Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৮ জন
আজকের পাঠক ২০ জন
সর্বমোট পাঠক ৭২৬৪২০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৯৯৫৬৬ বার
+ - R Print

সূরা শূরা


সূরা শূরা বা মন্ত্রণা সভা -৪২

৫৩ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী
[ দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : হা-মিম্‌ সূরার শ্রেণীর সাতটি সূরা এটি হচ্ছে তৃতীয় সূরা।এই শ্রেণী সম্বন্ধে দেখুন সূরা ৪০ নং এর ভূমিকা।

এই সূরার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে , কি ভাবে পাপ ও কুফ্‌রী আল্লাহ্‌র করুণায় ও নিদের্শনায় নিরাময় লাভ করে। আল্লাহ্‌র করুণা , ও হেদায়েত তাঁর প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। মানুষকে উপদেশ প্রেরণ করা হয়েছে , পরামর্শের মাধ্যমে তাদের মতপার্থক্য দূর করতে [ ৪২ : ৩৮ ]। এই উপদেশ অনুযায়ী সূরার নামকরণ হয়েছে।

সার সংক্ষেপ : আল্লাহ্‌র নিদর্শন ও দয়ার উপরে নির্ভরতার বিপরীত হচ্ছে প্রত্যাদেশের বিরুদ্ধে তর্ক-বির্তকে লিপ্ত হওয়া আল্লাহ্‌র একত্বে অবিশ্বাস করা ও কুফরী করা। [ ৪২ : ১- ২৯ ]।

মানুষের অমঙ্গল তার পাপ কাজেরই ফল স্বরূপ। পাপের পরিণতি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহ্‌র করুণা ও প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানুষকে পথ দেখান বা হেদায়েত করেন [ ৪২: ৩০ - ৫৩ ]।

সূরা শূরা বা মন্ত্রণা সভা -৪২

৫৩ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী
[ দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। হা - মীম ৪৫২৬।

৪৫২৬। দেখুন ৪০ নং সূরার ভূমিকা। প্যারা ২ -৪

০২। আইন - সীন - কাফ ৪৫২৭।

৪৫২৭। এই সূরাতে দুই সেট বা কেতা সংক্ষিপ্ত অক্ষর স্থাপন করা হয়েছে। এক সেট প্রথম আয়াত ও দ্বিতীয় সেট হচ্ছে দ্বিতীয় আয়াতে। দ্বিতীয় সেটে অক্ষরদ্বয়ের কোন নির্ভর যোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সুতারাং এর থেকে বিরত থাকা হলো।

০৩। এ ভাবেই [ তিনি ] তোমার প্রতি ওহী প্রেরণ করে থাকেন , যেমন তিনি তোমার পূর্ববর্তীদের [করেছিলেন ] ৪৫২৮। আল্লাহ্‌ - ক্ষমতায় মহাপরাক্রশালী , প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ।

৪৫২৮। প্রত্যাদেশসমূহ আল্লাহ্‌র ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। আর এই ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার উৎস একমাত্র আল্লাহ্‌। মানুষের ক্ষমতার সাথে আল্লাহ্‌র ক্ষমতার পার্থক্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র ক্ষমতা সর্বদা দয়া ও করুণাতে পরিপূর্ণ থাকে। মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পার্থক্য হচ্ছে মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অসম্পূর্ণ , অপরপক্ষে আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে সম্পূর্ণ ও বির্তকের উর্দ্ধে।

০৪। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর অধীনে। তিনি সর্বোচ্চ সমুন্নত সুমহান ৪৫২৯।

৪৫২৯। আল্লাহ্‌ সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি সমুন্নত ও মহান। তার মাহত্ব্য ও বিশালত্ব অনুধাবন ও উপলব্ধি করা যে কোন মানুষের পক্ষে অসম্ভব। আল্লাহ্‌র ক্ষমতা , পদমর্যদা ইত্যাদিতে অত্যুচ্চ ,যা মানুষের সর্বোচ্চ কল্পনার অতীত। পরবর্তী আয়াতে সর্বোচ্চ আকাশের উল্লেখ আছে এবং আরও উল্লেখ আছে ফেরেশতাদের যাদের চরিত্রগতভাবে সর্বোচ্চ ও মহৎ মনে করা হয়। আল্লাহ্‌র মাহত্ব্য এদের বহু উর্দ্ধে।

০৫। [ তাঁর মহিমায় ] আকাশ সমূহ তাদের উপরে বিদির্ণ হয়ে পড়তে চায় ৪৫৩০। ফেরেশতাগণ তাদের প্রভুর প্রশংসা কীর্তন করে এবংপৃথিবীর সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। মনে রেখো ! আল্লাহ্‌ অবশ্যই বারে বারে ক্ষমাশীল , পরম করুণাময় ৪৫৩১।

৪৫৩০। সপ্ত আকাশের অসীমত্ব মানুষের কল্পনার সীমানার বাইরে। বর্তমানে "হাবেল" টেলিস্কোপের মাধ্যমে অসীম আকাশ সম্বন্ধে মানুষ ধারণা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সীমাহীন আকাশের সীমা মানুষের জ্ঞান জগতের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌র বিশালত্ব ও মাহত্ব্যকে প্রকাশ করার জন্য আকাশের উপমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। যে আকাশ মানুষের কল্পনা ও ধারণা, সীমার বিশালত্বে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়।

৪৫৩১। আমাদের ধারণা ফেরেশতারা হচ্ছে সর্বাপেক্ষা পূত-পবিত্র ও মহৎ। তারা আল্লাহ্‌র মহিমা ও প্রশংসা কীর্তনের মাধ্যমে নিজেদের বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। এই আয়াতে তাদের আর দুটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা করা হয়েছে ;তারা মর্তবাসীর জন্য ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনা করে। অর্থাৎ তাদের চরিত্রে ক্ষমা ও দয়া গুণ দুটি প্রধান।

০৬। যারা আল্লাহ্‌কে ব্যতীত অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে ৪৫৩২ ; আল্লাহ্‌ তাদের উপর দৃষ্টি রাখেন। এবং তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও।

৪৫৩২। ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে মানুষের পাপ ও অকৃতজ্ঞতাকে। আল্লাহ্‌র পরিবর্তে যারা অপর কিছুকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তারা অকৃতজ্ঞ ও পাপী। তারা তাদের কাজের দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।আল্লাহ্‌র সামগ্রিক পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত তাদের ধবংস অনিবার্য। আর এ ব্যাপারে আল্লাহ্‌র বিচারই শেষ কথা। মানুষের অকৃতজ্ঞতা বা পাপ কাজের জন্য রাসুল [সা] দায়ী নন। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তি তাকে দেয় "সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি " র অপব্যবহারের জন্য দায়ী। কেউ কারও দায় বহন করবে না।

০৭।এ ভাবেই আমি ওহীর মাধ্যমে তোমাকে আরবী কুর-আন প্রেরণ করেছি ৪৫৩৩, যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মক্কা ও উহার চর্তুপার্শ্বের জনগণকে৪৫৩৪ , এবং [ তাদের ] সতর্ক করতে পার মহাসমাবেশের দিন সম্বন্ধে , যার সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ নাই। [যেদিন ] কেহ কেহ থাকবে বেহেশতে আর কেহ কেহ থাকবে জ্বলন্ত অগ্নিতে ৪৫৩৫।

৪৫৩৩। কোরাণ শরীফ আরবীতে অবতীর্ণ হওয়ার কারণ অতি সহজেই বোধগম্য। কারণ যাদের মাঝে কোরাণের বাণী সর্বপ্রথম প্রচারিত হবে তারা সকলেই আরবী ভাষী , আয়াতের পরবর্তী অংশ দেখুন। আরও দেখুন আয়াত [ ৪১ : ৪৪ ] ও টিকা ৪৫১৬।

৪৫৩৪। মক্কা নগরীর জন্য দেখুন টিকা ৯১৩ ও আয়াত [ ৬ : ৯২]। নিঃসন্দেহে আয়াতটি মক্কাতে অবতীর্ণ হয়, সে কারণেই এর প্রাথমিক প্রচার সম্বন্ধে মক্কার উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যতীত মুসলমানদের কিব্‌লা কাবা শরীফ মক্কায় অবস্থিত।এ ভাবেই মক্কা নগরী ইসলামের মূল কেন্দ্র এবং "উহার চর্তুদিকের জনগণ" অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ববাসী।

৪৫৩৫। মানুষের পাপ সম্বন্ধে এবং কেয়ামত দিবস সম্বন্ধে সর্তক করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে যেমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে সূরার সার সংক্ষেপে।

০৮। যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করতেন তবে তিনি তাদের একটি মাত্র সম্প্রদায়ে পরিণত করতে পারতেন ৪৫৩৬। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা করেন, আপন অনুগ্রহের মাঝে প্রবেশ করান, এবং পাপীদের কোন অভিভাবক নাই, কোন সাহায্যকারীও নাই।

৪৫৩৬। অনুরূপ আয়াত দেখুন [ ৫: ৪৮ ] ও টিকা ৭৬১। শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যে আল্লাহ্‌ মানুষ জাতিকে বিভিন্নতা দান করেছেন। পৃথিবীতে আল্লাহর নেয়ামত কেউ বেশী লাভ করে কেউ কম। মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, চারিত্রিক গুণাবলী ,বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি প্রতিটি মানুষের জন্যস্ব স্ব বৈশিষ্ট্য মন্ডিত করা হয়েছে যেনো তা সঠিক ব্যবহারের ফলে সে [ ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে ]। পৃথিবীতে শয়তানের ফাঁদে মানুষ তখনই ধরা দেয় যখন সে এসব অপব্যবহার করে। মানুষকে সাবধান করা হয়েছে সে যেনো বিবাদ প্রিয় হয়ে শয়তানের ফাঁদে পা না দেয় - তাহলে সে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও কৃপা লাভে বঞ্চিত হবে।

০৯। সে কি ! [ এবাদতের জন্য ] তারা কি আল্লাহ্‌কে ব্যতীত অন্য অভিভাবক গ্রহণ করেছে ? কিন্তু আল্লাহ্‌- তিনিই তো [ একমাত্র ] অভিভাবক ৪৫৩৭ তিনি মৃতকে জীবন দান করেন। সর্ববিষয়ের উপরে ক্ষমতা একমাত্র তারই।

৪৫৩৭। মানুষের সর্বোচ্চ পাপ হচ্ছে , আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর উপাসনা করা ; সর্বোচ্চ অকৃতজ্ঞতা হচ্ছে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারও অভিভাবকত্ব গ্রহণ করা। যেমন অনেকে বিপদ বা বিপর্যয়ের মুখে জ্যোতিষি বা পীর-ফকির বা মাজারের আশ্রয় প্রার্থনা করে। এ সবের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করা হচ্ছে তাদেরই আশ্রয় প্রার্থনা করা যাদের ব্যক্তিগত কোনও ক্ষমতাই নাই।সমস্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্‌র। বিশ্ব ভূবনের তিনিই একমাত্র পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। পৃথিবীর প্রতিটি জীবনকে তিনি সর্বোচ্চ মঙ্গল ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। মানুষ যখন আল্লাহ্‌র ক্ষমতার উপরে বিশ্বাস রাখতে না পারে তখনই এ সব মিথ্যা উপাস্যের স্মরণাপন্ন হয় এবং আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদারিত্বের পাপে নিমজ্জিত হয়।

রুকু - ২

১০। যে কোন বিষয়ে যাই-ই ঘটুক না কেন , উহার সিদ্ধান্ত আল্লাহ্‌র নিকটে ৪৫৩৮। আমার প্রভু আল্লাহ্‌ এরূপই, আমি/তাঁরই উপরে ভরসা স্থাপন করি এবং তারই অভিমুখী হই।

৪৫৩৮। জীবন ও ধর্ম , মানুষের জীবনে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। জীবনের চলার পথে, সময়ের পরিক্রমায় মানুষ অনেক সময়েই জীবনের সর্বোচ্চ বিষয়গুলিতে মতদ্বৈতের সম্মুখীন হতে পারে। যদি এই মতদ্বৈতের উৎস হয় স্বার্থপরতা বা সংঙ্কীর্ণতা তবে তারা তাদের আত্মাকে পাপের অতলে নিক্ষেপ করে। কিন্তু যদি তাদের পার্থক্য হয় আন্তরিক ,কিন্তু ভুল, যার উদ্দেশ্য সামাজিক বিভাজন বা সংঙ্কীর্ণ গোষ্ঠি সৃষ্টি নয় বা বিবাদ বিসংবাদ সৃষ্টি ও মানুষের মাঝে ঘৃণা ও হানাহানি সৃষ্টি নয় , তবে সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে বলা হয়েছে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র উপরে। সকল বিপযর্য়ের মাঝে আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা সকল মতদ্বৈততার অবসান ঘটিয়ে মীমাংসায় পৌঁছাতে তিনিই সকল সিদ্ধান্তের মালিক।

১১। [তিনি ] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া ৪৫৩৯ এবং গৃহপালিত পশুর মধ্য থেকে জোড়া এ ভাবেই তিনি তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। কোন কিছুই তাঁর সমতুল্য নয়, এবং একমাত্র তিনিই[সব কিছু ] শোনেন এবং দেখেন।

৪৫৩৯। যৌনতা হচ্ছে সৃষ্টির এক অপার রহস্য। যৌনতা শুধুমাত্র শারীরিক প্রয়োজনই নয়, এর সাথে জড়িত থাকে নীতি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক জীবনের বিকাশ। যৌন জীবনে মানুষ পশু থেকে আলাদা। যৌন জীবনকে ভিত্তি করে মানুষের সামাজিক জীবন ও সামাজিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক জীবনের বিকাশ ঘটেছে। সেই কারণে মানুষের যৌন জীবনকে পশুদের যৌন জীবন থেকে আলাদা ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।সেই কারণে মানুষের যৌন জীবনকে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। " তোমাদের মধ্যে থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন।" আন্‌-আম বা পশুদের জোড়ার ব্যাপারটি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পশুদের সাথে মানুষের জীবনের এবং সভ্যতার বিকাশের সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রাচীনকালে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যমই ছিলো পশু সে হিসেবে মানব সভ্যতার বিকাশের মূলে পশুর অশেষ অবদান বিদ্যমান। দেখুন আয়াত [ ৩৬: ৭১- ৭৩ ] ও আয়াত [ ২৩ : ২১ - ২২ ] যেখানে পশুকে যাতায়াতের জাহাজরূপে বর্ণনা করা হয়েছে এবং আর্ন্তজাতিক মিলনের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১২। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর চাবী তাঁর অধিকারে। তিনি যাকে ইচ্ছা জীবিকা বৃদ্ধি করেন যাকে ইচ্ছা সংকুচিত করেন ৪৫৪০। নিশ্চয়ই তিনি সকল বিষয় পরিপূর্ণরূপে জ্ঞাত।

৪৫৪০। 'রিযিক' শব্দটি সঙ্কীণার্থে ব্যবহার না করে ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রিযিক শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে আল্লাহ্‌র সেই সব নেয়ামত যা জীবনের জন্য প্রয়োজন , যথা : দৈহিক, মানসিক ,সামাজিক, বুদ্ধিমত্তা,আধ্যাত্মিক ইত্যাদির সমৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন সবই রিযিকের আওতায় অন্তর্ভুক্ত। রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ্‌ ; তাঁর নেয়ামত অশেষ ; অসীম যা নিঃশেষিত হওয়ার নয়। পৃথিবীর সকল কিছুর রিযিক আল্লাহ্‌র দান। তবে তিনি এই রিযিক বা নেয়ামত সকলকে সমভাবে দান করেন না। জাগতিক জীবনে আল্লাহ্‌র নেয়ামত কেউ বেশী লাভ করে কেউ কম লাভ করে। আল্লাহ্‌র বিচক্ষণ ও সূদূর প্রসারী পরিকল্পনার তা অংশ। পৃথিবীর অগ্রযাত্রায় , সভ্যতার বিকাশের জন্য আল্লাহ্‌ তার নেয়ামত বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন ভাবে বণ্টন করেন। ফলে কেউ হয় সাহিত্যিক , কেউ হয় কবি, কেউ বিজ্ঞানী , কেউ দার্শনিক ইত্যাদি। কারণ একমাত্র আল্লাহ্‌-ই জানেন তার সৃষ্ট জীবের জন্য কার কতটুকু প্রয়োজন। আল্লাহ্‌ সর্ব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।

১৩। তিনি তোমাদের জন্য সেই একই ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করেছেন , যা তিনি নূহ্‌ কে নির্দ্দেশ দিয়েছিলেন ৪৫৪১, আমি তোমার নিকট ওহীযোগে যা পাঠিয়েছি এবং যা আমি ইব্রাহীম , মুসা এবং ঈসাকে নির্দ্দেশ দিয়েছিলাম তা হচ্ছে তোমরা ধর্মের ব্যাপারে স্থির সংকল্প থাকবে , এবং উহাতে বিভক্তিকরণ করবে না ৪৫৪২। যারা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর এবাদত করে , তাদের পক্ষে তোমার আহ্বানকে কঠিন [ পথ] বলে মনে হবে ৪৫৪৩। আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা নিজের দিকে টেনে নেন এবং যারা [ তার ] অভিমুখী হয় তিনি তাদের পথ প্রদর্শন করেন।

৪৫৪১। আল্লাহ্‌ মানুষের জন্য যুগে যুগে যত ধর্ম প্রেরণ করেছেন তার মূল বক্তব্য বা সারমর্ম সর্ব যুগে একই রয়ে গেছে ; যথা : নূহ্‌ , ইব্রাহীম , মুসা , ঈসা অথবা আমাদের নবীজি হযরত মুহম্মদ মুস্তফা [ সা ] সমস্ত নবী রসুলদের নিকট প্রেরিত ধর্মের সারমর্ম একই। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের মূল কথাই হচ্ছে আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাস যা সর্ব যুগে একই রয়ে গেছে। ইসলামে এসে এই একত্বের ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।অন্যান্য ধর্মের মত তাতে কোনও রূপ অস্পষ্টতা নাই।

৪৫৪২। ঈমান বা বিশ্বাস বা আল্লাহ্‌র প্রতি মানুষের কর্তব্য বা ধর্ম যাই-ই বলা হোক না কেন, তার মাঝে মতদ্বৈতের কোনও অবকাশ নাই। ধর্মের ব্যাপারে দল বা উপদলের সৃষ্টি ধর্মের মূল নীতির বিরুদ্ধে যায় এবং মানুষের মাঝে একতা নষ্ট করে। আমাদের যা করণীয় কর্তব্য তা হচ্ছে বিশ্বাস বা ঈমান ও আল্লাহ্‌র প্রতি কর্তব্যের ব্যাপারে অধ্যাবসায়ী ও দৃঢ় সংকল্প হওয়া এবং নিজেদের মাঝে একতা রক্ষা করা। "ধর্মের ব্যাপারে স্থির সংকল্প থাকবে এবং উহাতে বিভক্তিকরণ করবে না" এই হচ্ছে আল্লাহ্‌র হুকুম।

৪৫৪৩। ঈমানদার বা বিশ্বাসীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা হবে নিঃস্বার্থ , আল্লাহ্‌র প্রতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাতে নিবেদিত প্রাণ, ও একতায় বিশ্বাসী। মোশরেকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হবে ঠিক এর বিপরীত। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : স্বার্থপরতা , অন্যায়ভাবে ধনসম্পদ অর্জনের আকাঙ্খা , দুর্বলদের অবদমিত করার চেষ্টা, মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা ও নিজেদের মধ্যে হানাহানি। ঈমানদার বা বিশ্বাসীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পূত পবিত্র আত্মার প্রতিফলন - যে ভাবে স্রষ্টা পূত পবিত্র ভাবে প্রথমে পৃথিবীতে তাকে প্রেরণ করেন। কিন্তু অন্যায় ও স্বার্থপরতা দ্বারা মোশরেকরা আত্মার এই পবিত্রতা নষ্ট করে ফেলে ফলে তাদের জন্য প্রকৃত ধর্মবোধকে দুর্বহ মনে হয়। তারা চেষ্টা করেও ধর্মীয় গুণাবলীর মাঝে কোনও সৌন্দর্য খুজে পাবে না। কিন্তু আল্লাহ্‌ অসীম করুণার আঁধার। আল্লাহ্‌র করুণা পূণ্যাত্মা পাপী সকলের জন্য সমভাবে বহমান। আল্লাহ্‌ মানুষকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে শিক্ষক প্রেরণ করেছেন , যে দ্বীনের অভিমুখী হয় আল্লাহ্‌ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন।

১৪। আর জ্ঞান আসার পর কেবলমাত্র পারস্পরিক বিদ্বেষবশতঃ উহারা নিজেদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি করেছে ৪৫৪৪। এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে তোমার প্রভুর পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে ওদের বিষয় [ দুনিয়াতেই ] ফয়সালা হয়ে যেতো ৪৫৪৫। কিন্তু ওদের পরে যারা কিতাবের উত্তরাধীকারী হয়েছে , তারা অবশ্যই সে সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে ৪৫৪৬।

৪৫৪৪। দেখুন আয়াত [ ২ : ২১৩ ]। যদি কেউ সত্য বা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ আসার পরে তা প্রত্যাখান করে তবে তারা তা করে হিংসা, দ্বেষ ও স্বার্থপরতার জন্য।

৪৫৪৫। দেখুন আয়াত [ ১০ : ১৯ ] ও টিকা ১৪০৭। আল্লাহ্‌ পাপীদের তাদের পাপ কাজের দরুণ সাথে সাথে ধবংস করে ফেলেন না। আল্লাহ্‌ তাদের অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের জন্য সময় দিয়ে থাকেন, যেনো তারা আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। এই সুযোগ না দিলে পাপীদের ভাগ্য সাথে সাথেই নির্ধারিত হয়ে যেতো। কিন্তু মানুষের এই স্বার্থপরতা ও অবাধ্যতা সত্বেও পরম করুণাময় পাপীদের সুযোগ দান করেন - যেনো তারা অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের পথ গ্রহণ করে।

৪৫৪৬। দেখুন আয়াত [ ১৪ : ৯ ] ও টিকা ১৮৮৪। "কিতাবের উত্তরাধিকারী" অর্থাৎ পূর্ববর্তী মানব গোষ্ঠি যারা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র কিতাব লাভ করেছিলো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে, ইহুদী ও খৃষ্টানেরা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মাঝে বহু দলে ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং খৃষ্টান ও ইহুদীদের বিভিন্ন দল পরস্পর আত্মঘাতী হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে যায়। এরই পটভূমিতে ইসলামের আবির্ভাব হয়।কিন্তু ইহুদী ও খৃষ্টানেরা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় কারণ বিভ্রান্তিকর সন্দেহ তাদের আত্মার মাঝে বিরাজ করে।

১৫। অতএব,তাদের[ ঈমানের দিকে ] আহ্বান কর ৪৫৪৭, এবং তোমাকে যে ভাবে আদেশ করা হয়েছে সে ভাবে উহাতেই দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক। ওদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না। অধিকন্তু বল, " আল্লাহ্‌ যে কিতাব প্রেরণ করেছেন , আমি তাতে বিশ্বাস করি। এবং আমাকে আদেশ করা হয়েছে তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করতে। আল্লাহ্‌ আমাদের প্রভু এবং তোমাদের প্রভু। আমাদের কাজের [ দায়িত্ব ] আমাদের এবং তোমাদের কাজের [ দায়িত্ব ] তোমাদের। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কোন বিবাদ-বিসম্বাদ নাই। আল্লাহ্‌ আমাদের একত্র করবেন , এবং তার নিকটেই [ আমাদের ]শেষ লক্ষ্য ৪৫৪৮। "

৪৫৪৭। কত সুন্দর ভাবে ইসলামের শিক্ষাকে এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

১) ইসলাম পূর্ব বিভিন্ন ধর্মে যত বিভাজন ,দল , উপদলের সৃষ্টি হয়েছে ,পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র একত্বের ধারণা প্রচার করা তত প্রয়োজনীয় হয়েছে।

২) আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় ভাবে অনুসরণ করতে হবে।

৩) জাগতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা এই বিশ্বাস যেন কক্ষচ্যুত না হয়। "ওদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না "।

৪) এই বিশ্বাসেরমূল ভিত্তি হবে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশে বিশ্বাস। এখানে যে " কিতাবের " উল্লেখ আছে তা দ্বারা আল্লাহ্‌র সকল রসুলদের নিকট প্রেরিত কিতাব সকলকে বোঝানো হয়েছে।

৫) এই প্রত্যাদেশ সকল শত্রুতা ভাবাপন্ন দলগুলির মধ্যে ন্যায়ের সাথে শান্তি স্থাপন করে শান্তির ধর্ম প্রচার করবে।

৪৫৪৮। ইসলামের আরও শিক্ষা হচ্ছে :

৬) যে আল্লাহ্‌র কথা ইসলাম প্রচার করে তা কোন সম্প্রদায়ের বা গোষ্ঠির ঈশ্বর নয়। আল্লাহ্‌ হচ্ছেন সমস্ত জগতের প্রভু।পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের যেখানে যত লোক আছে , সকলের প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ্‌।

৭) আমাদের বিশ্বাস শুধুমাত্র মুখের কথা নয়। কর্মের মাধ্যমে তার প্রকাশ ঘটতে হবে ; প্রত্যেকেরই প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব আছে।

৮) যখন আমরা আল্লাহ্‌র একত্ব প্রচার করি , সেই সত্য এবং পরলোকের বিশ্বাসের মধ্যে তোমাদের সাথে আমাদের কোন বিবাদ বিসম্বাদ নাই।

৯) তোমাদের যদি সন্দেহ থাকে তবে শেষ বিচার বা মীমাংসা আল্লাহ্‌র হাতে। তাঁর সন্তুষ্টিই হচ্ছে জীবনের চরম লক্ষ্য।

১৬। আল্লাহকে মেনে নেবার পরে যারা তার সম্পর্কে তর্ক করে ৪৫৪৯ , তাদের যুক্তি তর্ক তাদের প্রভুর দৃষ্টিতে অসার। তাদের উপরে [আল্লাহ্‌র ] গজব রয়েছে এবং তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।

৪৫৪৯। "আল্লাহকে মেনে নেবার পরে "। এই লাইনটির অর্থ বিশ্বাসীরা আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আনার পর অবিশ্বাসীরা তর্কবির্তকের মাধ্যমে তাদের বিশ্বাসের প্রতি অবজ্ঞা ও অপমান প্রদর্শন করে। কিন্তু তাদের এই কূট তর্ক বিশ্বাসীদের বিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল করতে অক্ষম। কারণ বিশ্বাসীদের বিশ্বাসের ভিত্তি , বিশ্বাস ও অবিশ্বাসীদের বৃথা ও অসাড় তর্কে দুর্বল হওয়ার নয়। বরং তাদের এই অসাড় তর্ক তাদের উপরেই প্রতিক্ষিপ্ত হয়। আল্লাহ্‌র ক্রোধ তাদের উপরে নিপতিত হয় ইহকালে , ও পরকালে তাদের দুরভিসন্ধি মূলক পরিকল্পনার জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি।

১৭। আল্লাহ্‌-ই সত্যসহ কিতাব ও [ন্যায় -অন্যায়ের ] মানদণ্ড প্রেরণ করেছেন ৪৫৫০। কি তোমাকে হৃদয়ঙ্গম করাবে যে সম্ভবতঃ কেয়ামত অতি আসন্ন ?

৪৫৫০। কিতাব অর্থাৎ আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ সমূহ। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের সত্য, মানদণ্ড যা দাঁড়িপাল্লার ন্যায়। আল্লাহ্‌ আমাদের নিকট কিতাব প্রত্যার্পন করেছেন দাঁড়িপাল্লার ন্যায় , যেনো আমরা প্রতি নিয়ত আমাদের নৈতিক নীতিমালা , পূণ্য -পাপ , ভালো মন্দ এরই নিরিখে বিচার করতে পারি, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে প্রতি মূহুর্তে আমাদের তা করতে হয়। কারণ শেষ বিচারের দিন যে কোনও মূহুর্তে চলে আসতে পারে। আবার মানদন্ড বা দাঁড়িপাল্লাকে আমরা এভাবেও বিচার করতে পারি যে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত মানসিক দক্ষতা সমূহ, যার সাহায্যে আমরা ন্যায় অন্যায় ,ভালো মন্দের, সত্য মিথ্যার পার্থক্য করতে পারি। অর্থাৎ বিবেক বা আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি হচ্ছে এই দাঁড়িপাল্লা বা মানদণ্ড।

১৮। যারা ইহা বিশ্বাস করে না শুধুমাত্র তারাই ইহা ত্বরান্বিত করতে চাইবে ৪৫৫১। আর যারা বিশ্বাস করে তারা শ্রদ্ধা ভক্তি মিশ্রিত ভয়ে ভীত এবং তারা জানে উহা সত্য। সাবধান! কেয়ামত সম্বন্ধে যারা বির্তক করে নিশ্চয়ই তারা বহুদূরে পথভ্রষ্ট।

৪৫৫১। অবিশ্বাসীরা শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাস করে না। তারা তা নিয়ে পরিহাস করে। তারা বিদ্রূপ করে বলে, " যদি শাস্তি থাকে তাড়াতাড়ি চলে আসুক।" এর তিন ধরণের উত্তর দেয়া হয়েছে আয়াত [ ১৩ : ৬ ] ও টিকা নং ১৮১০। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তাদের মনোভাব সম্পূর্ণ আলাদা। তারা জানে পরলোকের জীবন হচ্ছে চরম সত্য ; এবং তারা পরলোকের জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যারা কিয়ামত সম্বন্ধে বাক্‌ বিতন্ডা করে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে।

১৯। আল্লাহ্‌ তার বান্দাদের উপরে অতীব করুণাময় ৪৫৫২ , ৪৫৫৩ তিনি যাকে খুশী জীবনোপকরণ দিয়ে থাকেন ৪৫৫৪। তিনি ক্ষমতাবান এবং স্ব-ইচ্ছা সম্পাদন করতে সক্ষম।

৪৫৫২। 'Latif' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে আল্লাহ্‌র একটি গুণবাচক নাম হিসেবে। আল্লাহ্‌ দয়ালু , পরম করুণাময়, সদয়, ক্ষমাশীল। 'Latif' শব্দটির বিভিন্ন অর্থের জন্য দেখুন টিকা নং ২৮৪৪ ও আয়াত [ ২২ : ৬৩ ] ; আরও দেখুন আয়াত [ ১২ : ১০০ ]।

৪৫৫৩। 'বান্দাদিগের " দ্বারা এই আয়াতে সকল মানুষ - পাপী , পূণ্যাত্মা নির্বিশেষে সকলকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ্‌ সকলের পালনকর্তা।

৪৫৫৪। 'রিযিক' অর্থাৎ শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক বিকাশের জন্য সকল উপকরণ, "তিনি যাকে খুশী " - এই বাক্যটির অর্থ এই নয় যে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সীমাবদ্ধ ; বরং আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সকলের জন্য বিতরণ করা হয় , তবে তা আল্লাহ্‌র সূদূর প্রসারী জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। মানুষের ইচ্ছামত বা দাবী অনুযায়ী তা করা হয় না। আল্লাহ্‌ তাঁর অনুগ্রহ সকলকে ইচ্ছামত বন্টন করতে সক্ষম ,কারণ আল্লাহ্‌ অসীম ক্ষমতাশালী এবং তিনি তাঁর ইচ্ছাকে পরিপূর্ণতা দান করতে সক্ষম। পরবর্তী আয়াতে আরও মন্তব্য আছে।

রুকু - ৩

২০। যে কেহ পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার ফসল বর্দ্ধিত করে দেই। এবং যে কেহ এই পৃথিবীর ফসল কামনা করে , আমি তাকে উহার কিছু  অংশ দান করি , কিন্তু পরকালে তার কোন অংশ থাকবে না ৪৫৫৫।

৪৫৫৫। মানুষের জাগতিক ও পারলৌকিক কর্মপ্রণালীকে একটি সুন্দর উপমার সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে। কৃষক তাঁর জমি চাষ করে , মাটিকে ফসল বোনার উপযুক্তভাবে তৈরী করে, বীজ বপন করে , প্রয়োজনীয় আগাছা পরিষ্কার করে, এবং তাঁর এই পরিশ্রমের ফসল সময়কালে কেটে ঘরে তোলে। মানুষ যে ফসল বপন করে সেই ফসল-ই ঘরে তোলে। এই হচ্ছে স্রষ্টার আইন। কিন্তু আল্লাহ্‌ এখানে বলেছেন যে, যারা পারলৌকিক জীবনের জন্য পরিশ্রম করে, আল্লাহ্‌ তাদের পরিশ্রমের ফসল বহুগুণ করে তাদের দান করবেন। কিন্তু যারা শুধু জাগতিক বিষয়বস্তু এবং পার্থিব গৌরব ও অহংকারে নিমগ্ন থাকবে , তাদের পার্থিব সম্পদ তাদের আকাঙ্খা অনুযায়ী দান করা হবে ,কিন্তু পরলোকের জীবনের জন্য তাদের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে।

২১। সে কি !তাদের কি এমন সব শরীক [ দেবতা ] আছে যারা তাদের জন্য এমন সব ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে যার অনুমতি আল্লাহ্‌ দেন নাই ? ৪৫৫৬ আর যদি বিচার সম্বন্ধে [পূর্ব ] ঘোষণা না থাকতো , তবে তাদের মধ্যে বিষয়টির মীমাংসা [ তৎক্ষণাত ] হয়ে যেতো। প্রকৃতপক্ষে পাপীদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।

৪৫৫৬। আল্লাহ্‌র হুকুম ব্যতীত কোন কিছুরই অস্তিত্ব থাকতে পারে না। যারা আল্লাহ্‌ ব্যতীত মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করে , তারা কি বলতে পারে যে, " কেন আল্লাহ্‌ তাদের এ কাজের অনুমতি দান করেন ? " এর উত্তরহচ্ছে ,  আল্লাহ্‌ আদম সন্তানকে সীমিত আকারে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন - পৃথিবীতে তার জবাবদিহিতা নাই , কিন্তু তাদের এই কাজের জন্য তাদের অবশ্যই পরলোকে জবাবদিহি করতে হবে। দেখুন আয়াত [ ১৩: ৬ ] ও টিকা ১৮১০। 'পূর্ব ঘোষণা '- এ জন্য দেখুন আয়াত [ ১০ : ১৯ ] ও টিকা ১৪০৭।

২২। তুমি পাপীদের দেখবে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় , তাদের অর্জিত [ পাপ ] কাজের দরুণ ৪৫৫৭ , এবং তাদের [পাপের বোঝা অবশ্যই ] তাদের উপরে পতিত হবে। কিন্তু যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকাজ করে তারা থাকবে [ বেহেশতের ] বাগানের সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তরে ৪৫৫৮। তারা যা কিছু চাইবে তাদের প্রভুর নিকট তাই-ই পাবে। এটা অবশ্যই হবে [আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে ] জাঁকজমকপূর্ণ অনুগ্রহ ৪৫৫৮।

৪৫৫৭। পাপীদের শাস্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে তারা হবে মানসিক দিক থেকে ভীত ও সন্ত্রস্ত। তাদের পাপ কাজ তাদের বিবেককে তাড়া করে ফিরবে ফলে নৈতিক দিক থেকে তারা হবে ভীত ও সন্ত্রস্ত। পাপের ভারে তাদের অন্তরাত্মা সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকবে। এটাই হবে কৃতকর্মের শাস্তি।

৪৫৫৮। যারা সৎকাজে জীবন অতিবাহিত করেন তাদের চিত্র আঁকা হয়েছে পাপীদের মানসিক অবস্থার বিপরীত পটভূমিতে। পূণ্যাত্মাদের মানসিক অবস্থা হবে আরাম সুখ শান্তিতে সমৃদ্ধ। " তাদের কোনও ভয় নাই,তারা দুঃখিতওহবে না।" [ ২ : ৩৮ ]। তাঁদের আত্মা হবে পূত পবিত্র , এবং তাঁদের কোনও ইচ্ছাই আল্লাহ্‌ অপূর্ণ রাখেন না। আল্লাহ্‌র সান্নিধ্যে তারা জীবনের পরম ও চরম শান্তির আস্বাদন করবে। এই-ই হবে তাদের জীবনের চরম ও পরম পাওয়া। এর উপরে তাদের জন্য আর কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না। কারণ মানব জীবনের সর্বোচ্চ পাওয়া হচ্ছে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভ করা।

২৩। এই [ অনুগ্রহের ] সুসংবাদ আল্লাহ্‌ দেন তাঁর সেই বান্দাদের যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে ৪৫৫৯। বল : , " আমি তোমাদের নিকট থেকে আত্মীয়ের সৌহার্দ্য ব্যতীত এর জন্য অন্য কোন প্রতিদান চাই না " ৪৫৬০। যে ভালো কাজ করে আমি তার জন্য এতে কল্যাণ বর্ধিত করবো। আল্লাহ্‌ তো বারে বারে ক্ষমাশীল গুণ গ্রহণকারী ৪৫৬১।

৪৫৫৯। বেহেশতের ছবি বিভিন্নভাবে আঁকা হয়েছে। উপরের বর্ণনা তারই একটি বর্ণনা বিশেষ। এই বর্ণনাতে সর্বোচ্চ প্রাপ্তির উল্লেখ আছে, যা আল্লাহ্‌ মোমেন বান্দাদের দান করবেন।

৪৫৬০। আল্লাহ্‌র রাসুল মানুষকে সৎপথে আহ্বানের পরিবর্তে কোনও পুরষ্কার বা জাগতিক কোন কিছুই আকাঙ্খা করেন নাই। কিন্তু এটুকু তো দাবী তিনি করতে পারেন যে, তার আত্মীয় স্বজনেরা তাকে ভালোবাসবে ও তার উপরে কোনও অত্যাচার চালাবে না বা তাঁর কাজে বাঁধার সৃষ্টি করবে না , যেমনটি করেছিলো কোরাইশরা নবীর বিরুদ্ধে।

৪৫৬১। দেখুন আয়াত [ ৩৫ : ২৯- ৩০ ] এবং টিকা ৩৯১৫ [ বর্দ্ধিত করা শব্দটির জন্য ] এবং টিকা ৩৯১৭। [আল্লাহ্‌ মানুষের গুণাবলীর প্রশংসা করেন ]।

২৪। সেকি ! তারা কি বলে যে, " সে [নবী ] আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে ? " [যদি তাই হতো ] তবে আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে তোমার হৃদয় মোহর করে দিতে পারতেন ৪৫৬২। আল্লাহ্‌ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণীদ্বারা সত্যকে প্রমাণ করেন। অবশ্যই তিনি সকল হৃদয়ের গোপন কথা জানেন।

৪৫৬২। রাসুলের [সা ] দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে যদি কারও সন্দেহ হয়, তবে যেনো সে নবীর সামগ্রিক জীবন যাপন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও তাঁর গুণাবলীর দিকে লক্ষ্য করে। তাঁর ন্যায় পূত পবিত্র জীবন যাপন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; সত্যের প্রতি আল্লাহ্‌র নবীর অনুরাগ অতুলনীয়। আল্লাহ্‌ সত্যকে এবং সত্যাশ্রয়ীকে ভালোবাসেন , মিথ্যাকে ঘৃণা করেন। যারা সত্যাশ্রয়ী আল্লাহ্‌র সাহায্য তাদের জন্য প্রেরিত হয়, মিথ্যাশ্রয়ীদের জন্য নয়। আল্লাহ্‌র বাণীর যে সৌন্দর্য্য ও মানুষের মনের উপরে ক্ষমতা , তা মিথ্যার মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যারা মিথ্যাবাদী, যারা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে, আল্লাহ্‌ তাদের হৃদয়কে মোহর করে দেন। তারা আর মহত্তর ও বৃহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত হওয়ার ক্ষমতা হারায়। আল্লাহ্‌র নবীর মাঝে সেই ক্ষমতাই কি তাঁর নুবয়তের শ্রেষ্ঠ সাক্ষর নয়?

২৫। একমাত্র তিনিই তাঁর বান্দার অনুতাপ গ্রহণ করেন ৪৫৬৩ এবং পাপ সকল মাফ করে থাকেন। এবং তোমরা যা কর তার সব কিছু তিনি জানেন।

৪৫৬৩। মানুষের জন্য আল্লাহ্‌রএই বাণী এক বিশেষ সুসংবাদ। যদি অনুতাপ আন্তরিক হয় তবে আল্লাহ্‌র ক্ষমা সকল পাপীর জন্য সর্ব সময়ে উম্মুক্ত। পাপ যত জঘন্যই হোক না কেন প্রকৃত অনুতাপের মাধ্যমে সর্বদা আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করা যায়। তবে তা লাভ করতে হবে এই পার্থিব জীবনেই।

২৬। যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকাজ করে তিনি তাদের[ প্রার্থনা ]শোনেন ৪৫৬৪ এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন। কিন্তু অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।

৪৫৬৪। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য যে সৎ কাজ করে, সে কাজের অনুভূতি, তৃপ্তি, আবেগ ও বাসনা আত্মাকে করে সঞ্জিবীত ও সমৃদ্ধ। প্রতিটি সৎ কাজ আত্মাকে ক্রমান্বয়ে সফলতা ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বর্ধিত হয়।আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ হচ্ছে দুর্লভ চারিত্রিক গুণাবলী ও মানসিক দক্ষতা যা মোমেন ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীতে পরিণত হয় এবং জীবনকে পরিপূর্ণতা , সফলতা ও শান্তি দান করে।

২৭। যদি আল্লাহ্‌ তাঁর সকল বান্দাকে জীবনোপকরনের প্রাচুর্য দিতেন তবে তারা অবশ্যই পৃথিবীতে সকল সীমা লংঘন করতো ৪৫৬৫। কিন্তু তিনি যেরূপ ইচ্ছা করেন [ সুসম ] পরিমাণ মতই[ তা ]প্রেরণ করে থাকেন।তিনি তাঁর বান্দাদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত এবংতাদের লক্ষ্য রাখেন ৪৫৬৬।

৪৫৬৫। মানুষের সকল প্রার্থনা আল্লাহ্‌র নিকট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে না, এমন কি মোমেন বান্দার জন্যও না। এর উত্তর এই আয়াতে দেয়া হয়েছে। কারণ সমূহ নিম্নরূপ :

১) ভবিষ্যতের গর্ভে কি আছে আমরা কেহই তা জানি না , সুতারাং বর্তমানে যা মনোহর ও সফল মনে হয় হয়তো বা ভবিষ্যতের জন্য তা সুফল নাও বয়ে আনতে পারে। সুতারাং আমাদের জন্য প্রকৃত ভালো, আমরা কেহই জানি না। কারণ পৃথিবীতে প্রতি মূহুর্তে মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বিকৃতি ঘটে যেতে পারে। যার ফলে অনেক সময়েই আমরা আমাদের প্রকৃত মঙ্গলকে চিহ্নিত করতে অক্ষম হই।

২) ভবিষ্যত জ্ঞানের অভাবে মানুষের 'চাওয়া ' প্রকৃত কল্যাণকর নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা যা কামনা করে তা যদি সম্পূর্ণ তাদের দেয়া হতো তবে "তারা পৃথিবীতে সকল সীমা লঙ্ঘন করতো।" কারণ বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন স্বার্থ, পরস্পরের মাঝে এমন ভাবে মিশে যেতো যে তারা সংঘাতের সৃষ্টি করতো। সুতারাং প্রকৃতিতে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য মানুষের প্রার্থনা অনুমোদনের ক্ষেত্রে কিছুটা সমতা রক্ষা করা প্রয়োজন। বিশ্বজগতের ব্যবস্থাপনার জন্য তা প্রয়োজনীয়। কারণ মানুষের প্রত্যেকটি বাসনাপূর্ণ হওয়া মাঝে মাঝে স্বয়ং মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উপযোগীতার পরিপন্থি হয়ে থাকে। কাজেই কোন সময় কোন মানুষের দোয়া বাহ্যত কবুল না হলে এর পশ্চাতে বিশ্বজগতের এমন কিছু স্বার্থনিহিত আছে যা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা ব্যতীত আর কেউ জানে না। আল্লাহ্‌ সব মানুষকে সব নেয়ামত সমভাবে বণ্টন করেন না। কাউকে ধন-সম্পদ বেশী দিয়েছেন , কাউকে স্বাস্থ্য ও শক্তি অধিক পরিমাণে দিয়েছেন , কাউকে রূপ ও সৌন্দর্য্যে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং কাউকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরের তুলনায় বেশী সরবরাহ করেছেন। কাউকে মেধা ও সৃজন ক্ষমতা বেশী দিয়েছেন আবার কাউকে দিয়েছেন শিল্পী সত্ত্বা। ফলে সভ্যতার ক্রমবিকাশের জন্য প্রত্যেকেই প্রত্যেকের মুখাপেক্ষী। এই পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতার উপরেই সভ্যতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ্‌ সম্যক জানেন কার জন্য কোন নেয়ামত উপযুক্ত এবং কোন নেয়ামত ক্ষতিকর। তাই তিনি প্রত্যেককে তার উপযোগী নেয়ামত দান করেন। সকল নেয়ামত সমতা ও আল্লাহ্‌র প্রজ্ঞা অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। এর সারমর্ম এই যে, মানুষের প্রত্যেকটি বাসনা পূর্ণ হওয়া মাঝে মাঝে স্বয়ং মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উপযোগিতার পরিপন্থি হয়ে থাকে। কাজেই কোন দোয়া বাহ্যত কবুল না হলে এর পশ্চাতে বিশ্বজগতের এমন কিছু স্বার্থ নিহিত থাকে, যা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।

৪৫৬৬। "তিনি যেরূপ ইচ্ছা করেন সুসম পরিমাণেই তা প্রেরণ করে থাকেন।" এই বাক্যে তার ইচ্ছামত বাক্যটি "তিনি যা উপযুক্ত মনে করেন" বাক্যটির সমতুল্য "ইচ্ছামত" শব্দটি দ্বারা স্বেচ্ছাচারিতা বুঝানো হয় নাই, বরং আল্লাহ্‌র জ্ঞান প্রজ্ঞা অনুযায়ী বোঝানো হয়েছে।

২৮।[ মানুষ ] সকল আশা পরিত্যাগের পরেও আল্লাহ্‌ বৃষ্টি প্রেরণ করেন ৪৫৬৭, এবং [ দূর-দূরান্তরে ] তার করুণা ছড়িয়ে দেন। তিনিই তো অভিভাবক , সকল প্রশংসার যোগ্য।

৪৫৬৭। আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাত্রায়, বৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা কোন কিছুর সাথেই তুলনীয় নয়। মাটির আর্দ্রতা, ফসলের পরিপুষ্টি,নদীর নাব্যতা, বাতাসের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, আবহাওয়ার তাপমাত্রা ইত্যাদি সবই বৃষ্টির পরিমাণের উপরে নির্ভর করে। কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যাপারটি এতই সাধারণ যে, তা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণে অক্ষম। তখনই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় যখন অনাবৃষ্টির দরুণ ভূভাগ খরার কবলিত হয়। তখনই আমরা বৃষ্টিকে আল্লাহ্‌র রহমত রূপে পরিগণিত করি। আল্লাহ্‌র করুণা ও অনুগ্রহ বৃষ্টি অপেক্ষাও অধিক প্রয়োজনীয় আত্মার অস্তিত্বের জন্য। যখন আমাদের হতাশা ঘিরে ধরে, আমাদের সকল আশা-ভরসা নির্মূল হয়ে পড়ে , আমাদের আত্মিক অবস্থা ঐ খরা কবলিত মাটির ন্যায় হয়ে পড়ে ,তখন আল্লাহ্‌র সাহায্য ও রহমত বৃষ্টির ন্যায় সকল হতাশা ও নিরাশা দূর করে দেয়। আমাদের নূতনভাবে বাঁচার আশা আকাঙ্খা দান করে। সৃষ্টিকে রক্ষা করার স্রষ্টার এই কৌশল সর্বদা তাঁর সকল সৃষ্টিকে ঘিরে থাকে।তাঁর থেকে বড় অভিভাবক আর কে আছে ? সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌রই প্রাপ্য।

২৯। তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এই দুই এর মধ্যে তিনি যে সকল জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলি৪৫৬৮, ৪৫৬৯। তিনি যখন ইচ্ছা তখনই উহাদের সমবেত করতে সক্ষম।

৪৫৬৮। 'Dabbatun' - সকল পশু প্রাণী, এর মাঝে সরীসৃপ ও সকল জীবিত প্রাণী অন্তর্ভূক্ত। দেখুন টিকা ১৬৬ ও আয়াত [ ২ : ১৬৪ ] ও অনুরূপ আয়াত [২৪ : ৪৫ ] এবং অন্যান্য আয়াত সমূহ। এই আয়াতে 'জীব-জন্তু' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সকল জীবিত প্রাণের জন্য। জীবনের উৎস হচ্ছে জীবকোষের অভ্যন্তরের প্রোটপ্লাজম। যত আমাদের প্রাণীবিদ্যার জ্ঞানের ক্ষেত্র প্রশস্ত হচ্ছে, তত আমরা অনুধাবন করছি যে, সকল জীবনের উৎস এক কিন্তু তা সত্বেও তাদের মাঝে কতই না বিভিন্নতা। আল্লাহ্‌রএ এক অন্যতম নিদর্শন।

৪৫৬৯। কোরাণের এই আয়াত অনুযায়ী জীবনের বিকাশ শুধুমাত্র এই পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নয়। যদিও তত্ব অনুযায়ী আমরা জানি যে, সৌর মন্ডলের পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোনও গ্রহেই প্রাণের অস্তিত্ব নাই , কিন্তু কোটি কোটি যোজন দূরের যে নক্ষত্র মন্ডল সেই সব মিলিয়ন মিলিয়ন তারার মেলায় অনন্ত মহাশূন্যে কোন কোন গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব বিদ্যমান। আল্লাহ্‌র কি অপূর্ব নিদর্শন। যে সর্বশক্তিমান ,এরূপ সীমাহীন আকাশ, অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্র ও তাদের অসংখ্যের মাঝে প্রাণ সৃষ্টি করতে পারেন তিনি-ই ধন্য।

রুকু - ৪

৩০। তোমাদের যে দুর্ভাগ্য ঘটে তার কারণ তোমাদের হাত তার জন্য পরিশ্রম করেছে , এবং [ তোমাদের ] অনেকের জন্য তিনি ক্ষমা মঞ্জুর করেন ৪৫৭০।

৪৫৭০। মানুষের বিপদ, বিপর্যয়, দুঃখ ,কষ্ট, মানুষের পাপেরই পরিণতি। মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে পূত ও পবিত্র রূপে। সময়ের সাথে সাথে মানব শিশু বড় হয় এবং পৃথিবীর জটিলতায় নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে এবং পাপে নিমগ্ন হয়, ফলে সে আত্মার পবিত্রতা হারায়। মানুষের বিপদ বিপর্যয় মানুষের কৃতকর্মেরই ফল। সুতারাং প্রতিটি মানুষকেই তার ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে। তার দুর্ভাগ্যের জন্য সে অন্য কাউকে দোষারোপ করতে পারবে না।

৩১। তোমরা পৃথিবীতে [তাঁকে ] ব্যর্থ করতে পারবে না , আল্লাহ্‌ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নাই অথবা সাহায্যকারীও নাই ৪৫৭১।

৪৫৭১। প্রতিটি মন্দ চিন্তা, মন্দ কথা ও মন্দ কাজের পরিণতি মন্দ। ঠিক সেরূপ প্রতিটি ভালো চিন্তা , কথা ও কাজের পরিণতি ভালো। পৃথিবীতে ভালো কাজ তা যত সামান্যই হোক তার সুফল মানুষ ভোগ করবে, তবে সকল মন্দ কাজের শাস্তি পাপীরা লাভ করে না। কারণ আল্লাহ্‌ অনেক মন্দ কাজকেই ক্ষমা করে দেন। যদি আল্লাহ্‌ কিছু ক্ষমা করে দেন, এর ফলে কেউ যেনো মনে না করে যে, সে আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা ও ইচ্ছাকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম।আল্লাহ্‌ সর্বশক্তিমান ,তিনি ব্যতীত আর কোনও অভিভাবক বা রক্ষাকর্তা নাই। দেখুন আয়াত [ ৩৯: ২২ ]।

৩২। এবং তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে সাগরে সঞ্চরণশীল পাহাড়ের ন্যায় জাহাজসমূহ ৪৫৭২।

৪৫৭২। পর্বত প্রমাণ ঢেউয়ের মাঝে চলমান জাহাজ সমূহের উদাহরণ বারে বারে বহু স্থানে তুলে ধরা হয়েছে আল্লাহ্‌র বিভিন্ন নিদর্শন স্বরূপ। প্রাচীন কালে জাহাজসমূহ সমুদ্রে চলাচল করতো পালের সাহায্যে এবং পাল ছিলো সম্পূর্ণরূপে বাতাসের উপরে নির্ভরশীল। সেই কথাই এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, নৌযান সমূহ তাদের নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহ্‌র করুণার উপরে নির্ভরশীল। যদি বাতাস থেমে যেতো তবে বিশাল নৌযান সমূহ বাতাসের অভাবে মৃতবৎ দাড়িয়ে থাকতো। বর্তমানে অবশ্য জাহাজসমূহ বাতাসের উপরে নির্ভরশীল নয় , কিন্তু এই উপমা এখনও সমভাবে প্রযোজ্য। কারণ জাহাজ বা প্লেন সব কিছুই বাতাসের গতিবেগ অনুসরণ করেই চালানো হয়। এবং প্রচন্ড ঝড়ের মুখে এসব যানবাহন সমূহ তৃণবৎ পরিগণিতহয়।বায়ু প্রবাহ, তা  আল্লাহ্‌রইএক নিদর্শন।

৩৩। তিনি ইচ্ছা করলে বায়ুকে নিশ্চল করে দিতে পারতেন। তখন[ সমুদ্র ] পৃষ্ঠে তারা গতিহীন হয়ে পড়ে। যারা ধৈর্যের সাথে অধ্যাবসায়ী হয় এবং কৃতজ্ঞ হয় অবশ্যই এতে তাদের প্রত্যেকের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে ৪৫৭৩।

৩৪। অথবা, তিনি তাদের অর্জিত [ পাপের ] দরুণ সেগুলি ধবংস করে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি অধিকাংশকেই ক্ষমা করেন।

৪৫৭৩। আকাশ ও পৃথিবীতে স্রষ্টার নিদর্শন সমূহ ছড়ানো আছে। যদি আমরা স্রষ্টার নিদর্শন সমূহ সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারি , তবে এই অনুভব একদিকে আমাদের ধৈর্য্যশীল অধ্যাবসায়ী এবং আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীল হতে শিক্ষা দান করবে ; অন্যদিকে আমাদের আত্মার মাঝে আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ সৃষ্টি করবে। আত্মার মাঝেও বোধ জন্মাবে যে আমাদের দোষত্রুটি সত্বেও স্রষ্টা আমাদেরশাস্তি দান না করে বারে বারে ক্ষমা করেন।আল্লাহ্‌ নিরাকার ; বিশ্বের সকল কিছুর মাঝেই তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান। অন্তর দিয়ে অনুভূতি দিয়ে তা আত্মার মাঝে উপলব্ধির মাধ্যমেই নিরাকার আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব আত্মার মাঝে অনুভব করা সম্ভব। ধ্যানের মাধ্যমে, চিন্তার দ্বারা , আত্মপোলব্ধি ঘটে। বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে এই আত্মপোলব্ধির প্রতি আহ্বান করা হয়েছে।

৩৫। যারা আমার নিদর্শন সমূহের সম্বন্ধে বির্তক করে, তদের জানতে দাও যে, তাদের পলায়নের কোন পথ নাই ৪৫৭৪।

৪৫৭৪। আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহ যদি আমরা সঠিক মনোভাবের সাথে গ্রহণ না করি এবং এ সম্বন্ধে শুধু বৃথা তর্কবিতর্কে লিপ্ত হই এবং তা প্রত্যাখান করি, এবং তা বুঝতে ও উপলব্ধি করতে চেষ্টা না করি তবে আমাদের তার পরিণতি সম্বন্ধে সাবধান করা হয়েছে। বলা হয়েছে বিনিময়ে তারা কোনও কিছুই লাভ করবে না বরং তারা এর দ্বারা আল্লাহ্‌র শাস্তি এড়াতে ব্যর্থ হবে। আল্লাহ্‌র শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার একামাত্র উপায় হচ্ছে অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন করা এবং আল্লাহ্‌র করুণা লাভ করা।

৩৬। অতএব, [ এখানে ] তোমাদের যা কিছু দেয়া হয়েছে তা এই পৃথিবীর জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য মাত্র ৪৫৭৫। কিন্তু আল্লাহ্‌র নিকট যা রয়েছে তা আরও উত্তম এবং আরও স্থায়ী। [ এগুলি ] তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের প্রভুর উপরে নির্ভর করে ৪৫৭৬।

৪৫৭৫। পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী জীবন , মৃত্যুর সাথে সাথে এ জীবনের শেষ হয়ে যায়। পৃথিবীর জীবনের জন্য ভালো বা মন্দ ভাগ্য সবই ক্ষণস্থায়ী এবং আল্লাহ্‌ তা দান করেন পৃথিবীর জীবনের মাধ্যমে পরলোকের সুখ শান্তি অর্জনের জন্য। আলোচ্য আয়াত সমূহে বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়ার নেয়ামত সমূহ অসম্পূর্ণ ও ধ্বংসশীলএবং পরকালের নেয়ামত সমূহ যা আল্লাহ্‌র কাছে সংরক্ষিত তা পরিপূর্ণ ও চিরন্তন। ঠিক সেই একইভাবে ইহকালের দুঃখ কষ্ট ও মন্দ ভাগ্য সবই অস্থায়ী - তা শুধু এই জীবনের "শিক্ষানবীশকালের " জন্য প্রযোজ্য হবে।কিন্তু কেউ যদি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বঞ্চিত হয় তবে, তা হবে স্থায়ী মন্দ ভাগ্য। কারণ আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বঞ্চিত আত্মা হচ্ছে অভিশপ্ত আত্মা ,আধ্যাত্মিক জীবন যার জন্য অন্ধকার।

৪৫৭৬। স্থায়ী নেয়ামত সমূহ অর্জনের সর্ব প্রধান শর্ত হচ্ছে ঈমান বা এক আল্লাহ্‌র এবাদত করা এবং আল্লাহ্‌র রাস্তায় কাজ করা। পার্থিব জীবনে আল্লাহ্‌র এবাদতকে নয়টি বৈশিষ্ট্যে ভাগ করা হয়েছে :

১) তাদের আল্লাহ্‌র একত্বের প্রতি বিশ্বাস থাকবে যার প্রকাশ ঘটবে ;

২) মিথ্যা উপাস্যের উপরে নির্ভরশীলতার পরিবর্তে তারা এক আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীল হবে। মিথ্যা মূল্যবোধের পরিবর্তে তারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত মূল্যবোধকে গ্রহণ করবে; [ ৪২ : ৩৬ ]

৩) তারা গুরুতর পাপ থেকে ও অশ্লীল কাজ [ যৌন অপরাধ ] থেকে বিরত থাকে। [ ৪২ : ৩৭ ]

৪) তারা জানে যে মানুষ মাত্রই কেহই দোষত্রুটির উর্দ্ধে নয়। তারা নিজেরাও দোষত্রুটির উর্দ্ধে নয়। সুতারাং তারা রাগন্বিত হয়েও ক্ষমা করে দেয়। কারণ ক্রোধ যখন প্রবল আকার ধারণ করে , সুস্থ বিবেকবান ও বুদ্ধিমান মানুষকেও অন্ধ ও বধির করে দেয়। সে বৈধ অবৈধ ,সত্য মিথ্যা ও আপন কর্মের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। সুতারাং মোমিন ব্যক্তিরা ক্রোধকে দমন করবে। [৪২:৩৭]

৫) অন্যান্য বৈশিষ্ট্য গুলির জন্য দেখুন টিকা নং ৪৫৭৮।

৩৭। যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ পরিহার করে চলে, এবং যখন তারা ক্রোধান্বিত হয়, তখনও ক্ষমা করে ৪৫৭৭।

৪৫৭৭। পার্থিব জীবনে সাধারণ নারী ও পুরুষ কেহই ছোট খাট পাপ ও দোষত্রুটির উর্দ্বে নয়। কিন্তু এরা আন্তরিক ভাবে আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাসী এবং আল্লাহ্‌র আইন অনুসরণ করতে চেষ্টা করে। এরা জানে তারা নৈতিক দিক থেকে নিখুঁত নয়। কিন্তু এরা চেষ্টা করে গুরুতর পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। আল্লাহ্‌ পরম করুণাময়। সাধারণ মানুষের সীমাবদ্ধতা তিনি জানেন। যারা আধ্যাত্মিক দিক থেকে সাধারণ মানুষের উর্দ্ধে তাদের নৈতিকতার মানদণ্ড আরও কঠোর। কিন্তু সকলের জন্যই আছে ইসলামের আশীর্বাদ; হতে পারে তা বিভিন্ন মানদন্ডে।

৩৮। যারা তাদের প্রভুর [ আহ্বান ] মনোযোগ দিয়ে শোনে ৪৫৭৮ এবং নিয়মিত নামাজ পড়ে ; নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কাজ করে ৪৫৭৯ , তাদের যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে ;

৪৫৭৮। টিকা ৪৫৭৬ এবাদতের যে নয়টি বৈশিষ্ট্য আরম্ভ করা হয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতা এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। যারা আল্লাহ্‌র সেবা করেন তারা :

৫) সর্বদা আল্লাহ্‌র নিদর্শন শোনার জন্য ও উপলব্ধি করার জন্য ব্যগ্র থাকেন। অথবা আল্লাহ্‌র রাসুলের সর্তকবাণীর প্রতি মনোযোগ দেয় এবং তাদের সাধ্য অনুযায়ী সে পথ অনুসরণ করতে চেষ্টা করেন

৬) তারা আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের জন্য সালাত কায়েম করে - আল্লাহ্‌র প্রশংসা ও প্রার্থনার মাধ্যমে।

৭) তাদের কাজ কর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে স্থিরীকৃত হয়। তাদের চরিত্র ও কাজে কোনও গোপনতা থাকে না। কারণ সিদ্ধান্ত সকলের মতামতের ভিত্তিতেই গ্রহণ করা হয়। যেমন : গৃহে স্বামী,স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে ; ব্যবসা বাণিজ্যে অংশীদারদের মতামতের ভিত্তিতে ; দেশ পরিচালনায় শাসক ও শাসিতের মধ্যে মত বিনিময়েরর ভিত্তিতে ; প্রশাসনে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে ইত্যাদি।

৮) 'ব্যয়' করে অর্থাৎ যারা খরচ বা দান করে। তারা কখনও তাদের থেকে যারা দুর্বল তাদের জন্য সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করতে কার্পণ্য বোধ করে না। এই সাহায্য শুধু যে অর্থ সম্পদ তাই-ই নয়, আল্লাহ্‌ যাকে যে নেয়ামত দান করেছেন যথা : প্রতিভা , ক্ষমতা , যশঃ প্রতিপত্তি সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি [ দেখুন টিকা নং ২৭ ] তাই থেকে তাঁরা 'ব্যয়' বা দান করেন।

৯) যখন অন্য লোক তাদের প্রতি অত্যাচার করে, তারা ভয় পান না বা অন্যায় ও পাপের নিকট আত্মসমর্পন করেন না [৪২:৩৯)। প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত [ আয়াত ৪০ এর উল্লেখ করা হয়েছে]অধিকারের ভিত্তিতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন।

৪৫৭৯। " পরামর্শের মাধ্যমে " এই পরামর্শ শব্দটি হচ্ছে সূরাটির মূল শব্দ যে অনুযায়ী সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে। উদেশ দান করা হয়েছে মোমেন বান্দাদের ; কিভাবে তারা তাদের প্রতিদিনের কার্য পরিচালনা করবেন।এই আয়াতের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গনতন্ত্রের পরিচর্যা করতে বলা হয়েছে ; ঘরে -বাইরে সর্বত্র। এর ফলে একদিকে ব্যক্তির চরিত্রে আত্মগরিমা ও আত্ম অহংকারের জন্ম লাভ করবে না, অন্যদিকে ব্যক্তি তাঁর প্রতি আরোপিত দায়িত্ব হালকাভাবে গ্রহণ করবে না। কারণ প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা বিদ্যমান যা আল্লাহ্‌র নিকট গ্রহণযোগ্য। দেখুন উপরের ৪৫৭৮ টিকার (৭) নম্বর ব্যাখ্যা। ঘরে-বাইরে, রাষ্ট্র পরিচালনায়, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে গণতন্ত্রের এই স্বতঃস্ফুর্ত প্রকাশ ঘটে নবীজির জীবনের মাধ্যমে। শুধু তাই-ই নয় আল্লাহ্‌র এই হুকুমের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে ইসলামের প্রথম শাসকবর্গের জীবনেঃ চার খলিফার সময়কালে। বর্তমান যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের রূপরেখা ইসলামের এই নীতির আংশিক প্রয়োগ মাত্র। দেখুন মওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের 'Religious Policy of Islam' বইটি।

৩৯। এবং যারা অত্যাচারিত হলে [ ভীত হয় না , বরং ] নিজেকে সাহায্য ও প্রতিরক্ষা করে ৪৫৮০।

৪৫৮০। তারা অত্যাচারিত হলে সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করে এতে তারা সীমালংঘন করে না। এই প্রতিশোধের ক্ষেত্র চারটি হতে পারে। ১) ব্যক্তিগত। ২) অথবা নিজ পরিবার পরিজন। ৩) অথবা নিজ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠি। ৪) অথবা মজলুম জনতার অধিকার আদায়ের জন্য। এর মধ্যে ১) নম্বর ব্যতীত (২), (৩) , (৪) অত্যন্ত মহৎ কাজ যা করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। পৃথিবীতে খুব নগণ্য সংখ্যক লোকই আছে যারা অপরের জন্য আত্মোৎসর্গ করতে পারেন। (১) নম্বরে বলা হয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের কথা। কিন্তু মানুষের রাগ ও আক্রোশের দরুণ তার অপব্যবহার হতে পারে। যদিও (২), (৩) ও (৪)অত্যন্ত মহৎ কাজ , কিন্তু এরূপ মহৎ কাজেরও অপব্যবহার হতে পারে যখন এরূপ কাজের গোপন উদ্দেশ্য থাকে ব্যক্তিস্বার্থ। সে কারণেই প্রতিশোধের সীমারেখা নিচের আয়াতসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে , এবং টিকাতে ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে।

৪০। ক্ষতির বিনিময় সম পরিমাণ ক্ষতি ৪৫৮১। কিন্তু যদি কেউ ক্ষমা করে দেয় এবং আপোষ -নিষ্পত্তি করে, তার জন্য পুরষ্কার রয়েছে আল্লাহ্‌র নিকট ৪৫৮২। যারা পাপ করে আল্লাহ্‌ তাদের পছন্দ করেন না ৪৫৮৩।

৪৫৮১। যদি কেউ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অন্যায়ের প্রতিবিধানের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করে তবে তা হতে হবে আল্লাহ্‌র আইনের সীমারেখার মধ্যে।আইন যতটুকু অনুমোদন করে ততটুকুই প্রতিশোধ সে গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র আইন হচ্ছে , " ক্ষতির বিনিময়ে সম পরিমাণ ক্ষতি " - তোমার যতটুকু আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি কেউ করে , তুমি ঠিক ততটুকু ক্ষতিই তার কর। এটা প্রকৃতপক্ষে চতুর্থ গুণের ব্যাখ্যা ও বিবরণ। চতুর্থ গুণটি ছিলো যে, তারা শত্রুকে ক্ষমা করে। কিন্তু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমা করলে অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। তখন প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণই উত্তম পন্থা। আয়াতে এই বিধান বর্ণিত হয়েছে যে, কোথাও প্রতিশোধ গ্রহণ শ্রেয় বিবেচিত হলে সেখানে সাম্যের সীমা লঙ্ঘন না করার প্রতি লক্ষ্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সীমা লংঘিত হলে তা অত্যাচারে পর্যবসিত হবে। এই সীমারেখার ফলে প্রতিশোধকাঙ্খী ব্যক্তির বা গোষ্ঠির প্রতিশোধের আকাঙ্খা উদগ্র রূপ ধারণ করতে পারে না। আল্লাহ্‌র বিধানের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ স্পৃহার পরিতৃপ্তি নয় , বরং অত্যাচারীকে সংশোধন করার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বিবাদ বিসংবাদের অবসান ঘটানো। দেখুন আয়াত [ ৪১ : ৩৪ ] এবং [ ২৩ : ৯৬ ] আয়াতে যদিও সমান সমান প্রতিশোধের অনুমতি দেয়া হয়েছে কিন্তু এ কথাও বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে এবং আপোষ নিষ্পত্তি করে তার পুরষ্কার আল্লাহ্‌র দায়িত্ব। এতে বলা হয়েছে যে, ক্ষমা করাই উত্তম। যে ক্ষেত্রে ক্ষমা করার ফলে অত্যাচারীর ধৃষ্টতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেয়াই উত্তম। ক্ষমা করা তখনই উত্তম, যখন অত্যাচারী ব্যক্তি অনুতপ্ত হয় এবং তার পক্ষ থেকে অত্যাচার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। অবস্থাভেদে ক্ষমা ও প্রতিশোধ দুটোই উত্তম পন্থা। তবে সর্বাপেক্ষা উত্তম পন্থা হচ্ছে নৈতিকভাবে অত্যাচারীর মানসিক পরিবর্তন ঘটানো, যাতে সে অনুতপ্ত হয়, ফলে ঘৃণা বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয় যা করা সম্ভব শুধুমাত্র ক্ষমা ও ভালোবাসার মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে ক্ষমাকারীর ক্ষতিপূরণ বা পুরষ্কার যাই বলা হোক না কেন, হবে বহুগুণ। কারণ এর ফলে তারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে।

যে মতবাদ খৃষ্টানদের মধ্যে চালু আছে যে, " এক গালে চড় খেলে অন্য গাল বাড়িয়ে দাও" - ক্ষমার এই বাড়াবাড়িমূলক দৃষ্টান্ত ইসলাম গ্রহণ করে না। এই ক্ষমার দৃষ্টান্ত অন্যায়কারীদের অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও অন্যায় করার প্রবণতা বৃদ্ধি করবে। এ ব্যবস্থা হতে পারে কাপুরুষদের জন্য অথবা এ ব্যবস্থা তারাই প্রচার করেছে যারা মোনাফেক এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের দাস বানানোর চক্রান্ত বিশেষ। কারণ বাইবেলের চারটি আনুশাসনিক উপদেশ বইয়ের দুটির মধ্যে এই উপদেশ পাওয়া যায় [ MaH. v. 39, and Luke .vi. 29 ]। বাইবেলের বহু অংশ সময়ের ব্যবধানে বিকৃত হয়ে গেছে। সুতারাং এ কথা বিশ্বাস করার কোনও যুক্তি সঙ্গতকারণ নাই যে, যীশুখৃষ্ট এই মতবাদ প্রচার করেছেন।

৪৫৮২। মানব জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্‌কে ভালোবাসা ও আল্লাহ্‌র ভালোবাসা লাভ করা। আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকে ভালোবাসার মাধ্যমেই আল্লাহ্‌কে ভালোবাসা যায়। কারণ আল্লাহ্‌ নিরাকার। কিন্তু আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব তাঁর সৃষ্টির মাঝে বর্তমান। আল্লাহ্‌র কল্যাণকর হস্ত সর্ব সৃষ্টিকে ঘিরে থাকে। যে আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকে ভালোবাসে প্রকারান্তে সে আল্লাহকেই ভালোবাসে। কারণ আল্লাহ্‌ জালিমদের পছন্দ করেন না। যে আল্লাহ্‌র অনুমোদন ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারে , তাঁর জীবনে চাওয়া পাওয়ার কিছু থাকে না। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মূল্যবান পুরষ্কার আল্লাহ্‌র ভালোবাসা ও অনুমোদন লাভকারী ব্যক্তির নিকট তুচ্ছ ; কারণ আল্লাহ্‌র নূর তাঁর সর্ব সত্তাকে পরিব্যপ্ত করে রাখে। যার তৃপ্তি ও সুখ শান্তি অতুলনীয়।

৪৫৮৩। আল্লাহ্‌ অত্যাচারী জালিমদের পছন্দ করেন না। সুতারাং ক্ষমতা থাকা সত্বেও আমরা যদি অন্যায়কারীকে বাধা দান করে অন্যায়ের প্রতিরোধ না করি তবে আমরা আল্লাহ্‌র প্রতি আমাদের যে কর্তব্য তা থেকে বিচ্যুত হব। অন্যায়ের প্রতিরোধ করা মুসলমানদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

৪১। কিন্তু কারও প্রতি অন্যায় করা হলে যদি সে নিজেকে সাহায্য করে এবং প্রতিরক্ষা করে , তবে তাদের প্রতি কোন দোষারোপ করা হবে না ৪৫৮৪।

৪৫৮৪। অত্যাচারিত হওয়ার পরে যারা প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের দোষারোপ করে কোন ব্যবস্থা আল্লাহ্‌ গ্রহণ করবেন না। যদিও তারা ক্ষমার ন্যায় মহৎ পন্থা ত্যাগ করে সাধারণ আইনের আওতায় নিয়োজিত তবুও তাদের কোনও পাপ হবে না। পাপ হবে তাদেরই যারা মানুষের উপরে অন্যায়ভাবে অত্যাচার করে,পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে ; দেখুন পরবর্তী টিকা।

৪২।যারা অন্যায় ভাবে মানুষকে নীপিড়ন করে ,এবং পৃথিবীতে সকল সীমা লংঘন করে থাকে ,সত্য এবং ন্যায়কে অস্বীকার করে , শুধুমাত্র তাদেরকেই দোষারোপ করা হয়। নিশ্চয়ই তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি ৪৫৮৫।

৪৫৮৫। ক্ষমার ন্যায় মহৎ আইনের আশ্রয় গ্রহণ না করে মানুষ তখনই প্রতিশোধের মাধ্যমে প্রতিরোধের আশ্রয় গ্রহণকরে যখন অপরপক্ষ হয় ভয়াবহ অত্যচারী যেমন ছিলো ফেরাউন। সে নিজেকে আল্লাহ্‌ বলে ঘোষণা দিয়েছিলো। সে তার নিজের প্রজাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত করেছিলো এবং সকল মানুষকে যাদুবিদ্যার সাহায্যে প্রতারণা করতো। এরূপ ক্ষেত্রে ক্ষমার প্রশ্নটি সাধারণ লোকের জন্য গ্রহণ করা দুষ্কর।

৪৩। কিন্তু কেউ যদি ধৈর্য অবলম্বন করে ও ক্ষমা প্রদর্শন করে , তবে তা হবে চরিত্রের নির্ভিক ও দৃঢ় সংকল্প ইচ্ছার অনুশীলন ৪৫৮৬।

৪৫৮৬। উপরের পরিস্থিতিতে সাধারণ লোকের জন্য ক্ষমার করা যদিও কঠিন, তবুও আল্লাহ্‌র নবী সেই কঠিন ও দুষ্কর পথই অবলম্বন করেন। মক্কার কোরেশরা তাঁর উপরে যে নির্যাতন ও অত্যচার চালায় তা ছিলো অমানবিক। মক্কা জয়ের পরে তিনি ইচ্ছা করলেই তাদের দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দান করতে পারতেন বা তাদের "উচিত শিক্ষা " দান করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই। তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হবে সিদ্ধান্তটির কোনও সূদূর প্রসারী উদ্দেশ্য নাই , কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিদ্ধান্ত ছিলো এক মহান সাহস ও সূদূর প্রসারী সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি। কারণ রাসুলের [ সা ] ক্ষমা অপরাধীদের অন্তরে গভীর রেখাপাত করে , তারা অনুতপ্ত হয়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে যা অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দানের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব ছিলো না। ক্ষমা ও সহানুভূতি কখনও কখনও কঠোরতা অপেক্ষা গভীর ভাবে জীবনের ক্ষেত্রে দাগ কেটে যায়। তবে এই কথা সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়। কোন কোন ব্যক্তির জন্য কঠোরতার প্রয়োজন আছে, তবে তা হতে হবে আইনের আওতায় ,ন্যায়সঙ্গত ভাবে। তা যেনো ব্যক্তিগত আক্রোশ বা হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের পন্থা না হয়।

রুকু - ৫

৪৪। যাকে আল্লাহ্‌ বিপথে ত্যাগ করেন , তার জন্য কোন অভিভাবক নাই। পাপীরা যখন শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তুমি ওদের বলতে শুনবে ," [পৃথিবীতে ] ফিরে যাওয়ার কোন পথ আছে কি ?" ৪৫৮৭

৪৫৮৭। মৃত্যুর পরপারের জীবনে পাপীরা যখন তাদের কাজের পরিণাম উপলব্ধি করতে পারবে তখন পাপীদের মনের অবস্থা এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা তখন প্রাণপণে পৃথিবীর শিক্ষানবীশ কালে পুণরায় ফিরে যেতে চাইবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যখন সে পৃথিবীর জীবনে ছিলো, সে বারে বারে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহকে অবহেলা , অপব্যবহার ও প্রত্যাখান করেছে। জীবনের সে অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সে কিভাবে আবার সেখানে ফিরে যাবে ?

৪৫। তুমি দেখবে যে, অবনত অবস্থায় তাদের [ শাস্তির ] দিকে অগ্রসর করানো হবে এই কারণে তারা অপমানে চোরা চাহ্‌নীতে তাকাবে ৪৫৮৮। এবং বিশ্বাসীরা বলবে, " যারা নিজেদের ও নিজ পরিবারবর্গের [পরলোকের সুখ ] ধ্বংস করে , প্রকৃতপক্ষে তারাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে শেষ বিচারের দিনে।" সাবধান ! পাপীরা থাকবে চিরস্থায়ী শাস্তির মাঝে ৪৫৮৯।

৪৫৮৮। পৃথিবীর জীবনে পাপীরা ছিলো উদ্ধত অহংকারী , তারা ভুলে গিয়েছিলো যে, পৃথিবীর জীবন হচ্ছে পরলোকের " শিক্ষানবীশ কাল" মাত্র। এখন পরলোকে যখন তারা প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবে , তারা বিনয় ও নম্রতায় মাটির সাথে মিশে যেতে চাইবে। তারা তাদের দুঃখ দুর্দ্দশাতে হতাশ হয়ে পড়বে। পৃথিবীর জীবনের কোনও অনুগ্রহই সেখানে দেখতে পাবে না [ দেখুন আয়াত ২০ : ১২৪ - ১২৬ ]। যখন তারা তাদের বিপদ বিপর্যয় উপলব্ধি করতে পারবে তারা এত ভীত হয়ে পড়বে যে তাদের শুধুমাত্র তীর্যকভাবে তাকানোর ক্ষমতা থাকবে।

৪৫৮৯। মুমিন ব্যক্তিদের চিন্তা , অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি , ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হবে। " সকল দুঃখ - কষ্ট, বিপদ ,বিপর্যয়,নির্যাতন, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, অত্যাচার অপমান, যা তারা পাথির্ব জীবনে ভোগ করতে বাধ্য হয়েছিলো সত্যের অনুসারীদের শত্রুদের দ্বারা, সেগুলি সব মূল্যহীন হয়ে পড়বে। শেষ বিচারের দিনে প্রতিটি কাজের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ হয়ে পড়বে। সত্যকে প্রতিরোধ এবং সত্যকে প্রত্যাখান দ্বারা পাপীরা নিজেদের আত্মার গুণাবলীকে ধবংস করে ফেলে, ফলে এসব আত্মা হয় সত্যবিমুখ ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে মৃত। মন্দ ও উদ্ধত অহংকারীরা এভাবেই তাদের আত্মাকে ধ্বংস করে ফেলে , যা হয় দোযখের ইন্ধন। এসব দোযখের অধিবাসী ও তাদের সাথে যারা সহযোগীতা করতো সকলেই দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে। আর এই শাস্তি হবে অনন্তকাল স্থায়ী।

৪৬। আল্লাহ্‌ ব্যতীত সাহায্য করার জন্য আর কোন অভিভাবক তাদের থাকবে না৪৫৯০। আল্লাহ্‌ যাদের বিপথে ত্যাগ করেন তাদের [ লক্ষ্যে পৌঁছানোর ] কোন পথ নাই।

৪৫৯০। আয়াত নং ৪৪ যে যুক্তির অবতারণা করা হয়েছিলো এই আয়াতে এসে তার সমাপ্তি টানা হয়েছে। যদি কেউ শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্‌র উপরে বিশ্বাস স্থাপন না করে,এবং আল্লাহ্‌র হেদায়েতকে প্রত্যাখান করে এবং আল্লাহ্‌র তত্ববধানের উপরে নির্ভরশীল না হয়, তবে প্রকৃত পক্ষে তাদের কোনও অভিভাবক নাই। আল্লাহ্‌ ব্যতীত পৃথিবীতে যাদের তারা শক্তিশালী রূপে কল্পনা করতো সে সব মিথ্যা উপাস্যের উপাসনার ফলে তারা ধীরে ধীরে সঠিক পথের পরিবর্তে বিপথে পরিচালিত হয়। তাদের মূল্যবোধ,ধ্যান, ধারণা সবই ধীরে ধীরে বিকৃতরূপ ধারণ করে, কিন্তু পৃথিবীর জীবনে তারা তা উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়। শেষ বিচারের দিনে যখন প্রকৃত সত্য তাদের সম্মুখে উদ্ঘাটিত হবে, তারা তখন প্রাণপণে চাইবে পৃথিবীর জীবনের পুণরাবৃত্তি। কিন্তু হায় ! তখন আর তা সম্ভব হবে না। তাদের দোযখের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। অপরপক্ষে যাদের তারা পৃথিবীতে নগণ্যরূপে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করতো সেই সব মোমেন বান্দারা পৃথিবীর সৎ জীবনের সফল পরিণতি লাভ করে ধন্য হবে। তাদের জন্য হবে বেহেশতে অবস্থান।

৪৭। সেদিন আসার পূর্বেই তোমার প্রভুর আহ্বানে সাড়া দাও, যেদিন আল্লাহ্‌র [ আদেশে ] পিছনে ফিরে যাওয়া যাবে না ৪৫৯১। সেদিন তোমাদের জন্য কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না , তোমাদের জন্য [তোমাদের পাপকে ] নিরোধ করার কেহ থাকবে না ৪৫৯২।

৪৫৯১। হাশরের ময়দান বা শেষ বিচারের দিন অবশ্যই আসবে। কেউ তা বিশ্বাস করুক বা না করুক। এ হচ্ছে আল্লাহ্‌র আইন বা বিধান। কারও ক্ষমতা নাই সেদিনকে স্তব্ধ করে দেবার।

৪৫৯২। "শেষের সেদিন বড়ই ভয়ঙ্কর" - শেষ বিচারের দিনের বিচার থেকে কেহই নিষ্কৃতি লাভ করবে না। পাপীরা সেদিন তাদের অপরাধ গোপন করতে সক্ষম হবে না। তাদের কাজের পরিণতি তাদের জন্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে যাবে। তাদের কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না বা তা নিরোধ করার জন্য কেহ থাকবে না।

৪৮। যদি তারা ফিরে যায়, তবে তোমাকে তো আমি ওদের রক্ষক করে পাঠাই নাই ৪৫৯৩। তোমার কর্তব্য তো কেবল [ উপদেশ ] পৌঁছিয়ে দেয়া। সত্যিই , আমি যখন আমার পক্ষ থেকে মানুষকে অনুগ্রহ আস্বাদন করাই , সে এতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে , কিন্তু তাদের হাত যা আগে পাঠিয়েছে [ কৃতকর্ম ] তার জন্য যদি তাদের কোন অমঙ্গল হয়, তখন মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে ৪৫৯৪।

৪৫৯৩। এই আয়াতে রাসুলকে [ সা ] সম্বোধন করা হয়েছে। রাসুলের [ সা ] মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানুষকে সাবধান করেছেন যেনো তারা অনুতাপের মাধ্যমে নিজেদের ভুল সংশোধন করার সুযোগ লাভ করে এবং আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের জন্য প্রার্থনা করে। যদি এই সাবধান বানীতে কেউ কর্ণপাত না করে এবং আল্লাহ্‌র রসুলকে প্রত্যাখান করে , তবে তাদের সে অমনোযোগীতার জন্য আল্লাহ্‌র রাসুল দায়ী নন। তাদের উপরে নিপতিত শাস্তি তাদের কর্মের ফল। রাসুলের [সা ] কাজ শুধু প্রচার করা ও পাপের পরিণতি সম্বন্ধে সাবধান করা। তিনি তাদের রক্ষক নন, যে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন, বা তাদের আল্লাহ্‌ কর্তৃক দেয় "সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে" সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। মানুষকে স্বইচ্ছায় আল্লাহ্‌ পথে আসতে হবে - এই হচ্ছে তার জন্য নির্ধারিত নিয়তি। 'স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির' দায় দায়িত্ব প্রত্যেকের এবং জবাবদিহিতার জন্য স্রষ্টার কাছে সে দায়ী

৪৫৯৪। দেখুন আয়াত [ ৩০ : ৩৬ ]। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে সাধারণ মানুষ যখন আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ স্বরূপ পার্থিব বিভিন্ন নেয়ামত প্রাপ্ত হয় ; তখন সে আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে অহংকারে স্ফীত হয়ে পড়ে। আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানানোর পরিবর্তে সে সর্ব সাফল্যের জন্য নিজস্ব কৃতিত্ব দাবী করে থাকে, ফলে সে আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়া অন্তরের মাঝে উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়। যে অন্তর আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসাতে আপ্লুত হওয়ার কথা সে স্থানে গর্ব, দম্ভ , অহংকার , আত্মগরিমা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এভাবেই পৃথিবীতে মানব সন্তানের আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে সে বিচ্যুত হয়। জীবনের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণে অক্ষম হয়। আবার সেই মানুষই যখন নিজ কৃতকর্মের জন্য বিপদ বিপর্যয়ের মাঝে নিপতিত হয় সে বুঝতে অক্ষম হয় যে সৃষ্ট বিপদ বিপর্যয় তার নিজ দোষত্রুটি ও ভুলেরই ফসল। হতাশা তাকে ঘিরে ধরে এবং আত্মধিক্কারের পরিবর্তে সে আল্লাহ্‌কে সকল কিছুর জন্য দায়ী করে, সে বলে "আমার কপালের দোষ।" এখানে কপাল বলতে সে ভাগ্যলিপি যিনি রচনা করেন তাকেই সে বোঝায়। এই মানসিকতারও উৎপত্তি আল্লাহ্‌র প্রতি অকৃতজ্ঞতা থেকে সুতারাং এ ক্ষেত্রেও অকৃতজ্ঞতার দরুণ সে জীবনের প্রকৃত শিক্ষা যা আত্মিক উন্নতি সাধন করে তা থেকে সে বঞ্চিত হয়। উভয় ক্ষেত্রেরই পরিণতি এক।

৪৯। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহ্‌র-ই। তিনি যা ইচ্ছা[ ও পরিকল্পনা ] করেন তা সৃষ্টি করেন ৪৫৯৫। তাঁর ইচ্ছা [ ও পরিকল্পনা ] অনুযায়ী কন্যা সন্তান ও পুত্র সন্তান দান করে থাকেন।

৪৫৯৫। [ ১২ : ৪৯-৫০ ] নং আয়াতে আল্লাহ্‌র সৃজন ক্ষমতাকে খুব সাধারণ ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যা অন্তর্নিহিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ। আল্লাহ্‌র সৃষ্টিধর্মী ক্ষমতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ যা এক নির্দ্দিষ্ট উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বিত ; যেখানে মানুষের জ্ঞান সঙ্কীর্ণ, মানুষ অন্ধের ন্যায় জ্ঞানের পিছনে হাতড়িয়ে বেড়ায় , প্রজ্ঞায় ও দূরদৃষ্টিতে সে পরিপূর্ণ নয়। এই আয়াতে যৌনতা এবং পিতৃ ও মাতৃত্বের রহস্যের উপরে ভিন্ন আঙ্গিকে আলোকপাত করা হয়েছে।সন্তানের প্রশ্নে মানুষের ধ্যানধারণা নিজস্ব অধিকারের উপরে আবর্তিত হয়। মানুষ মনে করে সেই তাদের স্রষ্টা। প্রকৃত পক্ষে মানুষ আল্লাহ্‌র সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রাখার একটি মাধ্যম বই আর কিছু নয়। জনসংখ্যার বৃদ্ধি, নারী ও পুরুষের সংখ্যার মধ্যে সমতা বিধান ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক ও নৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এ সবই সেই বিশ্বস্রষ্টার পরিকল্পনা। পিতা-মাতা মানব সৃষ্টির বাহ্যিক মাধ্যম হয়ে থাকে মাত্র। বিশ্ব সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্রষ্টা কাউকে পুত্র কাউকে কন্যা সন্তান বা পুত্র কন্যা বা কাউকে বন্ধ্যা করে রাখেন। মানুষের বিজ্ঞানের জ্ঞান সৃষ্টির এই অপার রহস্যের অর্ন্তনিহিত জ্ঞানের সন্ধান দিতে অক্ষম। আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন এক বিশেষ উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত করে। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা আল্লাহ্‌র আছে।

৫০। অথবা পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন ৪৫৯৬ , এবং যাকে ইচ্ছা নিঃসন্তান রাখেন। তিনি জ্ঞান ও ক্ষমতায় পরিপূর্ণ।

৪৫৯৬। সন্তান মাতৃগর্ভে পুত্র না কন্যা হবে তা নির্ধারিত করে দেন স্রষ্টা - আর তাঁর নির্ধারিত আইন অনুযায়ী যে কোনও সমাজে বা জাতিতে পুরুষ ও নারীর সংখ্যার সমতা বিদ্যমান থাকে। কিভাবে এই সমতা বিদ্যমান থাকে বিজ্ঞান তার উত্তর দানে অক্ষম। কেন আল্লাহ্‌ কাউকে বন্ধ্যা রাখেন এবং পিতৃ বা মাতৃত্বের আনন্দ, দায়িত্ব ও পরিপূর্ণতা থেকে বঞ্চিত করেন সেও এক প্রহেলিকা। প্রতিটি মানব আত্মা আল্লাহ্‌র পরিকল্পনায় অমূল্য সম্পদ। সেখানে ছেলে বা মেয়ের কোনও পার্থক্য নাই।সমাজ ও সংসারের মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করা হয়, তবে এই পার্থক্য মানুষের সৃষ্টি। আল্লাহ্‌র বৃহত্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই স্ব-স্ব ভূমিকা বিদ্যমান।
worldly laws are made in earth not in heaven and it is not part of Allah's plan to torture women in a bond.
৫১। মানুষের জন্য এটা উপযুক্ত৪৫৯৭ নয় যে,আল্লাহ্‌ তার সাথে কথা বলবেন ওহী ব্যতীত ৪৫৯৮, অথবা পর্দ্দার অন্তরাল ব্যতীত ৪৫৯৯, অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতীত , যে দূত আল্লাহ্‌র অনুমতি ক্রমে আল্লাহ্‌র ইচ্ছাকে ব্যক্ত করেন। তিনি সর্বোচ্চ সমুন্নত , মহাজ্ঞানী ৪৬০০।

৪৫৯৭। উপরের আয়াতদ্বয়ের [ ৪৯ - ৫০ ] ধারাবাহিকতায় এই আয়াতগুলি [ ৫১- ৫৩ ] উচ্চতর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সন্ধান দেয়। মহাকাশ ও ভূমন্ডল সৃষ্টির মাঝে, মানুষের অস্তিত্ব এক ক্ষুদ্র কণিকার ন্যায়। মানুষের সৃষ্ট সমাজ, সভ্যতা, পরিবার , পরিজন মানুষ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে , তবে আল্লাহ্‌র সৃজন শক্তির কাছে তা অতি তুচ্ছ। আল্লাহ্‌র সৃজন ক্ষমতা ও মানুষের তুচ্ছতাকে তুলে ধরা হয়েছে টিকা ১২০ ও আয়াত [ ২ : ১১৭ ] এবং টিকা ৯১৬ ও আয়াত [ ৬ : ৯৪ ] এবং টিকা ৯২৩ ও আয়াত [ ৬ : ৯৮ ]। মানুষের প্রতিদিনের সামাজিক ও দাম্পত্য জীবন যে প্রহেলিকাতে ঘেরা , যার প্রকৃত রহস্য মানুষের অগোচরে। মানুষের এই ক্ষুদ্রতা , সীমাবদ্ধতা আধ্যাত্মিক জগতেও বিদ্যমান। কিভাবে স্রষ্টার সৃষ্ট ক্ষুদ্র মানুষ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্‌র সাথে মুখোমুখি কথা বলতে পারে ? সে তো তার উপযুক্ত নয়।আল্লাহ্‌র অপার করুণায় মানুষ তিনভাবে আল্লাহ্‌র সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। দেখুন আয়াত [ ৫১ - ৫৩ ]।

৪৫৯৮। আল্লাহ্‌ সমুন্নত ও প্রজ্ঞাময়। মানুষকে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব করা সত্ত্বেও কখনও কখনও মানুষ পশুর ন্যায় অধম হয়ে পড়ে [ ৯৫ : ৫ ]। মানুষের এই আচরণ সত্ত্বেও পরম করুণাময় আল্লাহ্‌ মানুষকে প্রত্যাদেশের নেয়ামতে ধন্য করেন। কিভাবে এই প্রত্যাদেশ মানুষের মাঝে প্রেরণ করা হয় ? তিনটি উপায়ের বর্ণনা করা হয়েছে : ১) Wahyun বা ওহী অর্থাৎ দৈব বা অতিপ্রাকৃত শক্তিবলে মনে সঞ্চারিত করা। ২) পর্দ্দার অন্তরাল থেকে এবং ৩) দূত প্রেরণ করে।

ওহীকে দুভাবে ব্যাখ্যা করা হয় ১) মানুষের মনের মাঝে, চিন্তার মাঝে আল্লাহ্‌র বাণী উত্থাপিত করা হয় যেনো , মানুষ আল্লাহ্‌র বাণীর মর্মার্থ নিজ আত্মার মাঝে উপলব্ধি করতে পারে।সে যেনো অনুধাবন করতে পারে আল্লাহ্‌র আদেশ বা নিষেধ , অথবা প্রকৃত সত্যের স্বরূপ এবং ২) মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রেরিত ওহী বা আল্লাহ্‌র বাণী। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র বাণী মানুষের ভাষায় রূপান্তরিত করা হয়।

৪৫৯৯। "পর্দ্দার অন্তরাল "- অবশ্যই তা পার্থিব কোন আচরণ নয়। এটা হচ্ছে আলোর পর্দ্দা।

এ ব্যাপারে মুসলমানরা রাসুলের [ সা ] বক্তব্য অনুসরণ করে। রাসুল [ সা ] বলেছেন : "His veil is light, were He to withdraw it, then would august splendour of His countenance surely consume everything that comes within His sight " যার বাংলা অনুবাদ দাড়ায় " আল্লাহ্‌র অন্তরাল হচ্ছে আলো। যদি তিনি তা তুলে নেন, তবে তার উপস্থিতির যে মহান দীপ্তি তা অবশ্যই তার দৃষ্টিগ্রাহ্য সকল কিছুকে গ্রাস করে নেবে। "
৪৬০০। "Rasul " বা দূত : ফেরেশতা জিব্রাইল যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাঁর প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেন নবীজীর নিকট।

৫২। এ ভাবেই আমার হুকুমে তোমাকে ওহী প্রেরণ করা হয়। [ পূর্বে ] তুমি জানতে না যে প্রত্যাদেশ কাহাকে বলে ৪৬০১ , ঈমান কি। কিন্তু আমি [কোর-আনকে ] করেছি আলো , যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ নির্দ্দেশ করি। তুমি তো [ মানুষদের ] পরিচালিত কর সরল পথে , - ৪৬০২

৪৬০১। 'রূহ' - এই শব্দটির অর্থ অনেকে মনে করেন প্রত্যাদেশ অথবা আল্‌ কোরাণ। আবার অনেকে মনে করেন রূহ দ্বারা জিব্রাইল ফেরেশতাকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়। অর্থাৎ প্রত্যাদেশের বাহক।

রাসুলুল্লাহ্‌ [ সা ] চল্লিশতম বৎসরে নবুয়ত প্রাপ্ত হন। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বেও তিনি ছিলেন অশেষ গুণের অধিকারী। তিনি ছিলেন পবিত্রতার প্রতীক, সত্যের অনুসন্ধানে অটল, কিন্তু তার পরেও তিনি প্রত্যাদেশের জ্ঞান সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন না। তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ সত্যের সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত ছিলেন না ; আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য আত্মার মাঝে উপলব্ধি করতেন না। আল্লাহ্‌ তাঁকে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এই সত্য অবগত করান।

৪৬০২। আল্‌ কোরাণ ও কোরাণের সত্যকে যিনি প্রচার করেন, সেই রাসুলকে [ সা ] এই আয়াতে সনাক্ত করা হয়েছে অভিন্ন রূপে। তারা মানুষকে হেদায়েত করে ও সরল পথ প্রদর্শন করে। সঠিক বা সরল পথের বিবরণ আছে নিম্নলিখিত আয়াত সমূহে [ ১ : ৬ ]ও টিকা ২২ এবং [ ১৮ : ১ - ২ ] ও টিকা ২৩২৬ - ২৭ এবং [ ৯০ : ১১ - ১৮ ]।

৫৩। [ যা ] আল্লাহ্‌র পথ ৪৬০৩ , আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই যার অধিকারে। দেখো [ কিভাবে ] সমুদয় বিষয় আল্লাহ্‌র দিকেই ফিরে যায়।

৪৬০৩। সরল পথের সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে তা আল্লাহ্‌র রাস্তা বা বিশ্বজনীন আইন যা সর্বকালে সর্বযুগে সকলের জন্য প্রযোজ্য।