মন্দ।

৪২১৫। পাপীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে , বিপদে পড়লেই তারা তাদের দায়-দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাইবে। পাপের অনুসারীরাও পরকালে তাদের নেতাদের দোষারোপ করতে চাইবে। কিন্তু সেদিন ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বই হবে প্রধান। কারও পাপের জন্য অন্য কেউ দায়ী হবে না।

৬১। তারা বলবে, " হে আমাদের প্রভু ! যে আমাদের উপরে এই [ শাস্তি ] এনেছে , আগুনের শাস্তি তাদের জন্য দ্বিগুণ বর্ধিত কর।" ৪২১৬

৪২১৬। দেখুন আয়াত [ ৭ : ৩৮ ] ও টিকা ১০১৯ এবং আয়াত [ ১১ : ২০ ]। পরকালের অবস্থা দর্শনে পাপীরা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। তারা তাদের আক্রোশ অন্যের উপরে মিটাতে চেষ্টা করবে। তারা যখন নিজেদের শাস্তি কোনও উপায়েই লাঘব করতে পারবে না, তখন তারা যারা তাদের পাপের পথে প্ররোচিত এবং প্রভাবিত করেছে , তাদের দ্বিগুণ শাস্তির জন্য আবেদন করবে। এই আয়াত এই সত্যের দিকে নির্দ্দেশ করে যে পাপীদের অন্তর সর্বদা হিংসা দ্বেষ ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ থাকে যা থেকে মৃত্যুর পরেও তারা রেহাই পায় না। পরের আয়াতে দেখুন তাদের বিস্ময় যে, অন্যান্য ব্যক্তিরা কি ভাবে শাস্তিকে এড়াতে সক্ষম হলো - যা এড়াতে তারা সক্ষম হয় নাই।

৬২। এবং তারা বলবে , " আমাদের কি হলো যে, আমরা যাদের মন্দদের মধ্যে অর্ন্তভূক্ত করতাম তাদের দেখতে পাচ্ছি না কেন ৪২১৭।

৪২১৭। " মন্দদের মধ্যে অর্ন্তভূক্ত করতাম" - অথাৎ পৃথিবীতে যারা মন্দ ও পাপী তারা নিজেদের পার্থিব সাফল্যের জন্য গর্বিত থাকে এবং নিজেদের অত্যন্ত বুদ্ধিমান ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে থাকে। তারা মোমেন বান্দাদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে থাকে, এজন্য যে, মোমেন বান্দারা পাপ কাজ দ্বারা জাগতিক উন্নতি বিধানে অক্ষম, সুতারাং তারা বুদ্ধিহীন ও তাদের শেষ পরিণতি জাগতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে শেষ হতে বাধ্য। কিন্তু পার্থিব জীবন শেষে পরলোকের জীবনে মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে যাবে। সে জগতে মোমেন বান্দারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ লাভে ধন্য হবে ফলে পাপীদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপ বুমেরাং এর মত তাদেরই আবার আঘাত হানে।

৬৩। " তবে কি আমরা [অহেতুক ] ঠাট্টা বিদ্রূপ করতাম অথবা তাদের ব্যাপার [ আমাদের ] দৃষ্টি বিভ্রম ঘটেছে?"

৬৪। দোযখ -বাসীদের জন্য এরূপ বাদ প্রতিবাদই হবে নেয্য এবং উপযুক্ত ৪২১৮।

৪২১৮। জাহান্নামীরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ প্রদর্শন করবে। তাদের আত্মার এই বিশেষ অবস্থা তাদের প্রতি শাস্তির অংশবিশেষ। কারণ অন্তরের এই অসুখী অবস্থা আত্মার মাঝে অশান্তির সৃষ্টি করে।

রুকু -৫

৬৫। বল, " আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং এক আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই, [যিনি ] সর্বোৎকৃষ্ট , অপ্রতিরোধ্য ৪২১৯।

৪২১৯। সূরা [ ১২ : ৩৯ ] আয়াতে হযরত ইউসুফ বন্দীদের মাঝে আল্লাহ্‌র একত্ব প্রচার করেছেন। পৃথিবীতে মানুষের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বাণী যা অনুধাবন করা উচিত এই পার্থিব জীবনেই , তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র একত্বের ধারণা। আল্লাহ্‌ এই বিশ্বভূবনের স্রষ্টা ,সকলের প্রতিপালক। আল্লাহ্‌র ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। পৃথিবীর কোনও শক্তিই তা খর্ব করতে পারবে না। আল্লাহ্‌ তাঁর করুণায় পাপীদের বারে বারে ক্ষমা করে থাকেন। এই বাণী পূণ্যাত্মা রাসুলের [ সা ] নিকট প্রচারের জন্য প্রেরণ করা হয়, এবং রাসুল [ সা ] তা প্রচার করেন। 'বল' শব্দটি দ্বারা 'রাসুলকে' বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ্‌র এই একত্বের ধারণাই হচ্ছে ঈমান।

৬৬। "আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এই দুইএর মধ্যবর্তী সকল কিছুর প্রভু - ক্ষমতায় পরাক্রমশালী , স্ব-ইচ্ছাকে কার্যকরী করতে সক্ষম ৪২২০। বারে বারে ক্ষমাশীল ৪২২১। "

৪২২০। সূরা [ ২২ : ৪০ ] আয়াতের টিকা ২৮১৮ এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে 'আজিজ' শব্দটির অর্থ। 'আজিজ' হচ্ছে আল্লাহ্‌র একটি উপাধি। এই আয়াতের মাধ্যমে পার্থিব ক্ষমতা ও ঐশ্বরিক ক্ষমতার মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। পার্থিব ক্ষমতা ঐশ্বরিক ক্ষমতার উপরে নির্ভরশীল, কিন্তু ঐশ্বরিক ক্ষমতা সব কিছুর উপরে কর্তৃত্বশীল। আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী।

উপদেশ : আল্লাহ্‌র একত্বের ধারণাকে আত্মার মাঝে অনুধাবন করতে হলে আল্লাহ্‌র ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে হবে আত্মার মাঝে।

৪২২১। 'Gaffar' বা মহাক্ষমাশীল। ক্ষমার সর্বোচ্চ প্রকাশ করা হয়েছে এই শব্দটি দ্বারা। যার ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে , "Forgiving again and again." এবং বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে বারে বারে ক্ষমাশীল। আল্লাহ্‌র ক্ষমতার এও এক রূপ।

৬৭। বল : " ইহা এক মহাসংবাদ -

৬৮। "যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। ৪২২২

৪২২২। আল্লাহ্‌র একত্বের এই ধারণা মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। কারণ এই নিখিল বিশ্ব -ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি মানুষের জন্য - এবং মানুষের সৃষ্টি আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য। এখানেই মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিহিত। কিন্তু মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ বাণী থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং যা অপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বহীন তাতে মনোনিবেশ করে থাকে। তারা বাদানুবাদ করে কখন শেষ বিচারের দিন আসবে ; পাপ কি, পূণ্য কি ইত্যাদি।

৬৯। [হে নবী তুমি বল ] , " উর্দ্ধলোকের সর্দাররা যখন নিজেদের মধ্যে [ কোন বিষয়ে ] আলোচনা করে সে সম্বন্ধে আমার তো কোন জ্ঞান নাই ৪২২৩।

৪২২৩। 'উর্দ্ধলোকের সর্দাররা ' এই বাক্যটি দ্বারা ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে ; মানুষ সৃষ্টির প্রাক্কালে ফেরেশতাদের বাদানুবাদ মানুষের জানার কথা নয়; কিন্তু তা নীচের আয়াতগুলির মাধ্যমে আয়াত [ ৭১ - ৮৫] প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষের জন্য যে বিষয়টি জানা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আল্লাহ্‌ পরম করুণাময় এবং মানুষের পাপকে বারে বারে মার্জনা করে দেন। যারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের উপরে মন্দের কোনও ক্ষমতাই কার্যকর হয় না।

৭০। " আমার নিকট শুধু মাত্র প্রকাশ করা হয়েছে যে, আমি সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য সর্তককারী।" ৪২২৪।

৪২২৪। 'Mubin' এই শব্দটি দুটি ভাবধারার প্রকাশ ঘটিয়েছে :

১) সর্তকবাণীটির ভাষা হবে পরিষ্কার প্রাঞ্জল সেখানে কোন অস্পষ্টতা বা বিষয়বস্তুর মারপ্যাচ নাই, মন্দের বা পাপের সাথে কোনও রূপ সমঝোতা নাই। যেরূপ বর্ণনা করা হয়েছে সূরা [ ৭ : ১৮৪ ] আয়াত।

২) সর্তকবাণী প্রকাশ্যে প্রচার করতে হবে সকল বাধা বিপত্তি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সূরা [ ২৬ : ১১৫] আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী স্পষ্ট সর্তককারী। বাক্যটি দ্বারা এই দ্বিবিধ ভাবধারাকে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে।

৭১। তোমার প্রভু ফেরেশতাদের বললেন, ৪২২৫ " আমি কাদামাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি : ৪২২৬

৪২২৫। এই আয়াতটি নিম্নোক্ত দুটি সূরার আয়াতের সাথে তুলনা যোগ্য :

১) সূরা [ ২ : ৩০ - ৩৯ ] আয়াতগুলির মাধ্যমে শয়তানের বিদ্রোহকে তুলে ধরা হয়েছে এবং প্রথম মানুষের উপরে তার ফলাফলকে বর্ণনা করা হয়েছে।

২) সূরা [ ১৫ : ২৯ - ৪০ ] আয়াতসমূহে জাগতিক জীবনে শয়তানের প্রভাব এবং যারা তা প্রতিরোধ করতে পারবে তাদের আশ্বাস দেয়া হয়েছে শয়তান বা মন্দ তাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। এই [৭১-৮৫] আয়াতসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে মানুষের আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে যা শয়তানের ক্ষমতাকে প্রতিহত করবে।

৪২২৬। এই আয়াত থেকে এ সত্যই প্রতীয়মান হয় যে মানুষ সৃষ্টির বহু পূর্বেই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিলো। কারণ আল্লাহ্‌ বলছেন যে, মানুষকে তিনি কর্দ্দম থেকে সৃষ্টি করবেন। পৃথিবীর অবস্থান মানুষ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই ছিলো , বিজ্ঞানও একথা স্বীকার করে যে, পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষের আগমন সবার শেষে সংঘটিত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষ স্বকীয় এজন্য যে মানুষই একমাত্র প্রাণী যার নশ্বর দেহের মাঝে পরমাত্মার বাস। এখানেই মানুষের স্বাতন্ত্র এখানেই তাঁর বৈশিষ্ট্য। ফলে একমাত্র মানুষের মাঝেই দেখা যায় নৈতিক মূল্যবোধের স্ফুরণ। Theory of evolution এর কোন ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম, যে হঠাৎ করে শুধু মানুষের মাঝে কেমন করে নৈতিক মূল্যবোধের স্ফুরণ ঘটেছে।

৭২। "যখন আমি তাকে [ সুষম ] গঠন করবো এবং তার মাঝে আমার রুহু ফুঁকে দেবো ,৪২২৭ , তখন তোমরা উহার প্রতি সিজ্‌দাবনত হবে।"

৪২২৭। দেখুন সূরা [ ১৫ : ২৯] আয়াতের টিকা ১৯৬৮। যেখানে "রুহুর" আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।

৭৩। সুতারাং ফেরেশতারা সকলে একসাথে সেজদাবনত হলো।

৭৪। কেবল ইব্‌লীস ব্যতীত। সে উদ্ধত হয়েছিলো এবং যারা ঈমানকে প্রত্যাখান করে তাদের অন্তর্ভূক্ত হলো ৪২২৮।

৪২২৮। আল্লাহ্‌র প্রতি অবিশ্বাস এবং সকল পাপ প্রসূত হয় অহংকার থেকে। অহংকার সকল পাপের জন্ম দেয়। অহংকার থেকে চরিত্রে ঔদ্ধত্যের জন্ম হয় ,বিনয় দূরীভূত হয় এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার প্রবণতা জন্মে। শ্রেষ্ঠ ভাবার প্রবণতা মানুষকে অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধিতে বাধা দান করে এবং মনের মাঝে হিংসা ও দ্বেষের জন্ম দানকরে। হিংসা ও দ্বেষ রীপু মানুষের চরিত্রের সকল গুণাবলী ধ্বংস করে দেয় ঠিক যেরূপ আগুন সব সুন্দর জিনিষ পুড়িয়ে শুধু ছাইকে অবশিষ্ট রাখে। হিংসাকে সেই কারণে আগুনের সাথে তুলনা করা হয়।

৭৫। আল্লাহ্‌ বলেছিলেন, " ওহে ইবলিস ! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজ্‌দাবনত হতে তোমাকে কিসে বাঁধা দিল ? ৪২২৯। তুমি কি উদ্ধত না কি উচ্চ্ মর্যাদাসম্পন্নদের [ এবং শক্তিশালীদের ] মধ্যে একজন ? " ৪২৩০

৪২২৯। আদম হচ্ছেন সকল মানুষের প্রতীক স্বরূপ। আদমের সৃষ্টির বর্ণনার মাধ্যমে মানুষ জাতির সৃষ্টির প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষের দেহ একতাল কাদা ব্যতীত আর কিছুই নয়। কিন্তু এই মাটিতে তৈরী দেহের মাঝে আল্লাহ্‌ তাঁর রূহুর অংশ দান করেছেন। এরই ফলে তাকে করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। এরই জন্য মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব। এরই কারণে মানুষের জন্য সম্মানের আসন পাতা , মানুষ মর্যদা সম্পন্ন।

৪২৩০। শয়তান আল্লাহ্‌র হুকুমকে অমান্য করলো।তাঁর এই ঔদ্ধত্যের উৎপত্তি হচ্ছে তার নিজের সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা , যার উৎপত্তি অহংকার থেকে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ শয়তানকে জিজ্ঞাসা করছেন যে, সে কি নিজেকে এতটাই উচ্চ মর্যদাসম্পন্ন মনে করে যে ,সে আল্লাহ্‌র হুকুমকে অমান্য করার সাহস রাখে ? অবশ্যই শয়তান উচ্চ মর্যদাসম্পন্ন ছিলো না। কিন্তু অহংকার তার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটায় ,প্রকৃত অনুধাবন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এ ভাবেই অহংকার মানুষকে বিপথে চালিত করে।

৭৬। [ ইবলিস ] বলেছিলো , " আমি তার থেকে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং ওকে কাঁদা থেকে সৃষ্টি করেছেন। "

৭৭। [আল্লাহ্‌ ] বলেছিলেন : " তবে এখান থেকে দূর হয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত অভিশপ্ত ;

৭৮। "এবং তোমার উপরে আমার অভিশাপ শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত থাকবে। " ৪২৩১

৪২৩১। দেখুন সূরা [ ১৫ : ৩৫ ] আয়াতের টিকা ১৯৭২ যেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেন শয়তানকে তৎক্ষণাত শাস্তি দান না করে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত অবসর দান করা হয়েছে। সূরা ৩৫ নং এ সম্বন্ধে বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে।

৭৯। [ ইবলিস ] বলেছিলো হে আমার প্রভু ! আপনি আমাকে অবকাশ দিন [ মৃতদের ] উত্থান দিবস পর্যন্ত ৪২৩২।

৪২৩২। "অবকাশ প্রাপ্তদের " সম্বন্ধে দেখুন সূরা [১৫ : ৩ ] আয়াতের টিকা ১৯৭৩।

৮০। [আল্লাহ্‌ ] বলেছিলেন , " তবে অবকাশ তোমাকে মঞ্জুর করা হলো, -

৮১। "নির্ধারিত সময়ের দিন পর্যন্ত।" ৪২৩৩।

৪২৩৩। এই অবকাশ হবে এক নির্দ্দিষ্ট সময় পর্যন্ত - তা অসীম বা অনির্ধারিত নয়। পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান হচ্ছে সীমিত সময়ের জন্য , যাকে বলা হয়েছে "শিক্ষানবীশ কাল "। এই শিক্ষানবীশ কাল মানুষের জন্য এক মহাপরীক্ষার সময়। মানুষকে আল্লাহ্‌ সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন - ভালোকে গ্রহণ বা বর্জন করার জন্য। মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে সে কিভাবে ব্যবহার করেছে তারই হিসাব দাখিল করতে হবে শেষ বিচারের দিনে। রোজ কেয়ামতের সাথে সাথে এই পৃথিবীর সময়কাল শেষ হয়ে যাবে। সমস্ত সৃষ্টিকে নূতন মাত্রাতে ধারণ করা হবে, নূতন পৃথিবীর সৃষ্টি হবে [ ১৪ : ৪৮ ]। যার মূল্যবোধ , আইন , সবই হবে এই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে পূণ্যাত্মা ও পাপীদের সম্পূর্ণভাবে আলাদা করা হবে - বর্তমান পৃথিবীর সকল ধারাকে অবলুপ্ত করে নূতন ধারাতে বিন্যস্ত করা হবে। [ ৫৬ : ৬০- ৬২ ]

৮২। [ ইবলিস ] বলেছিলো , " তাহলে আপনার ক্ষমতার শপথ , ৪২৩৪, আমি অবশ্যই তাদের সকলকেই বিপথগামী করবো ৪২৩৫।

৪২৩৪। শয়তানের এই শপথ নূতন বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে। যা পূর্বে উল্লেখ করা হয় নাই। শয়তান শপথ করে ক্ষমতার । পৃথিবীতে ভালো ও মন্দ , পূণ্য ও পাপ পাশাপাশি বিরাজ করে ; ভালোর ক্ষমতা হচ্ছে আল্লাহ্‌র ক্ষমতা , অপরপক্ষে মন্দের ক্ষমতা বা পাপের ক্ষমতা হচ্ছে শয়তানের ক্ষমতা। শয়তান এই ক্ষমতারই শপথ গ্রহণ করে, তবে সে এ কথাও হৃদয়ঙ্গম করে যে, তার ক্ষমতাও সীমিত। আল্লাহ্‌র বান্দাদের উপরে তার কোনও প্রভাব থাকবে না। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই।

৪২৩৫। দেখুন সূরা [ ১৫ : ৩৯ ] এর টিকা ১৯৭৪।

৮৩। " ব্যতিক্রম হবে তোমার বান্দাদের মধ্যে যারা তোমার অনুগত ও তোমার অনুগ্রহে পরিশুদ্ধ।"

৮৪। [আল্লাহ্‌ ] বলেছিলেনঃ " তবে এটাই ন্যায়সঙ্গত এবং উপযুক্ত ৪২৩৬ - এবং যা ন্যায়সঙ্গত ও উপযুক্ত আমি তাই বলি -

৪২৩৬। দেখুন সূরা [ ১৫ : ৬৪ ] এর টিকা ১৯৯০।

৮৫। " নিশ্চয়ই আমি তোমার দ্বারা এবং যারা তোমাকে অনুসরণ করছে , তাদের প্রত্যেকের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবো।" ৪২৩৭

৪২৩৭। দেখুন সূরা [ ৭ : ১৮ ] ; [ ৭: ১৭৯] এবং [ ১১ : ১১৯] ও টিকা ১৬২৩। আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের শাস্তি অবশ্যাম্ভাবী। যারা শয়তানের অনুসরণ করে আল্লাহ্‌র আইনের বা হুকুমের প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ করে তারা তাদের নেতা শয়তানের শাস্তির অনুরূপ শাস্তি ভোগ করবে।

উপদেশ : শয়তানের অবাধ্যতা প্রতীক ধর্মী যা মানুষের নৈতিক কর্মকান্ডে আল্লাহ্‌র আইন অমান্য করার প্রতীক স্বরূপ।

৮৬। [ মুহম্মদ ] বল, " ইহার [ কুর-আনের ] পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না ৪২৩৮ এবং আমি মিথ্যা দাবীদার নই ৪২৩৯।

৪২৩৮। দেখুন সূরা [ ২৫ : ৫৭ ] ; [২৬ : ১০৯ ] ও অন্যান্য আয়াতসমূহ। আল্লাহ্‌র রাসূল [ সা ] মানুষকে হেদায়েতের পরিবর্তে কোনও পুরষ্কার বা প্রতিদান আশা করেন না। বরং অকৃতজ্ঞ মানুষ তাঁকে অত্যাচার ও নির্যাতনে জর্জরিত করে। তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের মঙ্গলের জন্য আল্লাহ্‌র বাণী মানুষের মাঝে প্রচার করেছেন। তাঁর একমাত্র আশা মানুষ আল্লাহ্‌র পথে ফিরে আসবে। এবং আখেরাতে মুক্তি লাভ করবে এটাই তার একমাত্র পার্থিব পুরষ্কার। মানুষের জন্য এই নিঃস্বার্থ কাজের জন্য তিনি শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র নিকট পুরষ্কার আশা করেন।

৪২৩৯। "Mutakallif" - আক্ষরিক অর্থ যারা মিথ্যা ভান করে অথবা যা সত্য নয় তাই ঘোষণা করে,অথবা যে যোগ্যতা নাই তাই মিথ্যা দাবী করা। প্রকৃত পয়গম্বররা এ সবের উর্দ্ধে।

৮৭। " ইহা তো [সারা ] বিশ্ব জগতের জন্য উপদেশ মাত্র ৪২৪০।

৪২৪০। আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারের মাধ্যমে রাসুলের [সা ] কোন ব্যক্তিগত লাভ নাই। মানুষের মুক্তির জন্য , মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি তা প্রচার করেন। সত্যকে প্রচারের জন্য অমানুষিক কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করেন। এ সকলই সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়া। এই উপলব্ধি আমাদের বিশ্ব স্রষ্টার একত্ব , কল্যাণ স্পর্শ উপলব্ধিতে সাহায্য করে।

৮৮। " এবং কিছুদিন পর তোমরা অবশ্যই ইহার [সকল ] সত্যতা সম্বন্ধে জানতে পারবে।" ৪২৪১

৪২৪১। পৃথিবীর জীবনে পরকালের জীবনকে মনে হয় অস্পষ্ট এবং থাকে বিস্মৃতির অতলে। জীবনের প্রতিটি পল ও ক্ষণ আমাদের জাগতিক চিন্তায় ব্যস্ত রাখে - ফলে আমরা ভুলে যাই স্রষ্টার অস্তিত্ব , অনুভবে অক্ষম হই তার উপস্থিতি - যা আমাদের সমস্ত সত্তা জুড়ে বিরাজমান। কিন্তু যদি আমরা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত সঠিক জীবন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজের জীবনকে পরিচালিত করি , তবেই শুধু পরকাল সম্বন্ধে আমাদের মনে অস্বচ্ছ ধারণা জন্মাতে সক্ষম। তবে জাগতিক জীবন শেষে পরলোকে আমাদের নিকট জীবনের প্রকৃত অর্থ, পার্থিব জীবনের সকল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য , প্রকৃত মূল্যমান স্পষ্ট হবে।