Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪১ জন
আজকের পাঠক ৮০ জন
সর্বমোট পাঠক ৭৪৫৬৯৬ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ২১৩৬৬৭ বার
+ - R Print

সূরা মুতাফ্‌ফিফীন


সূরা মুতাফ্‌ফিফীন বা প্রবঞ্চক -৮৩

৩৬ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এই সূরাটি, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সূরার সমসাময়িক।

এই সূরার মাধ্যমে সকল প্রকার প্রতারণাকে নিন্দা করা হয়েছে। বিশেষ ভাবে ধর্মের ব্যাপারে এবং প্রতিদিনের জীবন যাপন প্রণালীতে।

সূরা মুতাফ্‌ফিফীন বা প্রবঞ্চক -৮৩

৩৬ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। যারা প্রবঞ্চনা করে, তাদের দুর্ভাগ্য।

২। যারা লোকের নিটক থেকে মেপে নেয়ার সময়ে পুর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে,

৩। কিন্তু যখন তারা অন্যকে দেয়, সে প্রাপ্য মাপ ও ওজনে কম দেয়। ৬০১১

৬০১১। মাপে কম দেয়ার অর্থ অন্যকে ঠকানো বা প্রতারণার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার প্রবণতা। মাপে কম দেয়া বাক্যটিকে সঙ্কীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে এর অর্থ ব্যপক ও গভীর ভাবে ব্যবহৃত হবে। কারণ ৩নং আয়াতে 'মাপ ' ও 'ওজন' দুটি শব্দ একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। ওজন হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যে ভাবে জিনিষকে ওজন করে থাকে বাটখারার সাহায্যে। 'মাপ' হচ্ছে যে কোন প্রাপ্য বস্তুর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। পরবর্তী দুটি আয়াতে মাপে কম দেয়ার প্রকৃত মানসিকতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই মানসিকতার সাথে অন্যের প্রতি অন্যায় করায় প্রবণতা জড়িত থাকে - আর তা হচ্ছে অন্যকে তার ন্যায্য প্রাপ্য অপেক্ষা কম দেয়া এবং নিজের বেলাতে যা প্রাপ্য তা থেকে বেশী দাবী করা। এরূপ মানসিকতা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রভূত প্রচলিত যা সচারচর আমাদের দেশে দৃষ্টি গোচর হয়। কিন্তু এই মানসিকতা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রচলিত আছে তবে তার ধরণ হবে আলাদা। যেমন গৃহে,বা সামাজিক অনুষ্ঠানে, বা অফিসে, আদালতে কোন ব্যক্তি বা গ্রুপ বিশেষ সম্মান বা সেবা দাবী করতে পারেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তাদের করণীয় কর্তব্য সম্বন্ধে তারা হন অমনোযোগী। এও এক ধরণের প্রতারণা। একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটিকে এভাবে তুলে ধরা যায়। আমাদের দেশের উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীরা যারা পদবলে উচ্চ সম্মানের ও সুযোগ সুবিধার দাবীদার। কিন্তু যে পদাধিকার বলে তিনি এ সব ভোগ করেন, তিনি সে পদের জন্য অর্পিত কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্বন্ধে অমনোযোগী। যার ফলে তাঁর কর্তব্য স্থলে ফাইলের পাহাড় গড়ে ওঠে। এটাও ঐ মাপে কম দেয়ার মানসিকতা থেকে উদ্ভুদ পরিস্থিতি। এটা একধরণের বিকৃত স্বার্থপরতা এবং দ্বিগুণ অন্যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আধ্যাত্মিক জগতের জন্য এ হচ্ছে এক বিপর্যয়কারী প্রক্রিয়া। যে লোক শুধুমাত্র নিজ স্বার্থের জন্য কাজ করবে, অন্যকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে সে কিভাবে আল্লাহ্‌র করুণা ও রহমতের আশা করতে পারে ? ইংরেজীতে এক অতি মূল্যবান উপদেশ আছে, তা হচ্ছে, " Do as you would be done by" এই সূরাতে আরও বিশদ ভাবে বলা হয়েছে যে, "অন্যেরা তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করুক বা না করুক,তোমার নিকট অন্যের যা প্রাপ্য তা পূর্ণভাবে পরিশোধ করবে" সুতারাং এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব অত্যন্ত বেশী।

৪। তারা কি চিন্তা করে না যে [ মরণের পরে ] তাদের হিসাবের জন্য ডাকা হবে ? ৬০১২

৫। মহা দিবসে ?

৬। যে দিন [ সকল ] মানুষকে দাঁড়াতে হবে জগত সমূহের প্রভুর সম্মুখে ?

৬০১২। পৃথিবীর নিয়ম হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতারকদের প্রতারণা সর্বসমক্ষে প্রকাশ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সে সামাজিক ও সম্মানের যোগ্য ও আইনের উর্দ্ধে বলে বিবেচিত হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতারকদের অবস্থান আলাদা। প্রতিটি আত্মা আল্লাহ্‌র রূহুর অংশ [ ১৫ : ২৯] যা সৃষ্টির আদিতে থাকে পূত ও পবিত্র। আত্মার এই হচ্ছে প্রকৃত রূপ। কেউ কি সেই আত্মাকে প্রতারণার দ্বারা কলুষিত করতে চায় ? তারা কি জানে না তাদের সকল কাজের জন্য শেষ বিচারের দিনে, জবাবদিহিতা বিদ্যমান ? যিনি সেই বিচার দিনের বিচারক তাঁর অজ্ঞাত কিছুই নাই, সেই মহাপ্রভু আল্লাহ্‌ সকলের অধিকার রক্ষা করেন। পৃথিবীর কেউ না জানলেও আল্লাহ্‌ সকলের সকল কর্ম সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল। সুতারাং তারা কি পুণরুত্থানের ভয় করে না ?

৭। না। নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা [ রক্ষিত ] আছে সিজ্জিনে ৬০১৩

৬০১৩। মূল শব্দ 'Sijn' থেকে 'Sijjin' শব্দটি উদ্ভুদ। 'Sijn' শব্দটির অর্থ কারাগার। ১৮নং আয়াতে 'Illiyin' শব্দটির বিপরীত অর্থ বহন করে শব্দটি। সুতারাং তফসীরকারদের মতে সিজ্জীন হচ্ছে কারাগার ; যেখানে পাপীদের আমলনামা রাখা হয়।

৮। কি ভাবে তোমাদের ব্যাখ্যা করা যাবে সিজ্জিন কি ?

৯। উহা হচ্ছে পূর্ণভাবে লিখিত নথি [রেজিস্ট্রার ]। ৬০১৪

৬০১৪। সিজ্জীন শব্দটি দ্বারা পাপীদের জন্য কারাগার না বুঝিয়ে যদি পাপীদের আমলনামা রাখার স্থানকে বুঝানো হয় তবে এদের অর্থের খুব একটা পার্থক্য হয় না। কারণ আমলনামা বা রেজিস্ট্রার -ই হচ্ছে পাপীদের জন্য কারাগারের প্রতীক। লিখিত আমলনামার' অর্থ হচ্ছে যেখানে প্রতিটি কর্মের খুঁটিনাটি বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে, কোন কিছুই যেখানে বাদ দেয়া হয় নাই। পাপীদের প্রতিটি কার্যের পূর্ণ বিবরণ সেখানে লিপিবদ্ধ আছে।

১০। অস্বীকারকারীদের জন্য সেদিন হবে দুর্ভাগ্য -

১১। যারা শেষ বিচার দিবসকে অস্বীকার করে ৬০১৫।

৬০১৫। পৃথিবীর জীবন শুধুমাত্র হাসি খেলার বস্তু নয়, বা এ জীবনের শেষ এই পৃথিবীতেই নয়। পৃথিবীর প্রতিটি কাজের কর্মফল বিদ্যমান এবং শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেককে তার নিজ নিজ কর্মের দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে। যারা এই পৃথিবীতে মিথ্যাচারে জীবনকে অতিবাহিত করে, এবং কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে থাকে, তারা এই দিবসে হবে করুণার পাত্র। সেদিন কোনও পাপীই বিচার দিবসকে অস্বীকার করতে পারবে না। তাদের কোনও মিথ্যা ভাষণ সেদিন কোন উপকারেই আসবে না।

১২। পাপিষ্ঠ, সীমালংঘনকারীরা ব্যতীত আর কেহ তা অস্বীকার করে না।

১৩। যখন তার নিকট আমার আয়াত সমূহ আবৃত্তি করা হয়, সে বলে, " ইহা অতীতকালের কাহিনী। " ৬০১৬

৬০১৬। দেখুন অনুরূপ সূরা [ ৬ : ২৫ ] আয়াত; [ ৬৮ : ১৫ ] ইত্যাদি। এই আয়াতের মাধ্যমে পাপিষ্ঠ ও সীমালংঘনকারীদের মানসিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এরা ঘৃণা সহকারে সত্যকে প্রত্যাখান করে এবং এমন ভান করে যে সত্য হচ্ছে মিথ্যা।

১৪। কখনই না ! বরং তারা যে [ পাপ ] করেছে, তা তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়েছে ৬০১৭

৬০১৭। 'হৃদয়' শব্দটি দ্বারা এখানে মানুষের আত্মাকে বুঝানো হয়েছে। এই নশ্বর দেহের অভ্যন্তরে আল্লাহ্‌ তাঁর রূহুর অংশ ফুৎকারের সাহায্যে প্রবেশ করিয়েছেন [ ১৫ : ২৯]। রূহু বা আত্মা হচ্ছে অমর এবং প্রতিটি মানুষ পবিত্র ও কলুষমুক্ত আত্মা দেহের মাঝে ধারণ করে পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে। জীবনে চলার পথে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ এবং পাপ কার্য আত্মার উপরে কলুষতার চিহ্ন বা মরিচা বা জং দ্বারা আবৃত করে দেয়। ফলে আত্মার শুভ্রতা ও ঔজ্জল্য ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে আসে। কিন্তু পাপ কার্যের পরে অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এই কলুষতা বা মরিচাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু যদি কেউ পাপ কার্যের পরে অনুতপ্ত না হয়ে, পাপ কাজ চালিয়েই যেতে থাকে তবে আত্মার উপরে কলুষতার বা মরিচার প্রলেপ ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। একখন্ড লৌহকে দীর্ঘদিন মুক্ত বাতাসে উম্মুক্ত রেখে দিলে তার উপরে মরিচার প্রলেপ শুরু হয়ে যায়। এবং দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই মরিচার প্রলেপ এতটাই গভীর রূপ ধারণ করে যে, মূল লৌহ খন্ডকে সনাক্ত করাই তখন দুষ্কর ব্যাপার হয়ে যায়। মরিচা বা জং এর উদাহরণের মাধ্যমে এই সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে যে, লোহা যেমন বিপরীত পরিবেশে তার ধর্ম বা গুণাগুণ হারিয়ে ফেলে এবং মরিচা দ্বারা আচ্ছাদিত হয়, আত্মার অবস্থাও পাপ কার্য দ্বারা সেরূপ ধারণ করে। পাপের কালিমা আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে ফেলে ফলে, তাদের আত্মার মাঝে আল্লাহ্‌র হেদায়েতের আলোর প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আত্মার এই অবস্থাকেই [ ২ : ৭ ] আয়াতে 'সীলমোহর' রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। লোহা যেরূপ মরিচার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত লৌহ হিসেবে না থেকে মরিচা বা অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়; আত্মিক অবস্থারও হয় সেরূপ। শারীরিক ভাবে এ সব ব্যক্তি জীবিত বলে পরিগণিত হলেও এদের ঘটে আধ্যাত্মিক মৃত্যু। আত্মার উপরে পাপের কলুষতার আবরণ তাদের মাঝে সত্যকে বোঝার ও ধারণ করার ক্ষমতাকে অবলুপ্ত করে দেয়। আল্লাহ্‌র হেদায়েতের আলো ও আত্মার মাঝে কঠিন দেয়ালের সৃষ্টি করে। এ কারণেই তারা সত্যকে বুঝতে অক্ষম হয়, এবং সত্যকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে সাহস পায়।

১৫। সেদিন তারা তাদের প্রভুর [ নূর ] থেকে অন্তরিত হবে। ৬০১৮

১৬। উপরন্তু তারা জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে।

৬০১৮। 'অন্তরিত' অর্থাৎ পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকবে। পূত পবিত্র আত্মাকে আয়নার সাথে তুলনা করা যায়। পরিষ্কার আয়নাতে যেরূপ উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়, পূত পবিত্র আত্মার মাঝেও সেরূপ আল্লাহ্‌র জ্ঞান,প্রজ্ঞার আলোর প্রতিফলন ঘটে। আল্লাহ্‌র হেদায়েতের আলো এ সব আত্মাকে করে উদ্ভাসিত। কিন্তু যে আত্মা পাপের কালিমাতে কলুষিত হয় সে আত্মাকে তুলনা করা যায় মসীলিপ্ত আয়নার সাথে। মসীলিপ্ত আয়নাতে যেরূপ কোনও প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয় না, ঠিক সেরূপ হচ্ছে পাপে আসক্ত আত্মার অবস্থান। এ সব আত্মাতে আল্লাহ্‌র নূর বা সত্য,জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোর অনুপ্রবেশের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। ঠিক যেনো দেয়াল দ্বারা তাদের অন্তরিত করা হয়েছে। ফলে, বিচার দিবসে পূণ্যাত্মারা আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভে হবেন ধন্য। অপরপক্ষে,পাপাত্মার কখনও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হবে না। স্রষ্টা ও তাদের মাঝে থাকবে "অন্তরায়" বা দেয়াল পাপীদের দৃষ্টিগোচর করানো হবে দোযখের আগুন - যা তাদের জন্য প্রজ্জ্বলিত যা তাদের জন্য একমাত্র সত্য।

১৭। উপরন্তু তাদের বলা হয় ; " এটাই সেই [ বাস্তব ] সত্য যা তোমরা মিথ্যা ভেবে প্রত্যাখান করতে।

১৮। না, অবশ্যই পূণ্যাত্মাদের আমলনামা ইল্লিনে [ সুরক্ষিত ] আছে ৬০১৯।

৬০১৯। 'ইল্লিয়ীন' যা 'সিজ্জীনের ' বিপরীত। মুমিনদের নাম ও আমলনামা সম্বলিত রেজিস্ট্রার,অথবা তাঁদের আমলনামা যেখানে রক্ষিত হয় সে স্থান হচ্ছে 'ইল্লিয়ীন'। সিজ্জীনের উল্লেখ আছে এই সূরার ৭নং আয়াতে এবং ব্যাখ্যা আছে ৬০১৩ নং টিকাতে।

১৯। এবং কিভাবে তোমাদের ব্যাখ্যা করা যাবে ইল্লিন কি ?

২০। ইহা হচ্ছে পূর্ণভাবে লিখিত নথি [রেজিস্ট্রার ]। ৬০২০

৬০২০। ২০ নং আয়াত ৯ নং আয়াতের পুণরাবৃত্তি। দেখুন টিকা নং ৬০১৪। পার্থক্য হচ্ছে পূর্বের রেজিস্ট্রারটি ছিলো পাপীদের জন্য এবং এই আয়াতে যে রেজিস্ট্রারের উল্লেখ আছে তা পূণ্যাত্মাদের জন্য। এই রেজিস্ট্রারে পূণ্যাত্মাদের খুঁটিনাটি সকল বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

২১। [আল্লাহ্‌র ] যারা নিকটবর্তী [ ইহা ] তাদের সাক্ষ্যদাতা। ৬০২১

৬০২১। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ৫৬ : ১১ ] ও টিকা ৫২২৭ এবং টিকা নং ৫২২৩। যারা আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য প্রাপ্ত তারা এই রেজিস্ট্রারের সাক্ষ্যদাতা হবে। অথবা এ ভাবে বলা যায় যে, পূণ্যাত্মারা তাদের রেজিস্ট্রারকে দেখতে পারবেন।

২২। সত্যিই পূণ্যাত্মারা থাকবে পরম প্রশান্তিতে ;

২৩। তারা [ মর্যদার ] সিংহাসনে উপবেশন করে অবলোকন করবে [ সকল জিনিষ ] ৬০২২

৬০২২। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ৩৬ : ৫৬ ]।

২৪। তুমি তাদের মুখমন্ডলে দেখবে প্রশান্তির দীপ্তি উজ্জ্বলভাবে বিকিরীত হবে। ৬০২৩

৬০২৩। দেখুন অনুরূপ আয়াত [৭৫ : ২২ ] এবং [ ৭৬ : ১১ ] আয়াত।

২৫। তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করা হবে মোহর করা বিশুদ্ধ শরাব দ্বারা ৬০২৪।

৬০২৪। এই পানীয় হবে সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ ও সুগন্ধ যুক্ত পানীয়। এই পানীয়ের মহার্ঘতাকে প্রকাশ করা হয়েছে এ ভাবে যে তা হবে 'সীলমোহর যুক্ত'। মহামূল্যবান " কস্তুরীর " সুগন্ধ যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য অতীব সাবধানে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে সীলমোহর করা হয়। 'কস্তুরী' হচ্ছে মৃগনাভি যা প্রাচ্যে মহামূল্যবান সুগন্ধিরূপে পরিচিত। ঠিক সেভাবেই বিশুদ্ধ পানীয়ের বিশুদ্ধতা ও সুগন্ধ রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা স্বরূপ সীলমোহর করা হয়। অন্যভাবেও এর ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব। 'সীলমোহর ' হচ্ছে পানীয়ের সর্বোচ্চ তৃপ্তির প্রকাশ। কস্তুরী বা মৃগনাভীর সীলমোহর উম্মুক্ত করার মাধ্যমে যেরূপ মহার্ঘ সুগন্ধির সর্বোচ্চ আনন্দ উপভোগের প্রকাশ ঘটে ঠিক সেরূপ হবে মোহর করা পানীয়ের উপভোগের সর্বোচ্চ আনন্দ।

২৬। মোহর হবে মৃগনাভি। যারা উচ্চাভিলাষী তারা এ বিষয়ে প্রতিযোগীতা করুক ৬০২৫।

৬০২৫। "মিসকের'' অর্থাৎ কস্তুরী বা মৃগনাভী। 'মিসকের মোহর ' দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, এই আনন্দ পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী আনন্দের মত নয়, তা হবে চিরস্থায়ী প্রশান্তি। যার জন্য প্রতিযোগীতা করা উচিত।

২৭। তাসনীমকে ৬০২৬ এর সাথে মিশ্রিত করে দেয়া হবে, ৬০২৬

৬০২৬। 'তাসনীম' শব্দটির আভিধানিক অর্থ জান্নাতের পানি যা উচ্চে অবস্থিত ঝর্ণা থেকে নিসৃত হয়। এই পানি অমৃত সূধাতুল্য পানি যা বিশুদ্ধ মোহর করা পানীয় থেকেও মহার্ঘ। এই পানি তারাই পান করবেন যারা আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য প্রাপ্ত। দেখুন [ ৫৬ : ১১ ] আয়াতের টিকা ৫২২৭। তবে এই আয়াতে বলা হয়েছে যে এই পানিয় মিশ্রণ ঘটানো হবে যেনো সকল পূণ্যাত্মারা তাঁর সুগন্ধ উপভোগ করতে পারেন। দেখুন [ ৭৬ : ৫ ] আয়াতের টিকা ৫৮৩৫ এ[Kafur fountain] এবং [৭৬: ১৭- ১৮ ] আয়াতের টিকা ৫৮৪৯ [ Salsabil ]।

২৮। ইহা একটি প্রস্রবণ, যা হতে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য প্রাপ্তরা পান করবে।

২৯। যারা পাপে আসক্ত, তারা তো বিশ্বাসীদের উপহাস করতো।

৩০। এবং তারা যখন বিশ্বাসীদের নিকট দিয়ে যেতো তারা তখন পরস্পরকে চক্ষু টিপে ইশারাতে [ ঠাট্টা করতো ];

৩১। আর যখন তারা আপন জনদের নিকটে ফিরে আসতো,তখন তারা কৌতুক পরিহাস করতে করতে আসতো ;

৩২। এবং যখনই তাদের দেখতো, তখনই তারা [পাপীরা ] বলতো, " দেখো ! এরাই তারা যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।" ৬০২৭

৬০২৭। যারা দুষ্ট প্রকৃতির এবং পাপী তারা পার্থিব জীবনে নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে থাকে। তারা সৎ এবং পূণ্যাত্মাদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে থাকে। তাদের এই বিদ্রূপের ভাষা হয় নিম্নরূপ : ১) তারা মুমিন ব্যক্তিদের উপহাস করে কারণ তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে থাকে। ২) প্রকাশ্যে যখন মুমিন ব্যক্তিরা যাতায়াত করতেন তখন দুষ্ট লোকেরা পরস্পর চক্ষু টিপে ইশারা করে তাঁদের দেখাতেন অপমান করার জন্য। ৩) নিজ গৃহে দূবৃত্তরা মুমিনদের সম্বন্ধে কটুক্তি করতো। এবং ৪) যেখানে যে অবস্থায়ই তারা মুমিনদের দেখতে পেতো তারা মুমিনদের বোকা এবং পথ ভ্রষ্টরূপে সম্বোধন করতো। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা। পরলোকের জীবনে তাদের সকল দুষ্কৃতি,কূটকৌশল,কটুক্তি, মিথ্যা, সব কিছুই তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়া হবে। সেদিন তাদের অবস্থান হবে নীচে এবং মুমিনদের উচ্চে।

৩৩। অথচ তাদের তো মোমেনদের তত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয় নাই। ৬০২৮

৬০২৮। পৃথিবীর জীবনে দুষ্কৃতিকারী ও পাপিষ্ঠদের ব্যবহারে মনে হবে তারা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ, সুতারাং পূণ্যাত্মাদের সম্বন্ধে কটুক্তি করার ও সমালোচনা করার অধিকার তাদের আছে। কে তাদের মুমিনদের তত্বাবধায়ক করে পাঠিয়েছে ? বরং তারা তাদের নিজেদের ভবিষ্যত সম্বন্ধে চিন্তা করুক।

৩৪। সেই দিন বিশ্বাসীরা, অবিশ্বাসীদের উপহাস করবে; ৬০২৯

৬০২৯। পরলোকের দৃশ্য হবে সম্পূর্ণ উল্টো। সেদিন মুমিনগণই পাপীষ্ঠদের উপহাস করবে।

৩৫। তারা [ মর্যদার ] সিংহাসনে উপবেশন করে অবলোকন করবে [সকল জিনিষ ] ৬০৩০।

৬০৩০। ৩৫ নং আয়াতটি পূর্বের ২৩ নং আয়াতের পুণরাবৃত্তি। কিন্তু এখানে অর্থের বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পূণ্যাত্মারা তাদের উচ্চে আসন থেকে লক্ষ্য করবেন যে, প্রকৃত মূল্যবোধ পৃথিবীতে উপহাসের বস্তু হলেও পরলোকে তা মহিমাতে উদ্ভাসিত হবে। তাঁরা আরও লক্ষ্য করবেন যে দাম্ভিক, মিথ্যা অহংকারী পার্থিব জীবনে যত মর্যদাবানই হোক না কেন পরলোকে তাদের সকলের মর্যদা হানি করা হবে এবং হীন,নীচ বলে প্রতিপন্ন করা হবে। নিজেদের কর্মফলেই এদের নিজেদের অধঃপতনের কারণ।

৩৬। অবিশ্বাসীদের তাদের কর্মের উপযুক্ত প্রতিফল দেয়া হবে।