Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৭৮ জন
আজকের পাঠক ১৩৮ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৪৫৭৫৪ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২১৩৭২৪ বার
+ - R Print

সূরা নূহ্‌


সূরা নূহ্‌ - ৭১

২৮ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা ও সারাংশ : এটা আর একটি মক্কী সূরা যা প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয় এর বিষয়বস্তু হচ্ছে ভালো যখন সত্য ও পূণ্যের মানদন্ড সমুন্নত রাখবে তখন একটা সময় আসবে যখন সে নিশ্চয়ই পাপীদের সঙ্গ পরিহার করবে, যাতে দূর্নীতি বিস্তার লাভ না করে। মহাপ্লাবনের পূর্বে এই ছিলো নূহ্‌ এর প্রার্থনার বিষয় বস্তু। হযরত নূহ্‌ এর যন্ত্রণার অনুরূপ যন্ত্রণা ছিলো মহানবীর প্রতি মক্কাবাসীদের অত্যাচার।


সূরা নূহ্‌ - ৭১

২৮ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

১। আমি নূহ্‌ কে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম [ এই আদেশ সহকারে ] ৫৭০৫ : " তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সর্তক কর, তাদের প্রতি ভয়াবহ শাস্তি আসার পূর্বেই।"

৫৭০৫। হযরত নূহ্‌ এর নবুয়তের উল্লেখ বহুস্থানে করা হয়েছে। বিশেষ ভাবে করা হয়েছে [ ১১ : ২৫ -৪৯ ] আয়াত সমূহে এবং এর টিকাতে। হযরত নূহ্‌ এর সম্প্রদায় আল্লাহ্‌র প্রেরিত নৈতিক আইনকে সম্পূর্ণ রূপে প্রত্যাখান করে ফলে সমগ্র সমাজ পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। সমাজের এই পাপকে বিদূরিত করার প্রয়োজন দেখা গেলো। সুতারাং মহাপ্লাবন দ্বারা সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এভাবেই নূহ্‌ এর সম্প্রদায়ের জন্য নূতন ভাবে পাপমুক্ত জীবন শুরু করার পরিবেশ সৃষ্টি করা হলো। অবশ্য নূহ্‌ এর সম্প্রদায় বলতে তাদেরই বোঝানো হয়েছে যারা নূহ্‌ এর নৌকাতে থেকে মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পান।

২। সে বলেছিলো, " হে আমার সম্প্রদায় ! আমি তো তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য সর্তককারী, ৫৭০৬

৫৭০৬। হযরত নূহ্‌ এর সতর্কবাণী ছিলো সুস্পষ্ট এবং প্রকাশ্য। 'Mubin' শব্দটি দ্বারা এই দ্বিবিধ অর্থকেই বোঝানো হয়েছে [ ৬৭ : ২৬ ]। সর্তকবাণী দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, যদি তারা অনুতপ্ত হয়, তবে তারা আল্লাহ্‌র করুণা লাভে সমর্থ হবে।

৩। " তোমরা আল্লাহ্‌র এবাদত কর, তাঁকে ভয় কর, এবং আমাকে মান্য কর ; ৫৭০৭

৫৭০৭। এই আয়াতে আল্লাহ্‌র প্রতি মানুষের ত্রিবিধ কর্তব্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এগুলি হচ্ছে :

১) 'ইবাদত' অর্থাৎ একান্ত আন্তরিকভাবে অন্তরের অন্থঃস্থল থেকে আল্লাহ্‌র উপাসনা করা।

২) 'ভয়' অর্থাৎ অন্তরের মাঝে এই ভয় থাকা যে, পাপের শেষ পরিণতি ভয়াবহ এবং তা আল্লাহ্‌র কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পাপ মানুষের চারিত্রিক গুণাবলী ধ্বংস করে দেয়। সুতারাং আল্লাহ্‌র ভয়ে পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে।

৩) মান্য করা অর্থাৎ অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধন করতে হবে। আল্লাহ্‌র হেদায়েতের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে।

৪। "তাহলে তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং তোমাদের অবকাশ দেবেন এক নির্দ্দিষ্টকাল পর্যন্ত। যখন আল্লাহ্‌ কর্তৃক দেয় নির্দ্দিষ্ট সময়কাল শেষ হয়, তখন তা বিলম্বিত করা যায় না ৫৭০৮। যদি তোমরা তা জানতে।

৫৭০৮। আল্লাহ্‌ মানুষকে আত্মসংশোধনের জন্য পৃথিবীর জীবনে অবসর দান করে থাকেন। আল্লাহ্‌র আদেশ হচ্ছে চিরন্তন সত্য। যে সত্যকে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন বা পরিমার্জন করার ক্ষমতা এই পৃথিবীতে কাউকে দেয়া হয় নাই। সুতারাং এই সত্যকে হৃদয়ের মাঝে উপলব্ধি করে আল্লাহ্‌র প্রদত্ত নির্দ্দিষ্ট সময়কালের মাঝে আত্মসংশোধনের মাধ্যমে সকলের আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ্‌র ক্ষমালাভের মাধ্যমেই ইহকাল ও পরকালে শান্তি লাভ করা সম্ভব।

৫। সে বলেছিলো, " হে আমার প্রভু ! আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্র আহ্বান করেছি ;

৬। " কিন্তু আমার আহ্বান ওদের [ সত্য থেকে ] পলায়ণ প্রবণতাই বৃদ্ধি করেছে। ৫৭০৯

৫৭০৯। যখন পাপীদের সম্মুখে তাদের পাপের শেষ পরিণতি উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়, তখন পাপীদের মাঝে দ্বিবিধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। একদল আছে যারা পূর্বে তাদের পাপ সম্বন্ধে অনবহিত ছিলো কিন্তু সতর্কবাণী শ্রবণে তাদের জ্ঞানোদয় ঘটে এবং তারা অনুতপ্ত হয় এবং আত্মসংশোধন করে আল্লাহ্‌র প্রতি আত্মনিবেদনে জীবনকে ধন্য করে থাকে। অন্য আর এক দল থাকে যাদের মনে সতর্কবাণী বা আল্লাহ্‌র হেদায়েত কোনও রেখাপাত করে না। বরং তা তাদের মনে বিরক্তির উৎপাদন করে এবং তাদের মাঝে আল্লাহ্‌র হেদায়েত থেকে পলায়ন প্রবণতা বৃদ্ধি করে। এরা পূণ্যের পথ থেকে আরও দূরে সরে যায় এবং পাপের পিচ্ছিল পথে দ্রুত অবতরণ করে। ফলে আল্লাহ্‌র করুণা লাভের সকল দরজা ধীরে ধীরে তাদের সমানে বন্ধ হয়ে যায়। তারা আর আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ লাভে সমর্থ হয় না।

৭। " প্রত্যেক সময়ে যখনই আমি তাদের আহ্বান করেছি, যাতে তুমি তাদের ক্ষমা কর, তারা কানে অঙ্গুলী দেয়, নিজেদের পোষাক দ্বারা আবৃত করে ফেলে ৫৭১০, অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে এবং অতিশয় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে।

৫৭১০। নূহ নবীর সম্প্রদায়ের বিদ্রোহের কথা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, আক্ষরিক অর্থে তা হচ্চে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা হযরত নূহের সর্তক বাণীকে প্রত্যাখান করার জন্য কানে আঙ্গুলি প্রবেশ করিয়ে রাখতো যেনো তা শুনতে না হয়, সমস্ত শরীরকে বস্ত্রাবৃত করে রাখতো যেনো [সত্যের] আলো তাদের শরীরে প্রবেশ না করে এবং তাদের যেনো আড়াল করে রাখে, সত্যের প্রচারকের দৃষ্টি থেকে। এই আয়াতটির অর্থ প্রতীকধর্মী, যা আক্ষরিক অর্থকে অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি আহ্বান করেছে। পোষাক যেরূপ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ঢেকে রাখে, মানুষের বিভিন্ন প্রবৃত্তি বা রীপু সমূহও সেরূপ আত্মার স্বাভাবিক প্রকাশকে ঢেকে রাখে বা ব্যহত করে। এ সব প্রবণতা হচ্ছে অহংকার, বদ্‌ভ্যাস বা স্বভাব, সামাজিক রীতিনীতি যা সত্যের বিরুদ্ধাচারণ করে তার প্রতি আনুগত্য, পুরুষানুক্রমিক ভাবে প্রচলিত ঐতিহ্যের প্রতি আত্মসমর্পনের ইচ্ছা যদিও তা আত্মিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর, ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার জন্য সত্যকে ত্যাগ করা, পার্থিব গৌরব রক্ষার জন্য বৃহত্তর সত্যকে অবদমিত করার প্রবণতা ইত্যাদি। এসব প্রবণতা, জাগতিক জীবনে মানুষকে এত প্রবলভাবে আকর্ষণ করে যে তাকে তুলনা করা চলে পোষাকের সাথে। পোষাক যেরূপ সূর্যের আলোর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, মানুষের এ সব প্রবণতা বা রীপু সমূহ তাদের আত্মার চারিপার্শ্বে এরূপ বেষ্টনীর সৃষ্টি করে যে, তা ভেদ করে আল্লাহ্‌র নূর বা হেদায়েতের আলো তাদের আত্মার মাঝে পৌঁছাতে সক্ষম হয় না। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে সত্য বিমুখ হয়ে পড়ে এবং তাদের চরিত্রে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। এরূপ লোকেরাই হয়, স্বার্থপর ও উদ্ধত অহংকারী।

৮। "সুতারাং আমি তাদের উচ্চস্বরে আহ্বান করেছি,

৯। " উপরন্তু আমি তাদের সাথে প্রকাশ্যে এবং গোপনে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলেছি ৫৭১১,

৫৭১১। প্রকৃত ধর্মপ্রচারকদের যা কিছু করণীয় নূহ্‌ নবী তার সকল কিছুই প্রয়োগ করেন তার সম্প্রদায়ের হেদায়েতের জন্য। তিনি বারে বারে আল্লাহ্‌র বাণী পুণরুক্তি করেন,শোনান, প্রকাশ্যে আহ্বান করেছেন, প্রচারণা করেছেন, গোপনে ব্যক্তিগত ভাবে আবেদন করেছেন। কিন্তু সব কিছুই ছিলো বৃথা।

১০। " বলেছিলাম, " তোমার প্রভুর ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয় তিনি বারে বারে ক্ষমাশীল ;

১১। "তিনি তোমাদের প্রচুর বৃষ্টি দেবেন ৫৭১২ ;

৫৭১২। সম্ভবতঃ সে সময়ে সমগ্র দেশ ছিলো খরা কবলিত। যদি তারা নূহ্‌ নবীর আহ্বানে কর্ণপাত করতো এবং আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আনায়ন করতো, তবে আল্লাহ্‌র রহমত স্বরূপ বৃষ্টিপাত হতো এবং খরা দূর হয়ে যেতো। কিন্তু তারা নূহ্‌ নবীর আহ্বানে সাড়া দিলো না ফলে যে বৃষ্টি তাদের জন্য রহমত হতে পারতো, সেই বৃষ্টি তাদের জন্য অভিশাপরূপে আর্বিভূত হলো। প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হলো এক মহাপ্লাবন যা তাদের সকলকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। ফলে পাপী সম্প্রদায়ের সকলে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ্‌র সূদূর প্রসারী পরিকল্পনায় তা ছিলো পরবর্তী মানব সম্প্রদায়ের জন্য আর্শীবাদ স্বরূপ। কারন পাপী সম্প্রদায় ধ্বংস হওয়ার দরুণ পৃথিবীতে নূতন মানব সম্প্রদায় জন্ম লাভ করার সুযোগ পেলো যারা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণে গুণান্বিত।

১২। " তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে; এবং তোমাদের দান করবেন উদ্যানসমূহ এবং দান করবেন [ স্রোতস্বীনি ] নদীসমূহ। ৫৭১৩

৫৭১৩। আল্লাহ্‌র নেয়ামতের কয়েকটি ধাপ এখানে উল্লেখ করা হয়েছে বৃষ্টি এবং শষ্য যা পরস্পর সম্পর্কিত, সম্পদ ও জনশক্তি [ সন্তান-সন্ততি], সমৃদ্ধ বাগান, স্থায়ী স্রোতস্বীনি ইত্যাদি হচ্ছে কোনও জাতির জন্য সমৃদ্ধির লক্ষণ। এগুলির উল্লেখ কোরাণে করা হয়েছে শুধুমাত্র পার্থিব উন্নতি বুঝানোর জন্যই নয়। এগুলি হচ্ছে প্রতীক ধর্মী যার সাহায্যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতিকে বুঝানো হয়। লক্ষ্য করুন, স্রোতস্বীণি নদীসমূহ" বাক্যটি। অর্থাৎ এগুলি এমন নদীনালা যার পানি সারা বৎসর প্রবাহিত হয়, শুকিয়ে যায় না। যে নদী সারা বৎসর নাব্য থাকে তার উভয়পার্শ্বে গড়ে উঠে জনপদ, বাণিজ্য কেন্দ্র, সমৃদ্ধ নগর যার অধিবাসীরা সুখ ও শান্তিতে বসবাস করে। এসব জনপদের অধিবাসীদের পার্থিব সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি পরলোকের সুখশান্তির পূর্বানুমান মাত্র।

১৩। " তোমাদের কি হয়েছে, যে তোমরা আল্লাহ্‌র শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাচ্ছ না ? -

১৪। " অথচ তোমরা কি দেখ না তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ে ? ৫৭১৪

৫৭১৪। দেখুন [ ২২ : ৫ ] আয়াত ও টিকা ২৭৭৩ - ২৭৭৭। আরও দেখুন [ ২৩ : ১২ - ১৭] এবং টিকা ২৮৭২ - ২৮৭৫। এই আয়াতটির অর্থ গভীর ও ব্যপক। মাতৃগর্ভে মানুষের সৃষ্টি যেমন পর্যায়ক্রমে ঘটে জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্তও তার দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে পর্যায়ক্রমে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে মানব সন্তান বিভিন্ন মানসিক ও আধ্যাত্মিক দক্ষতা প্রদর্শন করে থাকে। মানুষের এই মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিন্যাসকে চারিপার্শ্বের পৃথিবীর বিভিন্ন বিন্যাসের সাথে আকাশমন্ডলী সৃষ্টির বিন্যাসের সাথে তুলনা করা যায়। আল্লাহ্‌র সৃষ্টির নৈপুন্য দর্শনে এবং মনোজগতের ও আধ্যাত্মিক জগতের অনুভূতির মাধ্যমেও কি মানুষের চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করবে না?

১৫। " তোমরা কি দেখতে পাও না ; কিভাবে তিনি সৃষ্টি করেছেন সপ্ত স্তরে বিন্যস্ত আকাশমন্ডলী ; ৫৭১৫

৫৭১৫। দেখুন [ ৬৭ : ৩ ] আয়াতের টিকা ৫৫৫৯।

১৬। " এবং তার মাঝখানে চন্দ্রকে স্থাপন করেছেন আলোরূপে, এবং সূর্যকে স্থাপন করেছেন [ উজ্জ্বল ] প্রদীপরূপে ; ৫৭১৬

৫৭১৬। দেখুন [ ২৫ : ৬১ ] আয়াত যেখানে সূর্যকে উল্লেখ করা হয়েছে আকাশের প্রদীপরূপে। বলা হয়েছে, "কত মহান তিনি যিনি নভোমন্ডলে সৃষ্টি করেছেন, রাশিচক্র এবং উহাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ ও জ্যোর্তিময় চন্দ্র।"

১৭। " এবং আল্লাহ্‌ তোমাদের মাটি থেকে [ ধীরে ধীরে ] উদ্ভুদ করেছেন , ৫৭১৭

১৮। " এবং সব শেষে তিনি তোমাদের [ মাটিতেই ] ফিরিয়ে দেবেন ; এবং [ পুণরুত্থানের দিনে পুণরায়] উত্থিত করবেন ,

৫৭১৭। দেখুন [ ৩ : ৩৭ ] আয়াত যেখানে 'Nabat' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মেরী বা হযরত ঈসার মাতার শারীরিক বৃদ্ধি বুঝানোর জন্য। সাধারণ ভাবে শব্দটির সাহায্যে বৃক্ষ, তরুলতা ও উদ্ভিদ জগতের বৃদ্ধিকে বুঝানো হয়। এই আয়াতটিতে উপমা ব্যবহার করা হয়েছে যাতে বলা হয়েছে মানুষকেও উদ্ভুদ করা হয়েছে মৃত্তিকা হতে। উদ্ভিদকে যেরূপ উদ্ভুদ করা হয় মৃত্তিকা থেকে। উদ্ভিদের বেলাতে বীজ বপন করা হয়, অঙ্কুরোদ্গ ঘটে, চারাগাছের উন্মেষ ঘটে, যা বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্ত হয় এবং ফুল ফল দান করে পুণরায় মাটিতে মিশে যায়। মানুষের বেলাতে এর পরেও রয়েছে পুণরুত্থান। দেখুন [ ২০: ৫৫ ] আয়াত।

১৯। " এবং আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য ভূমিকে কার্পেটের ন্যায় [ বিস্তৃত ] করেছেন৫৭১৮;-

৫৭১৮। দেখুন [ ২০ : ৫৩ ] আয়াত।

২০। " যেনো তোমরা প্রশস্ত রাস্তায় চলাফেরা করতে পার।" ৫৭১৯

৫৭১৯। 'Fijaj' শব্দটি দ্বারা দুই পর্বতের মধ্যবর্তী উপত্যকা বা রাস্তাকে বুঝানো হয়। পৃথিবীতে বহু পর্বতশ্রেণী বিদ্যমান। এ সব পর্বত শ্রেণী দর্শনে ভ্রম হয় যে তা অতিক্রম করে যাওয়া দুঃসাধ্য। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র এ সব সুউচ্চ ও দুরূহ পর্বতশ্রেণীর মাঝে সৃষ্টি করেছেন উপত্যকা, সরু পথ যেখান দিয়ে মানুষ যাতায়াত করতে পারে এবং পর্বতকে অতিক্রম করতে পারে। সাধারণতঃ পার্বত্য পথ যেয়ে উপত্যকাতে শেষ হয়।

রুকু - ২

২১। নূহ্‌ বলেছিলো, " হে আমার প্রভু ! তারা আমাকে অমান্য করেছে এবং এমন লোকের অনুসরণ করেছে যার সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করে নাই।

২২। " এবং তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছিলো; ৫৭২০

৫৭২০। ধন-সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে পাপী ও কাফেররা উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে পড়ে। আর এই অহংকারের ফলেই তারা পূণ্যাত্মাদের ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র করে থাকে; কারণ পূণ্যাত্মাদের উপস্থিতি-ই তাদের মাঝে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি করে থাকে। সাময়িক কালের জন্য মনে হতে পারে যে, দুষ্টের ষড়যন্ত্র সফলতা লাভ করতে যাচ্ছে, কিন্তু তা কখনও হতে পারে না। আল্লাহ্‌র বিধান হচ্ছে শেষ পরিণতিতে দুষ্ট কখনও আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে সফলতা লাভ করবে না।

২৩। "এবং তারা [ পরস্পরকে ] বলেছিলো, " তোমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করো না ; ৫৭২১, পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্‌ সুওয়া'আ, ইয়াগুত, ইয়া'উক ও নাসরকে ;

৫৭২১। মোশরেকদের দেবদেবীদের নাম সমূহের উল্লেখ এখানে করা হয়েছে।

২৪। "ইতিমধ্যে তারা অনেককে বিপথে চালিত করেছে ; পাপীদের বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করো না।" ৫৭২২

৫৭২২। পৃথিবীর অগ্রযাত্রার ইতিহাস প্রমাণ করে যে, যারা এক আল্লাহ্‌র পরিবর্তে এসব দেবদেবীর আরাধনা করে থাকে, তাদের আরাধনা তাদের মাঝে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের স্ফুরণ অপেক্ষা, মানুষের কল্যাণ অপেক্ষা, কুসংস্কার, অজ্ঞানতা ও কাল্টের [cult] জন্ম দেয় যা মানুষের জন্য অকল্যাণকর। এ সব দেব দেবীর প্রতি বিশ্বাস শুধুমাত্র ভুলের পরে ভুলের সংযোজন ঘটায়। এভাবেই সমগ্র সমাজ হয়ে পড়ে কলুষিত। এ হচ্ছে আল্লাহ্‌ দেয়া প্রাকৃতিক বিধান। নূহ্‌ নবী যখন তাদের হেদায়েতে ব্যর্থ হলেন, তখন তাঁর প্রার্থনা ছিলো তাঁর অন্তরের তিক্ততার বহিঃপ্রকাশ। তিনি যালিমদের থেকে আল্লাহ্‌র রহমত বা করুণা ধারা ছিন্ন করার জন্য প্রার্থনা করেন। কারণ তারা শুধু যে নিজেরা বিভ্রান্ত তাই-ই নয়, তারা অন্যকেও বিভ্রান্ত করে বিপথে চালনা করে থাকে এবং পৃথিবীর পরিবেশকে কলুষিত করে থাকে।

২৫। তাদের পাপের দরুণ তারা [ বন্যায় ] নিমজ্জিত হয়েছিলো, ৫৭২৩, এবং তাদের প্রবেশ করানো হয়েছিলো আগুনের [ শাস্তিতে]। তারা নিজেদের জন্য আল্লাহ্‌র পরিবর্তে অন্য কোন সাহায্যকারী পায় নাই।

৫৭২৩। পাপের শাস্তি এই পৃথিবীতেই শুরু হয়ে যায়। পাপিষ্ঠের আধ্যাত্মিক জগত থাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত। পাপ কাজের পরিণতিতে পাপিষ্ঠের আত্মা উদ্বেগ, দুঃশ্চিন্তা, অশান্তি, ভয়, শঙ্কা ইত্যাদি বিভিন্ন উপসর্গে পরিপূর্ণ হয়ে পড়ে যা তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফলন বা শাস্তি। এই আয়াতে ইহলোকের শাস্তিকে উপস্থাপন করা হয়েছে নূহ্‌ নবীর সম্প্রদায়ের পানিতে নিমজ্জিত করার ঘটনার মাধ্যমে এবং পরলোকের শাস্তিকে উপস্থাপন করা হয়েছে অগ্নির মাধ্যমে। পানিতে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যু নির্দ্দেশ করে শ্বাসরুদ্ধ হওয়া, যার ফলে গলা, নাক, কান, চোখ, মুখ, ফুসফুস সব কিছু পানিতে নিমজ্জিত হয়ে শ্বাসকষ্টের মাধ্যমে দৈহিক মৃত্যু ঘটে।

অগ্নির কার্যকর ফলাফল হচ্ছে তা দেহের চামড়া, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মাংস, মগজ, হাড্ডি,মজ্জা, এক কথায় দেহের প্রতিটি অংগ প্রত্যঙ্গকে ভস্ম করে দেয়। পানিতে মৃত্যুর বৈশিষ্ট্য হলো, শরীরের অংগ প্রত্যঙ্গ অটুট থাকা সত্বেও তা আর কার্যকর থাকে না। সেরূপ পাপে নিমজ্জিত ব্যক্তির মানসিক দক্ষতা সমূহ অটুট থাকা সত্বেও তা আর কার্যকর থাকে না। মানসিক দক্ষতা হচ্ছে চারিত্রিক গুণাবলীর উৎস, যা আল্লাহ্‌র বিশেষ নেয়ামত। এই দক্ষতা কার্যকর না থাকার দরুণ পার্থিব জীবনে এসব লোকের চরিত্রের সকল গুণাবলী ধ্বংস হয়ে যায়। আগুনের ধর্মই হচ্ছে কোনও বস্তুকে প্রজ্জ্বলিত করে ভস্মে পরিণত করা। কিন্তু দোযখের আগুনের বৈশিষ্ট্য হবে যে তা দহনের পরিপূর্ণ যন্ত্রণা দান করবে কিন্তু ভস্মে পরিণত করবে না। আল্লাহ্‌ [ ৬: ১২৮ ] আয়াতে বলেছেন যে, " তোমরা সেথায় [ জাহান্নামে ] স্থায়ী হবে, যদি না আল্লাহ্‌ অন্য রকম ইচ্ছা করেন।" সময়ের এই অনন্তকালের ধারণা এই পৃথিবীতে আমাদের কল্পনা করাও সম্ভব নয়। কারণ মানুষ জন্মাবধি সসীম সময়ের ধারণায় আবদ্ধ, কিন্তু পরলোকের নূতন পৃথিবীতে সময় হবে অনন্তকালব্যপী অসীম যার ধারণা এ পৃথিবীতে করা সম্ভব নয়।

২৬। এবং নূহ্‌ বলেছিলো, " হে আমার প্রভু ! অবিশ্বাসীদের মধ্যে একজনকেও পৃথিবীতে অব্যহতি দিও না। ৫৭২৪

৫৭২৪। পৃথিবীর সকল পাপকে ও পাপীকে ধ্বংস করার জন্য আল্লাহ্‌ মহাপ্লাবন প্রেরণ করেন। হযরত নূহ্‌ এর প্রার্থনা কোন আক্রোশের বশে ছিলো না। তার প্রার্থনা ছিলো পাপের সকল প্রসারকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য আকুল আকুতি।

২৭। " কেন না, তুমি [ কাউকে] অব্যহতি দিলে, তারা তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে, এবং তারা দৃষ্কৃতিকারী ও অকৃতজ্ঞ ব্যতীত আর কিছুই জন্ম দেবে না।

২৮। " হে আমার প্রভু ! ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, এবং যারা বিশ্বাসী হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে, এবং [ সকল ] বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের ৫৭২৫। এবং পাপীদের জন্য ধ্বংস ব্যতীত কোন উন্নতি তুমি দান করো না। " ৫৭২৬

৫৭২৫। নূহ্‌ নবীর এই প্রার্থনা ছিলো সর্বকালের, সর্বযুগের,সকল মুমিন মানব সম্প্রদায়ের জন্য। তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তাঁর পিতা-মাতা তাঁর অতিথি এবং সকল মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য, যারা পৃথিবীতে সকল যুগে বিরাজ করবেন। সেই সাথে তিনি প্রার্থনা করেছিলেন পাপ ও পাপীদের ধ্বংসের জন্য যারা পৃথিবীর পরিবেশকে কলুষিত করে থাকে।

৫৭২৬। " পাপীদের জন্য ধ্বংস ব্যতীত কোন উন্নতি তুমি দান করো না," এই আয়াতটিকে পূর্বের ২৪ নং আয়াতের সাথে তুলনা করা যায়। দেখুন টিকা নং ৫৭২২।