Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৭২ জন
আজকের পাঠক ১২১ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৪৫৭৩৭ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২১৩৭০৮ বার
+ - R Print

সূরা কালাম


ঊনত্রিংশতিতম পারা

সূরা কালাম বা কলম - ৬৮

৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ সূরাগুলির মধ্যে প্রথমার্ধে অবতীর্ণ হয়। সাধারণ মুসলমানদের ধারণা যে, অবতীর্ণের ধারাবাহিকতায় এই সূরার অধিকাংশ দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। প্রথম সূরা যেটি অবতীর্ণ হয় সেটি হচ্ছে সূরা নং ৪৬ [ ইক্‌রা ] আয়াত হচ্ছে [ ৪৬ : ১ - ৫ ]।

পূর্ববর্তী সূরাতে মানুষের মিথ্যা দম্ভকে তুলনা করা হয়েছে প্রকৃত সত্যের বিপরীতে। এই সূরাতে ঐতিহাসিক উদাহরণের মাধ্যমে এই তুলনাকে তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেকবান ও জ্ঞানী। যারা তাদের সীমিত জ্ঞানে তা বুঝতে অক্ষম ছিলো, তারাই তাকে পাগল ও বিকৃত মস্তিষ্করূপে আখ্যায়িত করতো। ঠিক সেরূপ পৃথিবীতে যুগে যুগে প্রকৃত সত্যকে মিথ্যা আখ্যা দেয়া হয়েছে, প্রজ্ঞাকে পাগলামী বলা হয়েছে। অপরপক্ষে স্বার্থপরতাকে বিচক্ষণ পরিকল্পনারূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং উদ্ধত একগুয়েমীকে ক্ষমতাবানরূপে অভিহিত করা হয়েছে। এই সূরাতে দুধরণের মানব গোষ্ঠির মাঝে তুলনা করা হয়েছে এবং তাদের অর্ন্তনিহিত মুল্যমানকে তুলে ধরা হয়েছে এরই প্রেক্ষিতে।

সার সংক্ষেপ : মন্দের অত্যাচার সত্বেও ভালোরা তাদের কর্তব্যে অটল থাকবে। আল্লাহ্‌কে সর্বদা স্মরণে রাখবে। তাঁর কাছেই সকলে প্রত্যাবর্তন করবে শেষ বিচারের জন্য [ ৬৮: ১ - ৩৩ ]

প্রকৃত ন্যায় ও সত্য আল্লাহ্‌র নিকট থেকে আগত হয়। মানুষের মিথ্যা মানদন্ডে তা প্রতিফলিত হয় না। [ ৬৮: ৩৪- ৫২ ]

সূরা কালাম বা কলম - ৬৮

৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। নুন্‌ ৫৫৯২। শপথ কলমের এবং [ মানুষেরা ] যা লিপিবদ্ধ করে, ৫৫৯৩

৫৫৯২। 'নূন্‌ ' একটি সংক্ষিপ্ত অক্ষর। এর অর্থ হতে পারে মাছ, বা কালির দোয়াত, অথবা শুধুমাত্র একটি আরবী অক্ষর ণ [ নুন ] যার সাহায্যে দোয়াত এবং মাছ উভয় অর্থকে বোঝানো হয়েছে। লক্ষ্য করুন এই সূরার গীতি কবিতাটির ছন্দে লাইন শেষ হয়েছে [ "নুন" ] অক্ষরটির দ্বারা। সূরাটিতে কলমের উল্লেখ আছে আয়াত নং [ ৬৮ : ১ ]। এবং মাছের উল্লেখ করা হয়েছে ইউনুস নবীর কাহিনীর মধ্যে আয়াত নং [ ৬৮ : ৪৮ - ৫০ ]। ইউনুস নবীর উপাধি হচ্ছে " মাছেদের সঙ্গী "। সূরা [ ২১ : ৮৭ ] আয়াতে ইউনুস নবীকে 'যুননুন্‌ ' বলে সম্বোধন করা হয়েছে যেহেতু কাহিনীতে রয়েছে যে তাঁকে একটি বৃহৎ মাছ গিলে ফেলে। নুন্‌ অক্ষরটি ইউনুস নবীর নামের প্রতীক অর্থেও ব্যবহার হতে পারে।

৫৫৯৩। অলৌকিক কলমের ও লিখিত বিবরণীর শপথ হচ্ছে প্রতীক ধর্মী বিবরণ যার সাহায্যে মানুষের প্রতি আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের ধর্মকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ্‌র নবী কোন উম্মাদ বা বিকারগ্রস্থ নয়। তাঁর মুখ নিঃসৃত বাণী কোন অসংলগ্ন কথা নয় বরং তা আল্লাহ্‌র ক্ষমতার প্রতীক যা কলমের মাধ্যমে ধারণ করা হয়েছে। জীবনের অসংখ্য বহুবিধ অর্থকে প্রকাশ করা হয়েছে কলমের মাধ্যমে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন যুগের মানুষের জন্য রক্ষা করেছে কলম। মুহম্মদ (সা) ছিলেন আল্লাহ্‌র জীবন্ত করুণা ও দয়া। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী তাঁকে সকল অপবাদ ও নির্যাতনের উর্দ্ধে তুলে ধরেছে।

২। তোমার প্রভুর অনুগ্রহে তুমি উন্মাদ অথবা যাদুগ্রস্থ নও ৫৫৯৪।

৫৫৯৪। সাধারণ মানুষ তাকেই উম্মাদ বলে, যে আর দশ জনের মত আচার আচরণ করে না। সাধারণ লোকেরা মনে করে পাগল বা বিকারগ্রস্থ লোকেরা অশুভ শক্তি দ্বারা বা ভূত দ্বারা আক্রান্ত। সুতারাং মহানবীর নিকট প্রেরিত আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ বুঝতে অক্ষম ব্যক্তিরা তাঁকে বিকারগ্রস্থ মনে করেছিলো যা আল্লাহ্‌ এই আয়াতের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা করেছেন।

৩। তোমার জন্য অবশ্যই রয়েছে পুরষ্কার, যা শেষ হওয়ার নয় ৫৫৯৫;

৫৫৯৫। রাসুল (সা) সম্বন্ধে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, অবশ্যই তিনি বিকারগ্রস্থ নন, এবং তিনি আল্লাহ্‌র বিশেষ পুরষ্কারে ভূষিত। যে পুরষ্কার পার্থিব পুরষ্কারের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী বা ভঙ্গুর নয়, বরং তা চিরস্থায়ী, অমূল্য ও যা অন্তরকে আলোকিত করে। প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ্‌ তাঁকে চারিত্রিক গুণাবলীতে এতই মর্যদাবান করেছিলেন যে, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রনা, অপবাদ বা নির্যাতনে যার এতটুকু ক্ষতি করতে পারে নাই।

৪। এবং তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত

৫। শীঘ্রই তুমি দেখবে এবং উহারাও দেখবে, ৫৫৯৬

৬। তোমাদের মধ্যে কে বিকার গ্রস্থ ;

৫৫৯৬। আল মুস্তফার (সা) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাকে তাঁর সমসাময়িক সঙ্গীদের উর্দ্ধে স্থাপন করেছিলো। শুধু সমসাময়িক নয় সর্বযুগের বিশ্ব মানবের জন্য তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অনুকরণীয় বরণীয়। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মানুষের যুক্তিবাদী চিন্তা ও মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। সময়েই প্রমাণ করেছে কারা ছিলো মানসিক বিকারগ্রস্থ ? কি ঘটেছিলো ওয়ালিদ ইবনে মুগাইরার, অথবা আবু জহলের অথবা আবু লাহাবের ? অপরপক্ষে আল্লাহ্‌র রাসুল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের ও তাঁর অনুসারীদের ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে পৃথিবীর ইতিহাসে। এই আয়াতের আবেদন শুধুমাত্র সমসাময়িক সম্প্রদায়ের জন্য ছিলো না, এর আবেদন হচ্ছে বিশ্বজনীন।

৭। অবশ্যই তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা ভালো জানেন, [ তোমাদের মধ্যে ] কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে; এবং তিনি সর্বাপেক্ষা ভালো জানেন কে [ সত্য ] পথ নির্দেশ গ্রহণ করেছে ৫৫৯৭।

৫৫৯৭। মানুষ অনেক সময়েই আত্মগর্বে অন্ধ হয়ে নিজের বিচার বুদ্ধিকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। সে সর্বাপেক্ষা ন্যায়বান, এই মিথ্যা অহমিকা তার অন্তরে জন্ম নেয় তার আত্মগরিমা থেকে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ আজ যাকে ন্যায় বলে অভিহিত করে আগামীতে তাকেই অন্যায় বলে অভিহিত করতে দ্বিধা বোধ করে না। তাদের মনগড়া ন্যায় ও অন্যায় বোধ সীমিত জ্ঞানেরই প্রতিফলন মাত্র। ন্যায় ও অন্যায়ের মানদন্ড হচ্ছে আল্লাহ্‌র হুকুম সমূহ। আল্লাহ্‌র জ্ঞান অসীম ও সম্পূর্ণ এবং পৃথিবীর সব কিছুকে তা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আল্লাহ্‌ গুপ্ত, ব্যক্ত, অব্যক্ত, দৃশ্যমান, অদৃশ্য সকল কিছুরই খবর রাখেন। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সব কিছু সম্বন্ধেই অবহিত। অতীতের যে কাজের পরিণতিতে বর্তমান দাঁড়িয়ে আছে এবং বর্তমান কাজের যে পরিণতি ভবিষ্যতে ঘটবে সে সম্বন্ধে আল্লাহ্‌ সম্যক অবহিত।

৮। সুতারাং যারা [ সত্যকে] প্রত্যাখান করে তাদের কথায় মনোযোগ দিও না ৫৫৯৮।

৯। তারা চায় যে, তুমি নমনীয় হও, তা হলে তারাও নমনীয় হবে।

৫৫৯৮। আল্লাহ্‌র সত্যের বিরুদ্ধাচারীরা কখনও কখনও হয় আত্মপ্রবঞ্চনাকারী; তাদের সত্যের প্রতি অনীহা এবং চক্ষু বন্ধ করে থাকার প্রবণতা সত্বেও মাঝে মাঝে সত্যের অত্যুজ্জ্বল দীপ্তি তাদের চোখে ভাস্বর হয়। তখনই তারা প্রস্তাব রাখে রাসুলের (সা) নমনীয় হতে হবে, নমনীয় হতে হবে দেবদেবীর ব্যাপারে। খুব সহজে কার্য উদ্ধারের এ এক অতি সহজ পদ্ধতি, যা মানুষকে খুব সহজেই প্রলোভিত করে থাকে। সাধারণ মানুষ খুব সহজেই এরূপ প্রলোভনের ফাঁদে ধরা দেয়। রাসুল (সা) কে দেয়া উপদেশের মাধ্যমে এই আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, যদি আমরা প্রকৃত পক্ষেই পূণ্যাত্মাদের অর্ন্তভূক্ত হতে চাই, তবে আমরা এরূপ অন্যায় সমঝোতা বা মীমাংসা যা আল্লাহ্‌র চোখে অত্যন্ত গর্হিত তা থেকে বিরত থাকবো, নিজেদের রক্ষা করবো। ঘটনাটি এরূপ ছিলো যে আব জহল রাসূলকে (সা) এরূপ অসম্ভব একটি সমঝোতার পথে আহ্বান করেছিলো।

১০। এসব ঘৃণ্য [ চরিত্রের ] লোকের কথা শুনো না ৫৫৯৯, যারা [ সর্বদা মিথ্যা ] শপথ করতে প্রস্তুত থাকে, ৫৬০০,

৫৫৯৯। এই আয়াতে ও পরবর্তী আয়াতে মানুষের যে সব ঘৃণ্য দোষের বিবরণ দেয়া হয়েছে তা আজকে বাংলাদেশের সমাজে খুব একটা অসাধারণ কিছু নয়। এ সব ঘৃণ্য দোষ সমূহ যখন কোনও ব্যক্তির চরিত্রে প্রকাশ পায়, তখন তাঁকে করে তোলে জঘন্য চরিত্রের ব্যক্তিরূপে। ওয়ালিদ ইবনে মুগাইর ছিলেন এরূপ একজন ব্যক্তি, যে রাসুলের (সা ) চরিত্র সম্বন্ধে মিথ্যা কলঙ্ক রটনা করার প্রয়াস পেতো। এই কলঙ্ক রটনায় তার ভূমিকা ছিলো প্রধান। তার কথাই এই আয়াতে বলা হয়েছে, " যে ঘৃণ্য চরিত্রের।" বদরের যুদ্ধের সময়ে মুগাইর আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং তার শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত লাঞ্ছনাদায়ক।

৫৬০০। যারা মিথ্যাবাদী, সত্যের প্রতি যাদের সামান্যতম শ্রদ্ধাও নাই, শুধু তারাই পারে কথায় কথায় শপথ করতে। কারণ সাধারণ লোক তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করার ফলে তাকে বিশ্বাস করে না। লোকের বিশ্বাস হারানোর ফলে তারা বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রতি কথায় শপথ বাণী উচ্চারণ করে। প্রবাদ আছে প্রকৃত সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তির মৌখিক কথা লিখিত দলিলের থেকেও উত্তম।

১১। কুৎসা রটনা করে, যে অপবাদ প্রচার করে,

১২। যে কল্যাণ কাজে বাঁধা দান করে, যে সীমালংঘন করে ; পাপে নিমগ্ন থাকে,

১৩। রূঢ় [ এবং নিষ্ঠুর ] স্বভাব ৫৬০১; তদুপরি কুখ্যাত ;

৫৬০১। আত্ম-প্রবঞ্চনাকারী ও যারা সহজেই কার্য উদ্ধার করতে চায়, তারা ব্যতীত অন্য আর এক দল লোকের বর্ণনা এই আয়াতগুলির মাধ্যমে করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণীর এই লোকেরা হয় অত্যন্ত হীন ও নীচ চরিত্রের। তাদের সত্য সম্বন্ধে কোন ধারণাই নাই। ফলে বিশ্বস্ততার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতেও তারা অপারগ। এদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা মিথ্যাবাদী, কথায় কথায় সকলের সাথে বন্ধুত্বের শপথ করে এবং সুবিধাজনক যে কোন কার্যের প্রতি বিশ্বস্ততা ঘোষণা করে। একই সাথে তারা বন্ধু ও বিশ্বস্তদের পশ্চাতে কুৎসা রটনা করে এবং পরনিন্দা করে। যার ফলে সহজ সরল মানুষের মাঝে, সহজেই অশান্তির সৃষ্টি করে থাকে। এরা কল্যাণে বাঁধা দান করে, পাপ কার্যকে এদের চক্ষে মনোহর বলে দৃশ্যমান হয়। সে শুধুমাত্র যে কল্যাণে বাঁধাই দান করবে তাই-ই নয়, সে অকল্যাণের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হবে এবং অপর লোককেও কল্যাণের পথে অগ্রসর হতে বাধা দান করবে। যদি কেউ তাকে এই কাজে বাধা দান করে তবে সে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে, তার রূঢ় স্বভাব মানুষকে আহত করে। তার স্বভাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে সে অপরের ব্যাপারে নাক গলানোতে কুখ্যাতি অর্জন করবে। যেখানে তার কোনও অধিকার নাই, সেখানেও সে সম্পর্ক, অধিকার, ক্ষমতা দাবী করে। এদের প্রচুর অর্থ সম্পদ থাকতে পারে, কিন্তু এদের ধারণায় ধর্ম হচ্ছে হাসি, খেলার বস্তু, বৃদ্ধদের এবং কুসংস্কারচ্ছন্ন ব্যক্তিরাই ধর্মকে আকঁড়ে ধরে এই বিকৃত ধারণাতে তারা পার্থিব জীবনকে অতিবাহিত করবে।

১৪। কারণ ৫৬০২, সে ধন -সম্পদ ও সন্তান -সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী।

৫৬০২। "কারণ" এই বাক্যটি " লোকের কথা শুনো না " [ ৬৮: ১০ ] এই বাক্যটির সাথে সংযুক্ত অথবা "রূঢ় স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত" [ ৬৮ : ১৩ ] আয়াতের সাথে সংযুক্ত হতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে অর্থ দাঁড়ায় " অনুসরণ করোনা তার যে কথায় কথায় শপথ করে, এই জন্য যে সে ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী।" শেষোক্ত ক্ষেত্রে অর্থ দাঁড়াবে তার "রূঢ় স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত; এই জন্য যে সে ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে সমৃদ্ধিশালী।" এই উভয় ক্ষেত্রে এসব লোক আল্লাহ্‌র চক্ষে পাপীরূপে চিহ্নিত।

১৫। যখন তার নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, ৫৬০৩ সে চীৎকার করে বলে, " ইহা তো প্রাচীন কালের উপকথা মাত্র।" ৫৬০৪

৫৬০৩। আল্লাহ্‌র নিদর্শন পৃথিবীর সর্বত্র প্রকৃতির মাঝে ছড়ানো আছে। আল্লাহ্‌ মানুষের হৃদয় ও আত্মার মাঝে অবস্থান করেন এবং তাঁর প্রতি আহ্বান করেন। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ সমূহ -ই হচ্ছে কোরাণের আয়াতসমূহ যা আল্লাহ্‌র নিদর্শনের প্রতীক।

৫৬০৪। দেখুন [ ৬ : ২৫ ] আয়াত।

১৬। শীঘ্রই আমি উহার শুঁড় দাগিয়ে দেবো ৫৬০৫

৫৬০৫। হাতীর শুঁড় হচ্ছে সর্বাপেক্ষা অনুভূতিশীল অংগ। এখানে পাপীদের জন্তু জানোয়ারের সাথে তুলনা করা হয়েছে, এবং সর্বাপেক্ষা অনুভূতিশীল অংগ দ্বারা তাকে শাস্তি বিধান করা হবে।

১৭। নিশ্চয়ই আমি তাদের পরীক্ষা করেছি, যেভাবে পরীক্ষা করেছিলাম উদ্যান অধিপতিদের,যখন তারা শপথ করেছিলো যে, তারা প্রত্যুষে তাদের বাগানের ফল আহরণ করবে। ৫৬০৬

৫৬০৬। এই আয়াত ও পরবর্তী আয়াতগুলি দ্বারা একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত নীতিগর্ভমূলক রূপক কাহিনীর মাধ্যমে উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। ফল বাগানের মালিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এর মাধ্যমে মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে,

১) মানুষের "সীমিত স্বাধীন ইচ্ছার " প্রতি ; যে ইচ্ছাকে প্রয়োগ করে সে ইচ্ছা করলে ভালোকে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করতে পারে।

২) মানুষের ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব,

৩) আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করা,

৪) দুঃখ কষ্ট ভোগের মধ্যে দিয়ে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ লাভ,

৪) সর্বশেষে আধ্যাত্মিক শাস্তি যা একদিনে নিপতিত হয় না, যা দীর্ঘদিন ধীরে ধীরে আসে, তবে প্রতি পদক্ষেপেই আল্লাহ্‌ অনুতাপের দরজা উম্মুক্ত রেখেছেন।

এই রূপক কাহিনীতে আরও বলা হয়েছে মানুষের লোভ, স্বার্থপরতা, অমনোযোগীতা এবং অপরের উপরে দোষারোপ করার প্রবণতা। মানুষের এ সব দুর্বলতাকে তুলে ধরার পরে বলা হয়েছে আল্লাহ্‌র করুণা সীমাহীন। ভবিষ্যতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হারানো বাগানের থেকে আরও উন্নত বাগান আল্লাহ্‌ দান করবেন। তবে শর্ত হবে যদি সে অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন করে এবং আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন করে। কিন্তু যদি সে আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন না করে, তবে ইহকালের বিপদ বিপর্যয় অপেক্ষা পরলোকে ভয়াবহ শাস্তি তার জন্য অপেক্ষা করছে।

১৮। কিন্তু তারা 'ইন্‌শাআল্লাহ্‌ ' বলে নাই ৫৬০৭।

৫৬০৭। এ কথা সকলের স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, আমাদের সকল পরিকল্পনা এবং কার্যকরী পদক্ষেপ এবং সাফল্য সম্পূর্ণ আল্লাহ্‌র ইচ্ছার ও পরিকল্পনার উপরে নির্ভরশীল। আল্লাহ্‌র বিশ্বজনীন পরিকল্পনা কার্যকর হবেই। যারা বোকা শুধু তারাই ভাবতে পারে এবং গোপনে ষড়যন্ত্র করতে পারে যে, তারা প্রতারণার মাধ্যমে গরীবকে তার অধিকারচ্যুত করবে। কারণ গরীবের এই অধিকার আল্লাহ্‌ প্রদত্ত অধিকার। তারা ভুলে যায় যে, আল্লাহ্‌ প্রদত্ত অধিকারকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না। কেউ তা করতে গেলে সে নিজেই হয় ক্ষতিগ্রস্থ। সুতারাং আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন -ই হচ্ছে জীবনের প্রকৃত শিক্ষা।

১৯। অতঃপর তোমার প্রভুর নিকট থেকে [ বাগানে ] এক বিপর্যয় হানা দিল ৫৬০৮, [ যা সব কিছুকে ধ্বংস করলো ], যখন তারা নিদ্রিত ছিলো।

৫৬০৮। প্রচন্ড প্রাকৃতিক বিপর্যয় ফল বাগানে হানা দিয়ে সমস্ত ফল ও ফলগাছ এক কথায় সম্পূর্ণ বাগানকে তছনছ করে দিয়েছিলো। এই ধ্বংসজ্ঞ এতটাই প্রবল ছিলো যে বাগানের মালিকরাও তাদের বাগানকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলো না।

২০। সুতারাং [ বাগানটি ] সকালে [ দগ্ধ হয়ে ] কৃষ্ণবর্ণ, জনশূন্য স্থানে পরিণত হলো।

২১। প্রত্যুষে উহারা একে অপরকে ডেকে বললো, -

২২। " তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও, তবে সকাল সকাল বাগানে চল।" ৫৬০৯

৫৬০৯। প্রত্যুষে ঘুম থেকে জেগে বাগানের মালিকরা তাদের বাগানের পরিণতি সম্পর্কে অবহিত ছিলো না। সুতারাং তারা তাদের স্বার্থপর স্বপ্নে বিভোর ছিলো। তারা প্রতুষে ফল আহরণ করার পরিকল্পনা করে কারণ তাদের ধারণা ছিলো তাহলে তারা গরীব ও অভাবগ্রস্থদের তাদের অধিকার থেকে বিচ্যুত করতে পারবে।

২৩। সুতারাং তারা চুপি চুপি এই কথা বলতে বলতে চললো,

২৪। "আজকে যেনো কোন অভাবগ্রস্থ ব্যক্তি তোমাদের [উদ্যানে ] প্রবেশ করতে না পারে।" ৫৬১০

৫৬১০। সম্পদশালীর সম্পদে গরীবের অধিকার আছে। ফল বাগানের কাহিনীর মাধ্যমে এই সত্যকে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাচ্য দেশে জমির মালিক ফসল তোলার পরে জমিতে যে ফসল ঝরে পড়ে থাকে তা কুড়িয়ে নেয় না। তা গরীবদের জন্য রেখে দেয়। এই রূপক কাহিনীতে দেখানো হয়েছে যে ফল বাগানের সম্পদশালী মালিকরা গরীবের সামান্য অধিকারকে বিচ্যুত করার মানসে প্রত্যুষে কেউ জাগার পূর্বেই ফল সংগ্রহ করতে মনস্ত করে। তাদের এই অতি লোভকেই আল্লাহ্‌ শাস্তি দান করেন। তারা গরীবকে প্রতারিত করতে চেয়েছিলো, কিন্তু তা করতে চেয়েছিলো গোপনে। সুতারাং কেউ জেগে ওঠার পূর্বেই তারা তাদের ফসল ঘরে তোলার প্রয়াসী ছিলো, যেনো বাইরের লোকে তাদের এই প্রতারণা ধরতে না পারে।

উপদেশ : মানুষ ভুলে যায় যে অর্থ, সম্পদ, মান, মর্যাদা সবই সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র দান। তবে সে দান অর্জন করতে হয় নিজস্ব পরিশ্রম ও শক্তির মাধ্যমে। আল্লাহ্‌র দান বা নেয়ামত যে লাভ করে সে তার দায়িত্ব লাভ করে। গরীবের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে সে তার সেই দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে।

২৫। তারা তাদের সকাল শুরু করলো [ অন্যায় ] প্রতিজ্ঞা দ্বারা;

২৬। কিন্তু যখন তারা [ উদ্যানটি ] দেখতে পেলো, তারা বলেছিলো, " আমরা নিশ্চয়ই আমাদের পথ হারিয়েছি। ৫৬১১

৫৬১১। বাগানের মালিকরা যখন বাগানের অবস্থা দর্শন করলো তখন তারা তাদের বাগানকে সনাক্ত করতে সক্ষম হলো না কারণ তা ছিলো অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থায়। তাদের মনে হলো তারা অন্য কোনও স্থানে আগমন করেছে, তাদের সেই ফলে ভরা উদ্যান সেটা নয়। কোথায় তারা সোনার ফসল ঘরে তুলবে আর কোথায় তাদের এই বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত বাগান। বাগানের অবস্থা দর্শনে প্রথমে তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতির পরিমাণ সম্বন্ধে আতঙ্ক উপস্থিত হলো; তাদের পরিশ্রম, তাদের মূলধন সব বৃথা।

উপদেশ : তারা অন্যকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলো ফলে আল্লাহ্‌র ক্রোধে তারা নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্থ হলো। আল্লাহ্‌র এই নীতি সর্বকালের সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য। সুশীল ও উন্নত সেই সমাজ যে সমাজে সকলের অধিকারকে সমুন্নত রাখা হয়। আল্লাহ্‌র আশীর্বাদে সেই সমাজ হয় ধন্য। সে কারণেই পাশ্চাত্য সমাজ আজ এতটা উন্নত

২৭। "আমরা বঞ্চিত হয়েছি [ আমাদের ফসল ও শ্রমফল থেকে]।" ৫৬১২

৫৬১২। দেখুন অনুরূপ আয়াত সূরা [ ৫৬ : ৬৭ ] এবং উপরের টিকা।

২৮। উহাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিটি বলেছিলো, ৫৬১৩ "আমি কি তোমাদের বলি নাই, কেন তোমরা [আল্লাহ্‌র ] প্রশংসা বর্ণনা করছ না ? "

৫৬১৩। এ সব অন্যায়কারী ফল বাগানের মালিকদের মধ্যে একজন ছিলো কম অন্যায়কারী। তাকে আমরা সৎকর্মপরায়ণ রূপে অভিহিত করবো না, কারণ সেও ঐ সব ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে যুক্ত ছিলো। তবে তার মাঝে বিবেক জাগ্রত ছিলো। সে কারণেই সে তার নিজের ভ্রান্তিকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলো। সে পূর্বেই অন্যান্যদের গরীবদের বঞ্চিত করার এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাবধান করেছিলো সত্য। কিন্তু সে অন্যান্যদের বিরুদ্ধাচারণ না করে তাদের সাথে তাদের চক্রান্তে যোগদান করে। সুতারাং সেও ঐ একই পরিণাম ভোগ করে। একেই বলে, " সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।"

২৯। তারা বলেছিলো, " আমরা আমাদের প্রভুর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। অবশ্যই আমরা পাপ করেছি।"

৩০। অতঃপর তারা একে অপরকে দোষারোপ করতে লাগলো। ৫৬১৪

৫৬১৪। মানুষের সাধারণ ধর্ম হচ্ছে যখন তাদেরকে লোভ, স্বার্থপরতা ও যে কোন অন্যায়ের জন্য শাস্তি দান করা হয়, তখন তারা নিজেদের দোষকে অপরের প্রতি আরোপ করতে সচেষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে ফল বাগানের মালিকদের মধ্যে একজন ছিলো অপেক্ষাকৃত ভালো। সে সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটির অন্যায়কে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলো এবং অনুধাবন করেছিলো যে তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র হুকুমকে প্রত্যাখান করার মত নৈতিক অপরাধ। কিন্তু যেহেতু সে বাড়তি লাভের লোভকে সংবরণ করতে পারে নাই, সুতারাং সে এই কাজের দায় দায়িত্ব এড়াতে পারে না, সেও শাস্তির যোগ্য।

উপদেশ : অন্যায়কারীরা সর্বদা ভালো কাজের সুফল ভোগে আগ্রহী থাকবে, কিন্তু বিপদে একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে।

৩১। তারা বলেছিলো," হায় ! দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা তো ছিলাম সীমালংঘনকারী। "

৩২। "সম্ভবতঃ আমাদের প্রভু এর পরিবর্তে আমাদের এর থেকেও উৎকৃষ্ট [ উদ্যান ] দেবেন। আমরা [ অনুতাপের মাধ্যমে ] তাঁর অভিমুখী হলাম।" ৫৬১৫

৫৬১৫। আল্লাহ্‌ অসীম করুণার আঁধার। যদি পাপীরা প্রকৃত পক্ষেই অনুতপ্ত হয়, তবে আল্লাহ্‌ সর্বোচ্চ পাপকেও ক্ষমা করে দেন। যদি তা প্রকৃত অনুতাপ না হয়ে মোনাফেকী হয়, তবে তাদের কৃত পাপের উপরে মোনাফেকীর পাপও বর্তাবে।

এই রূপক কাহিনীর মাধ্যমে যে চিরসত্যকে আমাদের সম্মুখে তুলে ধরা হয়েছে তা হচ্ছে : বাগানের মালিকরা ছিলো অত্যন্ত স্বার্থপর ব্যক্তি। আর স্বার্থপর ব্যক্তিদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ন্যায় তারাও ছিলো অহংকার ও আত্মগর্বে গর্বস্ফীত ; এবং তারা আল্লাহ্‌কে ভুলে গিয়েছিলো। তারা ভুলে গিয়েছিলো যে, তাদের এই সম্পদ প্রাচুর্য আল্লাহ্‌র দান। আর অহংকারী লোকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এই হয় যে সে সর্বদা অন্যকে হেয় করে দেখতে ভালোবাসে এবং তার থেকে বিত্ত ও সম্মানে যারা কম তাদের প্রতি সে রূঢ় ব্যবহার করে। আল্লাহ্‌র আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকার দরুণ তারা গরীবকে অধিকার বঞ্চিত করার জন্য প্রত্যুষে বাগানের ফসল ঘরে তুলতে মনস্থ করে। প্রত্যুষে তারা যখন বাগানের বিপর্যস্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করলো তখন তারা কেউই নিজেদের দোষকে স্বীকার করলো না। বরং একে অপরের ঘারে দোষারোপে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এদের মধ্যে যারা নিজেদের ত্রুটিকে সনাক্ত করে অনুতপ্ত হয়ে আত্মসংশোধন করেছিলো, তারা আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হয়েছিলো। "উৎকৃষ্ট বিনিময় " অর্থাৎ সেই একই বাগান তবে নূতন ভাবে বাগানের পরিকল্পনা ও পরিচর্যার মাধ্যমে বাগানটি পূর্বাপেক্ষা আরও সমৃদ্ধ বাগানে রূপান্তরিত হবে ভবিষ্যতে। কারণ দানে আল্লাহ্‌ অকৃপণ।

৩৩। [ এই পৃথিবীর জীবনে ] এই হলো শাস্তি। কিন্তু পরকালে রয়েছে আরও কঠিনতর শাস্তি ; যদি তারা জানতো ৫৬১৬।

৫৬১৬। যদিও আল্লাহ্‌র আইন প্রত্যাখানকারী, স্বার্থপর, উদ্ধত, অহংকারী এবং পাপীদের শাস্তি হঠাৎ করেই নিপতিত হয়; কিন্তু তার পরেও কেউ যদি আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়, তবে আল্লাহ্‌র ক্ষমার হাত তার জন্য সর্বদা প্রসারিত।

পাপীদের প্রতি প্রদত্ত ইহকালের শাস্তি তাদের হতবুদ্ধি করে থাকে। তবে পরলোকের শাস্তি যে কতটা ভয়াবহ হবে তা আমাদের কল্পনারও বাইরে। কারণ সে শাস্তি হবে অনন্ত কাল ব্যপী এবং তখন আর অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের সুযোগ পাওয়া যাবে না।

রুকু - ২

৩৪। পূণ্যাত্মাদের জন্য তাদের প্রভুর নিকটে অবশ্যই রয়েছে ভোগ-বিলাসপূর্ণ জান্নাত। ৫৬১৭

৫৬১৭। বেহেশতের সুখ ও শান্তির বর্ণনা দেয়া কোনও মানব ভাষাতে সম্ভব নয় সুতারাং সেই বর্ণনাকে উপলব্ধিযোগ্য করার জন্য ইন্দ্রিয় অনুভূত ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে এবং আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের যে শান্তি সেই শান্তির সাথে সমন্বিত করা হয়েছে। মনোরম সুশোভিত উদ্যান আমাদের আনন্দ দেয় সত্য; তবে আধ্যাত্মিক জগতে পরলোকের যে বেহেশতি বাগান তার আনন্দ বর্ণনাতীত, কারণ তা আল্লাহ্‌ নৈকট্য লাভের আনন্দ দেয়।

৩৫। তারপরেও আমি কি বিশ্বাসীদের পাপীদের ন্যায় গণ্য করবো ? ৫৬১৮

৫৬১৮। আধ্যাত্মিক জগতের সর্বাপেক্ষা জঘন্য পাপ হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করা। কারণ এই পাপে আত্মার উপরে আবরণ সৃষ্টি হয় যা ভেদ করে আল্লাহ্‌র হেদায়েতের আলো বা আল্লাহ্‌র নূর প্রবেশ করে না। ফলে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের উপলব্ধি বা আল্লাহ্‌কে অন্তরের মাঝে উপলব্ধির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। পরিণতিতে সত্য ও ন্যায়ের জ্যোতি তাদের অন্তরে প্রবেশ লাভে বাধা প্রাপ্ত হয়। এর উপমা হচ্ছে জলাশয়ের চর্তুপাশ্বের কাদার আস্তরণ যা শুষ্ক মাটিকে পানি শুষে নিতে বাঁধার সৃষ্টি করে। এরা আল্লাহ্‌র চোখে অপরাধী। এ সব আত্মা নিজেদের পাপের বন্দীশালাতে নিজেদের উপাস্য স্থির করে নেয়। হয়তো বা তা পাষাণ মূর্তি, ধর্মযাজক বা এমনও হতে পারে যে মানুষকে দেয়া আল্লাহ্‌র নেয়ামতসমূহকেও তারা উপাস্যের বিষয়রূপে পরিগণিত করে যেমনঃ আল্লাহ্‌র দেয়া মেধা, মননশক্তি, প্রতিভা, খ্যাতি, বিজ্ঞান, জাতীয় নেতা ইত্যাদি। তারা উপলব্ধিতে অক্ষম এগুলির স্রষ্টা সেই বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্‌।

৩৬ তোমাদের কি হয়েছে ? তোমরা কি ভাবে বিচার কর ?

৩৭। অথবা তোমাদের কি কোন কিতাব আছে, যার সাহায্যে তোমরা শিক্ষা লাভ কর -

৩৮। যা তোমরা পছন্দ কর এর সাহায্যে তা পেতে পার ? ৫৬১৯

৫৬১৯। ন্যায়বান মোমেন ব্যক্তি ও পাপী ব্যক্তি এক হতে পারে না। অবশ্যই তাদের পরিণতিও এক হবে না। যদিও আল্লাহ্‌ মানুষকে সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন তবুও মানুষ যা খুশী তাই করতে পারে না। সুতারাং মানুষ কিভাবে আশা করে যে, আল্লাহ্‌র রাজত্বে যা ন্যায় ও সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত সেখানে পূণ্যাত্মা ও পাপী একই ভাবে পরিগণিত হবে ?

৩৯। অথবা আমি কি তোমাদের সাথে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত শপথের অঙ্গীকারে আবদ্ধ যে, তোমরা যা কিছু দাবী করবে তাই -ই পাবে ? ৫৬২০

৫৬২০। শুধু মোশরেক আরবরাই নয়, পৃথিবীর কোনও জাতিই আল্লাহ্‌র বিশেষ অনুগ্রহশীল জাতিরূপে নিজেকে দাবী করতে পারে না। ইহুদীরা যে নিজেকে আল্লাহ্‌র মনোনীত জাতি বলে দাবী করে এই আয়াতের মাধ্যমে সে দাবীকেও অসাড় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এ কথা সত্য যে, যখন কোনও জাতি নিজেদের বিশেষ গুণে গুণান্বিত করে থাকে, ন্যায় ও সত্য যখন তাদের জীবনের সাথে ওতপ্রেতভাবে জড়িত হয়, তখন সে সব জাতিকে আল্লাহ্‌ পৃথিবীতে তাঁর পতাকা বাহী রূপে মনোনীত করেন। তারা জগতের সম্মুখে ন্যায় ও সত্যকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। এ ভাবেই আল্লাহ্‌র সত্য যুগে যুগে পৃথিবীতে বিস্তার লাভ ঘটেছে। কিন্তু আল্লাহ্‌র পতাকা চিরদিন নির্দ্দিষ্ট এক জাতির নিকট স্থায়ী থাকে না। তারাই ততদিন তা ধরে রাখার যোগ্যতা অর্জন করে যতদিন তারা ন্যায় ও সত্য পথে থাকে বা আল্লাহ্‌র আইন মেনে চলে। কারণ আল্লাহ্‌র আইনই হচ্ছে ন্যায় ও সত্য। যখনই তারা ন্যায় ও সত্যের পথ বিচ্যুত হয়ে গর্বিত ও অহংকারী হয় স্বার্থপরতা ও অন্যকে ঠকানোর প্রবণতা বেড়ে যায়; তখনই তাদের পতন ঘটে। আল্লাহ্‌ তাদের এই সম্মানজনক অধিষ্ঠানটি কেড়ে নেন। এ কথা কেউ যেনো মনে না করেন যে আল্লাহ্‌ তাদের সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত অনন্তকাল স্থায়ী অঙ্গীকারে আবদ্ধ।

৪০। তুমি তাদের জিজ্ঞাসা কর, তাদের মধ্যে এই দাবীর জিম্মাদার কে ?

৪১। অথবা তাদের কি [আল্লাহ্‌র সাথে ] শরীক আছে ৫৬২১ ? যদি তারা সত্যবাদী হয়, তবে তাদের শরীকদের উপস্থিত করুক।

৫৬২১। 'দেবদেবী ' অর্থাৎ আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদার। যেমন : খৃস্টানদের ত্রিতত্ববাদ। অর্থাৎ যে কোনও রকম আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদারিত্বের কথা এখানে বলা হয়েছে। আল্লাহ্‌র ক্ষমতার সাথে যে কোনও শক্তিকে অংশীদার করার প্রবণতা আত্মার মাঝে আল্লাহ্‌র একত্বের ধারণাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। একত্বের ধারণা হচ্ছে আত্মার মূল সঞ্জীবনী শক্তি। সুতারাং এর থেকে বিচ্যুতির ফলে আত্মা তার মূল বৈশিষ্ট্য হারায়।

৪২। সেদিন পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে ৫৬২২। এবং তাদের আদেশ করা হবে সেজ্‌দা করার জন্য, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না, -

৫৬২২। " পায়ের গোছা উম্মোচিত করা।" এটি একটি আরবী বাগ্‌ধারা যার অর্থ চরম সংকট। কেয়ামত দিবসে যখন সকল রহস্যের অবসান ঘটবে তখনকার বর্ণনা এখানে করা হয়েছে। পায়ের গোছা যেরূপ চামড়া ও কাপড় দ্বারা ঢাকা থাকে; ঠিক সেরূপ হচ্ছে মানুষের পৃথিবীর জীবন। পৃথিবীর জীবনে মানুষ পার্থিব উন্নতির চিন্তায় বিভোর থাকে। পাপ পূণ্য,ন্যায় অন্যায়, ভালো -মন্দ তাদের চিন্তায় স্থান পায় না। তারা সুকৌশলে মনের বিকৃত বা পাপ চিন্তাধারাকে সযতনে গোপন রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু কেয়ামত দিবসে তাদের এই কার্যকলাপ ও চিন্তাধারা সর্ব সমক্ষে উলঙ্গভাবে প্রকাশ পেয়ে যাবে। জীবনের সকল রহস্য, সকল গোপনীয়তা উম্মুক্ত হয়ে যাবে। সেদিন প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য বা সেজ্‌দার জন্য আহ্বান করা হবে। কিন্তু পার্থিব জীবনে আল্লাহ্‌র প্রতি অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের যে মানসিকতা, তার থেকে তাদের মুক্তি ঘটবে না। পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য যাদের নিকট হাসিঠাট্টার বিষয়রূপে পরিগণিত হতো, কেয়ামত দিবসে তাদের সেই মন মানসিকতা তাদের সর্বসত্তাকে গ্রাস করে থাকবে। ফলে তারা ইচ্ছা থাকলেও আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য প্রকাশে হবে অপারগ।

৪৩। তাদের দৃষ্টি হবে অবনত ৫৬২৩, অসম্মান তাদের আচ্ছন্ন করবে ; বস্তুতঃ পূর্বে [ দুনিয়াতে ] তারা যখন সুস্থ ছিলো, তাদের সেজ্‌দা করতে আদেশ করা হয়েছিলো [ এবং তারা তা করে নাই ] ৫৬২৪।

৫৬২৩। অতীতের পাপ কাজ ও পাপকাজের স্মৃতি পাপীরা কেয়ামত দিবসেও অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না। তাদের অতীতের সকল কর্ম ও কর্মের স্মৃতি সর্বসমক্ষে হবে প্রকাশ্য। ফলে অতীতের কাজ ও বর্তমানের পরিণাম তাদের জন্য হবে লজ্জ্বাজনক ও অপমানকর পরিণতি।

৫৬২৪। 'Salimun' অর্থ সম্পূর্ণ ; বিচারের সম্পূর্ণ ক্ষমতা যার অধিকারে।

৪৪। অতঃপর আমাকে ছেড়ে দাও, তাদের সাথে যারা এই বাণীকে প্রত্যাখান করেছিলো তাদের আমি ধীরে ধীরে শাস্তি দান করবো এমনভাবে যে, তারা তা বুঝতেও পারবে না ৫৬২৬।

৫৬২৬। দেখুন সূরা [ ৭ : ১৮২ ] আয়াত। সংসারে প্রায়ই দেখা যায় যে যারা পাপী ও কৌশলী তারা পার্থিব জীবনে অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা-প্রতিপত্তিতে উত্তোরতর উন্নতি লাভ করে থাকে। এ দেখে মোমেন বান্দাদের অধৈর্য্য হওয়ার কারণ নাই। কারণ পার্থিব এই সমৃদ্ধি হয়তো বা তাদের শাস্তিরই একটি সোপান মাত্র। দুর্যোগ ও বিপর্যয়ও হতে পারে তাৎক্ষণিক শাস্তির পরিণামে। তবে আল্লাহ্‌র প্রকৃত শাস্তি নিপতিত হয় ধীরে ধীরে কারণ আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাকে অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের প্রচুর অবসর দান করেন। আল্লাহ্‌র শাস্তি ধীরে ধীরে ক্রমবিকাশের ধারাতে প্রকাশ পায়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, আমরা আল্লাহ্‌র সামগ্রিক পরিকল্পনা দেখতে ও বুঝতে অক্ষম। কারণ আমাদের জ্ঞান ও দেখার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। সুতারাং এ সম্বন্ধে আমাদের মনে কোনও রূপ প্রশ্ন জাগা উচিত নয়।

৪৫। আমি তাদের [ দীর্ঘ ] অবকাশ অনুমোদন করবো। সত্যই আমার পরিকল্পনা অত্যন্ত শক্তিশালী।

৪৬। অথবা তুমি কি তাদের নিকট পারিশ্রমিক দাবী করছো ৫৬২৭ ? ফলে তারা ঋণের ভারে আক্রান্ত হয়েছে ?

৫৬২৭। দেখুন সূরা [ ৫২ : ৪০] আয়াত ও টিকা ৫০৭৪। এই আয়াতে রাসুলকে (সা) সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, রাসুলের (সা) মুখে আল্লাহ্‌র বাণী শোনাতে অবিশ্বাসীদের কোনও অর্থ সম্পদ ব্যয় করতে হয় না। রাসুলও তাঁর প্রচারে বিনিময়ে কোনও অর্থ ও সম্পদ দাবী করেন না বা কোনও পুরষ্কারের প্রত্যাশী নন। এমনকি এর জন্য তিনি কোনও স্বীকৃতি বা প্রশংসা দাবী করেন না। যদিও এই আয়াতটিতে আল-মুস্তফাকে (সা) সম্বোধন করা হয়েছে, তবে এর আবেদন সার্বজনীন, পূণ্যাত্মা ব্যক্তিগণ তাদের পূণ্য কাজের কোনও মূল্য দাবী করেন না, তাদের কাজের পুরষ্কার তারা দাবী করেন একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র নিকট। অবিশ্বাসীরা এমন আচরণ করে যেনো তারা অদৃশ্যের সকল সংবাদ অবগত আছে। আধ্যাত্মিক জগতের সকল সংবাদ তাদের নখর্দপনে। কিন্তু এ সবই তাদের শূণ্যগর্ভ আস্ফালন।

৪৭। অথবা তাদের নিকট কি অদৃশ্যের জ্ঞান আছে ৫৬২৮, যে তারা তা লিখে রাখে ?

৫৬২৮। দেখুন [ ৫২ : ৪১ ] আয়াত ও টিকা ৫০৭৫। অবশ্যই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান অবিশ্বাসীদের করতলগত নয়। যদি তা থাকতো তবে তারা তা নিজেদের এবং অপরের পথনির্দ্দেশ রূপে লিখিত করে রাখতো। তা যখন তারা পারে নাই, সুতারাং তাদের উচিত আল্লাহ্‌র প্রেরিত প্রত্যাদেশকে গ্রহণ করা।

৪৮। অতএব, তুমি ধৈর্য ধারণ কর তোমার প্রভুর আদেশের অপেক্ষায়, এবং মৎস্য সহচরের ন্যায় ৫৬২৯, [ অধৈর্য্য ] হয়ো না, - যখন সে দুঃসহ যন্ত্রণায় চীৎকার করেছিলো।

৫৬২৯। মৎসের সহচর বা মৎসগ্রাসে পতিত। হযরত ইউনুসকে মাছ ভক্ষণ করেছিলো বলে তাঁকে এরূপ বলা হতো। 'Zun-nun' - বা ইউনুস নবীর জন্য দেখুন সূরা [ ২১ : ৮৭ - ৮৮ ] আয়াতের টিকা ২৭৪৪। আরও দেখুন সূরা [ ৩৭ : ১৩৯ -১৪৮ ] আয়াত ও আয়াতগুলির টিকাসমূহ। হযরত ইউনুসকে নীণেভা নামক নগরীতে আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারের জন্য আদেশ দান করা হয়। ঐ নগরীর অধিবাসীরা ছিলো দুষ্ট প্রকৃতির। তিনি তাঁর প্রচারকালে নগরীর অধিবাসীদের দ্বারা অত্যাচার ও নির্যাতনের শীকার হন এবং নগরী থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজে আরোহণ করেন। রাস্তায় জাহাজ ঝড়ে পতিত হয় এবং নাবিকেরা তাঁকে সমুদ্র বক্ষে নিক্ষেপ করে। সমুদ্র বক্ষে তাকে এক বিরাট মাছ ভক্ষণ করে - সম্ভবতঃ তা হয়তো বা হবে বিশাল আকৃতির তিমি মাছ। সেখানে তিনি জীবিত থাকেন ও অনুতাপে দগ্ধ হতে থাকেন। ফলে আল্লাহ্‌ তাঁকে ক্ষমা করেন। অপরপক্ষে নিণেভা নগরীর বাসিন্দারা অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন করে আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করে। এখানে আল্লাহ্‌র দুইটি গুণবাচক উপাধি দয়াময় ও ক্ষমাশীল এই দুটিকে রূপক নীতিগত মূলক কাহিনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। আদেশ করা হয়েছে বাঁধা ও বিপর্যয়ের মুখে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করে ধৈর্য ধারণের জন্য। ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীলতা এই গুণগুলি মোমেন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। তাহলেই আল্লাহ্‌র রহমত ও করুণা লাভ করা যায়।

৪৯। তার প্রভুর অনুগ্রহ তার নিকট না পৌঁছুলে সে লাঞ্ছিত হয়ে নিক্ষিপ্ত হতো উন্মুক্ত প্রান্তরে। ৫৬৩০

৫৬৩০। দেখুন আয়াত [ ৩৭: ১৪৫ - ১৪৬ ] ও টিকা ৪১২৬।

৫০। এভাবেই তার প্রভু তাঁকে মনোনীত করলেন ৫৬৩১, এবং তাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত করলেন। ৫৬৩২

৫৬৩১। হযরত ইউনুসকে আল্লাহ্‌ নিণেভা নগরীতে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন যেনো তিনি সেখানে আল্লাহ্‌র করুণা ও মহিমার বাণী প্রচার করতে পারেন। যদিও তিনি নবী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সাধারণ মানুষের ভুলভ্রান্তির উর্দ্ধে ছিলেন না। যার ফলে নিণেভাবাসীদের প্রত্যাখান ও অত্যাচারে তাঁর ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। যেহেতু তিনি আল্লাহ্‌ কর্তৃক মনোনীত, সুতারাং তার দায়িত্বও সাধারণ মানুষ থেকে অনেক বেশী। তাঁর এই ধৈর্যচ্যুতিতে আল্লাহ্‌ তাঁকে কঠিন শাস্তি দান করেন। মাছের পেটে থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হন এবং আল্লাহ্‌র করুণা ও ক্ষমা ভিক্ষা করেন। প্রকৃত অনুতাপ সর্বদাই আল্লাহ্‌ গ্রহণ করেন এবং পাপীর পাপকে ক্ষমা করে থাকেন। ইউনুস নবীও আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করেন এবং তিনি মাছের পেট থেকে উদ্ধার লাভ করে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পুণরুদ্ধার করেন। আল্লাহ্‌র নূর আবার তাঁর আধ্যাত্মিক জগতকে সমুজ্জ্বল করে তোলে।

৫৬৩২। দেখুন সূরা [ ৪ : ৬৯ ] আয়াত ও টিকা ৫৮৬। "সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত করিলেন।" এই আয়াত থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, সৎকর্মপরায়ণদের বিশাল গোষ্ঠির সদস্যপদ লাভ করা। এই গোষ্ঠিতে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে বিভিন্ন শ্রেণীর মানব সন্তান। কেউ সৎকর্মপরায়ণে হন অতি উচ্চে অধিষ্ঠিত আবার কারও অধিষ্ঠান সুউচ্চ নাও হতে পারে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজের পরিমাণ অনুযায়ী সৎকর্মপরায়ণদের শ্রেণীতে অর্ন্তভূক্ত হবেন। গণতন্ত্রে যেরূপ প্রত্যেক নাগরিকের জন্য তাঁর অধিকারকে সংরক্ষিত করা হয়; আধ্যাত্মিক জগতেও সেরূপ সৎকর্মপরায়ণের জন্য আছে নাগরিক অধিকার। যারা এই অভিজ্ঞানে সমৃদ্ধ তাদের মাঝে বিরাজ করে এক অদৃশ্য ভাতৃত্ববোধের বন্ধন। যে বন্ধনের সুত্রে কেউ থাকেন উচ্চমার্গে কেউ থাকেন নিম্নে। কিন্তু এর ফলে তাদের সৌহার্দ নষ্ট হয় না বরং আদান প্রদানের মাধ্যমে আরও দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়।

৫১।অবিশ্বাসীরা যখন কুর-আন শ্রবণ করে, তখন তারা তাদের চোখের চাহনি দ্বারা তোমাকে আছড়াইয়া ফেলতে চায় এবং বলে, " সে তো নিশ্চয়ই পাগল।" ৫৬৩৩

৫৬৩৩। এই আয়াতটিতে রাসুলের (সা) প্রতি কাফের ও দুষ্টলোকদের আচরণকে তুলে ধরা হয়েছে। কোরাণের বাণী তাদের নিকট এতটাই অসহ্য মনে হয় যে তাদের ক্ষমতা থাকলে তারা দৃষ্টি দ্বারা রাসুলকে (সা) ভস্ম করে দিত। এই আয়াতের আবেদন সর্বকাল ও সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য। পৃথিবীতে সর্বদা ভালো মন্দ পাশাপাশি বিরাজমান। মন্দ সকল সময়েই ভালোকে ধ্বংস করতে উদ্যত। পূণ্যাত্মাদের আত্মিক শান্তি, দৃঢ়তা ও নিশ্চিত নিরাপত্তা ধ্বংস করাই তাদের একমাত্র কাম্য। তারা তাদের কাজের মাধ্যমে তা করতে না পারলেও কুৎসিত বাক্যদ্বারা তাদের মনের আক্রোশ মিটাতে চেষ্টা করবে, যেরূপ তারা আল্লাহ্‌র রাসুলকে (সা) 'পাগল' বা 'ভুতগ্রস্থ' রূপে আখ্যা দিত। দেখুন [ ৬৮ : ২ ] আয়াত ও টিকা ৫৫৯৪। কিন্তু পূণ্যাত্মারা তাদের এই আচরণে বিচলিত হবে না। কারণ তারা জানে আল্লাহ্‌র বাণী চিরসত্য, এবং চিরস্থায়ী এবং বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ।

৫২। কুর-আন তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ব্যতীত অন্য কিছু নয়। ৫৬৩৪

৫৬৩৪। যারা আল্লাহ্‌র রাসুলকে (সা) পাগল ও ভূতগ্রস্থ আখ্যা দান করে তাদের কথার প্রবল প্রতিবাদ করা হয়েছে এই আয়াতের মাধ্যমে। রাসুল (সা) হচেছন বিশ্ব জগতের রহমত স্বরূপ। আল্লাহ্‌র বাণী 'কুরআন' তার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। কোরাণের উপদেশ সকল পাপ ও মন্দের প্রতিশোধক স্বরূপ।