Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ১৯ জন
আজকের পাঠক ৩২ জন
সর্বমোট পাঠক ৭১৩৭১৯ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৮৯৭৬৭ বার
+ - R Print

সূরা আল-মায়েদা


সূরা আল-মায়েদা - ৫

"বা The Table spread বা খাবার টেবিল"

আয়াত ১২০, রুকু ১৬, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]


ভূমিকাঃ এই সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে ইহুদী ও খৃষ্টানদের সম্বন্ধে যারা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে সৎপথ পরিত্যাগ করে অসৎ পথ অবলম্বন করে। এ সবই ইসলাম ধর্মকে পুনঃ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র বা ভিত্তি স্থাপন করে। এই সূরাতে খৃষ্টানদের সম্পর্কে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে, যারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে জাঁকজমকপূর্ণ করার মাধ্যমে যীশু খৃষ্টের শেষ নৈশভোজের (Last supper) যে অর্থ প্রদান করে, প্রকৃত সত্য তা থেকে বহু দূরে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধি বিধান সম্বন্ধে এই দুইটি প্রাচীন ধর্ম যা প্রচার করে তা সত্যের অপলাপ মাত্র। এরই প্রেক্ষিতে ইসলামের আগমন। যুক্তিসঙ্গত ভাবেই খাদ্য, পচ্ছিন্নতা, ন্যায়নীতি, বিশ্বস্ততা প্রভৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনগুলি ইসলামের মাধ্যমে পুনঃর্জীবিত করা হয়।

এই সূরার তৃতীয় আয়াতটি সর্বকালের জন্য স্মরণযোগ্য। এখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাংগ করলাম।" ১০ম হিজরীতে আমাদের নবীর বিদায় হজ্বের প্রাক্কালে এই আয়াতটি নাজেল হয়।

সারসংক্ষেপঃ এই সূরা শুরু হয়েছে আল্লাহ্‌র সাথে অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ নামার মাধ্যমে। এই অঙ্গীকার সামাজিক, মানবিক বা ঐশ্বরিক উভয়ই হতে পারে। এই অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে ব্যক্তি লাভ করে সৎ ও সুখী জীবনের ঠিকানা। খাদ্য সম্পর্কীয় নীতিমালা, কুসংস্কার মুক্ত জীবনবোধ এবং ঘৃণা ও পক্ষপাতিত্বহীন ন্যায়নীতি, সৎ, সুখী ও শান্তিময় জীবনের ঠিকানায় পৌঁছে দেয় [৫ : ১-৫]।

শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও পরস্পরের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায় নীতির অনুসরণ করাই হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধের সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থা বা ধর্মানুরাগ [৫ : ৬-১১]।

যদি ইহুদী ও খৃষ্টানেরা আল্লাহ্‌র সাথে তাদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং সত্য বিশ্বাস থেকে বিমুখ হয়, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে সাবধান বাণী [৫ : ১২-২৬]।

কাবিল দ্বারা হাবিলের হত্যা হচ্ছে প্রতীক স্বরূপ, যুগে যুগে হাবিলের মত ন্যায়বান ব্যক্তিরা কাবিলের ন্যায় হিংসুকদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়। অত্যাচারী ব্যক্তির শাস্তি দান করবেন স্বয়ং আল্লাহ্‌। ন্যায়বান ব্যক্তির জন্য দুঃখ বোধ করার কারণ নাই। [৫ : ২৭-৪৩]
মুসলমান সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে থাকবে। এ ব্যাপারে যদিও সে হবে পক্ষপাতিত্ববিহীন তবুও সে হবে সর্বদা মুসলিম ভাতৃত্বের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এবং ধর্মকে অবজ্ঞা ও আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করবে। খৃষ্টানদের প্রকৃত ধর্মানুরাগ, বিনয় এবং অন্যান্য গুণাবলীকে মুসলমানদের প্রশংসা ও উপলব্ধি করতে বলা হয়েছে। [৫ : ৪৪-৮৬]

আল্লাহ্‌ মুসলমানদের জন্য যা কিছু হালাল করেছেন তা কৃতজ্ঞতার সাথে উপভোগ করবে। তবে কোনও কিছুতেই তারা বাড়াবাড়ি করবে না। শপথ করা, জুয়া খেলা, পবিত্র স্থানের পবিত্রতা নষ্ট করা, সব রকম কুসংস্কার এবং মিথ্যা সাক্ষীকে নিন্দা করা হয়েছে। [৫ : ৮৭-১০৮]

হযরত ঈসার অলৌকিকত্ব এবং তার অনুসারীরা কিভাবে তার অপব্যবহার করে তার বর্ণনা করা হয়েছে। [৫ : ১০৯-১২০]

সূরা আল-মায়েদা - ৫

"বা The Table spread বা খাবার টেবিল"

আয়াত ১২০, রুকু ১৬, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]


০১। হে মুমিনগণ ! তোমরা [সকল] অঙ্গীকার পূর্ণ করবে ৬৮২। যা তোমাদের নিকট বর্ণনা করা হচ্ছে তা ব্যতীত ৬৮৩ সকল চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হলো। পবিত্র স্থানে [হারাম শরীফ] অথবা ইহ্‌রাম পরা অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয় ৬৮৪। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ নিজ ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আদেশ করেন ৬৮৫।

৬৮২। "Uqud" যার ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে obligation; বাংলা অনুবাদ "অঙ্গীকার"। কিন্তু এই আরবী শব্দটি বহু প্রকার ভাবকে প্রকাশ করতে সক্ষম। এ বাক্যটি এত ব্যাপক অর্থবোধক যে এর ব্যাখ্যা সম্বন্ধে লিখতে গেলে পূর্ণ এক অধ্যায় লেখা সম্ভব।

প্রথমতঃ আমাদের সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের ভিত্তিতে আমাদের, তাঁর প্রতি ঐশ্বরিক অঙ্গীকার রয়েছে। এই অঙ্গীকার হচ্ছে আধ্যাত্মিক, আত্মার সাথে এর যোগাযোগ। আল্লাহ্‌ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জ্ঞান এবং বিবেক দান করেছেন। আমাদের অনুভূতি ও বিচার বুদ্ধি দান করেছেন। সমস্ত বিশ্ব প্রকৃতিকে আল্লাহ্‌ মানুষের সেবার জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই স্রষ্টা মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতের পরশ সমস্ত সৃষ্টিকে পরিব্যপ্ত করে আছে। ভূলোক, দ্যুলোক তাঁর অস্তিত্বের বার্তা বহন করে। বিশ্ব জাহানে তাঁর সৃষ্টির স্বাক্ষর বর্তমান। তাঁর সৃষ্টিকে অনুধাবন থেকে, তাঁকে অনুধাবন করার ক্ষমতার জন্ম লাভ করে। সৃষ্টিকে অর্থাৎ বিশ্ব প্রকৃতিকে অনুধাবনের মাধ্যমে মানুষের জন্য আল্লাহ্‌ বিরাট পাঠশালার সৃষ্টি করেছেন। এর পরেও আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য প্রেরণ করেছেন তাঁর দূতদের [রাসূল ও নবী] আমাদের শিক্ষা দান করার জন্য। তাঁর কিতাব, তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসূলগণ পৃথিবীকে নৈতিক শিক্ষা দান করেছেন। সুস্থ ও সুন্দর জীবন ধারণের পথ প্রদর্শন করেছেন। আত্মিক উন্নতির জন্য মানব সন্তানদের আহবান করেছেন। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও প্রকাশ্য জীবন ধারণের ক্ষেত্রে সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিময় জীবনের পথ প্রদর্শন করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র এই অকৃপণ দান ও করুণা তখনই লাভ করা যায়, যখন মানব সন্তান আল্লাহ্‌র সাথে তার কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে। অঙ্গীকার যত প্রকার সবই এই শব্দের অন্তর্গত। এর প্রাথমিক প্রকার তিনটি :
(১) পালনকর্তার সাথে মানুষের অঙ্গীকার অর্থাৎ ঈমান ও নৈতিক মূল্যবোধের অঙ্গীকার

(২) নিজের সাথে মানুষের অঙ্গীকার : অলিখিত চুক্তি [implied obligation] ব্যবসা-বাণজ্য ও সামাজিক জীবন যাত্রায় আমরা প্রতিদিন অঙ্গীকারে আবদ্ধ। সামাজিক অঙ্গীকারের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বিয়ে একটি সামাজিক অঙ্গীকার [আল্লাহ্‌কে সাক্ষী রেখে]। সন্তানের দায়িত্ব, পিতামাতা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি কর্তব্য এগুলি সবই সামাজিক অঙ্গীকার। এ সমস্ত চুক্তি বিশ্বস্ততার সাথে ও পরস্পর সহযোগীতা ও সম্পর্কের ভিত্তিতে পালন করাই হচ্ছে অঙ্গীকার পালন করা। অফিস আদালতে যে দায়িত্ব যিনি নিয়োজিত, তিনি সেই দায়িত্ব পালনে চুক্তিবদ্ধ, উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যিনি শিক্ষক, তিনি আন্তরিক বিশ্বস্ততার সাথে শিক্ষাদানের জন্য চুক্তিবদ্ধ। ডাক্তার বিশ্বস্ততার সাথে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রুগীর আরোগ্য লাভের জন্য আন্তরিক হবেন- এটাই তার চুক্তি। এভাবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি তার কার্যের জন্য সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ।

(৩) মানুষের সাথে মানুষের লিখিত অঙ্গীকার [Expressed Obligation] : দুই ব্যক্তি বা দুই দল, বা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত লিখিত চুক্তি। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রত্যেক দলের বা প্রত্যেক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হচ্ছে লক্ষ্য রাখা যেন চুক্তি অনুযায়ী কর্তব্য সম্পাদন হয়।

প্রত্যেক সমাজে তাঁর নাগরিকদের সাথে বহু ধরণের অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত অঙ্গীকার থাকে যা তাদের সমাজে সামাজিক প্রথারূপে বিরাজ করে। এসব সামাজিক অঙ্গীকার পালন করা উচিত। কিন্তু যদি তা আল্লাহ্‌র আইনের বহির্ভূত হয় তবে সে সমাজকে ত্যাগ করে হিজরত করা প্রয়োজন। এসব অলিখিত সামাজিক রীতিনীতির অঙ্গীকার উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, গৃহকর্তা এবং অতিথির মধ্যে সৌহার্দমূলক ব্যবহারের এক সামাজিক ও অলিখিত চুক্তি থাকে, মনিব, প্রভুর মধ্যে, চাকুরীর ক্ষেত্রে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে ইত্যাদি। আল্লাহ্‌র নির্দেশ হচ্ছে : তখনই মোমেন বান্দা হওয়া যাবে যখন তাঁর প্রতি নির্দেশিত উপরের সকল অঙ্গীকার বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকভাবে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে খুশী করার জন্য পালন করা হবে। বিভিন্ন সরকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি অথবা পারস্পরিক সমঝোতা, বিভিন্ন দলের পারস্পরিক অঙ্গীকার এবং দুই ব্যক্তির মধ্যকার সর্বপ্রকার লেনদেন, বিবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার, ইজারা ইত্যাদিতে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে সব বৈধ শর্ত স্থির করা হয় তা মেনে চলা প্রত্যেক পক্ষের অবশ্য কর্তব্য। 'বৈধ' শব্দটি প্রয়োগ করার কারণ এই যে, যা অন্যায় তা গ্রহণ করা কারও জন্যও বৈধ নয়।
কর্মের মাধ্যমে, জীবন ধারণের মাধ্যমে, জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে - আল্লাহ্‌র সাথে চুক্তি, আদম সন্তানকে তার সকল অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনে তার কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সেটাই হচ্ছে সর্বোচ্চ ইবাদত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করে, লোকালয় ত্যাগ করে আল্লাহ্‌র ধ্যানে, আল্লাহ্‌র ইবাদতে যে জীবন ব্যয় করে সে কাপুরুষ। কারণ সে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত অঙ্গীকারকে অস্বীকার করে। "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।" এই হচ্ছে স্রষ্টার নির্দেশ। ইবাদাত ও অঙ্গীকার পূরণ করা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একে অন্যের সম্পূরক। কারণ দ্বীন ও দুনিয়া এই দুই এ মিলে ইসলাম ধর্ম। 'দুনিয়া' বিহীন দ্বীন হচ্ছে আল্লাহ্‌র অঙ্গীকারকে অস্বীকার করা। কারণ দুনিয়ার অঙ্গীকার পূরণ করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা। সত্য ও বিশ্বস্ততা হচ্ছে ধর্মের প্রধান অঙ্গ।

৬৮৩। 'আন-আম' দ্বারা উট, গরু, মেষ, ছাগল এবং অন্যান্য অহিংস ও রোমান্থনকারী জন্তুকে বুঝায়।

৬৮৪। দেখুন আয়াত [৫ : ৯৪-৯৬]। নিম্নোক্ত অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয়। (১) যখন কেহ সুরক্ষিত পবিত্র স্থানে অবস্থান করে (হারাম শরীফ)। অথবা (২) হজ্জ্ব অথবা উমরা পালনের উদ্দেশ্যে হারাম শরীফে প্রবেশ করার পূর্বে বিশেষ নিয়মে নিয়ত করে যে বস্ত্র খন্ড পরিধান করা হয় তাকে 'ইহ্‌রাম' বলে। 'ইহ্‌রাম' পরিধান অবস্থায় শিকার করা নিষিদ্ধ। দেখুন আয়াত [২ : ১৯৬] এবং টিকা ২১২। উপরের দুইটি শর্তই এক কথাই প্রকাশ করে, আর তা হচ্ছে সুরক্ষিত পবিত্র স্থানে অবস্থানকালে বা পবিত্র স্থানে প্রবেশের উদ্দেশ্যে নিয়ত করলে সকল প্রকার হিংস্রতা নিষিদ্ধ। পবিত্র স্থান মানুষ ও পশু সকলের জন্যই আল্লাহ্‌ কর্তৃক নিরাপদ স্থানরূপে নির্বাচিত।

৬৮৫। "আল্লাহ্‌ নিজ ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আদেশ করেন।" - এ বাক্যটি দ্বারা কেহ যেনো ধারণা না করেন যে আল্লাহ্‌ খেয়াল খুশী মত আদেশ দান করেন। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনার আদিরূপ। মহাবিশ্ব সম্বন্ধে তাঁর পরিকল্পনা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ, দক্ষ ও ত্রুটি বিচ্যুতি বিহীন। পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ লাভ করে স্রষ্টার ইচ্ছার মাধ্যমে। স্রষ্টার জ্ঞান, মহত্ব, করুণা সবই তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত এবং তাঁর ইচ্ছার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টা নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রজ্ঞা তাঁর সম্পূর্ণতা, তাঁর দক্ষতা, তাঁর ভালোবাসা সবই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে বিশ্বভূবন সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনার আদিরূপ; তাঁর পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গতা। এই কথাকেই উপরের বাক্য "আল্লাহ্‌ যাহা ইচ্ছা আদেশ করেন" - কথাটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। এ বাক্যটির দ্বারা একথা যেনো কেউ ধারণা না করে যে আল্লাহ্‌ খেয়াল খুশী মত আদেশ দান করেন। তাঁর বিশ্ব সম্পর্কে পরিকল্পনাই তাঁর ইচ্ছা যা আদেশের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

০২। হে মুমিনগণ ! আল্লাহ্‌র [উপাসনার] প্রতীক সমূহ, ৬৮৬ পবিত্র মাসের ৬৮৭ কুরবাণীর জন্য আনীত পশু, মালা পরানো চিহ্ন বিশিষ্ট পশু এবং নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তোষ লাভের আশায় পবিত্র [কাবা] ঘর অভিমুখে যাত্রীদের পবিত্রতার অবমাননা করবে না ৬৮৮। কিন্তু যখন তোমরা পবিত্র স্থান থেকে বের হবে এবং ইহ্‌রাম মুক্ত হবে তখন তোমরা শিকার করতে পার ৬৮৯। কিছু লোক বিদ্বেষের কারণে [এক সময়ে] তোমাদের মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাঁধা দিয়েছিলো, [সে কারণে তোমাদের পক্ষ থেকে শত্রুতা যেনো] তোমাদের সীমা লংঘনে প্ররোচিত না করে ৬৯০। ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মানুরাগে পরস্পরকে সাহায্য করবে। কিন্তু পাপ ও হিংসায় পরস্পরকে সাহায্য করবে না। আল্লাহ্‌কে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ শাস্তি দানে কঠোর।

৬৮৬। দেখুন আয়াত [২ : ১৫৮] যেখানে সাফা ও মারওয়াকে আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রদত্ত প্রতীক (Sha'air) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতে [৫ : ২] সমস্ত প্রতীককেই হজ্জ্বের সহিত সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। যথা- (১) সাফা এবং মারওয়া অথবা কাবা অথবা আরাফাত প্রভৃতি; (২) হজ্জ্বের পুরো অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা করা হয়েছে; (৩) হাজ্জ অনুষ্ঠানের নিষিদ্ধ বস্তু সমূহ (যেমন- শিকার করা) এবং (৪) হজ্জের নির্দিষ্ট সময়কে এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। দেখুন [২ : ১৫৮] যেখানে সাফা এবং মারওয়াকে আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রদত্ত প্রতীক (Sha'air) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতের বৃহত্তর পরিসরকে প্রকাশ করার জন্য উপরের প্রতীকগুলি ব্যবহার করা হয়েছে। দেখুন [২ : ১৫৮, ১৯৪-২০০] আয়াত এবং এদের টিকা সমূহ। উল্লেখিত আয়াত সমূহে মানব ও পালনকর্তার মধ্যে কয়েকটি চুক্তির উল্লেখ আছে।
৬৮৭। পবিত্র মাস সমূহ হচ্ছে রজব (৭ম), জুল-ক্বাদ (১১ দশ) জুল-হজ্জ্ব (১২ দশ, এই মাস হজ্জ্বের মাস) এবং মহররম (বছরের প্রথম মাস); দেখুন আয়াত [৯ : ৩৬]। এই চারটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ।

৬৮৮। যে সব জন্তুদের গলায় কুরবাণীর চিহ্নস্বরূপ কণ্ঠাভরণ পরানো হয়েছে সেগুলির অবমাননা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের পবিত্র প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। হেরেম শরীফে, পবিত্র সুরক্ষিত স্থানে মানুষ পশু সকলেই নিরাপত্তা ভোগ করবে।
৬৮৯। যখন তোমরা এহ্‌রাম থেকে মুক্ত হয়ে যাও, তখন শিকার করার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ তোমরা আবার দৈনন্দিক জীবনে প্রবেশ লাভ করবে।

৬৯০। দেখুন আয়াত [২ : ১৯১] এবং টীকা ২০৫। ৬ই হিজরী সনে হোদায়বিয়ার ঘটনার সময়ে মক্কার কোরেশরা ঘৃণা ও প্রতিহিংসার মনোবৃত্তি থেকে মুসলমানদের ওমরা পালন করতে বাঁধা দান করেছিল। মুসলমানেরা তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়ে ফিরে এসেছিল। মক্কা বিজয়ের পরে, যখন মক্কাতে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন মুসলমানদের অনেকেই এর প্রতিশোধের পক্ষপাতি ছিল। এই আয়াতে এরূপ প্রতিশোধ স্পৃহাকে নিষেধ করা হয়েছে। এই আয়াতের শিক্ষা সার্বজনীন। অন্যায় ও অত্যাচারের পরিবর্তে অন্যায় ও অত্যাচার দ্বারা প্রতিশোধ নেয়া ইসলাম অনুমোদন করে না; মন্দের পরিবর্তে মন্দ প্রতিদান হয় না। বরং ইসলাম জুলুমের প্রতিদানে ইন্‌সাফ ও ইন্‌সাফে কায়েম থাকার শিক্ষা দেয়। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে পরস্পর পরস্পরকে ধর্মানুরাগ ও পূণ্যকাজে সাহায্য করা। দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা ও ঘৃণা ইসলাম অনুমোদন করে না। শত্রুতা ও ঘৃণাকে ক্ষমা ও মহানুভবতা দ্বারা জয় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই আয়াতে। যা কিছু অন্যয় এবং মন্দ তা আমাদের প্রতিহত করতে হবে সংগ্রামের মাধ্যমে- কিন্তু এই প্রতিরোধে যেন কোন প্রকার বিদ্বেষ বা ঘৃণা প্রকাশ না পায়। এই প্রতিরোধের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে অন্যায়, অসত্য ও অত্যাচারের দমন। কোনও প্রতিশোধ বা বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসা নয়। মহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত এই সংগ্রামের জন্যই পরম করুণাময় আমাদের নির্দেশ দান করেছেন এই আয়াতে।

০৩। [খাদ্য হিসেবে] তোমাদের নিষিদ্ধ করা হলো : মৃত জন্তুর মাংস, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্‌ ব্যতীত অপরের নামে জবাই করা পশু ৬৯১, আর শ্বাসরোধে মৃত পশু অথবা প্রহারে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃংগাঘাতে মৃত জন্তু, এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু [মৃত্যুর পূর্বে] যদি তাদের [নিয়ম অনুযায়ী] জবেহ্‌ করতে পার ৬৯২ তা ব্যতীত। [নিষিদ্ধ করা হলো] যা মূর্তি পূঁজার পাথরের [বেদীর] উপর বলি দেয়া হয় তা ৬৯৩ এবং জুয়ার তীরের সাহায্যে [মাংসের] ভাগ নির্ধারণ করা ৬৯৪ এগুলি অসৎ কাজ।

যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো আজ তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে তারা সকল আশা ত্যাগ করেছে ৬৯৫। সুতরাং তাদের ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম ৬৯৬, ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।

কিন্তু কেউ যদি সীমালংঘনে অনুরক্ত না হয়ে, ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়, অবশ্যই আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।

৬৯১। দেখুন আয়াত [২ : ১৭৩] এবং টীকা ১৭৩ ও ১৭৪। মৃত প্রাণীর মাংস, রক্ত ও শূকরের মাংস এবং আল্লাহ্‌র নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামের জবাই করা প্রাণীর মাংস হারাম করার প্রেক্ষিতে এই আয়াতটি [৫ : ৩] নাজেল হয়েছে।

৬৯২। শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু এগুলি হারাম বলে বিবেচিত। এগুলি হারাম হওয়ার অন্যতম কারণ, যুক্তি হিসেবে বলা চলে এসব ক্ষেত্রে মৃত পশুর শরীরের অভ্যন্তরে রক্ত জমাট বেঁধে যায় কারণ এসব ক্ষেত্রে পশুর মৃত্যু ঘটে দেহ অভ্যন্তরে রক্তসহ। যদি পশুটকে আহত অবস্থায় কিন্তু জীবিত পাওয়া যায় তবে আল্লাহ্‌র নামে জবেহ্‌ পূর্বক তা হালাল হয়ে যায়। এর কারণ আহত হলেও প্রাণীর দেহভ্যন্তরে রক্তের প্রবাহ বিদ্যমান ছিল যা জবেহ্‌ করার ফলে প্রাণীর মৃত্যুর পূর্বেই বের করে দেওয়া সম্ভব হয়।

৬৯৩। "বেদীর উপরে বলি দেওয়া হয়" - এর অর্থ পৌত্তলিকদের তাদের প্রতিমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত প্রাণী।

৬৯৪। যে কোনও রকম জুয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। দেখুন [২ : ২৯১] আয়াত। টীকা ২৪১-তে জুয়া সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। ভাগ্য নির্ধারক তীর দ্বারা বণ্টন হারাম করার সাথে বলা হয়েছে এ বণ্টন পদ্ধতি পাপাচার ও পথভ্রষ্টতা। এগুলি সবই জুয়ার অন্তর্গত।

৬৯৫। এই লাইনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে সেই সময়ের কথা যখন ইসলাম সুশৃঙ্খল ও সংঘবদ্ধ জীবন ভিত্তিক বিশাল ধর্মীয় গোষ্ঠি হিসেবে পৃথিবীতে আত্ম প্রকাশ করে নাই। কাফেরদের মনে আশা ছিল তারা মুসলমানদের তথা ইসলামকে ধ্বংস করে দিতে সমর্থ হবে। (মক্কা বিজয়ের পরে) তাদের সে আশা ধূলিসাৎ হলো।

৬৯৬। এটি ছিল আমাদের নবীর প্রতি প্রেরিত আল্লাহ্‌ কর্তৃক শেষ প্রত্যাদেশ। বিদায় হজ্জ্বে ১০ম হিজরী ৯ই জুলহজ্ব তারিখে আরাফাতে অবতীর্ণ হয়েছে। এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ্‌ আমাদের নবীর কার্যকালের সমাপ্তির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

০৪। তারা তোমাকে প্রশ্ন করে, [খাদ্য হিসেবে] কি কি হালাল করা হয়েছে ৬৯৭ ? বল, "সমস্ত ভালো এবং পবিত্র জিনিস তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। এবং শিকারী পশু, পক্ষী যাদের তোমরা প্রাণী [ধরার] শিক্ষা দিয়েছ, যেভাবে আল্লাহ্‌ তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন; তারা যা ধরে আনে তা ভক্ষণ করবে ৬৯৮; কিন্তু তাতে আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করবে। এবং আল্লাহ্‌কে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।

৬৯৭। খাদ্য বস্তুর নির্দেশ মানার মধ্যে পূর্বের আয়াতটি ছিল নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত। যে সব বস্তু খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা চলবে না তাদেরই তালিকা। এই আয়াতে ঠিক তার বিপরীত ভাবের প্রকাশ করা হয়েছে অর্থাৎ খাদ্য হিসেবে যা হালাল তার কথা এখানে প্রকাশ করা হয়েছে। যথা- "সমস্ত ভালো এবং পবিত্র জিনিস তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে।"

৬৯৮। খাদ্যের প্রয়োজনে পশু হত্যার সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে পশুকে জবাই করার সময়ে আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে জবাই করতে হবে। এটাই হচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা; এই আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে এই শিক্ষাই দেওয়া হয় যে প্রাণীকে হত্যা করা হচ্ছে জীবন ধারণের প্রয়োজনে, শুধুমাত্র খেয়াল খুশী চরিতার্থ করার জন্য নয়। এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমাদের আল্লাহ্‌র অনুমতির প্রয়োজন। আল্লাহ্‌র নামে জবাই করে আমরা সেই অনুমতি যাঞ্চা করি। সমস্ত 'জীবনের' - স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ্‌। আল্লাহ্‌র অনুমতি সাপেক্ষে তার সৃষ্ট জীবন আমরা তাঁর কাছে ফেরৎ পাঠাই। এই ভাবধারা অত্যন্ত পবিত্র, মানুষের অন্তরে হিংস্রতার পরিবর্তে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যের সৃষ্টি করে। এর পরে যে প্রশ্নটি আসে তা হচ্ছে শিকার করা সম্বন্ধে। কিভাবে খাদ্যের প্রয়োজনে প্রাণী শিকারের ক্ষেত্রে, আল্লাহ্‌র প্রতি নিবেদনের যে আনুষ্ঠানিকতা; এই আনুষ্ঠানিকতা শিকারের সময়ে কিভাবে রক্ষা করা যায় সে সম্বন্ধে এখানে নির্দেশ দান করা হয়েছে। শিকারের সময়ে "শিকারী পশু-পক্ষী যাদের তোমরা শিক্ষা দিয়াছ" কথাটির অর্থ যে সব পাখী যেমন বাজ পাখী, পশু যেমন কুকুর ইত্যাদি শিকার ধরার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব প্রাণীরা শিকারের পিছনে ধাওয়া করে শিকারকে হত্যা করে। অবশ্যই এ সময়ে তারা তাদের মনিবদের কাছ থেকে বেশ দূরে যেয়েই এই কাজটি করে। সেক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র নির্দেশ নামা নিম্নরূপ : (১) শিকারী পাখী বা প্রাণীকে শিকার হত্যা করার প্রশিক্ষণ দেবার সময়ে এই শিক্ষা দিতে হবে, তারা যেনো নিজেদের খেয়াল খুশী চরিতার্থের জন্য বা ক্ষুধা মেটানোর জন্য হত্যা না করে। তাদের শিকার হত্যার একটাই উদ্দেশ্য, আর তা হবে শুধুমাত্র প্রভুর খাদ্যের জন্য। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র অনুমতি তাঁর প্রভুর মাধ্যমে শিকারী পাখী বা পশুর কাছে বহন করে নেওয়া হবে এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য। (২) এই পশু বা পাখীকে যখন শিকারের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হবে তখন তাদের উপরে আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করতে হবে। অর্থাৎ যখন শিকারী বাজ বা কুকুরকে শিকারের উদ্দেশ্যে ছাড়া হবে তখন 'Takbir' উচ্চারণ করতে হবে।

০৫। আজ থেকে তোমাদের জন্য [সমস্ত] ভালো এবং পবিত্র জিনিস হালাল করা হলো। কিতাবধারীদের খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য বৈধ ৬৯৯, এবং তোমাদের খাদ্যদ্রব্য তাহাদের জন্য বৈধ করা হলো। [শুধুমাত্র] মুমিন সচ্চরিত্রা নারী [তোমাদের বিবাহের জন্য বৈধ তা নয় বরং] তোমার পূর্বে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারী তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো ৭০০; তোমরা তাদের [বিবাহের জন্য] প্রাপ্য মোহর প্রদান করবে এবং তাদের নিকট থেকে সচ্চরিত্র আশা করো, ব্যভিচার অথবা গোপন প্রণয়িনী গ্রহণের জন্য নয়। কেহ ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করলে ৭০১; তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং পরলোকে সে [আধ্যাত্মিক ভাবে] ক্ষতিগ্রস্থদের শ্রেণীভুক্ত হবে।

৬৯৯। খাদ্য দ্রব্য সম্পর্কীয় নির্দেশ হচ্ছে "সমস্ত ভাল জিনিস"-ই হালাল করা হলো। মাংসের বেলাতে পশুকে হত্যা করা হবে কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থাৎ আল্লাহ্‌র নামে তা জবাই করতে হবে। এ ব্যাপারে কিতাবধারী জাতিদের সাথে মুসলমানদের একত্রীভূত করা হয়েছে।
৭০০। ইসলাম কোনও নূতন ধর্ম, বা স্বতন্ত্র কিছু নয়। এ ধর্ম হচ্ছে হযরত ইব্রাহীমের ধর্ম। সমস্ত কিতাবধারী জাতিরাই হযরত ইব্রাহীমের ধর্মাবলম্বী। তাই আল্লাহ্‌ সকল কিতাবধারী পুরুষদের বিবাহের জন্য কিতাবধারী নারীদের বৈধ করেছেন। একজন মুসলিম পুরুষ মুসলিম নারীকে বিবাহের জন্য যে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হয়, কিতাবধারী নারীদের বিবাহের জন্য একই শর্ত প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক সর্বক্ষেত্রে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। কিন্তু একজন মুসলিম নারী একজন মুসলিম ব্যতীত কিতাবধারী পুরুষকে বিয়ে করতে পারে না। এর কারণ নারীর পক্ষে মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি হারানোর ভয়। কারণ পৃথিবী জুড়ে এই আইন বিদ্যমান যে একজন স্ত্রী তার স্বামীর জাতীয়তা (nationality), সামাজিক সম্মান, উপাধি লাভ করে। তার নিজস্ব পরিচয় সেখানে অবলুপ্ত। যে কোন নারী বা পুরুষ ইসলাম গ্রহণের পরে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।

৭০১। ইসলামে খাদ্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক বন্ধন, বিবাহ এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই জীবনকে আল্লাহ্‌র হুকুম মত চলার নির্দেশ দান করে। পৃথিবীর এই জীবন আল্লাহ্‌র প্রতি কর্তব্য বই আর কিছু নয়। এ কথা স্মরণযোগ্য যে, আমাদের এই কর্তব্য সম্পাদনে আল্লাহ্‌র কোনও লাভ নাই, লাভ যা তা আমাদের নিজেদের। আল্লাহ্‌র দেয়া কর্তব্য সম্পাদনে ইহকালে আমরা লাভ করবো সুখ ও শান্তি, পরকালে বেহেশ্‌ত।

রুকু - ২

০৬। হে মুমিনগণ ! যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে ৭০২, তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে; তোমাদের মাথা [পানি দ্বারা] মসেহ করবে এবং পা গোড়ালীর গাট পর্যন্ত [ধৌত করবে]। যদি তোমরা আনুষ্ঠানিকভাবে [যৌন মিলনে] অপবিত্র থাক ৭০৩, তবে সর্ব শরীর [গোসলে] ধৌত করবে। কিন্তু তোমরা যদি পীড়িত হও, অথবা সফরে থাক, অথবা শৌচাগার থেকে আগমন কর অথবা স্ত্রীদের সাথে সংগত হও এবং পানি না পাও তবে তোমরা পবিত্র মাটি অথবা বালি দ্বারা তায়াম্মুম করবে ৭০৪ এবং তা দ্বারা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মাসেহ করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদের কষ্ট দিতে চান না, বরং তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করতে চান - যেনো তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার।

৭০২। এই নির্দেশগুলি 'ওজু' নামে অভিহিত। ওজু হচ্ছে নামাজের পূর্বে নিজেকে পরিষ্কারের নিমিত্তে ধৌত করা। (১) সমস্ত মুখ মন্ডল পানিতে ধৌত করা, এবং (২) দুই হাত এবং কনুই পর্যন্ত ধৌত করা; (৩) সামান্য পানি দ্বারা মাথা মর্দন করা (কারণ সাধারণত শরীরের মধ্যে মাথা সব সময়েই পরিষ্কার থাকে। সেই কারণে পূর্ণ ধৌতের প্রয়োজন পরে না।) এবং (৪) পা গোড়ালি পর্যন্ত ধৌত করা। এ ব্যতীত রাসূল (সাঃ) কে অনুসরণ করে সাধারণতঃ প্রথমে মুখ ও নাক পরে মুখমন্ডল ধৌত করে আনুষ্ঠানিক ওজু শুরু করা হয়।

৭০৩। দেখুন [৪ : ৪৩] এবং টীকা ৫৬৩। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অপবিত্রতার অন্যতম কারণ হচ্ছে যৌন অপবিত্রতা। সে ক্ষেত্রে গোসল করে সমস্ত শরীর ধৌত করে পবিত্র হতে হয়।

৭০৪। এখানে তাইয়ুম্মুমের বর্ণনা করা হয়েছে। যখন শারীরিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য পানির প্রাপ্ততা সহজসাধ্য নয়, সে ক্ষেত্রে পরিষ্কার মাটি বা বালির দ্বারা পরিষ্কার হওয়ার বিধান রয়েছে।

০৭। স্মরণ কর, তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ এবং যে অঙ্গীকারে তিনি তোমাদের আবদ্ধ ৭০৫ করেছিলেন; যখন তোমরা বলেছিলে, "আমরা শুনলাম ও আমরা মান্য করলাম।" এবং আল্লাহ্‌কে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তোমাদের অন্তরের গোপন বিষয় সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

৭০৫। এই আয়াতটির অর্থ সুদূর প্রসারী, যদিও নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপট এখানে বর্ণনা করা হয়েছে, তবে এর আবেদন সার্বজনীন-যুগ-কাল অতিক্রান্ত। নির্দিষ্ট যে ঘটনার বর্ণনা এখানে করা হয়েছে, তা ছিল দু-দল লোকের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি আল্লাহ্‌র রাসূলের সাথে। চুক্তিটি সংঘটিত হয় মিনার নিকটে 'আকাবা' উপত্যকায়। প্রথম দলটি চুক্তি করে হিজরতের ১৪ মাস পূর্বে এবং দ্বিতীয় দলটি করে হিজরতের অল্প কিছু পরে। এই চুক্তি ছিল আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য, তাঁর রাসূলের প্রতি আনুগত্য। এই চুক্তিটিকে তুলনা করা চলে হযরত মুসা সিনাই পর্বতের পাদদেশে ইহুদীদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন তার সাথে [দেখুন ২ : ৬৩ আয়াত এবং টিকা ৭৮]। এই অঙ্গীকারের সর্বজনীন অর্থ আয়াত
[৫ : ১] এবং টিকা ৬৮২-তে বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আদম সন্তান আল্লাহ্‌র সাথে নৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ। আল্লাহ্‌ মানুষকে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্তের ক্ষমতা, বিচারের ক্ষমতা এবং আত্মার মহত্বর এবং উন্নততর বিকাশের জন্য বিভিন্ন দক্ষতা (faculties of the soul) দান করেছেন। আর এ সব দক্ষতা বা গুণের জন্যই আল্লাহ্‌ আদম সন্তানকে পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন [২ : ৩০]। আদম সন্তানের চরিত্রের বিভিন্ন গুণাবলী যেমন- আল্লাহ্‌র দান, ঠিক তেমনই প্রতিনিধিত্বও তারই নিয়োগ। সুতরাং আদম সন্তান নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্‌র হুকুম পালন করতে দায়বদ্ধ। এই হুকুম পালনের প্রথম ধাপ হচ্ছে শারীরিক পরিষ্কার-পচ্ছিন্নতা, খাদ্যে পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি। এর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে চিন্তা এবং মনের পরিচ্ছন্নতা। মানুষের সুস্থ, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। পরিশুদ্ধ আত্মার মধ্যে আল্লাহ্‌র নূর প্রতিফলিত হয়। ফলে তার প্রতিটি কর্মের নিয়ত হয় পরিশুদ্ধ এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত। এই নিবেদিত নিয়তই হচ্ছে নিয়তের পরিশুদ্ধতা। 'নিয়ত' হচ্ছে এমন একটি অপ্রকাশিত মানসিক অবস্থা যা বাহির থেকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কোনও কাজ আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত, নাকি আত্মগর্ব বা আত্মতুষ্টির বা আত্ম প্রচারের জন্য সম্পাদিত তা বাইরের পৃথিবী না জানলেও আল্লাহ্‌ ঠিকই জানেন। প্রতিটি 'কর্মের' নিয়ত হচ্ছে অন্তরের অন্তঃস্থলের চিন্তা বা ভাবনা। কিন্তু সর্বশক্তিমানের কাছে তা প্রকাশ্য। নিয়তের সচ্ছ্বতা বা পরিচ্ছন্নতা হচ্ছে ইবাদতের সচ্ছ্বতা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়। কেউ অভাব গ্রস্থকে দান করে, - এ দানের পিছনে তার নিয়ত থাকতে পারে দাতা হিসেবে আত্মপ্রচার বা আত্মগর্ব - কিন্তু আল্লাহ্‌ সবই জানেন। আল্লাহ্‌র কাছে আমরা চুক্তিবদ্ধ আমাদের দানের নিয়ত হবে আল্লাহ্‌কে খুশী করা - কোনও প্রদর্শনী বা আত্মপ্রচার নয়। একই দানকর্ম নিয়তের পার্থক্যের জন্য আত্মার বিকাশে দুটি ভিন্ন ধারার সৃষ্টি করে। এখানেই নির্ভর করে 'নিয়তের' পরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধতা।

০৮। হে মুমিনগণ ! আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাকবে ৭০৬। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ যেনো তোমাদের পাপের দিকে ঘুরিয়ে না ৭০৭ ফেলে এবং ন্যায় বিচার বর্জনে প্ররোচিত করে। ন্যায় বিচার করবে; ইহা ধর্মানুরাগের নিকটতম; এবং আল্লাহ্‌কে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত।

৭০৬। দেখুন [৪ : ১৩৫] আয়াত।
৭০৭। ন্যায়নীতি ও নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করা সর্ব অবস্থাতেই প্রশংসার কাজ সন্দেহ নাই। অনুকূল পরিবেশে তা করা অনেক সহজ; কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে তা করা অনেক দূরূহ। এখানে সেরকম অবস্থারই বর্ণনা করা হয়েছে। সত্যিকার নীতিবান ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি সেই-ই, যে শত্রু এবং যাদের সে ঘৃণা করে তাদের প্রতিও ন্যায়নীতি ও নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন। এটাই হচ্ছে আল্লাহ্‌ কর্তৃক তার বান্দার পরীক্ষা। "অন্যের প্রতি বিদ্বেষ যেনো তোমাদের পাপের দিকে ঘুরিয়ে না ফেলে এবং ন্যায় বিচার বর্জনে প্ররোচিত করে।" - এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্‌র নির্দেশ।

০৯। যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহ্‌ তাদের ক্ষমা ও মহাপুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিতেছেন।

১০। যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আমার আয়াতকে অস্বীকার করে তারা দোযখের আগুনের অধিবাসী।

১১। হে মুমিনগণ ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে হস্ত উত্তোলন করার পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু [আল্লাহ্‌] তাদের হাত তোমাদের থেকে নিবৃত করেছিলেন ৭০৮। সুতরাং আল্লাহ্‌কে ভয় কর। এবং আল্লাহ্‌র প্রতি মুমিনরা তাদের [সকল] বিশ্বাস স্থাপন করুক।

৭০৮। এ আয়াতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শত্রুরা বার বার রাসুলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ও মুসলমানদেরকে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধরাপৃষ্ট থেকে মুছে ফেলার যেসব পরিকল্পনা করে, সেগুলো আল্লাহ্‌ ব্যর্থ করে দেন। ইসলামের ইতিহাসে সামগ্রিকভাবে কাফেরদের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। এইসব ঘটনাকে বিচার করলে দেখা যায় যে, কাফেররা জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থ সম্পদ, শক্তিতে শ্রেষ্ঠ থাকা সত্বেও প্রতিবার তারা পরাজিত হয়, কারণ তারা সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে। সে কারণে তাদের শক্তিকে আল্লাহ্‌ খর্ব করেন। সাধারণ উপদেশ হচ্ছেঃ এই নীতি যেমন তখনকার জন্য প্রযোজ্য ছিল, এখনও প্রযোজ্য আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। যারা সত্যের সৈনিক, তাদের হাত শক্তিশালী করবেন স্বয়ং আল্লাহ্‌। সত্যিকারের মোমেন বান্দার বিশ্বাস তাঁর অন্তরে - সে সর্বদা আল্লাহ্‌র 'নিয়ামত' সমূহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং সাহায্যের জন্য আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করবে। আল্লাহ্‌র সাহায্য তাঁদের জন্য অতি নিকটে।

রুকু - ৩

১২। আল্লাহ্‌ পূর্বেই বণী ইসরাঈলীদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। এবং আমি তাদের মধ্যে থেকে দ্বাদশ নেতা নিযুক্ত করেছিলাম ৭০৯। এবং আল্লাহ্‌ বলেছিলেন, "আমি তোমাদের সাথে আছি; যদি তোমরা নিয়মিত সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর, আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন ও তাদের সম্মান কর এবং আল্লাহ্‌কে উত্তম ঋণ প্রদান কর ৭১০, তবে তোমাদের পাপ সকল অবশ্যই মোচন করবো এবং তোমদের [বেহেশতের] বাগানে প্রবেশ করাবো, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। কিন্তু এর পরেও তোমাদের কেহ ঈমানের বিরোধিতা করলে সত্যই সে ন্যায়ের পথ থেকে ভ্রষ্ট হবে।" ৭১১।

৭০৯। দেখুন আয়াত [২ : ৬৩] এবং টীকা নং ৭৮। 'দ্বাদশ নেতা' বা বার জন বর্ষীয়ান নেতাকে নির্বাচন করা হয় বারটি গোত্র থেকে। দেখুন আয়াত [২ : ৬০] ও টীকা নং ৭৩।

৭১০। "আল্লাহ্‌কে উত্তম ঋণ প্রদান কর।" দেখুন আয়াত [২ : ২৪৫] ও টীকা নং ২৭৬। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বিধানের জন্য বান্দাকে প্রদত্ত আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে, আল্লাহ্‌র সৃষ্টির কল্যাণের জন্য ব্যয় করাই হচ্ছে আল্লাহ্‌কে "উত্তম ঋণ" দান করা। এই ব্যয় দাতাকে দরিদ্র করে না, বরং আল্লাহ্‌ তাকে বহুগণ করে ফেরত দেন।

৭১১। 'সরল পথ' বা সংশোধনের পথ। দেখুন [২ : ১০৮] এবং টীকা নং ১০৯।

১৩। কিন্তু তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে, আমি তাদের অভিশপ্ত করেছি ৭১২ এবং তাদের হৃদয়কে কঠিন করেছি। তারা শব্দগুলিকে তাদের [সঠিক]স্থান থেকে পরিবর্তন করেছে এবং তাদের নিকট যে [আল্লাহ্‌র] বাণী প্রেরণ করা হয়েছিলো তার একটা ভালো অংশ তারা ভুলে গিয়েছে। অল্প সংখ্যক ব্যতীত তুমি তাদের সকলকেই প্রতারণা করতে দেখবে ৭১৩। কিন্তু তাদের ক্ষমা কর এবং [তাদের অপকর্ম] উপেক্ষা কর। যারা দয়ালু অবশ্যই আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন ৭১৪।

৭১২। "তাহাদিগকে অভিশপ্ত করেছি" : এ কথাটির অর্থ হচ্ছে - আল্লাহ্‌র সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য ইহুদীদের উপর থেকে আল্লাহ্‌র ঐশ্বরিক করুণা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থাকেই 'লানত' বা অভিশপ্ত নামে অভিহিত করা হয়েছে। ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা ও অঙ্গীকার ভঙ্গের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ্‌ তাদের স্বীয় রহমত থেকে বঞ্চিত করেছিলেন ফলে তাদের হৃদয় কঠিনরূপ ধারণ করে। কঠিনরূপ অর্থাৎ - আত্মিক শাস্তি। অবাধ্যতার ফলে তাদের অন্তর অর্থাৎ হৃদয়ের ভাব ও অনুভূতি বিকৃতরূপ ধারণ করে, ঐ অন্তরে আধ্যাত্মিক চিন্তা ভাবনা ও বুঝার ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়, ফলে তারা তাদের পাপের পরিণামে আরও পাপে লিপ্ত হয়। এটা ঘটে দু'ভাবে- (১) তারা পাপের আক্রমণ থেকে আল্লাহ্‌র রহমত দ্বারা সুরক্ষিত নয়। ফলে সহজেই তারা পাপের ফাঁদে পা দেয় এবং পাপে আসক্ত হয়ে যায়। (২) তারা আল্লাহ্‌র ঐশ্বরিক রহমত ও করুণা ধারা হৃদয়ে অনুধাবন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এসব হৃদয়ে সৎ ও পূণ্যের কোন স্থান নাই। ফলে তারা কোনও পূণ্য কাজকে পূণ্য এবং মন্দ কাজকে পাপ মনে করে না। দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই হচ্ছে ঐশ্বরিক লানতের ফল।

৭১৩। বনী ইসরাঈলরা অঙ্গীকার ভঙ্গের শাস্তি লাভ করে এই ভাবে যে, আত্মার মুক্তির সর্ববৃহৎ উপায় আল্লাহ্‌র রহমত থেকে তারা বঞ্চিত হয় ! ফলে তাদের অন্তর এমন পাষাণে পরিণত হয় যে, আল্লাহ্‌র কালামকে তারা স্বস্থান থেকে ঘুরিয়ে দেয় অর্থাৎ আল্লাহ্‌র কালামে পরিবর্তন করে। সত্যের বিরুদ্ধে এবং ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের এই কাজ শুরু হয় তিনটি উপায়ে : (১) "তারা শব্দগুলিকে তাদের সঠিক স্থান থেকে পরিবর্তন করে" - অর্থাৎ তারা তাদের ধর্মগ্রন্থের শব্দগুলির পরিবর্তন করে যেনো তার অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়, অথবা শব্দগুলির ভুল ব্যাখ্যা দান করে। এভাবেই তারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত গ্রন্থের ভুল ব্যাখ্যা দ্বারা তাদের মনষ্কামনা তারা পূর্ণ করে। (২) "তাদের নিকট যে [আল্লাহ্‌র] বাণী প্রেরণ করা হয়েছিলো, তার একটা ভালো অংশ তারা ভুলে গিয়েছে।"- অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত ভাবে শব্দের পরিবর্তন বা ভুল ব্যাখ্যা দান করার ফলে তারা নিজেদের সুবিধাজনক ভাবে ধর্মগ্রন্থের কোনও কোনও অংশ ভুলে গেছে এবং (৩) এভাবেই এক প্রবঞ্চনাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আরও নূতন প্রবঞ্চনা ও মিথ্যার আশ্রয় তাদের গ্রহণ করতে হয়; "অল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলকেই প্রতারণা করতে দেখবে।"

উপদেশঃ যুগে যুগে নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রকৃত স্বরূপ এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আজকের যুগে বহু মুসলিম সমাজও এর ব্যতিক্রম নয়। আর ধর্মের নামে মুসলিম সমাজের এই প্রতারণার ফলে তারা আল্লাহ্‌র রহমত ও করুণা হতে বঞ্চিত।

৭১৪। দেখুন [২:১০৯] এবং টীকা ১১০ যেখানে "ক্ষমা কর" কথাটির ভাবার্থ বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

১৪। যারা নিজেদের খৃষ্টান বলে ডাকে, তাদেরও অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম ৭১৫। কিন্তু তাদের নিকট যে [আল্লাহ্‌র] বাণী প্রেরণ করা হয়েছিলো, তার একটা ভালো অংশ তারা ভুলে গিয়েছিলো। সুতরাং আমি তাদের মধ্যে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত শত্রুতা ও বিদ্বেষ দ্বারা বিচ্ছিন্ন করে রাখবো। এবং শীঘ্রই তারা যা করে আল্লাহ্‌ তাদের তা জানিয়ে দেবেন।

৭১৫। আয়াত [৬১ : ৬]-তে স্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে যে হযরত মসীহ্‌ সুস্পষ্ট ভাবে তার শিষ্যদের পরবর্তী নবীর আগমন বার্তা ঘোষণা করেছেন। যদিও তার নাম উল্লেখ করেছিলেন 'আহমেদ।' কিন্তু 'আহমেদ' বা 'মুহম্মদ' যার অর্থ প্রশংসিত বা "Praised one" এই সত্যের প্রকাশ খৃষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ সেন্ট জনের গসপেলে বর্ণনা আছে। এভাবেই খৃষ্টানেরা অঙ্গীকার করেছিল শেষ নবীর আনুগত্যের প্রতি। কিন্তু তারা তা ভুলে গিয়েছিল। এর ফলে খৃষ্টান ও ইহুদীদের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত শত্রুতা ও বিদ্বেষ স্থায়ী হবে।

১৫। হে কিতাবীগণ ! আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছে, কিতাবের যা তোমরা গোপন করতে, সে তার অনেক অংশ তোমাদের নিকট প্রকাশ করে, এবং অনেক [যা এখন অপ্রয়োজনীয়] উপেক্ষা করে। আল্লাহ্‌র নিকট থেকে তোমাদের নিকট এসেছে এক [নূতন] আলো, এবং এক প্রাঞ্জল কিতাব।

১৬। যারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, ইহা দ্বারা তিনি তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার পথে পরিচালিত করেন এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী অন্ধকার থেকে আলোর পথে পথ দেখান এবং তাদের সরল পথ প্রদর্শন করেন।

১৭। যারা বলে, "মারইয়াম পুত্র মসীহই আল্লাহ্‌" তারা অবশ্যই কুফরী করেছে। বলঃ, "মারইয়াম পুত্র মসীহ্‌, তাঁর মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে ধ্বংস করার ইচ্ছা যদি আল্লাহ্‌ করেন, তবে তাঁকে বাঁধা দিবার ন্যূনতম শক্তি কার আছে ?" আকাশ ও পৃথিবীতে এবং এর মাঝে যাকিছু আছে সব আল্লাহ্‌র অধিকারভুক্ত। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা সৃষ্টি করেন ৭১৭। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

৭১৭। খৃষ্টানেরা হযরত ঈসাকে আল্লাহ্‌র এক অবতার হিসেবে পূঁজা করে। কিন্তু সর্বোচ্চ সম্মানীয়, আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রেরিত যে রাসূল - হযরত ঈসা, তিনিও সাধারণ মরণশীল মানুষ বই আর কিছু নয়। সমস্ত ক্ষমতার আঁধার একমাত্র আল্লাহ্‌ আর কেহ নয়। এই বিরাট বিশ্ব ভূবনের সব কিছুই তিনি সৃষ্টি করেছেন। হযরত ঈসা; (আঃ) তাঁরই সৃষ্টি, খৃষ্টানেরা হযরত ঈসাকে আল্লাহ্‌ মনে করে, কারণ তিনি পিতা ব্যতীতই সৃষ্টি হয়েছেন, আলোচ্য বাক্যে এর উত্তর দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। লক্ষণীয়, হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহ্‌ পিতা ও মাতা উভয়ের মাধ্যম ব্যতীতই সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সব কিছুই করতে পারেন। সব কিছুর উপরে শক্তিমান।

১৮। ইহুদী ও খৃষ্টানগণ [উভয়েই] বলে, "আমরা আল্লাহ্‌র পুত্র এবং তাঁর প্রিয়।" বল, "তবে কেন তিনি তোমাদের পাপের জন্য তোমাদের শাস্তি দেন ? না তোমরা তাঁর সৃষ্ট অন্যান্য মানুষের মত মানুষ ব্যতীত অন্য কিছু নও। তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং আকাশ ও পৃথিবী এবং এর মাঝে যা কিছু আছে সব আল্লাহ্‌রই অধিকারভুক্ত ৭১৯। এবং [সকলের] শেষ গন্তব্য তাঁর দিকে।"

৭১৯। খৃষ্টানদের আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল হযরত ঈসা সম্পর্কে প্রচারিত পিতা-সন্তান তত্ত্ব এবং ইহুদীদের নিজেদের আল্লাহ্‌র সবচেয়ে প্রিয় বান্দা বা শ্রেষ্ঠত্বের দাবীকে আল্লাহ্‌ এই আয়াতে নাচক করে দিয়েছেন। এই দুটি ক্ষেত্রেই আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, "তোমরা তাঁর সৃষ্ট অন্যান্য মানুষের মত মানুষ ব্যতীত অন্য কিছু নও।"

১৯। হে কিতাবীগণ ! রাসূল প্রেরণের [ধারাবাহিকতায়] বিরতির পর ৭২০ আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছে; [সমস্ত কিছু] সুস্পষ্ট করতে, যাতে তোমরা বলতে না পার, "কোন সুসংবাদবাহী ও কোন [মন্দ থেকে] সাবধানকারী আমাদের নিকট আসে নাই।" কিন্তু এখন তো তোমাদের নিকট একজন সুসংবাদদাতা এবং সাবধানকারীর আগমন ঘটেছে। আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।

৭২০। হযরত ঈসা এবং হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর মধ্যে প্রায় ছয়শত বৎসর পৃথিবী অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। ধর্মের নামে ধর্ম ব্যবসায়ী দ্বারা পৃথিবী পরিব্যপ্ত হয়ে পড়েছিল। ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা ধর্ম জঘন্য দূর্নীতির আখড়াতে পরিণত হয়। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সর্বোচ্চ নিম্নসীমায় নেমে আসে। এ সময়কালের মধ্যে কোনও পয়গম্বরের আগমন ঘটে নাই। এটাই ছিল "রাসূল প্রেরণে বিরতিকাল।"

রুকু - ৪

২০। স্মরণ কর মুসা তার লোকদের বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায় " তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে নবী করেছেন ৭২১, তোমাদের রাজা করেছেন, ৭২২ এবং বিশ্বজগতে কাউকে যা তিনি দেন নাই তা তোমাদের দিয়েছেন ৭২৩।

৭২১। হযরত মুসা (আঃ) এর পূর্বে ইহুদীদের মধ্যে বহু নবী এসেছেন। যেমন- হযরত ইব্রাহীম, হযরত ইছহাক, হযরত ইসমাঈল, ইয়াকুব ইত্যাদি।

৭২২। ইসরাঈলীদের মিশরের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের স্বাধীন মুক্ত জীবনে আল্লাহ্‌ অধিষ্ঠিত করেছিলেন, ঠিক যেনো তারা প্রত্যেকেই রাজাধিরাজ সম্রাটের জীবন প্রাপ্ত হয়। এ জীবন তাদের দেয়া হয়েছিল শুধুমাত্র একটাই শর্তে, তারা আল্লাহ্‌কে মান্য করবে এবং হযরত মুসাকে অনুসরণ করবে।
৭২৩। "বিশ্বজগতে কাউকে যা তিনি দেন নাই।" - ইসরাঈলীরা ছিল আল্লাহ্‌র বিশেষ অনুগ্রহ ভাজন জাতি। আল্লাহ্‌ ইসরাঈলীদের নির্বাচিত করেছিলেন তাঁর প্রত্যাদেশ পৃথিবীতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। মানব জাতির জন্য এর থেকে বড় সম্মান আর কি হতে পারে ?

২১। "হে আমার সম্প্রদায় ! আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন তাতে তোমরা প্রবেশ কর ৭২৪ এবং সুনাম হানিকর ভাবে পশ্চাৎপসরণ করো না। করলে, তোমাদের নিজেদের ধ্বংস দ্বারা ভুপতিত হবে।

৭২৪। ওল্ড টেস্টামেন্টের ১৩ এবং ১৪ অধ্যায়ে যে ঘটনার বিবরণ দেয়া হয়েছে, এই আয়াতে সেই ঘটনার আলোকপাত করা হয়েছে। এই আয়াতটি পড়ার সময়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের ঘটনা টিকা হিসেবে পাঠ করুণ এবং মানচিত্র খুলে লক্ষ্য করুণ সিনাই উপদ্বীপকে। এই উপদ্বীপ পশ্চিমে মিশর দ্বারা যুক্ত। আরবের উত্তর-পশ্চিম অংশ এই উপদ্বীপের সাথে যুক্ত। প্যালেষ্টাইন এই উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থিত। ইসরাঈলীরা মিশর থেকে সুয়েজ উপসাগরের উত্তরাংশ অতিক্রম করে এই সিনাই উদ্বীপে প্রথম পদার্পন করে। হযরত মুসা এখানে তাঁর দলকে সুসংহত করেন এবং ধর্মীয় ব্যাপারে পৌরহিত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে তারা ২০০ মাইল দক্ষিণে সিনাই পর্বতের পাদদেশে গমন করেন সেখানে তিনি তওরাত (Torah) গ্রন্থ লাভ করেন। সেখান থেকে তাঁরা ১৫০ মাইল উত্তরে ক্যানন প্রদেশের দক্ষিণ সীমান্তে পারান (Paran) নামক মরুভূমিতে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করেন। এই ঘাঁটি থেকে ১২ জন লোককে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ সম্বন্ধে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়। এরা তাঁদের ঘাঁটি থেকে ১৫০ মাইল উত্তরে, ভবিষ্যৎ জেরুজালেমের ২০ মাইল দক্ষিণে হেব্রন পর্যন্ত খোঁজ খবর নেয়। সেখানে তারা একটি সমৃদ্ধশালী দেশের সন্ধান পান। সেখান থেকে তাঁরা দাড়িম্ব ফল, ডুমুর এবং আঙ্গুরের গুচ্ছ নিয়ে আসেন - দেশের সমৃদ্ধতার প্রমাণ স্বরূপ। এই ফলগুলি গন্ধে, রসে, গুণে ছিল উন্নতমানের এবং ওজনে এত ভারী ছিল যে এগুলি বহন করার জন্য দু'জন লোকের প্রয়োজন হয়েছিল। তারা দেশটিকে সমৃদ্ধশালী রূপে বর্ণনা করে। কিন্তু সেই সাথে তাঁরা বক্তব্য রাখে যে, সে দেশ দখল করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। ইসরাঈলীদের আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসে ঘাটতি ছিল তাই তারা ছিল ভীতু। না হলে তারা বিশ্বাস করতো যে আল্লাহ্‌ সর্বশক্তিমান। আল্লাহ্‌ যাদের সাহায্য করেন তাঁদের পরাজয় নাই। আল্লাহ্‌র থেকে বড় সাহায্যকারী আর কেউই নাই। তাদের এই ব্যবহারে হযরত মুসা অত্যন্ত মর্মাহত হন।

২২। তারা বলেছিলো, "হে মুসা ! এই দেশে মাত্রাতিরিক্ত শক্তিশালী এক সম্প্রদায় রয়েছে ৭২৫। তারা সেই স্থান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে কিছুতেই প্রবেশ করবো না। যদি তারা [একবার] স্থান ত্যাগ করে, তারপর আমরা প্রবেশ করবো।"

৭২৫। ইহুদীরা হযরত মুসার অনুসরণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। এবং তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতেও অপরাগতা প্রকাশ করে। তাঁরা হযরত মুসাকে বলে যে, "তারা সেই স্থান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে কিছুতেই প্রবেশ করবো না।" এভাবেই তারা আল্লাহ্‌র 'ইচ্ছার' বিরুদ্ধাচরণ করে। উপদেশ : প্রত্যেক ব্যক্তির এবং জাতির অনুধাবন করতে চেষ্টা করা উচিত - সর্বশক্তিমানের 'ইচ্ছাকে'। এবং এই অনুধাবনের পরে সর্বশক্তি দিয়ে সেই ইচ্ছার প্রতিফলন আমাদের জীবনে ঘটানো প্রত্যেকের কর্তব্য।

২৩। [কিন্তু তাদের] মধ্যে দু'জন, যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করতো তারা এবং যাদের উপরে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ছিলো ৭২৬, তারা বলেছিলো, "তোমরা তাদের মোকাবিলা করে [সঠিক] দ্বারা দিয়ে প্রবেশ কর। একবার প্রবেশ করলেই তোমরা জয়ী হবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর কর।"

৭২৬। অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে দু'জন ছিলেন যারা ছিলেন সত্যিকারের আল্লাহ্‌ ভক্ত' ফলে তারা ছিলেন সাহসী। এদের একজন ছিলেন জোসুয়া ও অন্যজন কালেব। ৪০ বৎসর পরে হযরত মুসার মৃত্যুর পরে জোসুয়া ইহুদীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এই দু'জন ইসরাঈলীদের প্রতি আবেদন করেছিলেন যে, "তোমরা তাদের মুকাবিলা করে সঠিক দ্বার দিয়ে প্রবেশ কর।"। "মুকাবিলা" করিয়া অর্থাৎ সবরকম সাবধানতা অবলম্বন করে শত্রুদের মুখোমুখি হওয়া। দেখুন আয়াত [২ : ১৮৯] এবং টীকা ২০৩। তারা আরও বলেছিলেন যে "তোমরা মুমিন হলে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর কর।" কারণ জয় ও পরাজয়ের মালিক একমাত্র আল্লাহ্‌।

২৪। তারা বলেছিলো, "হে মুসা ! যতক্ষণ তারা সেখানে আছে ততক্ষণ আমরা সেখানে প্রবেশ করবই না। সুতরাং তুমি এবং তোমার প্রভু যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকবো [এবং পর্যবেক্ষণ করবো]" ৭২৭।

৭২৭। হযরত মুসা আল্লাহ্‌র নিকট থেকে প্রাপ্ত আদেশ - যে আদেশ বলে তিনি ইহুদীদের ক্যানন প্রদেশে ঢোকার হুকুম দিয়েছিলেন- সেই আদেশ এবং জোসুয়া এবং ক্যালবের উপদেশ, ইহুদীদের কাছে অত্যন্ত অরুচিকর মনে হলো। জোসুয়া ও ক্যালেব ব্যতীত অন্য দশজন যারা ক্যানন দেশটি অনুসন্ধানে গিয়েছিলো তারা জনতার সামনে দেশটি সম্পর্কে অত্যন্ত ভীতিকর পরিস্থিতির বর্ণনা তুলে ধরেছিল। কারণ তাদের মতে ক্যানন প্রদেশের লোকজন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের মুখোমুখি হওয়া ইহুদীদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর ফলে 'জনতা' হযরত মুসা, হারুণ, জোসুয়া এবং ক্যালেবের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাঁদের সেই প্রাচীন দাসত্বের ভূমি মিশরে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে চেষ্টা করে। হযরত মুসাকে তারা যেভাবে সম্বোধন করেছিল তা ছিল ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপে ভরা। তাদের সম্বোধন ছিল - "তুমি এবং তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকব।"

উপদেশঃ যারা আল্লাহ্‌র প্রতি নির্ভরশীল নয়, তারা হয় ভীতু। ভীতু লোকের আত্ম সম্মান জ্ঞান অত্যন্ত কম থাকে; এবং তাঁরা সম্মান জনক কষ্টকর জীবনের থেকে অসম্মান জনক আপতঃ সুখের জীবনকে ভালোবাসে। এই সত্যটিই ইসরাঈলীদের বেলায় প্রযোজ্য ছিল। সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জীবন হচ্ছে আত্ম সম্মানের জীবন। ইসরাঈলীরা আত্ম সম্মানের জীবনের বিনিময়ে অসম্মানের ক্রীতদাসের জীবনের জন্য মিশর গমনের জন্য ব্যাকুল ছিল- কারণ তারা ছিল ঈমানে অবিশ্বাসী, আল্লাহ্‌র প্রতি নির্ভরশীলতা না থাকার দরুণ ভীতু। এই শিক্ষার উদাহরণ আজকের পৃথিবীতেও দেখা যায়। যে জাতি বা ব্যক্তি ঈমানহীন; সে জাতি হয় ভীতু ও সংগ্রাম বিমুখ। আপাতঃ সুখই সেই জাতির বা ব্যক্তির কাম্য। আপতঃ সুখের জন্য এরা আত্ম সম্মান বা স্থায়ী সুখকে বিসর্জন দেয়।

২৫। সে বলেছিলো, "হে আমার প্রভু ! শুধুমাত্র আমার নিজের এবং আমার ভ্রাতার উপরে আমার আধিপত্য আছে ৭২৮। সুতরাং এই বিদ্রোহী সম্প্রদায় থেকে আমাদের পৃথক করে দাও।"

৭২৮। এই আয়াতটির ওল্ড টেষ্টামেন্ট বা তওরাতে এভাবে বলা হয়েছে, "Moses and Aron fell on their faces before all the assembly of the congregation" (Num xiv5). তওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ্‌ বললেন যে, "I will smite them with the pestilence, and disinherit them." (Num xiv ১২). কিন্তু কোরানের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মুসা আল্লাহ্‌কে ঐ বিদ্রোহী সম্প্রদায় থেকে যারা ঈমানদার তাদেরকে আলাদা ভাবে বিচার করতে অনুরোধ করলেন। এখানে মুসার বক্তব্যে জীবনের আধ্যাত্মিক দিকটি প্রকাশিত।

২৬। আল্লাহ্‌ বললেন, "অতএব, ইহা [পবিত্র ভূমি] চল্লিশ বছর ৭২৯ তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো। দেশে দেশে তারা উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াবে। তুমি কিন্তু এসব সত্যত্যাগী [বিদ্রোহী] লোকদের জন্য দুঃখ করো না।"

৭২৯। একগুয়ে হটকারী এবং বিদ্রোহী ইহুদীদের জন্য আল্লাহ্‌র অভিসম্পাত ছিল যে, তাদের জন্য চল্লিশ বৎসর এদেশ হারাম রইল। পরিণতিতে তারা চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত একটি সীমাবদ্ধ এলাকায় আবরুদ্ধ ও বন্দী রইল। বাহ্যতঃ তাদের চারিপাশে কোনও প্রাচীর ছিল না; বরং তারা ছিল উন্মুক্ত প্রান্তরে। তারা মিশরে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পথ চলতো এবং দিন শেষে দেখতে পেতো যে তারা পূর্ব স্থানেই ফিরে এসেছে। চল্লিশ বছর তারা এভাবে উদভ্রান্তের মত ঘুরতে থাকে। সে সময়ে যারা ২০ বৎসর বা তদুর্ধ্বে ছিল এই সময়ের মধ্যে তারা সকলেই পরলোক গমন করে। হযরত মুসা এবং হারুণও পরলোক গমন করেন। যারা সেই সময়ে শিশু ছিল, তারাই ইতিমধ্যে বড় হয়ে সেই পবিত্র ভূমির সন্ধান লাভ করে। আল্লাহ্‌র শাস্তি স্বরূপ ইসরাঈলীরা চল্লিশ বৎসর যেখানে ঘুরে বেড়ায় সেটা হলো আকাবা উপসাগরের শীর্ষ থেকে শুরু করে তারা উত্তর দিকে যাত্রা করে, পূর্বদিকে তারা 'ডেড্‌সী' ((Dead Sea) এবং জর্দান নদীকে রেখে তারা অগ্রসর হয়। চল্লিশ বছর পরে তারা জর্দান নদী অতিক্রম করে অপর পারে অর্থাৎ এখন যেখানে জেরিকো (Jericho) সেখানে পৌঁছায়। এ সময়ের মধ্যে হযরত মুসা, হারুণসহ পূর্ববর্তী সকলেই পরলোক গমন করেন।

রুকু - ৫

২৭। আদমের দুই পুত্রের কাহিনীর সত্যতা ৭৩০ তাদের নিকট যথাযথভাবে বর্ণনা কর ৭৩১ দেখ তারা প্রত্যেকেই [আল্লাহ্‌র জন্য] কুরবাণী করেছিলো। একজনের কুরবাণী গ্রহণ করা হয়েছিলো, কিন্তু অন্যজনের কবুল হলো না। শেষোক্ত জন বললো, "নিশ্চিত হও, আমি তোমাকে হত্যা করবই," প্রথম জন বললো, "অবশ্যই আল্লাহ্‌ পূন্যবাণদের কুরবাণী গ্রহণ করেন।"

৭৩০। "আমাদের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাহাদিগকে যথাযথভাবে শোনাও।" এই কাহিনী তওরাতেও বর্ণনা করা হয়েছে, [১-১৫]। কিন্তু সেখানের বর্ণনায় উপদেশমূলক কোনও বর্ণনা ছিল না যা আল্লাহ্‌ শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। এই আয়াতে আমাদের নবীকে 'যথাযথ' ভাবে এই কাহিনী বর্ণনা করতে বলা হয়েছে। 'যথাযথ' কথাটি দ্বারা সত্য এবং এর শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে।

৭৩১। আদমের দুই পুত্র যারা হাবিল ও কাবিল নামে সম্বোধন করা হতো যা বাইবেলে Abel এবং Cain নামে পরিচিত। কাবিল ছিল জ্যেষ্ঠ এবং হাবিল ছিল ছোট। ছোট হাবিল ছিল পরহেজগার। যেহেতু কাবিল ছিল জ্যেষ্ঠ সেই কারণে সে বড়র অধিকার সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন এবং অহংকারী ছিল। সে ছিল একগুয়ে এবং হিংসুক। এই সব খারাপ রীপু তাকে এতটাই বিপথে চালিত করে যে, সে শেষ পর্যন্ত তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে। হাবিল ও কাবিলকে এখানে পৃথিবীর ধর্মীয় ইতিহাসের প্রতীক স্বরূপ বলা যায়। খৃষ্টানদের বেলায় এই প্রতীক হচ্ছে ইহুদীদের দ্বারা যীশু খৃষ্টকে হত্যা। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খৃষ্টান ধর্ম ইহুদী ধর্মের পরে অবতীর্ণ। কাবিল যেমন জ্যেষ্ঠ হয়েও ছিল হিংসুক, অহংকারী ও একগুয়ে- ইহুদীরাও ঠিক ছিল সেইরকম। ঠিক একই ভাবে ইহুদীরা পূর্বতন ধর্মের অধিকারী হলেও আমাদের নবী হযরত মুহম্মদের (সাঃ) জীবন ধ্বংসের চেষ্টা ও মুসলমানদের হত্যার মাধ্যমে সেই একই কাবিল ও হাবিলের ঘটনারই পনুরাবৃত্তি ঘটায়।

২৮। "আমাকে হত্যা করার জন্য তোমার হাত প্রসারিত করলেও, তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত তুলবো না। আমি তো জগত সমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্‌কে ভয় করি।"

২৯। "তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন কর ৭৩২ এবং তুমি অগ্নিবাসী হও এটাই আমার ইচ্ছা। এবং যারা পাপ করে এটাই হচ্ছে তাদের পুরস্কার" ৭৩৩।

৭৩৩। হাবিলের আবেদন ছিল অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। তিনি ছিলেন একজন আল্লাহ্‌ ভীরু ও পরহেজগার ব্যক্তি। মৃত্যুর হুমকীকে উপেক্ষা করেও তিনি ছিলেন শান্ত ও নির্ভীক। কাবিলের ক্রোধের জওয়াবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে প্রতিপক্ষকে সংশোধনের উপদেশ দান করেন।

৩০। অপরজনের [কু] প্রবৃত্তি তাকে ভাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করলো। সে তাকে [ভাইকে] হত্যা করলো এবং [নিজেকে আধ্যাত্মিক] ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত করলো ৭৩৪।

৭৩৪। নিরপরাধ, নিঃস্বার্থ ছোট ভাই এর আবেদন বড় ভাই কাবিলের উপরে কোনও প্রতিক্রিয়াই ঘটাতে সক্ষম হলো না। কারণ কাবিলের হৃদয় ছিল হিংসা, অহংকার ও স্বার্থপরতায় পূর্ণ। সে তাঁর ভাইকে খুন করলো, ফলে সে তাঁর নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনলো।

উপদেশঃ হিংসা, অহংকার ও স্বার্থপরতা অত্যন্ত খারাপ রীপু। এই রীপুগলি মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে - যেমন- কাবিলের ধ্বংস ডেকে এনেছিল। শয়তানের বেহেস্ত থেকে পতনেরও মূল কারণ ছিল নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার ও আদমের উপরে হিংসা।

৩১। অতঃপর আল্লাহ্‌ এক দাঁড় কাক পাঠালেন, যে মাটি খুঁড়ে তাকে দেখালো যে কিভাবে ভাতৃ হত্যার কলঙ্ক [শবদেহ] গোপন করা যায় ৭৩৫। সে বললো, "হায় ! আমি কি এই দাঁড় কাকের মতও হতে পারলাম না; যাতে ভাতৃহত্যার কলঙ্ক গোপন করতে পারি ?" অতঃপর সে অনুতাপে পূর্ণ হলো ৭৩৬।

৭৩৫। 'Sau-at' আরবী কথাটির অনুবাদ করা হয়েছে 'শব'। এই আয়াতে কাবিলের হাবিলকে হত্যা করার পরে তার আক্ষেপ ও লজ্জার প্রকাশ করা হয়েছে। দু'টি কারণে তার লজ্জ্বা বোধ হয়েছিল। প্রথমতঃ ভাই এর মৃতদেহ গোপন করার উপায় সে জানে না যা সামান্য একটি কাকও জানে। দ্বিতীয়তঃ এই অন্যায় হত্যাকান্ড তাকে বিধ্বস্ত করেছিল।

৭৩৬। শেষ পর্যন্ত হত্যাকারীর হৃদয়ে অনুতাপের উদ্ভব হয়। কোনও নির্দোষ মানুষকে হত্যা করাই অন্যায়। তদুপরি নিহত ব্যক্তি যদি হয় হত্যাকারীর আপন ভাই এবং নিহত ব্যক্তি যদি হয় পরহেজগার ও মোমেন ব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে অনুতাপ স্বাভাবিক। এই আয়াতে এ কথা বলা হয়েছে যে কাবিলের দুঃখ প্রকাশের প্রধান কারণ ছিল যে সে তার দুষ্কর্মের সাক্ষী তার ভাই এর শবদেহ গোপন করতে অক্ষম হয়েছিল। এই কাজের জন্য তাকে ঘৃণ্য, তুচ্ছ এবং কুৎসিত দাঁড় কাকের সাহায্য গ্রহণ ও প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করতে হলো। এ যেনো তার শৌর্য বীর্যের প্রতি অবজ্ঞা। তাঁর অহংকারের পতন। সুতরাং কাবিলের এই অনুতাপ সত্যিকারের অনুতাপ হতে পারে না, এ ছিল তার আত্মশ্লাঘায় বা অহমিকায় আঘাত লাগার পরিণাম।

৩২। এই কারণে বণী ইসরাঈলীদের এই বিধান দিলাম যে নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করার কারণ ব্যতীত যদি কেহ কাউকে হত্যা করে, সে যেনো দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করলো ৭৩৭। এবং যদি কেউ একটি প্রাণ রক্ষা করে সে যেনো সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো। অতঃপর যদিও তাদের নিকট আমার রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছিলো, এরপরও তাদের মধ্যে অনেকেই সীমালংঘনকারীই থেকে গেলো।

৭৩৭। কাবিলের কাহিনীর বর্ণনা করা হয়েছে, ইহুদীদের নৃশংসতা বর্ণনা করার ভূমিকা হিসেবে। ইসরাঈলীরা আল্লাহ্‌র বিধান সমূহের প্রতি বিদ্রোহ করেছিল, নবী রাসূলদের হত্যা করেছিল এবং নিরপরাধ পরহেজগার মোমেন বান্দাদের হত্যার মাধ্যমে স্বয়ং আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধাচারণ করে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্‌ ইসরাঈলীদের উপর থেকে তাঁর অনুগ্রহ প্রত্যাহার করেন এবং সেই অনুগ্রহ ইহুদীদের ভাতৃসুলভ অন্য জাতির উপরে বর্ষণ করেন। এর ফলে ইহুদীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। জাতিগতভাবে ইহুদীরা অত্যন্ত অহংকারী। এই ঈর্ষা ও অহংকার ইহুদীদের তাদের অপরাধ ও পাপকে অনুধাবনের পরিবর্তে আরও পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত করে- যেমনটি কাবিলের অহংকার, হিংসা করেছিল। পৃথিবীতে যারা ন্যায় ও সত্যের প্রতীক যারা আদর্শের পথ প্রদর্শক সেই নবী ও রাসূলদের ইহুদীরা হত্যা করে। এ হত্যাকে কোনও ব্যক্তিগত হত্যারূপে আল্লাহ্‌র কাছে পরিগণিত নয়। এ হত্যা হচ্ছে আদর্শকে হত্যার প্রতীক স্বরূপ - যে আদর্শের অনুসারী বিরাট জনগোষ্ঠি। একথাকেই এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। "সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করলো।" ঠিক সেই একই ভাবে আদর্শের সংগ্রামী কোনও বান্দাকে রক্ষা করার অর্থ "সে যেনো দুনিয়ার সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো।" ব্যক্তিগত আক্রোশবশতঃ হত্যা আল্লাহ্‌র কাছে কি পরিমাণ নিন্দনীয় উপরের আয়াতে তাকেই রূপকের ও তুলনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

৩৩। যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায় এবং সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের প্রসারের জন্য ৭৩৮। তাদের শাস্তি হচ্ছে; তাদের হত্যা করা হবে, অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে ৭৩৯ অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। পৃথিবীতে এটাই হবে তাদের লাঞ্জনা এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।

৭৩৮। এখানে দ্বৈত অপরাধের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা, দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্‌র সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। এখানে এরূপ ক্ষেত্রে চার ধরণের শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে এর যে কোনটি উপরোক্ত ব্যক্তির প্রতি প্রযোজ্য। এগুলি হল : শিরচ্ছেদ, ক্রুশে হত্যা, অঙ্গচ্ছেদ অথবা নির্বাসন। এই-ই ছিল সে যুগে অপরাধীদের শাস্তির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই নিয়ম কয়েকশত বৎসর পর্যন্ত পৃথিবীতে চলে এসেছে।

৭৩৯। "বিপরীত দিক হইতে" অর্থ ডান হাত বাম পা, অথবা বাম হাত ও ডান পা।

৩৪। ব্যতিক্রম হবে তারাই যারা তোমার আয়ত্তাধীনে আসার পূর্বে অনুতপ্ত [তওবা] হবে। সে ক্ষেত্রে জেনে রাখ যে, আল্লাহ্‌ ক্ষমামীল ও পরম দয়ালু।

রুকু - ৬

৩৫। হে মুমিনগণ ! আল্লাহ্‌র প্রতি কর্তব্য কর ৭৪০, তাঁর সান্নিধ্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর। এবং সর্বশক্তি দিয়ে তাঁর পথে সংগ্রাম কর, যেনো তোমরা সফলকাম হতে পার ৭৪১।

৭৪০। 'Taqwa' কথাটির বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে 'আল্লাহ্‌ ভীতি'। কিন্তু মওলানা ইউসুফ আলী এই লাইনটি "আল্লাহ্‌কে ভয় কর" - এর পরিবর্তে অনুবাদ করেছেন, "Do your duty to Allah" যুক্তি হিসেবে উত্থাপন করেছেন পরবর্তী বাক্যগুলির অন্তর্নিহিত ভাবধারা। সাধারণ ভাবে 'ভয়' কথাটির দ্বারা কোনও কিছু থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাকেই বুঝায়। যে কোনও ব্যক্তি ভীতিকর বস্তু বা ব্যক্তি থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরে রাখতে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে উপরের আয়াতে যে ভাবের প্রকাশ করা হয়েছে তা দ্বারা আল্লাহ্‌র নিকট থেকে দূরে থাকার প্রশ্নই ওঠে না বরং 'আল্লাহ্‌ ভীতি' কথাটির দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে যে আল্লাহ্‌কে খুশী করার জন্য আল্লাহ্‌র ইচ্ছা বা আইনকে মেনে চলার একান্ত আগ্রহের কথা; যা আল্লাহ্‌র ইচ্ছা বা আইনের পরিপন্থি তা পরিহার করার একান্ত প্রবণতা। এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি আমাদের কর্তব্য। আর তাই-ই হচ্ছে 'আল্লাহ্‌ ভীতি' বা 'তাকওয়া', এই আয়াতে আমাদের বলা হয়েছে যে "তাঁহার নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর, ও তাঁর পথে সংগ্রাম কর।" আর তা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আল্লাহ্‌র আইনকে প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশক্তি দ্বারা সংগ্রাম করা। ভয়ে আল্লাহ্‌ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং ভালোবেসে তার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যে জীবন উৎসর্গ দ্বারা আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের জন্য সংগ্রাম করা। সেই কারণে ইউসুফ আলী সাহেব অনুবাদে "Duty to Allah." বাক্যটি ব্যবহার করেছেন।

৭৪১। অনন্ত জীবনের প্রেক্ষিতে পৃথিবীর জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং সফলকাম কথাটি পরকালের অনন্ত জীবনের জন্য প্রযোজ্য।

৩৬। যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করে - যদি তাদের পৃথিবীর কিছু [সম্পদ] থাকে এবং [এর] দ্বিগুণ পরিমাণও [সম্পদ] থাকে- তবুও শেষ বিচারের দিনের শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ তা তাদের নিকট থেকে গৃহীত হবে না। তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।

৩৭। তারা আগুন থেকে বের হওয়ার জন্য আকাঙ্খা করবে। কিন্তু কখনও তারা সেখান থেকে বের হতে পারবে না। তাদের জন্য রয়েছে শাস্তি যা হবে স্থায়ী।

৩৮। পুরুষ বা নারী চোর ৭৪২ উভয়েরই হাত কেটে ফেল। তাদের অপরাধের জন্য আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আদর্শ দণ্ড। আল্লাহ্‌ ক্ষমতায় পরাক্রমশালী।

৩৯। কিন্তু যদি চোর তার অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়, এবং তার আচরণ সংশোধন করে, আল্লাহ্‌ তাকে ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

৪০। তুমি কি জান না যে, আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব [একমাত্র] আল্লাহ্‌রই ? যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেন, এবং যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন। সকল বিষয়ের উপরে আল্লাহ্‌ শক্তিমান ৭৪৩।

৭৪৩। সমাজকে সুস্থ সুন্দর রাখার জন্য দুষ্কৃতিকারীর কঠোর শাস্তির প্রয়োজন আছে। যে সমাজে অন্যায়কারী, দুষ্কৃতিকারী শাস্তি পায় না, সে সমাজে আল্লাহ্‌র আইন প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। এ কথা মনে রাখতে হবে যে শাস্তির বিধান বা আইন আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রদত্ত। এই বিধানের উপরে ভিত্তি করেই অপরাধীর জন্য শাস্তির আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন প্রণয়নের সময়ে আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ্‌ শুধু শাস্তিই দান করেন না, তিনি ক্ষমাশীল ও রহমতের আঁধার। "রহমানুর রহীম" শুধুমাত্র তাঁর নামেরই বিশেষণ। আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞান দ্বারা তার "শাস্তি দান" বা "ক্ষমা" বিচার করার ক্ষমতা নাই। আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞাময় ক্ষমতার প্রসার - আমাদেরই সার্বিক কল্যাণের জন্য। "সকল বিষয়ের উপরে আল্লাহ্‌ শক্তিমান।"

৪১। হে রাসূল ! যারা কুফরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয়, [তাদের অবিশ্বাস] যেনো তোমাকে দুঃখ না দেয় ৭৪৪। [হতে পারে] এরা তারা, যারা মুখে বলে, "আমরা বিশ্বাস করি" কিন্তু যাদের অন্তরে কোন ঈমান নাই; অথবা হতে পারে তারা ইহুদীদের মধ্যে যারা মিথ্যা শ্রবণে তৎপর, এমনকি তোমার নিকট আসে না এমন ভিন্ন দলের পক্ষে যারা কান পেতে থাকে ৭৪৫। তারা শব্দগুলিকে [সঠিক] স্থান থেকে পরিবর্তন করে ৭৪৬, তারা বলে, "এই প্রকার বিধান দিলে গ্রহণ করো এবং উহা না দিলে সাবধান।" আল্লাহ্‌ যদি কারও বিচার করতে চান, তার জন্য আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে তোমার সামান্য কিছুও করার ক্ষমতা নাই। তাদের হৃদয়কে আল্লাহ্‌ পবিত্র করতে চান না। এই পৃথিবীর জীবনে তাদের জন্য রয়েছে অপমান এবং পরলোকে রয়েছে মহাশাস্তি।

৭৪৪। এই আয়াতে দুই দল লোকের কথা বলা হয়েছে এরা হচ্ছে মোনাফেক ও ইহুদী। এই দুই দলের হেদায়েতের জন্যেই আমাদের নবী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এটা তাঁর জন্য অত্যন্ত দুঃখ ও হতাশার কারণ ছিল যে তাঁর এত অক্লান্ত আন্তরিকতা সত্বেও তিনি তাঁদের হেদায়েতের পথে আনতে পারেন নাই। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল অত্যন্ত ধূর্ত ও অবিশ্বস্ত এবং তাদের হৃদয়ের কাঠিন্য আমাদের নবীকে হতাশ করে।

উপদেশঃ এই উদাহরণ সে যুগেও যেমন প্রযোজ্য ছিল আজও সমভাবে প্রযোজ্য। ভালো ও মহৎ যা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের জন্য করা হয় তা সর্বদা মোনাফেকদের কঠিন হৃদয়ে স্থান লাভ করে না এবং মোনাফেক ও ইহুদীদের মত অবিশ্বাসীর সংখ্যা আজকের পৃথিবীতেও কম নাই।

৭৪৫। ইহুদীদের মধ্যে বহুলোক ছিল যারা হযরত মুহম্মদের (সাঃ) বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের জন্য উদ্‌গ্রীব থাকতো। তারা সর্বদা তাদের শ্রবণান্দ্রীয়কে সজাগ রাখতো, যে কোনও মিথ্যাকে শোনার জন্য। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল গুপ্তচর বৃত্তি। আর এই গুপ্তচর বৃত্তি ছিল এমন একদল লোকের জন্য যারা রাসূলের (সাঃ) নিকট যাতায়াত করে না - অর্থাৎ 'ইহুদী ধর্মযাজক' সম্প্রদায়। "তোমার নিকট আসে না এমন এক ভিন্ন দলের পক্ষে, যারা কান পেতে থাকে।" এই লাইনটি দ্বারা সেই সব গুপ্তচরদের কথা বলা হয়েছে যারা ইহুদী ধর্মযাজকদের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূলের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তি করে এবং মিথ্যাকে প্রচার করে।

৭৪৬। দেখুন আয়াত [৫ : ১৩] আরবী শব্দ Min ba'di, কথাটির বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে "অর্থ বিকৃত করে" এবং মওলানা ইউসুফ আলী সাহেব ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন, "They change the words from their (right) places." ইহুদীরা তাদের ধর্ম গ্রন্থের বহুস্থানে নিজেদের সুবিধামত পরিবর্তন করেছে এবং ধর্মীয় আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। তারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আইনের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল না, প্রয়োজনে তারা মূল বিষয় বস্তুকে ভুল ব্যাখ্যাদানের মাধ্যমে এর অর্থকে বিকৃত করতো।

৪২। [তারা অত্যন্ত আগ্রহশীল] মিথ্যা শ্রবণে, অবৈধ ভক্ষণে ৭৪৭ তারা যদি তোমার নিকট আসে, তাদের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তি করো অথবা হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করো ৭৪৮। যদি তুমি হস্তক্ষেপ কর, তবে তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যদি বিচার নিষ্পত্তি কর, তবে তাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করো। যারা ন্যায় বিচার করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন।

৭৪৭। "অবৈধ ভক্ষণ" - এই কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই 'অবৈধ' শব্দটি সাধারণ অর্থে অর্থাৎ আল্লাহ্‌ যা কিছু নিষেধ করেছেন তা বোঝানো হয়েছে। তা ব্যতীত এই শব্দটির অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক, গুঢ় ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যে কাজ দ্বারা সমাজ জীবনের শান্তি ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয় তাই-ই অবৈধ। এখানেই এই 'অবৈধ' শব্দটির বৈশিষ্ট্য। এখানে 'ভক্ষণ' কথাটি আক্ষরিক অর্থে এবং আলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহৃত। আক্ষরিক অর্থে ভক্ষণ অর্থাৎ খাওয়া - অর্থাৎ আল্লাহ্‌ যা খেতে বা ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন যেমন- মদ, শুকরের মাংস ইত্যাদি। আলঙ্কারিক অর্থে সেই সব বস্তু গ্রহণ করা অবৈধ যা সমাজ জীবনের শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী যথা : সুদ, ঘুষ, কারও অসহায়ত্বে সুযোগ গ্রহণ করা, ক্ষমতা বলে নিজের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। হারাম ভক্ষণের ফলে ব্যক্তির ব্যক্তিগত যথা- দেহ ও মনের ক্ষতি হয়। কিন্তু আলঙ্কারিক অর্থে "অবৈধ ভক্ষণের" ফলে [ঘুষ, সুদ ইত্যাদি] পুরো সমাজের মূল্যবোধ, ন্যায়নীতি এক কথায় পুরো সমাজের অস্তিত্বই সংকটের সম্মুখীন হয়। উৎকোচ বা ঘুষ শুধু গ্রহীতাকাই ধ্বংস করে না, সমগ্র দেশ ও জাতির নৈতিক মূল্যবোধের মূলোৎপাটন করে এবং জননিরাপত্তা ধ্বংস করে। যে দেশে বা বিভাগে ঘুষ চালু হয়ে পড়ে, সেখানে আইনও নিষ্কৃয় হয়ে পড়ে। অথচ আইনের উপরই দেশ ও জাতির শান্তি-শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। আইন নিষ্কৃয় হয়ে পড়লে কারও জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রু সংরক্ষিত থাকে না। তাই ইসলামে একে 'সুহত' আখ্যা দিয়ে কঠোরতর হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।

৭৪৮। এই আয়াতে রাসূল-কে অবহিত করে দেয়া হয়েছে যে, যারা অবিশ্বাসী (ইহুদীরা) তারা আন্তরিকতার সাথে আপনাকে বিচারক নিযুক্ত করছে না। এটা তাদের এক ধরণের ছলাকলা মাত্র। তাদের নিয়তে গোলমাল আছে। পরবর্তীতে বলা হয়েছে যে আপনি ইচ্ছা করলে তাদের বিচার করুণ নতুবা নির্লিপ্ত থাকুন।

৪৩। কিন্তু কেন তারা তোমার নিকট বিচার নিষ্পত্তির জন্য আসে, ৭৪৯, যখন তাদের নিকট [তাদের নিজেদের] আইন [তওরাত] রয়েছে ? যেখানে রয়েছে আল্লাহ্‌র [স্পষ্ট] আদেশ। এর পরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। নিশ্চয়ই তারা অকৃত্রিম ঈমানদার নয়।

৭৪৯। এই আয়াতে বলা হয়েছে ইহুদীদের প্রতি তওরাত কিতাব নাজেল করা হয়েছে যাতে আল্লাহ্‌র সমস্ত বিধানই দেওয়া আছে। এবং নির্দেশ দান করা হয়েছে সেই অনুযায়ী ন্যায় বিচার করা। ইহুদীরা রাসূলকে (সাঃ) বিশ্বাস করে না তবুও তাঁর কাছে বিচারের জন্য আসে এর কারণ কি ? এর কারণ (১) তারা তা করে রাসূলকে (সাঃ) হাস্যম্পদ করার নিমিত্তে অথবা (২) অন্যায়ভাবে রাসূলের (সাঃ) সমর্থন লাভের আশায়। কারণ ইহুদীরা সর্বদা তাদের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থের বিধানকে নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তন করে থাকে। স্বার্থ বিরোধী হলেই তারা ন্যায় বা নীতির ধার ধারে না। কিন্তু আমাদের রাসূল ন্যায়ের ব্যাপারে যেই-ই হোক না কেন, ছিলেন অটল।

রুকু - ৭

৪৪। নিশ্চয়ই আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম [মুসার নিকট], তাতে ছিলো পথ নির্দেশ এবং আলো ৭৫০। নবীগণ যারা আল্লাহ্‌র প্রতি অনুগত ছিলো [ইসলামে], তারা ইহুদীদের তদনুসারে বিচারপূর্বক মীমাংসা করতো; রাব্বানীগণ ৭৫১ এবং বিদ্বানগণও মীমাংসা করতো। কারণ তাদেরকে আল্লাহ্‌র কিতাব রক্ষক করা হয়েছিলো। এবং তারা ছিলো তার সাক্ষী ৭৫২। সুতরাং মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রী করো না ৭৫৩। এবং কেউ যদি আল্লাহ্‌ প্রেরিত বিধান অনুযায়ী বিচার মীমাংসা করতে সক্ষম না হয় তবে তারা কাফির বা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী [থেকে উন্নত নয়]।

৭৫০। 'Guidance' বা 'পথ' নির্দেশ বা 'হেদায়েত' হচ্ছে আল্লাহ্‌র নির্দেশিত পথে জীবন যাপন প্রণালী বা শুদ্ধ জীবন যাপন প্রণালী বা "Conduct of life"। 'আলো' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টির পরিবর্তে। আল্লাহ্‌র নির্দেশিত পথে, শুদ্ধ ও পবিত্র জীবন যাপনের ফলে আত্মার ভিতরে জন্ম নেয় বিবেক (wisdom) এবং অন্তর্দৃষ্টির (Spiritual insight)। এই বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টিই হচ্ছে আল্লাহ্‌র নূর যা তার আত্মাকে করে আলোকিত। এই আলোকিত আত্মা হচ্ছে ঈমানের উচ্চতর অধিষ্ঠান। এই আলোকিত আত্মায় ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা থাকে অত্যন্ত স্পষ্ট, সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ সনাক্ত করার ক্ষমতা থাকে অনন্য। আত্মার ভিতরে আল্লাহ্‌র নূরে এ সব সনাক্তকরণ তাদের জন্য হয় অত্যন্ত সহজ।

৭৫১। 'Rabbani' আরবী শব্দটি ইহুদীদের ভাষায় 'Rabbi' নামে পরিচিত। ইহুদীদের মধ্যে যারা ধর্ম সম্পর্কে বিজ্ঞ ও সুধীজন তাঁদের বলা হতো রাব্বী।

৭৫২। আল্লাহ্‌র কিতাব ও সত্যের প্রচারের জন্য বিদ্বান ও রাব্বানীগণকে সাক্ষীস্বরূপ করা হয়েছিল। দেখুন [২ : ১৪৩] এবং আয়াত [৪ : ১৩৫]।

৭৫৩। এই আয়াতে ইহুদীদের সম্পর্কে দুইটি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে : (১) ইহুদীরা তওরাতের ভুল ব্যাখ্যা করতো। এ কাজ তারা করতো তাদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য। কারণ তারা পৃথিবীর জীবনকে পরকালের জীবন অপেক্ষা বেশী গুরুত্ব দিত এবং আল্লাহ্‌ অপেক্ষা সামাজিক জীবনের রীতিনীতিকে বেশী ভয় করতো। (২) হযরত মুসা যে কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিলেন (তওরাত) ইহুদীরা সেই গ্রন্থের সাথে নিজেদের রচনা, বহু ঐতিহাসিক কাহিনী বা গল্প বা কবিতার মিশ্রণ ঘটায়। কোরানে বর্ণিত তওরাত, যা হযরত মুসার কাছে প্রেরিত ও বর্তমান ওল্ড টেষ্টামেন্টের মধ্যে খুব কমই মিল আছে। ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থের বিকৃতির দরুণ মূল গ্রন্থের বাণী ও সৌন্দর্য্য খুব কমই সঠিক আছে। ওল্ড টেষ্টামেন্টের প্রথম পাঁচটি বই [Pentatench] যাতে বিধান সমূহ বর্ণিত আছে - তাতে অনেক কল্প কাহিনী সংযুক্ত করা হয়েছে।

৪৫। আমি উহাতে তাদের জন্য বিধান দিয়েছিলাম ৭৫৪। জীবনের বদলে জীবন, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম। কিন্তু কেহ যদি দান হিসেবে প্রতিশোধকে ক্ষমা করে, তবে তা হবে তার জন্য [নিজের] পাপের প্রায়শ্চিত্ত ৭৫৫। এবং কেহ যদি আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে বিচার মীমাংসা করতে অসমর্থ হয় তবে তারা জালিম বা অত্যাচারীদের [থেকে উন্নত নয়] ৭৫৬।

৭৫৪। এই আয়াতে তওরাতের উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে 'কিসাসের' বিধান তওরাতেও আছে। এখানে 'উহাতে' অর্থাৎ তওরাতের কথা বলা হয়েছে।

'কিসাস' বা প্রতিশোধের যে বিধান ইহুদীদের দেয়া হয়েছে তাExod xxi, 23-25; Leviticus xxiv 18-21; Ges Deut, xiv 21-তে বর্ণিত হয়েছে। এই তিনটি গ্রন্থের বর্ণনার মধ্যে কোথাও দয়া প্রদর্শনের উল্লেখ নাই। লক্ষ্য করুণ [Matt v 38]-তে হযরত ঈসা কিসাসের পুরানো বিধানের উল্লেখ করেছেন, "প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ" ইত্যাদি এবং পরিবর্ধন করে "কিসাসকে" বা প্রতিশোধকে ক্ষমা প্রদর্শনের সাথে যুক্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে কোরানের বিধান আরও বেশী বাস্তবধর্মী। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি যদি ক্ষমা প্রদর্শন করেও তবুও রাষ্ট্র পরিচালনাকারী ব্যক্তিবর্গ ঐ হত্যাকারী বা অত্যাচারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতাবান। কারণ সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নিমিত্তে অনেক সময়ে অত্যাচারিত ক্ষমা করা সত্বেও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আছে। কারণ অত্যাচারিতের অত্যাচারের ফলে শুধুমাত্র যে অত্যাচারিত ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা নয়, তার সদূর প্রসারী প্রভাব সমাজ জীবনের উপরেও পড়ে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়ঃ কেউ কাউকে হত্যা করলো। নিহিত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজন খুনীকে মাপ করে দিল। খুনী নির্ব্বিঘ্নে সমাজ জীবনে পদচারণা করতে থাকলো। ফলে সমাজে এর বহুবিধ প্রভাব বিস্তার করতে পারে; এবং পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে এর প্রভাবে এরকম ঘটনার আরও প্রসার ঘটতে পারে। এই কথাটি আয়াত [৫ : ৩২]-তে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে "কেহ কাহাকেও হত্যা করিল, সে যেনো দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করিল"।

৭৫৫। হযরত মুসার আইনে প্রতিশোধ সম্পর্কে যা ছিল তা বর্ণনা করা হয়েছে এই আয়াতের প্রথমার্ধ্বে। ক্ষমার অংশটুকু হযরত মুসার আইনে নাই। ক্ষমা করার অংশ আছে হযরত ঈসার এবং হযরত মুহম্মদের (সাঃ) এর নিকট প্রেরিত কিতাবে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে 'কিসাস' বা প্রতিশোধের নিয়মাবলী কিভাবে যুগের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে হযরত ঈসা এবং শেষে কোরআন শরীফের শিক্ষাতে এর সমাপ্তি লাভ করে।
৭৫৬। আয়াত ৪৪, ৪৫ এবং ৪৭ এর শেষে যথাক্রমে "সত্য প্রত্যাখ্যানকারী" বা কাফের এবং "জালিম" বা অত্যাচারী এবং সত্যত্যাগী বা "ফাসেক" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইহুদীরা অন্যায়ভাবে ধর্মগ্রন্থের পরিবর্তন করে, সুতরাং তারা অবিশ্বাসী বা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। তারা তুচ্ছ মূল্যে অর্থাৎ পৃথিবীর সামান্য লাভ লোকসানের বিনিময়ে আল্লাহ্‌র শ্বাসত বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং তারা অবিশ্বাসী। যদি তারা বিচারের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র বিধানকে অস্বীকার করে, তবে তারা "জালিম" বা অত্যাচারী। খৃষ্টানদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তারা আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী বিধান দেয় না। সুতরাং তারা সত্যত্যাগী বা বিদ্রোহী। শব্দ তিনটি সমার্থক মনে হলেও এর প্রয়োগ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সমার্থক নয়। আয়াতগুলির পরিপ্রেক্ষিতে শব্দগুলির প্রয়োগের তারতম্য ঘটেছে।

৪৬। এবং তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থক রূপে আমি মারইয়াম পুত্র ঈসাকে প্রেরণ করি। আমি তাঁর নিকট উপদেশাবলী [ইঞ্জিল] প্রেরণ করেছিলাম। সেখানে ছিলো পথের নির্দেশ ও আলো ৭৫৭; এবং [তা ছিলো] তাঁর পূর্বে প্রেরিত আইনের [তাওরাতের] সমর্থন। যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করে তাদের জন্য [তা] পথনির্দেশ এবং সতর্কবাণী।

৭৫৭। "Guidance & light" বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে, "পথের নির্দেশ ও আলো।" দেখুন টীকা ৭৫০।

৪৭। ইঞ্জিলের অনুসারীগণ যেন আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুসারে বিচার মীমাংসা করে। যদি কেহ আল্লাহ্‌ [যে আলো] অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী বিচার মীমাংসা করতে সমর্থ না হয় তবে তারা ফাসেক বা সত্য ত্যাগকারীদের [বা বিদ্রোহীদের] থেকে উন্নত নয় ৭৫৮।

৪৮। আমি তোমার নিকট সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবকে সমর্থন করে এবং নিরাপদে রক্ষা করে ৭৫৯। সুতরাং আল্লাহ্‌ তোমার নিকট যা অবতীর্ণ করেছেন, সেই অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করো এবং যে সত্য তোমার নিকট এসেছে তা থেকে বিপথগামী হয়ে তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেক [সম্প্রদায়ের] জন্য আইন [শরীয়ত] ও স্পষ্ট পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি ৭৬০। যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদের এক জাতিতে পরিণত করতে পারতেন ৭৬১। কিন্তু [তাঁর পরিকল্পনা হচ্ছে] তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তদানুযায়ী তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং জাতি হিসেবে গুণাবলীর [অর্জনের] জন্য সংগ্রাম কর। তোমাদের সকলের শেষ লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র নিকট প্রত্যাবর্তন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছিলে সে বিষয়ের সত্য সম্বন্ধে তিনি তোমাদের [শেষ বিচারের দিনে] অবহিত করবেন ৭৬২।

৭৫৯। পূর্ববর্তী ঐশী কিতাব সমূহ সময়ের ব্যবধানে বিকৃত হয়ে যায়। পবিত্র কোরান নাজেল হয় দু'টো উদ্দেশ্যে। (১) আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে পরিপূর্ণ সত্যভাবে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপনের জন্য। (২) এবং এই বাণীকে অবিকৃত ভাবে সংগৃহীত করা। এর বিকৃত ব্যাখ্যাকে প্রতিরোধ করা। পবিত্র কোরান, পূর্ববর্তী সমস্ত ঐশী গ্রন্থের নির্দেশ ও ধর্মগ্রন্থ সমূহও আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রেরিত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এর নির্দেশ সমূহ বিকৃত হয়ে যায়। কোরানও সেই একই স্রষ্টার কাছ থেকে আগত এবং পূর্ববর্তী গ্রন্থের যে নির্দেশ; তাঁকে আল্লাহ্‌ হারিয়ে যেতে দেন নাই কোরানের মাধ্যমে। কোরানকে তাই বলা যায় পূর্ববর্তী ঐশ্বরিক বিধান সমূহের সাক্ষী স্বরূপ। পূর্ববর্তী গ্রন্থের [তওরাত ও ইঞ্জিল] ব্যাপারে কোরান যা বলে তা আল্লাহ্‌র বাণী - তাই একমাত্র সত্য। কারণ আর সবই হচ্ছে মানুষের রচনা বা মানুষ কর্তৃক বিকৃত সাধন করা হয়েছে।

৭৬০। 'Shir'at' বা Law or rules of Practical conduct. জীবনের পথ চলার নির্দেশ বা আইন। Minhaj বা Open way বা স্পষ্ট পথ - যা আমরা রাসূলের জীবনী থেকে শিক্ষা পাই।

৭৬১। আদিতে পৃথিবীকে মানুষ একজনই ছিলেন। হযরত আদম ও বিবি হাওয়া [দেখুন ২:২১৩ ও ৪:১ আয়াত]। যদি আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হতো তবে পৃথিবীতে আদমের বংশধরদের এক জাতি এক ভাষা এক সংস্কৃতি বিশিষ্ট করে রাখতে পারতেন। এমন কি সারা পৃথিবীতে একই আবহাওয়ার সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্‌ অসীম জ্ঞানের অধিকারী, তিনি পৃথবীতে বৈচিত্রের সৃষ্টি করেছেন। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে। পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে শুধুমাত্র তাদের চেহারা, ভাষা বা সংস্কৃতিতে পার্থক্য তাই-ই নয় - সম্পদ, সুযোগ, সুবিধা সবেরই বৈচিত্র বা বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। যুগে যুগে, কালে-কালে এই বিভিন্নতা স্থান ভেদে পরিবর্তিত হয়। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, এ সমস্তই আল্লাহ্‌ করেছেন মানুষের পরীক্ষার জন্য।

৭৬২। এই আয়াতে ধর্ম সম্পর্কে বিভেদকারীদের বলা হয়েছে যে, সকল বিভেদের অবসান ঘটবে শেষ বিচারের দিনে পৃথিবীর বিচারে মিথ্যা ভাষণ বা মতদ্বৈত যত চটকদার, উদ্দীপ্ত বা অলংকার পূর্ণ হোক না কেন শেষ বিচারের দিনে সেগুলোর কোনও মূল্য থাকবে না। সেদিন যা সত্য তাই-ই হবে একমাত্র ভাস্বর।

৪৯। এবং এই [আল্লাহ্‌র আদেশ] : আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন, সে অনুযায়ী তাদের মাঝে বিচার মীমাংসা করো। তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না। আল্লাহ্‌ তোমাকে যা দিয়েছেন তা [সেই শিক্ষা] থেকে যাতে তারা তোমাকে প্রতারিত করতে না পারে, [সে ব্যাপারে] তাদের সম্বন্ধে সতর্ক হও। এবং যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রাখ তাদের কোন কোন পাপের জন্য আল্লাহ্‌ তাদের শাস্তি দিতে চান। প্রকৃত পক্ষে অধিকাংশ মানুষই সত্য ত্যাগী বা বিদ্রোহী।

৫০। তবে কি তারা অন্ধকার যুগের বিচার মীমাংসার [বিধান] কামনা করে ? নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ্‌ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর বিচার মীমাসংসার [বিধান] দিতে পারে ? ৭৬৩।

৭৬৩। রাসূলের আবির্ভাবের পূর্বে সমগ্র আরবে জাহেলিয়াতের যুগ বিরাজ করতো। জাহেলিয়াতের যুগে - অর্থাৎ গোষ্ঠিগত শত্রুতা, বংশগত দ্বন্দ্ব, সামন্ত তান্ত্রিকতা, স্বার্থপরতা, মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ সমগ্র বিশ্ব অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। সুস্থ মানসিক বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ সমাজ থেকে হয়েছিল অন্তর্হিত। ইসলামের মূল সত্যই ছিল সমাজ থেকে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করে সমাজে ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ দূর করা। সাম্য ও ভাতৃত্বের উপরে সামাজিক বন্ধন স্থির করা। যদি আমাদের ঈমানে থাকে দৃঢ়তা যা এখানে বলা হয়েছে "নিশ্চিত বিশ্বাস"; তবে সর্বশক্তিমান আমাদের অন্তরে সঠিক বিধান দান করবেন এবং সঠিক পথের নির্দেশ দান করবেন।

রুকু - ৮

৫১। হে মুমিনগণ ! তোমরা ইহুদী ও খৃষ্টানদের বন্ধু এবং অভিভাবক রূপে গ্রহণ করো না ৭৬৪। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু এবং অভিভাবক। এবং তোমাদের মধ্যে যে কেহ তাদের [বন্ধু এবং অভিবাবকরূপে] গ্রহণ করবে, সে তাদেরই একজন হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অন্যায়কারীকে [সুপথে] পরিচালিত করেন না।

৭৬৪। এই আয়াতে বলা হয়েছে ইহুদী বা খৃষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতে। বিপদে লোকে বন্ধুদের কাছে সাহায্য, সহযোগীতা ও সান্ত্বনার জন্য হাত বাড়ায়। ইহুদী ও খৃষ্টানদের কথা বলা হয়েছে যে, তারা মুসলমানদের সাহায্যের পরিবর্তে বিপক্ষদলে সংঘবদ্ধ হবে, এর উদাহরণ আমরা আমাদের নবীর জীবদ্দশায় ঘটতে দেখি। কোরানের বাণী সর্বকালের, সর্বযুগের। এ বাণী যুগ ও কাল অতিক্রান্ত। মুসলমানদের বিরুদ্ধে খৃষ্টানদের সংঘবদ্ধ বিরোধীতা শুধু যে আমাদের নবীর সময়েই ঘটেছে তাই-ই নয়। এর পরেও বহুবার এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এই বিংশ শতাব্দীতেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নাই। যারা সামান্য ইতিহাসে জ্ঞান রাখেন তারা এর সত্যতা সমর্থন করবেন। যদি কেউ আল্লাহ্‌র সতর্কতা অগ্রাহ্য করে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করে, তবে সে তাদেরই একজন রূপে গণ্য হবে।

[মন্তব্যঃ বর্তমানে বিশ্বে ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০০১ সনের টুইন টাওয়ার ভাঙ্গার ঘটনার পরে এ সত্য প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

৫২। যাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি [মোনাফেকী] ৭৬৫ রয়েছে তুমি দেখবে কিরূপ উদ্দেশ্য বিহীন ভাবে তারা নিজেদের মধ্যে ছুটোছুটি করে এবং বলে : "আমরা আশংকা করি যে ভাগ্য পরিবর্তন আমাদের বিপর্যয় ডেকে আনবে।" আঃ ! সম্ভবতঃ আল্লাহ্‌ [তোমাকে] বিজয় দান করবেন, অথবা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোন সিদ্ধান্ত দেবেন। তখন, তারা তাদের অন্তরে যে চিন্তা গোপনে লালিত করেছিলো, তার জন্য অনুতপ্ত হবে।

৭৬৫। দেখুন আয়াত [২ : ১০]।

৫৩। এবং যারা মুমিন তারা বলবে, "এরাই কি সে লোক যারা আল্লাহ্‌র নামে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে তারা তোমাদের সংগেই আছে ?" ৭৬৬। তারা যা করে সবকিছুই নিষ্ফল হবে, [মোনাফেকীর জন্য] তারা [নিজের] ধ্বংসে নিমজ্জ্বিত হবে।

৭৬৬। মোনাফেকদের বৈশিষ্ট্য এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। যখন তারা বিজয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়, তখন তারা এমন ভান করে যে তারা মুসলমানদের বন্ধু, তাদের সাথে রয়েছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, তাদের সখ্যতা তাদের শত্রুদের সাথে। আল্লাহ্‌ যখন মুসলমানদের জন্য বিজয় দান করলেন, তখন এই সব মোনাফেকেরা বিশৃঙ্খল ও হতবুদ্ধি অবস্থায় পড়ে যায়। কারণ তাদের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করে মুসলমানেরা তাদের ভৎর্সনা করে এই বলে যে "এরাই কি সে লোক যারা আল্লাহ্‌র নামে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে তারা তোমাদের সংগেই আছে।" মোনাফেকদের বন্ধুত্বের কোনও মূল্য নাই। বিপদে কখনও তারা বন্ধুর পাশে দাঁড়ায় না। কারণ তাদের অন্তরে ব্যাধি। এ শিক্ষা রাসূলের (সাঃ) সময়ে যেমন প্রযোজ্য ছিল, এত বছর পরে আজও সমভাবে প্রযোজ্য। মোনাফেক বা মিথ্যাবাদীরা কখনও সত্যিকারের বন্ধু নয়।

৫৪। হে মুমিনগণ ! তোমাদের মধ্যে কেহ যদি [ধর্মীয়] বিশ্বাস থেকে ফিরে যায়, শীঘ্রই আল্লাহ্‌ এক সম্প্রদায় তৈরী করবেন যাদের তিনি ভালোবাসেন, যেমন তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা হবে মুমিনদের প্রতি কোমল, কাফেরদের প্রতি কঠোর; আল্লাহ্‌র রাস্তায় যুদ্ধ করবে এবং কখনও পরচ্ছিদ্রান্বেষীর নিন্দার ভয় করবে না ৭৬৭। ইহা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি তা দান করেন। এবং আল্লাহ্‌ সবকিছুকে ঘিরে থাকেন। এবং তিনি সবকিছু জানেন।

৭৬৭। "প্রকৃত পক্ষে অধিকাংশ মানুষই সত্যত্যাগী বা বিদ্রোহী" [৫ : ৪৯] আয়াত। এই বাক্যটি সার্বজনীন। অর্থাৎ এই বাক্যটি ইহুদী, খৃষ্টান, মুসলমান সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। মুসলমানদের মধ্যেও এমন অনেকে আছে যারা স্বধর্ম ত্যাগী। যদিও ইসলাম মানব ধর্ম, জীবনের ধর্ম, যুক্তি-সঙ্গত ও ন্যায়-নীতির ধর্ম, তবুও মুসলমানদের ক্ষেত্রেও উপরের কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। তাই এখানে মুসলমানদের আল্লাহ্‌ পূর্বাহ্নেই সাবধান করেছেন যে, মুসলমানেরা যেন ইহুদীদের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না করে। তারা যেনো ইহুদীদের মত স্ব-মহিমায় আত্মতৃপ্ত, উদ্ধত, অহংকারী না হয়। এই উদ্ধত ও অহংকারী মনোভাব ইহুদীদের আল্লাহ্‌র শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ মুসলমানদের সাবধান করে দিয়েছেন যে, যদি তারা ইহুদীদের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে তবে ক্ষতি হবে তাদেরই - আর কারও নয়। এ কথা যেনো ইহুদীদের মত কেউ না ভাবে যে আল্লাহ্‌র নেয়ামত শুধুমাত্র বিশেষ শ্রেণীর বা জাতির লোকের জন্য বরাদ্দ। আল্লাহ্‌র নেয়ামত বা করুণা তাদের জন্যই - যারা আল্লাহ্‌র শিক্ষাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে। আল্লাহ্‌র শিক্ষা কি ? আল্লাহ্‌র শিক্ষা হচ্ছে আল্লাহ্‌র কিতাব - কোরান যা আজ পর্যন্ত অবিকৃত। এই কোরানের শিক্ষাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। যারা এই শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করতে পারে, তারা আল্লাহ্‌র নেয়ামতে ধন্য হয়। তাদের অবস্থান সফলতার স্বর্ণ শিখরে। ইসলামের যে মূলনীতি বা সারমর্ম তার থেকে যদি মুসলমানদের পতন ঘটে তবে তাদের অবস্থা - হবে ঐ ইহুদীদের মতই। শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং এর মূলনীতি বা সারমর্মকে অনুধাবন করে নিজের জীবনে যদি তার প্রতিফলন ঘটাতে পারে তবে আল্লাহ্‌র নেয়ামত তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট।

ধর্মের মূলনীতি বা সারমর্মকে এই আয়াতে দু'ভাবে উপস্থান করা হয়েছে। (১) প্রথমতঃ এই সব মোমেন বান্দারা আল্লাহ্‌কে ভালোবেসে, আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন; (২) দ্বিতীয়তঃ এ সব মোমেন বান্দার লক্ষণ হচ্ছে : নিজ গোত্রে এরা হচ্ছেন অত্যন্ত বিনয়ী। এখানে গোত্র অর্থাৎ মোমেন বান্দাদের সমগোত্রীয় বলা হয়েছে। শুধুমাত্র মুসলমান নাম সর্বস্ব হলেই তারা সমগোত্রের হতে পারে না। অর্থাৎ মোমেন বান্দা আল্লাহ্‌কে ভালোবাসেন, তারা পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও বিনয়ী, কিন্তু তাঁরা অন্যায়কারীদের জন্য অত্যন্ত কঠোর। তাঁরা সর্বদা ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে পিছ-পা হবেন না। কারণ ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই হচ্ছে আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ। এই জিহাদের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সাহসী। পৃথিবীর কোনও ক্ষতি বা কোনও অপবাদ তাদেরকে এই জিহাদ থেকে চ্যুত করতে পারে না। "পরচ্ছিদ্রান্বেষার নিন্দার ভয় করবে না।" যারা আল্লাহ্‌র রাস্তায় যুদ্ধ করে, তারা বৃহত্তর নীতির বা মূল্যবোধের কারণে যুদ্ধ করে। পৃথিবীর নিন্দা বা গ্লানি বা স্তুতি কিছুই তাঁদের স্পর্শ করে না, তারা এসব কিছুর উর্ধ্বে। যেমন- পরের আয়াতে বলা হয়েছে এসব মোমেন বান্দার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ্‌; আল্লাহ্‌র নবী ও রাসূল, আল্লাহ্‌র বান্দারা; যারা ন্যায়ের পথের সাহসী সৈনিক। সুতরাং এসব মোমেন বান্দার সাফল্য অনিবার্য।

৫৫। তোমাদের [প্রকৃত] বন্ধু তো আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ - যারা নিয়মিত সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয় এবং বিনয়ে অবনত হয় [আল্লাহ্‌র ইবাদতে]।

৫৬। যারা আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণকে [বন্ধুরূপে] গ্রহণ করে - এরাই হল আল্লাহ্‌র দল যারা অবশ্যই বিজয় লাভ করবে।

৫৭। হে মুমিনগণ ! তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অথবা যারা কাফের, তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে হাসি ঠাট্টা অথবা খেলাধূলার বিষয়বস্তুরূপে গ্রহণ করে, তাদের তোমরা বন্ধুরূপে অথবা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না ৭৬৮। যদি তোমরা [প্রকৃত] মুমিন হও তবে আল্লাহ্‌কে ভয় কর।

৭৬৮। যারা ধর্মভীরু তারা অবশ্যই বন্ধুত্বের ব্যাপারে সাবধানী হবে। যারা ধর্মকে হালকাভাবে গ্রহণ করে অথবা ধর্মীয় বিধিবিধানকে ঠাট্টা তামাসার বিষয়বস্তু বলে গণ্য করে, তাদের সাথে বন্ধুত্বের ফলে খুব সহজেই তারা তাদের ধ্যান ধারণার প্রভাব অন্যের উপরে বিস্তার করতে পারে। বন্ধুত্বের মাধ্যমে, ভালোকে মন্দ, বিশ্বাসীকে অবিশ্বাসীতে পরিণত করা সহজ। দীর্ঘদিনের সহচার্য ও সঙ্গের ফলে একে অন্যের উপরে খুব সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই কথাটিই বাংলা প্রবাদে এভাবে বলা হয়েছে, "সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।"

৫৮। যখন তোমরা সালাতের জন্য আহবান কর, তখন তারা তা হাসি ঠাট্টা অথবা খেলাধূলার বিষয়রূপে গণ্য করে। এর কারণ হচ্ছে তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের [কোন কিছু] বোঝার ক্ষমতা নাই।

৫৯। বল, "হে কিতাবীগণ আমরা আল্লাহ্‌তে এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে তাতে ঈমান এনেছি। একমাত্র এই কারণেই কি তোমরা আমাদের অনুমোদন কর না ? তোমাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী বিদ্রোহী এবং অবাধ্য ৭৬৯।

৭৬৯। এই আয়াতে এবং পরবর্তী আয়াতে [৫ : ৫৯, ৬০] যারা সত্য-ত্যাগী তাদের বিদ্রুপাত্মক ভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। তারা সত্য-ত্যাগী এবং মুসলমানদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ন এই কারণে যে, মুসলমানেরা আল্লাহ্‌ তাঁদের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন (অর্থাৎ কোরান) তা, এবং পূর্ববর্তী রাসূলদের নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত ও ইঞ্জিল) তা বিশ্বাস করে। এই হচ্ছে সত্য-ত্যাগীদের শত্রুতার কারণ। এসব সত্য-ত্যাগীদের জন্য আল্লাহ্‌র অভিসম্পাত; যা তাদের ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত আছে। [See Dent xi 28, and xxviii 15-68 and numerous passages like Hosea viii 14 and ix 1]. আল্লাহ্‌র অভিসম্পাত কার উপরে [See numerous passages like Dent i. 34; Matt iii 7] কারা আল্লাহ্‌কে ত্যাগ করেছিল এবং পাপে আসক্ত হয়েছিল ? [See Jeremiah xvi, 11-13] উপরের যে নথী সংযুক্ত করা হোল, এগুলি সত্য-ত্যাগীদেরই লিপিবদ্ধ নথী। এসব কারণেই কি সত্য-ত্যাগীরা মোমেন মুসলমানদের ঘৃণা করে ?

৬০। বল, "আমি কি তোমাদের এর থেকেও নিকৃষ্ট কিছুর সংবাদ জানাবো যা আল্লাহ্‌র নিকট থেকে [প্রাপ্য] তুল্য বিনময় ? যারা আল্লাহ্‌র অভিশাপ এবং ক্রোধকে গ্রহণ করেছে, যাদের কতককে তিনি বানর এবং শূকরে পরিবর্তন করেছেন ৭৭০, যারা তাগুতের [অশুভ শক্তির] পূঁজা করে; - মর্যাদায় তারা [বহুগুণ] নিকৃষ্ট এবং সরল পথ থেকে তারা বহুদূরে বিচ্যুত।"

৭৭০। বানর সম্পর্কে দেখুন আয়াত [২ : ৬৫]। শয়তান কর্তৃক প্রাপ্ত লোক শূকরে পরিবর্তিত হয়। দেখুন [Matt viii 28-32]।

৬১। যখন তারা তোমার কাছে আসে তারা বলে, "আমরা ঈমান এনেছি।" কিন্তু তারা অবিশ্বাসী মন নিয়ে প্রবেশ করে এবং তা নিয়েই ফিরে যায়। তারা যা গোপন রাখে আল্লাহ্‌ তা পরিপূর্ণ ভাবে অবহিত।

৬২। তাদের অনেককেই তুমি পাপে ও হিংসা বিদ্বেষে এবং অবৈধ ভক্ষণে ৭৭১ প্রতিযোগীতা করতে দেখবে। তারা যা করে অবশ্যই অশুভ ক্ষতিকর।

৭৭১। "অবৈধ ভক্ষণ" - এই বাক্যটি আক্ষরিক ও আলংকারিক দ্বৈত অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। আক্ষরিক অর্থে হারাম জিনিস যা আল্লাহ্‌ নিষেধ করেছেন তা খাওয়া, আলঙ্কারিক অর্থে জোচ্চুরী ও অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পত্তি গ্রাস করা বা ঘুষ খাওয়া বা অন্যায় ভাবে অর্থ আত্মসাৎ করা যা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর। দেখুন টিকা ৭৪৭।

৬৩। রাব্বানীগণ এবং পন্ডিতগণ কেন তাদের পাপ কথা বলতে এবং অবৈধ ভক্ষণের [অভ্যাস] থেকে বিরত করে না ? তাদের কাজ অবশ্যই অশুভ ক্ষতিকর।

৬৪। ইহুদীরা বলে, " আল্লাহ্‌র হাত বাঁধা ৭৭২।" তাদেরই হাত বাঁধা হোক এবং [তাদের আল্লাহ্‌র প্রতি নিন্দা বাক্যের জন্য] তারা অভিশপ্ত হোক। না বরং আল্লাহ্‌র উভয়ই হস্তই প্রসারিত। তিনি [তাঁর অনুগ্রহ] যেভাবে খুশী দান এবং খরচ করেন। কিন্তু তোমার নিকট আল্লাহ্‌র তরফ থেকে যে প্রত্যাদেশ এসেছে তা তাদের ধর্মদ্রোহীতা ও কুফরী বৃদ্ধি করবে ৭৭৩। তাদের মধ্যে আমি শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত শত্রুতা ও বিদ্বেষ স্থায়ী করেছি ৭৭৪। যত বার তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্জ্বলিত করে ততবার আল্লাহ্‌ তা নির্বাপিত করেন। কিন্তু তারা [সকল সময়ে] দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য চেষ্টা করে। যারা ধ্বংসাত্মক কার্য করে আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন না ৭৭৫।

৭৭২। আয়াত [৫ : ১২] এবং [২ : ২৪৫]-তে উল্লেখ আছে " আল্লাহ্‌কে উত্তম ঋণ প্রদান কর" এবং আয়াত [৩ : ১৮১]-তে ইহুদীদের বিদ্রুপাত্মক উক্তি যা আল্লাহ্‌কে লক্ষ্য করে, তাঁর উল্লেখ আছে। সেখানে তারা বলে," আল্লাহ্‌ অভাবগ্রস্থ।" এই আয়াতে [৫ : ৬৪] অন্য আর এক ধরণের বিদ্রুপাত্মক কথার উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বলে, " আল্লাহ্‌র হাত বাঁধা।" আল্লাহ্‌ অসীম রহমতের মালিক - বিশ্বভূবন তাঁর রহমতে অবগাহন করে আপ্লুত। এ যেনো দু'হাত উপচে পরা বিতরণ। " আল্লাহ্‌র উভয় হস্তই প্রসারিত।"

৭৭৩। আল-মুস্তাফার (সাঃ) আবির্ভাব ইহুদীদের মনে হিংসার আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছিল। এ আগুন এত তীব্র ছিল যে তা তাদের ধর্মদ্রোহীতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৭৭৪। আয়াত [৫ : ১৪]-তে খৃষ্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং ইহুদীদের প্রতি, চিরস্থায়ী অনাদি অনন্তকাল ব্যাপী সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। এই নির্দেশ সকল কিতাবধারী জাতিদের জন্যই প্রযোজ্য। ইহুদী ও খৃষ্টান - তাদের নিজেদের ভিতরে মতদ্বৈত, কলহ, বিবাদ-বিসংবাদ সবই হবে চিরস্থায়ী। হাশরের দিন পর্যন্ত তা হবে স্থায়ী।
৭৭৫। পুরো আয়াতটির সার-সংক্ষেপ এভাবে করা হয়েছে। ইহুদীরা খোদাদ্রোহীতার অভিযোগে অভিযুক্ত, তারা আল্লাহ্‌কে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে; এর একটাই কারণ তারা আল-মুস্তফার (সাঃ) আগমনে অত্যন্ত হিংসা অনুভব করেছিল। এই হিংসার আগুন তাদেরকে আরও অবাধ্য এবং বিদ্রোহী করেছিল। এ কথা তারা বুঝতে অক্ষম ছিল যে তাঁদের হিংসার ফলে মহান আল্লাহ্‌ তায়ালার কোনও ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। কারণ তিনি এত মহৎ, এত সুউচ্চ, যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাকে অভিযুক্ত করা অসম্ভব। অপরক্ষে তাদের এই স্বার্থপরতা, হিংসা তাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদের বীজ বপন করবে - এই-ই আল্লাহ্‌র বিধান। তাদের এই দ্বন্দ্ব-কলহ, মতদ্বৈত, ঝগড়া অনন্তকাল শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত স্থায়ী হবে। এরা উদ্ধত জাতি। আল্লাহ্‌র নির্দেশাবলীর দ্বারা উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে তাদের কুফর ও অবিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে তাদের বিভিন্ন দলের মধ্যে ঘোর মতানৈক্যের সঞ্চার হয়। এরা বিপথগামী, তাই এরা চেষ্টা করে অসহায় ও নির্দোষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। কিন্তু আল্লাহ্‌র রহমত ঐ অসহায় ও নির্দোষদের উপরে বন্যার পানির মত প্লাবিত করে প্রবাহিত হয় ফলে আগুন যেভাবে পানি দ্বারা নিভে যায়, ইহুদীরাও ঠিক সেভাবে প্রতিহত হয়। ইতিহাসের প্রাথমিক যুগ থেকে এ সত্য বারে বারে প্রতিভাত হয়েছে, তবুও ইহুদিদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ থেমে থাকে নাই। আল্লাহ্‌ ধ্বংসাত্মক কার্য্যে লিপ্তদেরকে ভালোবাসেন না।

উপদেশঃ হিংসা মনের শুভবুদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয়। অন্যের সাফল্য বা সমৃদ্ধিতে হিংসা না করে কারণ অনুসন্ধান করা উচিত সমৃদ্ধি ও সাফল্যের। তা না করে যারা ধ্বংসাত্মক কাজের আশ্রয় গ্রহণ করে তাদের অবস্থা ঐ ইহুদীদের মত। এ কথা ইহুদীদের জন্য যেমন প্রযোজ্য ঠিক সমভাবে প্রযোজ্য ঐ সব মুসলমানদের উপরে; যারা নিজেদের দুর্ভাগ্যের জন্য নিজেদের দোষী না করে পরচ্ছিদ্রান্বেষী এবং অপরকে ধ্বংস করার মানসে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ দ্বারা সমাজ জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। মুসলিম সমাজে যারা মুসলমান নামে নিজেদের সনাক্ত করে, কিন্তু গঠনমূলক কাজের পরিবর্তে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকে - অবশ্যই তারা আল্লাহ্‌র রহমত বঞ্চিত। ইহুদীদের উদাহরণ এক্ষেত্রে সার্বজনীন এবং সর্বকালের।

৬৫। কিতাবীগণ যদি ঈমান আনতো এবং পূণ্যাত্মা হতো, আমি অবশ্যই তাদের অন্যায়গুলি মোচন করে দিতাম এবং তাদের শান্তির উদ্যানে প্রবেশ করাতাম।

৬৬। যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জিল এবং [এখন] যে সকল প্রত্যাদেশ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে তাদের দেয়া হয়েছে তাতে তারা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতো, তাহলে তারা তাদের উপর ও পদতল থেকে আহার্য লাভ করতো, সকল দিক থেকে করতো ৭৭৬। তাদের মধ্যে একদল সঠিক পথে রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই যা করে তা অশুভ।

৭৭৬। 'Akala' আরবী শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে 'To eat' এবং বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে আহার্য। এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ এখানে উপলব্ধির মাধ্যমে অনুধাবন করতে হবে। এই আয়াতে এই শব্দটির অর্থ বুঝাতে চাওয়া হয়েছে যে উপভোগ করা। এই উপভোগ হবে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক। অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে। আয়াত [৬ : ৬২, ৬৩]-তে অবৈধ ভক্ষণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই অবৈধ ছিল আহার্য এবং সেই সাথে অন্যায়ভাবে অর্থ-সম্পদ আহরণ করা, অন্যের অধিকার হরণ করা ইত্যাদি। এই অবৈধ ভক্ষণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে কারণ এর দ্বারা ব্যক্তির ইহকাল ও পরকালের ক্ষতি সাধন হয়। ইহকালে ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ দ্বারা ব্যক্তিগত লাভ হলেও, পরকালের খাতায় তার শূন্য জমা হয়। যে আত্মিক ক্ষতি তার হয় তার যন্ত্রণা তাকে ইহকালেও শান্তিতে থাকতে দেয় না, পরকালের শাস্তিতো তার পাওনা রইল। উপরন্তু আর্থিক দিক থেকে এসব ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী ভাবে লাভবান হতে পারে, কিন্তু সমাজের যে ক্ষতি সে করে তা অপূরণীয়। সমাজের ভারসাম্য, সুখ, শান্তি ও শৃঙ্খলা এরা নষ্ট করে। ফলে এদের উপরে আল্লাহ্‌র অভিসম্পাত। সুতরাং তারা তাদের মানসিক শান্তি হারায়। এই আয়াতে 'আহার্য লাভ' করা অর্থাৎ উপভোগ করাকে বুঝাতে চাওয়া হয়েছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা আল্লাহ্‌র রহমত লাভ করবে - এবং তা উপভোগ করবে। "উপর দিক থেকে আহার্য্য লাভ করবে" এই বাক্যটির দ্বারা আল্লাহ্‌র রহমত দ্বারা আত্মিক দিক থেকে হবে পরিতুষ্ট, তাই বুঝাতে চাওয়া হয়েছে। "পদতল থেকে আহার্য লাভ করবে" এই কথাটি দ্বারা বুঝাতে চাওয়া হয়েছে যে যে দৈনন্দিক জীবনে আমাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক চাওয়া-পাওয়া থাকে এই মাটির পৃথিবীতে, অর্থাৎ পুরো বাক্যটাকে সাধারণ ভাবে বিবেচনা করলে এর সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় যে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে তারা আল্লাহ্‌র রহমত উপভোগ করবে।

রুকু - ১০

৬৭। হে রাসূল ! তোমার প্রভুর নিকট থেকে যে [বার্তা] তোমাকে প্রেরণ করা হয়েছে তা ব্যাপকভাবে প্রচার কর। যদি তুমি তা না কর, তবে তো তুমি আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজ প্রচার ও সম্পাদন করলে না। এবং আল্লাহ্‌ তোমাকে মানুষের [অনিষ্ট] থেকে রক্ষা করবেন। যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাদের সৎ পথে পরিচালিত করেন না ৭৭৭।

৭৭৭। আমাদের প্রিয় নবী ধর্ম প্রচারে বহু বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন। অনেক দুঃখ-কষ্ট তাকে সহ্য করতে হয়। অনেক বিপদ সঙ্কুল পথ তাঁকে অতিক্রম করতে হয়। আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজ তাঁকে সমাধা করতেই হবে। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ আমাদের রাসূলকে অটল ও নির্ভীক ভাবে তার নির্দেশ পালনের হুকুম দিয়েছেন। বিপদ থেকে আল্লাহ্‌র আশ্রয় প্রার্থনা করে, সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের ভয় না করে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে ভয় করে তাঁর উপরে নির্ভর করে আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্দিষ্ট কাজে অগ্রসর হওয়ার হুকুম আছে এই আয়াতে। উপদেশ : আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্যও আল্লাহ্‌র এই হুকুম কার্যকর।

৬৮। বল, "হে কিতাবীগণ ! তাওরাত, ইঞ্জিল এবং প্রত্যাদেশ সমূহ যা তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তোমরা সে অনুযায়ী কাজ না করা পর্যন্ত তোমাদের [পথ প্রদর্শনের] কোন ভিত্তি নাই।" এটাই [আল কোরান] হচ্ছে সেই প্রত্যাদেশ যা [হে মুহম্মদ] তোমার প্রভুর নিকট থেকে তোমার নিকট অবতীর্ণ করা হয়েছে, যা তাদের অধিকাংশের অবিশ্বাস এবং ধর্মাদ্রোহীতা বৃদ্ধি করবে। [এসব] অবিশ্বাসীর জন্য তুমি দুঃখ করো না ৭৭৮।

৭৭৮। [৫ : ২৬] আয়াতে হযরত মুসাকে বলা হয়েছে যে সত্য-ত্যাগীদের জন্য দুঃখ না পেতে। এই আয়াতে আমাদের নবীকে কাফিরদের অবিশ্বাসের দরুণ দুঃখ না পেতে বলা হয়েছে। কাফিররা ধর্মদ্রোহী বা সত্য-ত্যাগকারীদের (Rebellion) অপেক্ষা অধিক ভীতিকর। সত্য-ত্যাগকারীদের (Rebellion) মানসিক বিকাশ, কখনও কখনও পরিবর্তন হওয়ার আশা রাখে। কিন্তু যারা কাফের তাদের মনের সেই অবস্থা হচ্ছে অপরিবর্তনশীল। মানসিক এই অবস্থা (State of mind) থেকে মুক্তি পাওয়া তাদের অসম্ভব। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায়ের সাথে তাদের হেদায়েতের চেষ্টা করেন। এ জন্য তাঁকে বহু অপমান ও গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। কিন্তু কেউ যদি জেগে জেগে ঘুমায় তবে তাকে জাগানো সম্ভব নয়। সেই রকম কেউ যদি অবিশ্বাসকে অন্তরে গেঁথে রেখে যুক্তি তর্কের অবতারণা করে, তবে তার পক্ষে সত্য অনুধাবন করা অসম্ভব। "তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তাদের অনেকের ধর্মদ্রোহীতা ও অবিশ্বাসই বৃদ্ধি করবে।" এই উক্তিটি দ্বারা একথাই বোঝানো হয়েছে যে পূর্ববর্তী কিতাবী জাতিদের হিংসা ও অবাধ্যতা-ই এদের সত্য গ্রহণে বড় বাঁধা।

৬৯। যারা বিশ্বাস স্থাপন করবে [আল কোরআনে], যারা অনুসরণ করবে ইহুদী [ধর্মগ্রন্থ], এবং সাবীয়ান ও খৃষ্টানগণ [এদের মাঝে] যারা বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহ্‌র একত্বের প্রতি; এবং শেষ বিচারের দিনে, এবং সৎ কাজ করবে ৭৭৯, তাদের কোন ভয় নাই, এবং তারা দুঃখিতও হবে না।

৭৭৯। এই আয়াতে [৫ : ৬৯] এবং সূরা আল-বাকারাতে [২ : ৬২] এই দুই আয়াতেই যে জিনিসটির প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি একান্ত বিশ্বাস। আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বস্ততা শুধুমাত্র কথার কথা নয়, চরিত্রের গুণগত মানের কষ্টিপাথরে তার বিশ্বাসের আন্তরিকতা যাচাই করা হবে, কাজের ভালো-মন্দ নিয়তের ভিত্তিতে। আল্লাহ্‌র কাছে হিসাবের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থাৎ তার কাজের হিসাব (accountability) এবং চরিত্রের গুণাবলী (conduct of life)-ই হবে তার পরহেজগারীর মানদন্ড। কোন গোত্র বা লেবাস বা মুখের কথায় এর মান যাচাই করা হবে না। কিতাবধারীদের দাবী যে তারাই একমাত্র আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দা। কারণ তারা হযরত ইব্রাহীমের বংশধর, এই দাবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তাদের যে দাবী ছিল যে তারাই একমাত্র আল্লাহ্‌ কর্তৃক মনোনীত। সুতরাং তারা যাই-ই করুক না কেন তারা আল্লাহ্‌র কাছে বিশেষ সুবিধা ভোগ করবেই। এই আয়াত দুটিতে তাদের এই মিথ্যা অহমিকার গোড়াতে আঘাত হানা হয়েছে। এখানে কিতাবধারীদের স্মরণ করানো হয়েছে যে আন্তরিক বিশ্বাস (Faith); এবং উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর (Righteous conduct) মাধ্যমেই একমাত্র স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়; মিথ্যা দাবীর মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায় না। এই আয়াতে বিশ্বাসের খুঁটিনাটি বিবরণ দান করা হয় নাই, বা একথাও বলা হয় নাই যে বিশ্বাসী হওয়ার জন্য সশব্দে সূরা, কালাম পড়ার প্রয়োজন। কারণ আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস ও তার রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত কোনও বাহ্যিক ঈমানই আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ্‌র দূতদের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র আদেশকে পৃথিবীর মানুষের কল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। একথা বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য শেষ নবী হযরত মুহম্মদের (সাঃ) জন্য। কারণ তার কাছে প্রেরিত আল্লাহ্‌র নির্দেশ সমস্ত বিশ্বমানবের কল্যাণের জন্য। এটা কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠি বা গোত্রের একান্ত নিজস্ব নয়। আল্লাহ্‌কে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতে হলে তার রাসূলদেরও বিশ্বাস করতে হবে এবং রাসূলদের এই তালিকায় শেষ নবী হিসেবে হযরত মুহম্মদকে (সাঃ) বিশ্বাস করতে হবে, তা না হলে তার বিশ্বাসের অকৃত্রিমতা সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যাবে। নিম্নলিখিত কোরানের আয়াত সমূহে এই সত্যকেই অনুমোদন করে। দেখুন [৪ : ১৭০], [৫ : ১৫, ১৯], [৭ : ১৫৭, ১৫৮] [২১ : ১০৭]; [২৫ : ১], [৩৩ : ৪০], [৬১ : ৬], [৩ : ৩১-৩২], [৪ : ১৫০-১৫১]-আয়াত সমূহ।

৭০। আমি বণী ইসরাঈলীদের নিকট থেকে অংগীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছিলাম। যখনই কোন রাসূল তাদের নিকট এমন কিছু আনে যা তাদের মনঃপুত নয়, [তখনই] কতককে তারা বলে ভন্ড এবং কতককে তারা হত্যা করে ৭৮০।

৭৮০। দেখুন [২:৮৭] আয়াত ও টীকা ৯১।

৭১। তারা মনে করেছিলো যে, তাদের কোন বিচার [বা শাস্তি] হবে না। সুতরাং তারা পরিণত হয়েছিলো অন্ধ ও বধিরে ৭৮১। এরপরও আল্লাহ্‌ তাদের [অনুগ্রহ] করেছিলেন, তবুও তাদের অনেকেই অন্ধ ও বধিরে পরিণত হয়েছিলো। তারা যা করে আল্লাহ্‌ তা সব ভালোভাবে দেখেন।

৭৮১। "সুতরাং তারা পরিণত হয়েছিলো অন্ধ ও বধিরে।" অর্থাৎ তারা আল্লাহ্‌র নিদর্শন থেকে তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিল - ব্যাপারটি যেনো চোখ থাকতেও অন্ধ, এবং আল্লাহ্‌র নিদর্শন থেকে তাদের শ্রবণশক্তিকে ফিরিয়ে নিয়েছিল, যেনো তারা বধির। একমাত্র আল্লাহ্‌ ভীতিই তাদের এরূপ অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

৭২।। তারাই কাফের যারা বলে, "মারইয়ামের পুত্র ঈসা আল্লাহ্‌।" অথচ ঈসা বলেছে, "হে বণী ইসরাঈলী, তোমরা আমার প্রভু এবং তোমাদের প্রভু, আল্লাহ্‌র ইবাদত কর।" যে কেউ আল্লাহ্‌র সাথে শরীক করবে আল্লাহ্‌ তার জন্য [বেহেশতের] বাগান নিষিদ্ধ করে দেবেন এবং তার আবাস হবে আগুন। জালিমদের জন্য সেখানে কোন সাহায্যকারী থাকবে না।

৭৩। ট্রিনিটি "তিনের মধ্যে আল্লাহ্‌ একজন" [এ কথা] যারা বলে তারা তো আল্লাহ্‌র অপমান করে, যদিও এক আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। যদি তারা তাদের বক্তব্যে [আল্লাহ্‌র অপমান] থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের উপরে ভয়াবহ শাস্তি পতিত হবে।

৭৪। কেন তারা আল্লাহ্‌র দিকে প্রত্যাবর্তন করে না ও তাঁর ক্ষমা ভিক্ষা করে না ? নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

৭৫। মারইয়ামের পুত্র ঈসা রাসূল ব্যতীত আর কিছু নয়। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। তাঁর মাতা ছিলো সত্যনিষ্ঠ ৭৮৩। তাঁরা উভয়েই [প্রতিদিন] আহার করতো [সাধারণ মানুষের মত], দেখ আল্লাহ্‌ কিভাবে আয়াত সমূহ তাদের নিকট সহজ করে দিয়েছেন ৭৮৪। অথচ দেখ কিভাবে তারা সত্য থেকে ভ্রান্ত পথে চালিত হয়।

৭৮৩। মাতা মরিয়ম কখনও দাবী করেন নাই যে তিনি আল্লাহ্‌র মাতা বা তাঁর সন্তান আল্লাহ্‌। তিনি ছিলেন পুত-পবিত্র ধর্মপ্রাণা রমণী।

৭৮৪। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হয়েছে ইহুদীদের ধর্মবিমুখিতা, খৃষ্টানদের হযরত মরিয়ম ও হযরত ঈসাকে আল্লাহ্‌র সমতুল্য জ্ঞান করা। এবং পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে পাথরের পূঁজার কথা যাদের কোনও জীবনই নাই। বারে বারে আমাদের এই সত্যের দিকে নির্দেশ দান করা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ এক এবং অদ্বিতীয়। মানুষের প্রতি তার নির্দেশও যুগে যুগে এক। মানুষ তার নিজস্ব বিকৃত চিন্তাধারার ফলে সত্যকে বিকৃত করে মিথ্যার আরাধনা করে ও কুসংস্কারের আশ্রয় গ্রহণ করে।

৭৬। বল, "তোমরা কি আল্লাহ্‌ ব্যতীত এমন কিছুর ইবাদাত কর, যাদের ক্ষতি বা উপকার করার কোনও ক্ষমতা নাই, অথচ আল্লাহ্‌ - যিনি সব কিছু শোনেন এবং জানেন।"

৭৭। বল, "হে কিতাবীগণ ! তোমাদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, [যথাযথ] সীমানা এবং সত্যকে অতিক্রম করো না ৭৮৫। যে সম্প্রদায় অতীতে পথভ্রষ্ট হয়েছে, যারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং [নিজেরা] সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে - তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না।"

৭৮৫। একজন প্রকৃত মোমেন বান্দা ও মোনাফেকের মধ্যে চিহ্নিত করার প্রধান উপায় হচ্ছে মোনাফেকেরা সর্বদা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, অপর পক্ষে মোমেন ও ধার্মিক লোকের বৈশিষ্ট্য তারা ধর্মের ব্যাপারে মধ্যপথ অবলম্বী, বিশেষতঃ মোনাফেকেরা হয় ধর্মব্যবসায়ী, ধর্মকে তাদের নিজস্ব সুযোগ সুবিধার জন্য ব্যবহার করে; অপর পক্ষে মোমেন বান্দাদের নিকট ধর্ম হচ্ছে অতি পবিত্র আমানত; অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সাথে তারা তা রক্ষা করে; সে কারণে তাদের আচরণে কোনও বাড়াবাড়ি স্থান পায় না।

বাড়াবাড়ি কথাটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় : প্রথাগত ধর্মীয় মনোভাব বা পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য - ন্যায় ও সত্যকে পদদলিত করতে এসব মোনাফেকেরা দ্বিধা বোধ করে না। এরা মিথ্যা উপাস্যের পূঁজা করে, ভূত-প্রেতের পূঁজা করে, পীর পূঁজা করে, মাজার পূঁজা করে। আল্লাহ্‌র নাম ব্যবহার করে ফতোয়া দান করে মানুষের উপরে ধর্মের নামে অত্যাচার করে। এসবই করে তাদের আত্মতৃপ্তির ও স্বার্থ রক্ষার্থে। এর সাথে আল্লাহ্‌র ইবাদাতের কোনও সম্পর্ক নাই। এরা কখনও সত্য পথের সন্ধান পায় না। ফলে এরা হয় পথভ্রষ্ট। সত্যপথ হচ্ছে সহজ ও সরল পথ। যারা পথভ্রষ্ট তাদের ধ্বংস অনিবার্য। দেখুন আয়াত [২ : ১০৮] এবং [৫ : ১৩] ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে মধ্যযুগে ইউরোপ ধ্বংসের প্রান্ত সীমায় উপনীত হয়েছিল। মুসলমানদেরও এর থেকে শিক্ষা গ্রহণের সময় এসেছে বৈকি।

রুকু - ১১

৭৮। বণী ইসরাঈলীদের মধ্যে যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো তাদের উপর দাউদ ৭৮৬ ও মারইয়ামের পুত্র ঈসার ৭৮৭ মুখ নিঃসৃত অভিশাপ উচ্চারিত হয়েছিলো। কারণ তারা ছিলো অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী।

৭৮৬। দাউদ নবীর প্রার্থনা সঙ্গীতের মধ্যে কিছু অংশ আছে যেখানে দুষ্টদের প্রতি অভিশাপ উচ্চারণ করা হয়েছে; [Psalm cix 17-18; Ixxviii 21-22] এবং [Psalm Ixix 22-28 and Psalm v. 10]

৭৮৭। দেখুন [Matt. xxiii, 33] এবং [Matt. xxiii, 34]

৭৯। [সাধারণতঃ] তারা যে সব অন্যায় অবিচার করতো তা থেকে একে অপরকে নিষেধ করতো না ৭৮৮। তারা যা করতো তা ছিলো সত্যিই অতি জঘন্য।

৭৮৮। পৃথিবীর সমস্ত দেশে সমস্ত জাতির মধ্যেই খারাপ লোক আছে। কিন্তু তারা দেশের আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এই আইনের ধারক বাহক ও রক্ষক হচ্ছে দেশের সচেতন নেতারা। কিন্তু যে সমাজে এসব নেতা বা ব্যক্তি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় বা নিজে সে ঐ অন্যায় কাজের অংশীদার হয়, সে সমাজের বা জাতির ধ্বংস অনিবার্য। উপরের আয়াতে [৫:৭৮] বলা হয়েছে "তারা দাউদ ও মরিয়ম তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিলা।" প্রাচীন ইহুদীদের মধ্যে ধার্মিক ও আচারনিষ্ঠ বলে খ্যাত ভন্ড ব্যক্তি পারিসী (Pharisees) এবং স্ক্রাইবস (Scribes) এরা ছিল সেই রকম নেতা যারা ছিল অন্তরে ভন্ড, স্বার্থপর এবং অন্যায়কারী। এদের বিরুদ্ধেই ছিল দাউদ নবী ও হযরত মরিয়মের পুত্রের অভিসম্পাত। এসব ভন্ডরা অন্যায় কাজে "একে অন্যকে বারণ করতো না।" অর্থাৎ এসব ধর্ম গুরুরা অন্যায় কাজে একে অন্যের সহযোগী ছিল। আজকের যুগেও অনুন্নত দেশ সমূহে দেখা যায় যারা নেতা, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক, তাদের মধ্যে নেতাসুলভ গুণের পরিবর্তে পারিসী ও স্ক্রাইবসের মত অন্যায় কাজে একে অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা দেখা যায়। তাদের সম্বন্ধেই পরবর্তী আয়াতে [৫ : ৮০] বলা হয়েছে।

৮০। তাদের অনেককেই তুমি কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে। প্রকৃতপক্ষেই [তাদের কাজ] অতি জঘন্য যা তারা তাদের [মৃত্যুর] পূর্বে [আল্লাহ্‌র] সম্মুখে প্রেরণ করে - যে কারণে আল্লাহ্‌ তাদের উপরে ক্রোধান্বিত হয়েছেন। এবং তাদের শাস্তি ভোগ স্থায়ী হবে।

৮১। যদি শুধুমাত্র তারা আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনতো, এবং বিশ্বাস স্থাপন করতো রাসূলে এবং তাঁর নিকট যে প্রত্যাদেশ দেয়া হয়েছে তাতে; [তাহলে] কখনও তারা তাদের বন্ধু এবং অভিভাবকরূপে গ্রহণ করতো না। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিদ্রোহী ও পাপী।

৮২। মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দেখবে ইহুদী ও মুশরিকদের। যারা বলে "আমরা খৃষ্টান" মানুষের মধ্যে তাদেরই তুমি মুমিনদের প্রতি ভালোবাসার নিকটতর দেখবে ৭৮৯। কারণ তাদের মধ্যে অনেকেই জ্ঞান অর্জনে একান্তভাবে নিবেদিত ৭৯০ এবং অনেকে সংসার পরিত্যাগ করেছে এবং তারা উদ্ধত নয়।

৭৮৯। "আমরা খৃষ্টান" - এ কথাটির দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে খৃষ্টানদের মধ্যে সেই সব ব্যক্তি, যারা শুধুমাত্র নামে খৃষ্টান নয়, বরং তাদের আন্তরিক বিশ্বাস (ঈমান), তাদের চরিত্রের গুণাবলী, তাদের কর্মপ্রণালী, তাদের জীবন ধারণ প্রণালী সবই ইঙ্গিত করে সত্যিকারের মোমেন বান্দার গুণাবলীর দিকে। ফলে তাঁরা যখন মুসলমানদের চরিত্রে ঐসব গুণাবলী দেখে তখন সেসব তাঁরা যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করে ও প্রশংসা করে। এর উদাহরণ ছিল অবেসিনিয়ার অধিবাসীরা। মক্কার নও-মুসলিমরা মুশরিকদের অত্যাচারের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য আবেসিনিয়াতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। তাদের আচরণ ছিল অনুরূপ।

৭৯০। "Qissis" - এই আরবী শব্দটি মওলানা ইউসুফ আলী অনুবাদ করেছেন "devoted to learning", যার বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে 'পন্ডিত'। এখানে খৃষ্টান পন্ডিত ও ধর্মযাজক ও সন্যাসীদের সাথে ইহুদীদের ধর্মযাজকদের তুলনা করা হয়েছে এই বলে যে তারা, "সংসার-বিরাগী" এবং তারা "অহংকারও করে না।" পরবর্তী আয়াতে [৫ : ৮৩] এদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে।

সপ্তম পারা

৮৩। এবং যখন তারা রাসূল যে প্রত্যাদেশ পেয়েছে তা শোনে, তুমি দেখবে তাদের চোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়; কারণ তারা সত্যকে সনাক্ত করতে পারে। তারা প্রার্থনা করে, "হে আমাদের প্রভু ! আমরা ঈমান আনলাম, তুমি আমাদের সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত কর।"

৮৪। "আল্লাহ্‌তে ও আমাদের নিকট আগত সত্যের প্রতি বিশ্বাস না করার, আমাদের কি কারণ থাকতে পারে, যখন আমরা প্রভুর নিকট প্রত্যাশা করি [তিনি যেনো] আমাদের সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত করেন ?"

৮৫। তাদের এই প্রার্থনার কথার জন্য, আল্লাহ্‌ তাদের পুরষ্কৃত করেছেন [বেহেশতের] বাগান দ্বারা যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত [যা] তাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল। যারা ভালো কাজ করে এরূপ হচ্ছে [তাদের] তুল্য বিনিময়।

৮৬। কিন্তু যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আমার আয়াত সমূহকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করে তারা হবে জাহান্নামের আগুনের সঙ্গী।

৮৭। হে মুমিনগণ ! যে সব উৎকৃষ্ট বস্তু আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য বৈধ করেছেন, সে সকলকে হারাম করো না। এবং সীমালংঘন করো না ৭৯১। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সীমালংঘনকারীকে ভালোবাসেন না।

৭৯১। আমাদের দৈনন্দিন জীবন ধারণের জন্য, জীবনের আনন্দের জন্য, জীবনকে উপভোগের জন্য আল্লাহ্‌র যা কিছু নেয়ামত তা ভোগ করার অধিকার আল্লাহ্‌ আমাদের দিয়েছেন, কিন্তু সেই সাথে এগুলি ভোগ করার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। অতিরিঞ্জিত বা বাড়াবাড়ি তা সে যে ব্যাপারেই হোক আল্লাহ্‌র অপছন্দ। এমনকি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলমানের জীবন হবে সংযত ও মিত্যাচারী। নিজেকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করার মধ্যে কোন পূণ্য নিহিত নাই। যদিও উপরের আয়াতে [৫ : ৮২] খৃষ্টান সন্ন্যাসী যারা পৃথিবীর আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস, সবকিছু ত্যাগ করেছে আল্লাহ্‌ সন্তুষ্টির জন্য, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু মুসলমানদের জন্য এরকম সন্ন্যাসব্রত আল্লাহ্‌র পছন্দ নয়। কর্মের মাধ্যমে, জীবনের মাধ্যমে, জীবনকে উপভোগের মাধ্যমে, আল্লাহ্‌র সব বৈধ নেয়ামতকে উপভোগের মাধ্যমে, সংযত ও মিতাচারী জীবন যাত্রার মাধ্যমে মুসলমানকে আল্লাহ্‌র যোগ্য বান্দা হওয়ার নির্দেশ এখানে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবী ত্যাগ করে সন্ন্যাস হওয়া বা ভোগ বিলাসের সমুদ্রে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া কোনও বাড়াবাড়িই আল্লাহ্‌ পছন্দ করে না। এই হচ্ছে মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্‌র বিধান।

৮৮। আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যে সব বৈধ এবং ভালো জিনিস দান করেছেন তা থেকে আহার কর। কিন্তু ভয় কর আল্লাহ্‌কে যাকে তোমরা বিশ্বাস কর।

৮৯। তোমাদের অনিচ্ছাকৃত শপথের জন্য আল্লাহ্‌ তোমাদের দায়ী করবেন না ৭৯২। কিন্তু তোমাদের সুচিন্তিত শপথের জন্য দায়ী করবেন। [শপথ ভঙ্গের] প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ দশজন দরিদ্রকে সাধারণ মানের খাদ্য, যা তোমাদের পরিবারের জন্য ব্যবহার কর, তা দান কর, অথবা তাদের বস্ত্র দান কর, কিংবা একজন দাসমুক্ত কর। যদি এ সকল তোমার সাধ্যের অতিরিক্ত হয়, [তবে] তিনদিন সিয়াম পালন কর। এই হচ্ছে [সুচিন্তিত] শপথ উচ্চারণের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা করো। এভাবেই আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন যেনো তোমরা কৃতজ্ঞ হওয়।

৭৯২। দেখুন আয়াত [২ : ২২৪-২২৬]। শপথ বাক্যের সাধারণ নীতি নিম্নরূপ : (১) নিরর্থক কোন শপথ করা উচিত না। যে শপথ সত্যি নিয়তের ভিত্তিতে করা নয়, তা না করাই উচিত। (২) কোনও সৎ কাজ বা ভালো কাজ না করার জন্য আল্লাহ্‌র নামে শপথ করা উচিত নয়। (৩) কোনও ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করলে অবশ্যই তা রক্ষা করার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করা উচিত। (৪) যদি কেউ তার প্রতিজ্ঞা বা ওয়াদা রক্ষা করতে না পারে, তবে তার প্রায়শ্চিত স্বরূপ সে দুঃখী জনকে খাওয়াবে অথবা কাপড় দান করবে, অথবা ক্রীতদাসের মুক্তি দান করবে। যদি এসব করার সামর্থ না থাকে তবে সে রোজা রাখবে।

৯০। হে মুমিনগণ ! [সকল] মাদকদ্রব্য [নেশা জাতীয় দ্রব্য], জুয়া, মূর্তি পূজার পাথর ৭৯৩ [যার উপরে উৎসর্গ করা হয়], তীরের ৭৯৪ সাহায্যে ভাগ্য গণনা জঘন্য কাজ [যা] শয়তানের সৃষ্টিকর্ম। সুতরাং তোমরা উহা বর্জন কর, যেনো তোমরা [আধ্যাত্মিক] সফলতা লাভ করতে পার ৭৯৫।

৭৯৩। দেখুন আয়াত [২ : ২১৯] এবং টীকা ২৪০ এবং ২৪১।

৭৯৪। আয়াত [৫ : ৩]-এ আছে "আর যা মূর্তি পূঁজার বেদীর উপরে বলি দেওয়া হয়।" এই আয়াতেও আছে "মূর্তি পূঁজার বেদী।" এই আয়াতগুলির দ্বারা পৌত্তলিকতা ও অন্ধ কুসংস্কার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

৭৯৫। আয়াত [৫ : ৩]-এ আছে "জুয়ার দ্বারা ভাগ নির্ণয় করা।" এবং এই আয়াতে আছে "তীরের সাহায্যে ভাগ্য গণনা।" অর্থাৎ লটারী বা তীর ইত্যাদির দ্বারা সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যকে চিহ্নিত করা বা জ্যোতিষের গণনাকে ভবিষ্যত গণনার বিষয়বস্তু ধরে নেওয়া, বা পাথরের আংটির সাহায্যে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা। শুভ অশুভ দিন ধার্য করা এগুলি সবই কুসংস্কার এবং আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীলতার অভাব। এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস হচ্ছে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোনও শক্তির উপরে বিশ্বাস স্থাপন করা - যা কিনা আল্লাহ্‌র সাথে শেরেক। এই আয়াতে আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদারিত্বের বা শেরেকের মুলোৎপাটন করা হয়েছে।
উপদেশঃ জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শিক্ষায় পশ্চাদপদ মুসলিম সমাজ প্রতিপদে আল্লাহ্‌র এই নির্দেশ অমান্য করে চলেছে।

৯১। শয়তানের পরিকল্পনা হচ্ছে : মাদকদ্রব্য ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষের প্রসার ঘটানো এবং তোমাদের আল্লাহ্‌র স্মরণে ও সালাত থেকে ফিরিয়ে রাখা। তবে কি তোমরা পরিহার করে চলবে না ?

৯২। তোমরা আল্লাহ্‌র আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর ৭৯৬; এবং [মন্দ থেকে] সতর্ক হও; যদি তোমরা ফিরে যাও, তবে জেনে রাখ আমার রাসূলের কর্তব্য হচ্ছে, [আল্লাহ্‌র বাণী] সুস্পষ্ট ভাবে প্রচার করা ৭৯৭।

৭৯৬। আল্লাহ্‌ আমাদের হুকুম দিয়েছেন, সকল কুসংস্কার ত্যাগ করে শুধু তারই আনুগত্য করার জন্য। আল্লাহ্‌ আমাদের স্রষ্টা, বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রভু, তার আনুগত্য করা ও হুকুম মানাই হচ্ছে আত্মার জন্য স্বাভাবিক বিকাশ। যদি আমরা তা না করে কুসংস্কারের বশবর্তী হই, তবে তা আমাদের আত্মার বিকাশের পথে বাধা স্বরূপ হবে। এ কথা কুসংস্কারচ্ছন্ন ব্যক্তির জন্য যেমন প্রযোজ্য ঠিক সমভাবে প্রযোজ্য যারা সাময়িক উত্তেজনার স্বাদ গ্রহণের জন্য মদ বা নেশায় আসক্ত হয়, অথবা ভাগ্য ফিরানোর জন্য জুয়া খেলে। মদ্‌,নেশার দ্রব্য, বা জুয়া হয়তো সাময়িক আনন্দ দান করে, কিন্তু সত্যিকারের সফলতা বা শান্তি বা পরহেজগারী এগুলো থেকে বহু দূর। কারণ আল্লাহ্‌র নির্দেশ থেকে ঐ ব্যক্তিরা বহু দূরে।
৭৯৭। দেখুন আয়াত [৫ : ৬৭]। যারা আল্লাহ্‌র হুকুম বা নির্দেশকে অমান্য করে তারা তাদের পার্থিব ও আত্মিক উভয় ক্ষতি নিজেই সাধন করে। "সতর্ক হও" - কথাটি দ্বারা এই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর কতভাবে সাবধান বাণী উচ্চারিত হতে পারে ?

৯৩। যারা ঈমান আনে এবং সৎ কাজ করে, তারা [অতীতে] যা ভক্ষণ করেছে, তার জন্য কোন দোষ নাই; যখন তারা পাপ [কাজ] থেকে নিজেকে রক্ষা করে, এবং ঈমান আনে এবং সৎ কাজ করে। [অথবা] পুণরায় পাপ [কাজ] থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং ঈমান আনে - [অথবা] পুনরায়, পাপ [কাজ] থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং সৎ কর্ম করে। কারণ যারা সৎ কাজ করে আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন ৭৯৮।

৭৯৮। গানের প্রথম লাইনটির মত "পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করে" কথাটি বারে বারে আবৃত্তি করা হয়েছে। "পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করে বা সাবধান হওয়া প্রত্যেকের প্রথম কর্তব্য। আধ্যাত্মিক জগতে, আল্লাহকে পাওয়ার এটাই হলো প্রথম ধাপ। তাই পাপ থেকে সাবধান হওয়া কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে।
এই আয়াতে পাপ থেকে সাবধানতার সাথে তিনটি অবস্থাকে সংযুক্ত করা হয়েছে। (১) "যদি তারা পাপ থেকে সাবধান হয় এবং ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে।" অর্থাৎ পাপ থেকে সাবধান থাকতে হবে স্রষ্টার প্রতি কর্তব্য করার জন্য। স্রষ্টার প্রতি কর্তব্য কি ? স্রষ্টার প্রতি আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তাঁর প্রতি ঈমান আনা ও সৎ কর্ম করা। (২) "পাপ থেকে সাবধান হয় ও ঈমান আনে" অর্থাৎ পাপ থেকে সাবধান থাকতে হবে কারণ নিজের বিবেককে জাগ্রত করার জন্য। বিশ্বাস বা ঈমান কথাটি আত্মার সাথে সম্পৃক্ত। এখানে বিশ্বাস বা ঈমান অন্তরের এক বিশেষ অবস্থা (State of mind) অন্তরের বিকাশ বা বিবেকই হচ্ছে বিশ্বাসের পরিপূর্ণ রূপ। (৩) "পুনরায় পাপ থেকে সাবধান হয় এবং সৎ কর্ম করে", অর্থাৎ পাপ থেকে সাবধান থাকতে হবে কারণ সৎ কর্ম করার জন্য। সৎ কর্ম কি ? যে কাজ সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য করা হয় তাই-ই সৎ কর্ম। অর্থাৎ উপরের বর্ণিত তিনটি কর্তব্য কর্ম যথা : (১) স্রষ্টার প্রতি ঈমান আনা, (২) বিবেককে জাগ্রত করা ও (৩) সৃষ্টির সেবা করার মানসিকতা অর্জন করা এই তিনটি কর্তব্য কর্মের পূর্বশর্ত হচ্ছে পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। যদি নিজেকে সর্ব পাপ থেকে মুক্ত রাখা যায়, পাপ সম্বন্ধে 'সাবধান' হওয়া যায় তবেই স্রষ্টার প্রতি, নিজের প্রতি ও সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য সম্পাদন করা সম্ভব। আমরা সাধারণ মানুষ; দৈনন্দিক জীবন যাপন প্রণালীতে নানা প্রলোভনের সম্মুখীন হই। পূর্বের আয়াতে [৫ : ৯০] প্রতিদিনের জীবন যাপনে আমরা যে সব পাপের সম্মুখীন হই তাদের উল্লেখ করা হয়েছে। মদ্‌ (খাদ্য), জুয়া (খেলাধূলা), মূর্তি বা অন্য কিছুকে শরীক করা (ইবাদত) ভাগ্য পরীক্ষার শর বা লটারী - এর মধ্যে অন্যতম। এগুলি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিক জীবন যাপন প্রণালীতে খাদ্য, খেলাধূলা, ইবাদত সবই হতে হবে সংযত, সুনিয়ন্ত্রিত এবং আল্লাহ্‌র নির্দেশিত পথে। পাপের প্রতি আসক্তির প্রথম ধাপই হচ্ছে খাদ্য, পানীয়, খেলাধূলার মাধ্যম। আবার সুনিয়ন্ত্রিত, সংযত জীবন-যাপন প্রণালীই হচ্ছে চারিত্রিক গুণাবলী বা আত্মিক বিকাশের প্রথম ধাপ। চারিত্রিক গুণাবলীই হচ্ছে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের প্রধান উপায়। অর্থাৎ আমাদের জীবনকে সুস্থ, সুন্দর করার জন্য খাদ্য, পানীয়, খেলাধূলা, ইবাদত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন। আল্লাহ্‌ নির্দেশিত পথে জীবনকে পরিচালনার মাধ্যমেই চরিত্রে গুণাবলীর জন্ম নেয় এবং পরবর্তীতে আত্মিক বিকাশের উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। যদি আমরা খাদ্য, পানীয়, খেলাধূলা, ইবাদত সম্বন্ধে আল্লাহ্‌র আদেশ লঙ্ঘন করি; তবে আমরা আমাদের নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করি। আমাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন শুধু যে আমাদেরই ক্ষতির কারণ হয় তাই-ই নয়, আমাদের চারিপাশে যারা বাস করে তাদেরও ক্ষতির কারণ ঘটে।

পাপ থেকে দূরে থাকার ফলে ব্যক্তির চরিত্রে বিবেকের জন্ম নেয়। আর বিবেকবান ব্যক্তির ঈমানদার বা বিশ্বাসী হওয়া ও সৎকর্মশীল হওয়া অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যে ব্যক্তি বিবেকবান সে অবশ্যই নিজেকে অন্যায়, অসত্য ও অপকর্ম থেকে দূরে রাখবে এবং সত্য, ন্যায় ও সৎ কর্মের সঙ্গী হয়। তিনি অবশ্যই ঈমানদার ও সৎ কর্মশীল হবেন। আবার ঈমানের পূর্বশর্তই হচ্ছে আল্লাহ্‌কে ভালোবেসে আল্লাহ্‌র হুকুমকে মান্য করা। অর্থাৎ পাপ থেকে দূরে থাকা। যে ব্যক্তি ঈমানদার এবং পাপ থেকে দূরে থাকে সে কি কখনও সৎ কর্মের প্রতি মনোযোগী না হয়ে পারে ? (১) পাপ থেকে দূরে থাকা; (২) বিবেককে জাগ্রত করা ও (৩) সৎ কর্ম, এই তিনে মিলেই আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন। এই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে কর্মের মাধ্যমে। শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে নয়।

রুকু - ১৩

৯৪। হে মুমিনগণ ! তোমাদের হাতের ও বর্শার সীমানায় যে খেলা [শিকার করা] সে বিষয়ে অবশ্যই আল্লাহ্‌ তোমাদের পরীক্ষা করবেন। আল্লাহ্‌ অবহিত হতে পারেন কে তাঁকে না দেখেও ভয় করে। ৭৯৯ এরপরও যদি কেহ সীমালংঘন করে তার জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।

৭৯৯। "পরীক্ষা করবেন" - এর বিশদ ব্যাখ্যা দেখুন আয়াত [৩ : ১৫৪, ১৬৬] এবং টীকা ৪৬৭। এহ্‌রাম অবস্থায় কাবা শরীফের পবিত্র সীমার মধ্যে শিকার নিষিদ্ধ।

৯৫। হে মুমিনগণ ! ইহ্‌রামে থাকা অবস্থায় অথবা পবিত্র স্থানে জন্তু শিকার করো না ৮০০। যদি কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে তা করে, তবে তার ক্ষতি পূরণ হবে যা সে হত্যা করেছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তুর বিনিময় উৎসর্গ করা হবে কাবাতে ৮০১। [এ ব্যাপারে] বিচার পূর্বক রায় দেবে তোমাদের মধ্যে দুজন ন্যায়বান ব্যক্তি। অথবা প্রায়শ্চিত্ত হবে দরিদ্রকে খাদ্য দান করা, অথবা সমসংখ্যক সিয়াম পালন করা, যেনো সে আপন কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করতে পারে। যা অতীতে ঘটেছে আল্লাহ্‌ তা ক্ষমা করেছেন। কেহ তার পুণরাবৃত্তি করলে, আল্লাহ্‌ তার উপরে প্রতিশোধ নেবেন। আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী ও শাস্তিদাতা।

৮০০। দেখুন [৫ : ১] এবং টীকা ৬৮৪। এহ্‌রাম সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা আছে [২ : ১৯৬] এবং টীকা ২১২।

৮০১। ইচ্ছাকৃতভাবে ইহ্‌রাম বাধা অবস্থায় শিকার করলে, তার শাস্তি এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। শাস্তি হিসেবে তিনটি শাস্তির কথা পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে। (১) যে প্রাণীটি হত্যা করা হয়েছে তার সমতুল্য একটি প্রাণী কাবা শরীফে আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে উৎসর্গ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রাণীটি হতে হবে নিজগৃহ পালিত এবং অনুরূপ কথাটির অর্থ এর আকার ও ওজনে হতে হবে হত্যা করা প্রাণীটির সমতুল্য। উৎসর্গীত প্রাণীর মাংস গরীবদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। (২) অথবা গৃহপালিত জন্তুর নির্ধারিত মূল্য দানও করা যায়, অথবা প্রতিটি মিসকিনকে যে পরিমাণ দান করবে সেই পরিমাণ খরচ করে খাওয়াবে। (৩) অথবা যতজন মিসকীনকে ঐ ভাবে দান করা যায় ততটি সিয়াম পালন করবে। এই উপায়টি হচ্ছে উপরের দুটি উপায় অবলম্বন করার ক্ষমতা না থাকলে তখন প্রযোজ্য অর্থাৎ যদি গরীব হয়। সমস্ত ব্যাপারটির ফয়সালা করবেন দু'জন ন্যায়বান লোক।

৯৬। তোমাদের জন্য পানিতে শিকার এবং খাদ্য হিসেবে তার ব্যবহার বৈধ করা হলো ৮০২, তোমাদের ও পর্যটকদের উপকারের জন্য। কিন্তু যতক্ষণ তোমরা পবিত্র স্থানে থাকবে অথবা এহ্‌রাম পরা অবস্থায় থাকবে স্থলভাগে শিকার নিষিদ্ধ করা হলো। আল্লাহ্‌কে ভয় কর, যার কাছে তোমাদের সকলকে প্রত্যাবর্তন করে সমবেত করা হবে।

৮০২। "Water game" - বা পানিতে শিকার বা সমুদ্র নদী, লেক, পুকুর ইত্যাদিতে খেলা।

৯৭। আল্লাহ্‌ কাবাকে পবিত্র ঘর করেছেন, যা মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল, আরও করেছেন পবিত্র মাস ৮০৩, কুরবাণীর জন্য কাবায় প্রেরিত পশু ও গলায় মালা পরিহিত পশুকে মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারিত ৮০৪। এ জন্য যে, তোমরা যেনো জানতে পার যা কিছু আসমান ও যমীনে আছে আল্লাহ্‌ তা জানেন এবং আল্লাহ্‌ সকল বিষয়ে সম্যক অবগত ৮০৫।

৮০৩। পবিত্র মাস বা নিষিদ্ধ মাসকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে [২ : ১৯৪] আয়াতের টিকা ২০৯ এবং [৫ : ২] আয়াতের টিকা ৬৮৭।

৮০৪। দেখুন আয়াত [৫ : ২] এবং টীকা ৬৮৮।

৮০৫। হজ্জ্বের সময়ে সারা পৃথিবী থেকে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ কাবা প্রাঙ্গনে সমবেত হয়। এই আয়াতে যারা আরবের বাইরে থেকে এখানে সমবেত হন তাদের বলা হয়েছে, তারা যেনো মনে না করে যেহেতু তারা বিদেশী, তাদের কেউ সনাক্ত করতে পারবে না, সুতরাং তারা যে কোনও অন্যায় করেও নিরাপদ থাকতে পারবে। তা সম্ভব নয়, কারণ আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান। তিনি সকলের অন্তরের চিন্তা-ভাবনার খবর রাখেন। তিনি সকলেরই নিয়ত সম্বন্ধে ওয়াকেবহাল। পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে যদিও তিনি পরম করুণাময় এবং ক্ষমাশীল, তবুও তিনি তাঁর আইন প্রয়োগে কঠোর।

৯৮। জেনে রাখ শাস্তি দানে আল্লাহ্‌ কঠোর। এবং আল্লাহ্‌ পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

৯৯। রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে শুধুমাত্র [আল্লাহ্‌র বাণী] প্রচার করা। আর তোমরা যা প্রকাশ কর ও যা গোপন কর আল্লাহ্‌ তা সব জানেন।

১০০। বল, "মন্দ ও ভালো কখনও এক নয়। যদিও মন্দের আধিক্য তোমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয় ৮০৬। সুতরাং হে বোধশক্তি সম্পন্নেরা, আল্লাহ্‌কে ভয় কর; যাতে [আধ্যাত্মিক] সফলতা লাভ করতে পার।

৮০৬। দেখুন আয়াত [২ : ২০৪]। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে সাধারণ মানুষ, গুণ অপেক্ষা বাহ্যিক চাকচিক্য, সংখ্যার আধিক্য দ্বারা অধিক প্রভাবিত হয়। সমাজে অধিক সংখ্যক লোক যা অনুসরণ করে তারাও তার অনুসারী হয়। কিছু সংখ্যক লোক বেশী মানুষের সমাগমকেই অনুসরণের মাপকাঠি মনে করে। যার কাছে মানুষের ভিড় দেখে তারা তারই অনুসরণ করে। তা ন্যায় বা অন্যায়, ভালো বা মন্দ সে বোধ তাদের হয় না। তা আল্লাহ্‌ কর্তৃক অনুমোদিত কিনা সে বিচার তারা করে না। সংখ্যাধিক্যের কারণে তারা তা অনুসরণ করে; যেমন মেষপাল তাদের প্রধান মেষকে না বুঝে অনুসরণ করে। কিন্তু যারা বিবেকবান এবং ন্যায়-অন্যায় প্রভেদকারী তারা কখনও গড্ডালিকা প্রবাহে চলেন না, তারা খুব সাবধানে ভালোকে মন্দ থেকে, পার্থক্য করেন। এ ব্যাপারে তারা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও যা সত্য, ন্যায়, ভালো তাকেই জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেন। যত বাধা বিপত্তিই আসুক না কেন তারা গড্ডালিকা প্রবাহে জীবন ভাসিয়ে দেন না।

রুকু - ১৪

১০১। হে মুমিনগণ ! তোমরা সেই সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের নিকট প্রকাশ করা হলে, তোমাদের অসুবিধা হতে পারে। যখন কোরআন অবতীর্ণ হয়, তখন যদি সেই সব বিষয়ে প্রশ্ন কর তবে উহা তোমাদের নিকট প্রকাশ করা হবে ৮০৭; আল্লাহ্‌ সেই সব ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ পরম ক্ষমাশীল ও পরম ধৈর্য্যশীল।

৮০৭। আল্লাহ্‌ সর্বোচ্চ জ্ঞানী। আমাদের জন্য এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা না জানাই আমাদের জন্য শ্রেয়ঃ। মহান স্রষ্টা সে সব রহস্য আমাদের মঙ্গলের জন্যই গোপন রেখেছেন। যেমন- যদি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পেতাম তবে তা আমাদের নিকট সব সময়ে খুব সুখের হতো না। অনেক সময়ে ভবিষ্যৎ বিপর্যয় জানতে পারলে ভয়ে, আতঙ্কে বর্তমানের সুখ-শান্তিও হতো বিঘ্নিত। আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের সীমিত জ্ঞান বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ্‌র বিরাট পরিকল্পনা বা কোনও ঘটনার কার্যকরণ সম্পর্ক, ভবিষ্যতে তার প্রভাব বোঝার ক্ষমতা আমাদের নাই। এই অজ্ঞতা আমাদের আশীর্বাদ স্বরূপ। কারণ ভবিষ্যতের জ্ঞান সর্বদা সুখের নাও হতে পারে। যদি সুখের না হয় তবে ভবিষ্যতের সাথে বর্তমান জীবনও অসহনীয় হয়ে ওঠে। আমাদের নবীর সময়ে কিছু লোক এই চেষ্টাই করেছিল। এরই প্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজেল হয়। হজ্ব ফরয হওয়ার হুকুম হলে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিল, হজ্ব কি প্রতি বছরই ফরজ কিনা ? উত্তরে হযরত (সাঃ) বলেছিলেন, "যে সব বিষয় সম্পর্কে আমি তোমাদের কোন নির্দেশ দেই না, সেগুলোকে সেভাবেই থাকতে দিও - ঘাঁটাঘাটি করে প্রশ্ন করো না। তোমাদের পূর্বে কোন কোন উম্মত বেশী বেশী প্রশ্ন করেই ধ্বংস হয়ে গেছে। আল্লাহ্‌র রাসূল যে সব বিষয়ে ফরয করেন নাই, তারা প্রশ্ন করে সেগুলোকে ফরয করে নিয়েছিল এবং পরে সেগুলোর বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত হয়েছিল। আমি যে কাজের আদেশ দিই সাধ্য অনুযায়ী তা পালন করা এবং যে কাজে নিষেধ করি, তা পরিত্যাগ করাই তোমাদের কর্তব্য হওয়া উচিত।" এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোরান অবতরণ কালে যদি তোমরা এরূপ প্রশ্ন কর, তবে ওহীর মাধ্যমে উত্তর এসে যাবে। কোরানে যা উল্লেখ আছে সে সম্পর্কে জানার জন্য বা ব্যাখ্যার জন্য প্রশ্ন করার অধিকার অবশ্যই আছে, তবে তার সীমারেখা থাকা প্রয়োজন যথাঃ (১) আমাদের বুদ্ধি বিবেক যতদূর অনুধাবন করতে পারে সে সীমারেখার বাইরে যাওয়া উচিত নয়। (২) সময় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে প্রশ্নটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া চাই এবং (৩) সময়ের বৃহত্তর পটভূমিতে আল্লাহ্‌র পরিকল্পনার যতটুকু আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, বা আমরা অনুধাবন করি সেই সীমারেখার মধ্যেই আমাদের কোরানের অন্তর্নিহিত অর্থ বা আয়াতের অর্থের অনুসন্ধান করতে হবে।

১০২। তোমাদের পূর্বেও কোন কোন সম্প্রদায় এই প্রকার প্রশ্ন করেছিলো ৮০৮। এবং সে কারণে তারা তাদের ঈমানকে হারিয়েছিলো।

৮০৮। উদাহরণ স্বরূপ বলা চলে হযরত মুসার সময়ে ইহুদীদের দ্বারা হযরত মুসাকে এরকম বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় দেখুন আয়াত [২ : ৬৮-৭১]। এটা ছিল তাদের ঈমান হীনতারই প্রতীক।

১০৩। আল্লাহ্‌ তো উষ্ট্রীর কান ছিদ্র করণ, অথবা [দেবতার নামে] উষ্ট্রীকে মুক্তভাবে ছেড়ে দেয়া, অথবা উষ্ট্রীর যমজ বাচ্চা প্রসবের জন্য প্রতিমার নিকট জন্তু উৎসর্গ করা অথবা নর-উষ্ট্রীকে তার কাজ থেকে রেহাই দিয়ে মুক্ত করা, [এসব কুসংস্কারকে] আল্লাহ্‌ প্রবর্তন করেন নাই ৮০৯। ধর্মাদ্রোহীরা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে মিথ্যার উদ্ভাবন করে। যেহেতু তাদের অধিকাংশই প্রজ্ঞা বিবর্জিত।

৮০৯। এই আয়াতটিতে আরব মুশরিকদের কুসংস্কারের সম্বন্ধে বলা হয়েছে। আরবের মুশরিকেরা যেহেতু এক আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসী ও বিশ্বস্ত ছিল না; সেই কারণে তাদের অন্তরাত্মা সর্বদা ভয়ে ও শঙ্কায় পরিপূর্ণ থাকতো। প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনাকে তারা তাদের বিভিন্ন উপাস্যের রোষের বা রাগের বহিঃ প্রকাশরূপে কল্পনা করতো। এসব উপাস্যের সন্তুষ্টি রক্ষার জন্য তারা বিভিন্ন কুসংস্কারের আশ্রয় গ্রহণ করতো। এসব কুসংস্কার তাদের সুস্থ চিন্তাধারা বিকাশের বাঁধা স্বরূপ ছিল। আত্মার স্বাভাবিক বিকাশের এ ছিল এক বিরাট অন্তরায়। যেমন- যদি কোন গৃহপালিত পশু বা উষ্ট্রীর একের অধিক বাচ্চা থাকতো, তবে পশুটির কানকে ছিদ্র করে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হতো; এরকম প্রাণীকে বলা হতো "Bahira" (বাহীরা)। নিরাপদে যাত্রা সম্পন্ন করার জন্য বা রোগমুক্তির জন্য উষ্ট্রীকে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হতো এবং প্রাণীটিকে মুক্তভাবে বিচরণ করতে দেওয়া হতো, একে বলা হতো "Saiba" (সাইবা)। যদি কোন প্রাণীর যমজ বাচ্চা হতো যা স্বাভাবিক ছিল না; সে ক্ষেত্রে উপাস্য দেবতাকে একটি বাচ্চা উৎসর্গ করা হতো, এই উৎসর্গীত প্রাণীকে বলা হতো "Wasila" (ওয়াসীলা)। আবার ham (হাম) অর্থ পুরুষ উট (যে বিশেষ সংখ্যক রমনক্রিয়া সমাপ্ত করে)। এরূপ উটকেও প্রতিমার নামে ছেড়ে দেয়া হতো। প্রাচীন আরবে সে সময়ে মুশরিকদের মধ্যে যে সব অন্ধ কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল উপরে তারই কয়েকটির উল্লেখ করা হয়েছে এখানে। এই উদাহরণ দ্বারা এই সত্যকেই তুলে ধরা হয়েছে যে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য যাকেই সন্তুষ্ট করতে চাওয়া হোক না কেন, যারই সাহায্য কামনা করা হোক না কেন তা হচ্ছে কুসংস্কার। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, তাদের ঐ কুসংস্কারের মূলে ছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা ও আল্লাহ্‌র আদেশ অমান্য করার প্রবণতা।

উপদেশঃ এই আয়াতের পরেও আজকে আমাদের সমাজে, যে সব কুসংস্কার প্রচলিত আছে তা কি আল্লাহ্‌র বৈধ আদেশের পরিপন্থি নয় কি ?

১০৪। যখন তাদের বলা হয়, "আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার দিকে ও রাসূলের দিকে এসো।" তারা বলে, "আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে পথ অনুসরণ করেছেন, তাই-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট" ৮১০। যদিও তাদের পূর্বপুরুষদের [এ সম্বন্ধে] কোন জ্ঞানই ছিলো না এবং তারা [সঠিক পথের] পথনির্দেশও লাভ করে নাই।

৮১০। দেখুন আয়াত [২ : ১৭০] এ বলা হয়েছে যে আল্লাহ্‌র নবীকে প্রেরণ করা হয়েছে পৃথিবীকে 'সত্য' শিক্ষাদানের নিমিত্তে। যুগে যুগে একথার সাক্ষ্য মেলে যে, যারা অজ্ঞ ও হটকারী তারাই শুধু বলে, "আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে পথ অনুসরণ করেছেন, তাই-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট।"

১০৫। হে মুমিনগণ ! তোমাদের নিজেদের আত্মাকে [পাপ থেকে] রক্ষা কর। যদি তোমরা সঠিক পথ নির্দেশ অনুসরণ কর, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমার কোন ক্ষতিই করতে পারবে না। তোমাদের সকলের শেষ লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র নিকট [প্রত্যাবর্তন]। অতঃপর তোমরা যা করতে তার প্রকৃত সত্য সম্বন্ধে তিনি তোমাদের অবহিত করবেন ৮১১।

৮১১। এই আয়াতটি আল্লাহ্‌র একত্বের দিকে নির্দেশ করছে। এই পৃথিবীতে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধের পরিবর্তন হয়। কিন্তু আল্লাহ্‌ নির্দেশিত ন্যায় ও অন্যায়ের মানদন্ড, সত্য-অসত্যের মানদন্ড স্থির ও অবিচল। এই মানদন্ডই হচ্ছে "সৎ পথে" চলার পথ প্রদর্শক এবং এই মানদন্ডে অবিচল থাকাই হচ্ছে "আত্মসংশোধনের" একমাত্র উপায়। এরই নিরিখে স্রষ্টা আমাদের বিচার করবেন। সময়ের পটভূমিতে পরিবর্তনশীল সংস্কৃতি বা মূল্যবোধ আমাদের বিচারের মানদন্ড হবে না। পরকালে এ ব্যাপারে আমাদের সম্যক ওয়াকিবহাল করানো হবে।

১০৬। হে মুমিনগণ ! যখন তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন ওসিয়াত করার সময় [তোমাদের মধ্যে থেকে] দু'জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে, অথবা তোমাদের বাইরের দু'জনকে রাখবে - যদি তোমাদের সফরে থাকাকালে মৃত্যুর বিপদ উপস্থিত হয়। যদি তোমাদের [তাদের সততা সম্বন্ধে] সন্দেহ হয়, তবে সালাতের পরে তাদের আটকিয়ে রাখ, এবং উভয়কে আল্লাহ্‌র নামে শপথ করাবে, "আমার এ থেকে কোনরূপ পার্থিব লাভ আশা করি না যদিও [ভোগ দখলকারী] নিকট আত্মীয়ও হয়। আমরা আল্লাহ্‌র নামে সাক্ষ্য গোপন করবো না। যদি আমরা তা করি তবে আমরা পাপীদের অন্তর্ভূক্ত হব" ৮১২।

৮১২। এই আয়াতে যে অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে সাধারণ ভাবে তা ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত; যদি সম্পূর্ণ ব্যাপারটির ফয়সালা সেখানেই হয়ে যায়। কিন্তু যদি প্রমাণ হয় মিথ্যা সাক্ষ্য, তবে অপর সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব হয়। পরের আয়াতে সে সম্পর্কেই বলা হয়েছে।

১০৭। কিন্তু যদি প্রকাশ পায় যে এই দুজন [শপথ ভাঙ্গার] অপরাধে লিপ্ত হয়েছে, তবে আইন অনুযায়ী যারা দাবীদার তাদের মধ্যে থেকে নিকটতম দুজন তাদের স্থলাভিষিক্ত হবে ৮১৩, এবং তারা আল্লাহ্‌র নামে শপথ করবে, "আমরা ঘোষণা করছি যে, আমাদের সাক্ষ্য তাদের দু'জনের সাক্ষ্য থেকে অবশ্যই অধিকতর সত্য এবং আমরা [সত্যের] সীমালংঘন করি নাই। যদি আমরা তা করে থাকি, তবে অবশ্যই আমরা পাপীদের অন্তর্ভূক্ত।"

৮১৩। রাসুলুল্লাহর (সাঃ) জীবদ্দশায় এ নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়। মদিনার একজন লোক বিদেশে পরলোক গমন করেন। তিনি মৃত্যুকালে তার মূল্যবান জিনিসপত্র তার দু'জন বন্ধুকে দেন, তারা যেনো মৃত্যুপথযাত্রীর উত্তরাধীকারদের নিকট উক্ত জিনিষ পত্রগুলি পৌঁছিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বন্ধুরা রৌপ্য নির্মিত কাপ উত্তরাধীকারীদের ফেরৎ না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেয়। যখন তা প্রকাশিত হয়, তখন পুনঃরায় সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় এবং ন্যায় বিচার করা হয়।

১০৮। এই পদ্ধতিতেই অধিকতর সম্ভাবনা আছে প্রকৃত সত্য সাক্ষ্যদানের, অধিকন্তু তারা ভয় পাবে যে তাদের শপথের পরে অন্য শপথ গ্রহণ করা হবে। আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং [তার পরামর্শ] শোন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ধর্মাদ্রোহী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।

রুকু - ১৫

১০৯। একদিন আল্লাহ্‌ সকল রাসূলকে একত্র করবেন এবং জিজ্ঞাসা করবেন, "[মানুষদের মাঝে তোমাদের শিক্ষার] কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো ?" তারা বলবে, "[এ বিষয়ে] আমাদের কোন জ্ঞানই নাই। যা কিছু গোপন আছে সবই তুমি সম্পূর্ণ অবগত" ৮১৪।

৮১৪। এই আয়াতটিতে বিচার দিবসের ছবি ফুটে উঠেছে। আল্লাহ্‌র দূতদের দ্বায়িত্ব ও তাঁদের সীমাবদ্ধতার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাঁরা শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌র কাছে প্রকাশ করবেন। আল্লাহ্‌র রাসূলদের সত্য প্রচারের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের মৃত্যুর পরে তাদের প্রচারিত বাণী মানুষের হৃদয়ে কিভাবে জাগরূর সে সম্পর্কে তারা অবহিত নন। এই সীমাবদ্ধতার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সত্য প্রচারে তাঁদের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কিন্তু সত্য প্রচারের স্থায়িত্ব বা তার সুদূর প্রসারী প্রভাব সম্বন্ধে তাদের কোনও ধারণা থাকবে না।

১১০। অতঃপর আল্লাহ্‌ বলবেন, "হে মারইয়াম পুত্র ঈসা ! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর ৮১৫। দেখ ! আমি তোমাকে পবিত্র আত্মা দ্বারা শক্তিশালী করেছিলাম ৮১৬ যেনো তুমি শৈশবে এবং পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলতে পার ৮১৭। দেখ ! আমি তোমাকে কিতাব, প্রজ্ঞা, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম ৮১৮। এবং দেখ ! আমার অনুমতিক্রমে তুমি কাদা থেকে পাখীর মত আকৃতি গঠন করতে ৮১৯ এবং তাতে তুমি ফুৎকার দিতে, [ফলে] আমার অনুমতিক্রমে তা [জীবন্ত] পাখী হয়ে যেতো। এবং আমার অনুমতিক্রমে তুমি জন্মান্ধ এবং কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করতে, এবং দেখ ! আমার অনুমতিক্রমে তুমি মৃতকে জীবন্ত করতে ৮২০। এবং দেখ ! আমি বণী ইসরাঈলীদের তোমার প্রতি [হিংস্রতা] থেকে নিবৃত রেখেছিলাম ৮২১। তুমি যখন তাদের স্পষ্ট নিদর্শন দেখিয়েছিলে, তখন তাদের মধ্যে যারা ঈমানহীন তারা বলেছিলো, "ইহা তো স্পষ্ট যাদু ব্যতীত অন্য কিছু নয়" ৮২২।

৮১৫। এই আয়াতটিতে শেষ বিচারের দিনের ভাবগাম্ভীর্য দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ হযরত ঈসাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন তাঁর প্রতি ও তার জননীর প্রতি আল্লাহ্‌র যে সব বিশেষ অনুগ্রহ ছিল, যেন তার অনুসারীরা তার প্রচারিত সত্য বিকৃতির জন্য লজ্জ্বিত ও অনুতপ্ত হয়। এই সূরার শেষ পর্যন্ত এই ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়েছে।

৮১৬। দেখুন আয়াত [২ : ৮৭] এবং টীকা [৩ : ৬২] ও টীকা ৪০১।

৮১৭। দেখুন আয়াত [৩ : ৪৬] এবং টীকা ৩৮৮।

৮১৮। দেখুন আয়াত [৩ : ৪৮]।

৮১৯। দেখুন আয়াত [৩ : ৪৯] এবং টীকা ৩৯০।

৮২০। হযরত ঈসার (আঃ) মোজেযা সমূহের বিবরণ এই আয়াতে প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি " মোজেযা'-র উল্লেখের পরেই "আমার অনুমতিক্রমে" কথাটির বারে বারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ, হযরত মুসার যে অলৌকিক ক্ষমতা তা তাঁর কোনও নিজস্ব ক্ষমতা ছিল না, তা ছিল সর্বক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্‌রই বিশেষ দান। আল্লাহ্‌ সবকিছুর উপরেই শক্তিমান।
৮২১। ইহুদীরা বহু পূর্ব থেকেই হযরত ঈসার জীবনাবসানের জন্য সচেষ্ট ছিল। কিন্তু আল্লাহ্‌ "বণী ইসরাঈলীদের নিবৃত্ত রেখেছিলেন।" দেখুন (Luke iv 28-29)। কোরানের আয়াত [৪ : ১৫৭]-তে উল্লেখ আছে যে, ইহুদীরা হযরত ঈসাকে ক্রুশবিদ্ধ করে নাই।

৮২২। আলোচ্য আয়াতে হযরত ঈসাকে যেসব অনুগ্রহ আল্লাহ্‌ মোজেযার আকারে দান করেছিলেন তার উল্লেখ আছে। ইহুদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-র এই সব মোজেযা দর্শন করে তা আল্লাহ্‌র বিশেষ অনুগ্রহরূপে স্বীকার না করে তা যাদু বলে আখ্যায়িত করে। এখানে উল্লেখ্য যে, যারা আল্লাহ্‌র মোজেযার অন্য কোনও ব্যাখ্যা দান করতে অক্ষম তারাই তাকে যাদু বিদ্যা বলে প্রচারের প্রয়াস পায়, যেমনটি ঘটেছিল হযরত মুসা, হযরত ঈসা এবং আমাদের নবী হযরত মুহম্মদের (সাঃ) বেলায়।

১১১। এবং দেখ ! আমি [তাঁর] শিষ্যদের আমার প্রতি ও আমার রাসূলের প্রতি ঈমান আনতে অনুপ্রাণীত করেছিলাম। তারা বলেছিলো, "আমরা ঈমান আনলাম এবং তুমি সাক্ষী থাক যে, ৮২৩, আমরা মুসলমান হিসেবে আল্লাহ্‌র নিকট মাথা নত করলাম ৮২৪।

৮২৩। এই আয়াতে 'হাওয়ারী' অর্থ হযরত ঈসার (আঃ) খাস অনুসারী। এখানে 'তুমি' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে হযরত ঈসার পরিবর্তে; যাকে তার অনুসারীরা সম্বোধন করেছিল "তুমি" শব্দটি দ্বারা।

৮২৪। মওলানা ইউসুফ আলী সাহেব ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন "That we bow to Allah as a Muslim." বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে "আমরা মুসলমান বা আত্মসর্পণকারী।" যারা হযরত মুহম্মদের (সাঃ) উম্মত শুধু তারাই যে মুসলিম একথা যেনো কেউ মনে না করে। এই আয়াত দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে হযরত মুহম্মদের জন্মের পূর্বে ও পরে পৃথিবীতে যারাই আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে সমর্পিত তাদেরকেই মুসলিম বা আত্মসমর্পণকারী বলা হয়। "মুসলিম" কোন উপাধি নয় বা কোনও সম্প্রদায়ের জন্য একচেটিয়া শব্দ নয়। এই শব্দটি বিশ্ব মানবের জন্য প্রযোজ্য। যারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার বা আইনের কাছে সমর্পিত বা পূণ্যত্মা তারাই মুসলিম।

১১২। দেখ ! শিষ্যরা বলেছিলো, "হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা ! তোমার প্রভু কি স্বর্গ থেকে আমাদের জন্য [খাদ্য পরিপূর্ণ] একটি টেবিল প্রেরণ করতে পারেন ?" ঈসা বললো, "যদি তোমরা মুমিন হও, আল্লাহ্‌কে ভয় কর" ৮২৫।

৮২৫। হযরত ঈসার শিষ্যরা হযরত ঈসাকে মোজেযা দেখাতে অনুরোধ করলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে (১) তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে। (২) খাদ্যের প্রতি ছিল প্রবল আসক্তি এবং (৩) শিশুরা যেমন কোনও ব্যাপারে গুরুত্ব বুঝতে অক্ষম, সেইরূপ ইহুদীরা আল্লাহ্‌র মোজেযার গুরুত্ব বুঝতে অক্ষম হয়ে তা খেলাধূলার বস্তু হিসেবে গ্রহণ করে। খৃষ্টান ধর্মে যে সব মোজেযার কথা উল্লেখ আছে তা নিম্নরূপ : (১) সাইমান- পিটার হযরত ঈসাকে (আঃ) তার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে, কারণ যেহেতু সাইমন ছিল পাপিষ্ঠ। [Luke v 8] পরবর্তীতে ঐ একই পিটারই তিনবার নির্লজ্জভাবে তার নেতাকে অস্বীকার করে, যখন তার নেতা শত্রুদ্বারা আক্রান্ত হয়। অপর এক শিষ্য জুডাস (Judas) হযরত ঈসার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। (২) বাইবেলে Canonical Gospel খাদ্য পানীয় সম্পর্কে অনেক মোজেযার বর্ণনা আছে। যেমন : পানি মদে রূপান্তরিত করা [John ii 1-11]; পাঁচটি রুটি ও একটি ছোট পাত্র মদকে ৫০০০ লোকে উপযোগী সুস্বাদু খাদ্য বস্তুতে রূপান্তরিত করা [John vii 5-13], গসপেলে যে মোজেযাগুলির উল্লেখ আছে তা এরূপঃ খাদ্যের জন্য অলৌকিক ভাবে মৎস্য ধরা [Luke v 4-11]; ডুমুর গাছের ফল না ধরার জন্য তাঁকে অভিসম্পাত করা [Matt, xxi 18-19]; হযরত ঈসার মাংস ও রক্ত ভক্ষণ রূপকের সাহায্যে উত্থাপন [John vi. 53-57]; (৩) যেহেতু সামারিতানরা (Samaritans) হযরত ঈসাকে (আঃ) তাদের গ্রামে গ্রহণ করবে না; হযরত ঈসার শিষ্য James এবং John হযরত ঈসাকে অনুরোধ করলো আকাশ থেকে আগুনকে আনা যেনো তা গ্রামবাসীকে ধ্বংস করে দেয় [Luke ix 54]।

১১৩। তারা বলেছিলো, "আমরা কেবলমাত্র উহা থেকে আহার গ্রহণ করবো এবং আমাদের হৃদয়কে পরিতৃপ্ত করবো এবং আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদের প্রকৃতই সত্য বলেছ। এবং আমরা এই অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হতে চাই।

১১৪। মারইয়াম পুত্র ঈসা বলেছিলো, "হে আল্লাহ্‌, আমাদের প্রভু ! আমাদের জন্য স্বর্গ থেকে খাদ্যভর্তি একটি টেবিল প্রেরণ কর ৮২৬। আমাদের প্রথম জন থেকে শেষ জনের পর্যন্ত - ইহা হবে আনুষ্ঠানিক আনন্দোৎসব এবং তোমার নিকট থেকে নিদর্শন এবং আমাদের জীবিকা দান কর ৮২৭। নিশ্চয়ই তুমি [আমাদের প্রয়োজনীয়] সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।"

৮২৬। এই আয়াতের প্রার্থনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে সেটা ছিল "Last supper" বা "শেষ ভোজের" প্রার্থনা। দেখুন The vision of Peter in, "The act of the Apostles" x 9-16].

৮২৭। "জীবিকা দান কর" ইংরেজী অনুবাদ হচ্ছে "Provide for our sustenance" এখানে "জীবিকা" কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কোরান শরীফে এবং হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রার্থনায় "Sustenance" বা জীবিকার অর্থ শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক। অর্থাৎ যা কিছু শরীর, মন ও আত্মার উন্নতি সাধন করে তাই-ই আল্লাহ্‌ প্রদত্ত "Sustenance" বা জীবিকা। বিশেষভাবে যা আত্মাকে সমৃদ্ধ করে তাই-ই আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিকা।

১১৫। আল্লাহ্‌ বলেছিলেন, "আমি তোমাদের নিকট ইহা অবশ্যই প্রেরণ করব। কিন্তু এর পর তোমাদের মধ্যে কেহ কুফরী করলে, আমি তাকে এমন শাস্তি দিব, যা বিশ্বজগতে অপর কাউকে দিব না" ৮২৮।

৮২৮। যাদের আল্লাহ্‌ উপরে বিশ্বাসের ভিত্তি নড়বড়ে তারাই মোজেযাতে অধিক আগ্রহী। মোজেযা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার প্রতীক। সুতরাং আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ব্যতীত কেউ যদি অলৌকক ক্রিয়া কর্ম দেখে নিজের খেয়াল বা ইচ্ছার পূরণ করতে চায়, তবে তার নিজস্ব দায়-দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। মোজেযা বা অলৌকিক ক্রিয়া কর্মের দর্শনের পরিবর্তে তারা ঈমান আনয়ন করবে এরূপ অভিমত ব্যক্ত করার পরে তারা যদি ঈমান না আনে, আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে মিথ্যার অবতারণা করে বা মিথ্যা উপাস্যের ইবাদত করে, তবে তার শাস্তি সাধারণ পাপের শাস্তির অধিক হবে।

উপদেশঃ আমাদের দেশে ভন্ড পীরেরা অলৌকিক ক্রিয়া কর্মের মাধ্যমে তার ভক্তদের প্রভাবিত করতে চায়। যা ইসলাম অনুমোদন করে না।

১১৬। এবং শোন ! আল্লাহ্‌ বলবেন, "হে মারইয়াম পুত্র ঈসা ! তুমি কি জনসাধারণকে বলেছিলে যে 'তোমারা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে আমাকে ও আমার জননীকে পূঁজা কর' ?" সে বলবে, "তুমিই মহিমান্বিত ! আমার যা [বলার] অধিকার নাই তা আমি কখনও বলতে পারি না। যদি আমি তা বলতাম তবে তুমি অবশ্যই তা জানতে। আমার অন্তরে কি আছে তুমি তো জান, যদিও আমি তোমার [অন্তরের কথা] জানি না। তুমি তো সকল গোপন বিষয়ে সম্যক অবগত ৮২৯।

৮২৯। হযরত ঈসার অনুসারীরা তার উপরে আরোপ করেছিল মিথ্যা অবিধান। শেষ বিচারের দিনে হযরত ঈসা (আঃ) তার প্রতি আরোপিত মিথ্যা অবিধানকে অস্বীকার করবেন। যদিও প্রটেষ্ট্যন্টরা মেরীর পূঁজা করে না; কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিমের অনেক চার্চ-ই মেরীকে পূঁজার প্রথা প্রচলিত আছে।

১১৭। "তুমি আমাকে যে আদেশ দিয়েছিলে তা ব্যতীত তাদের আমি কিছুই বলি নাই; যথাঃ 'আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু আল্লাহ্‌র উপাসনা কর' ৮৩০। যখন আমি তাদের মাঝে ছিলাম, আমি ছিলাম তাদের [কার্যকলাপের] উপর সাক্ষী। কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে, তখন তুমি ছিলে তাদের উপর পর্যবেক্ষক এবং তুমি সর্ববিষয়ে সাক্ষী ৮৩১।

৮৩০। দেখুন আয়াত [৫ : ৭২] ও টীকা ৭৮২।
৮৩১। এই আয়াতে হযরত ঈসা স্বীকার করেন যে তিনি মরণশীল মানুষ এবং তাঁর জ্ঞানও মরণশীল মানুষের মতই সীমাবদ্ধ।

১১৮। "যদি তুমি তাদের শাস্তি দাও, তবে তারা তো তোমারই বান্দা। যদি তুমি তাদের ক্ষমা কর, তবে তুমি তো ক্ষমতায় পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাময় ৮৩২।"

৮৩২। প্রভু তাঁর দাসকে অবাধ্যতার জন্য শাস্তি প্রদান করতে পারেন। এতে কারও কিছু বলার নাই। কিন্তু প্রভু ইচ্ছা করলেই তাঁর দাসদের ক্ষমা করে দিতে পারেন, আল্লাহ্‌র জ্ঞান আমাদের মরণশীল মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান অপেক্ষা বহুগুণ প্রসারিত। আল্লাহ্‌র রাসূল আল্লাহ্‌কে অনুরোধ করার ক্ষমতা রাখে তার উম্মতকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য। এটুকুই তার ক্ষমতা, এটুকুই তার সীমাবদ্ধতা।

১১৯। আল্লাহ্‌ বলবেন, "এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণ তাদের সততার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে [বেহেশতের] বাগান যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত - যা হবে তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান। আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও আল্লাহ্‌র প্রতি। এটাই তো [আধ্যাত্মিক] মহামুক্তি [সকল চাওয়া - পাওয়ার পরিসমাপ্তি] ৮৩৩।

৮৩৩। "Fauz" - এই আরবী শব্দটির অর্থ- শান্তি (Felicity), সুখ (happiness), অভীষ্ট সাধন করা (achievement), মোক্ষ লাভ করা (salvation), সফলকাম হওয়া (attainment), বা কামনা-বাসনার চরিতার্থ লাভ করা (Fulfilment of desires) এই একটি মাত্র শব্দ দ্বারা মানব জীবনের আত্মার মুক্তির সবগুলি ধাপের বর্ণনা প্রকাশ পেয়েছে। জীবনের শেষ উদ্দেশ্যকে এই একটিমাত্র শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে মানব আত্মার মুক্তি বা শান্তি লাভ। পরমাত্মার সান্নিধ্যে মানব আত্মার মুক্তি লাভ।

১২০। আসমান ও যমীনের মধ্যে সকল কিছুই আল্লাহ্‌র অধীনে। এবং সকল কিছুর উপরে তাঁর ক্ষমতা বিদ্যমান।