Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৬২ জন
আজকের পাঠক ৮২ জন
সর্বমোট পাঠক ৭১৩৭৬৯ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৮৯৮১৬ বার
+ - R Print

সূরা তারিক


সূরা তারিক বা রাতের আগুন্তক - ৮৬

১৭ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভুমিকা ও সারসংক্ষেপ : এই সূরাটিও প্রাথমিক মক্কী সূরার অর্ন্তগত। সম্ভবতঃ পূর্বের সূরা থেকে এর সময়ের পার্থক্য খুব বেশী নয়।

এর বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রতিটি আত্মার নিরাপত্তা রক্ষা করা হয়। মানুষের নশ্বর দেহের মূল্য খুব বেশী নয়, কিন্তু আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আত্মা হচ্ছে অক্ষয় ও অমর এবং তার জন্য আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যত -পরলোকের জীবনে।

সূরা তারিক বা রাতের আগুন্তক - ৮৬

১৭ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। শপথ আকাশের ৬০৬৭ ও রাতের [ আকাশে ] আগমনকারীর ; ৬০৬৮

৬০৬৭। এখানে আকাশের শপথের মাধ্যমে রাত্রির আকাশের নক্ষত্রের উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ আকাশ ও রাতের আকাশের নক্ষত্রের শপথের মাধ্যমে যে বক্তব্যের উপস্থাপন করেছেন তা উল্লেখ করা হয়েছে ৪ নং আয়াতে। " এমন কোন প্রাণ নাই যার উপরে তত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয় নাই।" পূর্বের সূরাতে উল্লেখ করা হয়েছে মোমেন বান্দাদের উপরে নির্যাতনের কথা এবং বলা হয়েছে আল্লাহ্‌ তাদের রক্ষা করেন। এই সূরাতেও সেই একই বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। রাতের আকাশের নক্ষত্র মন্ডলী উজ্জ্বল ভাবে অন্ধকার আচ্ছন্ন পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। রাতের অন্ধকারের পটভূমিতে কোটি কোটি যোজন দূর থেকে বিচ্ছুরিত নক্ষত্রের আলো মানুষের মনকে কোন সূদুরের পানে নিয়ে যায়। এটি একটি রূপক বর্ণনা। ঠিক সেরূপ হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগত। মানুষের অজ্ঞতা অথবা বিপদ বিপর্যয়ে অথবা পার্থিব আকর্ষণের হেতু যখন তাদের আধ্যাত্মিক জগত অন্ধকারে ডুবে যায় তখন নক্ষত্রের আলোর ন্যায় আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের আলো সেই অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আমাদের পথ দেখায়। সুতারাং মোমেন বান্দারা,যারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসে দৃঢ় ও অকুতভয়, তাদের পথ হারানোর কোন ভয় নাই। আল্লাহ্‌ তাদের রক্ষা করবেন।

৬০৬৮। এই আয়াতের উত্তর ৩নং আয়াতে দেয়া হয়েছে 'উহা উজ্জ্বল নক্ষত্র।" কোন কোন তফসীরকারের মতে এটা হবে প্রভাতের শুকতারা যা রাতের শেষ প্রহরে উজ্জ্বলরূপে প্রতিভাত হয়। আবার অন্য দল মনে করেন এটা হবে শনিগ্রহ, আবার অনেকে মনে করেন এটা লুব্ধক নক্ষত্র বা সপ্তর্ষিমন্ডল বা উল্কাপিন্ড হবে। মওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের মতে কোন বিশেষ নক্ষত্র হিসেবে বর্ণনা না করে সাধারণভাবে নেয়া যেতে পারে যা সমগ্র নক্ষত্র মন্ডলীর জন্য প্রযোজ্য হবে। কারণ বছরের প্রতিটি রাত্রেই নক্ষত্র মন্ডলী আকাশে দ্যূতি বিকিরণ করে এবং রাতের আকাশকে আলোকিত করে।

২। তোমাকে কি ভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে যে রাত্রের [ আকাশে ] আগমনকারী কি ?

৩। উহা উজ্জ্বল নক্ষত্র !

৪। এমন কোন প্রাণ [ আত্মা ] নাই যার উপরে তত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয় নাই। ৬০৬৯

৬০৬৯। যদি মানুষ শুধুমাত্র বস্তু জগত সম্বন্ধে তার সমস্ত চিন্তা -ভাবনা ও সত্ত্বা ব্যপৃত না রেখে মনোজগতকে বা আধ্যাত্মিক জগতকে প্রাণিধান করার জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করে, তবে তাঁর কোনও ভয় নাই। আল্লাহ্‌ এদের অগোচরে সকল বিপদ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবেন। হয়তো পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে, সামাজিক অবস্থানে তাঁর স্থান অতি নগণ্য ; কিন্তু তাঁর আত্মা আধ্যাত্মিক জগতের দুর্গম পথকে অতিক্রম করে আল্লাহ্‌র নিকট সম্মানের অধিকারী হয়ে যায়। আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ্‌ তাঁকে সমগ্র সৃষ্টির উপরে সম্মান দান করেন। ঐশ্বরিক শক্তি তাঁদের সকল বিপদ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন এই পার্থিব জীবনে।

৫। সুতারাং মানুষ প্রাণীধান করুক কি থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

৬। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত এক বিন্দু পানি থেকে ৬০৭০

৬০৭০। দেখুন সূরা [ ৭৬ : ২ ] আয়াতের টিকা ৫৮৩২।

৭। ইহা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও পঞ্জরাস্থির মধ্য থেকে, ৬০৭১

৬০৭১। পুরুষের বীর্য হচ্ছে দেহের কেন্দ্রীভূত বিশুদ্ধ সারাংশ। বীর্য দেহের কটিদেশে উৎপন্ন হয়; অর্থাৎ নিতম্বের হাড় ও পঞ্জরাস্থির মধ্যবর্তী অঞ্চলে। মানুষের মেরুদন্ড হচ্ছে শক্তি ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক। মেরুদন্ডের মধ্যে দিয়ে স্নায়ু মন্ডলীর মূল কান্ড পরিচালিত হয়েছে, যার মস্তিষ্কের সাথে সংযুক্তি ঘটেছে। আর এই স্নায়ু মন্ডলীর মাধ্যমে মস্তিষ্ক তার সকল নির্দ্দেশনা দেহের সর্বত্র পরিচালনা করে।

৮। নিশ্চয়ই [আল্লাহ্‌ ] তাকে পুণরায় [জীবিত ] করে আনতে সক্ষম ৬০৭২

৬০৭২। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব জগতের অপূর্ব সমণ্বয় ঘটিয়েছেন। যিনি এত বড় স্রষ্টা, তিনি অবশ্যই মৃত্যুর পরে মানুষের পুণরুত্থান ঘটাতে সক্ষম। কেয়ামতের পরে নূতন পৃথিবীতে মানুষকে আবার তিনি ফিরিয়ে আনবেন।

৯। সেদিন [ সকল ] গোপন বিষয় পরীক্ষা করা হবে।

১০। [ মানুষের ] কোন ক্ষমতা থাকবে না, এবং কোন সাহায্যকারীও থাকবে না ৬০৭৩।

৬০৭৩। কেয়ামতের পরে যে নূতন পৃথিবীর সৃষ্টি হবে, সে পৃথিবীর সব নিয়ম কানুন আমাদের এই চেনা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। এই পার্থিব জীবনের সকল কাজ, কাজের নিয়ত বা উদ্দেশ্য, সকল চিন্তা ভাবনা বা কল্পনা, তা যত গোপনই রাখা হোক না কেন, তা প্রকাশিত করা হবে নূতন পৃথিবীতে এবং তা প্রকৃত সত্যের কষ্টি পাথরে ন্যায়ের আলোকে যাচাই করা হবে। কোন প্রতারণা বা সংস্কার বা রীতিনীতি বা পক্ষপাতিত্ব সেদিন কোনও কাজে আসবে না। সেই কঠিন পরীক্ষাতে পৃথিবীর মত অন্যায় সুযোগ সুবিধা লাভের ক্ষমতা বা সুযোগ থাকবে না বা কোন সাহায্য লাভেরও সুযোগ থাকবে না।

১১। শপথ [ সেই ] আকাশের [ যা ] বার বার আসে ৬০৭৪,

৬০৭৪। ঋতু ভেদে আকাশের রূপ যায় বদলে। বর্ষায় একরূপ শরতে অন্য। শীতে, গ্রীষ্মে ইত্যাদি বিভিন্ন ঋতুতে আকাশ বিভিন্নভাবে রং বদলায়। এই আয়াতে শপথ করা হয়েছে সেই আকাশের যা বৃষ্টির মেঘকে ধারণ করে। আকাশের বিভিন্ন রূপ সত্ত্বেও সপ্ত আকাশের কোনও পরিবর্তন ঘটে না। এই শপথের মাধমে সেই চির সত্যের প্রতি ইঙ্গিত দান করা হয়েছে যা চিরকাল অপরিবর্তনীয় থেকে যায়। সেই সত্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের সত্য। বৃত্তের যেরূপ আবর্তন ঘটে শুধুমাত্র একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে, ঠিক সেরূপ হচ্ছে প্রত্যাদেশের সত্য। যদিও যুগে যুগে পরিবেশের সাথে জীবনের সমন্বয় সাধনের জন্য এই সত্যের রুপকে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সত্যের প্রকৃত রূপ একই থেকে যায়। যেরূপ মেঘের আনাগোনা সত্ত্বেও আকাশের রূপ একই থেকে যায়।

১২। পৃথিবীর শপথ, যা মুক্ত করে [ সবেগে নির্গত প্রস্রবণ ও অঙ্কুরিত উদ্ভিদ ] ৬০৭৫,

৬০৭৫। গ্রীষ্মের দাবদাহে মাটিকে মনে হয় পাথরের ন্যায় কঠিন। সেই মাটি যখন বৃষ্টির পানিতে সিক্ত হয়, তখন তা ভেদ করে উদ্ভিদের চারাগাছ মাথা তোলে এবং কঠিন ধরণীকে সবুজ করে তোলে। এই রূপক বর্ণনার মাধ্যমে সত্যের রূপকে তুলে ধরা হয়েছে। আধ্যাত্মিক জ্ঞান পৃথিবীর মানুষের নিকট ঐ দাবদাহে শুষ্ক মাটির ন্যায় কঠিন মনে হয়। কিন্তু বৃষ্টির ন্যায় প্রত্যাদেশের সত্য মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের মাটিকে সিক্ত উর্বর করে তোলে। যার ফলে আমাদের অন্তর্নিহিত আত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে এবং " ফুলে ফলে" ভরে ওঠে।

১৩। দেখো, এই সেই বাণী [ কুর-আন ] যা পৃথক করে [ ভালোকে মন্দ থেকে ]। ৬০৭৬

১৪। এটা কোন তামাশার বিষয় নয়।

৬০৭৬। দেখুন উপরের দুটি টিকা। প্রত্যাদেশের সত্য হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতের জন্য আলো, যা আত্মিক অন্ধকারের কঠিন আবরণকে ভেদ করে বিচ্ছুরিত হতে সক্ষম এবং যা আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্যের প্রতি বা কেন্দ্র বিন্দুর প্রতি পরিচালিত করতে সক্ষম। আল্‌ -কুরাণ হচ্ছে সেই প্রত্যাদেশের সত্য বা আলো, যা ভালো ও মন্দের মধ্যে মীমাংসাকারী বা পার্থক্যকারী। এটা কোনও হাসি-খেলার বস্তু নয়, কোরাণ আমাদের জীবনের সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ ও সঠিক পথ বাতলে দেয়।

১৫। তারা তো ষড়যন্ত্রের দুরভিসন্ধি করছে, ৬০৭৭

৬০৭৭। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও করুণা আধ্যাত্মিক জগতের সূচীভেদ্য অন্ধকারকে ভেদ করে আমাদের আধ্যাত্মিক জগতকে সত্যের আলো উপলব্ধিতে সাহায্য করে থাকে; ঠিক সেই ভাবে যে ভাবে কঠিন মাটির অন্ধকারকে ভেদ করে ক্ষুদ্র বীজ মুক্ত আলোতে মাথা তোলে। আল্লাহ্‌র এই করুণা ধারা সত্বেও পৃথিবীতে অনেক অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি আছে যারা অশুভ শক্তি দ্বারা চালিত হওয়ার ফলে, আল্লাহ্‌র মঙ্গলময় করুণাধারাকে ধ্বংস করতে প্রয়াসী। কিন্তু তাদের এই অশুভ পরিকল্পনা সফলতা লাভ করবে না,বরং আল্লাহ্‌র কল্যাণময় পরিকল্পনা সফলতা লাভ করবে। এরূপ ঘটনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে মক্কার কোরাইশগণ যারা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছিলো ইসলামকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে।

১৬। আমিও পরিকল্পনা করছি ৬০৭৮।

৬০৭৮। দেখুন সূরা [ ৩ : ৫৪ ] আয়াত।

১৭। অতএব, অবিশ্বাসীদের জন্য বিলম্ব কর, এবং অবকাশ দাও [ কিছু কালের জন্য ]। ৬০৭৯

৬০৭৯। দুষ্কৃতিকারী ও কাফেরদের অবকাশ দিতে বলা হয়েছে। তাদের 'অবকাশ' দেওয়া হচ্ছে আল্লাহ্‌রই পরিকল্পনার অংশ। এর দ্বারা আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা অকার্যকর হবে না। মনে রাখতে হবে কাফের ও মন্দদের সাহায্য সহযোগীতা করার অর্থ 'অবকাশ' দেওয়া নয়, অথবা ক্ষমতা থাকা সত্বেও দুষ্টের দমন না করাও অবকাশ দেওয়া নয়। তা হলে অবকাশ দেওয়ার বিকৃত অর্থ করা হবে। এই অবকাশ দেওয়ার অর্থ হবে যখন দুষ্ট ও মন্দের অত্যাচার নির্যাতন বন্ধ করার দৃশ্যতঃ কোনও উপায় থাকবে না তখন ধৈর্য্য ও বিনয় অবলম্বনের মাধ্যমে তাদের অবকাশ দান করতে হবে। কোনও অবস্থাতেই ধৈর্যহারা হলে চলবে না। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাসুলের (সা) জীবনী।