+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এই সূরাটি, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সূরার সমসাময়িক।
এই সূরার মাধ্যমে সকল প্রকার প্রতারণাকে নিন্দা করা হয়েছে। বিশেষ ভাবে ধর্মের ব্যাপারে এবং প্রতিদিনের জীবন যাপন প্রণালীতে।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৬০১১। মাপে কম দেয়ার অর্থ অন্যকে ঠকানো বা প্রতারণার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার প্রবণতা। মাপে কম দেয়া বাক্যটিকে সঙ্কীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে এর অর্থ ব্যপক ও গভীর ভাবে ব্যবহৃত হবে। কারণ ৩নং আয়াতে 'মাপ ' ও 'ওজন' দুটি শব্দ একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। ওজন হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যে ভাবে জিনিষকে ওজন করে থাকে বাটখারার সাহায্যে। 'মাপ' হচ্ছে যে কোন প্রাপ্য বস্তুর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। পরবর্তী দুটি আয়াতে মাপে কম দেয়ার প্রকৃত মানসিকতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই মানসিকতার সাথে অন্যের প্রতি অন্যায় করায় প্রবণতা জড়িত থাকে - আর তা হচ্ছে অন্যকে তার ন্যায্য প্রাপ্য অপেক্ষা কম দেয়া এবং নিজের বেলাতে যা প্রাপ্য তা থেকে বেশী দাবী করা। এরূপ মানসিকতা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রভূত প্রচলিত যা সচারচর আমাদের দেশে দৃষ্টি গোচর হয়। কিন্তু এই মানসিকতা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রচলিত আছে তবে তার ধরণ হবে আলাদা। যেমন গৃহে,বা সামাজিক অনুষ্ঠানে, বা অফিসে, আদালতে কোন ব্যক্তি বা গ্রুপ বিশেষ সম্মান বা সেবা দাবী করতে পারেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তাদের করণীয় কর্তব্য সম্বন্ধে তারা হন অমনোযোগী। এও এক ধরণের প্রতারণা। একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটিকে এভাবে তুলে ধরা যায়। আমাদের দেশের উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীরা যারা পদবলে উচ্চ সম্মানের ও সুযোগ সুবিধার দাবীদার। কিন্তু যে পদাধিকার বলে তিনি এ সব ভোগ করেন, তিনি সে পদের জন্য অর্পিত কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্বন্ধে অমনোযোগী। যার ফলে তাঁর কর্তব্য স্থলে ফাইলের পাহাড় গড়ে ওঠে। এটাও ঐ মাপে কম দেয়ার মানসিকতা থেকে উদ্ভুদ পরিস্থিতি। এটা একধরণের বিকৃত স্বার্থপরতা এবং দ্বিগুণ অন্যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আধ্যাত্মিক জগতের জন্য এ হচ্ছে এক বিপর্যয়কারী প্রক্রিয়া। যে লোক শুধুমাত্র নিজ স্বার্থের জন্য কাজ করবে, অন্যকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে সে কিভাবে আল্লাহ্র করুণা ও রহমতের আশা করতে পারে ? ইংরেজীতে এক অতি মূল্যবান উপদেশ আছে, তা হচ্ছে, " Do as you would be done by" এই সূরাতে আরও বিশদ ভাবে বলা হয়েছে যে, "অন্যেরা তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করুক বা না করুক,তোমার নিকট অন্যের যা প্রাপ্য তা পূর্ণভাবে পরিশোধ করবে" সুতারাং এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব অত্যন্ত বেশী।
৬০১২। পৃথিবীর নিয়ম হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতারকদের প্রতারণা সর্বসমক্ষে প্রকাশ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সে সামাজিক ও সম্মানের যোগ্য ও আইনের উর্দ্ধে বলে বিবেচিত হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতারকদের অবস্থান আলাদা। প্রতিটি আত্মা আল্লাহ্র রূহুর অংশ [ ১৫ : ২৯] যা সৃষ্টির আদিতে থাকে পূত ও পবিত্র। আত্মার এই হচ্ছে প্রকৃত রূপ। কেউ কি সেই আত্মাকে প্রতারণার দ্বারা কলুষিত করতে চায় ? তারা কি জানে না তাদের সকল কাজের জন্য শেষ বিচারের দিনে, জবাবদিহিতা বিদ্যমান ? যিনি সেই বিচার দিনের বিচারক তাঁর অজ্ঞাত কিছুই নাই, সেই মহাপ্রভু আল্লাহ্ সকলের অধিকার রক্ষা করেন। পৃথিবীর কেউ না জানলেও আল্লাহ্ সকলের সকল কর্ম সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল। সুতারাং তারা কি পুণরুত্থানের ভয় করে না ?
৬০১৩। মূল শব্দ 'Sijn' থেকে 'Sijjin' শব্দটি উদ্ভুদ। 'Sijn' শব্দটির অর্থ কারাগার। ১৮নং আয়াতে 'Illiyin' শব্দটির বিপরীত অর্থ বহন করে শব্দটি। সুতারাং তফসীরকারদের মতে সিজ্জীন হচ্ছে কারাগার ; যেখানে পাপীদের আমলনামা রাখা হয়।
৬০১৪। সিজ্জীন শব্দটি দ্বারা পাপীদের জন্য কারাগার না বুঝিয়ে যদি পাপীদের আমলনামা রাখার স্থানকে বুঝানো হয় তবে এদের অর্থের খুব একটা পার্থক্য হয় না। কারণ আমলনামা বা রেজিস্ট্রার -ই হচ্ছে পাপীদের জন্য কারাগারের প্রতীক। লিখিত আমলনামার' অর্থ হচ্ছে যেখানে প্রতিটি কর্মের খুঁটিনাটি বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে, কোন কিছুই যেখানে বাদ দেয়া হয় নাই। পাপীদের প্রতিটি কার্যের পূর্ণ বিবরণ সেখানে লিপিবদ্ধ আছে।
৬০১৫। পৃথিবীর জীবন শুধুমাত্র হাসি খেলার বস্তু নয়, বা এ জীবনের শেষ এই পৃথিবীতেই নয়। পৃথিবীর প্রতিটি কাজের কর্মফল বিদ্যমান এবং শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেককে তার নিজ নিজ কর্মের দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে। যারা এই পৃথিবীতে মিথ্যাচারে জীবনকে অতিবাহিত করে, এবং কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে থাকে, তারা এই দিবসে হবে করুণার পাত্র। সেদিন কোনও পাপীই বিচার দিবসকে অস্বীকার করতে পারবে না। তাদের কোনও মিথ্যা ভাষণ সেদিন কোন উপকারেই আসবে না।
৬০১৬। দেখুন অনুরূপ সূরা [ ৬ : ২৫ ] আয়াত; [ ৬৮ : ১৫ ] ইত্যাদি। এই আয়াতের মাধ্যমে পাপিষ্ঠ ও সীমালংঘনকারীদের মানসিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এরা ঘৃণা সহকারে সত্যকে প্রত্যাখান করে এবং এমন ভান করে যে সত্য হচ্ছে মিথ্যা।
৬০১৭। 'হৃদয়' শব্দটি দ্বারা এখানে মানুষের আত্মাকে বুঝানো হয়েছে। এই নশ্বর দেহের অভ্যন্তরে আল্লাহ্ তাঁর রূহুর অংশ ফুৎকারের সাহায্যে প্রবেশ করিয়েছেন [ ১৫ : ২৯]। রূহু বা আত্মা হচ্ছে অমর এবং প্রতিটি মানুষ পবিত্র ও কলুষমুক্ত আত্মা দেহের মাঝে ধারণ করে পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে। জীবনে চলার পথে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ এবং পাপ কার্য আত্মার উপরে কলুষতার চিহ্ন বা মরিচা বা জং দ্বারা আবৃত করে দেয়। ফলে আত্মার শুভ্রতা ও ঔজ্জল্য ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে আসে। কিন্তু পাপ কার্যের পরে অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এই কলুষতা বা মরিচাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু যদি কেউ পাপ কার্যের পরে অনুতপ্ত না হয়ে, পাপ কাজ চালিয়েই যেতে থাকে তবে আত্মার উপরে কলুষতার বা মরিচার প্রলেপ ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। একখন্ড লৌহকে দীর্ঘদিন মুক্ত বাতাসে উম্মুক্ত রেখে দিলে তার উপরে মরিচার প্রলেপ শুরু হয়ে যায়। এবং দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই মরিচার প্রলেপ এতটাই গভীর রূপ ধারণ করে যে, মূল লৌহ খন্ডকে সনাক্ত করাই তখন দুষ্কর ব্যাপার হয়ে যায়। মরিচা বা জং এর উদাহরণের মাধ্যমে এই সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে যে, লোহা যেমন বিপরীত পরিবেশে তার ধর্ম বা গুণাগুণ হারিয়ে ফেলে এবং মরিচা দ্বারা আচ্ছাদিত হয়, আত্মার অবস্থাও পাপ কার্য দ্বারা সেরূপ ধারণ করে। পাপের কালিমা আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে ফেলে ফলে, তাদের আত্মার মাঝে আল্লাহ্র হেদায়েতের আলোর প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আত্মার এই অবস্থাকেই [ ২ : ৭ ] আয়াতে 'সীলমোহর' রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। লোহা যেরূপ মরিচার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত লৌহ হিসেবে না থেকে মরিচা বা অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়; আত্মিক অবস্থারও হয় সেরূপ। শারীরিক ভাবে এ সব ব্যক্তি জীবিত বলে পরিগণিত হলেও এদের ঘটে আধ্যাত্মিক মৃত্যু। আত্মার উপরে পাপের কলুষতার আবরণ তাদের মাঝে সত্যকে বোঝার ও ধারণ করার ক্ষমতাকে অবলুপ্ত করে দেয়। আল্লাহ্র হেদায়েতের আলো ও আত্মার মাঝে কঠিন দেয়ালের সৃষ্টি করে। এ কারণেই তারা সত্যকে বুঝতে অক্ষম হয়, এবং সত্যকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে সাহস পায়।
৬০১৮। 'অন্তরিত' অর্থাৎ পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকবে। পূত পবিত্র আত্মাকে আয়নার সাথে তুলনা করা যায়। পরিষ্কার আয়নাতে যেরূপ উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়, পূত পবিত্র আত্মার মাঝেও সেরূপ আল্লাহ্র জ্ঞান,প্রজ্ঞার আলোর প্রতিফলন ঘটে। আল্লাহ্র হেদায়েতের আলো এ সব আত্মাকে করে উদ্ভাসিত। কিন্তু যে আত্মা পাপের কালিমাতে কলুষিত হয় সে আত্মাকে তুলনা করা যায় মসীলিপ্ত আয়নার সাথে। মসীলিপ্ত আয়নাতে যেরূপ কোনও প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয় না, ঠিক সেরূপ হচ্ছে পাপে আসক্ত আত্মার অবস্থান। এ সব আত্মাতে আল্লাহ্র নূর বা সত্য,জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোর অনুপ্রবেশের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। ঠিক যেনো দেয়াল দ্বারা তাদের অন্তরিত করা হয়েছে। ফলে, বিচার দিবসে পূণ্যাত্মারা আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভে হবেন ধন্য। অপরপক্ষে,পাপাত্মার কখনও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হবে না। স্রষ্টা ও তাদের মাঝে থাকবে "অন্তরায়" বা দেয়াল পাপীদের দৃষ্টিগোচর করানো হবে দোযখের আগুন - যা তাদের জন্য প্রজ্জ্বলিত যা তাদের জন্য একমাত্র সত্য।

সূরা মুতাফ্ফিফীন
সূরা মুতাফ্ফিফীন বা প্রবঞ্চক -৮৩
৩৬ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এই সূরাটি, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সূরার সমসাময়িক।
এই সূরার মাধ্যমে সকল প্রকার প্রতারণাকে নিন্দা করা হয়েছে। বিশেষ ভাবে ধর্মের ব্যাপারে এবং প্রতিদিনের জীবন যাপন প্রণালীতে।
সূরা মুতাফ্ফিফীন বা প্রবঞ্চক -৮৩
৩৬ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। যারা প্রবঞ্চনা করে, তাদের দুর্ভাগ্য।
২। যারা লোকের নিটক থেকে মেপে নেয়ার সময়ে পুর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে,
৩। কিন্তু যখন তারা অন্যকে দেয়, সে প্রাপ্য মাপ ও ওজনে কম দেয়। ৬০১১
২। যারা লোকের নিটক থেকে মেপে নেয়ার সময়ে পুর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে,
৩। কিন্তু যখন তারা অন্যকে দেয়, সে প্রাপ্য মাপ ও ওজনে কম দেয়। ৬০১১
৬০১১। মাপে কম দেয়ার অর্থ অন্যকে ঠকানো বা প্রতারণার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার প্রবণতা। মাপে কম দেয়া বাক্যটিকে সঙ্কীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে এর অর্থ ব্যপক ও গভীর ভাবে ব্যবহৃত হবে। কারণ ৩নং আয়াতে 'মাপ ' ও 'ওজন' দুটি শব্দ একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। ওজন হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যে ভাবে জিনিষকে ওজন করে থাকে বাটখারার সাহায্যে। 'মাপ' হচ্ছে যে কোন প্রাপ্য বস্তুর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। পরবর্তী দুটি আয়াতে মাপে কম দেয়ার প্রকৃত মানসিকতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই মানসিকতার সাথে অন্যের প্রতি অন্যায় করায় প্রবণতা জড়িত থাকে - আর তা হচ্ছে অন্যকে তার ন্যায্য প্রাপ্য অপেক্ষা কম দেয়া এবং নিজের বেলাতে যা প্রাপ্য তা থেকে বেশী দাবী করা। এরূপ মানসিকতা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রভূত প্রচলিত যা সচারচর আমাদের দেশে দৃষ্টি গোচর হয়। কিন্তু এই মানসিকতা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রচলিত আছে তবে তার ধরণ হবে আলাদা। যেমন গৃহে,বা সামাজিক অনুষ্ঠানে, বা অফিসে, আদালতে কোন ব্যক্তি বা গ্রুপ বিশেষ সম্মান বা সেবা দাবী করতে পারেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তাদের করণীয় কর্তব্য সম্বন্ধে তারা হন অমনোযোগী। এও এক ধরণের প্রতারণা। একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটিকে এভাবে তুলে ধরা যায়। আমাদের দেশের উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীরা যারা পদবলে উচ্চ সম্মানের ও সুযোগ সুবিধার দাবীদার। কিন্তু যে পদাধিকার বলে তিনি এ সব ভোগ করেন, তিনি সে পদের জন্য অর্পিত কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্বন্ধে অমনোযোগী। যার ফলে তাঁর কর্তব্য স্থলে ফাইলের পাহাড় গড়ে ওঠে। এটাও ঐ মাপে কম দেয়ার মানসিকতা থেকে উদ্ভুদ পরিস্থিতি। এটা একধরণের বিকৃত স্বার্থপরতা এবং দ্বিগুণ অন্যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আধ্যাত্মিক জগতের জন্য এ হচ্ছে এক বিপর্যয়কারী প্রক্রিয়া। যে লোক শুধুমাত্র নিজ স্বার্থের জন্য কাজ করবে, অন্যকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে সে কিভাবে আল্লাহ্র করুণা ও রহমতের আশা করতে পারে ? ইংরেজীতে এক অতি মূল্যবান উপদেশ আছে, তা হচ্ছে, " Do as you would be done by" এই সূরাতে আরও বিশদ ভাবে বলা হয়েছে যে, "অন্যেরা তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করুক বা না করুক,তোমার নিকট অন্যের যা প্রাপ্য তা পূর্ণভাবে পরিশোধ করবে" সুতারাং এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্ব অত্যন্ত বেশী।
৪। তারা কি চিন্তা করে না যে [ মরণের পরে ] তাদের হিসাবের জন্য ডাকা হবে ? ৬০১২
৫। মহা দিবসে ?
৬। যে দিন [ সকল ] মানুষকে দাঁড়াতে হবে জগত সমূহের প্রভুর সম্মুখে ?
৫। মহা দিবসে ?
৬। যে দিন [ সকল ] মানুষকে দাঁড়াতে হবে জগত সমূহের প্রভুর সম্মুখে ?
৬০১২। পৃথিবীর নিয়ম হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতারকদের প্রতারণা সর্বসমক্ষে প্রকাশ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সে সামাজিক ও সম্মানের যোগ্য ও আইনের উর্দ্ধে বলে বিবেচিত হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতারকদের অবস্থান আলাদা। প্রতিটি আত্মা আল্লাহ্র রূহুর অংশ [ ১৫ : ২৯] যা সৃষ্টির আদিতে থাকে পূত ও পবিত্র। আত্মার এই হচ্ছে প্রকৃত রূপ। কেউ কি সেই আত্মাকে প্রতারণার দ্বারা কলুষিত করতে চায় ? তারা কি জানে না তাদের সকল কাজের জন্য শেষ বিচারের দিনে, জবাবদিহিতা বিদ্যমান ? যিনি সেই বিচার দিনের বিচারক তাঁর অজ্ঞাত কিছুই নাই, সেই মহাপ্রভু আল্লাহ্ সকলের অধিকার রক্ষা করেন। পৃথিবীর কেউ না জানলেও আল্লাহ্ সকলের সকল কর্ম সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল। সুতারাং তারা কি পুণরুত্থানের ভয় করে না ?
৭। না। নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা [ রক্ষিত ] আছে সিজ্জিনে ৬০১৩
৬০১৩। মূল শব্দ 'Sijn' থেকে 'Sijjin' শব্দটি উদ্ভুদ। 'Sijn' শব্দটির অর্থ কারাগার। ১৮নং আয়াতে 'Illiyin' শব্দটির বিপরীত অর্থ বহন করে শব্দটি। সুতারাং তফসীরকারদের মতে সিজ্জীন হচ্ছে কারাগার ; যেখানে পাপীদের আমলনামা রাখা হয়।
৮। কি ভাবে তোমাদের ব্যাখ্যা করা যাবে সিজ্জিন কি ?
৯। উহা হচ্ছে পূর্ণভাবে লিখিত নথি [রেজিস্ট্রার ]। ৬০১৪
৯। উহা হচ্ছে পূর্ণভাবে লিখিত নথি [রেজিস্ট্রার ]। ৬০১৪
৬০১৪। সিজ্জীন শব্দটি দ্বারা পাপীদের জন্য কারাগার না বুঝিয়ে যদি পাপীদের আমলনামা রাখার স্থানকে বুঝানো হয় তবে এদের অর্থের খুব একটা পার্থক্য হয় না। কারণ আমলনামা বা রেজিস্ট্রার -ই হচ্ছে পাপীদের জন্য কারাগারের প্রতীক। লিখিত আমলনামার' অর্থ হচ্ছে যেখানে প্রতিটি কর্মের খুঁটিনাটি বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে, কোন কিছুই যেখানে বাদ দেয়া হয় নাই। পাপীদের প্রতিটি কার্যের পূর্ণ বিবরণ সেখানে লিপিবদ্ধ আছে।
১০। অস্বীকারকারীদের জন্য সেদিন হবে দুর্ভাগ্য -
১১। যারা শেষ বিচার দিবসকে অস্বীকার করে ৬০১৫।
১১। যারা শেষ বিচার দিবসকে অস্বীকার করে ৬০১৫।
৬০১৫। পৃথিবীর জীবন শুধুমাত্র হাসি খেলার বস্তু নয়, বা এ জীবনের শেষ এই পৃথিবীতেই নয়। পৃথিবীর প্রতিটি কাজের কর্মফল বিদ্যমান এবং শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেককে তার নিজ নিজ কর্মের দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে। যারা এই পৃথিবীতে মিথ্যাচারে জীবনকে অতিবাহিত করে, এবং কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে থাকে, তারা এই দিবসে হবে করুণার পাত্র। সেদিন কোনও পাপীই বিচার দিবসকে অস্বীকার করতে পারবে না। তাদের কোনও মিথ্যা ভাষণ সেদিন কোন উপকারেই আসবে না।
১২। পাপিষ্ঠ, সীমালংঘনকারীরা ব্যতীত আর কেহ তা অস্বীকার করে না।
১৩। যখন তার নিকট আমার আয়াত সমূহ আবৃত্তি করা হয়, সে বলে, " ইহা অতীতকালের কাহিনী। " ৬০১৬
১৩। যখন তার নিকট আমার আয়াত সমূহ আবৃত্তি করা হয়, সে বলে, " ইহা অতীতকালের কাহিনী। " ৬০১৬
৬০১৬। দেখুন অনুরূপ সূরা [ ৬ : ২৫ ] আয়াত; [ ৬৮ : ১৫ ] ইত্যাদি। এই আয়াতের মাধ্যমে পাপিষ্ঠ ও সীমালংঘনকারীদের মানসিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এরা ঘৃণা সহকারে সত্যকে প্রত্যাখান করে এবং এমন ভান করে যে সত্য হচ্ছে মিথ্যা।
১৪। কখনই না ! বরং তারা যে [ পাপ ] করেছে, তা তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়েছে ৬০১৭
৬০১৭। 'হৃদয়' শব্দটি দ্বারা এখানে মানুষের আত্মাকে বুঝানো হয়েছে। এই নশ্বর দেহের অভ্যন্তরে আল্লাহ্ তাঁর রূহুর অংশ ফুৎকারের সাহায্যে প্রবেশ করিয়েছেন [ ১৫ : ২৯]। রূহু বা আত্মা হচ্ছে অমর এবং প্রতিটি মানুষ পবিত্র ও কলুষমুক্ত আত্মা দেহের মাঝে ধারণ করে পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে। জীবনে চলার পথে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ এবং পাপ কার্য আত্মার উপরে কলুষতার চিহ্ন বা মরিচা বা জং দ্বারা আবৃত করে দেয়। ফলে আত্মার শুভ্রতা ও ঔজ্জল্য ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে আসে। কিন্তু পাপ কার্যের পরে অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এই কলুষতা বা মরিচাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু যদি কেউ পাপ কার্যের পরে অনুতপ্ত না হয়ে, পাপ কাজ চালিয়েই যেতে থাকে তবে আত্মার উপরে কলুষতার বা মরিচার প্রলেপ ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। একখন্ড লৌহকে দীর্ঘদিন মুক্ত বাতাসে উম্মুক্ত রেখে দিলে তার উপরে মরিচার প্রলেপ শুরু হয়ে যায়। এবং দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই মরিচার প্রলেপ এতটাই গভীর রূপ ধারণ করে যে, মূল লৌহ খন্ডকে সনাক্ত করাই তখন দুষ্কর ব্যাপার হয়ে যায়। মরিচা বা জং এর উদাহরণের মাধ্যমে এই সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে যে, লোহা যেমন বিপরীত পরিবেশে তার ধর্ম বা গুণাগুণ হারিয়ে ফেলে এবং মরিচা দ্বারা আচ্ছাদিত হয়, আত্মার অবস্থাও পাপ কার্য দ্বারা সেরূপ ধারণ করে। পাপের কালিমা আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে ফেলে ফলে, তাদের আত্মার মাঝে আল্লাহ্র হেদায়েতের আলোর প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আত্মার এই অবস্থাকেই [ ২ : ৭ ] আয়াতে 'সীলমোহর' রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। লোহা যেরূপ মরিচার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত লৌহ হিসেবে না থেকে মরিচা বা অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়; আত্মিক অবস্থারও হয় সেরূপ। শারীরিক ভাবে এ সব ব্যক্তি জীবিত বলে পরিগণিত হলেও এদের ঘটে আধ্যাত্মিক মৃত্যু। আত্মার উপরে পাপের কলুষতার আবরণ তাদের মাঝে সত্যকে বোঝার ও ধারণ করার ক্ষমতাকে অবলুপ্ত করে দেয়। আল্লাহ্র হেদায়েতের আলো ও আত্মার মাঝে কঠিন দেয়ালের সৃষ্টি করে। এ কারণেই তারা সত্যকে বুঝতে অক্ষম হয়, এবং সত্যকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে সাহস পায়।
১৫। সেদিন তারা তাদের প্রভুর [ নূর ] থেকে অন্তরিত হবে। ৬০১৮
১৬। উপরন্তু তারা জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে।
১৬। উপরন্তু তারা জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে।
৬০১৮। 'অন্তরিত' অর্থাৎ পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকবে। পূত পবিত্র আত্মাকে আয়নার সাথে তুলনা করা যায়। পরিষ্কার আয়নাতে যেরূপ উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়, পূত পবিত্র আত্মার মাঝেও সেরূপ আল্লাহ্র জ্ঞান,প্রজ্ঞার আলোর প্রতিফলন ঘটে। আল্লাহ্র হেদায়েতের আলো এ সব আত্মাকে করে উদ্ভাসিত। কিন্তু যে আত্মা পাপের কালিমাতে কলুষিত হয় সে আত্মাকে তুলনা করা যায় মসীলিপ্ত আয়নার সাথে। মসীলিপ্ত আয়নাতে যেরূপ কোনও প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয় না, ঠিক সেরূপ হচ্ছে পাপে আসক্ত আত্মার অবস্থান। এ সব আত্মাতে আল্লাহ্র নূর বা সত্য,জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোর অনুপ্রবেশের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। ঠিক যেনো দেয়াল দ্বারা তাদের অন্তরিত করা হয়েছে। ফলে, বিচার দিবসে পূণ্যাত্মারা আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভে হবেন ধন্য। অপরপক্ষে,পাপাত্মার কখনও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হবে না। স্রষ্টা ও তাদের মাঝে থাকবে "অন্তরায়" বা দেয়াল পাপীদের দৃষ্টিগোচর করানো হবে দোযখের আগুন - যা তাদের জন্য প্রজ্জ্বলিত যা তাদের জন্য একমাত্র সত্য।