Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩৯ জন
আজকের পাঠক ৫২ জন
সর্বমোট পাঠক ৭১৩৭৩৯ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৮৯৭৮৬ বার
+ - R Print

সূরা মা'আরিজ


সূরা মা'আরিজ বা আরোহণের সোপান - ৭০

৪৪ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরাটির বিষয়বস্তু পূর্ববর্তী সূরার সমগোত্রীয়, ধৈর্য ও সময়ের রহস্য বেহেশতের আরোহণের পথ প্রদর্শন করবে। মন্দ বা পাপ এবং ভালো বা পূণ্য প্রত্যেকেই তার শেষ পরিণতি লাভ করবে।

সময়ের ক্রমপঞ্জি অনুযায়ী এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ প্রথম দিকের সূরাগুলির শেষ দিকে অথবা মক্কাতে অবস্থানের মধ্যবর্তী সময়ের প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয়। মক্কী সূরাগুলির মধ্যে এই সূরাটির অবস্থান সম্ভবতঃ ৬৯ নং সূরা অবতীর্ণ হওয়ার স্বল্প দিন পরেই।

সূরা মা'আরিজ বা আরোহণের সোপান - ৭০

৪৪ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। একজন জিজ্ঞাসাকারী শাস্তিকে আহ্বান করেছিলো ৫৬৭৫, -

২। অবিশ্বাসীদের জন্য, যা প্রতিরোধ করার কেহ নাই, - ইহা আসবে আল্লাহ্‌র নিকট থেকে,

৫৬৭৫। যারা জিজ্ঞাসা করে কেয়ামত কবে সংঘটিত হবে ? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তাদের অন্তরের সন্দেহই ব্যক্ত হয়। এর উত্তর হচ্ছে সময়ের রহস্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্‌র নিকট বর্তমান যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির সীমার বাইরে। কিন্তু কিছু কিছু জিনিষ আছে যা মানুষকে অন্তরঙ্গ ভাবে স্পর্শ করে,যার প্রভাবে তার নৈতিক চরিত্র এবং ভবিষ্যতের কল্যাণ প্রভাবিত হয়। এগুলি হচ্ছে বিশ্বাস করা যে :

১) শেষ বিচার অবশ্যই সংঘটিত হবে, কেহ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না।

২) কাফেরদের জন্য তা হবে ভয়াবহ শাস্তি ; কিন্তু পূণ্যাত্মাদের ভয়ের কোন কারণ থাকবে না।

৩) এটা হবে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দেয় শাস্তি, যিনি ন্যায় বিচার ও দয়া উভয়েরই মালিক। এ শাস্তি অন্ধ দুর্যোগ হবে না তা হবে ন্যায়ের উপরে প্রতিষ্ঠিত। এবং

৪) এরই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্‌র আর একটি উপাধিকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে, আর তা হচ্ছে "উর্দ্ধে আরোহণের সোপান সমূহের প্রভু" যার অর্থ যদিও তাঁর সিংহাসনের অবস্থান উর্দ্ধে, কিন্তু তাঁর করুণাধারা তাঁর সিংহাসনের বাইরে নয়। আল্লাহ্‌র অসীম করুণা ধারাই হচ্ছে তাঁর নিকট পৌঁছানোর সিঁড়ি।

৩। [শাস্তি ] আসবে আল্লাহ্‌র নিকট থেকে যিনি উর্দ্ধে আরোহণের সোপান সমূহের প্রভু। ৫৬৭৬

৫৬৭৬। "Ma'arij " - উর্দ্ধলোকের সিড়ি বা সোপান। সূরা [ ৪৩ : ৩৩ ] আয়াতে রয়েছে, " রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিড়ি যাহাতে উহারা আরোহণ করে; যেখানে "Ma'arij" শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূরাতে এই শব্দটি আধ্যাত্মিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নশ্বর দেহের অধিকারী মানুষ কি সেই সমুচ্চ মর্যদার অধিকারী আল্লাহ্‌র নিকট পৌঁছাতে সক্ষম ? আল্লাহ্‌র অসীম করুণা ও দয়া মানুষকে ফেরেশতাদের উপরে মর্যদা দান করেছেন। এ ভাবেই মানুষ সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী হয়। কিন্তু এ পথ খুব বন্ধুর। এ পথ একদিনে বা অল্প সময়ে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। দেখুন পরবর্তী দুইটি টিকা।

৪। ফেরেশতাগণ ও রুহু ৫৬৭৭ আল্লাহ্‌র দিকে আরোহণ করে এমন দিনে যার পরিমাণ পৃথিবীর পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ৫৬৭৮

৫৬৭৭। "Ruh" - বা আত্মা। দেখুন সূরা [ ৭৮ : ৩৮ ] আয়াত যেখানে বলা হয়েছে "রূহু" ও ফিরিশতাগণ "। আবার সূরা [ ৯৭ : ৪ ] আয়াতে বলা হয়েছে, " ফিরিশতাগণ ও রূহু "। সূরা [ ১৬ : ২ ] আয়াতে বর্ণিত রূহু শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে 'ওহী' শব্দটি দ্বারা। কোন কোন তফসীরকারের মত্যে রূহু শব্দটি দ্বারা জিব্রাঈল ফিরিশতাকে বুঝানো হয়। রূহুকে বিভিন্ন ভাবে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু মওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের মতে রূহু শব্দটির অর্থ আরও ব্যপক হওয়া প্রয়োজন, তা হলে যে কোন বর্ণনা প্রসঙ্গে তা ব্যবহৃত হতে পারে। মানুষকে আল্লাহ্‌ রূহু দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। রূহু হচ্ছে পরমাত্মার অংশ যা আল্লাহ্‌ ফুৎকারের সাহায্যে মানুষের ভিতরে আত্মারূপে প্রবেশ ঘটিয়েছেন। দেখুন সূরা [ ১৫ : ২৯ ] আয়াত। এভাবেই আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ্‌ আমাদের সুউচ্চ মর্যদা দান করেছেন এবং তাঁর সান্নিধ্যের আলোকের যোগ্য করেছেন।

৫৬৭৮। ফিরিশতা ও রূহু আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকে বহু বছরের সাধনায়। এই মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত যোগ্যতা অর্জন, আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ যোগ্যতা ব্যতীত সম্ভব নয়। এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য বহু সময়ের প্রয়োজন ; পৃথিবীর মাপকাঠিতে তা হয়তো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতের জন্য তা হবে এক মূহুর্ত বা একদিন। এ ভাবেই সময়ের আপেক্ষিক ধারণাকে প্রকাশ করা হয়েছে যার ব্যাখ্যা একমাত্র বিজ্ঞানই দিতে পারে। দেখুন সূরা [ ৩২ : ৪ - ৫ ] ও টিকা ৩৬৩২ এবং ৩৬৩৪।

৫। সুতারাং তুমি ধৈর্য্য ধারণ কর, পরম [ সন্তোষজনক ] ধৈর্য। ৫৬৭৯

৫৬৭৯। আল্লাহ্‌ রাসুলের (সা) জীবনের উদাহরণের মাধ্যমে ধৈর্য ধারণের প্রতি উপদেশ দান করেছেন। রাসুলের (সা) প্রতি অত্যাচার ও নির্যাতন যখন ছিলো প্রতিদিনের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাঁকে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করতে বা ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দান করেছেন। বিপদ ও বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে অভিযোগের প্রবণতা দেখা যায়। মানুষ তার দুভার্গ্যের জন্য সকলকে দোষী করার প্রয়াস পায়। তাঁর এই অভিযোগ কখনও হয় প্রকাশ্য কখনও অপ্রকাশ্য। তার এই অভিযোগ পূর্ণ অসহায়ত্ব কোন ধৈর্য প্রদর্শন নয়। এই আয়াতে যে ধৈর্যের উল্লেখ করা হয়েছে তা "পরম ধৈর্য "। অর্থাৎ জীবনের সকল অবস্থাতেই আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করা এবং দুঃখ -বিপদ, বিপর্যয়কে আল্লাহ্‌র দান হিসেবে গ্রহণ করে এ সবের মাঝে নিহিত আল্লাহ্‌র মঙ্গল ইচ্ছাকে অনুসন্ধান করার নামই হচ্ছে "পরম ধৈর্য" বা "Patience of beautiful Contentment"। মোমেন বান্দারা বিশ্বাস করবে যে তাদের জীবনে যাই-ই ঘটুক না কেন তা আল্লাহ্‌ প্রেরণ করেছেন বান্দার কল্যাণের জন্য, যেমনটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম নবী করিমের জীবনে। এরূপ ধৈর্য্য হচ্ছে বেহেশতি শান্তির প্রতীক, কারণ তা উৎসারিত হয় আল্লাহ্‌র প্রতি পবিত্রতম বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা থেকে।

৬। ওরা ঐ দিনকে মনে করে সুদূর পরাহত [ ঘটনা ]।

৭। কিন্তু আমি দেখছি ইহা [ অতি ] আসন্ন। ৫৬৮০

৫৬৮০। পাপীরা পার্থিব জীবনে অনেক সময়েই তাদের পাপের জন্য সমুচিত শাস্তি, লাভ করে না। সুতারাং তাদের ধারণা হয় যে পাপের শাস্তি বহু দূর বা প্রকৃত পক্ষে এরূপ শাস্তির অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা সন্ধিহান হয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ্‌ বলেছেন যে সময়ের বৃহত্তর পরিসরে এবং আল্লাহ্‌র বিশ্বজনীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তা অতি নিকটে। কারণ সময়ের যে ধারণা আমরা করে থাকি তা আপেক্ষিক মাত্র, যে ধারণা আধ্যাত্মিক জগতের জন্য প্রযোজ্য নয়। পাপীদের পাপের শাস্তি এই পৃথিবীর জীবনে ঘটতেও পারে বা না ঘটতেও পারে, কিন্তু পরলোকের জীবনে তা অবশ্যই ঘটবে।

৮। সে দিন আকাশ হবে গলিত তামার ন্যায় ৫৬৮১

৫৬৮১। দেখুন সূরা [ ১৮: ২৯ ] আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে দোযখে পাপীদের উত্তপ্ত গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয় পান করানো হবে। এবং সূরা [ ৪৪ : ৪৫ ] আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে যে, তাদের খাদ্য হবে গলিত ধাতুর ন্যায় যা তাদের পেটের মাঝে ফুটতে থাকবে। এই আয়াতে বলা হয়েছে কেয়ামত দিবসে আকাশ হবে গলিত ধাতুর ন্যায়। অনেকের মতে তা হবে তেলের তলানির মত গাদ। এ সব উপমার সাহায্যে এ সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে যে, সেদিন এই চেনা জানা পৃথিবী ও পৃথিবীর উপরে বেষ্টনীকৃত সুউচ্চ নীল আকাশ সব কিছুই বিকৃত হয়ে যাবে ও বীভৎস রূপ ধারণ করবে।

৯। পর্বত সমূহ হবে পশমের মত ৫৬৮২,

৫৬৮২। দেখুন সূরা [ ১০১ : ৫ ] আয়াত, যেখানে পর্বত সমূহকে ধনিত তুলার মত বলা হয়েছে। পর্বত হচ্ছে কাঠিন্য, স্থায়িত্ব, বিশালত্বের প্রতীক। যে পর্বতকে পার্থিব জীবনে অবিনশ্বর রূপে প্রতীয়মান হয়, সেই পবর্তও সেদিন রঙ্গীন পশমের ন্যায় হাল্‌কা নমনীয় বোধ হবে।

১০। বন্ধু বন্ধুর খোঁজ খবর নেবে না ৫৬৮৩, -

৫৬৮৩। কেয়ামত দিবসে এই চেনা জানা পৃথিবী এতটাই পরিবর্তিতত হয়ে যাবে যে, স্বর্গ ও মর্তকে বিভেদ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেদিন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কও হয়ে পড়বে কুৎসিত ও ভয়াবহ। কারণ পাপীরা পৃথিবীতে পাপে নিমগ্ন ছিলো। ফলে তাদের মন মানসিকতা থেকে পবিত্রতা দূরীভূত হয়ে পাপের কালিমাতে ঢেকে যাবে। ফলে অন্ধকার আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে দেয়। তাদের এই অন্ধকারচ্ছন্ন আত্মা বাইরের পৃথিবীর লোকের দৃষ্টিগোচর না হলেও, হাশরের ময়দানে তাদের পাপের বিবরণ সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হবে। ফলে পাপীরা সেদিন তাদের কৃতকর্মের পরিণাম উপলব্ধিতে সমর্থ হবে এবং ভয়ে আতঙ্কে ও শঙ্কায় তাদের অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে পড়বে। সেদিন তারা উপলব্ধি করবে যে আত্মীয়, স্বজন, বন্ধু, বান্ধব কেউই কারও উপকারে আসবে না। সেদিন তারা নিকতম বন্ধুকেও পরিত্যাগ করবে এবং তাদের দর্শনেও তাদের মাঝে উদ্বেগ ও দুঃশ্চিন্তার জন্ম দেবে।

১১। যদিও তাদের রাখা হবে একে অপরের দৃষ্টি সীমার মধ্যে; অপরাধীরা সেদিনের শাস্তির বদলে দিতে চাইবে তার সন্তানদের, ৫৬৮৪ -

৫৬৮৪। পার্থিব জীবনেও পাপীদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বার্থপরতা। তাদের সকল পাপের উৎস মুখ হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থ। হাশরের ময়দানেও তারা এই মানসিকতা থেকে মুক্তি লাভ করবে না। তাদের পাপ মুক্তির জন্য তাদের সন্তান-সন্ততি, তার পরিবার,বন্ধু বান্ধব, যারা পার্থিব জীবনে তাকে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সঙ্গ দান করেছিলো, তাদের সকলকে মুক্তিপণ হিসেবে দান করতে দ্বিধা বোধ করবে না। তাদের উদ্বেগ দুশ্চিন্তা ও স্বার্থপরতা এরূপ বীভৎসরূপ ধারণ করবে।

১২। তার স্ত্রী ও ভ্রাতাকে,

১৩। তার জ্ঞাতি- গোষ্ঠিকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত।

১৪। এবং পৃথিবীর সকল কিছুর বিনিময়ে, যাতে এই মুক্তিপণ তাকে মুক্তি দেয়। ৫৬৮৫

৫৬৮৫। পৃথিবীর সকল কিছু এমনকি সকল ভালোবাসার সম্পর্ককেও সে ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য মুক্তিপণ দিতে দ্বিধাবোধ করবে না। কিন্তু কিছুই তাঁকে আল্লাহ্‌র শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। দোষখের আগুন তার জন্য অপেক্ষা করবে।

১৫। কখনই তা হবার নয় ! নিশ্চয়ই তা হবে জাহান্নামের আগুন।

১৬। যা মাথার খুলি পর্যন্ত চামড়া খসিয়ে নেবে ৫৬৮৬।

৫৬৮৬। এই আয়াতটির ইংরেজী ও বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজীতে বলা হয়েছে, [ ৭০ : ১৬ ] ;Plucking out [ his being ] Rigid the skull যার ভাবার্থ করা যায় যে দোযখের সেই ভয়াবহ অগ্নি শুধু যে তাদের গায়েরf চামড়াই তুলে নেবে তাই-ই নয়, তা তাদের মস্তিষ্ক পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অর্থাৎ পাপীদের অনুধাবন ক্ষমতাকেও তা আক্রান্ত করবে, যেরূপ বলা হয়েছে [ ১০৪ : ৭ ] আয়াতে। ''যাহা হৃদয়কে গ্রাস করিবে।" হৃদয় অর্থাৎ অন্তরের অনুভূতি ও ভালোবাসার স্থল, এই বর্ণনাগুলিকে এক কথায় এ ভাবে প্রকাশ করা যায় যে, পাপীদের শাস্তিকে দোযখের আগুনের প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে যা তাদের অন্তরের অন্তঃস্থলকে পর্যন্ত দহন করবে।

১৭। যারা [ সত্যের প্রতি ] পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিলো, ৫৬৮৭, এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, তাদের [ সকলকে জাহান্নাম ] আমন্ত্রণ জানাবে।

১৮। যারা [ সম্পদ ] পুঞ্জিভূত করেছে এবং [ ব্যবহার না করে ] সংরক্ষিত রেখেছে !

৫৬৮৭। পাপের বিশ্লেষণ করা হয়েছে চারটি প্রধান ভাগে। প্রথম দুটি হচ্ছে মনঃস্তাত্বিক, দ্বিতীয় দুটি হচ্ছে ভোগবিলাসের মাধ্যমে বা কর্মে। ১) মানুষের পাপের প্রথম শুরু হয় সত্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শনের মাধ্যমে। সত্যকে ন্যায়সম্মত পন্থায় স্বীকৃতি না দেওয়ার মাধ্যমে। অথবা সত্য ও ন্যায়ের প্রতি উদাসিনতা থেকে সৃষ্ট মানসিকতার জন্য অথবা অত্যাচারিত হওয়ার ভয়ে ন্যায় ও সত্য থেকে দূরে সরে থাকার কারণে। ২) মানুষ যখন মনঃস্তাত্বিকভাবে এরূপ বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হয়, তখন বিবেক এবং মানুষের অন্তরের মাঝে সত্যকে সনাক্ত করার যে স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে, সেই ক্ষমতা ব্যক্তিকে সত্য পথে, ন্যায়ের পথে ধরে রাখতে প্রয়াস পায় এবং সত্য পথ তাকে সর্বদিক থেকে সৎ পথে, ন্যায়ের পথে ফিরে আসতে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু পুণঃ পুণঃ পাপের ফলে যাদের আত্মার উপরে কঠিন আবরণ পড়েছে তারা ইচ্ছাকৃত ভাবে "মুখ ফিরিয়ে রাখে ", অর্থাৎ ইচছাকৃত ভাবে সত্যকে প্রত্যাখান করে থাকে, সত্যকে অপমানিত করে থাকে। ৩) তাদের এই দ্বিবিধ মনঃস্তাত্বিক কারণে তাদের মনোজগতে যে পরিবর্তন সাধিত হবে তার ফলে তারা লোভ লালসার নিকট আত্মসমর্পনে বাধ্য হবে। তারা সম্পদের লোভে সম্পদের পাহাড় গড়ার কাজে আত্মনিবেদন করবে। পার্থিব যে সব সুযোগ সুবিধা, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি তার প্রাপ্য নয় সে সব লাভ করার জন্য সে প্রাণাপাত করবে। এ সব লাভ করার জন্য সে ন্যায় অন্যায়ের সীমারেখা মান্য করবে না। সে প্রতারণা, মোনাফেকী এবং অপরাধের আশ্রয় গ্রহণে দ্বিধা বোধ করবে না। ৪) এসবের মাধ্যমে সে যখন পার্থিব সম্পদ, সুযোগ সুবিধা ও প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করে থাকে; তার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে, সে এগুলি চিরদিন কুক্ষিগত করে রাখার প্রয়াস চালাবে এবং অন্যকে তা থেকে বঞ্চিত করাই হবে তার একমাত্র উদ্দেশ্য। তাঁর সঞ্চিত অর্থে যাতে অন্যের অধিকার না থাকে, অপরের বিদ্বেষ থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য সে থাকবে সদা সচেষ্ট। তার অর্ন্তজগত এ ভাবেই পার্থিব পাপের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। যার ফলে তার আধ্যাত্মিক জগত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।

১৯। মানুষকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্ত করে ; ৫৬৮৮

৫৬৮৮। সূরা [ ৯৫ : ৪ ] আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, " আমি তো সৃষ্টি করিয়াছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে। " মানব সন্তানের জন্য মহত্তর ও উচ্চতর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে কারণেই তাঁকে দান করা হয়েছে "সীমিত আকারে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ;'' যা আর কোনও প্রাণীকে দান করা হয় নাই। এই ইচ্ছাশক্তির সঠিক ব্যবহারে মানুষ দেবত্বে উন্নীত হয় এবং এর অপব্যবহারে মানুষ পশুতে পরিণত হয়। তার চরিত্র রীপুর দাসে পরিণত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সে হয়ে পড়ে দুর্বল [ ৪ : ২৮ ], ত্বরাপ্রিয় [ ১৭ : ১১ ] ও অস্থির বা অধৈর্য [ ৭০ : ১৯ ] মানুষকে এ ভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে, কারণ আল্লাহ্‌ এসব দুর্বলতা অতিক্রম করার ক্ষমতা তাঁকে দান করেছেন। মানুষ তাঁর কর্ম দ্বারা এ সব দুর্বলতা অতিক্রম করতে সক্ষম অথবা এ সব দুর্বলতা দ্বারা পশুত্বে উপণীত হতেও সক্ষম।

২০। যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী।

২১। আর যখন কল্যাণ স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ ; ৫৬৮৯

৫৬৮৯। যখন মানুষকে বিপদ বিপর্যয় স্পর্শ করে, মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম হচ্ছে সে হতাশ হয়ে পড়ে ও সর্বদা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে। আবার যখন সম্পদে, ক্ষমতায়, প্রভাবে সে হয় সমৃদ্ধ সে হয়ে পড়ে উদ্ধত, গর্বিত ও অহংকারী। নিজের শক্তিতে তার এতটাই প্রত্যয় জন্মে যে, সে অপর লোকের অধিকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, অন্যের অধিকারের ব্যাপারে সে হয় অত্যন্ত কৃপণ এবং নিজেকে সকল দোষ ত্রুটির উর্দ্ধে কল্পনা করে থাকে। মানুষের চরিত্রের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা সার্বজনীন এবং যুগ কাল অতিক্রান্ত

২২। তবে যারা প্রার্থনায় [সালাতে] আন্তরিক তারা এরূপ করে না ; ৫৬৯০

২৩। এবং যারা তাদের প্রার্থনায় [ সালাতে ] সদা -প্রতিষ্ঠিত

৫৬৯০। উপরে যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে তা সাধারণ পাপী তাপী, মানু্ষের জন্য প্রযোজ্য। তবে যারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনায় একান্ত নিবেদিত তাদের বৈশিষ্ট্য সমূহ বর্ণনার সময়ে "তবে ... " শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে "সালাতে আন্তরিক" বাক্যটির পূর্বে। সালাত আদায়কারীদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন স্থানে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে এরা হলেন বিশ্বাসী ও পূণ্যাত্মা। সালাতে আন্তরিকতা দ্বারা শুধু মাত্র আনুষ্ঠানিকতা বা সেজদাকে বুঝানো হয় না। এর অর্থ ব্যক্তির চিন্তা, কথা ও কাজে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন। এর অর্থ আল্লাহ্‌র উপস্থিতি আত্মার মাঝে উপলব্ধি করা। "আন্তরিক" বাক্যটি দ্বারা মনের এই উপলব্ধি ও অনুভবকে বুঝানো হয়েছে। আত্মার মাঝে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভ ; প্রকৃত দান, ইহজীবনকে পরলোকের জন্য শিক্ষানবীশকাল হিসেবে মূল্যায়ন করা; আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করা; আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টিকে পরিহার করা ; যৌন পবিত্রতা রক্ষা করা; আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ; সত্য সাক্ষে যারা অটল এবং সালাত বা আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য অন্তরের মাঝে সযত্নে রক্ষাকারী বা সালাতে যত্নবান এরাই জান্নাতে সম্মানীত হবেন। [ ২২ - ৩৫ আয়াত ]।

২৪। আর যাদের সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত হক,

২৫। [ অভাবগ্রস্থের ] জন্য যারা, যাঞা করে ও যারা যাঞা করে না, উভয়ের জন্য ৫৬৯১

৫৬৯১। দেখুন সূরা [ ৫১ : ১৯ ] আয়াতের টিকা ৫০০১। যাঞাকারী অর্থাৎ যারা সাহায্য প্রার্থনা করে। এদের আমরা খুব সহজেই সনাক্ত করতে পারি। কিন্তু যারা বঞ্চিত অর্থাৎ যাদের প্রয়োজন আছে কিন্তু যাঞা করতে অপারগ "বঞ্চিত" শব্দটি দ্বারা তাদেরই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃত অভাবগ্রস্থের অভাব মোচনের মধ্যেই দানের প্রকৃত মাহাত্ম্য নিহিত। এরা যাঞাকারী হোক বা না হোক সে বিষয় গৌণ। সাধারণতঃ দেখা যায় অলস ও কর্মবিমুখ ব্যক্তিরা, যারা অপরের উপার্জনে জীবন ধারণ করতে ভালোবাসে তারাই অপরের নিকট যাঞা করতে দ্বিধা বোধ করে না। সুতারাং প্রকৃত অভাবগ্রস্থকে খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যেনো সময়োচিত সাহায্য তার উপকার সাধনে সমর্থ হয়। সকল মানুষের প্রতিভা, যোগ্যতা, সুযোগ-সুবিধা সবই আল্লাহ্‌র দান। যারা এসবে ধন্য আল্লাহ্‌র এসব নেয়ামতের জন্য তাদের আছে বাড়তি দায় দায়িত্ব। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে যারা অভাবগ্রস্থ তাদের খুঁজে বের করে সাহায্য করা। যেমন বিদ্যানের উচিত যেখানে জ্ঞানের অভাব সেখানে সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করা ; দুর্বলের প্রতি সবলের সাহায্য, দুস্থের প্রতি সহানুভূতি, দরিদ্রের প্রতি ধনীর, অসহায়ের প্রতি শক্তিশালীর ইত্যাদি জীবনের বিভিন্ন অভাবগ্রস্থদের মাঝে, যাদের সামর্থ্য আছে তাদের সাহায্যের হাতকে সম্প্রসারিত করা। যারা আল্লাহ্‌র নেয়ামতে ধন্য তারা যেনো উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, এই নেয়ামত সমূহ তাদের কোনও নিজস্ব ক্ষমতায় সৃষ্টি হয় নাই। এসব সর্বশক্তিমানের দান তার সৃষ্টির সেবার জন্য

২৬। এবং যারা শেষ বিচারের দিনকে সত্য বলে বিশ্বাস করে ;

২৭। যারা তাদের প্রভুর অসন্তুষ্টিকে ভয় পায়, ৫৬৯২ -

৫৬৯২। প্রতিপালকের শাস্তি সম্পর্কে ভীত থাকার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌র আইন ভঙ্গ না করা বা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ না করা। এই -ই হচ্ছে আল্লাহ্‌ ভীতি। মানব জীবনের সকল ইচ্ছাকে স্রষ্টার ইচ্ছার নিকট পদাবনত করে দিলে এবং পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের মাধ্যমেই আত্মার মাঝে অপার সুখ শান্তি ও প্রশান্তির জন্ম লাভ ঘটে। কারণ আত্মার ধর্মই হচ্ছে আল্লাহ্‌ ইচ্ছার সাথে ঐক্যতান। সমন্বিত হওয়ার আকাঙ্খা। অপর পক্ষে পাপবোধ আত্মার মাঝে বিরোধ বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তির সৃষ্টি করে - যার অপর নাম ঐশি ক্রোধ।

২৮। প্রভুর অসন্তুষ্টি হচ্ছে [ মানসিক ] অনাবিল প্রশান্তির বিপরীত ; ৫৬৯৩

৫৬৯৩। এই আয়াতটি ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে নিম্নলিখিত ভাবে, " For their Lord's displeasure is the opposite of peace and Tranquility " যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহ্‌র ক্রোধ মানসিক প্রশান্তির বিপরীতে কাজ করে। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টি এমন এক বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থা যার বিরুদ্ধে কোন নিরাপত্তা কেউ দিতে অক্ষম। আল্লাহ্‌র শাস্তি যে কোন মূহুর্তে যে কোন দিক হতে নিপতিত হতে পারে। সুতারাং প্রতিপালকের আইনকে যারা ভঙ্গ করে, তারা আল্লাহ্‌র শাস্তি থেকে নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারে না।

২৯। এবং যারা তাদের যৌন সততা রক্ষা করে,

৩০। তাদের পত্নী অথবা অধিকারভূক্ত দাসী ব্যতীত ৫৬৯৪, এর জন্য তাদের দোষ দেয়া হবে না।

৩১। কিন্তু যারা এই সীমা অতিক্রম করে, তারা সীমালংঘনকারী ; -

৫৬৯৪। দেখুন আয়াত [ ৪ : ২৫ ] যেখানে যুদ্ধ বন্দী ইমানদার দাসীদের বিবাহের অনুমতি দান করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সামাজিক সম্মান স্বাধীন বিবাহিত নারীদের অপেক্ষা কম হবে। বর্তমানে ক্রীতদাস প্রথা নাই। সুতারাং এই আইনও বর্তমানে অপ্রচলিত।

৩২। এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, ৫৬৯৫

৫৬৯৫। আমানত ও প্রতিশ্রুতি প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য উভয়ই হতে পারে, দেখুন [ ৫ : ১ ] আয়াতের টিকা নং ৬৮২। মানুষের সম্পূর্ণ জীবনই হচ্ছে আমানত ও প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ। কখনও তা অতি সাধারণ দৈনন্দিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। কখনও তা বৃহৎ কর্মজীবনের সাথে সম্পৃক্ত যা অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ বা অসাধারণ যাই-ই হোক না কেন অঙ্গীকার সব সময়ই আল্লাহ্‌র চোখে পবিত্র। উপরন্তু আমাদের জীবন, মেধা, মননশীলতা, সৃজন ক্ষমতা, প্রভৃতি সবই আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আমাদের জন্য নেয়ামত স্বরূপ, যা আল্লাহ্‌ আমাদের দান করেছেন আমানত স্বরূপ। সুতারাং এ সব নেয়ামতের দায়িত্বও আমাদের বহন করতে হবে বৈকি। এ ব্যাপারে প্রত্যেকের কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্বন্ধে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।

৩৩। এবং যারা তাদের সাক্ষ্যদানে অটল থাকে, ৫৬৯৬

৫৬৯৬। "সাক্ষ্য দানে অটল " - অর্থাৎ যদি আমরা প্রকৃত সত্য ঘটনা অবগত থাকি, তবে আমাদের উপরে সত্য সাক্ষী দানের দায়িত্ব্‌ ও কর্তব্য আরোপিত হয়। যদি এই সাক্ষ্য দানে আমাদের পরিবার পরিজন বা নিকট জনেরা ক্ষতিগ্রস্থ হয় - তবুও সত্য সাক্ষ্য দান থেকে বিরত থাকা চলবে না। এই সাক্ষ্য দানে হতে হবে 'অটল' - অর্থাৎ নির্ভিক, পক্ষপাতহীন। এই সাক্ষ্য যদি আমাদের দুঃখ কষ্টে নিপতিত করে, ক্ষতির সম্মুখীন করে, বন্ধু-বান্ধব হীন করে, তবুও সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রাখতেই হবে। কারণ তা আল্লাহ্‌র হুকুম। মিথ্যা ও পাপমুক্ত হয়ে সত্যাশ্রয়ী জীবনের অঙ্গনে যাদের পদচারণা তারাই আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দা।

৩৪। এবং যারা তাদের এবাদতের [ পবিত্রতা ] রক্ষা করে ৫৬৯৭, -

৩৫। [ বেহেশতের শান্তির ] বাগানে এরাই হবে সম্মানিত।

৫৬৯৭। "এবাদতের পবিত্রতা" - এই বাক্যটি দ্বারা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা বা নামাজকে বোঝায় না। মুসলমানদের সমগ্র জীবনই আল্লাহ্‌র এবাদত। তাঁর কর্ম হবে সৎ, দান হবে বিশ্ববিধাতার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গিত ;পূত ও পবিত্র। মানুষের সমগ্র জীবন - জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ এক কথায় পার্থিব জীবন -ই হচ্ছে আল্লাহ্‌র এবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি। জীবনের এই উদ্দেশ্যকে পূত ও পবিত্র রাখা প্রত্যেকের মহৎ কর্তব্য। আমরা ২৩ নং আয়াতে শুরু করেছিলাম "সালাতকে সদা প্রতিষ্ঠিত " বাক্যটি দ্বারা এর পরের আয়াতগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে মোমেন বান্দাদের পার্থিব জীবনের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের পবিত্রতা বর্ণনা করে - যার মাধ্যমে তারা আল্লাহ্‌র এবাদত বা সালাত কায়েম করে থাকেন। এবং শেষ করা হয়েছে, " এবাদতের পবিত্রতা রক্ষা করে" অর্থাৎ কর্তব্য কর্মে অবিচল থাকা ও পবিত্রতা রক্ষা করার আদেশ দ্বারা।

মন্তব্য : এই আয়াতগুলির অর্ন্তনিহিত উপদেশ আজকের মুসলিম সমাজের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক নামাজ বা রোজার মাঝে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কোনও মুক্তি নাই। চিন্তায় ও কর্মে পূত পবিত্র জীবন যাপনই হচ্ছে মুসলিমদের প্রকৃত সালাত বা বিশ্ব স্রষ্টার এবাদত।

রুকু - ২

৩৬। অবিশ্বাসীদের কি হলো যে, ওরা পাগলের মত তোমার দিকে ছুটে আসছে - ৫৬৯৮

৩৭। দক্ষিণ ও বাম দিক থেকে, দলে দলে ?

৫৬৯৮। " ওরা পাগলের মত তোমার দিকে ছুটে আসছে " - কাফেররা পরলোকের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। রাসুল (সা) এর কুরআন তেলাওয়াত এবং তাতে জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা শুনে কাফেররা রাসুলের (সা) প্রতি ধাবিত হতো কোরাণের বর্ণিত বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করার মানসে। কিন্তু বাইরে তারা ভাব করতো যে, তারা তা শোনার জন্য ধাবিত হচ্ছে। এদেরকেই সাবধান করা হয়েছে ব্যঙ্গ বিদ্রূপাত্মক ভাষায়।

৩৮। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি কি বেহেশতে প্রবেশের আকাঙ্খা করে ?

৩৯। কখনও না, তারা জানে, আমি তাদের সৃষ্টি করেছি নিকৃষ্ট পদার্থ থেকে ৫৬৯৯

৫৬৯৯। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতি নিম্ন্‌ উপাদান থেকে। মানুষের এই দেহ মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্ট, যার প্রয়োজন পশুর প্রয়োজনের ন্যায়। এই দেহের মাঝে আল্লাহ্‌ রূহুকে ফুৎকারের সাহায্যে প্রবেশ করিয়েছেন যা স্বর্গীয় ও পরমাত্মার অংশ [ ১৫ : ২৯]। পূত পবিত্র পার্থিব জীবন যাপনের ফলে, আল্লাহ্‌র জীবন বিধান অনুযায়ী পৃথিবীর পথ অতিক্রমের ফলে আধ্যাত্মিক জীবনের সফলতা লাভ করা যায়। পূত পবিত্র আত্মায় আল্লাহ্‌র নূর প্রতিফলিত হয়। এ ভাবেই স্রষ্টা মানুষকে নশ্বর দেহের মাধ্যমে দান করেছেন পাশবিক অংশ বা পশুর মনোবৃত্তি এবং আত্মার মাধ্যমে দান করেছেন ঐশ্বরিক গুণাবলী যা তাকে ফেরেশতাদের উর্দ্ধে স্থান দান করেছে। মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি - এই আত্মিক উৎকর্ষতার জন্যই। এভাবেই আল্লাহ্‌ মানুষের জন্য মহত্তর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সৃষ্টি করেছেন পরলোকের জীবনের প্রতিশ্রুতিতে। মানুষ নশ্বর দেহ সৃষ্টির উপাদান তার পাশবিক প্রয়োজন সম্বন্ধে সম্যক অবগত।

৪০। অতঃপর আমি পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভুর নামে শপথ করছি ৫৭০০, ৫৭০১ যে, নিশ্চয়ই আমি সক্ষম -

৪১। তাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর মানবগোষ্ঠিকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করতে এবং [ আমার পরিকল্পনায় ] আমি পরাজিত হব না।

৫৭০০। শপথের উল্লেখ আছে সূরা [ ৬৯ : ৩৮] আয়াত ও টিকা ৫৬৬৫ এবং সূরা [৫৬ : ৭৫] আয়াত। এই আয়াতে আল্লাহ্‌ তাঁর নিজস্ব ক্ষমতাকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বর্ষচক্রের বিভিন্ন সময়ে সূর্য বিভিন্ন স্থানে উদিত ও অস্ত যায়। উদীয়মান ও অস্তগামী সূর্যের অত্যুজ্জ্বল দীপ্তি ও রং এর ছটা যার সৃষ্টি, সেই স্রষ্টার শপথ এখানে করা হয়েছে।

৫৭০১। দেখুন সূরা [ ৩৭ : ৫ ] আয়াত ও টিকা ৪০৩৪। যদিও আমরা প্রতিদিন সূর্যকে পুর্বদিকে উদিত হতে দেখি, কিন্তু জ্যোর্তিবিদরা জানেন যে সূর্য কোনও এক নির্দ্দিষ্ট স্থানে উদিত হয় না। সৌর বর্ষ ব্যপী সূর্য প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে উদিত হয়। যিনি একই সূর্যকে বিভিন্ন স্থানে উদিত করতে সক্ষম, অবশ্যই তিনি অবিশ্বাসী কাফেরদের অপেক্ষা উৎকৃষ্ট মানব সৃষ্টিতে সক্ষম।

৪২। অতএব, ওদের নিরর্থক কথাবার্তা এবং ক্রীড়া কৌতুকে মত্ত থাকতে দাও ৫৭০৩, যতক্ষণ না তারা সেদিনের সম্মুখীন হয়, যে সম্পর্কে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো।

৫৭০৩। অবিশ্বাসীদের সন্দেহ, বাক্‌ বিতন্ডা বৃথা। কারণ এর দ্বারা তারা কোনও লাভই করতে সক্ষম হবে না। এটা হচ্ছে তাদের বোকামী, তাদের মত যারা দূরদৃষ্টিহীন ও গভীর ভাবে চিন্তা করতে অক্ষম। তারা অস্বীকার করলেও এবং শেষ বিচারের দিন সম্বন্ধে অমনোযোগী থাকলেও তা অবশ্যই আসবে যার বর্ণনা আছে পরবর্তী দুটি আয়াতে।

৪৩। যেদিন তারা কবর থেকে উত্থিত হবে দ্রুতবেগে, মনে হবে তারা নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে [ যা তাদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে ] ৫৭০৪

৫৭০৪। এই আয়াতে শেষ বিচারের দিনের চিত্র আঁকা হয়েছে। সেদিন এক নির্দ্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হবে যা প্রকৃত সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। সেদিন প্রত্যেকেই প্রকৃত সত্যের মানদন্ডকে সনাক্ত করতে সক্ষম হবে। অবিশ্বাসীরা সত্যকে প্রত্যক্ষ করবে লজ্জা ও অনুতাপের মাধ্যমে। কিন্তু সেদিন আর অনুতাপ করার সময় দেয়া হবে না।

৪৪। তাদের নেত্রদ্বয়, বিষাদে নত হবে; অপমান তাদের [ সর্বাঙ্গ ] আচ্ছন্ন করবে। এই হবে সে দিন, যার সম্বন্ধে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো।