Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫৫ জন
আজকের পাঠক ৮৬ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৬০৩৮৬ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২২৪০৮৬ বার
+ - R Print

সূরা দাহ্‌র


সূরা দাহ্‌র বা ইনসান বা সময় - ৭৬

৩১ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : সম্ভবতঃ এই সূরাটি প্রাথমিক মক্কী সূরাগুলির অন্যতম। অবশ্য এর কয়েকটি আয়াত বাদে।

এই সূরার বিষয়বস্তুতে তুলনা করা হয়েছে যারা ভালোকে গ্রহণ করে তাদের সাথে যারা মন্দকে গ্রহণ করে তাদের পটভূমিতে।

এই সূরার শিরোনাম প্রাচীন কালের প্যাগান আরবদের ধারণার ব্যাখ্যা দান করে। তারা ধারণা করতো যে, 'সময়' হচ্ছে অসীম যা সৃষ্টির আদি থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিদ্যমান ও বহমান এবং অসীম অনন্ত সময় ভবিষ্যতেও চিরদিন বিদ্যমান থাকবে। "সময়ের " এই সীমাহীনতাই মানুষের সকল পরিণতির জন্য দায়ী। সূরা [ ৪৫ : ২৪ ] আয়াতে আমরা পড়েছি যে, " তারা বলে আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদের ধ্বংস করে। " অর্থাৎ মানব সভ্যতা,মানুষের সুখ, দুঃখ সবই মহাকালের পরিক্রমায় স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাদের এই ধারণা ভুল। 'সময় ' কোন অসীম বা বির্মূত বস্তু নয়। 'সময়কেও' সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা কোন সীমাহীন বস্তু নয় - এরও একদিন শেষ হবে। সময়ের ধারণা হচ্ছে আপেক্ষিক, যা আইনেস্টাইন প্রমাণ করে গেছেন। একমাত্র আল্লাহ্‌ই হচ্ছেন অনন্ত অসীম; আদি অন্তহীন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ং অস্তিমান, প্রকৃত বাস্তব। আল্লাহ্‌র প্রতি আরোপিত গুণাবলী আমরা আমাদের কাল্পনিক বস্তু 'সময়কে ' আরোপ করবো না।

মক্কী সূরাগুলির ন্যায় এই সূরাটির সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবধারাতে সমৃদ্ধ। সুতারাং সূরাগুলির তফসীর বা ব্যাখ্যা করার সময়ে এ সত্যকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে।


সূরা দাহ্‌র বা ইনসান বা সময় - ৭৬

৩১ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

১। কালের প্রবাহে মানুষের জন্য এমন এক সময় কি ছিলো না যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিলো না ৫৮৩০, ৫৮৩১ ?

৫৮৩০। 'দহর ' বা কাল প্রবাহ যার অর্থ হচ্ছে আদি ও অন্তহীন সময়ের ধারণা।

৫৮৩১। এ কথা সত্য যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের বহু পূর্বেই এই বিশ্বভূবনের সৃষ্টি হয়েছে। ভূতাত্বিক গবেষণায় এ কথার সত্যতা প্রমাণ করে। দেখুন সূরা [ ২ : ৩০- ৩১ ] আয়াত যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে মানুষ সৃষ্টির পূর্বাভাষ। " স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলিলেন, " আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি'', তারা বললো, " আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে ? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্তুতিগান ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।" ফেরেশতাদের এই বক্তব্য থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেও পৃথিবীতে এমন সব প্রাণী বিদ্যমান ছিলো যারা অশান্তি ও রক্তপাত ঘটাতো। কারণ অনাগত মানুষের ভবিষ্যত দেখার ক্ষমতা ফেরেশতাদের ছিলো না, পৃথিবীতে সে সময়ে যারা [ ডাইনোসর ] অবস্থান করছিলো তাদেরই প্রেক্ষাপটে মানুষ সৃষ্টি সম্বন্ধে ফেরেশতারা উপরিউক্ত উক্তি প্রয়োগ করে। বিজ্ঞান বলে মানুষ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিলো।

২। আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি একবিন্দু মিলিত শুক্রবিন্দু থেকে, যেনো তাকে আমি পরীক্ষা করতে পারি। সুতারাং আমি তাকে দান করেছিলাম শোনার ও দেখার ক্ষমতা। ৫৮৩২

৫৮৩২। ' মিলিত শুক্র বিন্দু ' - নূতন প্রাণ সৃষ্টির পূর্বে ডিম্ব কোষকে শুক্রনুদ্বারা নিষিক্ত হওয়া প্রয়োজন। এ কথা বিশ্বের সকল প্রাণীর জন্য যেরূপ প্রযোজ্য, মানুষের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। তবে মানুষের বেলায় পার্থক্য হচ্ছে, মানুষের এই নশ্বর দেহ ধারণ করে অতীন্দ্রিয় আত্মা, যার ফলে তাঁকে দান করা হয়েছে কতকগুলি মানসিক দক্ষতা যা ঐশ্বরিক গুণাবলী ধারণ করতে সক্ষম। যে কোন নির্দ্দেশ সে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে [ যা প্রকাশ করা হয়েছে শ্রবণশক্তি দ্বারা ]। মানুষের আছে বুদ্ধিমত্তা এবং আধ্যাত্মিক অর্ন্তদৃষ্টি ও বিবেক [যা প্রকাশ করা হয়েছে দৃষ্টি শক্তি দ্বারা ]। এ ভাবেই মানুষকে সৃষ্টির অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করা হয়েছে।

মানুষকে দান করা হয়েছে " সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি "। এসব মানসিক দক্ষতার কারণেই সে পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি [ ২ : ৩০ ]। আল্লাহ্‌র দেয়া এই সব মানসিক ক্ষমতার সে সঠিক সদ্ব্যবহার করেছে কি না সেই জবাবদিহিতাই হবে মানুষের মনুষ্য জন্মের প্রধান সমস্যা। সুতারাং তাঁকে আল্লাহ্‌ যেমন পথের দিক্‌নির্দ্দেশনা দান করবেন, ঠিক সেরূপ ভাবে পরীক্ষাও করে নেবেন।

৩। আমি তাকে পথের নির্দ্দেশ দেখিয়েছিলাম, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে [ যা হবে তার ইচ্ছার উপরে নির্ভরশীল ] ৫৮৩৩

৫৮৩৩। আল্লাহ্‌ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিশেষ মানসিক দক্ষতা দ্বারা। সঠিক ব্যবহারের ফলে এ সব মানসিক দক্ষতা সমূহ ঐশ্বরিক গুণাবলী আত্মার মাঝে ধারণ করতে সক্ষম হয়। শুধু তাই-ই নয়, এ সব দক্ষতাকে সঠিক পথে প্রয়োগের জন্য পথ নির্দ্দেশ দান করেছেন প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এবং পথের দিশারী হিসেবে নবী রসুলদের প্রেরণ করেছেfন। যদি মানুষ কৃতজ্ঞ হয়, তবে সে আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথকে গ্রহণ করে নিজেকে মোমেন বান্দারূপে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং পূণ্যাত্মাদের অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি সে কৃতজ্ঞ না হয় তবে সে আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথকে পরিত্যাগ করবে। যার ফলে তার সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অপব্যবহারের ফলে সে ন্যায়কে ত্যাগ করে অন্যায়কে গ্রহণ করবে, সত্য ও ভালো তার নিকট হবে অবহেলিত এবং সে মিথ্যা ও মন্দকে জীবনে ওতপ্রেতভাবে গ্রহণ করবে। এ ভাবেই সে মিথ্যা, অন্যায় ও অসত্যের বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়বে। পাপের ভারে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি হয়ে পড়বে নুব্জ, কুব্জ - সে হারাবে আত্মার ভালোকে গ্রহণ করার আত্মিক স্বাধীনতা। তার বিবেক হবে তমসাচ্ছন্ন যা তাকে ন্যায় ও সত্যের পথে চালিত করতে পারতো। ফলে সে দোযখের শাস্তির আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। দেখুন পরবর্তী আয়াত। ভালো ও মন্দ কে গ্রহণ করার স্বাধীনতা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ ভাবে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির উপরে।

৪। প্রত্যাখানকারীদের জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি শৃঙ্খল,বেড়ি,ও লেলিহান অগ্নি। ৫৮৩৪

৫৮৩৪। দেখুন সূরা [ ১৩ : ৫ ] ; [ ৩৪ : ৩৩ ] ; [ ৪০ : ৭১ ]। এই আয়াতটি গভীর অর্থবোধক এবং প্রতীকধর্মী। পাপের পরিণাম পাপীর আত্মাতে অষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। পাপের কারণে সত্যের আলোর প্রদীপ বা বিবেকের আলো তার আত্মার মাঝে নির্বাপিত হয়ে যায়। ফলে সে প্রকৃত সত্যকে চিনতে পারে না। যার ফলে সে সংস্কার, অভ্যাস, কুসংস্কার, সামাজিক রীতিনীতর দাসে পরিণত হয়। একেই সে ধর্ম মনে করে। এগুলি তার বিবেককে শৃঙ্খলিত করে ফেলে - সংস্কারের জোয়াল তার আত্মাকে করে নীপিড়িত, আত্মার অবস্থান হয় শ্বাসরুদ্ধকর। ফলে আত্মার সুক্ষ অনুভূতির [fine instict ] মৃত্যু ঘটে। তার অনুভূতি হয় আবেগ তাড়িত পশুর ন্যায়। ঘৃণা-বিদ্বেষ, হিংসা, হতাশা তার সর্বসত্তাকে ঘিরে ফেলে যার থেকে সে মুক্তি পায় না। এগুলির উপমা হচ্ছে লৌহ বেড়ি। যদিও এ সব আত্মা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের জন্য ব্যকুল হয়, তবুও সে তার পাপের জোয়াল থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হয় না। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের আলো, করুণাধারার, বারি একমাত্র পূণ্যাত্মাদের আত্মার মাঝেই প্রবেশ লাভ করে।

৫। পূণ্যাত্মারা পান করবে এমন পানীয় যাতে [ বেহেশতি ] কাফূর মিশ্রিত থাকবে, ৫৮৩৫

৬। এমন একটি প্রস্রবণ যেখান থেকে আল্লাহ্‌র ভক্ত বান্দাগণ পান করবে, এবং তা প্রবাহিত করতে পারবে পর্যাপ্ত পরিমাণে।

৫৮৪২। " কাফূর " - আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ হচ্ছে কর্পূর। বেহেশতি শান্তির, ঝরণার এ হচ্ছে এক উপাদান। বেহেশতি পানীয় যা পবিত্র, সুস্বাদু, উপাদেয়, যাতে কাফূর মসলা যোগ করা হয়, সুগন্ধযুক্ত করার জন্য। যে পানীয় প্রমত্ততা আনায়ন করে না, বরং তা শক্তিদায়ক, সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর ও উপযোগী। সাধারণতঃ প্রাচ্য দেশে কর্পূরকে এর সতেজ অনুভূতি ও শক্তিদায়ক উপযোগীতার জন্য ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৭। তারা ৫৮৩৬, [ তাদের ] প্রতিজ্ঞা পালন করে এবং সেদিনকে ভয় করে ৫৮৩৭, যে দিনের অনিষ্ট ছড়িয়ে পড়বে ব্যপক ভাবে। ৫৮৩৮

৫৮৩ ৬। ' তারা ' অর্থাৎ পূণ্যাত্মাগণ। পূণাত্মাদের চেনা যাবে তাদের গুণাবলীর দ্বারা। এসব গুণাবলীর বিবরণ আছে আয়াত [ ৭ - ১০ ] পর্যন্ত। এ সব পূণ্যাত্মারা পরলোকের জীবনে সীমাহীন প্রশান্তি সুখ ভোগ করবেন যার বর্ণনা আছে আয়াতে [ ১১ - ১২ ] পর্যন্ত।

৫৮৩৭। দেখুন [ ২২ : ২৯ ] আয়াত। এই আয়াত দ্বারা যে সব কর্তব্যকে বুঝানো হয়েছে তা হচ্ছে আধ্যাত্মিক কর্তব্য বা আল্লাহ্‌র প্রতি মানুষের কর্তব্য। পরবর্তী আয়াতে এই কর্তব্যের রূপরেখা বর্ণনা করা হয়েছে। এসব হচ্ছে মানবতার জন্য কাজ করা অথবা মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য। যারা তা করেন তারাই আল্লাহ্‌র সাথে কৃত সকল অঙ্গীকার বা ওয়াদা পালন করেন [ ৫: ১ আয়াত এবং টিকা ৬৮২ ]। এই অঙ্গীকার হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি হিসেবে, আল্লাহ্‌র সৃষ্ট জীবের প্রতি বা পৃথিবীর সকল সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে মানুষের কর্তব্য। এই কর্তব্যই হচ্ছে মানুষের অঙ্গীকার আল্লাহ্‌র সাথে।

৫৮৩৮। পূণ্যাত্মারা ভয় করেন শেষ বিচারের দিনের। যেদিন পার্থিব পাপের পরিণতি হবে ভয়াবহ যা চিন্তার অতীত। এবং যেদিন পার্থিব সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে।

৮। আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসা [ প্রকাশের জন্য ] তারা অভাবগ্রস্থ,এতিম, এবং বন্দীদের আহার করায় ৫৮৩৯।

৫৮৩৯। 'বন্দী' শব্দটি দ্বারা সে যুগের যুদ্ধবন্দীদের বুঝানো হয়েছে। ইসলাম পূর্ব যুগে ও ইসলামের যুগে যুদ্ধ বন্দীদের নিজেদের খাদ্যের সংস্থান নিজেদেরই করতে হতো এবং নিজেদের মুক্তিপণ নিজেদেরই সংগ্রহ করতে হতো। এমন কি সাধারণ অপরাধী যারা জেলখানাতে থাকতো, তাদেরও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করতো তাদের আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধব অথবা বন্দীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে সেই খরচ বহন করা হতো। তবে 'বন্দী' শব্দটি সংকীর্ণাথে ব্যবহার না করে ব্যপক অর্থে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

মানুষ শুধু যে কারাগারেই বন্দী থাকে তা সত্য নয়। বন্দী এই শব্দটি প্রতীকধর্মী যা বৃহত্তর মানবগোষ্ঠির জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন আধ্যাত্মিক ভাবে বন্দী যাদের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক মুক্তি ঘটে নাই। কিন্তু যারা মুক্তির জন্য ব্যকুল। এরূপ ক্ষেত্রে পূণ্যাত্মাদের দায়িত্ব তাদের আত্মিক মুক্তির জন্য সাহায্য করা। 'বন্দী' শব্দটি ব্যপক অর্থে মূক প্রাণীজগতকেও বুঝানো যায় যারা মানুষের দয়ার উপরে নির্ভরশীল। এরূপক্ষেত্রে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মানুষের। এ ভাবেই প্রকৃতিকে সংরক্ষণের দায়িত্ব এসে যায় মানুষের উপরে। দেখুন [ ৯০ : ১৩] আয়াত ও টিকা ৬১৪০।

৯। [ এই বলে ], " শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমরা তোমাদের আহার্য দান করি। তোমাদের নিকট থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও চাই না। ৫৮৪০

৫৮৪০। এই আয়াতের যে ভাষ্য তা দাতা কর্তৃক সরবে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নাই। এই আয়াতের যে বক্তব্য তা হবে দাতা ব্যক্তিদের মনের কথা এবং দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও মানসিকতা।

১০। " আমরা আমাদের প্রভুর নিকট থেকে এক বিপর্যয়কারী ক্রোধের আশংকা করি।" ৫৮৪১

৫৮৪১। এই আয়াতের যে ভয়ংকর দিনের কথা বলা হয়েছে সেই দিন হচ্ছে পাপীদের জন্য পাপের পরিণতি দিবস। তবে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, পৃথিবীতে আমরা কেউই সম্পূর্ণ পাপমুক্ত নই। সুতারাং প্রকৃত মুক্তিলাভের জন্য আমাদের প্রয়োজন আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও করুণা। সুতারাং পূণ্যাত্মাদের অন্তর থাকে ভয়ে ও শঙ্কায় পরিপূর্ণ। কারণ তারা জানে যে তারা সাধারণ মানুষ, সুতারাং তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্বেও তারা আল্লাহ্‌র প্রতি কর্তব্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হন নাই। সুতারাং আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও করুণার আশাই সর্বোচ্চ আশা এবং পাপের পরিণাম থেকে মুক্তিলাভের উপায়।

১১। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাদের রক্ষা করবেন সেদিনের অনিষ্ট থেকে, এবং তাদের উপরে বর্ষণ করবেন, সৌন্দর্যের আলো ৫৮৪২, এবং [ নির্মল ] আনন্দ।

৫৮৪২। দেখুন [ ৭৫ : ২২ - ২৩ ] আয়াত।

১২। এবং যেহেতু তারা ধৈর্য্যশীল এবং দৃঢ়চেতা, তিনি তাদের পুরস্কৃত করবেন উদ্যান ও রেশমের বস্ত্র দ্বারা ৫৮৪৩।

৫৮৪৩। দেখুন [ ২২ : ২৩ ] আয়াত।

১৩। [ সেখানে ] তারা হেলান দিয়ে সমাসীন হবে উচ্চ সিংহাসনে, ৫৮৪৪ সেখানে তারা সূর্যের [ প্রখর তাপ ] দেখতে পাবে না, তীব্র শীতও অনুভব করবে না। ৫৮৪৫

৫৮৪৪। দেখুন [ ১৮ : ৩১ ] আয়াত।

৫৮৪৫। পরলোকের অভিজ্ঞতা পৃথিবীর জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। কারণ সে পৃথিবী হবে সম্পূর্ণ নূতন পৃথিবী যার সাথে আমাদের এই চেনা জানা পৃথিবীর কোনও সামঞ্জস্যই থাকবে না। দৈহিক আরামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরিবেশের তাপমাত্রা। দেহ অত্যাধিক উষ্ণতা বা শীতলতা কোনটাই সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যে তাপমাত্রা সুখপ্রদ সেটাতেই আমরা আরাম পাই। এই সুখের অনুভূতিকেই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪। তাদের উপরে নীচু হয়ে থাকবে [ বৃক্ষের সুশীতল ] ছায়া এবং গুচ্ছ গুচ্ছ ফল অবনত হয়ে ঝুলে থাকবে। ৫৮৪৬

৫৮৪৬। বৃক্ষের ছায়া ও ফলমূল দ্বারা আরাম আয়েশের অনুভূতিকে বুঝানো হয়েছে। এসব বর্ণনার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গত সুখের অনুভূতিকেই বুঝানো হয়েছে।

১৫। তাদের পরিবেশন করা হবে, রূপার পাত্রে, এবং স্ফটিকের পানপাত্রে, - ৫৮৪৭

৫৮৪৭। দেখুন [ ৪৩ : ৭১ ] আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে, " তাদের পরিবেশন করা হবে স্বর্ণের থালা ও পানপাত্রে।" এ সব বর্ণনা দ্বারা মহার্যতা, দুষ্প্রাপ্যতা, ও নিখাঁদ উজ্জ্বলতা প্রকাশ করা হয়েছে, যার কল্পনা করা পৃথিবীতে সম্ভব নয়।

১৬। [ এবং ] স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ রৌপ্য পাত্রে। [ তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ] তারা তার পরিমাণ নির্ধারণ করবে। ৫৮৪৮

৫৮৪৮। রৌপ্যের ঔজ্জ্বল্য যা শ্বেত শুভ্র ও স্ফটিকের ন্যায় আলোক বিকিরণকারী পাত্র।

১৭। এবং তাদের পান করতে দেয়া হবে যান্‌জাবীল মিশ্রিত পানীয় - ৫৮৪৯

৫৮৪৯। উপরের [ ৭৬ : ৫ - ৬ ] নং‌ আয়াতে এবং ৫৮৩৫ টিকাতে 'Kufur' মিশ্রিত পানীয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে 'Kufur' কে বলা হয়েছে পানীয়ের শীতলতা ও পানে সজীবতা উৎপাদনের ক্ষমতাকে বুঝানোর জন্য। এই পানীয় দেয়া হবে সেই সব পূণ্যাত্মাদের যাদের বিচারসভার শেষ বিচার কেবলমাত্র শেষ হয়েছে। এটা হবে পূণ্যাত্মাদের বেহেশতে প্রবেশের প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ বর্ণনা করা হয়েছে [ ১২ - ১৪ ] আয়াতে, যখন তারা বেহেশতের উদ্যানে প্রবেশ করবেন সিল্কের পোষাকে পরিধান করে এবং দেখতে পাবেন যে পৃথিবীতে তাদের বিনয়ী চরিত্রের জন্য পরলোকে তাদের উচ্চ সম্মান দান করা হয়েছে নূতন পৃথিবীতে। তৃতীয় ধাপ বর্ণনা করা হয়েছে [ ১৫ - ২১ ] আয়াতে। তৃতীয় ধাপে তারা সিল্কের এবং ব্রোকেডের পোষাক অর্থাৎ সর্বোচ্চ দামী পোষাক পরিধান করে, রত্ন-পাথরের মুল্যবান, অলংকারে সুসজ্জিত হয়ে প্রশান্ত চিত্তে আসন গ্রহণ করবেন এবং ভোজের সামগ্রীর জন্য আদেশ দান করবেন এবং সেই সাথে থাকবে Zanjabil পানীয়। এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ আদা। প্রাচ্যে ঔষধে আদার ব্যবহার প্রচলিত। উপরের বর্ণনাটি রাজকীয় ভোজসভার দৃশ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

১৮। সালসাবীল নামক প্রস্রবণ থেকে ৫৮৫০।

৫৮৫০। 'Salsabil' - বেহেশতের একটি ঝরণা।

১৯। তাদের ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করবে চিরকিশোরগণ ৫৮৫১। যখন তুমি তাদের দেখবে, তখন তোমার মনে হবে যে, ওরা যেনো ছড়ানো মুক্তা সদৃশ্য ৫৮৫২।

৫৮৫১। দেখুন [ ৫৬ : ১৭ ] আয়াত এবং টিকা ৫২৩১।

৫৮৫২। "ছড়ানো মুক্তা" - মুক্তাকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সৌন্দর্য্যের ঔজ্জ্বলতাকে প্রকাশ করার জন্য। বিক্ষিপ্ত কারণ তারা সর্বদা চলাচল করছেন।

২০। এবং যখন তুমি সেখানে দৃষ্টি দেবে, তুমি দেখতে পাবে প্রশান্তি ও আড়ম্বরের রাজত্ব।

২১। তাদের পোষাক হবে সুক্ষ সবুজ রংএর রেশমের এবং ভারী ব্রকেডের এবং তাদের সজ্জিত করা হবে রূপার কংকন দ্বারা ৫৮৫৩। আর তাদের প্রভু তাদের পান করতে দেবেন বিশুদ্ধ ও পবিত্র মদিরা ৫৮৫৪।

৫৮৫৩। দেখুন [ ১৮: ৩১ ] আয়াত যেখানে অলংকার বলা হয়েছে স্বর্ণনির্মিত।

৫৮৫৪। " পান করতে দেবেন বিশুদ্ধ ও পবিত্র মদিরা।" - এই বাক্যটি দ্বারা পূণ্যাত্মাদের জন্য সম্মানের সর্বোচ্চ সীমাকে প্রকাশ করা হয়েছে। যে ঐশ্বরিক ভোজসভার বর্ণনা পূর্বে করা হয়েছে, সেই ভোজসভায় রাজকীয় সম্মানের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে এই পানীয় দ্বারা। পরের আয়াতের বক্তব্যে প্রকাশ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ এ সব অতিথিদের কর্ম প্রচেষ্টাকে স্বীকৃত দান করবেন এবং পুরষ্কার হিসেবে বেহেশতের নাগরিকত্ব দান করবেন।

২২। অবশ্যই ইহা তোমাদের [ কর্মচেষ্টার ] পুরষ্কার এবং তোমাদের পরিশ্রমকে [আল্লাহ্‌ ] গ্রহণ করেছেন এবং স্বীকৃতি দিয়েছেন। "

রুকু - ২

২৩। তিনিই তোমার প্রতি কুর-আন অবতীর্ণ করেছেন ধাপে ধাপে। ৫৮৫৫

২৪। সুতারাং তোমার প্রভুর আদেশের প্রতি দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য্যশীল হও, এবং তাদের মধ্যে যারা পাপিষ্ঠ অথবা অকৃতজ্ঞ তাদের আনুগত্য করো না।

৫৮৫৫। কোরাণ ধীরে ধীরে সুদীর্ঘ ২৩ বৎসর ব্যপী সময়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করা হয়, সময়, পরিবেশ এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এই সূরাটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন ছিলো ইসলামের প্রথম অবস্থা। সে সময়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীর উপরে অত্যাচার, নির্যাতন, মিথ্যা দোষারোপের ঝড় বয়ে যায়; কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে তাঁর প্রতি আরোপিত আল্লাহ্‌র কর্তব্য অবিচলিতভাবে পালন করে যান। পরের আয়াতে দেখুন নবীর প্রতি আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ হচ্ছে ধৈর্য্যের সাথে দৃঢ় ও অবিচলিতভাবে আল্লাহ্‌র আদেশের প্রতীক্ষ করা এবং পাপিষ্ঠদের আনুগত্য না করা। নবীর (সা) প্রতি আল্লাহ্‌র এই আদেশ আমাদের মত সাধারণ মানুষেরও জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়, সেটাই এই আয়াতের উপদেশ

২৫। এবং তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর সকালে ও সন্ধ্যায়। ৫৮৫৬

৫৮৫৬। আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা ও আনুগত্য প্রকাশ করার তিনটি উপায় এখানে বর্ণনা করা হয়েছে : ১) সর্বদা একান্তভাবে আল্লাহ্‌র পবিত্র নাম স্মরণ করা। ২ ) রাত্রির কিয়দংশ আল্লাহ্‌র এবাদতে সিজ্‌দাতে নিমগ্ন থাকা ; ৩) রাত্রির দীর্ঘ সময় আল্লাহ্‌র মাহাত্ম্য প্রকাশ করা। ১) এই আয়াতের 'সকাল-সন্ধ্যায় " বাক্যটির দ্বারা সর্বদা অর্থাৎ শয়নে স্বপনে জাগরণে সর্বদা বোঝানো হয়েছে। বিশেষ ভাবে ঊষাকালে এবং গোধূলী লগ্নে পৃথিবীর আলো - আঁধারের সন্ধিক্ষণে প্রকৃতির মাঝে আসে পরিবর্তন যার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের উপরে, মানুষের মনের উপরে। সে কারণে সকাল -সন্ধ্যার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র নিরানব্বইটি নাম মানুষের প্রতি আল্লাহ্‌র বিশেষ রহমতের প্রকাশ। এ সবই হচ্ছে আল্লাহ্‌র রহমতের প্রতীক। আল্লাহ্‌র আরোপিত নাম সমূহের উপমা হচ্ছে একটি তালাবদ্ধ স্বর্ণ ঝাঁপি যার মাঝে আছে আল্লাহ্‌ নামের অমুল্য রত্ন সমূহ। সকলের জন্য এই ঝাঁপিকে করা হয়েছে সহজলভ্য কিন্তু এর তালা খুলে আল্লাহ্‌র নামের রত্ন আহরণ করা সকলের পক্ষে সমান সহজ নাও হতে পারে। সকলেই এই রত্নের যোগ্য নাও হতে পারে। যদি সে আল্লাহ্‌ নামের রত্নরাজি থেকে লাভবান নাও হতে পারে,তবুও সে এই রত্নের ঝাঁপি বহন করার অধিকার লাভ করবে। এমনও তো হতে পারে যে তাঁর অযোগ্যতা সত্বেও ঝাঁপির চাবি সে জীবনের কোন এক শুভ মূহুর্তে লাভ করতে পারে। ফলে তাঁর সম্মূখে আল্লাহ্‌র রহমতের নাম সমূহের গুঢ় অর্থ উম্মোচন হয়ে পড়বে এবং তার বিশ্বচরাচর ডুবে যাবে স্বর্গীয় রহমতের সমুদ্রে। সুতারাং যে শিক্ষানবীশ বা কেবলমাত্র ধর্মের পথে অগ্রসরমান হয়তো কোন শুভ মূহুর্তে সে আল্লাহ্‌র আশীর্বাদে ধন্য হতেও পারে। আল্লাহ্‌র রহমতের ধারায় আপ্লুত হয়ে, হঠাৎ আলোর বন্যার ন্যায় আধ্যাত্মিক জীবনের গুঢ় রহস্য আল্লাহ্‌ তাঁর সম্মুখে উম্মোচন করে দেবেন ফলে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য সে আত্মার মাঝে অনুভবে সক্ষম হবে। সে হবে ধন্য, ( ২ ) এবং ( ৩ ) এর জন্য দেখুন পরবর্তী টিকা।

২৬। এবং রাত্রির কিছু অংশ তাঁর প্রতি সিজ্‌দাবনত হও এবং তাঁকে মহিমান্বিত কর রাত্রির দীর্ঘ সময় ধরে ৫৮৫৭।

৫৮৫৭। দেখুন উপরের টিকা ( ২) 'সিজ্‌দা ' হচ্ছে দৈহিক বা শারীরিক ভাবে আল্লাহ্‌র নিকট বিনয়ের সাথে আনুগত্য প্রকাশ করার উপায় যা দৃশ্যমান বা চোখে দেখা যায়। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে সিজদা করার সর্বশ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে রাত্রিকাল। সিজদা হচ্ছে দৈহিক এবাদত, যা এই নশ্বর দেহকে অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক জগতকে আলোকিত করে থাকে। সিজদার প্রকৃষ্ট সময় হচ্ছে নিশিত রাত্রি। কারণ দিবসের কর্ম কোলাহল ও কর্মব্যস্ততা আমাদের আল্লাহ্‌র প্রতি একাগ্র ভাবকে লক্ষ্যচ্যুত করে থাকে। নিশিত রাত্রির নিঃস্তব্ধতা, যখন সারা পৃথিবী সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ে, এই হচ্ছে একাগ্রভাবে আল্লাহ্‌র সম্মুখে দাড়াবার সময় বা বিনয়ে আপ্লুত হয়ে সেজদার সময়। কারণ এ সময়েই আত্মা রাত্রির নিঃস্তব্ধতার মাঝে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের সুযোগ লাভ করে। ৩) দিবসের ক্লান্তি রাত্রিকে ক্লান্তিকর করে তুলতে পারে না, বরং তা হয়ে উঠবে অর্থবহ আনন্দদায়ক যদি আমরা রাত্রির নিরবতাকে বিশ্বপ্রকৃতির ধ্যানমগ্নতার সাথে একাতত্বা করে অনুভব করতে পারি। দেখুন [ ৫৭ : ১ ] আয়াত যেখানে বলা হয়েছে, " নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু আসে, সবই আল্লাহ্‌র পবিত্রতা ঘোষণা করে।" বিশ্বপ্রকৃতির এবাদতের সাথে মানুষ নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারলেই তাঁর এবাদত সার্থক ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। "তাঁকে মহিমান্বিত কর রাত্রির দীর্ঘ সময় ধরে"।

২৭। তারা [ দুনিয়ার ] অপসৃয়মান জীবনকে ভালোবাসে, এবং পিছনে রেখে দেয় সেই কঠিন দিনকে [ যা ভবিষ্যতে আসবে ] ৫৮৫৮।

৫৮৫৮। 'পার্থিব জীবন' হচ্চে ক্ষণস্থায়ী জীবন। দেখুন [ ৭৫ : ২০ ] আয়াত। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কার মোশরেক কোরেশদের উপলক্ষ্য করে। কিন্তু এর আবেদন বিশ্বজনীন যুগ কাল অতিক্রান্ত। যুগে যুগে যারা পরলোকের জীবনে প্রকৃত বিশ্বাসী হবে না তাদের নিকট পৃথিবীর জীবনই হবে সর্বশ্রেষ্ঠ কাম্য বস্তু। পৃথিবীর ভোগ বিলাস আরাম আয়েশ হবে তাদের নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ কাম্য। সুতারাং তারা পরলোকের জীবনের ধারণাকে প্রত্যাখান করে থাকবে।

২৮। আমিই তাদের সৃষ্টি করেছি, এবং তাদের গাইটগুলিকে মজবুত করেছি ৫৮৫৯ ; আমি যখন ইচ্ছা করবো, তাদের সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে তাদের অনুরূপ অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি ৫৮৬০।

৫৮৫৯। "গাইটগুলিকে মজবুত করেছি " - আল্লাহ্‌ মানুষকে শুধু সৃষ্টিই করেন নাই, তাদের গঠনও করেছেন সুদৃঢ় বা মজবুত। অর্থাৎ তিনি তাদের দিয়েছেন প্রকৃতিকে জয় করার ক্ষমতা, শক্তি এবং সেই সাথে পাপের প্রলোভনকে জয় করার মত মনোবল এবং ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল থাকার মত দৃঢ়তা।

৫৮৬০। যদি কেউ বা কোন জাতি আল্লাহ্‌র করুণা, দয়া ও সদয় তত্বাবধানের পরেও ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহ্‌র আনুগত্য না করে, অকৃতজ্ঞের মত আল্লাহ্‌র বিধানকে প্রত্যাখান করে, তবে আল্লাহ্‌র আইন হচ্ছে সে বা তারা আল্লাহ্‌র করুণা লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, এবং আল্লাহ্‌ তাদের পরিবর্তে অন্যকে তার করুণাধারাতে সিক্ত করবেন ফলে তাঁরা হয়ে উঠবে পার্থিব জীবনে ক্ষমতাশালী। আল্লাহ্‌র সীমাহীন নেয়ামত সকলের জন্য সমভাবে বিতরণ করা হয়েছে। তবে তারাই এ থেকে উপকৃত হবে যারা আল্লাহ্‌র নেয়ামতের নৈতিক দায়ভার বহনে সম্মত হয়। এ কথা যেনো কেউ না ভাবে যে, আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে কুক্ষিগত করা যায় বা যথেচ্ছ অপব্যবহার করা চলে। কারণ সকল নেয়ামত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ্‌। সুতারাং যারা আল্লাহ্‌তে বিশ্বাসী ও আল্লাহ্‌র রাস্তায় কাজ করেন। যদি সমস্ত পৃথিবীও তাদের বিশ্বাসের বিপক্ষে চলে যায় তবুও তারা হতাশ বা নিরাশ হবেন না। কারণ আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে যে কোনও মূহুর্তে ঘটনা প্রবাহের ধারা ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হলে চরম শত্রুও পরম বন্ধুতে পরিণত হতে পারে, অথবা এক নূতন প্রজন্মের জন্ম হবে যারা আল্লাহ্‌র পতাকা বা ন্যায়ের পতাকা উড্ডীয়মান করে সমাজকে কলুষমুক্ত করবে এবং আল্লাহ্‌র ইচ্ছাকে জয়যুক্ত করবে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ও পরিকল্পনা সকলের অগোচরে নিরবে নিভৃতে কাজ করে চলে।

২৯। এটা একটা সতর্কবাণী। অতএব যার ই‌চ্ছা সে তার প্রভুর দিকে [ সরল ] পথ অবলম্বন করুক।

৩০। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ব্যতীত তোমরা তা করবে না ৫৮৬১। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ।

৫৮৬১। মানুষ জন্মগতভাবেই চরিত্রগত দুর্বল। অতি সহজেই সে শয়তানের কুমন্ত্রণার কাছে পরাজিত হয়। শয়তানের প্রলোভন থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাঁর বর্মের প্রয়োজন, আর সে বর্ম হচ্ছে আল্লাহ্‌র করুণার বর্ম। আল্লাহ্‌র করুণা ব্যতীত তাঁর কিছুই করার ক্ষমতা নাই। আল্লাহ্‌র করুণা লাভ করলে সে অসাধ্য সাধন করতে পারে। কারণ আল্লাহ্‌ সকল ক্ষমতার অধিকারী,তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সকল কিছুকে পরিবৃত করে রাখে। যে নিজ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র করুণা লাভে সক্ষম, আল্লাহ্‌র "ইচ্ছা" তাকে সৎপথে চালিত করে থাকে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ব্যতীত এই পথ তাঁর নিকট, দুর্গম বোধ হবে। আধ্যাত্মিক জীবনের যে নৈতিক আইন বা বিধান, 'ইচ্ছা ' শব্দটি দ্বারা সেই আইনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

৩১। তিনি যাকে খুশী নিজ অনুগ্রহের অর্ন্তর্ভূক্ত করেন ৫৮৬২ ; কিন্তু যারা পাপী - তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত করেছেন ভয়াবহ শাস্তি।

৫৮৬২। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ, তাঁর পরিকল্পনা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী পৃথিবীকে বিতরণ করা হয়। যদি কারও কর্ম ও কর্মের নিয়ত, প্রচেষ্টা, আল্লাহ্‌র বিধান বা ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত হয় তবে সে আল্লাহ্‌র করুণা লাভে সক্ষম হবে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা তাকে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে সফলতা দান করবে, অপরপক্ষে, যদি কেউ আল্লাহ্‌র বিধান বা ইচ্ছাকে প্রত্যাখান করে, তবে সে আল্লাহ্‌র রহমত বঞ্চিত হবে, পরিণতিতে তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করতে হবে। " আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ব্যতীত তোমরা তা করবে না।" অর্থাৎ আল্লাহ্‌র মনোনীত আইনের বাইরে কেউ যাবে না।