Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫ জন
আজকের পাঠক ১২ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৫৯৮৯৮ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২২৩৬৯০ বার
+ - R Print

সূরা মুল্‌ক


সূরা মুল্‌ক বা সম্রাজ্য - ৬৭

৩০ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এতক্ষণে আমরা কোরাণ শরীফের পনের ভাগের চৌদ্দ ভাগ শেষ করেছি। এ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে উম্মার মুসলিম ভাতৃত্বের বিকাশের অগ্রগতি।

এই সূরাতে এসে ধারাবাহিকতাতে সাময়িক যতি টানা হয়েছে। পরবর্তী পনেরটি সূরা হচ্ছে গীতি কবিতা। এর অধিকাংশ মক্কাতে অবতীর্ণ। এই সূরাগুলির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন। এগুলিকে অন্য ধর্মের প্রার্থনা সঙ্গীত বা ধর্মীয় সংগীতের সাথে তুলনা করা চলে যা আধ্যাত্মিক ভাবধারাতে পূর্ণ। কোরাণের এই সূরাগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এগুলির সৌন্দর্য, গভীর অর্থ, মহনীয়তা, চমৎকারিত্ব এবং সর্বপরি মনের উপরে এর প্রভাব, অতুলনীয়। যেহেতু এই সূরাগুলির উৎস মহাজ্যোতির্ময় প্রভুর মহান অস্তিত্বকে ধারণ করে, সেহেতু এগুলির হেদায়েতের আলো অন্তরের গভীর অন্ধকারকে বিদির্ণ করে প্রবেশ লাভে সক্ষম। যদিও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনকেই মনে হয় প্রকৃত সত্য, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে প্রকৃত জীবনের নগন্য ও সামান্য পরিমাণ এবং দ্রুত অপসৃয়মান। এ সব সূরার ভাবধারাকে প্রকাশের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীকধর্মী ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা আমাদের চেনা জানার জগতের আধ্যাত্মিক দিগন্তকে উন্মোচিত করে।

পরলোকের অনন্ত জীবনের তুলনায় ইহলোকের অস্তিত্ব ছায়ার ন্যায়। বাইরের চাকচিক্যময় পার্থিব জীবন ও গভীর আধ্যাত্মিক জীবনের তুলনার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

এই সূরাটি মধ্য মক্কান সূরা ; ৬৯ ও ৭০ নং সূরার অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বক্ষণে এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। এ সূরাতে আল্লাহকে সম্বোধন করা হয়েছে রাহমান [ পরম করুণাময় ] হিসেবে। যে ভাবে তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে রব [ প্রভু ও প্রতিপালক ] এবং রাহ্‌মান হিসেবে ৬৯ নং সূরাতে।


সূরা মুল্‌ক বা সম্রাজ্য - ৬৭

৩০ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। মহিমান্বিত ৫৫৫৪ তিনি, যার হাতে রয়েছে সর্বময় কর্তৃত্ব ৫৫৫৫। সকল বিষয়ের উপরে তিনি সর্বশক্তিমান ; -

৫৫৫৪। যখন আমরা আল্লাহ্‌র নামকে মহিমান্বিত করি তার দ্বারা আমরা কি বুঝাতে চাই ? আমরা বুঝাতে চাই যে, আমরা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ সমূহ সনাক্ত করতে সক্ষম এবং তা আমরা সর্বান্তকরণে ঘোষণা করি। আমাদের সকল সমৃদ্ধি ও সুখ শান্তি তাঁরই দান। "যার হাতে রয়েছে সর্বময় কর্তৃত্ব।" - আল্লাহ্‌ যিনি সকল বিশ্বের প্রভু এবং নিখিল বিশ্বের সকল ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের সীমিত জ্ঞানে পার্থিব জীবনে আমরা প্রভুত্ব অথবা ক্ষমতাকে সাধারণভাবে ভালো এবং বদান্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখে থাকি। কিন্তু আল্লাহ্‌র রাজত্বে এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য নাই। তিনি-ই সেই সর্বশক্তিমান প্রভু যার বদান্যতা তুলনাহীন।

৫৫৫৫। 'Mulk' অর্থ রাজত্ব, প্রভুত্ব, সার্বভৌমত্ব, ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা। 'সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান ' বাক্যটি দ্বারা বুঝাতে চাওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ তাঁর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা রাখেন ; পৃথিবীর কোনও শক্তিই তাঁকে বাধা দান করতে সক্ষম নয়। এখানে আল্লাহ্‌র বদান্যতা বা মঙ্গল ইচ্ছাকে তাঁর ক্ষমতা ও প্রভুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতসমূহে বিষদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

২। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মরণ এবং জীবন ৫৫৫৬, যেনো তিনি পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম ৫৫৫৭। এবং তিনি ক্ষমতায় পরাক্রমাশালী। বারে বারে ক্ষমাশীল ৫৫৫৮।

৫৫৫৬। ' তিনিই সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন।' লক্ষ্য করুন এই আয়াতে "জীবনের" উল্লেখের পূর্বে "মরণ" উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াত [ ২ : ১৮ ] এর বর্ণনা হচ্ছে " অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদের জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুণরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তাঁর দিকেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে। " আবার সূরা [ ৫৩ : ৪৪ ] আয়াতের বর্ণনাতে মৃত্যুর উল্লেখ জীবনের পূর্বে করা হয়েছে। এ সব আয়াত থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে,

১) পৃথিবীর জীবন শুরুর পূর্বে হয়তো আমরা ছিলাম অস্তিত্ববিহীন বা অন্যরূপে বিরাজমান;

২) পৃথিবীতে আমরা যে ভাবে অবস্থান করছি একদিন সে জীবনের অবসান ঘটবে, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে না। কারণ আত্মা অমর। শুধু আত্মার সামনে থাকবে পর্দা বা বাঁধার প্রাচীর যা উল্লেখ আছে সূরা [ ২৩ : ১০০] আয়াতে 'Barzak' শব্দটি দ্বারা। এই পর্দার আবরণ থাকবে দৈহিক মৃত্যুর পর থেকে শেষ বিচারের পূর্ব পর্যন্ত। শেষ বিচারের দিনে এই পর্দার অবসান ঘটবে এবং পরে প্রত্যেকের জন্য হবে নূতন জীবনে যাত্রা। সে জীবন হবে অনন্ত জীবন নূতন পৃথিবীতে নূতন আঙ্গিকে যার উল্লেখ আছে সূরা [ ১৪ : ৪৮ ] আয়াতে।

৫৫৫৭। আমরা জানি না পৃথিবীতে আগমনের পূর্বে আমাদের অবস্থান কি ছিলো, আবার পৃথিবীর জীবনকে মৃত্যুর মাধ্যমে ত্যাগ করার পরে আমাদের অবস্থান কি হবে। আমাদের চেতনা শুধু এই পার্থিব জীবনকেই ঘিরে থাকে। এ কথা কেউ যেনো মনে না করে যে জীবন শুধুমাত্র পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রে আনন্দ উৎসবের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; এ জীবন উদ্দেশ্য বিহীন, মৃত্যুই জীবনের সমাপ্তি এনে দেবে। যদিও পার্থিব জীবন শুরু করার পূর্বের অবস্থা এবং মৃত্যুর পরের অবস্থান আমরা কল্পনা করতে পারি না; কিন্তু আল্লাহ্‌ আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এই আয়াতের মাধ্যমে। জীবনের বৃহত্তর ও মহত্তর উদ্দেশ্য রয়েছে এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেককে উত্তম কর্ম বা সৎ কাজের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে। এ পৃথিবীর জীবনে, পৃথিবীর জীবনকে আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করবার জন্য "তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।"

৫৫৫৮। মানুষ দুর্বলচিত্ত। এই দুর্বলচিত্ত মানুষ জীবনের বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতে সক্ষম। কারণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তিনি "পরাক্রমশালী " এবং তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম। তিনি ক্ষমাশীল অন্যথায় দুর্বল মানুষের পক্ষে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব ছিলো না।

৩। তিনিই স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ ৫৫৫৯। তুমি পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোন ত্রুটি দেখতে পাবে না। সুতারাং পুণরায় তোমার দৃষ্টিকে ফেরাও, [ দেখ ] কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?

৫৫৫৯। দেখুন সূরা [ ৬৫ : ১২ ] আয়াত ও টিকা ৫৫২৬ - ২৭। আকাশকে বর্ণনা করা হয়েছে সপ্তাকাশ হিসেবে। বর্তমান বিজ্ঞান মহাকাশের রহস্যভেদে আত্মনিয়োগ করেছে - তারা স্বীকার করে যে মহাকাশের রহস্য তারা খুব কমই জানে। হয়তো তা হবে সাতটি ছায়াপথের সমষ্টি - ভবিষ্যতের বিজ্ঞানই বলে দেবে এর সমাধান। আমরা অনন্ত নক্ষত্রবীথির মাঝে ক্ষুদ্র মানব সন্তান যার অস্তিত্ব বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় অতি নগণ্য। আমাদের দৃষ্টিতে যা ভাস্বর তা হচ্ছে অনন্তের বিশাল ব্যপ্তির মাঝে অপরূপ শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য। যেখানে ছায়াপথে বিরাজমান শত শত নক্ষত্রপুঞ্জ নির্দিষ্ট নিয়মে ছুটে চলেছে যার ক্ষুদ্র অংশই পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি পথে ভাস্বর। মহাশূন্যের এই বিশালত্বের ধারণাই মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে স্রষ্টার বিশালত্বের ধারণায়। তবেই উপলব্ধির সিড়ি বেয়ে আমরা অর্ন্তদৃষ্টির মাধ্যমে পরলোকের জীবনের বিশালত্ব অনুভব করতে পারবো।

৪। পুণরায় বারে বারে তুমি দৃষ্টি ফেরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে ৫৫৬০।

৫৫৬০। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে অসীম আকাশের উপমার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ষমতার ও বিশালত্বের প্রতি। বিশ্ব ব্রহ্মান্ড আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের এই প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্‌র ক্ষমতার প্রতি যা নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত। আমাদের বলা হয়েছে অনন্ত নীলাকাশ এবং এর মাঝে বিরাজমান নক্ষত্রপুঞ্জ পুনঃপুনঃ গভীর অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করি না কেন আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মাঝে আমরা কোন ত্রুটি বা বিশৃঙ্খলা বের করতে পারবো না। তাঁর সৃষ্টি করার ক্ষমতা, সমন্বিত, নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত। আল্লাহ্‌র সৃষ্ট সপ্ত আকাশ এত বিশাল যে সে বিশালত্বের ধারণা করা আমাদের মত ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে অসম্ভব। পর্যবেক্ষণ আমাদের দৃষ্টিকে ক্লান্ত করে দেবে তবুও আমরা এর শেষ দেখতে পাব না। এমনকি জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ টেলিস্কোপের সাহাযেও আকাশের শেষ প্রান্ত দেখা সম্ভব নয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীগণ হাবেল টেলিস্কোপ স্থাপন করেছেন মহাশূন্যে - যার সাহায্যে প্রতিনিয়ত অনন্ত নক্ষত্র বীথির, নিঃসীম নীল আকাশের ছবি পৃথিবীর মানুষ প্রাপ্ত হচ্ছে। মানুষ আশ্চর্য হয়ে যায় আকাশের সীমাহীন ব্যপ্তি লক্ষ্য করে। যত মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পাচ্ছে, তত মানুষ মহাকাশের বিশালত্বের ধারণাতে হতবাক হয়ে পড়ছে। মহাকাশের রহস্যের কোন সীমা নাই। এই বিশাল সৃষ্টি কৌশলের মধ্যে কোনও ত্রুটি নাই। যদি সামান্যতম ত্রুটিও থাকতো তবে গ্রহ নক্ষত্র পরস্পর সংঘর্ষে মহাকাশে বিপর্যয় ঘটে যেতো। এ থেকে মানুষকে তার ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্বের ধারণা করতে বলা হয়েছে।

৫। আর নিশ্চয় আমি [ দুনিয়ার ] নিকটতম আসমানকে ৫৫৬১ সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং এই সব [ প্রদীপকে ] করেছি শয়তানকে বিতাড়ণের ক্ষেপনাস্ত্র ৫৫৬২। এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি।

৫৫৬১। "নিকটবর্তী আকাশের" জন্য দেখুন টিকা সূরা [ ৩৭: ৫ ] আয়াতের টিকা ৪০৩৫।

৫৫৬২। নির্মেঘ রাতের আকাশে যে উল্কাখন্ডের পতন হয়, তা প্রতীকের সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে সূরা [ ১৫ : ১৬- ১৮ ] আয়াতে এবং টিকাতে ১৯৫১ - ৫৪ ] উল্কাকেও সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য কারণ বলা হয়েছে, " উহাদের করেছি শয়তানকে বিতাড়ণের ক্ষেপনাস্ত্র।" কিন্তু কেউ যদি এ সব বস্তুর প্রতি অযৌক্তিকভাবে, কুসংস্কারবশতঃ ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, যা তাদের কল্পনা প্রসূত, তবে তারা কি জলন্ত অগ্নির শাস্তি নিয়ে খেলা করছে না ? সে শাস্তির পরিমাণ র্নিধারণ করার ক্ষমতা কারও নাই।

৬। যারা তাদের প্রভু [ ও প্রতিপালককে ] ৫৫৬৩, প্রত্যাখান করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। উহা অতি মন্দ গন্তব্যস্থল।

৫৫৬৩। পূর্বের আয়াত সমূহে নক্ষত্রপুঞ্জকে বলা হয়েছে আকাশের সৌন্দর্য প্রদীপরূপে। নিঃসীম মহাশূন্যে নক্ষত্রপুঞ্জ ছুটে চলেছে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মাধ্যমে। দৃশ্যমান আকাশে কোথাও বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু কোন তারা যদি তার গতিপথে বাধাপ্রাপ্ত হয় তবে তা বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হয় ও শেষ পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। উল্কা খন্ড হচ্ছে তারই প্রমাণ। এই উপমার সাহায্যে আধ্যাত্মিক জগতকে তুলে ধরা হয়েছে। যখন কেউ তার প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, এর থেকে বড় পাপ, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতে আর কি আছে ? কারণ আমাদের স্রষ্টা, আমাদের প্রতিপালক শুধুমাত্র আমাদের কল্যাণ প্রত্যাশী। সুতারাং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণাম হচ্ছে জাহান্নামের আগুন যার বর্ণনা আছে পরবর্তী দুটো আয়াতে। উল্কা যেরূপ বাধাপ্রাপ্ত হলে ছাই হয়ে যায়, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জগতও সেরূপ খোদাদ্রোহিতার ফলে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

৭। যখন তাদের সেখানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা উহার [ ভয়ংকর ] নিঃশ্বাস টানার শব্দ শুনতে পাবে ৫৫৬৪ ; আর উহা হবে উদ্বেলিত ; -

৫৫৬৪। 'Shahiq' -শব্দটির জন্য দেখুন সূরা [ ১১ : ১০৬ ] আয়াত। সেখানে [ ফোঁপাইয়া কাঁদা ] শব্দটিকে তুলনা করা হয়েছে 'Zafir' [ দীর্ঘশ্বাস ] শব্দটির সাথে। এখানে ক্রিয়াপদ 'fara' ক্রিয়াপদটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে উদ্বেলিত হওয়া বা বিষ্ফোরিত হওয়া, তীব্র বেগে নির্গত হওয়া। সূরা [ ১১ : ৪০ ] আয়াতে 'fara' ক্রিয়াপদটি ব্যবহার করা হয়েছে তীব্রবেগে বন্যার পানি বের হওয়া বুঝানোর জন্য। এখানে ঐ একই ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হয়েছে তীব্রবেগে জ্বলন্ত অগ্নিশিখাকে বুঝানোর জন্য যা শাস্তির প্রতীক। জাহান্নামের আগুন হবে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। পাপীদের শেষ পরিণতি ধ্বংস তা পানির দ্বারাই হোক বা আগুনের দ্বারাই হোক।

৮। যেনো ক্রোধে ফেটে পড়বে। যখনই কোন দলকে উহাতে নিক্ষেপ করা হবে, ইহার রক্ষীরা জিজ্ঞাসা করবে, " তোমাদের নিকট কি কোন সর্তককারী আসে নাই ? " ৫৫৬৫

৫৫৬৫। দেখুন সূরা [ ৩৯ : ৭১ ] আয়াত ও টিকা ৪৩৪৮। 'যখনই ' শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে প্রত্যেকবার। হয়তো একই ফেরেশতা সর্বক্ষণ দোযখের দ্বার পাহারাতে নিযুক্ত থাকবেন না। সুতারাং যখনই নূতন লোক দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে, সে সময়ে যে ফেরেশতা দ্বারে থাকবেন এই আয়াতের জিজ্ঞাসা হবে সেই ফেরেশতার। ফেরেশতাদের চরিত্রে কোন বক্রতার বা পাপের স্থান নাই, সুতারাং তাদের পক্ষে মানুষের চরিত্রের মন্দ ও পাপকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সুতারাং এত লোক শাস্তির জন্য আগমন করছে দেখে তারা আশ্চর্য হয়ে যাবে। সে কারণেই তারা জিজ্ঞাসা করবে যে, তাদের নিকট কি কোনও সতর্ককারী প্রেরিত হয় নাই ? প্রকৃত সত্য হচ্ছে মানুষ তার পৃথিবীর শিক্ষানবীশকালে আল্লাহ্‌ মানুষকে বারে বারে নবী-রসুলদের মাধ্যমে তাঁর নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করেছেন। এই নিদর্শন এসেছে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে, সৎ মানুষের বিবেকের মাধ্যমে এবং আমাদের চারিদিকের বিশ্ব প্রকৃতির মাধ্যমে

৯। তারা বলবে, " হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের নিকট একজন সর্তককারী এসেছিলো, কিন্তু আমরা তাকে প্রত্যাখান করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ্‌ কোন [ প্রত্যাদেশ ] প্রেরণ করেন নাই। তোমরা তো মহা বিভ্রান্তিতে রয়েছ।" ৫৫৬৬

৫৫৬৬। এ সব পাপীরা আল্লাহ্‌র নিদর্শনকে প্রত্যাখানই করেছিলো শুধু তাই-ই নয় তারা আল্লাহ্‌র অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছিলো। শুধু তাই নয় এরা আল্লাহ্‌র প্রেরিত নবী ও রসুলদের নির্যাতন ও হত্যা করেছিলো। [ ৩৬ : ৩০ ]। এরা এসব আধ্যাত্মিক শিক্ষকদের বোকা, পাগল, এবং বিভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করতো।

১০। তারা আরও বলবে, " যদি আমরা শুনতাম অথবা আমাদের বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম ৫৫৬৭, তাহলে আমরা এখন জ্বলন্ত অগ্নিবাসীদের দলভূক্ত হতাম না।"

৫৫৬৭। মানুষ হচ্ছে আল্লাহ্‌র খলিফা। আল্লাহ্‌ তাঁকে সীমিত আকারে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন, বিবেক দান করেছেন, ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্যের মধ্যে পাথর্ক্য করার মত ক্ষমতা দান করেছেন। পূণ্যের রাস্তায় চলার জন্য আল্লাহ্‌ আধ্যাত্মিক শিক্ষকদের প্রেরণ করেছেন যুগে যুগে। সকল যুগের সকল মানুষের পক্ষে এসব শিক্ষকদের সাথে ব্যক্তিগত সংস্পর্শ লাভ করা সম্ভব নয় সত্য। কিন্তু তাদের মত ও চিন্তাধারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে যা যুগে যুগে মানুষকে প্রেরণা জাগায়, মানুষের বিবেককে জাগরিত করতে সাহায্য করে। মানুষ ইচ্ছা করলেই বিবেক ও বুদ্ধির সাহায্যে তাদের শিক্ষাকে বুঝতে ও অন্তরে ধারণ করতে সক্ষম হতো। কারণ আল্লাহ্‌ প্রতিটি মানুষের আত্মার মাঝে এই ধারণ ক্ষমতা দান করেছেন। মানুষ এই বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগে অক্ষমতার দরুণ জাহান্নামবাসী হয়ে নরক যন্ত্রণা ভোগ করবে।

১১। অতঃপর তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে ৫৫৬৮। কিন্তু [ তখন ] জাহান্নামের অধিবাসীদের থেকে [ ক্ষমা হবে ] বহুদূর।

৫৫৬৮। এসব জাহান্নামের অপরাধীরা শেষ বিচারের অগ্নি পরীক্ষাতে অনুত্তীর্ণ হয়ে দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে। তখন তাদের জ্ঞানচক্ষু উম্মীলিত হবে। এমনকি ফেরেশতার প্রশ্নের উত্তরেও তারা মিথ্যাভান করতে ভয় পাবে। তারা স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের অপরাধ স্বীকার করবে। কিন্তু তাদের এই স্বীকারোক্তি অনুতাপ হিসেবে গৃহীত হবে না। কারণ অনুতাপের শর্তই হচ্ছে আত্মসংশোধন। আর পৃথিবীর জীবন শেষে সেই আত্মসংশোধনের সুযোগ লাভ করা যায় না

১২। যারা আল্লাহকে না দেখেও ভয় করে ৫৫৬৯, তাদের জন্য আছে ক্ষমা এবং মহাপুরষ্কার।

৫৫৬৯। দেখুন সূরা [ ৩৫ : ১৮ ] আয়াতের টিকা ৩৯০২। দৃষ্টির অগোচরে অর্থ আল্লাহকে না দেখেও অন্তরের মাঝে তাঁর অস্তিত্বকে অনুভব করা এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভয় করা মন্দ বা পাপ কাজ থেকে দূরে থাকা। এরূপ ক্ষেত্রে ভয় হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। এই ভালোবাসা এতটাই তীব্র যে সে আল্লাহ্‌র অপছন্দ যে কোনও কাজ করতে ভয় পাবে কারণ প্রভুর ভালোবাসা হারানোর ভয়ে তার অন্তর সর্বদা ভীত থাকবে। আল্লাহ্‌র ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খায় তার সর্বসত্ত্বা উম্মুখ হয়ে থাকবে। এই ভালোবাসার স্রোত ফল্গুধারার ন্যায় অন্তরের মাঝে প্রবাহিত হতে থাকে। বাইরের পৃথিবীর স্বীকৃতি বা সুনাম বা লোক দেখানোর জন্য তার কোনও কাজ হবে না। তার কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন। অন্তরে যখন আল্লাহ্‌র জন্য এরূপ সুতীব্র ভালোবাসার স্রোত প্রবাহিত হয়, তখন পরম করুণাময়ের ক্ষমা, যে পাপ বান্দার জীবনে অতীতে ঘটে গেছে, লাভ করা যায়। এরূপ ক্ষেত্রেই আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের "মহাপুরষ্কারে" পুরষ্কৃত করেন, আল্লাহ্‌র ভালোবাসার পূণ্য সলিলে অবগাহন দ্বারা। যে পুরষ্কার আল্লাহ্‌র ভালোবাসা, তা মানুষের কল্পনা, স্বপ্ন -সাধনার, ধ্যানের সীমা অতিক্রম করে যায়।

১৩। তোমাদের কথা গোপনেই বল বা প্রকাশ্যেই বল, অবশ্যই [ সকল ] হৃদয়ের গোপনীয়তা সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ অবগত।

১৪। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না ৫৫৭০? এবং তিনিই বুঝতে পারেন সুক্ষ রহস্য [এবং] সে সম্বন্ধে সম্যক অবগত।

৫৫৭০। শিল্পী তার শিল্পের প্রতিটি আচরণ সম্বন্ধে অবগত। যিনি বিশ্ব সৃষ্টির শিল্পী তিনি তাঁর শিল্প কর্মের প্রতিটি খুটিঁনাটি অবশ্যই অবগত। আমাদের মত সীমিত অপূর্ণ জ্ঞানের আদম সন্তানের উচিত নয় আল্লাহ্‌র জ্ঞানের পরিমাপ করা। তাঁর জ্ঞানকে 'Latif' এবং 'Khabir' শব্দদ্বয় দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। যার বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে 'সুক্ষদর্শী ' ও 'সম্যক অবগত' দেখুন সূরা [ ২২ : ৬৩ আয়াতের টিকা ২৮৪৪ ]।

রুকু -২

১৫। তিনিই ভূমিকে তোমাদের জন্য ব্যবহারযোগ্য করেছেন ৫৫৭১। সুতারাং এর দিগ-দিগন্তে ভ্রমণ কর এবং তিনি যে জীবনোপকরণ দিয়েছেন, তা উপভোগ কর। কিন্তু তাঁর নিকটেই ঘটবে পুণরুত্থান। ৫৫৭২

৫৫৭১। " তোমাদের জন্য ভূমিকে ব্যবহারযোগ্য করে দিয়েছেন " - এই বিশাল পৃথিবী মানুষের জন্য দুর্গম সন্দেহ নাই। কিন্তু মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মরুভূমির মধ্যে পথ তৈরী করে মরুভূমিকে জয় করেছে। সুউচ্চ পর্বতকে অতিক্রম করার রাস্তা তৈরী করেছে, নদী ও সমুদ্র পথকে জয় করেছে নৌকা ও জাহাজের সাহায্যে। আকাশ পথকে অতিক্রম করেছে উড়োজাহাজের সাহায্যে। সুতারাং প্রকৃতি যে দুর্গমতা দ্বারা মানুষকে ভয় দেখাতো মানুষ তা নিজ বুদ্ধিমত্তার দ্বারা জয় করেছে। আর এই বুদ্ধিমত্তা আল্লাহ্‌র দান, যার ব্যবহারের ফলে জলে, স্থলে, আকাশে, মানুষের বিচরণ হয়েছে সহজ ও আরামদায়ক।

৫৫৭২। আল্লাহ্‌র করুণা, দয়া এবং সদয় তত্বাবধান আমাদের পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে করেছে আরামদায়ক। কিন্তু আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে পরলোকের অনন্ত জীবন।

১৬। তোমরা কি [ তখন ] নিরাপদ বোধ কর যে, যিনি আকাশে রয়েছেন, তিনি [ ইচ্ছা করলে ] পৃথিবী তোমাদের আত্মসাৎ করে নিতে পারে, যখন তা [ ভূমিকম্পের সময়ে ] কাঁপতে থাকে ? ৫৫৭৩

৫৫৭৩। দেখুন সূরা [ ১৭ : ৬৮] আয়াত ও টিকা ২২৬৩। আরও দেখুন কারুণের গল্প সূরা [ ২৮: ৭৬- ৮২ ] আয়াতে। যদিও আমাদের নিকট পৃথিবীটাকে সুন্দর, আরামদায়ক এবং নিরাপদ মনে হয়, তবে তার কারণ আল্লাহ্‌ ভূমিকে করেছেন মানুষের জন্য বাধ্য, পরিচালনা যোগ্য, সেবা করতে ইচ্ছুক; সুবিধাজনক এবং কার্যোপযোগী [ উপরের আয়াত ১৫ ]। মানুষের জন্য এই দান আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ। যদি আমরা আল্লাহ্‌র আইনকে প্রত্যাখান করি তবে কি আমরা পার্থিব জীবনের এই নিরাপত্তা ভোগ করতে পারবো ? পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী আরাম আয়েশ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে ? ভূমিকম্প বা টর্ণেডো, ঘুর্ণিঝড়, বন্যা, প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূহুর্তের মধ্যে আমাদের সকল নিরাপত্তা, সুখ, শান্তি ধূলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। সুতারাং বর্তমান জীবনের নিরাপত্তা আরাম আয়েশ সবই আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ মাত্র।

১৭। অথবা তোমরা কি [ তখন] নিরাপদ বোধ কর যে, যিনি আকাশে রয়েছেন, তিনি [ ইচ্ছা করলে,কঙ্কর বর্ষণ সহ ] ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড় তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করবেন ৫৫৭৪? যেনো তোমরা জানতে পার আমার সর্তকবাণী কতটা [ ভয়ঙ্কর ] ছিলো?

৫৫৭৪। দেখুন [ ১৭: ৬৮ ] আয়াত ; এবং সূরা [ ২৯: ৪০] আয়াত ও টিকা ৩৪৬২ ] লূতের উপদেশ প্রত্যাখান করার ফলে এরূপ প্রচন্ড 'কঙ্কর বর্ষী ঝঞা তাদের উপরে পতিত হয়।

১৮। তাদের পূর্ববর্তী মানুষেরা আমার [ সর্তকবাণী ] অবশ্যই প্রত্যাখান করেছিলো। ফলে, তাদের প্রতি আমার প্রত্যাখান ছিলো কতটা [ ভয়ংকর ] ? ৫৫৭৫

৫৫৭৫। দেখুন সূরা [ ২২ : ৪২ - ৪৪ ] আয়াত ও টিকা ২৮২২।

১৯। তারা কি তাদের উর্দ্ধদেশের বিহঙ্গকুলকে লক্ষ্য করে না ৫৫৭৬ ? যারা তাদের ডানাগুলিকে মেলে দেয় ও গুটিয়ে ফেলে ? ৫৫৭৭। পরম করুণাময় [আল্লাহ্‌ ] ব্যতীত কেউ তাদের [ উর্দ্ধে ] ধারণ করে রাখতে পারে না। অবশ্যই তিনিই সব কিছুর সম্যক দ্রষ্টা।

৫৫৭৬। প্রকৃতির রাজ্যে বিহঙ্গকূলের আকাশে উড্ডীয়মান হওয়া এক অত্যাশ্চর্য সুন্দর ঘটনা। তাদের পালক, শরীরের কাঠামো, হাড়, আকৃতি অর্থাৎ চঞ্চু থেকে পুচ্ছ পর্যন্ত সকল কিছুই এমন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সৃষ্টি যে তারা পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে অতিক্রম করে নীল আকাশে ডানা মেলে বিচরণের ক্ষমতা রাখে। বিহঙ্গকূলের নীল আকাশে ডানা মেলে ওড়া, আকাশ থেকে ডানা গুটিয়ে পৃথিবীর মাটি থেকে শীকারকে ছো মেরে ধরা, বা নীলাকাশে ডানা মেলে স্থির থাকা সব কিছুই মানুষকে প্রেরণা যুগিয়েছে বিমান ও বিমান চালনা সংক্রান্ত বিজ্ঞান আবিষ্কারে। কিন্তু পাখীকে আকাশে ওড়ার এই জ্ঞান কে শিখিয়েছে ? কে তাকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের সাথে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা দান করেছে? সেটা একমাত্র বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্‌রই দান। তাঁরই অশেষ করুণাতে প্রতিটি প্রাণী লাভ করে পৃথিবীতে বাঁচার এবং পরিবেশের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলার ক্ষমতা। মানুষ বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে মুগ্ধ ও চমৎকৃত হয়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞানের সব জ্ঞানই প্রকৃতি বিজ্ঞানের জ্ঞান যা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত

৫৫৭৭। বিহঙ্গকূল উড়ার প্রক্রিয়ায় পক্ষযুগলকে বিভিন্নভাবে আন্দোলিত করে থাকে। এর বর্ণনায় যে আরবী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা যেরূপ সুন্দর ও শৈল্পিক যে তার উপযুক্ত অনুবাদ করা কোন ভাষাতেই সম্ভব নয়। 'Saffat' অর্থাৎ শূন্যে ডানা মেলে দেয়া ; যার দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে অনুভূতি তা হচ্ছে ডানা মেলে ক্রমাগত উচ্চে ওঠা। আবার 'yaqbidhna' অর্থ ডানা গুটানো। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে ছন্দে ছন্দে ডানাকে আন্দোলিত করা।

২০। পরম করুণাময় আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কে তোমাদের সৈন্য হয়ে তোমাদের সাহায্য করতে পারে ? অবিশ্বাসীরা তো রয়েছে বিভ্রান্তির মধ্যে। ৫৫৭৮

৫৫৭৮। মানুষের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, সর্বাপেক্ষা বিশাল সৈন্য সমাবেশেরও সাধ্য নাই আল্লাহ্‌র ক্রোধকে মোকাবিলা করার। পৃথিবীতে আমরা বেঁচে থাকি সে তো আল্লাহ্‌রই সদয় তত্বাবধানের জন্য। যদি কেউ আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারও সাহায্য কামনা করে তবে তারা আত্ম প্রবঞ্চনার মধ্যে বাস করে। তারা বিভ্রান্ত।

২১। যদি আল্লাহ্‌ জীবনোপকরণ বন্ধ করে দেন, তবে কে তোমাদের জীবনোপকরণ সরবরাহ করবে ৫৫৭৯ ? বস্তুত ওরা উদ্ধত্য, অবিশ্বাস ও সত্য বিমুখতায় অবিচল রয়েছে।

৫৫৭৯। দেখুন সূরা [ ১৬ : ৭৩ ] ও টিকা ২১০৫। 'জীবনোপকরণ' শব্দটি কোরাণ শরীফের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। জীবনোপকরণ বলতে সেই সব উপকরণকেই বোঝানো হয় যা পার্থিব, মানসিক ও আধ্যাত্মিক জগতের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। অর্থাৎ পৃথিবীতে শান্তি ও সমৃদ্ধিপূর্ণ জীবন ধারণের জন্য যে সব উপকরণের প্রয়োজন সবই "জীবনোপকরণ "। আমাদের এই জীবনোপকরণ আল্লাহ্‌র একক দান। যদি কেউ মনে করে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কেউ তার সাহায্যকারী আছে তবে সে মহাবিভ্রান্তির মাঝে বাস করে। আত্ম অহংকার মানুষকে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরতার পরিবর্তে স্বনির্ভরতার প্রতি আকর্ষণ করে। এ সব লোক উদ্ধত অহংকারে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং দাম্ভিকতা হয় এদের বৈশিষ্ট্য যা অধার্মিকতা। "বস্তুত উহারা উদ্ধত্য, অবিশ্বাস, অবাধ্যতা, ও সত্য বিমুখতায় অবিচল রয়েছে। "

২২। সুতারাং যে অবিবেচকের ন্যায় মুখ নীচু করে চলে ৫৫৮০, সেই সঠিক ভাবে পরিচালিত না কি সেই ব্যক্তি যে ঋজু হয়ে সরল পথে চলে ? ৫৫৮১

৫৫৮০। দেখুন [ ২৭ : ৯০ ] আয়াত ও টিকা ৩৩২০। যে ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ ও সাধু সে সর্বদা "ঋজু হয়ে সরল পথে " চলবে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ তাঁর হবে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে সিক্ত। ঋজু হয়ে, অর্থাৎ উন্নত মস্তকে ভয়হীন ও দ্বিধাহীন, নিঃশব্দ চিত্তে জীবনের পথকে সে অতিক্রম করবে। অপরপক্ষে যে ব্যক্তি অন্যায়কারী ও পাপী তার বর্ণনা হচ্ছে সে "মুখ নীচু করে চলে।" এর অর্থ হচ্ছে পাপ ও অন্যায়বোধ তার চিত্তকে ভয় ও শঙ্কাতে পরিপূর্ণ করে তোলে। পাপের পথ হচ্ছে জীবনের জন্য অন্ধকার পথ, সে পথে পাপীর পদচারণা হচ্ছে নিম্নাভূমুখী। এর উপমা হচ্ছে অন্ধকার পথে সে চলে হোচ্‌ট খেতে খেতে - তার হৃদয় সর্বদা পরিপূর্ণ থাকে ভয়, শঙ্কা ও অবিশ্বাসে। এই দুধরণের লোকের ব্যবধান হচ্ছে পৃথিবীর দুই মেরুর মাঝে যে ব্যবধান। যদিও তারা একই পৃথিবীতে বাস করে একই আলো বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়। আল্লাহ্‌র একই নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে এবং আল্লাহ্‌র নেয়ামত সমভাবে ভোগ করে, তবুও তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের মানসিকতার মধ্যে হয় দুস্তর ব্যবধান।

৫৫৮১। "সরল পথ" দ্বারা সেই পথকে বোঝানো হয়েছে যে পথের সন্ধান হযরত ইব্রাহীম তাঁর পিতাকে দিতে চেয়েছিলেন। দেখুন সূরা [ ১৯ : ৪৩ ] আয়াত।

২৩। বল, "তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ৫৫৮২, [ এবং শারীরিক বৃদ্ধি ঘটান ] ৫৫৮৩, এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, অনুভূতি এবং অনুধাবন ক্ষমতা। তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

৫৫৮২। 'বল' দ্বারা রাসুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। বিশ্ববাসীকে বলতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ সকল কিছুর স্রষ্টা সকল সমৃদ্ধি ও উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু। তিনি মানুষকে বিভিন্ন মানসিক দক্ষতাতে সমৃদ্ধ করেন। যার সাহায্যে মানুষ উচ্চতর সম্মান ও মানসিক সমৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভে সক্ষম। এই উচ্চতর মানসিক দক্ষতাসমূহকে প্রকাশ করা হয়েছে 'শ্রবণশক্তি" অর্থাৎ সাধারণ থেকে অসাধারণ শোনার ক্ষমতা, 'দৃষ্টিশক্তি' অর্থাৎ সাধারণ থেকে অসাধারণ কিছু দেখার ক্ষমতা, 'অনুধাবন' অর্থাৎ উপলব্ধি করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা বলেই মানুষ পশু থেকে উন্নত এবং মানুষ পৃথিবীর সকল বাধাকে অতিক্রম করে নিজ আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্ষমতা বলেই সে আধ্যাত্মিক জগতে ফেরেশতাদের থেকেও সমুন্নত। সে পৃথিবীর খলিফা।

৫৫৮৩। 'Anshaa' শব্দটির জন্য দেখুন সূরা [ ৬ : ৯৮] আয়াতের টিকা ৯২৩।

২৪। বল, " তিনিই পৃথিবীতে তোমাদের বংশ বৃদ্ধি করেছেন ৫৫৮৪, এবং তাঁর নিকটই তোমাদের সমবেত করা হবে"।

৫৫৮৪। মানুষ একজোড়া পিতামাতা থেকে সৃষ্টি হয়ে বংশবৃদ্ধি করে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সাথে তারা বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম দান করেছে। যত পার্থক্যই তাদের মাঝে লক্ষ্য করা যাক না কেন তাদের সকলকেই শেষ বিচারের দিনে একস্থানে সমবেত করা হবে। সেদিন মানুষের সকল পাপকে ধ্বংস করে ফেলা হবে, শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সত্য সারা পৃথিবীতে বিরাজ করবে।

২৫। তারা জিজ্ঞাসা করে; " তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে বল কবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে? " ৫৫৮৫

৫৫৮৫। যারা আল্লাহ্‌র একত্বে এবং অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয় তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। তারা হয় সন্দেহবাতিক তাদের প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী আয়াতে দেয়া হয়েছে।

২৬। বল, " সময় সম্বন্ধে জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্‌র নিকটেই রয়েছে ৫৫৮৬ আমাকে [ প্রেরণ ] করা হয়েছে জনসাধারণকে সুস্পষ্টভাবে সাবধান করার জন্য।

৫৫৮৬। অবশ্যই প্রতিটি মানুষকে তাঁর পৃথিবীতে কৃত কর্মের হিসাব দাখিল করতে হবে। তবে কখন সেই শেষ বিচার অনুষ্ঠিত হবে তা জানেন শুধুমাত্র সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌। রাসুলের দায়িত্ব হচ্ছে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য তা প্রকাশ্যে পরিষ্কার ভাবে ঘোষণা করা। দুষ্কৃতিকারী অন্যায়কারী, পাপীদের শাস্তি দান করা তার কর্তব্য নয়, অথবা তাদের জন্য শাস্তি ত্বরাণ্বিত করাও তার কাজ নয়।

২৭। অবশেষে, যখন তারা তা অতি নিকটে দেখবে ৫৫৮৭, তখন অবিশ্বাসীদের মুখমন্ডল ম্লান হয়ে পড়বে। এবং [ তাদের ] বলা হবে, " এই হল [ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ], যা তোমরা আহ্বান করছিলে।" ৫৫৮৮

৫৫৮৭। "তা" অর্থাৎ কেয়ামতের শাস্তি। যখন তা প্রকৃতপক্ষে কাফেরদের দৃষ্টিগোচর করানো হবে তখন তাদের বোধদয় ঘটবে। অবিশ্বাসীরা বুঝতে পারবে যে তারা যাদের ধর্মমত বা বিশ্বাসকে উপহাস করতো তাই-ই প্রকৃত সত্য। তাদের সন্দেহ পোষণ ছিলো পরিপূর্ণ ভ্রান্ত।

৫৫৮৮। কেয়ামত দিবসকে অবিশ্বাসের দরুণই তারা তা উপহাসের পাত্র বলে বিবেচনা করতো। অবশ্যই তারা কেয়ামতের শাস্তিকে প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিলো। এখন তা নিকটবর্তী এবং অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের পথ রুদ্ধ।

২৮। বল, " তোমরা কি চিন্তা করেছ ? যদি আল্লাহ্‌ আমাকে ও আমার সাক্ষীদের ধ্বংস করতে চান ৫৫৮৯ অথবা আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন, [অবশ্যই তা করতে পারেন ], তবে অবিশ্বাসীদের কে ভয়াবহ শাস্তি থেকে উদ্ধার করবে" ?

৫৫৮৯। যারা অবিশ্বাসী ও সন্দেহবাতিক তাদের বক্তব্য দুনিয়াতে এরূপ হবে, " যদি সেরূপ বিপর্যয় আসে তবে ভালো ও মন্দ সকলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তোমরা যেরূপ বল যে, আল্লাহ্‌ তাঁর করুণা ধারা পাপী পূণ্যাত্মা সকলের জন্য সমভাবে বর্ষণ করে থাকেন।" এর উত্তর এই আয়াতে দেয়া হয়েছে, " আমাদের [ পূণ্যাত্মাদের ] জন্য চিন্তা করো না। যদি আমরা আমাদের সকল পূণ্যবান সঙ্গী সাথীসহ ধ্বংস হয়ে যাই, তাতে তোমাদের তো কোনও উপকারে আসবে না। তাতে তোমাদের কি সান্তনা ? তোমাদের পাপের দরুণ তোমরা নিদারুণ কষ্টে পতিত হবে, কিন্তু আমরা যদি কষ্টে পতিত হই তবে আমরা মনে করি তা আমাদের আত্মিক বিশুদ্ধতার জন্য, আমাদের কল্যাণের জন্য আল্লাহ্‌র দান ক্ষমা লাভ করবো। কারণ আমরা জানি আল্লাহ্‌ করুণাময়, আমরা তারই করুণার উপরে বিশ্বাসী। কাফেরদের অন্তরে এরূপ বিশ্বাসের কোনও স্থান নাই। দেখুন পরের আয়াত।

২৯। বল; " তিনিই পরম করুণাময় আল্লাহ্‌। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করি; ও তারই উপরে নির্ভর করি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে [ আমাদের মধ্যে ] কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে "। ৫৫৯০

৫৫৯০। দেখুন উপরের টিকা। আমরা মুসলমান হিসেবে বিশ্বাস করি আল্লাহ্‌ আমাদের মালিক। তিনি আমাদের সকল বিপদ বিপর্যয়ের থেকে রক্ষা করবেন - যদি আমরা সৎ পথে জীবনধারণ করি এবং অতীতের পাপের জন্য অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন করি। আল্লাহ্‌র উপরে এই নির্ভরশীলতা আত্মার মাঝে শান্তি আনে। দুঃখভরা পৃথিবীতে বাস করেও দুঃখ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা যায়। কিন্তু অবিশ্বাসী কাফেরদের দুঃখ থেকে নিষ্কৃতি লাভের এরূপ কোনও স্থান নাই। হতভাগ্য তারা। পরলোকে যখন তারা প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি হবে, তখন তারা বুঝতে সক্ষম হবে বিশ্বাসী না অবিশ্বাসীরা কারা সঠিক পথে ছিলো। "কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।"

৩০। বল, " তোমরা ভেবে দেখেছ কি ? কোন সকালে যদি তোমাদের নদীগুলি [ ভূগর্ভে ] হারিয়ে যায়, তবে কে তোমাদের স্বচ্ছ প্রবাহিত পানি সরবরাহ করতে পারবে ? " ৫৫৯১

৫৫৯১। সূরাটি শেষ করা হয়েছে অপরূপ সুন্দর একটি উপমার মাধ্যমে যার সাহায্যে আধ্যাত্মিক জীবনের উৎসকে তুলে ধরা হয়েছে। পানির গতির ধারা যেরূপ নিম্নাভিমূখী ; আল্লাহ্‌র রহমতের ধারাও সেরূপ নিম্নাভিমূখী। প্রতিদিনের জীবনে আমরা যদি কখনও প্রভাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখি পৃথিবীর উপরিভাগ পানি শূন্য হয়ে গেছে, সকল উৎস শুকিয়ে মাটির নীচে চলে গেছে; তাহলে তার অবশ্যাম্ভবী পরিণতি হবে পৃথিবীর সকল জীবের মৃত্যু। সেরূপ ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা ও করুণা ব্যতীত আধ্যাত্মিক জীবনের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। আধ্যাত্মিক জীবনের প্রাণ হচ্ছে, ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা, করুণা, ও দয়া যার গতি পানির ন্যায় উর্দ্ধলোক থেকে নিম্নলোকে। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের মূল কেন্দ্র হচ্ছে ঐশ্বরিক করুণাধারা। আমাদের সর্ব অস্তিত্বের জন্য আমরা সর্বশক্তিমানের দয়া ও করুণার প্রার্থী। জাগতিক কোনও শক্তিই আল্লাহ্‌র সমকক্ষ নয়। আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দয়া ও করুণা ঝরণার স্বচ্ছ পানির ন্যায়। ঝরণার প্রবাহমান পানি যেরূপ পরিষ্কার, সুস্বাদু যার সাথে কর্দমাক্ত ঘোলা পানির কোনও তুলনাই চলে না। ঠিক সেরূপ আল্লাহ্‌র সদয় তত্বাবধান, প্রজ্ঞা, করুণা যা মানব জীবনকে ঘিরে থাকে যা মানুষের আধ্যাত্মিক শক্তিকে উজ্জীবিত করতে তুলনাহীন। পৃথিবীর সকল জ্ঞানের ভান্ডার তার তুলনায় ঐ কর্দমাক্ত পানির ন্যায়। কারণ পার্থিব জ্ঞান অনেক সময়েই জীবনকে আলোকিত করার পরিবর্তে তমসাচ্ছন্ন করে ফেলে। পানির অভাবে পৃথিবী যেরূপ জীবন শূন্য হয়ে যাবে ঠিক সেরূপ যে আত্মা আল্লাহ্‌র রহমত বঞ্চিত হবে সে আত্মা শেষ পর্যন্ত মৃত আত্মাতে রূপান্তরিত হবে। এই আয়াতটিতে পার্থিব জীবনের উপমার মাধ্যমে ইহলোককে অতিক্রম করে পারলৌকিক জীবনকে উপলব্ধিতে সাহায্য করেছে। প্রবাহমান পানির স্রোত যেরূপ তার গতিধারার জন্য উৎস হিসেবে ঝরনার উপরে নির্ভরশীল। ঠিক তদ্রূপ হচ্ছে ঐশ্বরিক করুণা ধারা যার প্রবাহ উচ্চ থেকে নিম্নে মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের মাঝে।