Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ১৮ জন
আজকের পাঠক ৯৩ জন
সর্বমোট পাঠক ৭২৫৭৮২ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৯৯০৭৪ বার
+ - R Print

সূরা গাশিয়াহ্‌


সূরা গাশিয়াহ্‌ বা আচ্ছাদনকারী ঘটনা - ৮৮

২৬ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : প্রাথমিক মক্কী সূরাগুলির মধ্যে এই সূরাটি সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়। সম্ভবতঃ এটির সময়কাল হচ্ছে ৫৩ নং সূরার সমসাময়িক। এই সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে পরলোকের জীবনে ভালো ও মন্দের পরিণতি যেদিন সকল কিছুর প্রকৃত মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং সমন্বয় সাধন করা হবে। এই পৃথিবীতেও আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহ আমাদের বিচার দিবসের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ্‌ ন্যায়পরায়ণ ও মঙ্গলময়। তিনি এক মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে এই বিশাল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন।

সূরা গাশিয়াহ্‌ বা আচ্ছাদনকারী ঘটনা - ৮৮

২৬ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। তোমার নিকট কি আচ্ছাদনকারী ঘটনার [ কেয়ামত ] সংবাদ পৌঁছেছে ? ৬০৯৬

৬০৯৬। 'Gashiya' - শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'যাহা আচ্ছন্ন করে " ; আবৃত করে ; ম্লান করে, চাপা দেয় ইত্যাদি যা মানুষের সমগ্র চেতনাকে নাশ করে দেবে। যেহেতু কেয়ামত সকলকেই আচ্ছন্ন করবে,সে কারণে এ স্থলে অনুবাদ হিসেবে কেয়ামত শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

২। কিছু মুখ সেদিন অপদস্ত হবে ৬০৯৭

৬০৯৭। দেখুন [ ৭৫ : ২২, ২৪ ] আয়াত।

৩। ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে, ৬০৯৮

৬০৯৮। পাপীরা যখন তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ দোযখের আগুনকে প্রত্যক্ষ করবে, তাদের মুখে কষ্ট ও ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠবে।

৪। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত আগুনে;

৫। তাদের ফুটন্ত প্রস্রবণ থেকে পান করানো হবে,

৬। তিক্ত [কন্টকময় ] দারী ব্যতীত তাদের জন্য অন্য কোন খাবার থাকবে না ৬০৯৯,

৬০৯৯। 'দারী ' হচ্ছে আরবদেশের এক প্রকার কণ্টকময় গুল্ম। এই গুল্ম যখন সবুজ থাকে তখন একে শিব্‌রাক বলা হয় এবং যখন শুকিয়ে যায় তখন তাকে 'দারী ' বলে। এই গুল্ম বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই তা খায় না। 'যাকুমের ' ন্যায় এটি দোযখের খাদ্য। দেখুন যাকুমের জন্য [৫৬ : ৫২ ] অথবা [ ১৭: ৬০ ] আয়াত ও ২২৫০ টিকা।

৭। যা তাদের পুষ্টি দেবে না বা ক্ষুধাও নিবারণ করবে না।

৮। [অন্য ] কিছু মুখ সেদিন আনন্দে উৎফুল্ল হবে,

৯। নিজেদের কর্ম সাফল্যে সন্তুষ্ট ৬১০০
৬১০০। লক্ষ্য করুন পাপী ও পূণ্যাত্মাদের ভাগ্যকে সমান্তরাল ভাবে তুলনা করা হয়েছে। পাপীদের বেলাতে ছিলো অপমান ও লাঞ্ছনা, পূণ্যাত্মাদের বেলাতে পরিতৃপ্তি ও আনন্দ। পাপীরা দোযখের আগুনের ভয়ে ক্লিষ্ট, ক্লান্ত ও অবনত, অপরপক্ষে পূণ্যাত্মাদের জন্য আছে বেহেশতের সুখের অনুভূতি ।পার্থিব জীবনে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অবিরাম চেষ্টা, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পূণ্যাত্মাদের ইহকালে অত্যাচার ও নির্যাতনের সম্মূখীন হতে হয়েছে সত্য। কিন্তু বিনিময়ে তাঁরা পৃথিবীতেই লাভ করেছেন মানসিক শান্তি ও সন্তুষ্টি যা অমূল্য। যারা সত্যের সংগ্রামী - আল্লাহ্‌ তাদের আত্মিক শক্তি ও শান্তি দান করেন।

১০। [ প্রবেশ করবে ] সুমহান বেহেশতে ৬১০১

৬১০১। পূণ্যাত্মাদের জন্য সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামত হচ্ছে তাদের মানসিক সুখ ও শান্তি যার উল্লেখ করা হয়েছে [ ৮- ৯ ] আয়াতে, যা তারা লাভ করেন তাদের পৃথিবীর কৃতকর্মের দরুণ। এর পরে উল্লেখ করা হয়েছে বাহ্যিক আনন্দের উপকরণের, উদ্যান হচ্ছে যার প্রধান উপকরণ। বাগানের বিপরীতে পাপীদের জন্য আছে দোযখের আগুন। বাগানের বর্ণনাতে বলা হয়েছে যে এর প্রধান সৌন্দর্য হবে সেখানে কোন "অসার বাক্য' থাকবে না। এই বাগান হবে উচ্চ মর্যদা সম্পন্ন।

১১। সেখানে তারা কোন অহংকারের কথা শুনবে না ;

১২। সেখানে প্রবাহমান ঝরণা থাকবে ৬১০২

৬১০২। ফুটন্ত প্রস্রবণের [ ৫ নং আয়াত ] পরিবর্তে পূণ্যাত্মাদের জন্য থাকবে স্বচ্ছ পরিষ্কা র প্রস্রবণের পানি। পাপীরা থাকবে ভয়ে শঙ্কায় ক্লিষ্ট সেখানে পূণ্যাত্মারা থাকবে নরম গালিচা ও উপাধান দ্বারা পরিবৃত্ত।

১৩। সেখানে থাকবে উন্নত [ মর্যদাসম্পন্ন ] সিংহাসন,

১৪। প্রস্তুত থাকবে পানপাত্র,

১৫। সারি সারি বালিশ,

১৬। বিছানো থাকবে বহুমূল্য গালিচা।

১৭। তারা কি উট সকলের দিকে লক্ষ্য করে না, কিরূপে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে ? - ৬১০৩

৬১০৩। যারা পরকাল ও শেষ বিচারে বিশ্বাসী নয়, তাদের স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে। দৈনন্দিক জীবনের খুব সাধারণ বস্তু সম্বন্ধে গভীর ভাবে চিন্তা করতে বলা হয়েছে ; তবেই তারা আল্লাহ্‌র মাহাত্ব্য ও সৃষ্টির প্রতি তার সদয় তত্বাবধানের সঠিক রূপটি অনুধাবনে সক্ষম হবে। প্রথমতঃ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে উটের প্রতি। মনে রাখতে হবে ইসলামের প্রথম বিকাশ ঘটে মোশরেক আরবদের মাঝে। উটকে সে দেশে বলা হতো, " মরুর জাহাজ" যা তাদের জীবনের জন্য এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তু একমাত্র যানবাহন। এই বিশেষ দিকের প্রতি লক্ষ্য করেই উটের উদাহরণ দেয়া হয়েছে। উটের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে স্রষ্টা তা সৃষ্টি করেছেন মরুবাসীর প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে। উট তার খাদ্য অন্ত্রের মাঝে পানি সংগ্রহ করে রাখতে পারে এবং মরুভূমিতে চলার সময়ে তার ৮/১০ দিন পানি পানের প্রয়োজন হয় না। মরুভূমির কাঁটা গাছ ও ঝোপ গুল্ম তার প্রধান খাদ্য। আবার উটের পায়ের পাতা এমন ভাবে গঠিত যে তা মরুভূমির বালির মাঝে চলার উপযোগী। উট মানুষ ও ভারী বোঝা বহনে সক্ষম। সুতারাং প্রাচীন কালে মরুবাসীরা উটের সাহায্যে ব্যবসা বাণিজ্য, ও যাতায়াত করতো। উটের মাংস ও দুধ তাদের ছিলো প্রধান খাদ্য। উটের চামড়া তারা বয়নশিল্পে ব্যবহার করতো। এভাবেই উটকে মরুবাসীদের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে সৃষ্টি করা হয়েছে। এরূপ অসংখ্য উদাহরণ প্রতিটি দেশেই পাওয়া যায়, যেখানের প্রাণীকূলকে আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন সেই পরিবেশের উপযোগী করে।

১৮। এবং আকাশের দিকে ? কি ভাবে উহাকে উর্দ্ধে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে ? ৬১০৪

৬১০৪। আকাশ হচ্ছে অনন্ত রহস্যের ভান্ডার মানুষের চোখে। দ্বিতীয়তঃ এই আকাশ সম্বন্ধে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। সূদূর দিগন্তের নীল আকাশ দিনে সূর্য ও রাতে চন্দ্র ও নক্ষত্র রাজিকে ধারণ করে দিন ও রাত্রির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। মানুষ কি একবারও চিন্তা করে না কি সুনিপুন কৌশলে স্রষ্টা সূর্য ও চন্দ্রকে বিন্যস্ত করেছেন যাতে পৃথিবী যোজন মাইল দূরে থাকা সত্বেও উষ্ণতা ও আলো লাভ করে ? ঋতুর পরিবর্তন ঘটে, জোয়ার ভাটা সংঘটিত হয়। সূর্য চন্দ্রের অস্তিত্বের সাথে পৃথিবীর জীবনের অস্তিত্ব বর্তমান। এ ব্যতীত বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ আকাশের সীমাহীন রহস্যের সামান্য সন্ধান লাভ করে স্তুম্ভিত ও আশ্চর্য্য হয়ে যায়।

১৯। এবং পর্বত সমূহের প্রতি ? কি ভাবে উহাদের দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করা হয়েছে ? ৬১০৫

৬১০৫। লক্ষ্য করুণ কি সুনিপুন ভাবে উদাহরণ গুলিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাতে প্রয়োজনীয় প্রাণী উটের উল্লেখ দিয়ে শুরু করে সীমাহীন আকাশের চমৎকারীত্ব উল্লেখ করা হয়েছে যার প্রভাব সমগ্র পৃথিবীর জীবনের উপরে পড়ে। এই দুটি উদাহরণ আমাদের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে আমাদের সামাজিক জীবন ও সমগ্র পৃথিবীর জীবন ব্যবস্থাকে স্পর্শ করেছে। তৃতীয় উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে পর্বতের। পর্বতকে এমন ভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে, তা সমগ্র ভূমন্ডলের পানি সরবারহ করে থাকে নদী দ্বারা এবং পৃথিবীকে ভূঅভ্যন্তরস্থ চলমান শিলার কম্পন থেকে রক্ষা করে। নদীর উৎপত্তি হয় পর্বতে পরে তা বিভিন্ন দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়। পর্বতমালা আবাহওয়াকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যার বিবরণ আছে ভূগোল বিজ্ঞানে। দেখুন [৭৯: ৩১ ] আয়াতের টিকা নং ৫৯৩৮।

২০। এবং পৃথিবীর প্রতি, কি ভাবে উহাকে বিস্তৃত করা হয়েছে ? ৬১০৬

৬১০৬। চতুর্থ এবং শেষ উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে সমগ্র ভূমন্ডলের, যেখানে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে এবং যা মানুষের বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। ভূগোল বিজ্ঞানের মাধ্যমে আমরা জানি যে, পৃথিবী গোলাকার ; কিন্তু কি আশ্চর্যভাবে বসবাসকারী মানুষের নিকট তা সমতল মনে হয়। ভূমন্ডলে সৃষ্টি করা হয়েছে সমতলভূমি, উপত্যকা, পর্বত, মরুভূমি, সমুদ্র ইত্যাদি। এ সব সৃষ্টির মাঝে এত সুসামঞ্জস্য বিদ্যমান,যে সামান্য চিন্তা করলেই মানুষের ধারণার মাঝে ধরা দেয় স্রষ্টার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর যা মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পরেও কি মানুষ পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবনে ব্যর্থ হবে? তারা কি স্রষ্টার অস্তিত্বকে অন্তরের মাঝে উপলব্ধিতে সক্ষম হবে না ? তারা কি বুঝতে সক্ষম হবে না যে, এ সকল কিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। মানুষ যাতে পৃথিবীর জীবনে এক নির্দ্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত হয়। পৃথিবীতে তাকে প্রেরণ করা হয়েছে সুনির্দ্দিষ্ট কর্তব্য সম্পাদনের জন্য, যার সুনির্দ্দিষ্ট হিসাব তাকে দিতে হবে।

২১। সুতারাং তুমি উপদেশ দাও, কেননা তুমি তো একজন উপদেশদাতা।

২২। তুমি তো ওদের কর্মবিধায়ক নও। ৬১০৭

৬১০৭। রাসুলকে (সা) আল্লাহ্‌ প্রেরণ করেছেন মানুষকে উপদেশ দান করার জন্য। তাদের সঠিক পথের নির্দ্দেশনা দানের জন্য। মানুষের উপরে জোর জবরদস্তি করা তাঁর কাজ নয়। ধর্মের ব্যাপারে তিনি কাউকে শাস্তি দান করতে পারেন না। শাস্তি দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ্‌। তবে বিধর্মীদের সাবধান করা হয়েছে যে, পরলোকে তারা অবশ্যই শাস্তি লাভ করবে এবং সেদিন প্রতিটি জিনিষেরই প্রকৃত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে।

২৩। কিন্তু কেউ যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, এবং আল্লাহকে প্রত্যাখান করে ; -

২৪। আল্লাহ্‌ তাকে মহাশাস্তি দেবেন,

২৫। নিশ্চয় আমার নিকটেই তাদের ফিরে আসতে হবে ;

২৬। অতঃপর ওদের হিসাব -নিকাশ আমারই কাজ।