Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ২৪ জন
আজকের পাঠক ৬২ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৪৫৬৭৮ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২১৩৬৪৯ বার
+ - R Print

সূরা মুজাদালা


অষ্টবিংশতি পারা

সূরা মুজাদালা বা আবেদনকারীনী মহিলা - ৫৮

২২ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : পূর্বের সূরার ভূমিকাতে, মদিনাতে অবতীর্ণ যে দশটি সূরার উল্লেখ করা হয়েছিলো তন্মোধ্য এটি দ্বিতীয়। এই সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে মহিলা এবং তাঁর সন্তানদের পক্ষ থেকে কৃত মহিলাটির আবেদন যা আল্লাহ্‌ কর্তৃক গ্রহণ [ দেখুন ৫৮ : ১ আয়াতের টিকা ৫৩৩০ ] করা হয়েছিলো। মুসলিম ভাতৃত্বের অভ্যন্তরে গোপন শলাপরামর্শ ও ষড়যন্ত্রকে নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়।

এই সূরার অবতীর্ণ কাল ৩৩ নং সূরার অবতীর্ণ কালের সমসাময়িক এবং সম্ভবতঃ তা পঞ্চম থেকে সপ্তম হিজরীর মধ্যে।

সার সংক্ষেপ : মহিলাদের সম্মান ধ্বংসকারী সকল মিথ্যা কথাকে নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। ঠিক সেইরূপ করা হয়েছে সকল মিথ্যা ষড়যন্ত্র, বিবাদ - বিসংবাদ এবং শলা পরামর্শকে। [ ৫৮ : ১ - ২২ ]

সূরা মুজাদালা বা আবেদনকারীনী মহিলা - ৫৮

২২ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। আল্লাহ্‌ অবশ্যই শুনেছেন সেই নারীর বক্তব্য [ এবং গ্রহণ করেছেন ], যে তার স্বামীর সম্বন্ধে তোমার নিকট আবেদন করেছিলো ৫৩৩০ এবং [ প্রার্থনার মাধ্যমে ] তার অভিযোগ আল্লাহ্‌র নিকট পেশ করেছিলো। আল্লাহ্‌ তোমাদের উভয় পক্ষের যুক্তি তর্ক [ সব সময়ে ] শুনছিলেন ৫৩৩১, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ [ সব ] শোনেন ও [ সব ] দেখেন।

৫৩৩০। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পটভূমি হচ্ছে তালাবার কন্যা খাওলার ঘটনা। তিনি ছিলেন সামীতের পুত্র আউসের স্ত্রী। যদিও আউস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তবুও তিনি তার স্ত্রীকে মোশরেক আরবদের প্রথামত, 'জিহারের ' মাধ্যমে ত্যাগ করেন। 'জিহারের' সজ্ঞা হচ্ছে স্বামী স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলবে, " তুমি আমার নিকট আমার মায়ের পৃষ্ঠদেশের ন্যায়।" প্যাগান আরবদের প্রথা অনুযায়ী এর দ্বারা স্বামী তার স্ত্রীর ভরণ পোষণ এবং স্বামীর সর্ব দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায় কিন্তু স্ত্রীর তার স্বামীর ঘর ত্যাগ করে অনত্র গমন বা অন্য ব্যক্তিকে বিবাহের অধিকার থাকে না। 'জিহার' এর এরূপ চুক্তি মহিলাদের জন্য শুধু অবমাননাকরই ছিলো না, তা ছিলো তাদের জন্য দুঃখ-দুর্দ্দশার কারণ। খাওলার জন্য জিহারের শর্ত গুলি ছিলো অতীব দুর্দ্দশার কারণ। প্রথমতঃ খাওলা তাঁর স্বামীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন উপরন্তু তাঁর ছিলো ছোট ছোট সন্তান যাদের ভরণ-পোষণের কোনও সঙ্গতিই তার ছিলো না। জিহারের শর্ত অনুযায়ী সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আর পিতার থাকবে না। কি অমানবিক ও অমানুষিক শর্ত ও প্রথা। এরই প্রেক্ষাপটে খাওলা আল্লাহ্‌ নিকট প্রার্থনা করেন এবং রাসুলের (সা) নিকট আবেদন জানান। তাঁর প্রার্থনা আল্লাহ্‌ কবুল করেন এবং মিথ্যা শব্দ সমষ্টির উপরে প্রতিষ্ঠিত এই জঘন্য প্রথার বিলুপ্তি ঘটান। দেখুন সূরা [ ৩৩ : ৪ ] আয়াতের টিকা নং ৩৬৭০।

৫৩৩১। আল্লাহ্‌র অন্যতম উপাধি, তিনি ন্যায় বিচারক। মানুষের অধিকারকে, মিথ্যা প্রথা, বা সংস্কার বা মিথ্যা ভণিতা দ্বারা খর্ব করার মত অন্যায়কে আল্লাহ্‌ প্রশ্রয় দান করেন না। এমন কি যে দুর্বল তার ফরিয়াদও আল্লাহ্‌ শোনেন।

২। যদি তোমাদের মধ্যে কেহ স্ত্রীদের জিহার ৫৩৩২ [আপন ময়ের সাথে তুলনা] করে পরিত্যাগ করে; তারা তাদের মাতা হতে পারে না ; তাদের যারা জন্ম দিয়েছে [প্রসব করেছে], তারা ব্যতীত। প্রকৃতপক্ষে তারা অন্যায় ও মিথ্যা শব্দ [উভয়ই] ব্যবহার করছে ৫৩৩৩। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ পাপ মোচনকারী ৫৩৩৪ এবং বারে বারে ক্ষমাশীল।

৫৩৩২। দেখুন উপরের টিকা ৫৩৩০।

৫৩৩৩। "প্রকৃতপক্ষে তারা অন্যায় ও মিথ্যা শব্দ [উভয়ই] ব্যবহার করছে।" জিহারের প্রথা এবং যে কথা দ্বারা স্ত্রীকে ত্যাগ করা হয় সবই অন্যায় এবং অসত্য। এর দ্বারা স্ত্রী তালাক্‌ হয় না।

৫৩৩৪। দেখুন সূরা [ ৪ :৯৯ ] আয়াত এবং [ ২২ : ৬০ ] আয়াত। সাধারণ মানুষ কেহই ভুল ত্রুটির উর্দ্ধে নয়। মানুষের দুর্বলতা মনমানসিকতা, বিভিন্ন উদ্দেশ্য তাকে ভুলের পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ্‌র অপার করুণা ও দয়া আমাদের এ সব ভুলের ও পাপের পরিণতি থেকে রক্ষা করে। " আল্লাহ্‌ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল।" - তা না হলে আমাদের গুনাহের পরিণামে আমাদের ধ্বংস ছিলো অনিবার্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ রেখেছেন। কারণ সেই পরম করুণাময়ের একান্ত মঙ্গল ইচ্ছা হচ্ছে তাঁর বান্দাদের ভুল -ভ্রান্তি, দোষ-ত্রুটি দূর করা এবং তাঁর ক্ষমা দ্বারা আমাদের ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধন করার সুযোগ দান করা।

৩। কিন্তু যারা জিহার দ্বারা তাদের স্ত্রীদের পরিত্যাগ করে, এবং পরে তাদের উচ্চারিত উক্তি প্রত্যাহার করার ইচ্ছা করে ৫৩৩৫, [তাদের জন্য বিধান হচ্ছে] একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করতে হবে। এর দ্বারা তোমাদের মৃদু র্ভৎসনা করা হয়েছে কার্য সম্পাদন করার জন্য। তারা যা করে আল্লাহ্‌ সে [ সব ] ভালো ভাবে অবগত।

৫৩৩৫। যদি আল্লাহ্‌ 'জিহার ' শব্দটিকে উপেক্ষা করতেন এবং পুরুষকে কোন শাস্তি ব্যতিরেকেই তাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে বৈধ করতেন, তবে সমাজে পুরুষ নির্বোধের ন্যায় পূর্বাপর জ্ঞানশূন্য হয়ে তার ক্ষমতার অপব্যবহার ও দম্ভ প্রকাশ করতো। সুতারাং স্বেচ্ছাচারী পুরুষের জন্য শাস্তির বিধান অবতীর্ণ হলো। কিন্তু মহিলাদের অধিকারকে সংরক্ষণ করা হলো। মহিলা তার এবং তাঁর সন্তানদের ভরণ-পোষণের অধিকার লাভ করবে কিন্তু পুরুষ প্রায়শ্চিত্ত ব্যতীত স্বামী স্ত্রী সহবাসের অধিকার লাভ করবে না। যদি স্বামী অনুতপ্ত ভাবে স্ত্রীকে ফেরত পেতে চায়, তবে অবশ্যই আল্লাহ্‌ প্রদত্ত শাস্তি তাঁকে মেনে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের পুণঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি স্ত্রী স্বামীকে ভালোবাসে এবং তাদের দাম্পত্য জীবনকে ফিরে পেতে চায় তবে সে আবেদন করতে পারে এবং স্বামীকে প্রায়শ্চিত্ত করার দাবী জানিয়ে আবেদন জানাতে পারে।

৪। কিন্তু যার এ সামর্থ থাকবে না ৫৩৩৬, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাকে একাদিক্রমে দুই মাস সিয়াম পালন করতে হবে। কিন্তু যে তাতেও অসমর্থ, সে ষাটজন অভাবগ্রস্থকে খাওয়াবে ৫৩৩৭। ইহা এ জন্য যে, তোমরা যেনো আল্লাহ্‌র প্রতি এবং তাঁর রসুলের প্রতি বিশ্বাস প্রমাণ করতে পার। এই হচ্ছে [আল্লাহ্‌ কর্তৃক ] নির্ধারিত সীমা। যারা আল্লাহকে প্রত্যাখান করে, তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি ৫৩৩৯।

৫৩৩৬। দেখুন সূরা [ ৪ : ৯২ ] আয়াত। জিহরের মাধ্যমে স্ত্রীকে ত্যাগ করতে চাওয়াকে আল্লাহ্‌ অর্থহীন ঘোষণা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে দায়িত্ব জ্ঞানহীন পুরুষকে শাস্তি পেতে হবে। শাস্তিটি হচ্ছেঃ একজন ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে। নিজস্ব ক্রীতদাসও হতে পারে অথবা কোনও ক্রীতদাসের পক্ষ থেকে তার স্বাধীনতা ক্রয় করা যেতে পারে। যদি তা সম্ভব না হয় তবে উপর্যপুরি দুমাস একটানা রোজা রাখতে হবে। যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে ষাটজন গরীবকে আহার্য দান করতে হবে। দেখুন পরবর্তী টিকা।

৫৩৩৭। অভাবগ্রস্থকে আহার্য দানের উপরে বিজ্ঞজনের অভিমত হচ্ছে নিম্নরূপ : প্রতিজনের জন্য অর্দ্ধসা গম বা পূর্ণ 'সা' খেজুর প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করবে। এক 'সা ' প্রায় ৯ পাউন্ড ওজনের সমান। আবার অনেকের মতে এক 'মুদ' যা ২-১/৪ পাউন্ডের সমানই যথেষ্ট। অবশ্য এই পরিমাণ খাদ্য একজন পূর্ণবয়স্ক লোকের একদিনের খাদ্যের পরিমাণ হিসেবে যথেষ্ট। ব্যাপারটিকে এভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে না যেয়ে বক্তব্যের মূল নির্যাসকে অনুধাবনের মাধ্যমে এ কথা সহজ ভাবে বলা যায় যে, একজন অভাবগ্রস্থ ব্যক্তির দুবেলা যে পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন তা প্রচুর পরিমাণে দান করা। তৃপ্তির সাথে পেটভরে একজন অভাবগ্রস্থকে দুবেলা ষাট [ ৬০ ] দিন খাওয়ানো যেতে পারে, অথবা ষাট [ ৬০ ] জন অভাবীকে একদিনে দুবেলা খাওয়ানো যেতে পারে অথবা দুজন অভাবীকে ত্রিশ [ ৩ ০ ] দিন খাওয়ানো যেতে পারে ইত্যাদি। এ ব্যাপারে ধর্মীয় ভিত্তিতে চুলচেরা বিশ্লেষণের প্রয়োজন নাই।

৫৩৩৮। শাস্তির বিধান করা হয়েছে এ জন্য যে, আমরা যেনো আল্লাহ্‌র হুকুম মেনে নিয়ে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যকে প্রমাণ করতে পারি।
৫৩৩৯। আল্লাহ্‌র নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রাপ্য ক্ষুদ্র শাস্তিকে মেনে না নেওয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌র কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা তাঁর হুকুমকে অমান্য করা , তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করা। পরবর্তী আয়াতে আছে বৃহৎ অপমানকর লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির বিবরণ যা আল্লাহ্‌র আইন প্রত্যাখানকারীদের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে।

৫। যারা আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে তাদের অপদস্থ করে ধূলিতে মিশিয়ে দেয়া হবে, যেমন করা হয়েছিলো তাদের পূর্ববর্তীদের। নিশ্চয়ই আমি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছি। এবং অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি, -

৬। সেই দিন, যেদিন তাদের সকলকে একত্রে [ পুনরায় ] উত্থিত করা হবে এবং তাদের কার্যাবলীর প্রকৃত সত্য [ এবং অর্থ ] জানিয়ে দেয়া হবে ৫৩৪০। আল্লাহ্‌ উহার [ মূল্য ] হিসাব করেছেন, যদিও তারা তা বিস্মৃত হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ের সাক্ষী।

৫৩৪০। "তাদের কার্যাবলীর প্রকৃত সত্য এবং অর্থ জানিয়ে দেয়া হবে।" অনুরূপ আয়াত অনেক আছে কোরাণ শরীফের বিভিন্ন সূরাতে যেমন [ ৫ : ৪৮ ] ও টিকা ৭৬২ ; [ ৫ : ১০৫ ] ও টিকা ৮১১ [ ৬ : ৬০, ১০৮ ] ; [ ৯: ৯৪ ] ইত্যাদি। পৃথিবীর মোহ মানুষকে করে বিভ্রান্ত ও সত্য বিচ্যুত। ফলে তার উপলব্ধি ও অনুভব করার ক্ষমতা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বিভ্রান্তির বেড়াজালে। প্রকৃত সত্যকে বিভিন্ন ব্যক্তি তার উপলব্ধির সত্ত্বা অনুযায়ী বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখে থাকে এবং সমাজে কূটতর্কের জন্ম দেয়। যেমন : সমাজে অনেক সময়েই অনেক ভন্ড লোক দেখা যায় যারা সমাজের চক্ষে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। এদের কেউ সমাজতন্ত্রের নামে জনদরদী, কেউ মানবতার নামে, কেউ ধর্মের নামে জনদরদী। কিন্তু তাদের কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে। এরা তাদের অন্তরের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আত্মগোপন করে জনসমক্ষে নিজেকে পূত-পবিত্র এবং জনকল্যাণে আত্মনিবেদিত ব্যক্তি রূপে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে তাদের জনহিতকর কাজ তাদের মুখোশ বা ভণিতা মাত্র। অনেক সময়ে দেখা যায় যে, মানুষ আবেগ ও অনুভূতিতে আপ্লুত হয়ে কোন নেতাকে দেবতার আসনে বসায় যে যোগ্যতা তার নাই। এবং দুঃখের বিষয় এসব লোকেরাও সচেতনহীন ভাবে সেই কথা বিশ্বাস করে এবং নিজের দোষত্রুটি উপলব্ধির পরিবর্তে নিজেকে ফেরেশতা সমতুল্য ব্যক্তিরূপে গণ্য করে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে নিজেকে মহৎ ও বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারীরূপে কল্পনা করার প্রবণতা। নিজেকে দোষত্রুটি মুক্ত করার জন্য যা স্মরণ রাখা প্রয়োজন তা আমরা ভুলে যাই। যা ভুলে যাওয়া প্রয়োজন তা আমরা স্মরণ রাখি ও গর্বে অহংকারে স্ফীত হই। এর ফলে আমাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং  অন্তর্দৃষ্টি বা দূরদৃষ্টি ধীরে ধীরে হয়ে পড়ে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর, ফলে আমাদের মূল্যবোধ হয় অবক্ষয়ের সম্মুখীন, এবং আমরা মিথ্যা মূল্যবোধে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। এই আয়াতের মাধ্যমে ও অন্যান্য বহু আয়াতে আল্লাহ্‌ বারে বারে সাবধান করেছেন যে, শেষ বিচারের দিনে মানুষের এই মিথ্যা মূল্যবোধ, ভণিতা, প্রবণতা সব কিছুর অবসান ঘটবে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত সত্যরূপ হবে উদ্ভাসিত, মিথ্যার খোলস যাবে ঝড়ে। শুধু যে সত্য উদ্ভাসিত হবে তাই-ই নয়, আমরা আমাদের জীবনে কৃত প্রতিটি কাজের নিয়ত এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যকে অনুধাবনে সক্ষম হব। পৃথিবীর জীবনে এই বোধ আমাদের জীবনে থাকে অনুপস্থিত। পরলোকের জীবনে প্রকৃত সত্যকে অনুধাবনের মাধ্যমে আমাদের জ্ঞান চক্ষুকে উম্মীলিত করা হবে।

রুকু - ২

৭। তোমরা কি দেখ না, আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে আল্লাহ্‌ তা জানেন ? তিন জনের মধ্যে কখনও কোন গোপন শলা পরামর্শ হতে পারে না, যেখানে তিনি চতুর্থ ব্যক্তিরূপে উপস্থিত নাই; ৫৩৪১। এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠ জন হিসেবে তিনি তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকেন না। কিংবা ইহা অপেক্ষা কম বেশী হলেও তারা যেখানেই থাকুক না কেন, অবশ্য তিনি উহাদের সঙ্গেই আছেন। সব শেষে শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌ তাদের কৃতকর্মের সত্যতা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।

৫৩৪১। পার্থিব জীবন বহুভাবেই গোপনীয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ। মানুষ যে ভাবেই , যেখানেই গোপনীয়তা অবলম্বন করুক না কেন, আল্লাহ্‌র নিকট তা গোপনীয় থাকে না। সাধারণভাবে গোপনীয় কাজের বা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকে পাপ কার্য বা পাপবোধ, এই পাপ কাজ বা পাপবোধ যাতে সর্বসমক্ষে প্রকাশ না পায়, সে জন্যই লোকে গোপনীয়তার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় সকল কাজের সকল কুমন্ত্রণার, সকল পাপই সংঘটিত হয় আল্লাহ্‌র সম্মুখে। তাঁকে ফাঁকি দেওয়ার কোনও উপায়। নাই।

৮। তুমি কি সেই সকল লোকদের দেখ নাই, যাদের গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিলো ৫৩৪২ ? অথচ তাদের যা [ করতে ] নিষেধ করা হয়েছিলো তারা তারই পুনরাবৃত্তি করে। এবং [ তারা ] পাপ কাজ, অত্যাচার এবং রসুলের হুকুম অমান্য করার জন্য নিজেদের মধ্যে গোপন পরামর্শ করে। আর যখন তারা তোমার নিকট আসে, তখন তারা তোমাকে এমন [ বক্র ] কথা দ্বারা সালাম [ সম্ভাষণ ] করে, ৫৩৪৩ যার দ্বারা আল্লাহ্‌ তোমাকে সালাম করেন নাই। এবং তারা নিজেদের মধ্যে বলে, " আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদের শাস্তি দেন না কেন ৫৩৪৪ ?" তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। উহার মাঝে তারা জ্বলতে থাকবে, কত মন্দ সেই গন্তব্যস্থল।

৫৩৪২। মদিনার মুসলিম উম্মাহ্‌ ধীরে ধীরে যখন শক্তি সংগ্রহ করে শক্তিশালী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে, সে সময়ে ইসলামের বিরুদ্ধ শক্তিরা প্রকাশ্য সমরে বিজয় লাভ সম্ভব নয় জেনে গোপনে ইসলাম এবং রাসুলুল্লাহ্‌ (সা) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এই ষড়যন্ত্রের নেতা ছিলো মদিনার ইহুদীরা যারা ইসলামের অভ্যুত্থানে ছিলো চরম অসন্তুষ্ট এবং মোনাফেকেরা যারা ছিলো নামমাত্র মুসলমান কিন্তু সুযোগ সন্ধানী। এদের ষড়যন্ত্রের কলাকৌশল সম্বন্ধে কোরানের বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন সময়ে বর্ণনা করা হয়েছে যেমন [ ২ : ৮-১ ৬ ] ; এবং [ ৪ : ১৪২ - ১৪৫ ]।

৫৩৪৩। আল্লাহ্‌ রাসুলকে (সা) সম্বোধন করেছেন 'Salam' যার অর্থ শান্তি। কিন্তু রাসুলের (সা ) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা এই অভিবাদনের শব্দকে বিকৃত করে বলে 'Sam' যার অর্থ 'মৃত্যু বা ধ্বংস '। তারা সালামের শান্তির পরিবর্তে এই শব্দটি দ্বারা রাসুলকে সম্ভাষণ করতো। কারণ প্রকাশ্যে তারা তাদের মনের ভাবকে প্রকাশ করতে সাহস পেতো না। বিকৃত উচ্চারণ দ্বারা তারা সাধারণ মুসলিমদের ধোঁকা দিলেও তা ছিলো তাদের অন্তরের বিষোদ্গরণের একটি পন্থা মাত্র। বাইরে তাদের সম্ভাষণ ছিলো নম্র, ভদ্র ও শান্ত, কিন্তু তা ছিলো তাদের অন্তরের গরল ঢাকার উপায় স্বরূপ।

৫৩৪৪। ইসলামের শত্রুরা কৌশলপূর্ণ প্রতারণার মাধ্যমে তাদের বিকৃত মানসিকতাকে চরিতার্থ করছিলো এবং নিজেদের কৃতিত্বে তারা নিজেরাই ছিলো বিমোহিত। তারা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতো যে, "কেন আল্লাহ্‌ তাদের এই কৌশলপূর্ণ প্রতারণার জন্য শাস্তি দান করছেন না ?" এর উত্তর হচ্ছে : তাদের জন্য শাস্তি নির্ধারিত করা হয়েছে এবং তা অবশ্যই ভোগ করতে হবে। যদি এই পৃথিবীতে নাও হয় পরলোকে অবশ্যই তারা তা ভোগ করবে। কারণ পৃথিবীতে অনেক সময়েই আল্লাহ্‌ তাদের সময় ও সুযোগ দিয়ে থাকেন, তারা যেনো অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন দ্বারা এই সুযোগ গ্রহণ করে।

৯। হে মুমিনগণ ! যখন তোমরা গোপন পরামর্শ করবে, সে পরামর্শ যেনো পাপ কাজ, অত্যাচার এবং রসুলের হুকুম অমান্য করার জন্য না হয়। বরং তা করো পূন্যকাজ ও আত্ম সংযমের জন্য ৫৩৪৫। এবং আল্লাহকে ভয় করো যার নিকট তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।

৫৩৪৫। সাধারণ ভাবে মানুষের ধর্ম হচ্ছে কোন পাপ বা অন্যায় বা অপরাধের জন্য গোপনীয়তা অবলম্বন করা। এরূপ গোপনীয়তা হচ্ছে পাপ বা অন্ধকার রাজ্যে পদচারণা যা মানুষকে সমাজের দৃষ্টিতে লুকিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু এ ব্যতীত আর এক ধরণের কাজ আছে যা গোপন করার প্রবণতা পূণ্যাত্মারই সাক্ষ্য বহন করে। যেমন : দান করা বা অন্যায়কারীকে বাধা দান করা জন্য গোপনীয় কাজ করা। বিরোধী শক্তির [ অন্যায়কারী ] অপকৌশল ধ্বংস করার জন্য গোপন শলাপরামর্শ ইত্যাদি এগুলো পাপ নয় বরং পূণ্যকাজ। কারণ এর দ্বারা সমাজের নীরিহ সাধারণ মানুষেরা উপকৃত হয়। পাপকে প্রতিরোধ করা অন্যায়কারীর ষড়যন্ত্রকে ধূলিস্যাৎ করা, অপরাধীকে বন্দী করা ইত্যাদি জনহিতকর কার্যের জন্য গোপনীয়তা অবলম্বন করা পূণ্য কাজ। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে গোপনীয়তা অবলম্বন বা গোপনে পরামর্শ করা পাপ হবে না পূণ্য হবে তা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করবে কাজের নিয়ত বা উদ্দেশ্যের উপরে। ভেবে দেখতে হবে যার বিরুদ্ধে শলাপরামর্শ করা হচ্ছে সে কি পাপী ? সেকি সমাজের জন্য ক্ষতিকর ? সেকি আইন অমান্যকারী ? সমাজ ও জাতির জন্য যা কল্যাণজনক কাজ তা সব সময়েই পূণ্য কাজ। পরবর্তী আয়াতে সেই নির্দ্দেশ দেয়া হয়েছে এ ভাবে " সে পরামর্শ যেনো পাপাচরণ সীমালংঘন ও রাসুলের বিরুদ্ধাচারণ সর্ম্পকে না হয়।"

১০। গোপন পরামর্শ শয়তান দ্বারা [ অনুপ্রাণিত ] করা হয়, যেনো সে মুমিনদের দুঃখ দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহ্‌র অনুমতি ব্যতীত সে তাদের বিন্দুমাত্র অনিষ্ট করতে পারবে না ৫৩৪৬। মোমেনরা তাদের [ সকল ] বিশ্বাস আল্লাহ্‌র উপরে ন্যস্ত করুক।

৫৩৪৬। অশুভ শক্তি বা শয়তান মোমেন বান্দার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। তবে এর ব্যক্তিক্রম ঘটে যখন ১) বান্দাকে আল্লাহ্‌ দুর্যোগ ও বিপদের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান এবং ২) আপতঃদৃষ্টিতে যা ক্ষতিকর মনে হবে দূর ভবিষ্যতে মোমেন বান্দার জন্য আল্লাহ্‌ হয়তো তা মঙ্গলজনকরূপে উপস্থাপন করবেন। তবে এ কথা সর্বদা অন্তরে রাখতে হবে যে, আল্লাহ্‌র হুকুম ব্যতীত কিছুই সংঘটিত হয় না। বিপদ - বিপর্যয়, সুখে-দুঃখে আমরা সর্বদা তাঁরই ক্ষমতার উপরে নির্ভর করবো। এ কথা যেনো কখনও আমাদের মনে উঁকি না দেয় যে আমাদের বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান দ্বারা আমরা আমাদের বিপদ বা বিপর্যয় মোকাবিলা করতে পারবো। নির্ভরশীলতা হবে শুধু মাত্র আল্লাহ্‌র উপরে।

১১। হে মুমিনগণ ! যখন মজলিসে তোমাদের [ বসবার জন্য ] স্থান করে দিতে বলা হয়, ৫৩৪৭ তখন স্থান করে দিও। আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য [ প্রচুর ] স্থান করে দেবেন। এবং যখন তোমাদের উঠতে বলা হবে, তখন তোমরা উঠে দাঁড়াবে ৫৩৪৮। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, এবং যাদের [ অতিন্দ্রীয় ] জ্ঞান দান করা হয়েছে ৫৩৪৯ আল্লাহ্‌ তাদের [ উপযুক্ত ] মর্যদায় উন্নীত করবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ সে সম্বন্ধে সম্যক অবগত।

৫৩৪৭। কোনও সমাবেশ বা সভাকক্ষে নেতার আগমন সময়ে জনসাধারণের কি ধরণের আচরণ হওয়া উচিত তাই-ই এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেক সময়েই দেখা যায় সমাবেশে সকলেই নেতার কথা শোনার জন্য হুড়োহুড়ি করে এবং সম্মুখে নেতার কাছাকাছি যাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। যার ফলে সমাবেশ কক্ষে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় যা নেতার জন্য অসুবিধার সৃষ্টি করে এবং জনসাধারণের অসুবিধার সৃষ্টি করে। এরূপ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে "মজলিসে স্থান করে দাও।" অর্থাৎ চাপাচাপি করো না যেনো অন্য লোকের সমাবেশে নেতার কথা শোনার অধিকার খর্ব না হয়। আমাদের স্থান করে দিতে বলা হয়েছে তবেই আমাদের সৌজন্য বোধ, আমাদের আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের যোগ্য করে তুলবে, কারণ আল্লাহ্‌ বলেছেন," আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য প্রচুর স্থান করে দেবেন। "

৫৩৪৮। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে "উঠে দাড়াবে" এবং ইংরেজীতে এই বাক্যটির অনুবাদ হয়েছে 'Rise up' অর্থাৎ উঠে দাঁড়াও। এখানে উঠে দাঁড়াও শব্দটি কাউকে সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে। এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা সম্মানীয় ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করে আল্লাহ্‌ তাদের জন্য সম্মানের আসনের বন্দোবস্ত করবেন তাদের যোগ্যতা ও ক্ষমতা অনুযায়ী। 'Rise up' উঠিয়া দাঁড়াও ' শব্দটি দ্বারা এ কথা বুঝানো হয়েছে যে সমাবেশের শেষে হুড়োহুড়ি না করে ধীর স্থির ভাবে উঠে দাঁড়াতে হবে। এবং যেতে হবে।

৫৩৪৯। ঈমান বা বিশ্বাস, সকল বিশ্বাসীদের আল্লাহ্‌র রাজত্বে সমতার ভিত্তিতে স্থাপন করে। যে কোনও সুস্থ ও সভ্য সমাজে সকল নাগরিকদের সম অধিকার দান করা হয় - তখনই সে সমাজ হয় সুসভ্য এবং সুনীতিসম্পন্ন জাতি। মৌলিক অধিকারকে সমতার ভিত্তিতে স্থাপন করলেও মানুষের অন্তর্নিহিত নেতৃত্বের ক্ষমতা বা সৃজন ক্ষমতা, প্রতিভা, মেধা, বংশ মর্যদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির কারণে মানুষে মানুষে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত এই বিশেষ দান সমূহের জন্য ব্যক্তিকে,তার প্রতি আল্লাহ্‌ প্রদত্ত নেয়ামত সমূহের দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে। এই দায়িত্ব বহন করার ক্ষমতা নির্ভর করবে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উপরে। কারণ মেধা মনন শক্তি, সৃজনশীল ক্ষমতা, প্রতিভা প্রভৃতির প্রকৃত উন্মেষ তখনই ঘটে যখন ব্যক্তি তার নিজস্ব জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করতে পারে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত রাস্তায়। এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে অন্তর্দৃষ্টি বা অতীন্দ্রীয় জ্ঞান - যা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ প্রদত্ত। আল্লাহ্‌র রাজত্বকে যারা কল্যাণের দিকে পরিচালিত করার জন্য কাজ করে এবং আল্লাহ্‌ অর্পিত নিজস্ব দায়িত্বকে সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে আগ্রহী, আল্লাহ্‌ তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞাতে ধন্য করেন। এ ভাবেই সে সম্মান ও মর্যদা লাভ করে সমাজে ও পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রে। গায়ের জোড়ে এ মর্যদা লাভ করা যায় না।

১২। হে মুমিনগণ! যখন তোমরা রসুলের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে পরামর্শ করতে চাও ৫৩৫০ ; তোমাদের ব্যক্তিগত পরামর্শের পূর্বে দানে কিছু ব্যয় কর। এটাই হবে তোমাদের জন্য উত্তম এবং [ আত্মার ] পরিশুদ্ধতার সহায়ক ৫৩৫১। কিন্তু যদি তাতে অক্ষম হও, আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।

৫৩৫০। আল্লাহ্‌র রাজত্বে আধ্যাত্মিক জগতের উন্নতির জন্য আল্লাহ্‌ আমাদের সর্বাধিক সুযোগ করে দিয়েছেন। জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষকের [ রাসুল ] শিক্ষা ছিলো সকলের জন্য অবারিত। এখানে ধনী বা গরীবের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নাই। সকলেই সমভাবে রাসুলের নিকট গমনের অধিকারী ছিলো। কিন্তু মানুষ বড়ই দুর্বল চরিত্রের প্রাণী। সুতারাং মানুষের জন্য যে সমতার বাণী ইসলাম পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে তা থেকে সরে এসে রাসুলের (সা ) নিকট সমাজের সম্পদশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাঝে অন্যায় প্রবণতা দেখা যায়। তারা সময়ে অসমেয় অতি সাধারণ ব্যাপারে নিজেদের গুরুত্ব প্রদানের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ্‌র (সা ) কানে কানে কথা বলতো, এতে সময়ের অপচয় ছাড়াও নবীর অত্যন্ত কষ্ট হতো এবং অন্যদেরও অসুবিধা হতো। তাই রাসুলের (সা) সাথে চুপি চুপি কথা বলার পূর্বে সদ্‌কার নির্দ্দেশ দান করা হয়েছে। তাদের এই প্রবণতার কারণ নিম্নলিখিত :

১) তাদের ধারণা ছিলো যে তাদের ঘটনাটি বা ব্যাপারটি বিশেষ বিশেষত্বের দাবী রাখে, যা সর্বসাধারণের মাঝে প্রকাশ করা যুক্তিযুক্ত নয়;

২) তাদের ব্যাপারটি যদি সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়, তবে তাদের সম্মানের হানি হবে যা যুক্তি সঙ্গত নয়।

৩) হয়তো বা তারা প্রচন্ড স্বার্থপর, যে কারণে তারা রাসুলের (সা) মুল্যবান সময়কে নিজ স্বার্থে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করতে এবং নিজেকে সম্মানীত ব্যক্তিরূপে উপস্থাপনে আগ্রহী।

উপরে বর্ণিত তিনটি উদ্দেশ্যর কারণেই মানুষ রাসুলের (সা ) অমৃত উপদেশ বাণীকে কুক্ষিগত করতে চাইতো, যা কোরাণের এই আয়াতের মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে তাদের আত্ম উন্নতির পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয় নাই। সাধারণ মানুষ অহংকারে পরিপূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি। সুতারাং তাদের আত্ম উন্নতির পথকে সুগম করার জন্য বলা হয়েছে যে যদি তারা রাসুলের (সা) সাথে ব্যক্তিগত ভাবে চুপি চুপি আলোচনা করতে চায়, তবে তা করার পূর্বে তারা অবশ্যই গরীবদের জন্য কিছু দান করবে। মুসলিমগণ এই নির্দ্দেশের ফলে সতর্ক হন এবং মুনাফেকরা সাদকা করার ভয় এ থেকে বিরত থাকে।

৫৩৫১। মানুষের এই দুর্বলতা আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমার যোগ্য। সে কারণেই এই ব্যবস্থা গরীবকে অর্থ দানের মাধ্যমে তাদের এই ব্যক্তিগত দোষত্রুটি সম্বন্ধে বোধদয় ঘটবে এবং অর্থ প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে তারা তাদের দোষত্রুটি পরিশুদ্ধ করার সুযোগ লাভ করবে। সর্বোপরি গরীবকে দান করার প্রবণতা তাদের গরীবের দুঃখ - দুর্দ্দশা উপলব্ধির মাধ্যমে আত্ম শুদ্ধির পথে পরিচালিত করবে। ফলে তাদের কর্মের উদ্দেশ্য বা নিয়ত হবে পরিশুদ্ধ। আবার একই সাথে আল্লাহ্‌ এই বিশেষ 'দান' কে বাধ্যতামূলক করেন নাই বলা হয়েছে কেউ অক্ষম হলে, আল্লাহ্‌ "ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু "।

১৩। তোমরা কি [ তার সাথে ] ব্যক্তিগত পরামর্শের পূর্বে দান খয়রাত করতে ভয় পাচ্ছ ৫৩৫২ ? যদি তাই-ই হয় তবে তোমরা তা [ দান ] করো না এবং আল্লাহ্‌ তোমাদের ক্ষমা করবেন। তবে [ কমপক্ষে] নিয়মিত সালাত কায়েম কর ; যাকাত দাও ৫৩৫৩ ; এবং আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসুলের আদেশ পালন কর। তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ সে সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।

৫৩৫২। টিকা ৫৩৫০ তে মানুষের যে সব দুর্বলতার উল্লেখ করা হয়েছে যার দরুণ তাকে দান করতে বলা হয়েছে, সে সব দুর্বলতার কারণে মানুষ হয়তো যৎসামান্য দান করতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু যদি তাদের পরামর্শের জন্য বেশী অর্থ দান করতে হয়, তবে হয়তো তাদের আত্মশুদ্ধির এই পথকে পরিহার করার প্রবণতা জন্ম লাভ করবে যা সকলের জন্য তা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে তারা কি করবে ? তারা কি সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যাপারটি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবে? এখানে বলা হয়েছে তার প্রয়োজন নাই। তবে তারা তাদের নামাজ ও যাকাত যথাযথ ও যত্নের সাথে পালন করবে। " আল্লাহ্‌ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন " অর্থাৎ আল্লাহ্‌র রাসুল (সা) তাদের "বিশেষ দান " যার উল্লেখ আছে আয়াত ১২ তা থেকে অব্যহতি দেবেনে। এই বিশেষ ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ বিত্তশালীদের কুক্ষিগত করার প্রবণতা থেকে রক্ষা করেন এবং গরীবদের জন্য সমতার ভিত্তিতে অংশ গ্রহণের সুযোগ করে দেন। রাসুলের সাথে পরামর্শের জন্য সকলের সম অধিকার। অর্থ বিত্ত যেনো এই অধিকারকে কেড়ে না নেয় আবার অর্থের প্রাচুর্য যেনো সুবিধাবাদী শ্রেণী গড়ে না তোলে। রাসুলই (সা) ভালো অবগত আছেন, ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগত ভাবে সমাজ বা জাতির জন্য কোনটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়।

৫৩৫৩। ' যাকাত' - যাকাত হচ্ছে বাধ্যতামূলক দান যা নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের মাধ্যমে পরিশোধযোগ্য।

রুকু -৩

১৪। তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর নাই ৫৩৫৪, যারা, আল্লাহ্‌ যে সম্প্রদায়ের প্রতি রুষ্ট, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে ৫৩৫৫ ? তারা তোমাদের দলভূক্ত নয়, তাদেরও দলভূক্ত নয়, এবং তারা জেনে বুঝে মিথ্যা শপথ করে ৫৩৫৬।

৫৩৫৪। এই আয়াতে যাদের উল্লেখ করা হয়েছে তারা মদিনার মোনাফেক শ্রেণী। তারা ভাণ করতো যে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে তারা মুসলমান অপেক্ষা ইহুদীদের সাথে বেশী একাত্মতা বোধ করতো। দেখুন টিকা ৫৩৪২।

৫৩৫৫। এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয়, সে সময়ে মদিনার ইহুদীরা এবং পার্শ্ববর্তীস্থানের ইহুদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করতো। সে সময়ে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাদের জবাবদিহিতার জন্য ডাকা হয়।

৫৩৫৬। এসব মোনাফেকরা খুব ভালোভাবেই জানতো যে মুসলমান হিসেবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচেছ মুসলমানদের বা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকা এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সাহায্য করা, এ সত্য জানার পরেও তারা বিরুদ্ধাচারণ করে।

১৫। আল্লাহ্‌ তাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত করেছেন। তারা যা করে তা অবশ্যই মন্দ।

১৬। তাদের শপথগুলি [ তাদের মন্দ কাজের ] পর্দা স্বরূপ। এরূপেই তারা [ মানুষদের ] আল্লাহ্‌র পথে বাঁধা দান করে ৫৩৫৭। সুতারাং তাদের জন্য আছে অপমানকর শাস্তি।

৫৩৫৭। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ৬৩ : ২ ] মোনাফেকদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা হবে মিথ্যাবাদী। আর এই মিথ্যাকে ঢাকার জন্য তারা পুণঃ পুণঃ শপথের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। তাদের এই শপথ দ্বারা সত্যকে প্রতারিত করার প্রয়াস পায় ; যেনো কোন লোক সত্যকে গ্রহণ না করে। সত্যকে প্রত্যাখাত করার তাদের এই অপকৌশল শুধু মাত্র সন্দেহ প্রবণ ও বিশ্বনিন্দুককেই প্রতারিত করতে পারবে।

১৭। তাদের ধন সম্পদ বা তাদের সন্তান-সন্ততি, আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে কোন কাজেই আসবে না ৫৩৫৮। তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী, সেথায় তারা চিরদিন থাকবে।

৫৩৫৮। যারা ঈমানহীন এবং সত্যকে প্রত্যাখানকারী, তারা সাধারণতঃ তাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, জনশক্তি, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির জন্য গর্ববোধ করে এবং অহংকার করে বেড়ায়। কিন্তু যিনি এই সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা ও অধিপতি তাঁর নিকট এ সব পার্থিব বস্তু সম্ভারের কোনও মূল্য নাই। শেষ পর্যন্ত এ সব লোকের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।

১৮। একদিন আল্লাহ্‌ তাদের সকলকে উত্থিত করবেন [ বিচারে জন্য ] তখন তারা আল্লাহ্‌র নিকট শপথ করবে ৫৩৫৯, এখন যেমন তারা তোমাদের নিকট শপথ করছে। এবং তারা মনে করে যে তারা [ প্রতিষ্ঠিত আছে ] ভালো কিছুর উপরে। না, অবশ্যই না। তারা তো মিথ্যাবাদী।

৫৩৫৯। শেষ বিচারের দিনের মোনাফেকদের মানসিক অবস্থার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। প্রথমে তারা এ দিনের প্রকৃত তাৎপর্য ও ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারবে না। তাদের ধারণা হবে, পৃথিবীতে তারা যেরূপ মিথ্যা ভাষণ ও মিথ্যা শপথ দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতো, ঠিক সেই একই ভাবে তারা পরলোকের জীবনেও মিথ্যা শপথ দ্বারা আল্লাহ্‌র জ্ঞানকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হবে। কিন্তু তা করতে তারা সক্ষম হবে না কারণ তাদের যে ধারণা তারা "ভালো কিছুর উপরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে " - সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে। তাদের সকল প্রচেষ্টা ভিত্তিহীন মিথ্যা ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত। মিথ্যা সর্বদাই মিথ্যা - তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হবেই। সুতারাং মিথ্যার মূল্যহীন প্রলোভন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সকলে অনুধাবন করুক।

১৯। শয়তান তাদের উপরে প্রভাব বিস্তার করেছে ৫৩৬০। সুতারাং সে তাদের আল্লাহকে স্মরণ করতে ভুলিয়ে দিয়েছে। ওরা তো শয়তানেরই দল। প্রকৃত পক্ষে, শয়তানের দলই ধ্বংস হয়ে যাবে।

৫৩৬০। মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে পূত পবিত্র চরিত্রের অধিকারী রূপে [ ৩০ : ৩০ আয়াত ও টিকা ৩৫৪১ ]। সময়ের পরিক্রমায় সংসারের প্রলোভনে সে হয় সত্যপথ থেকে বিচ্যুত, ফলে সে আত্মার পবিত্রতা হারায়। কারণ নবী রসুলদের সতর্কবাণী সত্বেও মানুষ মন্দ ও পাপের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং শয়তান তাদের উপরে প্রভাব বিস্তার করার ফলে তারা আল্লাহ্‌র পথ বা সৎ পথকে ভুলে যায় এবং সর্বান্তকরণে "শয়তানের দলে " যোগদান করে। মানুষ আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি - অর্থাৎ আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ঐশী গুণাবলীর অধিকারী। পাপের বিকৃত মানসিকতা তার সর্বসত্ত্বাকে গ্রাস করে ফেলে, সে হয় শয়তানের অংশীদার, পরিণতিতে মানব আত্মার করুন পরিণতি বা ধ্বংস।

২০। যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তারা হবে চরম লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভূক্ত ৫৩৬১।

৫৩৬১। পরকালের শাস্তি সকলের জন্য সমান নয়। পাপের প্রকৃতি অনুযায়ী তার তারতম্য ঘটবে। এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা আল্লাহ্‌ ও রাসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে তাদের শাস্তি হবে চরম লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য ও অবলম্বন বোধ। রাসুলের (সা) মাধ্যমে আমরা আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যের এই পথকে খুঁজে পেয়েছি। এই পথের আহ্বান অপ্রতিরোধ্য। কারণ এই আনুগত্যই হচ্ছে আত্মার প্রকৃত ধর্ম যা আত্মাকে শান্তির নিলয়ে পৌঁছে দেয়। যারা এই অপ্রতিরোধ্য আহ্বানে সাড়া দিতে অক্ষম তারা তাদের আত্মাকে কলুষিত করার সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যায় যার পরিণতি ভয়াবহ।

২১। আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন, " আমিই এবং আমার রাসুলগণ অবশ্যই বিজয়ী হবে।" একমাত্র আল্লাহ্‌-ই শক্তিতে পরিপূর্ণ, [ তাঁর ] ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম ৫৩৬২।

৫৩৬২। 'Aziz' শব্দটির অর্থের জন্য দেখুন [ ২২ : ৪০ ] আয়াতের টিকা ২৮১৮।

২২। আল্লাহ্‌ এবং শেষ বিচারের দিনে যারা বিশ্বাস করে, এমন কোন লোককে তুমি দেখবে না, তাদেরকে ভালোবাসতে, যারা আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে; যদিও তারা তাদের পিতা, কিংবা পুত্র, কিংবা আত্মীয় স্বজন হয় ৫৩৬৩। এদের হৃদয়ে আল্লাহ্‌ ঈমানকে সুদৃঢ় করেছেন ৫৩৬৪, এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহু দ্বারা তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন ৫৩৬৫। এবং তিনি তাদেরকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন, পাদদেশে যার নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা [ চিরদিন ] থাকবে। আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং তারাও আল্লাহ্‌র প্রতি সন্তুষ্ট হবে ৫৩৬৬। এরা হলো আল্লাহ্‌র দল ৫৩৬৭। সত্যই, এরাই আল্লাহ্‌র সেই দল যারা প্রশান্তি লাভ করবেন।

৫৩৬৩। প্রকৃত মোমেন বান্দাদের গুণাবলীকে এখানে বিবৃত করা হয়েছে। যদি কেউ প্রকৃত পক্ষে বিশ্বাস করে যে আল্লাহ্‌ আমাদের স্রষ্টা, প্রতিপালক,সকল কল্যাণের মালিক, পরকালে তাঁর নিকটেই ইহকালের জবাবদিহি করতে হবে এবং পরলোকে আমাদের সকল কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হবে সত্য ও ন্যায়ের মানদন্ডে, তবে সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিশ্বাসে, ধর্মমতে, আচরণে, সব কিছুতে আমূল পরিবর্তন ঘটে যেতে বাধ্য। এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী লোকেরা জীবনের কোনও অবস্থাতেই পাপ, অন্যায় ও অসত্য বা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাথে একাত্মতা অনুভব করবে না। হতে পারে তারা তার নিকট আত্মীয় সেক্ষেত্রেও তারা তাদের সাথে একাত্মতাবোধ করার পরিবর্তে সত্যের পতাকাতলে সমবেত হবে।।

৫৩৬৪। "ইহাদের অন্তরে আল্লাহ্‌ ঈমানকে সুদৃঢ় করেছেন।" অর্থাৎ তাদের অন্তরে বিশ্বাস বা ঈমান অনপনেয় কালিতে অঙ্কিত হয়ে যায়। তারা কখনও আল্লাহ্‌র সাথে মিথ্যাচারণ করবে না।

৫৩৬৫। 'রূহু' অর্থাৎ হেদায়েতের আলো যা দ্বারা অন্তরকে অন্ধকার মুক্ত করে উদ্ভাসিত করা হয় অথবা জিবরাঈল (আ)। দেখুন আয়াত [ ২ :৮৭ ] ও টিকা ২৫৩, যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ্‌ হযরত ঈসা ( আ) কে পবিত্র রূহু দ্বারা শক্তিশালী করেন। এই আয়াতে আমাদের বলা হয়েছে যে, পূণ্যাত্মা ব্যক্তিদেরও আল্লাহ্‌ 'রূহু ' দ্বারা তাদের ঈমানকে বৃদ্ধি করতে ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করেন। যখনই কোন মোমেন বান্দা তাঁর আত্মাকে সকল পাপ মুক্ত করে পূত পবিত্র রাখে এবং সেই আত্মাকে সে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসাতে নিবেদিত করে আল্লাহ্‌ তা গ্রহণ করেন এবং প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ প্রার্থীদের ঈমানকে আরও সুদৃঢ় করেন। শুধু তাই-ই নয় তাদের ঈমানকে সুদৃঢ় ও মজবুত করার জন্য আল্লাহ্‌ তাদের পবিত্র রূহু দ্বারা সাহায্য করেন। এই 'রূহৃ' বা পবিত্র আত্মা বা হেদায়েতের আলোকে কোনও মানুষের ভাষাতে বর্ণনা করা সম্ভব নয় - এ হচ্ছে আল্লাহ্‌র বিশেষ গুণবাচক উপাধি যা মনুষ্য ভাষাতে বর্ণনা করা যায় না।

৫৩৬৬। পূণ্যাত্মাদের জন্য আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের পুরষ্কারের বর্ণনা করা হয়েছে এই আয়াতে। মানব জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যা বর্ণনা করা হয়েছে আধ্যাত্মিক মুক্তি বেহেশতের বর্ণনার মাধ্যমে। পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকে যে মানব সৃষ্টির স্রোতধারা বয়ে চলেছে কোন অনাদি ভবিষ্যতের পানে - মনে হয় মানব সভ্যতার এই স্রোতধারা মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে কিছুই হারায় না। মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্য হচ্ছে পৃথিবীতে পূত পবিত্র,জীবন যাপনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগ্রত্য প্রদর্শন করে পরলোকের অনন্ত জীবনে বেহেশত বা আধ্যাত্মিক প্রশান্তির অধিকারী হওয়া। পবিত্র জীবন যাপন এবং ঈমান বা আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস ও একান্ত আনুগত্য এই-ই হচ্ছে পরলোকে মুক্তির পথ। যে তা লাভ করে পৃথিবীতে সে শুধু যে তাঁর আত্মার মাঝে অপার বেহেশতি শান্তির পরশ অনুভব করে তাই ই নয়; তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেরও আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। সৃষ্টির আদিতে আত্মার যে পবিত্রতাসহ সে জন্মলাভ করেছিলো, যে সব গুণাবলী সে স্রষ্টার নিকট থেকে লাভ করেছিলো, পূত-পবিত্র জীবন যাপনের দ্বারা এবং স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্যের মাধ্যমে সে আত্মার আদি অবস্থা প্রাপ্ত হয় যা তার জন্য বয়ে আনে অপার শান্তির অনুভূতি। এই অনুভূতি আর কিছু নয় এ হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির প্রকাশ। " আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট " এই বাক্যটিতে সন্তুষ্টিকে বর্ণনা করা হয়েছে পারস্পরিক। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে বান্দা যখন আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয় তার সর্ব সত্ত্বা, অন্তঃকরণ হয় সে আবেশে আপ্লুত। স্বর্গীয় প্রশান্তি তার সর্ব সত্ত্বাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে সে হয় স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট। এই পারস্পরিক সন্তুষ্টি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে মানব জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য বা সিদ্ধি লাভ।

৫৩৬৭। আয়াত ১৯ এ যে দলের উল্লেখ ছিলো তার বর্ণনা ছিলো 'শয়তানের দল ' রূপে। এই আয়াতে তার বিপরীত ভাবধারা প্রকাশ করা হয়েছে, ' আল্লাহ্‌র দল' উল্লেখের দ্বারা। শয়তান বা পাপীর দল তাদের কৃতকর্মের দ্বারাই ধ্বংস হয়ে যাবে। অপর পক্ষে যারা ন্যায় ও সত্যের অনুসারী বা পূত পবিত্র জীবন যাপন করে এবং আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যে আত্মোৎসর্গ করে যাদের বলা হয়েছে আল্লাহ্‌র দল তারা অনন্ত জীবন লাভ করবে বেহেশতি শান্তির মাধ্যমে। যদিও সারা সৃষ্টিই হচেছ আল্লার তবুও মানুষ তার কৃতকর্মের দ্বারা শয়তানের দলে পরিণত হয়।